নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা
না পড়তে পারি। কিন্তু ধরে রাখতে পারি।
১
বারান্দায় বসে আছে হাজেরা।
প্রতিদিন বসে। বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। একই জায়গায়। কাঠের পিঁড়ি। পিঁড়িটা পুরনো। হাজেরার শ্বশুরের আমলের। কত পুরনো হাজেরা জানে না। হাজেরা যখন এই বাড়িতে এসেছিল, তখনো পিঁড়িটা ছিল। সেটা ষাট বছর আগে। হাজেরার বিশ বছর বয়স। পিঁড়িটা হয়তো তারও আগের।
পিঁড়ির কাঠ ক্ষয়ে গেছে। মাঝখানে একটা গর্ত। ঠিক যেখানে হাজেরা বসে। ষাট বছরের বসার ওজনে কাঠ বসে গেছে। হাজেরার শরীরের আকৃতি কাঠে ছাপ ফেলেছে।
হাজেরা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাস্তাটা মাটির। বাড়ি থেকে সোজা গেলে পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা ধরে বাঁয়ে গেলে উপজেলা সদর। ডানে গেলে জেলা শহর। জেলা শহর থেকে ঢাকা। ঢাকা থেকে সারা পৃথিবী। হাজেরার ছেলেমেয়েরা সেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে।
ছয় সন্তান। তিন ছেলে, তিন মেয়ে। পনেরো নাতি-নাতনি। সব জীবিত। সব সুস্থ। আলহামদুলিল্লাহ। হাজেরা প্রতিদিন শুকরিয়া আদায় করে। সব জীবিত। কেউ মরেনি। কেউ অসুস্থ না। এটুকু অনেক। হাজেরা জানে এটুকু অনেক। তার প্রজন্মের অনেকের সন্তান মরেছে, রোগে, দুর্ঘটনায়, একাত্তরে। হাজেরার সব সন্তান বেঁচে আছে।
কিন্তু কেউ এখানে নেই।
বড় ছেলে আনোয়ার ঢাকায়। গার্মেন্টসের ম্যানেজার।
মেজো ছেলে ফরিদ চট্টগ্রামে। ব্যবসা।
ছোট ছেলে জামাল মালয়েশিয়ায়।
বড় মেয়ে রেহানা সিলেটে। শ্বশুরবাড়ি।
মেজো মেয়ে নাসিমা রাজশাহীতে। স্কুলের শিক্ষিকা।
ছোট মেয়ে তাহমিনা ঢাকায়। ডাক্তার।
ছয় সন্তান। ছয় ঠিকানা। কোনোটাই এই গ্রামে না।
হাজেরা মনে করে, বাচ্চারা ছোট থাকতে এই বারান্দায় খেলত। আনোয়ার আর ফরিদ মারামারি করত। রেহানা পুতুল খেলত। জামাল কাঁদত সবসময়, জামাল ছোটবেলায় খুব কাঁদত। নাসিমা বই পড়ত, ছোটবেলা থেকেই। তাহমিনা সবার ছোট, সবার আদরের, সবার চোখের মণি।
এই বারান্দায় এত শব্দ ছিল একসময়। হাসি, কান্না, ঝগড়া, খেলা। এখন বারান্দায় একটাই শব্দ: বাতাস। গাছের পাতায় বাতাস। টিনের চালে বাতাস। আর হাজেরার নিশ্বাসের শব্দ। এটুকুই।
২
হাজেরার স্বামী মরেছে বারো বছর আগে।
আব্দুল হামিদ। কৃষক। সারাজীবন ধান ফলিয়েছে, পাট ফলিয়েছে, ছেলেমেয়ে মানুষ করেছে। মরার আগে বলে গেছে, "বাচ্চাগুলারে দেখিস।" হাজেরা বলেছিল, "দেখব।" কিন্তু বাচ্চারা তখন আর বাচ্চা নেই। বাচ্চারা তখন বড়। বড় হয়ে চলে গেছে। যে যার জীবনে। এটাই নিয়ম। হাজেরা জানে। হাজেরাও তার মা-বাবাকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি এসেছিল। তার মাও একা বসে থাকতেন। বারান্দায়। রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
হামিদ মরার পর ছেলেরা বলেছিল, "আম্মা, ঢাকায় চলো।" হাজেরা বলেছিল, "না।" ফরিদ বলেছিল, "চট্টগ্রামে আসো।" হাজেরা বলেছিল, "না।" তাহমিনা বলেছিল, "আম্মা, আমার কাছে থাকো, আমি ডাক্তার, তোমার সেবা করব।" হাজেরা বলেছিল, "না। আমি এই বাড়িতেই থাকব।"
কেন? হাজেরা ভাষায় বলতে পারে না। কিন্তু জানে। এই বাড়ি তার। এই মাটি তার। এই পিঁড়ি তার। এই বারান্দা, যেখানে হামিদ বসত, যেখানে বাচ্চারা খেলত, যেখানে সন্ধ্যায় আজানের আওয়াজ আসে পাশের মসজিদ থেকে, এটা তার জায়গা। ঢাকায় গেলে কী হবে? ছোট ফ্ল্যাট। চারদিকে দেয়াল। জানালা দিয়ে আরেকটা বিল্ডিং। আকাশ দেখা যায় না। মাটি নেই। গাছ নেই।
হাজেরা রয়ে গেল।
একা। শব্দটা অনেক রকম। একা মানে কেউ নেই। একা মানে শব্দ নেই। একা মানে সকালে উঠে কারো সাথে কথা বলার নেই। একা মানে রাতে ঘুমানোর আগে কাউকে "ভালো থাকিস" বলার নেই। একা মানে হাসলে কেউ দেখে না, কাঁদলে কেউ শোনে না।
হাজেরা একা থাকতে শিখেছে। শেখেনি আসলে। অভ্যাস হয়েছে। অভ্যাস আর শেখা এক না। শেখা মানে বুঝে নেওয়া। অভ্যাস মানে সহ্য করে নেওয়া। হাজেরা সহ্য করেছে। আশি বছরের জীবনে অনেক কিছু সহ্য করেছে। দারিদ্র্য। বন্যা। একাত্তরের যুদ্ধ। হামিদের মৃত্যু। কিন্তু একাকীত্ব সবচেয়ে কঠিন। কারণ এটা শেষ হয় না। দারিদ্র্য কমে, বন্যা নামে, যুদ্ধ থামে, শোক হালকা হয়। একাকীত্ব বাড়ে।
পাশের বাড়ির রাবেয়া দিনে দুবার আসে। রান্না করে দেয়। কাপড় ধুয়ে দেয়। আনোয়ার মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাঠায়। ফরিদ তিন হাজার। জামাল মাঝে মাঝে দশ হাজার। টাকার অভাব নেই। খাওয়ার অভাব নেই। ওষুধের অভাব নেই।
মানুষের অভাব আছে।
৩
ফোন আসে।
আনোয়ার সপ্তাহে একদিন ফোন করে। রবিবার। "আম্মা, কেমন আছেন?" "আছি, বাবা।" "কিছু লাগবে?" "না, বাবা।" "ঠিক আছে, আম্মা। ভালো থাকেন।" ফোন কেটে যায়। দুই মিনিট।
ফরিদ দুই সপ্তাহে একবার। কখনো তিন সপ্তাহ। ফরিদ ব্যস্ত। ব্যবসা। হাজেরা বোঝে। ব্যবসা মানে ব্যস্ত।
জামাল মাসে একবার। মালয়েশিয়া থেকে। রাত তিনটায় ফোন আসে কখনো কখনো। সময়ের তফাৎ। হাজেরা জেগে যায়। জামালের গলা শোনে। "আম্মা, ভালো আছেন?" "আছি। তুই ভালো আছিস?" "আছি, আম্মা।" "খাস ঠিকমতো?" "খাই।" "আল্লাহ হাফেজ, বাবা।" "আল্লাহ হাফেজ, আম্মা।"
মেয়েরা ফোন করে বেশি। রেহানা প্রতি তিনদিনে। নাসিমা সপ্তাহে দুবার। তাহমিনা প্রতিদিন। তাহমিনা ডাক্তার, তাই জিজ্ঞেস করে, "ব্লাড প্রেশার মাপছেন? ওষুধ খাচ্ছেন? হাঁটছেন?" হাজেরা বলে, "হ্যাঁ।" সব হ্যাঁ। কিছু সত্য, কিছু না। ওষুধ খায়। ব্লাড প্রেশার মাপে না। হাঁটে, কিন্তু বারান্দা থেকে রান্নাঘর, রান্নাঘর থেকে বারান্দা।
ফোনে কথা হয়।
ফোনে গলা শোনা যায়।
কিন্তু ফোনে মুখ দেখা যায় না। ফোনে হাত ধরা যায় না। ফোনে পাশে বসা যায় না। ফোনে একসাথে খাওয়া যায় না। ফোনে একসাথে চুপ করে বসে থাকা যায় না। চুপ করে বসে থাকাটাও তো একটা সঙ্গ। পাশে কেউ থাকলে চুপও একটা কথা।
তাহমিনা বলে, "ভিডিও কলে আসুন, আম্মা।" হাজেরার ফোনে ভিডিও কলের বোতাম কোথায় সে জানে না। সবুজ বোতাম চাপলে কথা হয়। এটুকু জানে।
হাজেরা ফোনে কথা বলার পর ফোনটা ধরে রাখে। কিছুক্ষণ। যেন ছেলে বা মেয়ের উষ্ণতা ফোনের ভেতরে আটকে আছে। যেন কানে লাগালে আরেকটু শুনবে। শব্দ না, নিশ্বাস। তারপর রেখে দেয়। ফোনটা চুপ হয়ে যায়। ঘরটা চুপ হয়ে যায়।
সবচেয়ে কঠিন সময় বিকেল তিনটা থেকে চারটা। রাবেয়া দুপুরে খাওয়া দিয়ে চলে যায়। সন্ধ্যায় আবার আসবে। মাঝের সময়টা হাজেরার। ঘড়ি নেই দেয়ালে। কিন্তু আলো দেখে সময় বোঝে। রোদ পশ্চিমে হেলে পড়লে তিনটা। ছায়া লম্বা হলে চারটা। ছায়া আরো লম্বা হলে পাঁচটা। সময় ছায়ার মতো চলে। ধীরে। একটু একটু করে।
৪
ঈদে কার্ড এসেছে।
ডাকে। খামে। নাতি আরিফের কাছ থেকে। আনোয়ারের ছেলে। ঢাকায় থাকে। ক্লাস সেভেনে পড়ে।
খামটা সবুজ। ভেতরে একটা কার্ড। রঙিন। সামনে একটা চাঁদ আঁকা, নিচে লেখা "ঈদ মুবারক"। ভেতরে আরিফের হাতের লেখায়:
"দাদি, ঈদ মুবারক। ভালো থেকো। আমি তোমাকে মিস করি। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই আসব।"
হাজেরা পড়তে পারে না।
হাজেরা কোনোদিন স্কুলে যায়নি। অক্ষর চেনে না। আলিফ বা তা চেনে, নামাজের সূরা মুখস্থ আছে, কিন্তু লেখা পড়া, কাগজে ছাপা অক্ষর থেকে অর্থ বের করা, এটা হাজেরার জীবনে আসেনি।
রাবেয়া পড়ে দিয়েছিল। রাবেয়ার ক্লাস ফাইভ পাস। রাবেয়া পড়ল, হাজেরা শুনল। শুনে চোখ বন্ধ করল। আরিফের মুখ মনে করল। গত ঈদে এসেছিল। ছোটখাটো। চশমা পরে। বই পড়ে সারাদিন। হামিদের মতো দেখতে না। আনোয়ারের মতোও না। আরিফ আরিফের মতো দেখতে।
কার্ডটা হাজেরা রেখে দিল। বালিশের নিচে। প্রতিদিন বের করে। ধরে। দেখে। পড়তে পারে না। কিন্তু ধরে রাখতে পারে। আরিফের হাত এই কাগজ ছুঁয়েছে। আরিফের কলম এই কাগজে চলেছে। এটুকুই।
হাজেরার কাছে আরো জিনিস আছে। আলমারিতে। পুরনো আলমারি, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। ভেতরে একটা টিনের বাক্স। বাক্সে: আনোয়ারের ছোটবেলার জামা, একটা। ফরিদের স্কুলের রিপোর্ট কার্ড। জামালের জন্মের সময়ের সোনার আংটি, মিষ্টির দোকান থেকে কেনা, আসল সোনা না, কিন্তু হাজেরার কাছে আসল। রেহানার বিয়ের ছবি, সাদাকালো। নাসিমার প্রথম চিঠি, ট্রেনিং থেকে লেখা। তাহমিনার ডাক্তারি পাসের সার্টিফিকেটের ফটোকপি।
ছয়টা সন্তান। ছয়টা জিনিস। প্রতিটা জিনিস একটা সন্তানের প্রতিনিধি। হাজেরা কখনো কখনো বাক্সটা খোলে। জিনিসগুলো বের করে। ধরে। দেখে। রাখে। এটাই তার সন্তানদের কাছে যাওয়া। এভাবেই যায়।
না পড়তে পারি। কিন্তু ধরে রাখতে পারি।
৫
সন্ধ্যা হলো।
আজান হলো। হাজেরা নামাজ পড়ল। জায়নামাজ গুটিয়ে রাখল। বারান্দায় এলো। পিঁড়িতে বসল।
রাস্তা খালি। সন্ধ্যার পর এই গ্রামে মানুষ চলাচল কম। কদিন আগে একটা গরু চলে গেছিল। তার আগে রিকশাভ্যান। তার আগে দুটো ছেলে, সাইকেলে। কোনোটাই হাজেরার বাড়িতে আসেনি।
কেউ আসবে।
হাজেরা প্রতি সন্ধ্যায় এটা বলে।
মনে মনে। কখনো মুখে।
কেউ আসবে। আজ না হলে কাল। কাল না হলে পরশু।
কেউ একজন এই রাস্তা ধরে আসবে, বাড়ির সামনে থামবে, ডাকবে, "দাদি" বা "আম্মা" বা "খালাম্মা।"
হাজেরা উঠবে। দরজা খুলবে। চা বসাবে।
কিন্তু কেউ আসে না।
আসে না মানে কখনোই আসে না, তা না। ঈদে আসে। বড় ঈদে আনোয়ার আসে, পরিবার নিয়ে, দুদিন থাকে। ছোট ঈদে ফরিদ আসে কখনো কখনো। মেয়েরা আসে বছরে একবার-দুবার। কিন্তু বাকি তিনশো পঞ্চান্ন দিন?
তিনশো পঞ্চান্ন দিন হাজেরা বসে থাকে। বারান্দায়। পিঁড়িতে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
গত ঈদে আনোয়ার এসেছিল। পরিবার নিয়ে। নাতি-নাতনি। বাড়ি ভরে গিয়েছিল। শব্দে ভরে গিয়েছিল। রান্নাঘরে হাঁড়ির আওয়াজ। উঠোনে বাচ্চাদের চিৎকার। সন্ধ্যায় সবাই মিলে খাওয়া। হাজেরা রেঁধেছিল নিজে। আশি বছরের হাতে পোলাও। মাংস। ফিরনি। হাতে জোর কম, কিন্তু রান্না করেছিল। ছেলেমেয়েদের জন্য।
দুদিন পর সবাই চলে গেল।
বাড়ি আবার খালি। রান্নাঘর আবার চুপ। উঠোন আবার নিরব। হাজেরা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল, গাড়ি চলে যাচ্ছে। ধুলো উড়ছে। ধুলো থিতিয়ে পড়ল। রাস্তা আবার খালি।
সেই রাতে হাজেরা কাঁদেনি। কাঁদে না হাজেরা। কান্না বুড়ো বয়সে শুকিয়ে যায়। যেভাবে নদী শুকায়। তলায় বালু থাকে, পানি থাকে না।
রাত নামল। তারা উঠল। গ্রামের আকাশে তারা অনেক। ঢাকায় তারা দেখা যায় না, আনোয়ার বলেছিল। হাজেরা ভেবেছিল, তারা দেখা যায় না, এটা কেমন জায়গা?
হাজেরা ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে বালিশের নিচ থেকে কার্ডটা বের করল। হাতে ধরল। অক্ষরগুলো দেখল। পড়তে পারে না। কিন্তু জানে কী লেখা আছে। রাবেয়া পড়ে দিয়েছিল। মুখস্থ হয়ে গেছে।
"দাদি, ভালো থেকো।"
হাজেরা কার্ডটা বুকের ওপর রাখল। চোখ বন্ধ করল।
কার্ডের কোণা একটু ভাঁজ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ধরে বলে। প্রতিদিনের হাতের ছোঁয়ায় কাগজ নরম হয়ে আসছে। একদিন এই কার্ড ছিঁড়ে যাবে। তখন? তখন হাজেরা কাগজের টুকরোগুলো জড়ো করবে। হাতে ধরবে। ছেঁড়া কাগজও ধরে রাখা যায়।
ভালো আছি, বাবা। ভালো আছি।