নারী ও পানি
এই ২৭৩ ঘণ্টায় আমি কী করতে পারতাম?
১
কলসিটা মাথায় উঠল।
বিশ লিটার। রোজিনা জানে ওজন। ঠিক বিশ লিটার ধরে এই কলসিতে। দিনে তিন ট্রিপ। তিন কলসি। ষাট লিটার। প্রতিদিন। ষাট লিটার পানি রোজিনার মাথায় চড়ে এই বাড়িতে আসে। রান্নার পানি, গোসলের পানি, কাপড় ধোয়ার পানি, বাসনমাজার পানি, পশুর পানি।
পানি। সবকিছুর শুরু পানি।
টিউবওয়েলটা দুই কিলোমিটার দূরে। আগে ছিল দেড় কিলোমিটার। সেই টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। লাল রঙ করে দিয়েছে। পানি ওঠে, কিন্তু খাওয়া যায় না। পাশে সাইনবোর্ড, লাল অক্ষরে লেখা: "আর্সেনিকযুক্ত, পান করবেন না।"
নতুন টিউবওয়েল বসেছে আরো পাঁচশো মিটার দূরে।
সবুজ রঙ। পানি ভালো। নিরাপদ।
কিন্তু পাঁচশো মিটার বেশি।
পাঁচশো মিটার শুনতে বেশি না। কিন্তু প্রতি ট্রিপে পাঁচশো মিটার বেশি মানে এক কিলোমিটার বেশি, যাওয়া-আসায়। তিন ট্রিপে তিন কিলোমিটার বেশি। প্রতিদিন। প্রতি ট্রিপে পনেরো মিনিট বাড়তি। তিন ট্রিপে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। প্রতিদিন পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেশি হাঁটা, মাথায় বিশ লিটার পানি নিয়ে।
রোজিনা হিসেব জানে। রোজিনা ক্লাস এইট পাস। গণিত ভালো ছিল।
পঁয়তাল্লিশ মিনিট প্রতিদিন। বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন, কারণ পানি আনা বন্ধ থাকে না, ঈদেও লাগে, জ্বরেও লাগে, বৃষ্টিতেও লাগে।
পঁয়তাল্লিশ গুণ তিনশো পঁয়ষট্টি সমান ষোলো হাজার চারশো পঁচিশ মিনিট। ভাগ ষাট সমান দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা।
দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা।
শুধু অতিরিক্ত সময়। শুধু নতুন টিউবওয়েল পাঁচশো মিটার দূরে যাওয়ার কারণে।
আগের সময়টা ধরলে আরো বেশি। আগে দেড় কিলোমিটার ছিল। এখন দুই। প্রতি ট্রিপে চার কিলোমিটার। তিন ট্রিপে বারো কিলোমিটার। প্রতিদিন।
বারো কিলোমিটার। একজন নারী, মাথায় বিশ কেজি পানি, প্রতিদিন বারো কিলোমিটার হাঁটে। বছরে চার হাজার তিনশো আশি কিলোমিটার। ঢাকা থেকে দিল্লি, দিল্লির চেয়েও বেশি। শুধু পানি আনতে।
এই দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টায় আমি কী করতে পারতাম?
২
পানি আনা মেয়েদের কাজ।
এটা কে ঠিক করেছে রোজিনা জানে না। কেউ ঠিক করেনি হয়তো। এমনিতেই হয়ে গেছে। মায়েরা আনত, মেয়েরা আনে, মেয়েদের মেয়েরা আনবে। শেকলের মতো। প্রতিটা প্রজন্ম একটা লিংক।
রোজিনার স্বামী কামাল সকালে বেরোয়। ভ্যানগাড়ি চালায়। সন্ধ্যায় ফেরে। ক্লান্ত। রোজিনা বলে না, "পানি আনো।" কামাল বলে না, "আমি আনি।" বিষয়টা কথার বাইরে। বিষয়টা কাঠামোর ভেতরে। এমন গভীরে বসানো যে দেখাই যায় না।
কামাল খারাপ মানুষ না। মারে না। খাটে। সংসার চালায়। কিন্তু কামালের মাথায় কখনো কলসি ওঠেনি। কামালের মায়ের মাথায় উঠেছে। কামালের বোনের মাথায় উঠেছে। কামালের মাথায় না।
রোজিনার মেয়ে সুমি। দশ বছর। সুমি এখন রোজিনার সাথে যায়। ছোট কলসি। দশ লিটার। সুমির মাথায়ও পানি।
রোজিনা দেখে সুমিকে। ছোট মাথা। চিকন ঘাড়। দশ লিটার পানি। হাঁটছে। পায়ে স্যান্ডেল নেই। খালি পা। মাটির রাস্তা। কাঁকর।
রোজিনার মায়ের মাথায় পানি ছিল। রোজিনার মাথায় আছে। সুমির মাথায় উঠেছে। সুমির মেয়ের মাথায়ও উঠবে?
৩
আর্সেনিক।
শব্দটা রোজিনা প্রথম শুনেছিল পাঁচ বছর আগে। এনজিও থেকে লোক এসেছিল। টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করেছিল। ছোট বোতলে পানি নিয়েছিল। দুই সপ্তাহ পর ফলাফল এসেছিল। আর্সেনিক। মাত্রার চেয়ে বেশি। কত বেশি রোজিনা বোঝেনি। সংখ্যাটা বলেছিল, "পঞ্চাশ মাইক্রোগ্রাম পার লিটার। মাত্রা দশ।" পাঁচগুণ বেশি।
"এই পানি খেলে কী হয়?"
"চামড়ায় দাগ। পেটের সমস্যা। দীর্ঘদিন খেলে ক্যান্সার।"
ক্যান্সার। শব্দটা রোজিনা চেনে। পাশের বাড়ির আলেয়ার শ্বশুর ক্যান্সারে মরেছে। পেটের ক্যান্সার। হাড় হয়ে গেছিল শেষে।
রোজিনা কত বছর এই পানি খেয়েছে? হিসেব করল। বিয়ের পর এই বাড়িতে এসেছে পনেরো বছর আগে। পনেরো বছর এই পানি খেয়েছে। কামাল খেয়েছে। সুমি খেয়েছে। পেটের ভেতরে, রক্তে, হাড়ে।
এনজিওর লোক বলেছিল, "চিন্তা করবেন না। সব আর্সেনিক শরীরে জমে না। কিছু বের হয়ে যায়।"
রোজিনা চিন্তা করে। পানি নিয়ে চিন্তা করে। পানি যে চিন্তার বিষয় হতে পারে, এটা রোজিনা আগে জানত না। পানি তো পানি। পানি খেতে হয়। পানি দিয়ে রান্না করতে হয়। পানি দিয়ে ধুতে হয়। পানি আনতে হয়। পানি নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়?
কিন্তু পানিই বিষ হতে পারে। এটা রোজিনার কাছে নতুন ছিল।
নতুন টিউবওয়েল বসল। পাঁচশো মিটার দূরে। নিরাপদ পানি। সবুজ রঙ। রোজিনা গেল। পানি আনল। নিরাপদ। কিন্তু দূরে।
নিরাপদ পানির দাম সময়। সময়ের দাম টাকায় মাপা যায় না। কিন্তু শরীরে মাপা যায়। ঘাড়ে। কোমরে। হাঁটুতে।
৪
পানি আনা মেয়েদের কাজ। কিন্তু পানির নীতি ঠিক করে পুরুষ।
এই কথাটা রোজিনা বলেছিল ইউনিয়ন পরিষদের মিটিংয়ে। মেম্বার ডেকেছিল। পানি সমস্যা নিয়ে আলোচনা। পুরুষরা বসেছে সামনের সারিতে। মেয়েরা পেছনে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে।
চেয়ারম্যান বলল, "নতুন টিউবওয়েলের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছি। এলজিইডি বলেছে বাজেট আছে। তবে সময় লাগবে।"
"কোথায় বসাবেন?" রোজিনা জিজ্ঞেস করল।
"স্কুলের পাশে।"
"স্কুলের পাশে মানে আমাদের পাড়া থেকে তিন কিলোমিটার।"
"সব জায়গায় তো একসাথে দেওয়া যায় না।"
"কিন্তু কোথায় দেবেন সেটা কে ঠিক করছে? যারা পানি আনে, তারা? নাকি যারা পানি আনে না, তারা?"
চুপ। কেউ কিছু বলল না। পেছন থেকে একজন মেয়ে হাসল। আস্তে।
চেয়ারম্যান বলল, "আপনার পাড়ায় কটা পরিবার?"
"বিয়াল্লিশ।"
"বিয়াল্লিশ পরিবার। ঠিক আছে, দেখি কী করা যায়।"
"দেখি" মানে কিছু হবে না। রোজিনা জানে। "দেখি" মানে ভুলে যাওয়া। রোজিনা উঠে দাঁড়াল।
"চেয়ারম্যান সাহেব, আমি প্রতিদিন ছয় কিলোমিটার হাঁটি পানির জন্য। মাথায় বিশ কেজি। বছরে দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা বাড়তি খরচ হয় শুধু নতুন টিউবওয়েল দূরে বলে। এই সময়টা আমার। এই শরীরটা আমার। আপনি যখন ঠিক করবেন কোথায় টিউবওয়েল বসবে, তখন একবার ভাববেন, কার মাথায় পানি উঠবে।"
রোজিনা বসল।
পেছনে একজন মেয়ে বলল, "ঠিক বলেছেন, আপা।" আস্তে বলল। কিন্তু রোজিনা শুনল।
চেয়ারম্যান কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর অন্য বিষয়ে চলে গেল।
মিটিং শেষে রোজিনা বের হলো। বাইরে রোদ। কলসি হাতে নেই। কিন্তু মাথায় ওজন আছে। অন্য রকম ওজন।
৫
সকাল পাঁচটা। রোজিনা উঠেছে।
প্রথম ট্রিপ।
কলসি নিল। বের হলো। রাস্তায় অন্ধকার থাকতে থাকতে আলো ফুটছে। পূবে আকাশ লাল। শিশির ভেজা ঘাস। পায়ে ঠান্ডা লাগছে।
পাশে সুমি। ছোট কলসি হাতে। ঘুমচোখে। কিন্তু হাঁটছে। অভিযোগ নেই। অভিযোগ করতে শেখেনি। বা শিখেছে যে অভিযোগ করে লাভ নেই।
রোজিনা হাঁটতে হাঁটতে ভাবে।
দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা। একটা বছরের দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা। এই সময়ে কী করতে পারত? সেলাই শিখতে পারত। সুমিকে পড়াতে পারত। সবজি বাগান করতে পারত, যেটা ইচ্ছা ছিল কিন্তু সময় হয়নি। হাঁস-মুরগি পালতে পারত, আরো কয়েকটা, বাড়তি আয়। ঘুমাতে পারত। শুধু ঘুমাতে পারত। রোজিনার ঘুমের অভাব আছে। সবসময় আছে।
দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা মানে এগারো দিনের বেশি। পুরো এগারো দিন। চব্বিশ ঘণ্টা করে। শুধু টিউবওয়েল দূরে যাওয়ার কারণে। শুধু আর্সেনিকের কারণে। শুধু সিদ্ধান্তটা নেওয়ার সময় কেউ জিজ্ঞেস করেনি, "মা-বোনেরা, টিউবওয়েলটা কোথায় হলে ভালো হয়?"
টিউবওয়েলে পৌঁছল। সারিতে দাঁড়াল। সামনে তিনজন। তিনজনই মেয়ে। একজন বৃদ্ধা, দুজন তরুণী। কলসি হাতে। অপেক্ষা।
রোজিনার পালা এলো। হ্যান্ডেল চাপল। পানি উঠল। ঠান্ডা। পরিষ্কার। নিরাপদ। কলসি ভরল।
মাথায় তুলল। বিশ লিটার। কলসির তলা ঠান্ডা। মাথায় ঠান্ডা লাগল।
হাঁটতে শুরু করল। দুই কিলোমিটার। পাশে সুমি। ছোট পায়ে।
রোজিনা হাঁটে। প্রতিদিন হাঁটে। প্রতিদিন পানি আনে। প্রতিদিন দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টার একটুকরো সময় মাটিতে পড়ে যায়, পায়ের দাগের মতো, যেটা পরের পায়ের চাপে মুছে যায়।
সুমি হাঁটছে পাশে। দশ বছর। তার মাথায়ও পানি।
রোজিনা সুমির দিকে তাকাল। সুমি তাকাল না। সুমি সামনে তাকিয়ে আছে। রাস্তার দিকে। রাস্তা লম্বা।
সুমি স্কুলে যায়। ক্লাস ফোরে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার আগে পানি আনে। স্কুল থেকে ফিরে পানি আনে। পানি আর পড়া। পড়া আর পানি। সুমি কি বড় হয়ে পানি আনবে? নাকি সুমি অন্য কিছু করবে? রোজিনা চায় সুমি অন্য কিছু করুক। রোজিনা চায় সুমির মাথায় কলসি না থাকুক। সুমির মাথায় থাকুক বই। সুমির হাতে থাকুক কলম। সুমির পায়ে থাকুক জুতা।
কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মাঝখানে দুই কিলোমিটার রাস্তা। আর একটা কলসি। আর দুইশো তিয়াত্তর ঘণ্টা।
রোজিনা হাঁটতে থাকল।