মেয়ে হওয়ার মূল্য

মেয়ে হওয়ার মূল্য জন্মে দিতে শুরু করে। শোধ হয় না কোনোদিন।

পর্ব ৯৯ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

জন্ম।

"মেয়ে হয়েছে।"

তিনটে শব্দ। পৃথিবীতে আসার মুহূর্তে প্রথম যে বাক্য তাকে ঘিরে উচ্চারিত হয়, সেটা তার পরিচয় নয়, তার ওজন নয়, তার স্বাস্থ্য নয়। সেটা তার লিঙ্গ। "মেয়ে হয়েছে।" এই বাক্যের পরে যে নীরবতা নামে, সেটা বাংলাদেশের প্রতিটা প্রসূতি ঘরে একই রকম। একটা দম। একটা থামা। যেন ঘরের বাতাস একটু ভারী হয়ে গেল।

"ছেলে হয়েছে" বললে আজান দেওয়া হতো। মিষ্টি বিলানো হতো। শ্বশুর খুশিতে টাকা ছড়াত। "মেয়ে হয়েছে" বলায় কেউ কিছু বলে না। মা ক্লান্ত শুয়ে থাকে। ধাত্রী বাচ্চাটাকে মুছে কাপড়ে জড়ায়। বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, একটু হতাশ, একটু চুপ।

সে এখনো কিছু বোঝে না। সে কাঁদছে। তার কান্না ছেলেদের কান্নার মতোই। একই ফুসফুস, একই কণ্ঠস্বর, একই প্রয়োজন। কিন্তু তার কান্নার উত্তর আলাদা। তার কান্নায় পৃথিবী একটু কম উৎসাহিত। একটু কম আগ্রহী। একটু কম স্বাগত।

মেয়ে হওয়ার মূল্য দিতে শুরু করে জন্মের প্রথম শ্বাসে।

শৈশব।

ভাইয়ের বাটিতে ভাত বেশি। তার বাটিতে কম। কেউ মেপে দেয় না, কিন্তু হাতটা যেন নিজেই জানে, ছেলের জন্য বেশি, মেয়ের জন্য কম। ডিমটা ভাইয়ের। মাছের মাথাটা বাবার। মাছের লেজটা মায়ের। মেয়ে পায় কাঁটাযুক্ত মাঝখানটা।

ভাই স্কুলে যায়। সে-ও যায়। কিন্তু ভাইয়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর আসে, তার জন্য আসে না। ভাইয়ের বই নতুন, তার বই ভাইয়ের পুরোনো বই, যদি সে ভাইয়ের পরের ক্লাসে থাকত। কিন্তু বেশিরভাগ সময় ভাইয়ের বই তার কাজে লাগে না, কারণ ভাই সায়েন্সে, সে আর্টসে।

ভাই মাঠে খেলে। ক্রিকেট, ফুটবল, মার্বেল। সে বাড়িতে থাকে। "মেয়ে মানুষ মাঠে খেলবে?" পুতুল আছে, পুতুল নিয়ে খেলে। পুতুলের সংসার সাজায়। পুতুলকে ভাত খাওয়ায়। পুতুলের বাচ্চা জন্ম দেয়। ছয় বছর বয়সেই সংসারের মহড়া।

সন্ধ্যায় ভাই বাইরে যায়। সে যায় না। "মেয়ে মানুষ সন্ধ্যার পরে বাইরে যায় না।" কেন? কেউ বলে না কেন। শুধু বলে যায় না। যেন সন্ধ্যার পরে পৃথিবীটা মেয়েদের জন্য নয়। যেন অন্ধকার শুধু মেয়েদেরই গিলে খায়। ভাইদের গিলে খায় না।

সে শেখে: বাইরেটা ভাইয়ের, ভেতরটা তার। পৃথিবী ভাইয়ের। ঘর তার। আকাশ ভাইয়ের। চুলা তার।

কিন্তু সে জানে না যে একদিন সেই চুলাও তার থাকবে না। একদিন অন্যের চুলায় রান্না করতে হবে। শ্বশুরবাড়ির চুলায়। সেই চুলায় আগুনের রঙ আলাদা।

কৈশোর।

কৈশোর মানে শরীর বদলানো। কৈশোর মানে পৃথিবী বদলানো। কৈশোর মানে যে দরজাগুলো খোলা ছিল, সেগুলো একে একে বন্ধ হওয়া।

বারো বছরে শরীর বদলায়। কেউ আগে থেকে বলেনি। মা বলেনি, বোন বলেনি, স্কুল বলেনি। একদিন সকালে বিছানায় রক্ত দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে। মা আসে। চুপ করিয়ে দেয়। দরজা বন্ধ করে। "কাউকে বলবি না।" কেন বলবে না? রক্ত তো তার শরীরের। রক্ত তো স্বাভাবিক। কিন্তু মেয়ের শরীর লজ্জার। মেয়ের রক্ত লজ্জার। মেয়ের বেড়ে ওঠা লজ্জার।

ওড়না আসে। বুক ঢাকতে হয়। আগে যে বুকে কিছু ছিল না, এখন আছে, এবং সেটা ঢাকতে হয়। কেন ঢাকতে হয়? কারণ পুরুষের চোখ আছে। পুরুষের চোখ মেয়ের শরীরে থামে। সেই থামা মেয়ের দোষ। পুরুষ তাকাবে, এটা স্বাভাবিক। মেয়ে ঢাকবে, এটা কর্তব্য।

রাস্তায় হাঁটলে পেছন থেকে শব্দ আসে। শিস। মন্তব্য। কখনো হাত। সে দ্রুত হাঁটে। মাথা নিচু করে হাঁটে। এটাই শেখে: মাথা নিচু রাখ, দ্রুত হাঁট, চোখে চোখ রেখো না।

বিয়ের কথা ওঠে। সে ক্লাস নাইনে। কোথাকার কে এসে দেখে যায়। "মেয়েটা সুন্দর।" সুন্দর হওয়া যোগ্যতা। সুন্দর হওয়া সম্পদ। সুন্দর হওয়া বিপদ। কারণ সুন্দর মেয়ে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হয়। "নইলে কেউ নিয়ে যাবে।" নিয়ে যাবে। যেন সে জিনিস। যেন সে পাকা ফল, তাড়াতাড়ি না পাড়লে পচে যাবে, পড়ে যাবে।

মা লড়ে। "মেয়েকে পড়াবো।" বাবা দোনোমনো করে। শেষে রাজি হয়। মেয়ে পড়ে। কিন্তু প্রতিটা ক্লাসে যাওয়া একটা জয়। প্রতিটা পরীক্ষায় বসা একটা বিদ্রোহ। কারণ ঘরের বাইরে মেয়ে, প্রতিটা পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হয় কেন সে বাইরে আছে।

যৌবন।

বিয়ে। যৌতুক। শ্বশুরবাড়ি। তিনটে শব্দ। তিনটে শিকল। একটা গলায়, একটা হাতে, একটা পায়ে।

বাবা ধার করে। মেয়ের বিয়ে মানে বাবার ঋণ। মেয়ে জন্ম নেওয়ার দিন থেকে বাবা জানে, একদিন এই ঋণ করতে হবে। আলমারি, বিছানা, টেলিভিশন, সোনার গয়না, নগদ টাকা। মেয়ের দাম। না, মেয়ের দাম নয়, মেয়ে নেওয়ার দাম। ছেলেপক্ষ মেয়ে "নিচ্ছে," তাই মেয়েপক্ষকে দিতে হবে। যেন মেয়ে বোঝা। যেন মেয়ে ফেরত দেওয়ার জিনিস। যেন মেয়ের সাথে ঘুষ না দিলে কেউ নেবে না।

শ্বশুরবাড়িতে সে নতুন। নাম হারায়। "বউমা" হয়ে যায়। নিজের বাড়ি ফেলে এসেছে, নিজের ঘর ফেলে এসেছে, নিজের মা ফেলে এসেছে। এই বাড়ি তার নয়। এই ঘর তার নয়। এই মানুষগুলো তার পরিবার, কিন্তু তার নয়। সে মেহমান। চিরদিনের মেহমান। মেহমানের মতো সতর্ক, মেহমানের মতো নম্র, মেহমানের মতো নিজেকে ছোট করে রাখা।

গর্ভধারণ। শরীর ভারী হয়। পা ফোলে। পিঠে ব্যথা। তবু রান্না করতে হয়, ঘর সামলাতে হয়, শাশুড়ির সেবা করতে হয়। গর্ভবতী মানে অসুস্থ নয়, গর্ভবতী মানে দুজনের কাজ একজনে করা।

প্রথম সন্তান। যদি ছেলে হয়, মুক্তি। যদি মেয়ে হয়, "পরেরটা ছেলে হবে।" তার শরীর একটা কারখানা। ছেলে উৎপাদনের কারখানা। ছেলে না হওয়া পর্যন্ত কারখানা বন্ধ হয় না।

নাম হারায়। সে আর "সে" নয়। সে "বড় ভাইয়ের বউ," "ছোট ঘরের বউমা," "আব্দুলের মা।" নিজের নাম কেউ ধরে ডাকে না। নিজের নাম শুধু স্কুলের খাতায় আছে, আধার কার্ডে আছে, কিন্তু মুখে কেউ বলে না।

প্রসবের ব্যথা সইতে হয়। একা। স্বামী বাইরে বসে থাকে। শাশুড়ি বলে, "আমরাও সয়েছি।" সওয়া ছাড়া আর কী আছে? সওয়াটাই মেয়ের ভাগ্য। ব্যথা সওয়া, অপমান সওয়া, অবহেলা সওয়া, সব সওয়া।

মধ্যবয়স।

মধ্যবয়স মানে ভুলে যাওয়া। সবাই ভুলে যায়। সে-ও নিজেকে ভুলে যায়।

সে এখন অদৃশ্য। সন্তানের মা, স্বামীর স্ত্রী, শাশুড়ির বউমা। নিজে কে? সেই প্রশ্নটা সে ভুলে গেছে। আয়নায় তাকালে দেখে ক্লান্ত একটা মুখ, চোখের নিচে কালি, চুলে পাক, হাতে রান্নার দাগ। এই মুখটা তার, কিন্তু সে চেনে না। কোথায় গেল সেই মেয়ে যে স্কুলে যেতে চেয়েছিল? কোথায় গেল সেই মেয়ে যে রাতে তারা গুনত?

সকালে ওঠে সবার আগে। ফজরের আজানে। অন্ধকারে। চুলা জ্বালায়, পানি গরম করে, চা বানায়, ভাত চড়ায়, তরকারি কাটে। সবাইকে জাগায়। সবাইকে খাওয়ায়। স্কুলে পাঠায়। ঘর ঝাড়ু দেয়। কাপড় ধোয়। বাজার করে। আবার রান্না করে। আবার খাওয়ায়। আবার পরিষ্কার করে। থালা মাজে। পরের দিনের জন্য ডাল ভিজিয়ে রাখে। রাতে শোয় সবার পরে। মশারি টাঙায় সবার জন্য, নিজেরটা সবশেষে। এই চক্র প্রতিদিন। প্রতিদিন। প্রতিদিন। তিরিশ বছর ধরে প্রতিদিন।

কেউ বলে না "ধন্যবাদ।" কেউ বলে না "তুমি ক্লান্ত? বিশ্রাম নাও।" কারণ এটা তার "কাজ।" রান্না তার কাজ, সন্তান পালন তার কাজ, সেবা তার কাজ। এটা কাজ, কিন্তু এর কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই, কোনো পদোন্নতি নেই, কোনো অবসর নেই।

স্বামী বাইরে গেলে সে একা হয়। কিন্তু একা মানে মুক্ত নয়। একা মানে আরো কাজ। কারণ স্বামী না থাকলেও সংসার থামে না। সংসার কখনো থামে না। সংসার একটা নদী, আর সে সেই নদীর একমাত্র নৌকা। নদী শুকোলেও সে নৌকা থাকবে। কেউ নতুন নদী দেবে না।

অসুখ হলে চুপ করে সয়। "আমার কিছু হয়নি।" ডাক্তারের কাছে যায় না। কারণ ডাক্তারের কাছে যাওয়া মানে সংসার একদিন থামবে। একদিন থামলে "কে রান্না করবে? কে বাচ্চা দেখবে?" এই প্রশ্নের উত্তর নেই। তাই সে অসুখ চেপে রাখে। শরীরে জমা করে। স্তরে স্তরে।

বার্ধক্য।

চুল সাদা। শরীর ভাঙা। কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, চোখে ঝাপসা। সারাজীবন অন্যের সেবা করেছে, এখন নিজেরই সেবা দরকার। কিন্তু কে দেবে?

সন্তানরা বড় হয়ে গেছে। ছেলে ঢাকায়, মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে। সে এখন বোঝা। যে নারী সারাজীবন সবার বোঝা বহন করেছে, সে নিজেই এখন বোঝা। ছেলে টাকা পাঠায়, কিন্তু সময় দেয় না। মেয়ে ফোন করে, কিন্তু আসতে পারে না। সে একা ঘরে বসে থাকে, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে, সময় গোনে।

ভাগ্য ভালো হলে ছেলে কাছে রাখে। ভাগ্য মন্দ হলে বৃদ্ধাশ্রমে যায়। অথবা গ্রামের বাড়িতে একা থাকে, পাশের বাড়ির মানুষ মাঝে মাঝে দেখে যায়, মাঝে মাঝে দেখে না।

ছেলে থাকলে মা "সম্মানিত।" ছেলে না থাকলে মা "অভাগিনী।" মায়ের সম্মান তার নিজের নয়। মায়ের সম্মান ছেলের। ছেলে যদি ভালো করে, "মায়ের দোয়া।" ছেলে যদি খারাপ করে, "মায়ের শাসন ছিল না।" সব ছেলের মাধ্যমে। মায়ের নিজের কোনো পরিচয় নেই ছেলে ছাড়া।

মেয়ে থাকলে মেয়ে কাঁদে। কিন্তু মেয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে পারে না। মেয়ে অসহায়। মেয়ে যতটুকু করতে পারে, ফোনে কান্না, এটুকুই।

মৃত্যু।

"মা মারা গেছে।"

ফোনে খবর যায়। ছেলে ছুটে আসে। মেয়ে ছুটে আসে। সবাই কাঁদে। "আমার মা ছিল সবচেয়ে ভালো মানুষ।" "মা সব দিয়ে গেছে।" "মায়ের মতো আর কেউ নেই।"

কবরের পাশে সবাই দাঁড়ায়। চোখে পানি। বুকে ব্যথা। "মাকে আরেকটু ভালো রাখতে পারতাম।" "মায়ের সাথে আরেকটু সময় কাটাতে পারতাম।" "মা শেষ যখন ফোন করেছিল, আমি ব্যস্ত ছিলাম, ধরিনি।"

মায়ের কবরে সবাই কাঁদে। বেঁচে থাকতে কয়জন দেখেছিল?

বেঁচে থাকতে কয়জন জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, তুমি কেমন আছ?" শুধু "খেয়েছ?" নয়। "কেমন আছ?" কেমন আছ মানে তোমার মন কেমন, তোমার ভেতরে কী চলছে, তুমি কি সুখী, তুমি কি একা লাগে, তুমি কি কিছু চাও।

কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কারণ মায়ের "কেমন আছ"-এর উত্তর সবাই জানে: "আমি ভালো আছি।" মায়ের ভালো থাকা প্রশ্নাতীত। মায়ের ভালো না থাকা অচিন্তনীয়।

মায়ের কবরে ফুল দেয় কেউ কেউ। বেশিরভাগ কেউ দেয় না। কবরের মাটি ধীরে ধীরে সমান হয়ে যায়। ঘাস গজায়। একদিন কবরটা খুঁজে পাওয়া যায় না। মায়ের নাম ভুলে যায় নাতিরা। মায়ের মুখ ভুলে যায় নাতনিরা। শুধু একটা অনুভূতি থেকে যায়, ঝাপসা, দূরবর্তী, যেন কেউ ছিল যে ভালোবাসত, কিন্তু কে ছিল, কেমন ছিল, মনে নেই।

এভাবেই মেয়ের জীবন শেষ হয়। জন্মে নীরবতা, মৃত্যুতে বিস্মৃতি।

এটা একজনের গল্প নয়।

এটা সবার গল্প। প্রতিটা মেয়ের। প্রতিটা নারীর। যে জন্মেছে এই মাটিতে, এই আকাশের নিচে, এই নদীর পাশে। প্রতিটা "মেয়ে হয়েছে"-তে যে নীরবতা নামে, সেটা একই নীরবতা। প্রতিটা ওড়নায় যে লজ্জা ঢাকা হয়, সেটা একই লজ্জা। প্রতিটা রান্নাঘরে যে ঘাম ঝরে, সেটা একই ঘাম।

কিন্তু প্রতিটা মেয়ে আলাদা। প্রতিটা মেয়ের ব্যথা তার নিজের। প্রতিটা মেয়ের লড়াই তার নিজের। প্রতিটা মেয়ের জয় তার নিজের।

কেউ গার্মেন্টসে সেলাই করে, সতেরো বছর বয়সে, রাত দশটায় ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে অন্ধকার রাস্তায় হাঁটে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, প্রথম প্রজন্মের ছাত্রী, পরিবারের সবার আশা। কেউ খেতে কাজ করে, রোদে, ঘামে, কোমর ব্যথায়। কেউ অফিসে বসে, কম্পিউটারে, ছেলেদের মাঝে একমাত্র মেয়ে।

সব আলাদা। কিন্তু মূল্যটা একই।

মেয়ে হওয়ার মূল্য জন্মে দিতে শুরু করে। শোধ হয় না কোনোদিন। কারণ পৃথিবী মেয়েদের কাছে সবসময় পাওনাদার। সবসময় কিছু চায়। সবসময় বলে, "আরো দাও। আরো সহ্য কর। আরো চুপ থাক। আরো ত্যাগ কর।" আর মেয়ে দেয়। দিতে দিতে নিজে ফুরিয়ে যায়। কিন্তু ফুরোনোর আগে একটা কাজ করে: পরের মেয়েটাকে একটু শক্তিশালী করে রেখে যায়।

কিন্তু।

এই একটা শব্দ দিয়ে এই গল্প বদলায়।

কিন্তু এই মূল্য দিতে দিতে মেয়েরা একটা জিনিস শেখে যেটা ছেলেরা শেখে না।

সহ্য করা। না, সহ্য করা শব্দটা ঠিক না। সহ্য করা দুর্বলতা বোঝায়। মেয়েরা যা শেখে সেটা সহ্য নয়। সেটা রূপান্তর। ব্যথাকে শক্তিতে রূপান্তর। অপমানকে একগুঁয়েমিতে রূপান্তর। অবহেলাকে স্বনির্ভরতায় রূপান্তর।

প্রতিটা "মেয়ে হয়েছে"-তে একটা মেয়ে জন্মায় যে একদিন প্রমাণ করবে "মেয়ে হওয়া" কম নয়। প্রতিটা "মেয়ে মানুষ"-এ একটা মানুষ তৈরি হয় যে "মানুষ" শব্দটার অর্থ বদলে দেবে। প্রতিটা বন্ধ দরজায় একটা হাত তৈরি হয় যে একদিন সেই দরজা ভাঙবে।

মেয়ে হওয়ার মূল্য বেশি। কিন্তু মেয়ে হওয়ার মূল্য যারা দেয়, তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। কারণ তারা প্রতিদিন লড়ে। প্রতিটা শ্বাসে লড়ে। এবং লড়তে লড়তে একদিন এমন একটা পৃথিবী বানায় যেখানে তাদের মেয়েদের এত মূল্য দিতে হবে না।

সেই পৃথিবী আসেনি এখনো। কিন্তু আসছে। ধীরে। খুব ধীরে। কিন্তু আসছে।

প্রতিটা মেয়ের জন্মে সেই পৃথিবী একটু কাছে আসে। প্রতিটা মায়ের লড়াইতে সেই পৃথিবী একটু স্পষ্ট হয়।

মেয়ে হওয়ার মূল্য জন্মে দিতে শুরু করে। শোধ হয় না কোনোদিন। কিন্তু মেয়েরা হিসেব রাখে না। মেয়েরা শুধু দিয়ে যায়। দিতে দিতে একদিন এত বেশি দেয় যে পৃথিবী লজ্জা পায়। এবং বদলায়।

অথবা বদলায় না। এবং মেয়েরা তবু দিয়ে যায়।

এটাই মেয়ে হওয়া। এটাই অর্ধেক আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা। এটাই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটানা মূল্য দিয়ে যাওয়া, কিন্তু রসিদ না পাওয়া।