একটি SMS, দুটি ভাগ্য
২১ লাখ ফোনে একটি করে বার্তা, কিন্তু ভাগ্য সবার আলাদা
১
২০২৬ সালে একুশ লাখ ছেলেমেয়ে HSC পরীক্ষা দিয়েছে।
একুশ লাখ। সংখ্যাটা মুখে বলা সহজ। বোঝা কঠিন। ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। পুরো সিলেট বিভাগের মোট মানুষের অর্ধেক। একুশ লাখ ফোনে এখন একটা করে SMS আসবে। কারো জীবন বদলে যাবে। কারো জীবন যেখানে ছিল, সেখানেই থাকবে।
জাহিদের ফোনে এখনো কিছু আসেনি।
সকাল আটটা বাজে। মাইমনসিং শহরের এক গলির ভেতর, টিনের চালের ঘর। দুই রুম। একটায় বাবা-মা, অন্যটায় জাহিদ আর মিম। রান্নাঘর বাইরে, চালার নিচে। পায়খানা আরো বাইরে, উঠোনের কোণায়। এই বাড়িতে জাহিদ আঠারো বছর কাটিয়েছে। এই বাড়ি থেকেই সে প্রথম স্কুলে গেছে, প্রথম পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে, প্রথম বুকে চাপা কান্না চেপেছে যেদিন বড় ভাই রাকিব গাজীপুর চলে গেল।
ফোনটা বিছানার ওপর। স্ক্রিন বন্ধ। জাহিদ দাঁত মাজতে গেছে, কিন্তু ব্রাশটা মুখে ঢুকিয়ে আবার ফিরে এসেছে। ফোন চেক করেছে। কিছু নেই। আবার গেছে। আবার ফিরেছে।
এটা তৃতীয়বার।
মিম বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে জেগে আছে। ক্লাস এইটে পড়ে। পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই, কিন্তু ভাইয়ের চিন্তা নিয়ে তার চিন্তা আছে। সে ভাইকে দেখছে। ভাই দেখছে না।
"ভাইয়া, দাঁত মাজতে এত সময় লাগে?"
জাহিদ কিছু বলল না। ব্রাশ মুখে ঢুকিয়ে বাইরে গেল। টিউবওয়েলের পানি ঠান্ডা। মার্চের শেষ, কিন্তু সকালে এখনো শীত আছে। পানি মুখে দিতেই শরীর কাঁপল। কিন্তু ভেতরে যে কাঁপুনি চলছে, সেটা ঠান্ডার জন্য না।
চার-পাঁচ মাসের প্রস্তুতি। রাত তিনটায় উঠে পড়া। ফিজিক্সের সমস্যা যখন মিলত না, দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকা। কেমিস্ট্রির অর্গানিক, যেটা কোনোদিন মাথায় ঢুকত না, সেটা জোর করে গিলে ফেলা। আর অংক। অংক ভালো লাগত। অংকে জাহিদ কথা বলত। বাকি সাবজেক্টে সে চুপ করে মুখস্থ করত।
আজ সব হিসাব হবে। একটা SMS-এ।
২
রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ আসছে। মা হাসিনা সকালে উঠে প্রথমে নামাজ পড়ে, তারপর চুলায় আঁচ দেয়। আজও তাই করেছে। যেন আজ আর দশটা দিনের মতোই একটা দিন। যেন ছেলের রেজাল্ট আসবে না। যেন এই দিনটার জন্য সে ছয় মাস ধরে মানত করেনি।
মা এরকমই। ভেতরে ঝড়, বাইরে শান্ত।
জাহিদ রান্নাঘরে গেল। "মা, চা দাও।"
"ভাত খা আগে।"
"ভাত খেতে ইচ্ছা করছে না।"
"ইচ্ছায় পেট চলে না। বস।"
জাহিদ বসল। মা ভাত দিল, ডাল দিল, কাল রাতের বেগুনভাজা দিল। জাহিদ ভাতে হাত দিল, কিন্তু গিলতে পারছে না। গলায় আটকে যাচ্ছে। মা দেখছে, কিন্তু কিছু বলছে না। সেলাই মেশিনের কাপড় গুছাচ্ছে। কাল রাতে দুটো ব্লাউজ শেষ করেছে। আজ সন্ধ্যার মধ্যে আরো একটা দিতে হবে। পাঁচশো টাকা পিস। মাসে পনেরো-কুড়িটা করলে সাত-আট হাজার হয়। কিন্তু এত অর্ডার আসে না। পাঁচ হাজার হলেই বাঁচে।
ফোন কাঁপল।
জাহিদের হাত থেকে ভাত পড়ে গেল।
বাবা। আজিজ চাচা। CNG থেকে ফোন করেছে।
"রে, আইছে নাকি?"
"না, বাবা। এখনো আসেনি।"
"আমি একটু আগে আমজাদ ভাইরে জিগাইলাম। উনি কইলেন দশটার দিকে আসবে। তুই চেক কর।"
"চেক করছি, বাবা।"
"আচ্ছা। আমি আবার ফোন করুম।"
বাবা ফোন রেখে দিল। বাবা আজ সকালে CNG নিয়ে বেরিয়েছে কারণ বাসায় বসে থাকলে পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু প্যাসেঞ্জার নিচ্ছে কি না সন্দেহ। বাবার মাথায় এখন একটাই জিনিস ঘুরছে। ছেলের রেজাল্ট।
বাবা CNG চালায় পনেরো বছর ধরে। আগে রিকশা চালাত। তারপর একদিন ভাড়া নিয়ে CNG শুরু করল। মালিক ধানমন্ডিতে থাকে। বাবা মাসে আট হাজার টাকা ভাড়া দেয়। বাকি যা আয় হয়, সেটা তার। মাসে পনেরো হাজারের মতো আসে। কম আসে, বেশি আসে, কিন্তু গড়ে পনেরো। এই পনেরো হাজার টাকা দিয়ে চার জনের সংসার চলে। রাকিব গাজীপুর থেকে পাঁচ হাজার পাঠায়। মায়ের সেলাইয়ের পাঁচ হাজার। মোট পঁচিশ হাজার। মাইমনসিং শহরে পঁচিশ হাজারে সংসার চলে, কিন্তু দৌড়ায় না।
জাহিদ ভাত ফেলে উঠে গেল। মা কিছু বলল না।
৩
নয়টা পঁয়তাল্লিশ।
জাহিদ খাটের ওপর বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। Facebook খুলেছে। টাইমলাইনে সবাই রেজাল্ট নিয়ে পোস্ট করছে। "দোয়া করবেন", "আজ ভাগ্য নির্ধারণের দিন", "যা হওয়ার তা হবে"। একজন লিখেছে, "GPA 5 না পেলে জীবনে কিছু হবে না।" পোস্টে দুইশো লাইক।
জাহিদ জানে এটা সত্য না। কিন্তু পেটের ভেতর যে পাথরটা বসে আছে, সেটা যুক্তি মানে না।
মিম এসে পাশে বসল। "ভাইয়া, GPA কত পেলে মেডিকেলে চান্স পাওয়া যায়?"
"মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা আলাদা। GPA-তে কিছু হয় না।"
"তাহলে GPA দিয়ে কী হয়?"
জাহিদ একটু থামল। ভালো প্রশ্ন। GPA দিয়ে আসলে কী হয়? একটা সংখ্যা। দুই দশমিক শূন্য থেকে পাঁচ দশমিক শূন্যের মধ্যে। এই সংখ্যাটা দিয়ে মানুষ বিচার করে তুমি কতটা ভালো ছাত্র। কিন্তু সত্যিই কি তাই?
রাসেল, জাহিদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, পড়ে দিনে বারো ঘণ্টা। তার বাবা স্কুলের হেডমাস্টার। বাসায় আলাদা পড়ার ঘর আছে। প্রাইভেট টিউটর আসে তিনজন। রাসেলের GPA 5 আসবে, এটা সবাই জানে। রাসেলও জানে।
ফারুক, আরেক বন্ধু, পড়তে ভালোবাসে কিন্তু বাবা অসুস্থ। মাঝে মাঝে দোকানে বসতে হয়। প্রাইভেট পড়ার পয়সা নেই। ফারুক বলে, "আমি পলিটেকনিকে যাব। ডিপ্লোমা করব। টাকা আগে, পড়া পরে।"
সুমাইয়া, ব্যাচে সবচেয়ে ভালো ছাত্রী। বিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট। ডাক্তার হবে। তার বাবা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, পয়সার অভাব নেই। সুমাইয়ার একটাই স্বপ্ন, একটাই লক্ষ্য। সোজা পথ। বাঁকা হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ বাঁকা হওয়ার দরকার নেই।
আর জাহিদ? জাহিদের পথ সোজাও না, বাঁকাও না। পথটা এখনো তৈরি হয়নি।
"ভাইয়া, উত্তর দাও না।"
"GPA দিয়ে দরজা খোলে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে হলে আরো অনেক কিছু লাগে।"
মিম কিছু বুঝল কি না বোঝা গেল না। কিন্তু সে মাথা নাড়ল। মিম এরকমই। বোঝে না, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করে। এটা জাহিদের চেয়ে বড় গুণ।
৪
দশটা বেজে সাত মিনিট।
ফোন কাঁপল।
SMS।
জাহিদের হাত কাঁপছে। সে ফোনটা তুলল। স্ক্রিনে আলো জ্বলল। নোটিফিকেশন বারে একটা মেসেজ।
educationboardresults.gov.bd
সে আঙুল দিয়ে টাচ করল। মেসেজ খুলল।
পরীক্ষার্থীর নাম: মোঃ জাহিদুল ইসলাম। বোর্ড: ময়মনসিং। রোল: ৩১৫৭৮২। GPA: ৪.১৭।
চার দশমিক এক সাত।
জাহিদ মেসেজটা পড়ল। আবার পড়ল। তিনবার পড়ল।
চার দশমিক এক সাত।
পাঁচ না। চার দশমিক এক সাত। গোল্ডেন না। A+ না। কিন্তু ফেল না। কিন্তু পাঁচও না।
বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আনন্দ? না, ঠিক আনন্দ না। স্বস্তি? হ্যাঁ, কিছুটা। কিন্তু তার সাথে মিশে আছে একটা টান, যেন কেউ বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে বের করে নিয়ে গেছে। সেটা কী? আশা? না। আশা তো আছে। তাহলে কী?
গর্ব। গর্বটা পুরোটা আসেনি।
পাঁচ পেলে বাবাকে ফোন করে বলত, "বাবা, পাঁচ!" বাবা CNG থামিয়ে কাঁদত। মা সিজদায় যেত। রাকিব ভাই ফোন করে বলত, "তোকে নিয়ে গর্ব করি।" পুরো গলিতে খবর ছড়িয়ে যেত।
চার দশমিক এক সাতে কী হয়? বাবাকে কী বলবে? "বাবা, চার দশমিক এক সাত।" বাবা কী বলবে? "ভালো।" শুধু "ভালো।" কাঁদবে না। মাও সিজদায় যাবে, কিন্তু চোখে যে আলোটা থাকত, সেটা একটু ম্লান হবে।
এটা ফেলের কষ্ট না। এটা মাঝামাঝির কষ্ট। এটা "ভালো, কিন্তু সেরা না" এর কষ্ট। বাংলাদেশে এই কষ্টের কোনো নাম নেই। কারণ এই দেশে হয় তুমি গোল্ডেন, নাহলে তুমি কিছু না। মাঝখানের মানুষের জন্য কোনো গল্প নেই।
কিন্তু একুশ লাখের মধ্যে ছয় লাখ এই মাঝখানে। GPA চার থেকে চার দশমিক নিরানব্বই। না গোল্ডেন, না ফেল। সবচেয়ে বড় দল। সবচেয়ে নীরব দল।
জাহিদ এই চার্টটা দেখলে বুঝত, সে একা না। কিন্তু জাহিদ চার্ট দেখে না। জাহিদ ফোনের স্ক্রিনে ৪.১৭ দেখছে। আর ভাবছে, এই সংখ্যাটা দিয়ে কোন দরজা খুলবে, আর কোনটা বন্ধ হয়ে যাবে।
৫
মিম লাফ দিয়ে উঠল।
"ভাইয়া পাস করেছে! মা, ভাইয়া পাস করেছে!"
জাহিদ বলল, "চিল্লাস না।"
কিন্তু মিম শোনে না। মিম দৌড়ে রান্নাঘরে গেল। মা ফিরে এল। জাহিদের হাত থেকে ফোনটা নিল। স্ক্রিনে তাকাল। মা ইংরেজি সংখ্যা পড়তে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে।
"চার দশমিক... এক... সাত।"
মা ফোনটা ফেরত দিল।
"আলহামদুলিল্লাহ।"
তারপর ফিরে গেল। সেলাই মেশিনে বসল। প্যাডেলে পা দিল। মেশিন চলতে লাগল।
জাহিদ বুঝল, মা খুশি। কিন্তু মায়ের খুশিটা অন্যরকম। মায়ের খুশিতে হিসাব আছে। মা ভাবছে, চার দশমিক এক সাত মানে কোথায় পড়া যাবে, কত খরচ হবে, টাকা কোথা থেকে আসবে। মায়ের আনন্দ আর দুশ্চিন্তা একই সময়ে আসে। যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ।
ফোন বাজল। বাবা।
"কত?"
"চার দশমিক এক সাত, বাবা।"
একটু চুপ। CNG-র ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাস্তার হর্ন। কারো চিৎকার, "এই, দেখে চালাও!"
"ভালো। ভালো তো।"
"হ্যাঁ, বাবা।"
"পাঁচ হইলে ভালো হইত।"
জাহিদ কিছু বলল না।
"যাই হোক। তুই পাস করছস, এইটাই বড় কথা। অনেকে তো পাসও করতে পারে না।"
"হ্যাঁ, বাবা।"
"আমি আসতাছি দুপুরে। তোর মারে কও মিষ্টি আনুম।"
ফোন কাটল।
জাহিদ ফোনটা বিছানায় রাখল। বাবার কথাটা কানে বাজছে। "পাঁচ হইলে ভালো হইত।" বাবা জানে না এই কথায় কতটা ওজন। বাবা ভেবেছে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু জাহিদ শুনেছে অন্যকিছু। সে শুনেছে, "যথেষ্ট হয়নি।"
বাবা কোনোদিন HSC দেয়নি। বাবা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। তারপর দাদা মারা গেলেন, বাবাকে সংসারে নামতে হলো। বাবার কাছে GPA একটা যাদুর সংখ্যা। পাঁচ মানে সোনা। চার মানে রূপা। তিন মানে তামা। বাবা জানে না, পাঁচ পেয়েও অনেকে বেকার থাকে। চার পেয়েও অনেকে জীবন গড়ে। বাবা সংখ্যা দেখে। জাহিদকেও সংখ্যা দেখতে শিখিয়েছে এই দেশ।
৬
এগারোটায় জাহিদ রাসেলকে ফোন করল।
প্রথম রিংয়েই ধরল রাসেল। মানে সে ফোনের পাশেই বসে ছিল।
"কত?"
"চার দশমিক এক সাত। তোর?"
"পাঁচ।"
একটা শব্দ। পাঁচ। একটা সিলেবল। কিন্তু এই একটা শব্দের ওজন পুরো পৃথিবীর সমান।
"দোস্ত, অনেক ভালো হয়েছে তোর!" জাহিদ বলল। গলায় হাসি আনার চেষ্টা করল। হাসি এল। আসল হাসি। কারণ রাসেলের জন্য সে সত্যিই খুশি। রাসেল তার ভাইয়ের মতো। রাসেলের সাথে সে ক্লাস সিক্স থেকে পড়ছে। রাসেলের সাফল্য তার নিজের সাফল্য।
কিন্তু হাসির পেছনে একটা সুই ফোটার মতো ব্যথা আছে। ছোট। প্রায় অনুভব করা যায় না। কিন্তু আছে।
"তোরটাও ভালো," রাসেল বলল। "চার দশমিক এক সাত তো কম না।"
"হ্যাঁ।"
"এখন কী করবি? ভর্তি পরীক্ষার প্রিপারেশন?"
"আগে ভাবতে হবে কোথায় পড়ব।"
"BUET-এ দে না। তোর অংক ভালো।"
জাহিদ হাসল। BUET। বুয়েট। এই দেশের সবচেয়ে কঠিন ভর্তি পরীক্ষা। চার দশমিক এক সাত নিয়ে BUET-এর স্বপ্ন দেখা, যেন একটা সাইকেল নিয়ে মোটরসাইকেলের রেসে নামা। অসম্ভব না। কিন্তু পথটা অনেক খাড়া।
"দেখি।"
"দেখিস কী? এখনই শুরু কর। ভর্তি পরীক্ষা ছয় মাস পরে। প্রতিটা দিন কাউন্ট করে।"
রাসেলের কথা ঠিক। কিন্তু রাসেলের বাবা হেডমাস্টার। রাসেলের কোচিং ফি নিয়ে চিন্তা নেই। রাসেলের বাড়িতে একটা আলাদা ঘর আছে, যেখানে শুধু পড়ার টেবিল আর বই। রাসেলের দুনিয়ায় "প্রস্তুতি নে" বললেই প্রস্তুতি নেওয়া যায়। জাহিদের দুনিয়ায় প্রস্তুতি নিতে হলে আগে হিসাব করতে হয়, কোচিংয়ের পয়সা কোথা থেকে আসবে।
"আচ্ছা, পরে কথা হবে। তুই মিষ্টি খা গিয়ে," জাহিদ বলল।
"তুইও খা। চার দশমিক এক সাত তো ভালো রেজাল্ট।"
"হ্যাঁ। ভালো।"
ফোন রেখে দিল।
ভালো। সবাই বলছে ভালো। কিন্তু "ভালো" আর "সেরা" এক জিনিস না। এই দেশে "ভালো" দিয়ে চলে না। এই দেশে সেরা হতে হয়, নাহলে কেউ তাকায় না। পত্রিকায় খবর হয় কার, GPA 5 যারা পেয়েছে তাদের। টেলিভিশনে ইন্টারভিউ হয় কার, গোল্ডেন যারা পেয়েছে তাদের। চার দশমিক এক সাত নিয়ে কেউ ইন্টারভিউ দেয় না। চার দশমিক এক সাত নিয়ে কেউ Facebook-এ স্ট্যাটাস দেয় না।
কিন্তু একুশ লাখের মধ্যে ছয় লাখ এই "ভালো" ক্যাটাগরিতে। দেশের সবচেয়ে বড় দল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দল। কারণ এরাই একদিন এই দেশ চালাবে। গোল্ডেনরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। ফেলরা হারিয়ে যাবে। কিন্তু এই ছয় লাখ? এরা কোথায় যাবে? কী করবে? কে বলে দেবে?
কেউ না। এটাই সমস্যা।
৭
দুপুরে বাবা ফিরল। হাতে একটা ছোট প্যাকেট। মিষ্টি। রসগোল্লা। ছয়টা।
"ছয়টা কেন?" মিম জিজ্ঞেস করল।
"চারটা আমাদের চার জনের। একটা রাকিবের নামে। একটা আল্লাহর ওয়াস্তে।"
বাবা রসগোল্লা টেবিলে রাখল। জুতা খুলল। হাত-মুখ ধুলো। তারপর জাহিদের পাশে এসে বসল।
"দেখি তোর ফোন।"
জাহিদ ফোন দিল। বাবা SMS খুলল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বাবা ইংরেজি পড়তে পারে, কিন্তু ধীরে। ৪.১৭ সংখ্যাটা বারবার দেখল।
"এইটা ভালো না খারাপ?"
"ভালো, বাবা। মোটামুটি ভালো।"
"মোটামুটি? মানে পুরা ভালো না?"
জাহিদ চুপ করে থাকল। কী বলবে? বলবে পাঁচ পেলে ভালো হতো? সেটা তো বাবা নিজেই বলেছে।
মা রান্নাঘর থেকে এল। "যা পাইছে ভালো পাইছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর। কত মানুষের ছেলেমেয়ে পাসই করতে পারে না।"
বাবা মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ, সেইটা ঠিক।"
মিম রসগোল্লা খাচ্ছে। তার কোনো চিন্তা নেই। তার ভাইয়া পাস করেছে, রসগোল্লা এসেছে, দুনিয়া সুন্দর। মিম এখনো সেই বয়সে আছে যেখানে সংখ্যার ওজন বোঝা যায় না।
বাবা বলল, "এখন কী করবি?"
এই প্রশ্নটাই তো। এই প্রশ্নটার উত্তর জাহিদের কাছে নেই। এই প্রশ্নটার উত্তর একুশ লাখ ছেলেমেয়ের কাছে নেই। HSC-র পর কী হবে? কোথায় পড়বে? পড়বে কি আদৌ? টাকা কোথা থেকে আসবে? কোন সাবজেক্ট নেবে? কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ারই দরকার নেই?
"ভাবছি, বাবা।"
"বেশিদিন ভাবার সময় নাই। তোর ভাই ভাবতে ভাবতে সময় পার হইয়া গেছিল। তারপর গার্মেন্টসে গেছে।"
রাকিব ভাই। HSC পাস করেছিল, GPA 3.22। ভর্তি পরীক্ষায় দুইটায় চেষ্টা করেছিল, দুইটাতেই হয়নি। কোচিং করার পয়সা ছিল না। একবার মামার কাছ থেকে ধার নিয়ে ঢাকায় গেছিল পরীক্ষা দিতে, সেবারও হলো না। তারপর একদিন বলল, "আমি গাজীপুরে যাব। কাজ করব।" বাবা কিছু বলেনি। মা কেঁদেছিল। কিন্তু কেউ আটকায়নি। কারণ বিকল্প কী ছিল?
রাকিব ভাই এখন গাজীপুরে একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে পনেরো হাজার পায়। পাঁচ হাজার বাড়িতে পাঠায়। বাকিটা দিয়ে ঢাকার কাছে একটা মেসে থাকে। রাকিব ভাই কোনোদিন বলে না "আমার কষ্ট হচ্ছে।" কিন্তু ঈদে যখন বাড়ি আসে, তখন চোখের নিচে যে কালি থাকে, সেটা সব বলে দেয়।
জাহিদ রাকিব ভাইয়ের মতো হতে চায় না। কিন্তু রাকিব ভাইয়ের মতো না হওয়ার রাস্তাটা কতটা সরু, সেটা আজ প্রথমবার বুঝতে পারছে।
"আমি ভাবব, বাবা। একটু সময় দাও।"
বাবা রসগোল্লা মুখে দিল। চিবাতে চিবাতে বলল, "সময় নে। কিন্তু বেশি নিস না।"
৮
রাত।
মিম ঘুমিয়ে গেছে। পাশের ঘরে বাবা-মা কথা বলছে। আওয়াজ আসছে। ফিসফিস। জাহিদ কান পেতে শুনছে।
"কোচিং করতে হইবো। কোচিং ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় চান্স হয় না।"
"কোচিং কত?"
"মাইমনসিংয়ে হইলে দশ-বারো হাজার। ঢাকায় হইলে তিরিশ-চল্লিশ।"
"ঢাকায় থাকবে কই?"
"সেইটাই তো সমস্যা।"
চুপ। CNG-র চাবির আওয়াজ। বাবা চাবি নিয়ে খেলে যখন চিন্তায় থাকে।
"রাকিব কি আর একটু বেশি পাঠাইতে পারব?"
"ওর নিজেরই তো কষ্ট। পনেরো হাজারে ঢাকায় থাকে।"
"তাইলে?"
"তাইলে আমরা এখান থেকে কিছু জমাব। আমার সেলাইয়ের টাকা থেকে। তোর CNG থেকে।"
"পাঁচ হাজার জমানো যায়। বেশি না।"
"পাঁচ হাজার মাসে হইলে ছয় মাসে তিরিশ হাজার। মাইমনসিংয়ে কোচিং হইবো।"
"আর ইউনিভার্সিটির খরচ?"
চুপ। দীর্ঘ চুপ।
"সেইটা পরে দেখা যাবে। আগে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করুক।"
জাহিদ চোখ বন্ধ করল। মা-বাবার কথাগুলো কানে ঢুকছে, আর বুকের ভেতরে জমা হচ্ছে। পাঁচ হাজার টাকা মাসে। এটাই তার মূল্য। এটাই তার পরিবার তার জন্য করতে পারে। পুরো সংসারের সাশ্রয়ের শেষ ফোঁটাটুকু। মায়ের রাত জেগে সেলাই করা কাপড়ের দাম। বাবার রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে CNG চালানোর দাম।
এই টাকা নষ্ট করার অধিকার নেই জাহিদের।
ফোনটা তুলল। স্ক্রিনে আলো জ্বলল। SMS-টা আবার খুলল।
GPA: ৪.১৭।
একটা সংখ্যা। ছয়টা অক্ষর। এই সংখ্যাটা আগামী দশ বছর তার পেছনে লেগে থাকবে। প্রতিটা ফর্মে, প্রতিটা ইন্টারভিউতে, প্রতিটা আলোচনায়। "তোমার HSC-র GPA কত ছিল?" এই প্রশ্নটা সে শুনবে বারবার।
নাকি শুনবে না? নাকি একদিন এই সংখ্যাটা শুধু একটা সংখ্যা হয়ে যাবে? নাকি একদিন কেউ জিজ্ঞেস করবে, "তুমি কী করেছ জীবনে?" আর সেই উত্তরটা এই সংখ্যার চেয়ে অনেক বড় হবে?
জাহিদ জানে না।
আপাতত সে জানে, ঘুম আসবে না আজ। জানালা দিয়ে মাইমনসিং শহরের আকাশ দেখা যাচ্ছে। দুই-একটা তারা। বিদ্যুতের তারের ফাঁকে চাঁদের একটা টুকরো। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। পাড়ার মসজিদ থেকে এশার আজান শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।
একুশ লাখ ছেলেমেয়ের মধ্যে কতজন আজ রাতে ঘুমাতে পারবে?
কতজনের বাবা-মা আজ রাতে ফিসফিস করে হিসাব কষবে?
কতজনের ভাগ্য আজ থেকে দুই ভাগ হয়ে গেল, একটা SMS-এ?
জাহিদ ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করল। অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকল। মিমের শ্বাসের আওয়াজ। বাবা-মায়ের ফিসফিস থেমে গেছে। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো চুপ করে শুয়ে আছে, চোখ খোলা, ছাদের দিকে তাকিয়ে।
এই দেশে ছাদের দিকে তাকিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখা হয়। আর অনেক স্বপ্ন ভাঙাও হয়।
জাহিদের স্বপ্ন এখনো ভাঙেনি। তৈরিও হয়নি।
শুধু একটা সংখ্যা আছে। ৪.১৭। আর একটা প্রশ্ন।
এখন কী হবে?