বাবার CNG

মিটারে টাকা ওঠে, জীবনে খরচ বাড়ে, পকেটে হিসাব থাকে না

পর্ব ৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

সকাল সাড়ে ছয়টায় আজিজ সাহেব CNG-র চাবি ঘোরালেন। ইঞ্জিন একবার কাশলো, তারপর স্টার্ট নিল। প্রতিদিনের মতো।

গত রাতে ঘুম হয়নি ভালো। ছেলের রেজাল্ট মাথায় ঘুরছিল। 4.17। সংখ্যাটা জানেন, কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে কী হয়, সেটা এখনো পরিষ্কার না।

হাসিনা সকালে বলেছিল, "জাহিদের কলেজের বন্ধুরা নাকি ঢাকা যাবে। কেউ বুয়েট, কেউ মেডিকেল।"

আজিজ সাহেব কিছু বলেননি। চা খেয়ে বের হয়ে গেছেন।

রাস্তায় এখনো কুয়াশার ভাপ। মার্চের সকাল, কিন্তু শীত পুরো যায়নি। CNG-র পেছনের সিট খালি। স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে যাত্রী খুঁজতে হবে।

আজিজ সাহেব স্ট্যান্ডে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেন। তাঁর আগে চারটা CNG। মানে অন্তত পনেরো মিনিট অপেক্ষা।

পনেরো মিনিট মানে শূন্য আয়। মিটার বন্ধ, কিন্তু সময় চলছে।

প্রথম যাত্রী উঠলেন ষাটোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক। কলেজ মোড় থেকে সদর হাসপাতাল।

ভদ্রলোক উঠেই জিজ্ঞেস করলেন, "ভাই, HSC রেজাল্ট বের হইছে না?"

আজিজ সাহেব বললেন, "জি, গতকাল।"

"আপনার কেউ দিছে?"

"ছেলে দিছে।"

"কত পেল?"

এই প্রশ্নটা আজিজ সাহেব জানতেন আসবে। রেজাল্টের পরের সপ্তাহে বাংলাদেশের সবচেয়ে কমন প্রশ্ন। দোকানদার জিজ্ঞেস করে, পাড়ার চাচা জিজ্ঞেস করে, যাত্রী জিজ্ঞেস করে। সবাই জানতে চায়। কেউ না কেউ তো পরীক্ষা দিয়েছে। পুরো দেশটাই পরীক্ষা দিয়েছে।

"4.17 পেয়েছে।"

ভদ্রলোক বললেন, "ভালো তো।"

কিন্তু গলার স্বরে উৎসাহ নেই। যেন বললেন, "বৃষ্টি হচ্ছে তো" বা "রাস্তায় জ্যাম তো।" তথ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন, কিন্তু মুগ্ধ হলেন না।

আজিজ সাহেব লক্ষ্য করলেন।

5 হলে বলতেন "মাশাআল্লাহ!" 4.17-তে বললেন "ভালো তো।" মাঝখানে 0.83 পয়েন্টের ব্যবধান, কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় আকাশ-পাতাল ফারাক।

সদর হাসপাতালে ভদ্রলোক নামলেন। ভাড়া দিলেন ষাট টাকা। মিটারে ছিল বাষট্টি। দুই টাকা কম দিলেন।

আজিজ সাহেব কিছু বললেন না। দুই টাকার জন্য তর্ক করার শক্তি নেই সকালবেলা।

দ্বিতীয় রাউন্ড। বাজার থেকে রেলস্টেশন। একজন মহিলা, কোলে বাচ্চা।

এই রাউন্ডে মিটারে উঠল আশি টাকা। ভালো।

তৃতীয় রাউন্ড। রেলস্টেশন থেকে থানা মোড়। পঁয়তাল্লিশ টাকা।

সকাল দশটা পর্যন্ত মোট আয়: একশো সাতাশি টাকা। তিন রাউন্ড।

আজিজ সাহেব মাথায় হিসাব করলেন। সারাদিনে দশ-বারো রাউন্ড হয়। ভালো দিনে সাতশো, খারাপ দিনে পাঁচশো। গড়ে ছয়শো ধরলে মাসে আঠারো হাজার। কিন্তু সেখান থেকে CNG-র ভাড়া বাদ, গ্যাসের খরচ বাদ, মেরামত বাদ। হাতে থাকে পনেরো হাজারের মতো।

পনেরো হাজার।

বাড়িভাড়া সাত হাজার। খাওয়া-দাওয়া ছয় হাজার। মিমের স্কুলের খরচ দেড় হাজার। বিদ্যুৎ, পানি, ফোনের বিল আরো দুই হাজার।

মোট: সাড়ে ষোলো হাজার।

আয়ের চেয়ে খরচ দেড় হাজার বেশি।

রাকিবের পাঁচ হাজার না এলে সংসার চলে না। রাকিবের পাঁচ হাজার দিয়ে মাসের ঘাটতি পূরণ হয়, আর বাকি সাড়ে তিন হাজার সেভিংস। কিন্তু সেভিংস বলতে যা বোঝায়, তা না। ওই টাকা দিয়ে মাসের মাঝখানে কোনো একটা চাহিদা মেটে। কখনো ওষুধ, কখনো জাহিদের বই, কখনো CNG-র কোনো পার্টস।

ইউনিভার্সিটি? ঢাকায়?

আজিজ সাহেব কপালের ঘাম মুছলেন। মার্চের রোদ উঠতে শুরু করেছে।

থানা মোড়ের চায়ের দোকানে আজিজ সাহেব বসলেন। এক কাপ চা, আট টাকা।

পাশে বসা সেলিম ভাই। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সেলিম ভাইও CNG চালান।

সেলিম ভাই বললেন, "আজিজ ভাই, আপনার ছেলে তো পাশ করছে, তাই না?"

"হ্যাঁ, 4.17।"

"আমার ছেলে পাশই করতে পারল না। তিনবার দিছে, তিনবার ফেল।" সেলিম ভাই চায়ে চুমুক দিলেন। "এখন গ্যারেজে কাজ শিখতেছে। বলি কী, ওর জন্য অইটাই ভালো হইছে। বই নিয়া বসলে ঘুমাইতো।"

পাশ থেকে জসিম ভাই বললেন, "আমার মেয়ে HSC দিয়া বিয়া হইয়া গেছে। ভালোই পাইছিল, কিন্তু শ্বশুরবাড়ি বলল পড়ার দরকার নাই।"

"আর আমার ছেলে," বললেন মতিন ভাই, "জাপান গেছে। তিন বছর আগে। এখন ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। মাসে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার পাঠায়।"

সবাই চুপ হয়ে গেল।

তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার। আজিজ সাহেবের দুই মাসের আয়ের সমান। এক মাসে।

মতিন ভাই বললেন, "তবে পাঠাইতে খরচ হইছিল আট লাখ। জমি বেচছিলাম।"

আট লাখ। আজিজ সাহেবের কোনো জমি নেই। গ্রামে বাপের ভিটা আছে, কিন্তু সেটা ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগ করলে কিছু থাকে না।

জসিম ভাই বললেন, "আপনার ছেলে পড়তে চাইলে পড়ান। কিন্তু কোথায় পড়াবেন, সেইটা ভাবেন। ঢাকায় গেলে মাসে দশ-বারো হাজার লাগবে শুধু থাকা-খাওয়ায়। টিউশন ফি আলাদা।"

আজিজ সাহেব চুপচাপ চা শেষ করলেন।

দুপুরে যাত্রী কমে গেল। সকাল আর বিকেল ভালো, দুপুরে মন্দা। প্রতিদিনের প্যাটার্ন।

আজিজ সাহেব CNG পার্ক করে রাখলেন একটা গাছের নিচে। জানালা খুলে বসে রইলেন। যাত্রী নেই, আয় নেই, কিন্তু মাথা চলছে।

আটাশ বছর আগে তিনি গ্রাম থেকে এসেছিলেন। ক্লাস আটে পড়তেন, কিন্তু বাবা মারা গেলেন, পড়া শেষ। চাচার সাথে শহরে এলেন। প্রথমে রিকশা চালাতেন। রিকশার প্যাডেল মারতে মারতে পায়ে ব্যথা হতো, কিন্তু বিকল্প ছিল না।

তারপর একদিন একজন বললেন, "CNG চালা। রিকশার চেয়ে ভালো।" লাইসেন্স করতে পাঁচ হাজার লেগেছিল। তখন পাঁচ হাজার অনেক টাকা। হাসিনার গহনা থেকে একটা চুড়ি বিক্রি করে জোগাড় করেছিলেন।

সেই চুড়ির কথা হাসিনা কোনোদিন তোলেননি। কিন্তু আজিজ সাহেব ভোলেননি।

রিকশা থেকে CNG, এটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আপগ্রেড। ইঞ্জিন আছে, ছাদ আছে, বৃষ্টিতে ভেজা লাগে না।

কিন্তু CNG থেকে পরের ধাপে আর যাওয়া হয়নি। বিশ বছর ধরে একই জায়গায়।

জাহিদ কি একই জায়গায় থাকবে?

বিকেল চারটায় যাত্রী ফিরে এলো। স্কুল ছুটি, অফিস ছুটি, বাজার, সবই একসাথে।

পরপর চারটা রাউন্ড। চল্লিশ, পঁয়ষট্টি, পঁচাশি, পঞ্চান্ন। বিকেলের চার ঘণ্টায় দুশো পঁয়তাল্লিশ।

সারাদিনের মোট: ছয়শো পঁচিশ টাকা। গড়পড়তা দিন।

ছয়শো পঁচিশ থেকে গ্যাস একশো আশি বাদ। CNG ভাড়া একশো পঞ্চাশ বাদ। নিজের খাওয়া পঁয়ত্রিশ বাদ।

হাতে আসল: দুশো ষাট টাকা। সারাদিন রোদে, ঘামে, ধুলোয়। সকাল সাড়ে ছয় থেকে সন্ধ্যা সাতটা।

এই দুশো ষাট টাকায় পরিবারের চারজনের ভাত হয়, কিন্তু স্বপ্ন হয় না।

জাহিদ যদি ঢাকায় পড়তে যায়? হলের সিট পেলে থাকা দুই হাজার। খাওয়া ছয় হাজার। বই-খাতা দুই হাজার। যাতায়াত দেড় হাজার। বাকি খরচ আরো দুই হাজার। মোট: সাড়ে তেরো হাজার। প্রতি মাসে। টিউশন ফি আলাদা।

আজিজ সাহেব জানেন, এই হিসাব তাঁর সামর্থ্যের বাইরে। কিন্তু হিসাব না করে থাকতেও পারেন না।

সন্ধ্যা সাতটায় আজিজ সাহেব শেষ যাত্রী নামিয়ে দিলেন।

CNG নিয়ে বাসায় ফেরার আগে রাস্তার পাশে দাঁড়ালেন। ফোন বের করলেন।

জাহিদকে কল করলেন।

তিন রিং। জাহিদ ধরল।

"বাবা?"

"কী রে, কোনো পরিকল্পনা করেছিস?"

"চিন্তা করছি, বাবা।"

"কী চিন্তা করছিস? কোথায় পড়বি, কী পড়বি, কিছু ঠিক করেছিস?"

"এখনো না। বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছে। সবাই বলছে ভর্তি কোচিং লাগবে।"

"কোচিং কত?"

"বারো থেকে পনেরো হাজার।"

আজিজ সাহেব চুপ করে রইলেন। পনেরো হাজার মানে তাঁর এক মাসের পুরো আয়।

"বাবা?"

"শুনছি।"

"আমি একটু সময় নিয়ে ভাবছি। তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।"

আজিজ সাহেব বললেন, "চিন্তা করিস, কিন্তু বেশি দিন করিস না। চিন্তারও খরচ আছে।"

"মানে?"

"মানে, যতদিন তুই চিন্তা করবি, ততদিন সময় যাবে। সময় গেলে সুযোগ যায়। আর সুযোগ গেলে আফসোস আসে। আফসোসের কোনো শেষ নেই।"

জাহিদ কিছু বলল না।

আজিজ সাহেব বললেন, "আমি ক্লাস আটে পড়া ছাড়ছিলাম। তখন ভাবছিলাম পরে পড়ব। পরে আর আসেনি।"

"বাবা, আমি পড়ব। ইনশাআল্লাহ।"

"পড়বি তো ভালো কথা। কিন্তু কোথায়, কী, কত খরচ, এগুলো ঠিক কর। স্বপ্ন দেখা সহজ, হিসাব কঠিন।"

ফোন রাখলেন আজিজ সাহেব।

বাসায় ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বসলেন। হাসিনা ভাত বাড়ছেন।

মিম পাশে বসে পড়ছে। অংক। ক্লাস আটের অংক।

আজিজ সাহেব মিমের খাতার দিকে তাকালেন। সমীকরণ, চলক, মান নির্ণয়। এগুলো তিনি বোঝেন না। ক্লাস আটের পর আর বই ধরেননি।

কিন্তু জীবনের অংক তিনি প্রতিদিন করেন। সেই অংকে সমীকরণ নেই, কিন্তু চলক অনেক। গ্যাসের দাম বাড়লে আয় কমে। যাত্রী কমলে আয় কমে। CNG বিগড়ালে খরচ বাড়ে। রাকিব টাকা পাঠাতে না পারলে ঘাটতি বাড়ে।

একটা চলক স্থির থাকে না।

হাসিনা জিজ্ঞেস করলেন, "জাহিদের সাথে কথা হইছে?"

"হইছে।"

"কী বলল?"

"চিন্তা করছে।"

হাসিনা বললেন, "চিন্তা করুক। কিন্তু ওরে একটু সাহস দেন। ও ভয় পাইতেছে, বুঝতেছেন না?"

আজিজ সাহেব ভাত মুখে দিলেন। কিছু বললেন না।

সাহস দেওয়া সহজ। টাকা দেওয়া কঠিন।

রাতে শোয়ার আগে আজিজ সাহেব বারান্দায় দাঁড়ালেন।

রাস্তার ওপারে আরেকটা CNG পার্ক করা। সেটা রহিমের। রহিমের ছেলে তিন বছর আগে National University-তে ভর্তি হয়েছিল। এক বছর পর ছেড়ে দিয়েছে। এখন মোবাইল ফোনের দোকান দিয়েছে।

রহিম একদিন বলেছিল, "পড়ায় টাকা ঢাললাম, কিছু হইল না। দোকানে ঢালতাম, আগেই লাভ হইতো।"

আজিজ সাহেব সেদিন কিছু বলেননি। কিন্তু ভেবেছিলেন, রহিমের ছেলে আর জাহিদ এক না। জাহিদ পড়তে চায়। জাহিদের চোখে একটা আলো আছে যেটা আজিজ সাহেব নিজের ভেতরে কোনোদিন দেখেননি।

সেই আলো নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই।

কিন্তু আলো জ্বালিয়ে রাখতে তেল লাগে। তেলের দাম আছে।

আজিজ সাহেব ভাবলেন, রাকিবকে ফোন করবেন। রাকিব গার্মেন্টসে কাজ করে, ওভারটাইম করলে মাসে পনেরো-ষোলো হাজার পায়। পাঁচ হাজার পাঠায়। আর একটু বেশি পাঠাতে পারবে?

কিন্তু রাকিবেরও তো জীবন আছে। ও গাজীপুরে মেসে থাকে, নিজেও খায়, নিজেরও স্বপ্ন আছে। বড় ভাই বলেই কি সব দায় ওর?

আজিজ সাহেব ঘরে ঢুকলেন। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কাল আবার সকাল সাড়ে ছয়টা। চাবি ঘোরানো। ইঞ্জিন স্টার্ট। স্ট্যান্ডে লাইন। প্রথম যাত্রী। মিটার শূন্য থেকে শুরু। প্রতিদিন। শূন্য থেকে।

জীবনটাও তাই। গতকালের আয় গতকাল শেষ। আজকের আয় আজ শুরু করতে হবে।

কিন্তু জাহিদের জীবন যেন এরকম না হয়। মিটার যেন শূন্য থেকে শুরু না হয়। যেন একটু এগিয়ে থাকে।

এটুকুই চান আজিজ সাহেব। এটুকুই।

বাইরে রাস্তায় একটা CNG চলে গেল। ইঞ্জিনের আওয়াজ মিলিয়ে গেল।

কাল আবার মিটার শূন্য।