মায়ের হিসাবের খাতা

পঁচিশ হাজারে পাঁচজনের সংসার, ছেলের ভবিষ্যতের জন্য বাকি পাঁচ হাজার

পর্ব ৪ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত সাড়ে দশটায় সংসার ঘুমিয়ে পড়ে।

আজিজ ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে রাত নয়টায়। CNG-র সিট থেকে নামলেই তার পিঠে ব্যথা করে। বিশ বছর ধরে করে। আজিজ ব্যথার কথা কাউকে বলে না। বললে কী হবে? ব্যথা তো যাবে না। রুটি-রুজি বন্ধ করা যাবে না। তাই চুপ করে খায়, চুপ করে শোয়। আজও তাই।

মিম ঘুমিয়ে গেছে পড়তে পড়তে। বইয়ের ওপর মুখ। হাসিনা বইটা সরিয়ে রেখে কম্বল টেনে দিয়েছে।

জাহিদ ছাদে গেছে। ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। বন্ধু হবে। রেজাল্টের পর থেকে ছেলেটা একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। চোখে একটা আলো, যেটা আগে ছিল না। কিংবা ছিল, হাসিনা দেখেনি। মা হলেই যে সবকিছু দেখা যায়, এটা ভুল কথা। মা অনেক কিছু দেখে না। দেখতে চায় না। দেখলে ভয় লাগে।

হাসিনা উঠে বসল। পাশে আজিজ নাক ডাকছে। ডানপাশে মিম। ঘরে তিনটে মানুষ ঘুমাচ্ছে, কিন্তু ঘরটা চুপচাপ নয়। আজিজের নাক ডাকা, মিমের নিশ্বাস, ফ্যানের শব্দ, জানালা দিয়ে আসা রাস্তার কুকুরের ডাক। রাতের শব্দগুলো দিনের চেয়ে আলাদা। দিনে শব্দ চাপা পড়ে। রাতে বেরিয়ে আসে।

হাসিনা আলমারির ভেতর থেকে খাতাটা বের করল।

খাতাটা পুরনো। মলাট ছেঁড়া। একসময় সবুজ ছিল, এখন মলিন হলুদ। মিমের ক্লাস ফাইভের অংক খাতা ছিল এটা। পেছনের অর্ধেক পাতা খালি ছিল বলে হাসিনা নিয়ে নিয়েছিল। সেই থেকে এটা হাসিনার খাতা। হিসাবের খাতা।

মোবাইলের টর্চ জ্বালাল। আলো কম রাখল, যেন কেউ জেগে না যায়।

প্রথম পাতা খুলল। তারিখ লেখা: ২৩ রমজান, ১৪৪৪। তার নিচে কলাম করা। বাঁ দিকে খরচ, ডান দিকে টাকা। হাসিনার হাতের লেখা গোল, পরিষ্কার। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে হাসিনা। হাতের লেখা ভালো ছিল। স্যার বলতেন, "হাসিনার খাতা দেখলে চোখ জুড়ায়।" তারপর বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন। চোখ জোড়ানো খাতা বন্ধ হলো। নতুন খাতা খুলল। হিসাবের খাতা।

হাসিনা পাতা উলটাতে লাগল। গত ছয় মাসের হিসাব। প্রতি মাসে একই ছক, একই কলাম, একই গল্প।

আয়:

আজিজের CNG, মাসে পনেরো হাজার। কখনো চৌদ্দ, কখনো ষোলো, কিন্তু গড়ে পনেরো। বর্ষায় কম হয়, মানুষ কম বের হয়। রমজানে একটু বেশি হয়, মানুষ ইফতারের আগে তাড়াহুড়ো করে।

রাকিবের পাঁচ হাজার। প্রতি মাসের দশ তারিখে বিকাশে পাঠায়। একদিনও দেরি করে না ছেলেটা। কখনো কখনো সাড়ে পাঁচ পাঠায়। বাড়তি পাঁচশোটা হাসিনা আলাদা রাখে। রাকিবকে বলে না। বললে ছেলে আরো বেশি পাঠাবে, নিজে না খেয়ে থাকবে।

হাসিনার সেলাই, মাসে পাঁচ হাজার। এটা ধরাবাঁধা না। কখনো চার, কখনো ছয়। পাড়ার মহিলাদের ব্লাউজ, পেটিকোট, বাচ্চাদের জামা। ঈদের আগে বেশি আসে। বিয়ের সিজনে বেশি আসে। বাকি সময় কম।

মোট: পঁচিশ হাজার। কাগজে লেখা সংখ্যাটা দেখতে বড়। আসলে ছোট। পাঁচজনের সংসারে পঁচিশ হাজার টাকা একটা চাদর, যেটা সবার গায়ে টানলে কারো না কারো পা বেরিয়ে যায়।

ব্যয়:

হাসিনা কলম নিল। নীল কলম, দোকান থেকে পাঁচ টাকায় কেনা। কলমের গায়ে দাঁতের দাগ, মিম কামড়ায়। হাসিনা লিখতে শুরু করল।

বাড়িভাড়া: ৬,০০০। বিদ্যুৎ: ৮০০। গ্যাস: ৪০০। মিমের স্কুল ও কোচিং: ১,৫০০। বাজার: ৮,০০০। ওষুধপত্র: ৫০০। যাতায়াত: ১,০০০। আজিজের CNG-র গ্যাস ও মেরামত: ২,০০০। বিবিধ: ১,০০০।

লাইন টানল। যোগ করল। মুখে মুখে, ক্যালকুলেটর ছাড়া। হাসিনার মুখের হিসাব কখনো ভুল হয় না। কোনোদিন হয়নি।

একুশ হাজার দুইশো।

পঁচিশ থেকে একুশ বাদ দিলে থাকে তিন হাজার আটশো।

তিন হাজার আটশো টাকা। এটাই বাকি। পুরো সংসারের, পুরো মাসের, পুরো পরিবারের সব খরচ মেটানোর পর যা অবশিষ্ট, সেটা দিয়ে জাহিদের ভবিষ্যৎ বানাতে হবে।

হাসিনা সংখ্যাটার নিচে দাগ দিল। দুইবার।

এবার হাসিনা নতুন পাতায় গেল। এই পাতাটা আজকের। রেজাল্টের দিনের পরের রাত।

পাতার মাথায় লিখল: জাহিদের পড়াশোনা।

তারপর তিনটা ভাগ করল। তিনটা রাস্তা। তিনটা সম্ভাবনা।

প্রথম ভাগ: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

ভর্তি পরীক্ষার ফি ও কোচিং: ১০,০০০-১৫,০০০ (একবারে)। টিউশন ফি: ৫০০-১,০০০ মাসে। হলের সিট: ৫০০ মাসে, যদি পায়। খাওয়া: ৩,০০০-৪,০০০ মাসে। হল ক্যান্টিনে সস্তা, কিন্তু সস্তাও তো টাকা। যাতায়াত, বই, ফটোকপি: ১,০০০-২,০০০।

মোট: মাসে ৫,০০০-৮,০০০। তার হাতে আছে তিন হাজার আটশো।

ঘাটতি: মাসে দেড় থেকে চার হাজার।

হাসিনা কলমটা থামাল। ঘাটতি শব্দটা সে লেখেনি। মাথায় হিসাব করেছে। ঘাটতি লিখতে ভালো লাগে না। লিখলে সত্যি হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ভাগ: প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়।

সেমিস্টার ফি: ৫০,০০০-৭০,০০০। বছরে দুই সেমিস্টার। মাসে ভাগ করলে ৮,০০০-১২,০০০ শুধু টিউশন। বাকি খরচ: ৫,০০০-৮,০০০।

মোট: ১৫,০০০-২০,০০০ মাসে।

হাসিনা এই ভাগে আর কিছু লিখল না। খালি একটা শব্দ লিখল: না।

তৃতীয় ভাগ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

টিউশন ফি: ২০০-৫০০ মাসে। বই: ৫০০। যাতায়াত: ৫০০। কোচিং: ১,০০০-১,৫০০।

মোট: ৩,০০০-৫,০০০ মাসে।

এটা তিন হাজার আটশোর কাছাকাছি। যদি হাসিনা আরেকটু বেশি সেলাই করে, যদি ঈদের অর্ডার একটু আগে থেকে ধরে, যদি বাজারে একটু কম মাছ কেনে, তাহলে হয়তো সম্ভব।

হাসিনা তৃতীয় ভাগের পাশে একটা ছোট্ট টিক দিল।

তারপর প্রথম ভাগের দিকে আবার তাকাল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম। নামগুলো হাসিনা শুনেছে। বড় বড় নাম। যেখানে পড়লে মানুষ হওয়া যায়।

কিন্তু মাসে পাঁচ-আট হাজার কোথা থেকে আসবে?

রাকিব আরো টাকা পাঠাতে পারবে? রাকিবের বেতন বারো হাজার। পাঁচ হাজার বাসায় পাঠায়। বাকি সাতে তার খাওয়া, থাকা, যাতায়াত। ঢাকায় সাত হাজারে কীভাবে চলে ছেলেটা, হাসিনা ভাবতে পারে না। ভাবে না। ভাবলে ঘুম আসে না।

আজিজ কি আরো বেশি চালাতে পারবে? সকাল ছয়টা থেকে রাত নয়টা। পনেরো ঘণ্টা। আর কত? আজিজের পিঠে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা। আজিজ বলে না, কিন্তু হাসিনা দেখে। হাসিনা দেখে কীভাবে আজিজ সকালে উঠতে গিয়ে খাটের কোনা ধরে, কীভাবে একটু থেমে পিঠ সোজা করে, কীভাবে মুখে কিছু না বলে বেরিয়ে যায়।

না। আজিজকে আর চাপ দেওয়া যাবে না।

তাহলে?

হাসিনা নতুন একটা পাতায় গেল। মাথায় লিখল: আমি কী করতে পারি।

প্রথম লাইন: সেলাইয়ের অর্ডার বাড়ানো।

এখন হাসিনা দিনে তিন-চারটা ব্লাউজ সেলাই করে। যদি পাঁচ-ছয়টা করে? তাহলে মাসে হাজার দেড়েক বাড়তে পারে। কিন্তু তার মানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেলাই। রান্না কে করবে? মিমকে দিয়ে রান্না করানো যায়, কিন্তু মিমের পড়াশোনা আছে। মিমকে পড়তে দিতে হবে। মিম ক্লাস এইটে, এরপর নাইন, তারপর এসএসসি। মিমের পড়া বন্ধ করা যাবে না। এটা আলোচনার বাইরে।

দ্বিতীয় লাইন: কামিজ-সালোয়ার।

ব্লাউজে কম লাগে। একটা ব্লাউজে একশো পঞ্চাশ, দুইশো টাকা পায়। কিন্তু কামিজ-সালোয়ার বানালে পাঁচশো-সাতশো পাওয়া যায়। সমস্যা হলো হাসিনার মেশিন পুরনো। জ্যাক মেশিন, বিশ বছর আগে কেনা। কামিজের কাজে মাঝে মাঝে আটকে যায়। নতুন মেশিন লাগবে। নতুন মেশিন মানে দশ-বারো হাজার টাকা। যেটা নেই।

তৃতীয় লাইন: পাড়ার বাইরে কাজ খোঁজা।

হাসিনা জানে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সেলাই অপারেটর নেয়। মাসে আট-দশ হাজার পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে ঘর কে সামলাবে? আজিজ সারাদিন বাইরে। মিম স্কুলে। জাহিদ হয়তো দূরে পড়তে যাবে। ঘর ফাঁকা। সংসার কে চালাবে?

হাসিনা কলমটা রাখল। ডান হাতের আঙুলগুলো ম্যাসাজ করল। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেছে। বিশ বছরের সেলাইয়ে জয়েন্টগুলো ফুলে আছে। শীতকালে বেশি ব্যথা করে। গরমকালে একটু কম। ডাক্তার বলেছে, বিশ্রাম নিতে। হাসিনা হেসেছিল। বিশ্রাম। শব্দটাই মজার। যেন বিশ্রাম একটা জিনিস, দোকানে গেলে কেনা যায়।

হাসিনা আবার কলম ধরল। চতুর্থ লাইন লিখল: রাতে সেলাই।

এটাই সবচেয়ে সহজ। দিনে সংসার, রাতে সেলাই। রাত দশটার পর দুই-তিন ঘণ্টা। ঘুম একটু কম হবে। কিন্তু ঘুম কম হলে মানুষ মরে না। মানুষ ক্লান্ত হয়। ক্লান্তি আর মৃত্যু এক জিনিস না।

চতুর্থ লাইনের পাশে টিক দিল।

"আম্মা?"

মিম। চোখ কচলাচ্ছে। হাসিনা দ্রুত খাতা বন্ধ করল।

"ঘুমাও। রাত হয়েছে।"

"তুমি কী করো?"

"কিছু না। হিসাব।"

মিম একটু উঠে বসল। "আম্মা, ভাইয়া কি ঢাকা যাবে?"

হাসিনা চুপ করে রইল একটু। তারপর বলল, "ইনশাআল্লাহ।"

কথাটা বলতে গিয়ে হাসিনার গলা ভারী হলো না। গলা ভারী হওয়ার অভ্যাস তার নেই। হাসিনা কাঁদে না। কাঁদা তার ধাতে নেই। যখন রাকিব প্রথম ঢাকা গেল, গার্মেন্টসে, তখনও কাঁদেনি। আজিজ চোখ মুছেছিল। হাসিনা শুকনো চোখে ছেলের ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছিল। একটা বাড়তি গেঞ্জি রেখে দিয়েছিল। একটা ছোট বোতলে সরিষার তেল। একটা প্যাকেটে গুড়ের নাড়ু, যেটা রাকিব ছোটবেলে থেকে পছন্দ করে।

কাঁদলে কী হতো? ব্যাগ হালকা হতো? ট্রেনের ভাড়া কমতো?

"আম্মা, ভাইয়া সরকারি পাবে তো?" মিম আবার বলল।

"দেখা যাবে। এখন ঘুমা।"

"ভাইয়া ডাক্তার হবে?"

"জাহিদ যা হতে চায় হবে। তুই ঘুমা।"

মিম শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমাল না। চোখ খোলা। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসিনা জানে মিম ঘুমায়নি। মিমও জানে হাসিনা জানে।

দুজনে চুপচাপ শুয়ে রইল।

একটু পর মিম বলল, "আম্মা, আমি বড় হলে অনেক টাকা কামাব।"

হাসিনা কিছু বলল না।

মিম বলল, "তখন তোমাকে আর সেলাই করতে হবে না।"

হাসিনা ডান হাতটা বাঁ হাতের ওপর রাখল। আঙুলগুলো ফোলা, শক্ত, রুক্ষ। এই হাত দিয়ে সে বিশ বছর ধরে সুই-সুতা চালিয়েছে। এই হাত দিয়ে দুই ছেলে, এক মেয়ে বড় করেছে। এই হাত দিয়ে ভাত রেঁধেছে, কাপড় কেচেছে, জ্বরে গায়ে পানি দিয়েছে, চুল বেঁধে দিয়েছে।

"ঘুমা," হাসিনা বলল। গলার স্বর সমান।

মিম এবার সত্যি ঘুমিয়ে গেল। নিশ্বাস সমান হয়ে এলো।

হাসিনা উঠে বসল। খাতাটা আলমারিতে রেখে দিল, শাড়ির তলায়। এই জায়গায় রাখে সবসময়। কেউ দেখে না। কেউ খোঁজেও না। হিসাবের খাতা কে দেখতে চায়? হিসাব দেখতে ভালো লাগে না। হিসাব সত্যি কথা বলে। সত্যি কথা শুনতে ভালো লাগে না।

তারপর হাসিনা সেলাই মেশিনের কাছে গেল। ঘরের এক কোণায়, জানালার পাশে। রাতে এখানে রাস্তার বাতি থেকে একটু আলো আসে। মেশিনের সাথে একটা ছোট ল্যাম্প জোড়া আছে, হলুদ আলো।

ল্যাম্প জ্বালাল। মেশিনের ওপর কাপড় সাজাল। আফসানা আপার কামিজ। কাল দেওয়ার কথা। আজ রাতে শেষ করলে সকালে দিতে পারবে। তিনশো টাকা।

সুই নামাল। প্যাডেল টিপল। মেশিন চলতে শুরু করল। টকটক টকটক।

ঘড়িতে রাত এগারোটা বাজে। আজিজ নাক ডাকছে। মিম ঘুমাচ্ছে। জাহিদ ছাদ থেকে নেমে নিজের ঘরে গেছে।

হাসিনা সেলাই করছে।

প্রতিটা সেলাই সমান, সোজা, পরিষ্কার। বিশ বছরের হাত। আঙুল ব্যথা করছে, কিন্তু সেলাই সোজা। ব্যথায় সেলাই বাঁকা হয় না। হাসিনার কোনোকিছু ব্যথায় বাঁকা হয় না।

তিনশো টাকা। এই দিয়ে জাহিদের ভর্তি পরীক্ষার ফরমের একটা অংশ হবে। কিংবা একদিনের মেসের খাবার। কিংবা একটা বইয়ের অর্ধেক দাম।

তিনশো টাকা কিছু না। তিনশো টাকা সবকিছু।

হাসিনা সেলাই করতে থাকল। মেশিনের টকটক শব্দ ঘরে ভরে গেল। ঘড়িতে এগারোটা পার হয়ে গেল। সাড়ে এগারো। বারো।

জাহিদ জানে না মা জেগে আছে। জাহিদ জানে না মায়ের একটা হিসাবের খাতা আছে। জাহিদ জানে না সেই খাতায় তার নাম লেখা। জাহিদ জানে না তিন হাজার আটশো টাকায় তার ভবিষ্যৎ ঠেকে আছে।

জাহিদের জানার দরকার নেই। এখনো না।

হাসিনা শেষ সেলাইটা দিল। সুতা কাটল দাঁত দিয়ে। কামিজটা ভাঁজ করে রাখল।

ল্যাম্প নেভাল। মেশিন থামল। ঘর অন্ধকার।

হাসিনা উঠে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। আজিজের নাশতা, মিমের টিফিন, জাহিদের চা।

চোখ বন্ধ করল। ঘুম এলো না। হিসাব মাথায় ঘুরছে। তিন হাজার আটশো। পাঁচ হাজার। আট হাজার। ঘাটতি। ঘাটতি। ঘাটতি।

তারপর একটা কথা মনে এলো। মা বলতেন, "আল্লাহ রিজিকের মালিক।" হাসিনা বিশ্বাস করে। কিন্তু হাসিনা এটাও জানে, আল্লাহ রিজিক পাঠান মানুষের হাত দিয়ে। মানুষকে হাত চালাতে হয়।

হাসিনা আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করল। তারপর ছেড়ে দিল। আবার মুষ্টিবদ্ধ করল। ব্যায়াম। ডাক্তার বলেছিল করতে। ব্যথা একটু কমে। হাত একটু নরম থাকে। হাত নরম থাকলে সেলাই ভালো হয়। সেলাই ভালো হলে অর্ডার বাড়ে। অর্ডার বাড়লে টাকা বাড়ে। টাকা বাড়লে জাহিদ পড়তে পারে।

সব কিছু সবকিছুর সাথে জড়িত। একটা মায়ের আঙুলের ব্যায়াম আর একটা ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটা লম্বা সুতা আছে। কেউ দেখে না। হাসিনা দেখে।

হাসিনা চোখ বন্ধ রাখল। ঘুম আসার আগে শেষবার ভাবল, কাল সকালে উঠে আরেকটা অর্ডার নিতে হবে। ফরিদা আপা বলেছিলেন একটা সালোয়ার দিতে। সেটা নিয়ে নেবে।

মেশিন পুরনো হলেও চলবে। চালাতে হবে।