পাড়ার বিচার

4.17 পেয়েছে শুনে পাড়া জেগে উঠল, কিন্তু জাহিদের পক্ষে কেউ নেই

পর্ব ৫ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

খবর ছড়াতে সময় লাগে না।

জাহিদের রেজাল্ট বের হয়েছে বিকেল তিনটায়। সাড়ে তিনটায় পাড়ার চায়ের দোকানে সবাই জানে। চারটায় পাশের গলির মানুষও জানে। সাড়ে চারটায় খালারা জানে, মামারা জানে, চাচারা জানে। পাঁচটার মধ্যে এমন কেউ নেই যে জানে না।

পাড়া হলো আসল সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুকের আগে পাড়া ছিল, ফেসবুকের পরেও থাকবে। ফেসবুকে লাইক দেওয়া যায়, ইগনোর করা যায়। পাড়ায় সেই সুযোগ নেই। পাড়ার মানুষ সামনে এসে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে, প্রশ্ন করে। উত্তর না দিলে নিজেরাই উত্তর বানিয়ে নেয়।

প্রথম এলো রশিদ চাচা। পাশের বাড়ি। রশিদ চাচা মুদি দোকানদার, সকাল আটটা থেকে রাত দশটা দোকানে বসেন। কিন্তু রেজাল্টের দিন দোকান ফেলে চলে এসেছেন। এটা ইভেন্ট। চায়ের দোকানে ম্যাচের দিন যেমন ভিড় হয়, রেজাল্টের দিনও তেমন। পার্থক্য হলো, ম্যাচে অন্যের জয়-পরাজয়, রেজাল্টে নিজের পাড়ার ছেলেমেয়েদের।

"কত পেলি, বাবা?"

"4.17, চাচা।"

রশিদ চাচা একটু ভাবলেন। মাথা নাড়লেন। "ভালো। ভালো তো। সায়েন্সে 4.17 মন্দ না।"

কথাটায় প্রশংসা আছে, কিন্তু একটা "কিন্তু" ঝুলে আছে বাতাসে। রশিদ চাচা বলেননি, কিন্তু তাঁর চোখে লেখা আছে: ভালো, তবে 5.00 না।

জাহিদ বুঝতে পারল। 4.17 একটা সংখ্যা যেটা না এদিক না ওদিক। খুব খারাপ হলে মানুষ সান্ত্বনা দিত। খুব ভালো হলে মানুষ তারিফ করত। 4.17 এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে মানুষ কী বলবে বুঝতে পারে না। তাই বলে "ভালো তো" আর পরের বাক্যে চলে যায় আসল প্রশ্নে।

"এখন কী পড়বি?"

এই প্রশ্নটা আজকে জাহিদ পঞ্চাশবার শুনবে। কমপক্ষে।

রশিদ চাচা গেলেন, আসলেন জামাল চাচা। জামাল চাচা আজিজ ভাইয়ের দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই, কিন্তু পাড়ায় সবাই চাচা ডাকে। জামাল চাচা গার্মেন্টসে সুপারভাইজার, মাসে কুড়ি হাজার টাকা পান। পাড়ায় এটা সম্মানজনক। গার্মেন্টসে সুপারভাইজার মানে মানুষ চেনেন, দুনিয়া বোঝেন।

জামাল চাচা এসে বসলেন। চা খেলেন না, সময় নেই। কিন্তু উপদেশ দেওয়ার সময় সবসময় আছে।

"জাহিদ, শোন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়। সরকারি চাকরি হবে। পাওয়ার গ্রিডে ঢুকতে পারবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডে ঢুকতে পারবি। সরকারি চাকরি মানে লাইফ সেট।"

জামাল চাচা নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েননি। এমনকি কোনো ইঞ্জিনিয়ারকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেনও না। কিন্তু তাঁর ধারণা আছে। ধারণা যথেষ্ট। বাংলাদেশে উপদেশ দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা লাগে না, ধারণা লাগে।

আজিজ পাশে বসে শুনছিলেন। কিছু বললেন না। আজিজের অভ্যাস, অন্যরা যখন তাঁর ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলে, তিনি চুপ থাকেন। কারণ তিনি নিজেও জানেন না উত্তরটা কী।

জামাল চাচা চলে গেলেন। আজিজ জাহিদের দিকে তাকালেন। কিছু বলতে গিয়ে বললেন না। জাহিদও কিছু বলল না। দুজনের মধ্যে একটা নীরবতা, যেটা বাবা-ছেলের মধ্যে প্রায়ই হয়। বলার অনেক কিছু আছে, কিন্তু কোনোটাই বলা যাচ্ছে না।

বিকেল পাঁচটায় খালা এলেন। বাবার বড় বোন, নাসিমা খালা। নাসিমা খালার ছেলে সোহাগ, দুই বছর আগে HSC দিয়েছিল। সোহাগ পেয়েছিল 4.83। এই তথ্যটা নাসিমা খালা পাড়ার প্রতিটা মানুষকে জানিয়েছেন, কমপক্ষে তিনবার করে।

নাসিমা খালা এসে হাসিনাকে জড়িয়ে ধরলেন। "আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! পাশ করেছে!"

"পাশ" শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। 4.17 কে "ভালো রেজাল্ট" না বলে "পাশ করেছে" বলার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। নাসিমা খালা সেই পার্থক্যটা বোঝেন। হাসিনাও বোঝেন। জাহিদও বোঝে।

"কত পেয়েছে?"

হাসিনা বললেন, "4.17।"

নাসিমা খালা একটু চুপ থাকলেন। ঠিক এক সেকেন্ড। এই এক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি হিসাব করলেন: 4.83 বনাম 4.17। ব্যবধান 0.66। তাঁর ছেলে এগিয়ে। এই তথ্যটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি মুখে সহানুভূতি আনলেন।

"ভালো, ভালো তো! সায়েন্সে 4.17 তো খারাপ না। আমার সোহাগ তো কমার্সে ছিল, তাই একটু বেশি পেয়েছিল, 4.83। কিন্তু সায়েন্স আলাদা, সায়েন্সে কম আসে।"

কথাটা সত্য। সায়েন্সে GPA কম আসে, সবাই জানে। কিন্তু নাসিমা খালা কথাটা বলেছেন সান্ত্বনা হিসেবে না, তুলনা হিসেবে। সোহাগের 4.83 টা আবার একবার বাতাসে ভাসল, যেন কেউ ভুলে যায় সেটা ঠেকাতে।

হাসিনা চুপ করে শুনলেন। তিনি জানেন খালাম্মার এই অভ্যাস। প্রতিটা কথোপকথনে সোহাগের রেজাল্ট আসবেই। বৃষ্টি আসে, রোদ আসে, সোহাগের 4.83 আসে। প্রকৃতির নিয়ম।

জাহিদ ভেতরের ঘরে বসে শুনছিল। দরজা খোলা। খালার গলা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

"এখন কী পড়াবে? ইঞ্জিনিয়ারিং? ডাক্তারি তো 4.17 তে কঠিন হবে..."

হাসিনা বললেন, "দেখা যাক।"

"দেখো, আমার কথা শোন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করাও। প্রাইভেটে টাকা কোথায়? ন্যাশনালে কম খরচে হয়ে যাবে।"

খালা চলে গেলেন। তাঁর উপদেশ রেখে গেলেন, যেভাবে মানুষ বাড়িতে এসে জুতো রেখে যায়। জুতো ফেরত নেওয়া যায়, উপদেশ ফেরত নেওয়া যায় না।

সন্ধ্যার আগে পাড়ার চায়ের দোকানে একটা আলোচনা হলো। জাহিদ সেখানে ছিল না, কিন্তু পাড়ার আলোচনা দেয়ালের ওপাশেও শোনা যায়। পাড়ায় দেয়াল পাতলা, গোপনীয়তা বিলাসিতা।

কথা বলছিলেন কাদের ভাই। কাদের ভাই বয়সে তরুণ, তিরিশ-বত্রিশ, মোবাইলে ইউটিউব দেখেন, ফেসবুকে পোস্ট দেন। পাড়ায় তিনি "আধুনিক" মানুষ।

"আজিজ ভাইয়ের ছেলে 4.17 পেয়েছে। সায়েন্সে। মন্দ না, কিন্তু মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং কঠিন হবে।"

পাশ থেকে ফারুক মিয়া বললেন, "4.17 তে BUET তো হবেই না।"

"BUET? আরে ভাই, BUET এ 5.00 পেয়েও অনেকে চান্স পায় না।"

"তাহলে?"

"ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। অথবা প্রাইভেট, যদি টাকা থাকে।"

"আজিজ ভাইয়ের টাকা কোথায়? CNG চালায়।"

এই কথাটা চায়ের কাপের ভেতরে পড়ল, চিনির মতো গুলে গেল। কেউ আপত্তি করল না। CNG চালানো মানে টাকা নেই, এটা সমীকরণ, এটা নিয়ে তর্ক নেই।

তারপর কথা উঠল শফিকের। শফিক পাড়ার সেই ছেলে যে পাঁচ বছর আগে জাপান গেছে। কোনো এক ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। মাসে কত পাঠায় কেউ সঠিক জানে না, কিন্তু সবার ধারণা অনেক। শফিকের বাবা গত বছর পাকা বাড়ি করেছেন, দোতলা, টাইলস লাগানো। পাড়ায় এটা সাফল্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ। পাকা বাড়ি মানে ছেলে সফল। টিনের ঘর মানে ছেলে এখনো পথে আছে।

"শফিকের কথা ভাবো। SSC তেই মাঝারি ছিল, HSC ও তেমন না। কিন্তু এখন? বাবা পাকা বাড়ি করছে। GPA দিয়ে কী হবে, আয় দিয়ে তো বাড়ি হয়।"

কথাটা সত্য। অন্তত পাড়ার হিসেবে সত্য। GPA একটা সংখ্যা, বাড়ি একটা বাস্তবতা। সংখ্যা ভোলা যায়, বাড়ি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

আজিজ সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়তে মসজিদে গেলেন। মসজিদ পাড়ার কেন্দ্রবিন্দু, এখানে শুধু নামাজ হয় না, খবরও হয়। নামাজের আগে পাঁচ মিনিট, পরে দশ মিনিট, মানুষ কথা বলে।

"আজিজ ভাই, ছেলে কী পড়বে?"

প্রথমবার জিজ্ঞেস করলেন ইমাম সাহেব। সাদা পাঞ্জাবি, পাকা দাড়ি, গলায় নরম সুর। ইমাম সাহেবের প্রশ্নে জবাবদিহিতা আছে। তিনি পাড়ার মুরুব্বি, তাঁকে উত্তর দিতে হয়।

"দেখা যাক।"

আজিজ বললেন। কথাটা বলতে বলতে তিনি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। "দেখা যাক" একটা ঢাল, প্রশ্নের তলোয়ার থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু ঢাল বারবার ব্যবহার করলে হাত ভারী হয়ে যায়।

"ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াও। সরকারি চাকরি করবে, মসজিদে দান করবে, সবার উপকার হবে।" ইমাম সাহেব হাসলেন। হাসিটা সদয়, কিন্তু উপদেশটা সেই একই।

দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন মকবুল ভাই। তৃতীয়বার আলম চাচা। চতুর্থবার সেলিম। প্রতিবার আজিজ বললেন, "দেখা যাক।"

পঞ্চমবার হাফিজ সাহেব, যাঁর ছেলে ঢাকায় প্রাইভেটে BBA পড়ছে। "ছেলেকে ঢাকায় পাঠান। ঢাকা ছাড়া কিছু হবে না।"

ছয়বার। সাতবার। আটবার। প্রতিবার "দেখা যাক।" প্রতিবার শব্দটা একটু ভারী হলো। প্রথমবার যখন বলেছিলেন, তখন শব্দটা হালকা ছিল, সত্যিই দেখা যাবে এমন একটা আশা ছিল। আটবার বলার পর শব্দটা সিসার মতো ভারী। "দেখা যাক" মানে "জানি না।" "জানি না" মানে "পারব কিনা জানি না।" "পারব কিনা জানি না" মানে "টাকা নেই।"

আজিজ মসজিদ থেকে বের হলেন। রাস্তায় হাঁটছেন। সন্ধ্যার আকাশ লাল হয়ে আসছে। CNG টা রাস্তার ধারে পার্ক করা। কাল সকালে আবার বের হতে হবে, স্ট্যান্ডে যেতে হবে, যাত্রী খুঁজতে হবে, মিটারে টাকা উঠবে, দিন শেষে পনেরো শো টাকা হবে হয়তো, হবে না হয়তো।

ছেলে কী পড়বে?

আজিজ জানেন না। কিন্তু পাড়া চায় উত্তর। পাড়া অপেক্ষা করে না। পাড়ার ধৈর্য কম।

রাত আটটায় জাহিদ বাইরে বের হলো। ঘরে বসে থাকতে পারছে না। সারাদিন মানুষ এসেছে, প্রশ্ন করেছে, উপদেশ দিয়েছে।

গলির মোড়ে কামাল ভাই আর সুজন বসে আছে। কামাল ভাই রিকশা চালান, সুজন মিস্ত্রির কাজ করে। ডাকলেন, "এই জাহিদ, আয় বোস।"

জাহিদ বসল। "4.17" বলল।

কামাল ভাই মাথা নাড়লেন। "আমার কথা শুনবি? পড়াশোনা করে কী হবে? চার-পাঁচ বছর পড়বি, তারপর চাকরি খুঁজবি, পাবি কিনা জানা নেই। আমি দেখ, রিকশা চালাই, দিনে আটশো-হাজার টাকা আসে। কারো কাছে হাত পাততে হয় না।"

সুজন বলল, "আমার মামাতো ভাই অনার্স পাশ করে দুই বছর বেকার ছিল। এখন কুরিয়ারে চাকরি করে, বারো হাজার টাকা। চার বছর পড়ে বারো হাজার। আমি মিস্ত্রির কাজ করি, পনেরো পাই।"

জাহিদ কিছু বলল না। সংখ্যাগুলো ঠিক আছে। গণিত পরিষ্কার। কিন্তু গণিত সবসময় পুরো গল্প বলে না।

জাহিদ উঠে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, সবাই তাকে ভাবতে বলছে। কিন্তু কেউ বলছে না কী ভাবতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, জাপান, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রিকশা, মিস্ত্রি। প্রতিটা দিকের পেছনে একটা করে গল্প, প্রতিটা গল্পে একটা করে মানুষ। কিন্তু জাহিদের গল্প তো জাহিদের।

কেউ জানে না, কিন্তু সবাই নিশ্চিত।

পাড়ার শেষ মাথায় একটা বাড়ির সামনে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কথা কানে এলো।

"আজিজের ছেলে 4.17 পেয়েছে।"

"সায়েন্সে?"

"হ্যাঁ।"

"4.17 তে তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কঠিন হবে।"

"কঠিন তো বটেই। চান্স পাবে কোথায়? BUET তো দূরের কথা, রাজশাহী-চট্টগ্রামেও কঠিন।"

"ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু ভালো তো আর সেরা না।"

কথাগুলো এমনভাবে বলা হচ্ছিল যেভাবে মানুষ আবহাওয়ার কথা বলে। "আজ গরম পড়েছে" বলতে কোনো আবেগ লাগে না, "আজিজের ছেলে 4.17 পেয়েছে" বলতেও তেমন কিছু লাগে না। তথ্য, শুধু তথ্য। কিন্তু তথ্যটা জাহিদের বুকে ঢুকে গেল, যেভাবে কাঁটা ঢোকে, আলতো করে, রক্ত পরে বের হয়।

"ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কঠিন হবে।"

কথাটা সত্য হতে পারে। কিন্তু সত্য বলার ভঙ্গি একটা বিষয়। কেউ সত্য বলে উৎসাহ দেয়, কেউ সত্য বলে থামিয়ে দেয়। এই দুজন মহিলা থামিয়ে দেওয়ার দলে। তাঁরা জানেন না যে জাহিদ শুনছে। জানলেও হয়তো একই কথা বলতেন। পাড়ায় পেছনে বলা আর সামনে বলার মধ্যে তফাত কম।

জাহিদ দ্রুত পা ফেলে বাড়ি ফিরে এলো।

বাড়িতে ঢুকে দেখল মিম বারান্দায় বসে আছে। ক্লাস এইটে পড়ে মিম, বয়স তেরো। মিমের হাতে একটা গণিতের খাতা, কিন্তু পড়ছে না। ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

"ভাইয়া, কোথায় গিয়েছিলে?"

"একটু হাঁটতে।"

"লোকজন কী বলছে?"

জাহিদ অবাক হলো। মিম ছোট, কিন্তু বোঝে। পাড়ার মেয়ে, পাড়ার ভাষা বোঝে।

"কিছু না।"

"মিথ্যা কথা। আমি শুনেছি। খালাম্মা এসে বলে গেছে ভাইয়ার রেজাল্ট নাকি ভালো হয়নি। 4.17 নাকি কম।"

জাহিদ কিছু বলল না।

মিম উঠে দাঁড়াল। তেরো বছরের মেয়ে, কিন্তু চোখে একটা আগুন আছে যেটা জাহিদের চোখে নেই। জাহিদের চোখে প্রশ্ন আছে, সন্দেহ আছে, ক্লান্তি আছে। মিমের চোখে শুধু রাগ।

"ভাইয়া অনেক ভালো পেয়েছে। 4.17 অনেক ভালো। আমি জানি ভাইয়া কত পড়াশোনা করেছে। লোডশেডিংয়ের মধ্যে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়েছে। এত কষ্ট করে পেয়েছে, আর লোকে বলে কম?"

মিমের গলা উঁচু হয়ে গেল। হাসিনা ভেতর থেকে বললেন, "মিম, চিল্লাস না।"

মিম চুপ হলো। কিন্তু চুপ হওয়া মানে মেনে নেওয়া না। মিম মানেনি। মিমের বয়স তেরো, পাড়ার কথা তার কাছে অন্যায় মনে হয়। বড় হলে হয়তো মানিয়ে নিত, যেভাবে হাসিনা মানিয়ে নিয়েছেন, যেভাবে আজিজ মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তেরো বছরে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি।

জাহিদ মিমের মাথায় হাত রাখল। "ঠিক আছে।"

"ঠিক নেই।"

"ঠিক আছে, মিম।"

মিম আর কিছু বলল না। গণিতের খাতাটা তুলে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ভাইয়ার দিকে তাকাল। সেই তাকানোতে একটা প্রতিশ্রুতি ছিল: আমি বড় হলে কেউ ভাইয়াকে এরকম বলতে পারবে না।

প্রতিশ্রুতিটা মিমের নিজের কাছে, কাউকে বলেনি। তেরো বছরের মেয়েরা এরকম প্রতিশ্রুতি করে, বেশিরভাগ ভুলে যায়। কিছু কিছু মনে রাখে।

জাহিদ নিজের ঘরে ঢুকল। ঘর বলতে একটা ছোট রুম, রাকিবের সাথে ভাগ করে থাকে। রাকিব এখনো ফেরেনি, গার্মেন্টস থেকে রাতে ফেরে। ঘরে একটা খাট, একটা পড়ার টেবিল, টেবিলের ওপর বই। HSC-র বইগুলো এখনো সাজানো আছে। পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান। এই বইগুলো দিয়ে জাহিদ দুই বছর কাটিয়েছে। এখন বইগুলো শেষ। বইয়ের কাজ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু জাহিদের কাজ শুরু হয়নি।

দরজা বন্ধ করল।

ঘরটা চুপ। বাইরে পাড়ার শব্দ, কারো টিভি, কারো কথা, দূরে রিকশার ঘণ্টা। কিন্তু দরজা বন্ধ করলে শব্দগুলো একটু কমে, যেন দেয়াল একটা ফিল্টার।

জাহিদ খাটে বসল। ভাবল।

পাড়া আজ তার বিচার করেছে। রায় দিয়েছে। রায়টা হলো: 4.17 মোটামুটি, কিন্তু যথেষ্ট না। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য যথেষ্ট না। সফল হওয়ার জন্য যথেষ্ট না। সফল মানে কী সেটা পাড়া ঠিক করে দিয়েছে: ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, BCS ক্যাডার, অথবা বিদেশ। এই চারটার বাইরে সাফল্যের সংজ্ঞা পাড়ার অভিধানে নেই।

জাহিদের বাবা CNG চালান। মা সেলাই করেন। ভাই গার্মেন্টসে কাজ করে। এঁরা কেউ সফল না, পাড়ার সংজ্ঞায়। এঁরা "চলছে" এমন মানুষ। "চলছে" মানে বেঁচে আছে, কিন্তু উঠতে পারেনি। পাড়া চায় জাহিদ উঠুক। কিন্তু 4.17 দিয়ে কোথায় উঠবে সেটা কেউ বলতে পারে না।

জাহিদ ভাবল, পাড়ার কথা কি ঠিক? 4.17 কি সত্যিই যথেষ্ট না?

হতে পারে। হয়তো ঠিক। হয়তো 4.17 সত্যিই সেই দরজাগুলো খুলবে না যেগুলো 5.00 খোলে। হয়তো পাড়ার মানুষ যা দেখেছে সেটাই বাস্তব: GPA কম হলে ভালো জায়গায় চান্স হয় না, চান্স না হলে ভালো চাকরি হয় না, ভালো চাকরি না হলে পাকা বাড়ি হয় না। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ আগের ধাপের ওপর দাঁড়িয়ে, আর জাহিদের প্রথম ধাপটাই একটু নিচু।

কিন্তু তারপর জাহিদ ভাবল, পাড়ার কথা কি সবসময় ঠিক হয়?

রশিদ চাচা মুদি দোকান চালান, তিনি জানেন কোন চালের দাম বেশি। কিন্তু তিনি কি জানেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সাবজেক্টে কত পয়েন্ট লাগে? জামাল চাচা বলেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে, তিনি নিজে কোনো ইঞ্জিনিয়ারকে চেনেন না। খালাম্মা সোহাগের 4.83 এর কথা বলেন, কিন্তু সোহাগ কী পড়ছে, কেমন আছে, সেটা কেউ জিজ্ঞেস করে না।

পাড়া অনেক কিছু জানে। কার ছেলে কত পেয়েছে, কে কোথায় পড়ছে। কিন্তু পাড়া জানে না যে 4.17 দিয়েও অনেক কিছু হয়। পাড়া জানে না যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের বাইরেও পৃথিবী আছে। পাড়া দেখেনি বলে জানে না।

জাহিদ শুয়ে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সিলিংয়ে একটা টিকটিকি। টিকটিকিটা নিজের কাজ করছে, কারো কথা শুনছে না, কারো উপদেশ নিচ্ছে না।

দরজার ওপাশে পাড়া। পাড়া রায় দিয়েছে। জাহিদকে ওই রায় মানতে হবে? নাকি নিজে অন্য কিছু ভাবতে পারে?

জাহিদ জানে না।

বাতি নেভাল। অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে। কানে এখনো বাজছে: "ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কঠিন হবে।" কথাটা বলেছিলেন দুজন মহিলা, যাদের নাম জাহিদ জানে, যারা প্রতিদিন দেখা হলে হাসেন, ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ না। কিন্তু তাদের কথাটা কেটেছে। যে কথা কাটে সেটা খারাপ মানুষের কথা না সবসময়, ভালো মানুষের কথাও কাটে, কারণ ভালো মানুষ ভাবে না যে তার কথা কাউকে কাটতে পারে।

ঘুম আসছে না। পাশের ঘরে মিম পড়াশোনা করছে, পেন্সিলের শব্দ। বাবা-মা কথা বলছেন নিচু গলায়, কী বলছেন শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু জাহিদ জানে কী নিয়ে কথা বলছেন।

তার ভবিষ্যত নিয়ে।

পাড়া ঘুমায়নি এখনো। আশেপাশের বাড়িতে এখনো আলো জ্বলছে, এখনো কোথাও কেউ বলছে: "আজিজের ছেলে 4.17 পেয়েছে।" কথাটা ঘুরছে, বাতাসে, দেয়ালে, গলিতে। কাল সকালে অন্য খবর আসবে, অন্য কারো রেজাল্ট, অন্য কারো ভাগ্য। তখন জাহিদের 4.17 পুরনো হয়ে যাবে। কিন্তু আজ রাতে এটা তাজা, এটা জ্বলছে।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল। একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে: পাড়াকে ভুল প্রমাণ করতে হবে, নাকি পাড়া ঠিকই বলেছে?

উত্তর নেই। শুধু প্রশ্ন। প্রশ্ন নিয়ে ঘুমানো কঠিন। কিন্তু জাহিদ ঘুমাবে। কাল আবার সকাল হবে। কাল পাড়া আবার কথা বলবে। কাল আবার কেউ জিজ্ঞেস করবে, "ছেলে কী পড়বে?"

আর আজিজ আবার বলবেন, "দেখা যাক।"