ফেসবুকে গোল্ডেন
নিউজফিডে সোনার বন্যা, জাহিদের স্ক্রিনে নিজের মুখ ধূসর
১
ফোনটা হাতে নিল জাহিদ।
স্ক্রিনে notification দেখাচ্ছে ৪৭টা। এতক্ষণে ৪৭টা। রেজাল্ট বের হয়েছে ঘণ্টাখানেক আগে, আর এর মধ্যে পুরো Facebook ফেটে পড়েছে। জাহিদ আঙুল দিয়ে নিউজফিড স্ক্রল করতে শুরু করল।
সোনা। চারদিকে সোনা।
প্রথম পোস্ট। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সোনালী অক্ষরে লেখা: "GPA 5.00। Alhamdulillah।" নিচে ৫৩৭ লাইক। ১২৩ কমেন্ট। ছেলেটাকে জাহিদ চেনে না। মিউচুয়াল ফ্রেন্ড আছে ১৪ জন। কিন্তু Facebook-এর অ্যালগরিদম ঠিক করেছে যে এই পোস্টটা জাহিদের দেখা দরকার।
দ্বিতীয় পোস্ট। মেয়ে একটা, চট্টগ্রামের। সাদা হিজাবে সেলফি, হাতে মার্কশিট ধরা। ক্যাপশনে লেখা: "সব প্রশংসা আল্লাহর। GPA 5.00।" ৮১৯ লাইক। কমেন্টে সবাই লিখেছে "মাশাআল্লাহ", "গর্বিত", "তোমার পরিবার ধন্য"।
তৃতীয় পোস্ট। চতুর্থ পোস্ট। পঞ্চম পোস্ট।
সব সোনালী।
জাহিদের মনে হলো সে একটা সোনার দোকানে ঢুকেছে খালি পকেটে। চারদিকে ঝকমক করছে, কিন্তু কিছু তার নয়।
ষষ্ঠ পোস্ট। এটা একটু আলাদা। ছেলেটা GPA 5.00 পেয়ে কাঁদছে। ভিডিও। মা বাবা জড়িয়ে ধরেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে কেউ "আল্লাহু আকবার" বলছে। ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে গেছে। ৩.৪K শেয়ার। কমেন্টে একজন লিখেছে: "এই কান্না দেখে আমিও কাঁদলাম।"
জাহিদ কাঁদতে পারছে না। কাঁদার মতো কিছু হয়নি। কিন্তু হাসতেও পারছে না। হাসার মতো কিছু হয়েছে কি?
4.17।
সংখ্যাটা এখন আর শুধু একটা সংখ্যা নেই। এটা একটা সামাজিক অবস্থান। Facebook তাকে শেখাচ্ছে ঠিক কোথায় সে দাঁড়িয়ে আছে।
২
কোচিং সেন্টারগুলো শুরু করেছে।
"উদয় কোচিং সেন্টার, সিলেট শাখা। এবার আমাদের ৫০ জন ছাত্রছাত্রী GPA 5.00 পেয়েছে! গর্বিত!" নিচে ৫০ জনের ছবি কোলাজ করে বসানো। সবার মুখে হাসি। সবার হাতে ফুল।
জাহিদ হিসাব করল মনে মনে। উদয় কোচিংয়ে ছাত্র আছে কমপক্ষে ৩৫০। ৫০ জন পাস করেছে 5.00-তে। বাকি ৩০০ জনের কথা কেউ বলছে না। তারা কোথায়? তারা কি Facebook-এ নেই? আছে, কিন্তু তাদের পোস্ট কেউ দেখছে না।
আরেকটা কোচিং সেন্টার। ঢাকার। এরা আরো বড়। পোস্টে লেখা: "আমাদের ৮৫% ছাত্র GPA 4.50-এর উপরে!" একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, ৮৫% মানে বাকি ১৫% 4.50-এর নিচে। সেই ১৫% কোথায়? তারা কি মানুষ নয়? তাদের কি Facebook নেই?
আছে। তারাও স্ক্রল করছে এখন। জাহিদের মতো।
কিন্তু অ্যালগরিদম তাদের পোস্ট দেখাচ্ছে না কাউকে। কারণ তাদের পোস্টে লাইক কম। লাইক কম কারণ GPA কম। GPA কম কারণ... কারণ কী? কারণ কি তারা কম পড়েছে? নাকি তাদের বাবা CNG চালায়, ঘরে টিউশন টিচার রাখার টাকা নেই, লোডশেডিংয়ে পড়তে বসলে বিদ্যুৎ চলে যায়, পাশের ঘরে তিনজন ঘুমায় বলে রাত দশটার পর পড়ার উপায় নেই?
জাহিদ থামল। এত ভাবছে কেন? 4.17 তো খারাপ না।
কিন্তু Facebook বলছে খারাপ। Facebook বলছে 5.00 ছাড়া কিছুই না।
৩
রাসেলের পোস্ট দেখল।
রাসেল জাহিদের ক্লাসমেট। ছোটবেলার বন্ধু। একসাথে ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়েছিল। রাসেলের বাবা সরকারি স্কুলের হেডমাস্টার। মা কলেজে পড়ান। বাড়িতে আলাদা পড়ার ঘর আছে। AC আছে। ব্রডব্যান্ড আছে।
রাসেলের পোস্টটা সুন্দর। ছবি নেই। শুধু টেক্সট:
"Alhamdulillah, GPA 5.00। কৃতজ্ঞ। বাবা মায়ের দোয়া ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। শিক্ষকদের ধন্যবাদ।"
শব্দগুলো সাজানো। বিনয়ী। রাসেল এমনই, সবসময় পরিমিত। কিন্তু বিনয়ের আড়ালেও যেটা ঝলমল করছে সেটা হলো সংখ্যাটা। 5.00। পাঁচ দশমিক শূন্য শূন্য। পুরো গোল। পুরো সোনালী।
২,০৪৭ লাইক। ৩৮৯ কমেন্ট। ১২২ শেয়ার।
জাহিদ পোস্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লাইক বাটনে চাপ দিল।
আঙুলটা ভারী লাগল।
এটা মিথ্যা না। জাহিদ সত্যিই খুশি রাসেলের জন্য। ছোটবেলার বন্ধু, তার ভালো হোক, এটা তো চাওয়ার কথা। কিন্তু খুশির ভেতরে একটা কাঁটা আছে। কাঁটাটার নাম তুলনা। কাঁটাটা বলছে: তোরা একই ক্লাসে পড়তি, একই পরীক্ষা দিলি, কিন্তু সে 5.00, তুই 4.17। পার্থক্যটা 0.83। কিন্তু লাইকের পার্থক্যটা হবে দুই হাজার।
জাহিদ লাইক দিয়ে স্ক্রল করে নিচে চলে গেল। দ্রুত। যেন পোস্টটা থেকে পালাচ্ছে।
৪
সুমাইয়ার পোস্ট।
সুমাইয়া গ্রুপের মেধাবী। সবাই জানত সে ডাক্তার হবে। ক্লাসে সবসময় ফার্স্ট। নোট করে এত সুন্দর করে যে টিচাররাও তার খাতা দেখে বলতেন, "সুমাইয়া, তুমি এটা প্রিন্ট করিয়েছ নাকি?"
সুমাইয়ার পোস্ট পড়ে জাহিদ চুপ হয়ে গেল।
"4.83। আশানুরূপ হয়নি। রসায়নে A+ মিস করেছি। তবু চেষ্টা করে যাব। দোয়া করবেন।"
4.83। জাহিদের চেয়ে 0.66 বেশি। আর সুমাইয়া দুঃখী।
কমেন্টগুলো পড়ল। সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে। "তোমার তো মেডিকেল হবেই।" "4.83 তো অসাধারণ।" "এটা নিয়ে দুঃখ করো না।" কেউ কেউ লিখেছে: "আমি 3.50 পেয়েছি, তোমাকে দেখে হাসি পাচ্ছে।"
জাহিদ হাসল না।
সুমাইয়ার দুঃখটা আসল। সে 5.00 চেয়েছিল। সে পারত। রসায়নের দ্বিতীয় পত্রে একটা প্রশ্ন কমন পড়েনি। সেটা না হলে সে 5.00 পেত। এটা সুমাইয়ার ব্যর্থতা নয়, কিন্তু সুমাইয়া মনে করছে ব্যর্থতা। কারণ সুমাইয়ার মাপকাঠি রাসেলের মতো 5.00।
আর জাহিদের মাপকাঠি?
4.17 নিয়ে কী বলবে সে? সুমাইয়া 4.83 পেয়ে দুঃখী, তাহলে জাহিদের কী অনুভূতি হওয়া উচিত? দুঃখের বর্গমূল? দুঃখের ঘনমূল?
একটা অদ্ভুত জিনিস হচ্ছে। সুমাইয়ার পোস্ট দেখে জাহিদের নিজের দুঃখটা কেমন যেন ছোট হয়ে গেল। না, ছোট হয়নি, চেহারা বদলেছে। সুমাইয়া যদি 4.83 নিয়ে কষ্ট পায়, তাহলে এই পুরো সিস্টেমটাই একটা ফাঁদ। কেউ সুখী নয়। 5.00 যারা পেয়েছে তারা ভাবছে BUET হবে কিনা। 4.83 পেয়ে সুমাইয়া ভাবছে মেডিকেল হবে কিনা। 4.17 পেয়ে জাহিদ ভাবছে কিছু হবে কিনা।
৫
ফারুকের প্রোফাইলে গেল। খুঁজে খুঁজে।
ফারুক কিছু পোস্ট করেনি।
প্রোফাইল পিকচার আগের ঈদের। নীল পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদের সামনে। কভার ফটো একটা পাহাড়ের ছবি, কোত্থেকে ডাউনলোড করা। শেষ পোস্ট তিন মাস আগের, একটা ফানি ভিডিও শেয়ার করেছিল।
ফারুক GPA পেয়েছে 3.80।
3.80 মানে A+ নেই একটাও। 3.80 মানে Facebook-এ পোস্ট দেওয়ার মতো কিছু নেই, এটা ফারুক বুঝে গেছে। নিউজফিডে সোনালী পোস্টের বন্যায় সে 3.80 লিখে কী কমেন্ট পাবে? "ভালো হবে ইনশাআল্লাহ"? সেই করুণার কমেন্ট? ফারুক করুণা চায় না। তাই চুপ আছে।
ফারুক পলিটেকনিকে যাবে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং। ফারুকের বাবা মিস্ত্রি, টিনের চাল ঠিক করে। ফারুক বলেছিল, "আমি হাতে কাজ শিখব, বই পড়ে আমার হবে না।" সেদিন জাহিদ ভেবেছিল ফারুক হাল ছেড়ে দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে ফারুক সবার আগে বুঝে গিয়েছিল।
3.80 দিয়ে পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়া যায়। ফারুকের পরিকল্পনায় কোনো ফাঁক নেই। কিন্তু Facebook-এ তার অস্তিত্ব নেই আজ। অ্যালগরিদম তাকে মুছে দিয়েছে।
৬
আরিফের প্রোফাইলে ঢুকল।
আরিফ GPA পেয়েছে 4.50। ভালো নম্বর। Facebook-এ পোস্ট দেওয়ার যোগ্য। কিন্তু আরিফ রেজাল্ট নিয়ে কিছু পোস্ট করেনি।
আরিফ একটা লিংক শেয়ার করেছে। "সাকুরা ইন্টারন্যাশনাল, জাপান ভিসা প্রসেসিং এজেন্সি। JLPT N4 কোর্স, ভর্তি চলছে।"
ব্যস। এইটুকুই।
জাহিদ বুঝল। আরিফ HSC-কে পেছনে ফেলে দিয়েছে। আরিফের বাবা মধ্যপ্রাচ্যে আছে, দশ বছর। মা একা সংসার চালায়। আরিফ বলেছিল একদিন, "বাংলাদেশে পড়ে কী হবে? বাবা দশ বছর ধরে বিদেশে, তবু আমরা গরিব।" সেদিন কথাটা রসিকতা মনে হয়েছিল। আজ মনে হচ্ছে আরিফ ম্যাথ কষে ফেলেছে।
জাপানে গেলে একটা কারখানায় কাজ করবে। মাসে লাখ টাকা পাঠাবে। GPA দিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করবে না সেখানে। জাপানিরা জিজ্ঞেস করবে: তুমি কি সময়মতো আসো? তুমি কি কাজটা ঠিকমতো করো? ব্যস। 4.50 না 5.00, কোনো তফাৎ নেই।
আরিফের পোস্টে লাইক আছে ৭টা। সাতটা। রাসেলের পোস্টে দুই হাজার, আরিফের পোস্টে সাত। অথচ আরিফ হয়তো পাঁচ বছর পর রাসেলের চেয়ে বেশি আয় করবে।
কিন্তু সেটা Facebook জানে না। Facebook শুধু জানে GPA। Facebook শুধু জানে আজকে।
৭
জাহিদ নিজের পোস্ট লিখতে গেল।
"What's on your mind?" Facebook জিজ্ঞেস করছে।
জাহিদ টাইপ করল: "Alhamdulillah, HSC পাস করেছি।"
তাকিয়ে রইল। GPA লেখেনি। শুধু "পাস করেছি"। কেমন দেখাচ্ছে? দেখে মনে হচ্ছে লুকাচ্ছে। যারা দেখবে তারা বুঝবে, GPA 5.00 হলে লিখত। না লেখা মানে ভালো না।
মুছে ফেলল।
আবার টাইপ করল: "GPA 4.17। ভালো না মন্দ জানি না। তবে চেষ্টা করেছিলাম।"
এটা সৎ। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে করুণা চাইছে। "ভালো না মন্দ জানি না" লাইনটা পড়ে মানুষ ভাববে ছেলেটা বেচারা। ফারুকের মতো জাহিদও করুণা চায় না।
মুছে ফেলল।
তৃতীয়বার টাইপ করল: "HSC রেজাল্ট পেলাম। পরিবারের জন্য আলহামদুলিল্লাহ। এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা।"
ভালো। মোটামুটি নিরাপদ। GPA নেই, কিন্তু ইতিবাচক। দেখে মনে হবে ছেলেটা পজিটিভ। কিন্তু... কেউ কি জিজ্ঞেস করবে "কত পেলে?" কমেন্টে? তখন কী বলবে? 4.17 বলবে? তখন কি কেউ লাইক দেবে? নাকি সেই করুণামিশ্রিত "ইনশাআল্লাহ ভালো হবে"?
মুছে ফেলল।
ফোনটা বিছানায় রেখে দিল। Facebook-এ নিজের কথা বলার একটা ভাষা আছে, সেটা হলো 5.00-এর ভাষা। ওই ভাষায় 4.17-এর কোনো শব্দ নেই।
৮
Quora খুলল।
সার্চ বারে টাইপ করল: "4 point দিয়ে কী হয়?"
ফলাফল এল অজস্র।
"HSC-তে GPA 4.00 পেয়েছি, ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাব কি?" "GPA 4.17 দিয়ে কোন সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারব?" "4.33 পেয়েছি, জীবন কি শেষ?" "GPA 5.00 না পেলে কি কোনো ভবিষ্যৎ নেই?"
হাজার হাজার প্রশ্ন। হাজার হাজার জাহিদ। সবাই একই জিনিস জিজ্ঞেস করছে। সবার ভয় একই: 5.00 না পেলে কী হবে?
উত্তরগুলো পড়ল। কেউ লিখেছে: "GPA কোনো ব্যাপার না। আমি 3.67 পেয়েছিলাম, এখন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মাসে ১.৫ লাখ বেতন।" কেউ লিখেছে: "ভাই, GPA ছাড়া কিছু নাই এই দেশে। ভর্তি পরীক্ষায় 200 নম্বরের মধ্যে 60 নম্বর GPA থেকেই আসে।" কেউ লিখেছে: "জীবনটা ম্যারাথন, স্প্রিন্ট না।"
কে ঠিক বলছে?
সবাই ঠিক বলছে। কেউই ঠিক বলছে না।
জাহিদ Reddit-এও গেল। r/bangladesh। কেউ পোস্ট করেছে: "HSC result is out. My GPA is 4.00. What are my options?" কমেন্টে একজন লিখেছে: "Bro, relax. GPA is just a number. Admission test is what matters." আরেকজন লিখেছে: "4.00 means you can't even apply for most public universities. Sorry bro."
Sorry bro।
দুইটা কমেন্ট, দুইটা বিপরীত কথা। জাহিদ দুটোই বিশ্বাস করতে চায়। দুটোই বিশ্বাস করা যায় না।
৯
মিম এসেছে ঘরে।
ক্লাস এইটে পড়ে মিম। জাহিদের ছোট বোন। মিমের হাতে মায়ের ফোন।
"ভাইয়া, একটা সেলফি তুলি?"
জাহিদ তাকাল। "কেন?"
"Facebook-এ দেব। ক্যাপশন দেব, আমার ভাইয়া HSC পাস করেছে।"
"GPA লিখবি?"
মিম একটু ভাবল। "লিখব না। শুধু লিখব পাস করেছে। তাহলেই তো হলো।"
জাহিদ মিমের দিকে তাকাল। চৌদ্দ বছরের মেয়ে। কিন্তু বুদ্ধিটা আঠারো বছরের ভাইয়ের চেয়ে বেশি। GPA না লিখলে কেউ জিজ্ঞেস করবে না, কারণ পোস্টটা মিমের, জাহিদের না। মিম ভাইয়াকে নিয়ে গর্বিত, এটুকুই দেখাবে।
"আয়, তুল।"
মিম জাহিদের পাশে বসল। ফোনটা উঁচু করে ধরল। জাহিদ হাসল।
হাসিটা আসল। মিমের পাশে বসলে হাসি আসে। কিন্তু হাসিটা পুরো না। হাসির ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। সেই ফাঁকা জায়গার মাপ 0.83, যেটুকু হলে 5.00 হতো।
ক্লিক।
ছবিটা দেখল। দুজনে পাশাপাশি। মিম হাসছে, দাঁত বের করে। জাহিদও হাসছে, ঠোঁট বন্ধ করে। দুটো হাসি, দুটো রকম। একটা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে না এখনো, আরেকটা ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না।
মিম পোস্ট দিল: "আমার ভাইয়া HSC পাস করেছে। প্রাউড সিস্টার।"
লাইক আসল ২৩টা। মিমের বন্ধুরা। কেউ GPA জিজ্ঞেস করল না।
১০
রাত হয়ে এসেছে।
জাহিদ শেষবারের মতো Facebook স্ক্রল করছে। সোনালী পোস্টের বন্যা একটু কমেছে। এখন মিম শুরু হয়েছে। কেউ পোস্ট করেছে: "GPA 5.00 পেয়ে বাবার কাছে বাইক চাইলাম, বাবা বললেন বাসে যাও।" কেউ লিখেছে: "GPA 2.00 পেলে বাবা মারে, 5.00 পেলে বাবা কান্দে, মাঝখানে কোনো ইমোশন নাই।"
জাহিদ মিমগুলোতে হাসল। এটা Facebook-এর নিয়ম। প্রথমে আবেগ, তারপর হাসি, তারপর ভুলে যাওয়া। আগামীকাল এই নিউজফিড অন্য কিছু দিয়ে ভরে যাবে।
কিন্তু জাহিদের 4.17 ভরে যাবে না। সেটা থাকবে।
স্ক্রল করতে করতে একটা বিজ্ঞাপন এল।
"সফল ভর্তি কোচিং, ঢাকা। HSC-এর পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ব্যাচ শুরু ১ এপ্রিল। ফি: ৪৫,০০০ টাকা।"
৪৫,০০০ টাকা।
জাহিদ সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে রইল। বাবার দুই মাসের আয়ের চেয়ে বেশি। মায়ের নয় মাসের সেলাই। রাকিব ভাইয়ের নয় মাসের বেতন।
বিজ্ঞাপনটা কেন তার কাছে এল? কারণ সে আজ সারাদিন "GPA", "ভর্তি পরীক্ষা", "HSC রেজাল্ট" সার্চ করেছে। অ্যালগরিদম তার প্রতিটা ক্লিক ট্র্যাক করেছে। প্রতিটা স্ক্রল, প্রতিটা থামা, প্রতিটা সার্চ। অ্যালগরিদম জানে জাহিদ চিন্তিত। অ্যালগরিদম জানে জাহিদের ভর্তি কোচিং দরকার। অ্যালগরিদম জানে জাহিদের পকেটে টাকা নেই।
তবু বিজ্ঞাপনটা দেখাচ্ছে। কারণ অ্যালগরিদমের কাজ বিক্রি করা, সমাধান দেওয়া নয়।
জাহিদ ফোনটা বন্ধ করল।
অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে। পাশের ঘরে মিম ঘুমিয়ে গেছে। বাবা এখনো ফেরেনি, রাতের শিফটে CNG চালাচ্ছে। মা রান্নাঘরে কিছু একটা গুছাচ্ছে, বাসনের আওয়াজ আসছে।
ফোনের স্ক্রিন বন্ধ, কিন্তু জাহিদের মাথার স্ক্রিন বন্ধ হচ্ছে না। সেখানে এখনো স্ক্রল হচ্ছে। সোনালী পোস্ট, রাসেলের ২,০৪৭ লাইক, সুমাইয়ার দুঃখ, ফারুকের নীরবতা, আরিফের জাপান, আর একটা সংখ্যা যেটা সে কাউকে বলতে পারছে না:
৪৫,০০০ টাকা।
অ্যালগরিদম তার ভবিষ্যৎ জানে। জাহিদ এখনো জানে না।