চায়ের কাপে দশটা স্বপ্ন
পাঁচজন বন্ধু, পাঁচটা রাস্তা, একটা টং দোকান
১
কলেজের গেটের পাশে, ড্রেনের ওপর তিনটা তক্তা পেতে, টিনের চাল দিয়ে যে টং দোকানটা বসেছে, সেটার নাম "বিসমিল্লাহ টি স্টল"। নামটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে, কিন্তু সাইনবোর্ডের অর্ধেক অক্ষর মুছে গেছে। এখন শুধু "বিসমি...টি স্ট" পড়া যায়। কেউ কিছু মনে করে না। এখানে সাইনবোর্ড পড়ে কেউ চা খেতে আসে না। আসে গন্ধে।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। আকাশে মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে একটু আগে। দোকানের সামনে দুটো কাঠের বেঞ্চ। বেঞ্চের রঙ এককালে নীল ছিল, এখন ধূসর। একটা বেঞ্চে জাহিদ, রাসেল, ফারুক। অন্যটায় সুমাইয়া আর আরিফ। সুমাইয়া বেঞ্চের একদম কোনায় বসেছে। ওর আর আরিফের মাঝে দুই ফুট ফাঁকা জায়গা। এই দুই ফুট বাংলাদেশের সামাজিক দূরত্বের সবচেয়ে সৎ পরিমাপ।
চা আসেনি এখনো। কিন্তু চায়ের গন্ধ আসছে। আদা, এলাচ, চিনি, আর পোড়া দুধের মিশ্রণ। এই গন্ধটা বাংলাদেশের যেকোনো টং দোকানে একই রকম। যেন একটা গোপন রেসিপি আছে, যেটা সব চা-ওয়ালা জন্মের সময় পেয়ে যায়।
চুলার ওপর কালো কেতলি। কেতলির মুখ থেকে বাষ্প উঠছে। চা-ওয়ালা কাদের চাচা কেতলির পাশে দাঁড়িয়ে, একটা লম্বা চামচ দিয়ে নাড়ছেন। কাদের চাচার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় টুপি, গালে পাকা দাড়ি, শরীর শুকনো। হাতের আঙুলগুলো লম্বা আর চিকন, যেন কোনো হারমোনিয়াম বাদকের হাত। কিন্তু এই হাত সারাজীবন চা বানিয়েছে, হারমোনিয়াম বাজায়নি।
দোকানের কোণায় একটা পুরনো টেলিভিশন। স্ক্রিনে ক্রিকেট চলছে। বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা। সাকিব ব্যাট করছে। কমেন্টেটর চিৎকার করছে, কিন্তু আওয়াজ কমিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে ক্রিকেট দেখার চেয়ে আড্ডা মারাটা বেশি জরুরি। ক্রিকেট শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।
"পাঁচ কাপ লিকার," রাসেল বলল।
"আমার দুধ চা," সুমাইয়া বলল।
"লিকার খা। দুধ চা মেয়েদের চা।"
"দুধ চা মেয়েদের চা, এটা কোন বইতে লেখা? মেডিকেলে পড়ে তুই এসব ভাঙবি।"
রাসেল হাসল। "মেডিকেলে পড়ার আগে BUET-এ পড়তে হবে। সেটা আগে হোক।"
"তোর BUET আর আমার মেডিকেল এক জিনিস না।"
"একই জিনিস। দুইটাই কিডনি বেচে পড়তে হয়।"
কাদের চাচা চা ঢালতে শুরু করলেন। ছোট ছোট কাচের কাপে। উঁচু থেকে ঢালছেন, যেন ঝর্ণা পড়ছে। এটা চা-ওয়ালাদের শিল্প। কেউ শেখায় না, নিজে নিজে আসে। প্রতিটা কাপে চায়ের রঙ একই, একটু গাঢ়, একটু লাল। সুমাইয়ার কাপে দুধ বেশি, রঙ হালকা।
জাহিদ কাপটা হাতে নিল। গরম। আঙুল পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু টং দোকানের চা গরম গরম না খেলে মজা নেই। এটা একটা অলিখিত নিয়ম।
২
প্রথম চুমুকটা নেওয়ার পর একটু চুপচাপ। চায়ের প্রথম চুমুক পবিত্র। এই সময় কেউ কথা বলে না। তারপর ফারুক কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, "তো?"
"তো কী?" আরিফ বলল।
"তো মানে, এখন কী? রেজাল্ট তো হয়ে গেল। এরপর কী?"
এই প্রশ্নটা সারাদিন ধরে বাতাসে ভাসছিল। কেউ জোরে বলেনি। এখন ফারুক বলে ফেলল। ফারুকের সুবিধা হলো, ও বুঝে না কোন কথা বলা উচিত আর কোনটা না। সব কথা বলে ফেলে। কখনো কখনো এটা সমস্যা, কখনো কখনো সুবিধা।
রাসেল প্রথম বলল। রাসেল সবসময় প্রথম বলে। এটা 5.00 পাওয়া ছেলেদের অভ্যাস। তারা জানে তাদের উত্তরটা সবচেয়ে ভালো, তাই আগে বলে ফেলে।
"BUET। ইলেকট্রিক্যাল। এটা ছাড়া কিছু ভাবছি না।"
"ভাবছ না, নাকি ভাবার দরকার নাই?" ফারুক জিজ্ঞেস করল।
"দুইটাই।" রাসেল চায়ে চুমুক দিল। "5.00 পেয়েছি। চান্স না পেলে কেউ পায় না।"
এটা ঠিক। রাসেলের কথায় অহংকার আছে, কিন্তু মিথ্যা নেই। ছেলেটা সত্যিই পড়ে। সারাদিন পড়ে। পরীক্ষার আগে রাতে ঘুমায় না, কিন্তু সেটা দুশ্চিন্তায় না, পড়তে গিয়ে সময় পায় না বলে। রাসেলের পৃথিবীটা সরল রেখা। পয়েন্ট A থেকে পয়েন্ট B। মাঝখানে কোনো বাঁক নেই। জাহিদ মাঝে মাঝে ভাবে, এত সরল জীবন কেমন লাগে? বোরিং না? রাসেল বোধহয় বোরিং শব্দটাই চেনে না।
সুমাইয়া বলল, "মেডিকেল। ঢাকা মেডিকেলে পড়ব।"
"ঢাকা মেডিকেলেই কেন? অন্য কোথাও না?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"বাবা ডাক্তার চায়। আমিও চাই। ঢাকা মেডিকেল সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে ভালো জায়গায় পড়ব।"
সুমাইয়ার কথায় একটা স্থিরতা আছে। যেন সে এই সিদ্ধান্ত জন্মের আগেই নিয়ে রেখেছে। 4.83 দিয়ে মেডিকেল চান্স পাওয়া কঠিন না, কিন্তু সহজও না। কোচিং লাগবে। কোচিংয়ে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার। বই কিনতে আরো কয়েক হাজার। সুমাইয়ার বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মাস মাইনে পঁচিশ হাজারের মতো। সুমাইয়ার দুই ভাই আরো পড়ছে। খরচ সামলানো সহজ না। কিন্তু সুমাইয়া এসব নিয়ে কথা বলে না। শুধু বলে, "পড়ব। হয়ে যাবে।"
জাহিদ ভাবল, "হয়ে যাবে" বলাটা একটা ক্ষমতা। সবাই পারে না।
তারপর আরিফ। আরিফ একটু সময় নিল। চায়ের কাপটা দুই হাতে ধরে, ভেতরে তাকিয়ে রইল, যেন চায়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ লেখা আছে।
"জাপান।"
"জাপান?" ফারুক চোখ বড় করল।
"হ্যাঁ। জাপান যাবো। কাজ করব। পড়ব। দালাল ঠিক করেছি। আট লাখ লাগবে।"
চুপচাপ। আট লাখ টাকা। এই টেবিলে বসা পাঁচজনের কারো বাবার বার্ষিক আয় আট লাখ না। আরিফের বাবা মুদি দোকান চালান। মাসে পনেরো-কুড়ি হাজার আসে। আট লাখ মানে তিন-চার বছরের পুরো আয়।
"টাকা কোথায় পাবি?" রাসেল জিজ্ঞেস করল।
"জমি বিক্রি করবে বাবা। গ্রামে একটু জমি আছে। আর কিছু ধার করবে।"
"জমি বিক্রি?" সুমাইয়ার গলায় উদ্বেগ। "যদি কাজ না হয়?"
আরিফ চায়ে চুমুক দিল। "হবে। ওখানে কাজ আছে। দালাল বলেছে ফ্যাক্টরিতে কাজ দেবে। মাসে দেড় লাখ। দুই বছরে টাকা উঠে যাবে।"
"দালাল বলেছে," রাসেল বলল। শুধু এইটুকু। কিন্তু এই তিনটা শব্দে যে সন্দেহ আছে, সেটা সবাই বুঝল।
আরিফও বুঝল। মুখ শক্ত করে বলল, "তোর সব BUET দিয়ে হবে। আমার হবে না। আমাকে অন্য রাস্তা খুঁজতে হবে।"
কেউ কিছু বলল না। টেলিভিশনে সাকিব একটা চার মারল। কমেন্টেটর চিৎকার করল।
৩
ফারুকের পালা।
ফারুক কাপটা প্লেটের ওপর রাখল। ও প্লেটে চা ঢেলে খায়। এটা গ্রামের অভ্যাস। ফারুক গ্রাম থেকে এসেছে, অভ্যাসটা রেখে দিয়েছে।
"পলিটেকনিক। ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রিক্যাল।"
"তুই তো সায়েন্স পড়ছিলি," জাহিদ বলল।
"পড়ছিলাম। 3.80 পেয়েছি। এই দিয়ে ভালো কোথাও চান্স পাব না। বাবা বলল পলিটেকনিকে ভর্তি হ। হাতের কাজ শিখব। চাকরি পাব।"
"তোর ইচ্ছা কী?" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল।
ফারুক একটু ভাবল। তারপর হাসল। হাসিটা অদ্ভুত। খুশির না, কষ্টেরও না। একটা চেনা হাসি। যারা নিজের ইচ্ছা জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি, তাদের হাসি এমন হয়।
"ইচ্ছা? ইচ্ছা তো অনেক কিছু। কিন্তু ইচ্ছায় তো ভর্তি ফি দেওয়া যায় না।"
চুপ।
ফারুকের বাবা ইলেকট্রিশিয়ান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়্যারিং করেন। মাসে কতো আসে ফারুক কোনোদিন বলেনি। কিন্তু ও কখনো দশ টাকার চায়ের বদলে বিশ টাকার চা খায় না, এটা দিয়ে অনুমান করা যায়।
তারপর সবাই জাহিদের দিকে তাকাল।
জাহিদ জানত এই মুহূর্তটা আসবে। সারাক্ষণ জানত। চা খেতে আসার আগে থেকে জানত। কিন্তু প্রস্তুত ছিল না। কারণ প্রস্তুত হতে গেলে একটা উত্তর লাগে, আর তার কোনো উত্তর নেই।
"আমি..." জাহিদ চায়ের কাপে তাকাল। চায়ের রঙ গাঢ় বাদামি। ভেতরে নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে, অস্পষ্ট। "আমি চিন্তা করছি।"
"মানে? কী চিন্তা করছিস?" রাসেল।
"মানে, ঠিক করিনি এখনো।"
"4.17 পেয়েছিস। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনার্স হবে। কোন সাবজেক্টে পড়বি ঠিক কর।"
"সেটাই তো চিন্তা করছি।"
রাসেল কিছু বলতে গিয়ে থামল। রাসেল মাঝে মাঝে থামতে পারে। এটা তার একটা গুণ।
আরিফ বলল, "জাপান চল। দুইজনে গেলে ভালো। দালালও কম নেবে।"
"আট লাখ কোত্থেকে আনব?"
"জমি?"
"জমি নাই।"
ফারুক বলল, "পলিটেকনিকেও আসতে পারিস। হাতের কাজ শিখলে লস নাই।"
সুমাইয়া কিছু বলল না। শুধু জাহিদের দিকে তাকাল। সুমাইয়ার চোখে একটা জিনিস আছে যেটা অন্যদের নেই। সহানুভূতি না। সমবেদনাও না। সেটা হলো বোঝাপড়া। সুমাইয়া বোঝে যে "চিন্তা করছি" মানে "আমি জানি না" না। মানে "আমার সামনে এত রাস্তা আছে যে কোনটায় যাব বুঝতে পারছি না।" অথবা, "আমার সামনে কোনো রাস্তাই নেই।" দুইটার মধ্যে পার্থক্য বোঝা কঠিন।
৪
কাদের চাচা দ্বিতীয় রাউন্ড চা আনলেন। কেউ অর্ডার করেনি। কাদের চাচা বোঝেন কখন দ্বিতীয় রাউন্ড দরকার। এটা পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা।
চা রাখতে গিয়ে কাদের চাচা বললেন, "কই যাবা তোরা?"
"কেন চাচা?" রাসেল বলল।
"এমনি। শুনতেছিলাম।" কাদের চাচা বেঞ্চের একপাশে বসলেন। কেউ মানা করল না। টং দোকানে চা-ওয়ালার বসার অধিকার সবার ওপরে।
"তোরা কলেজ পাস করছস। ভালো। আমার ছেলেও পাস করছিল।"
"আপনার ছেলে কী করে?" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল।
কাদের চাচা একটু চুপ করলেন। চুপটা একটু বেশি লম্বা হলো। তারপর বললেন, "কিছু করে না।"
"মানে?"
"মানে, কিছু করে না। BBA পড়ছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। তিন বছর আগে পাস করছে। এখনো চাকরি হয়নি।"
চুপ।
"আমি চা বেচে তারে পড়াইছিলাম। কোচিং দিছি। বই কিনে দিছি। পরীক্ষার ফি দিছি। বউরে বলছিলাম, ছেলে পড়াশোনা শিখলে আমাদের আর চা বেচতে হবে না।" কাদের চাচা হাসলেন। এই হাসিটাও ফারুকের হাসির মতো। "এখন ছেলে ঘরে বসে আছে। সিভি দেয়। ইন্টারভিউ দেয়। হয় না। বলে, জব মার্কেট খারাপ। আমি বলি, জব মার্কেট কবে ভালো ছিল?"
কেউ কিছু বলল না।
কাদের চাচা উঠে দাঁড়ালেন। কেতলির দিকে তাকালেন। বললেন, "পড়াশোনা ভালো জিনিস। কিন্তু পড়াশোনা করলেই জীবন ভালো হয়, এটা মিথ্যা কথা। জীবন ভালো হয় ভাগ্যে, আর ভাগ্য কারো হাতে নাই।"
তারপর চলে গেলেন চুলার কাছে। আরেকটা অর্ডার এসেছে। পাশের টেবিলে দুজন রিকশাওয়ালা বসেছে। তাদেরও চা লাগবে।
পাঁচজন বন্ধু চুপ করে বসে রইল।
টেলিভিশনে সাকিব আউট হলো। ক্যাচ। কমেন্টেটর হতাশ গলায় কিছু বলল। পাশের টেবিলে একজন রিকশাওয়ালা বলল, "শালা এই বলে আউট হয়? দেশটারে খাইল।"
আরিফ হঠাৎ বলল, "চাচার ছেলে BBA পড়ে বেকার। আমি HSC পাস করে জাপান যাচ্ছি। কে বেশি বুদ্ধিমান?"
রাসেল বলল, "তুই বুদ্ধিমান না, তুই ডেসপারেট। দুইটা আলাদা জিনিস।"
"ডেসপারেট মানুষ বেশি পরিশ্রম করে। বুদ্ধিমান মানুষ বেশি চিন্তা করে। চিন্তা করে কেউ ভাত খায় না।"
রাসেল কিছু বলল না। জাহিদ লক্ষ্য করল, আজ রাসেল অনেকবার চুপ হয়ে যাচ্ছে। 5.00 পেয়েও চুপ হয়ে যাচ্ছে। কাদের চাচার কথাটা কি লাগছে? হয়তো। BBA পড়ে বেকার। ইলেকট্রিক্যাল পড়ে? সিভিল পড়ে? BUET থেকে পড়ে? রাসেল হয়তো প্রথমবার ভাবছে, 5.00 কি সত্যিই যথেষ্ট?
সুমাইয়া বলল, "চাচার কথা পুরোপুরি ঠিক না। পড়াশোনা করলে সুযোগ বাড়ে। সুযোগ মানেই চাকরি না, কিন্তু সুযোগ ছাড়া কিছু হয় না।"
ফারুক বলল, "সুযোগ তো সবার সমান না।"
"না। সমান না। কিন্তু শূন্যের চেয়ে অসমান সুযোগ ভালো।"
এই কথাটা ভারী। কাঠের বেঞ্চে বসে, দশ টাকার চা খেতে খেতে, এই কথাটা আরো ভারী।
৫
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হচ্ছে। আকাশে তারা উঠতে শুরু করেছে। দু-একটা। তারপর আরো কয়েকটা। শহরের আলোয় তারা সব দেখা যায় না, কিন্তু কিছু দেখা যায়।
চা শেষ। কাপগুলো খালি। কাদের চাচা কাপ নিয়ে গেলেন। প্লাস্টিকের বালতিতে ডুবিয়ে ধুলেন। গরম পানি না, ঠান্ডা পানি। স্বাস্থ্যবিধি টং দোকানে খাটে না। কিন্তু কেউ অসুস্থ হয় না। টং দোকানের চায়ে একটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে, এটা জাহিদের বিশ্বাস।
"চলি?" আরিফ উঠে দাঁড়াল।
সবাই উঠল। ফারুক হিসাব করল। পাঁচ কাপ লিকার, এক কাপ দুধ চা, দ্বিতীয় রাউন্ড। মোট একশো বিশ টাকা। মাথাপিছু চব্বিশ টাকা। ফারুক সবসময় হিসাব করে। ও ভাগ করতে পারে। জীবনের অনেক কিছু ভাগ করতে পারে না, কিন্তু চায়ের বিল ভাগ করতে পারে।
জাহিদ পকেটে হাত দিল। পঁচিশ টাকা বের করল। একটা কুড়ি, একটা পাঁচ। পাঁচ টাকার নোটটা ছেঁড়া। একটা কোণা স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো। এই নোটটা কাদের চাচা নেবেন কিনা সন্দেহ। কাদের চাচা নিলেন। টং দোকানে ছেঁড়া নোট চলে। এটাও একটা অলিখিত নিয়ম।
রাসেল বের হলো আগে। বলল, "কাল থেকে অ্যাডমিশন কোচিং শুরু। আটটায়। কেউ আসতে চাইলে বলিস।"
সুমাইয়া বলল, "আমারও কাল থেকে। আলাদা কোচিং।"
আরিফ বলল, "আমার কাল দালালের সাথে দেখা। পাসপোর্ট।"
ফারুক বলল, "আমার ভর্তির ফর্ম তুলতে হবে। পলিটেকনিকে।"
জাহিদ কিছু বলল না।
সবাই হাঁটতে শুরু করল। রাসেল আর সুমাইয়া একদিকে, ফারুক অন্যদিকে, আরিফ আরেকদিকে। চারটা রাস্তা চারদিকে চলে গেল। জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল একটু। তারপর নিজের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তায় আলো কম। ল্যাম্পপোস্ট আছে, কিন্তু দুটোর মধ্যে একটা নষ্ট। যেটা জ্বলছে, সেটাও হলুদ আর ক্লান্ত। পোকা উড়ছে আলোর চারপাশে। জাহিদ হাঁটছে।
সবার একটা পরিকল্পনা আছে। রাসেলের BUET। সুমাইয়ার মেডিকেল। আরিফের জাপান। ফারুকের পলিটেকনিক। পরিকল্পনা ভালো কি খারাপ সেটা পরের কথা, কিন্তু একটা আছে। একটা দিক আছে। একটা দরজা আছে যেদিকে হাঁটতে হবে।
জাহিদের কোনো দরজা নেই। শুধু দেয়াল। দেয়ালগুলো দেখতে দরজার মতো, কিন্তু ধাক্কা দিলে খোলে না।
4.17।
এই সংখ্যাটা কিছুর জন্য যথেষ্ট, কিন্তু কোনোকিছুর জন্য যথেষ্ট না। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়া যায়। কিন্তু কোন সাবজেক্টে? অর্থনীতি? সমাজবিজ্ঞান? হিসাববিজ্ঞান? প্রতিটা সাবজেক্টের নাম শুনলে কিছু একটা অনুভব হওয়া উচিত। উৎসাহ, কিংবা আগ্রহ, কিংবা অন্তত কৌতূহল। জাহিদের কিছু হয় না। শূন্য।
কাদের চাচার কথাটা কানে বাজছে। "আমার ছেলে BBA পড়ে এখন বেকার।" তিন বছর। তিন বছর ধরে সিভি দিচ্ছে। তিন বছর ধরে বাবা চা বেচছে।
জাহিদের বাবা CNG চালায়। পনেরো হাজার আসে। মা সেলাই করে। পাঁচ হাজার। রাকিব গার্মেন্টসে। পাঁচ হাজার। মোট পঁচিশ হাজার। এই পঁচিশ হাজার থেকে জাহিদের পড়ার খরচ বের করতে হবে। ভর্তি ফি, কোচিং, বই, যাতায়াত। আর জাহিদ যদি কাদের চাচার ছেলের মতো তিন বছর বেকার থাকে?
মাথার ওপরে আকাশ। তারা। অনেক তারা। শহরের আলো থেকে একটু দূরে এলে তারা দেখা যায়। প্রতিটা তারা একটা সম্ভাবনা। অথবা একটা মৃত তারা, যেটা কোটি বছর আগে নিভে গেছে, শুধু আলোটা এখনো আসছে। এখান থেকে বোঝা যায় না কোনটা জ্বলছে আর কোনটা নিভে গেছে।
রাসেলের একটা টানেল আছে, টানেলের শেষে BUET। সুমাইয়ার একটা সিঁড়ি আছে, সিঁড়ির ওপরে মেডিকেল। আরিফের একটা জাহাজ আছে, জাহাজের গন্তব্য জাপান। ফারুকের একটা ওয়ার্কশপ আছে, ওয়ার্কশপে তার আর সোল্ডারিং আয়রন।
জাহিদের কিছু নেই। শুধু একটা প্রশ্ন।
কিন্তু জাহিদ আজ সন্ধ্যায় একটা জিনিস বুঝল। সবার পরিকল্পনা আছে, কিন্তু কারো পরিকল্পনা নিশ্চিত না। রাসেলের BUET নিশ্চিত না। সুমাইয়ার মেডিকেল নিশ্চিত না। আরিফের জাপান সবচেয়ে কম নিশ্চিত। ফারুকের পলিটেকনিক নিশ্চিত, কিন্তু সেটা ফারুকের ইচ্ছা না, বাবার সিদ্ধান্ত। আর কাদের চাচার ছেলের পরিকল্পনা ছিল, সেটা কাজ করেনি।
তাহলে পরিকল্পনা না থাকাটা কি সত্যিই সমস্যা? নাকি পরিকল্পনা থাকাটাই একটা ভ্রম? মানুষ পরিকল্পনা করে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য। নিজেকে বলে, "আমি জানি আমি কোথায় যাচ্ছি।" কিন্তু কেউ জানে না। কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে।
জাহিদ জানে না। কিন্তু জাহিদ অন্তত সেটা স্বীকার করছে। এটাই হয়তো একমাত্র সততা যেটা তার আছে।
বাসা এসে গেল। গেটের সামনে দাঁড়াল। ভেতর থেকে টেলিভিশনের আওয়াজ। মিম দেখছে। বাবা এখনো ফেরেননি, CNG নিয়ে বের হয়ে আছেন। মা হয়তো সেলাই করছেন, নাহলে রান্নায় ব্যস্ত।
জাহিদ একবার পেছনে ফিরে তাকাল। আকাশের দিকে। তারা। একটা, দুটো, তিনটা, অসংখ্য।
প্রতিটা তারা একটা সম্ভাবনা। অথবা একটা ডেড এন্ড।
এখান থেকে বোঝা যায় না।
জাহিদ ভেতরে ঢুকল।