কোচিং সেন্টারের মধু

৪৫ হাজার টাকায় আশা বিক্রি হয়, কিন্তু ক্রেতা জানে না দামটা ন্যায্য কি না

পর্ব ৮ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রেজাল্টের তৃতীয় দিন।

জাহিদের ফোনটা বাজল দুপুর বারোটায়। অচেনা নম্বর। ঢাকার নম্বর, ০১৭ দিয়ে শুরু। জাহিদ ধরল না। কেটে দিল। আবার বাজল। আবার কাটল। তৃতীয়বার বাজলে ধরল, কারণ তিনবার ফোন করলে মানুষটা হয়তো জরুরি কিছু বলতে চায়।

"আসসালামু আলাইকুম। আমি স্টার একাডেমি কোচিং সেন্টার থেকে বলছি। আপনি কি জাহিদুল ইসলাম?"

জাহিদ থামল। সে কখনো এই নামে কোথাও ফোন নম্বর দেয়নি। কোনো ফর্ম পূরণ করেনি। কোনো ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করেনি। তাহলে এরা তার নম্বর পেল কীভাবে? তার নাম পেল কীভাবে? তার রেজাল্ট জানে কীভাবে?

"আপনি HSC-তে GPA 4.17 পেয়েছেন, তাই না? অভিনন্দন। আমাদের ভর্তি কোচিং প্রোগ্রামে ভর্তি হলে আপনার জন্য বিশেষ ছাড় আছে।"

জাহিদের মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে। এরা তার রেজাল্ট জানে। মানে কেউ তাদের বলেছে। কে বলেছে? বোর্ড? স্কুল? নাকি ডেটা কেনাবেচা হয়?

"ভাই, আমার নম্বর কোত্থেকে পেলেন?"

ওপাশে একটু চুপ। তারপর হাসি। পেশাদার হাসি, যেটা কলসেন্টারে শেখানো হয়।

"ভাই, আমরা শিক্ষা বোর্ডের রেজাল্ট থেকে মেধাবী ছাত্রদের খুঁজে বের করি। আপনার ভালোর জন্যই।"

জাহিদ ফোন কাটল।

বিকেলের মধ্যে আরো তিনটা কোচিং সেন্টার থেকে ফোন এলো। তিনটা আলাদা নম্বর। তিনটা আলাদা নাম। কিন্তু স্ক্রিপ্ট একই। "অভিনন্দন।" "বিশেষ ছাড়।" "সীমিত আসন।" "আগামী সপ্তাহের মধ্যে ভর্তি না হলে আসন শেষ হয়ে যাবে।"

একুশ লাখ ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। এদের প্রত্যেকের ফোনে এরকম কল যাচ্ছে। মানে কোথাও একটা ডাটাবেস আছে। নাম, রোল, GPA, ফোন নম্বর। কেউ এই ডাটাবেস বানিয়েছে। কেউ বিক্রি করেছে। কেউ কিনেছে। প্রতিটা নম্বরের একটা দাম আছে। জাহিদের ফোন নম্বরটাও একটা পণ্য।

সে জানে না দাম কত। হয়তো এক টাকা। হয়তো পাঁচ টাকা। কিন্তু একুশ লাখ গুণ পাঁচ টাকা মানে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। শুধু ফোন নম্বর বেচে।

পরদিন সকালে জাহিদ গেল কোচিং সেন্টারে। যেটা সবচেয়ে কাছে, হাঁটা দূরত্বে। "মেধা কোচিং সেন্টার।" নাম শুনে মনে হয় গম্ভীর প্রতিষ্ঠান। আসলে একটা পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় দুটো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চালানো হয়।

বাইরে ব্যানার। বড় করে লেখা: "আমাদের ৩৫% ছাত্র ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পায়!"

জাহিদ ব্যানারটার দিকে তাকিয়ে রইল। পঁয়ত্রিশ শতাংশ। মানে একশো জনের মধ্যে পঁয়ত্রিশ জন। মানে বাকি পঁয়ষট্টি জন চান্স পায় না। পঁয়ষট্টি শতাংশ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। এরা টাকা দিয়ে, সময় দিয়ে, চার মাস খেটে, শেষে কিছু পায় না।

কিন্তু ব্যানারে লেখা ৩৫%। উজ্জ্বল হলুদ রঙে, বড় ফন্টে। যেন পঁয়ত্রিশ শতাংশ একটা বিশাল সংখ্যা। যেন এটা গর্বের কথা।

জাহিদ ভাবল, কোনো হাসপাতাল যদি বলত "আমাদের ৩৫% রোগী বেঁচে যায়!", কেউ কি সেখানে যেত?

ভেতরে ঢুকল।

রিসেপশনে একজন মেয়ে বসে আছে। সামনে একটা রেজিস্টার। দেয়ালে সফল ছাত্রদের ছবি। ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, বুয়েটে চান্স পেয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। প্রতিটা ছবিতে ছাত্রের মুখে হাসি, হাতে সার্টিফিকেট।

কয়টা ছবি? জাহিদ গুনল। আঠারোটা। আঠারোটা ছবি। তিন বছরের।

তিন বছরে আঠারোজন সফল। প্রতি বছরে ছয়জন। প্রতি ব্যাচে তিনশো ছাত্র ধরলে, তিন বছরে নয়শো। নয়শো থেকে আঠারো। দুই শতাংশ। ব্যানারে যে ৩৫% লেখা, সেটা কীভাবে হিসাব করেছে সেটা একটা রহস্য।

হয়তো "চান্স পায়" বলতে এরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজও ধরেছে। সেটা ধরলে হ্যাঁ, ৩৫% হতে পারে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে চান্স পেতে কোচিং লাগে না। সেটা তো এমনিতেই হয়। কোচিংয়ের কৃতিত্ব সেখানে কতটুকু?

"ভাই, একটু বসুন। স্যার আসছেন।"

জাহিদ বসল। পাশে আরো চারজন বসে আছে। সবার চোখে একই চেহারা। আশা, ভয়, এবং টাকার হিসাব।

একটা ছেলে, খুব সম্ভব জাহিদের বয়সী, ফিসফিস করে বলল, "তুই কোন সাবজেক্টে দিবি?"

"ঠিক করিনি।"

"মেডিকেল দে। মেডিকেলে পড়লে লাইফ সেট।"

জাহিদ কিছু বলল না। "লাইফ সেট" কথাটা সে গত তিনদিনে অন্তত বিশবার শুনেছে। যেন জীবন একটা সেটিং, একবার ঠিক করলে আর বদলায় না। যেন একটা পরীক্ষায় পাশ করলে বাকি জীবন নিজে থেকে চলে যাবে।

স্যার এলেন। মানে কোচিং সেন্টারের মালিক। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, হাতে একটা ফাইল।

"তোমাদের কে কে ভর্তি পরীক্ষার জন্য এসেছ?"

সবাই হাত তুলল।

"ভালো কথা। দেখো, ভর্তি পরীক্ষা হলো তোমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। HSC-র চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ HSC সবাই পাশ করে, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পায় মাত্র কয়েকজন। তোমরা সেই কয়েকজনের মধ্যে থাকতে চাও, তাই না?"

সবাই মাথা নাড়ল।

জাহিদ ভাবল, এটা একটা বিক্রির কৌশল। প্রথমে ভয় দেখাও। তারপর আশা দেখাও। তারপর দাম বলো।

স্যার বললেন, "চলো, ক্লাসরুমটা দেখো।"

ক্লাসরুম। শব্দটা বড়। বাস্তবটা ছোট।

একটা ঘর। মাপে হয়তো বিশ ফুট বাই ত্রিশ ফুট। আশিজনের বসার মতো জায়গা আছে। কিন্তু চেয়ার আছে দুইশোটা। প্লাস্টিকের চেয়ার, যেগুলো বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া হয়। সারি সারি, গাদাগাদি। দুইশো মানুষ এই ঘরে বসবে। চার মাস। প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা।

দেয়ালে একটা এসি আছে। বন্ধ। জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "এসি চলে?"

"চলে, চলে। গরমের সময় চালানো হয়।"

জাহিদ দেখল এসির পাইপ থেকে মরচে পড়ছে। সম্ভবত দুই বছর ধরে চালানো হয়নি। দুইশো মানুষের ঘামে ঘরটা কেমন হবে সেটা কল্পনা করতে জাহিদের কষ্ট হলো না।

সামনে একটা হোয়াইটবোর্ড। পুরনো। মার্কারের দাগ মুছে যায়নি। পাশে একটা মাইক, স্ট্যান্ডসহ। মানে শিক্ষক সামনে দাঁড়িয়ে মাইকে বলবেন, দুইশো মানুষ শুনবে। শেষের সারি থেকে বোর্ড দেখা যায় কি না জাহিদ পরীক্ষা করল। যায় না। শেষ পাঁচ সারি থেকে বোর্ডের লেখা পড়া অসম্ভব।

"স্যার, পেছনের দিক থেকে বোর্ড দেখা যায় না।"

"ওটা সমস্যা না। স্যার মাইকে বলবেন, শুনতে পাবে।"

শুনতে পাবে। দেখতে পাবে না। গণিত আর পদার্থবিদ্যা কি শুধু শুনে বোঝা যায়? সমীকরণ, চিত্র, গ্রাফ, এগুলো দেখতে হয়। কিন্তু স্যার বললেন শুনতে পাবে, তাই ঠিক আছে। স্যার বললে ঠিক।

"ফি কত, স্যার?"

এই প্রশ্নটা জাহিদ করল না। পাশের ছেলেটা করল। কিন্তু সবাই শুনতে চাইছিল।

"চার মাসের কোর্স। সপ্তাহে ছয়দিন, প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, বায়োলজি, ইংলিশ। পাঁচজন অভিজ্ঞ শিক্ষক। সাবজেক্ট-ভিত্তিক মডেল টেস্ট প্রতি সপ্তাহে।"

স্যার থামলেন। একটু সময় নিলেন। যেভাবে টেলিভিশনে পণ্যের দাম বলার আগে একটু সাসপেন্স তৈরি করা হয়।

"মোট ফি পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা।"

ঘরে নীরবতা। পাঁচটা মুখ একসাথে শক্ত হয়ে গেল।

পঁয়তাল্লিশ হাজার।

জাহিদ হিসাব করল। বাবার মাসিক আয় পনেরো হাজার। মায়ের পাঁচ হাজার। রাকিব ভাইয়ের পাঁচ হাজার। মোট পঁচিশ হাজার। এর থেকে বাড়ি ভাড়া, খাওয়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওষুধ বাদ দিলে মাসে হাতে থাকে হয়তো তিন-চার হাজার টাকা। পঁয়তাল্লিশ হাজার মানে বাবার তিন মাসের আয়। শুধু কোচিং। বিশ্ববিদ্যালয় না। থাকা-খাওয়া না। বই-খাতা না। শুধু কোচিং।

"দুই কিস্তিতে দেওয়া যাবে। প্রথম কিস্তি ভর্তির সময়, বাকিটা দুই মাস পরে।"

দুই কিস্তিতে। যেন কিস্তি করলে টাকা কমে যায়। যেন সাড়ে বাইশ হাজার টাকা সামান্য কিছু।

জাহিদ আরো একটা হিসাব করল। মাথার মধ্যে। এই ঘরে দুইশো চেয়ার। মানে প্রতি ব্যাচে দুইশো ছাত্র। দুইশো গুণ পঁয়তাল্লিশ হাজার মানে নব্বই লাখ টাকা। এক ব্যাচে। বছরে তিন ব্যাচ। তিন গুণ নব্বই মানে দুই কোটি সত্তর লাখ।

দুই কোটি সত্তর লাখ।

একটা কোচিং সেন্টারের। যেখানে দুটো ভাড়া ফ্ল্যাট, একটা ভাঙা এসি, কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার, আর একটা মাইক।

জাহিদ স্যারকে জিজ্ঞেস করল, "স্যার, এখানে যারা পড়ায় তারা কি শুধু এখানেই পড়ান?"

স্যার একটু হাসলেন। "না, না। আমাদের শিক্ষকরা অনেক অভিজ্ঞ। তারা অন্য কোচিং সেন্টারেও ক্লাস নেন।"

"কয়টায়?"

"সেটা তোমার জানার দরকার নেই। তারা যেখানেই পড়াক, এখানে এসে ভালো পড়ায়, সেটাই তোমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।"

জাহিদ পরে জানল, মেধা কোচিং সেন্টারের সেরা ফিজিক্সের শিক্ষক পাঁচটা কোচিং সেন্টারে পড়ান। সকাল আটটায় প্রথম ব্যাচ, সেটা অন্য জায়গায়। দশটায় দ্বিতীয়। দুপুরে মেধা কোচিং সেন্টারে। বিকেলে আরেকটায়। রাতে আরেকটায়। প্রতিদিন পাঁচটা ক্লাস। পাঁচটা আলাদা জায়গায়। মাঝে ট্রাফিকে সময় যায়। ক্লান্তি বাড়ে। পঞ্চম ক্লাসে তিনি যা পড়ান সেটা প্রথম ক্লাসের মতো হয় না। হওয়ার কথাও না। মানুষ মেশিন না।

কিন্তু ছাত্ররা সব ক্লাসে একই ফি দেয়। প্রথম ক্লাসের ছাত্রও পঁয়তাল্লিশ হাজার, শেষ ক্লাসের ছাত্রও পঁয়তাল্লিশ হাজার। মান আলাদা, দাম একই।

বাড়ি ফেরার পথে জাহিদ থামল একটা চায়ের দোকানে। চা খেতে না। মাথা ঠান্ডা করতে। পকেটে দশ টাকা ছিল, কিন্তু চা খেলে আট টাকা চলে যাবে। সে চা খেল না।

দোকানের পাশে একটা ছেলে বসে ছিল। কানে হেডফোন। ফোনের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখছে। জাহিদ উঁকি দিল। ফিজিক্স। ইউটিউবে একটা ভিডিও চলছে। বাংলায়। চ্যানেলের নাম "10 Minute School"।

ছেলেটা হেডফোন খুলল। জাহিদকে দেখে হাসল।

"ভর্তি পরীক্ষা?"

"হ্যাঁ।"

"কোচিং করবি?"

"জানি না। তুই?"

ছেলেটা হাসল। "না। আমি গত বছর চান্স পেয়েছি। জাহাঙ্গীরনগরে। অর্থনীতি। কোচিং ছাড়া।"

জাহিদ তাকাল। "সত্যি?"

"হ্যাঁ। ইউটিউব আর পাস্ট পেপার। ব্যস।"

ছেলেটার নাম মাহমুদ। তিন বছর আগে HSC পাশ করেছে। GPA ছিল 4.33। প্রথম বছর কোচিং করেছিল। পঁয়ত্রিশ হাজার দিয়ে। চান্স পায়নি। দ্বিতীয় বছর টাকা ছিল না। তখন ইউটিউবে পড়া শুরু করল।

"প্রথমে মনে হয়েছিল হবে না। কোচিংয়ে স্যার বলেন কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা না। ইউটিউবে সেটা বোঝা কঠিন। কিন্তু পাস্ট পেপার সলভ করতে করতে বুঝলাম, প্যাটার্ন আছে। একই ধরনের প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। সেগুলো ধরতে পারলেই হয়।"

"কত ঘণ্টা পড়তি?"

"দিনে আট-দশ ঘণ্টা। কিন্তু নিজের সময়ে, নিজের মতো। কোচিংয়ে পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকতাম, কিন্তু আসলে বুঝতাম দুই ঘণ্টার জিনিস। বাকি তিন ঘণ্টা শুধু বসে থাকা।"

"কোনো খরচ?"

"ইন্টারনেট বিল। মাসে তিনশো টাকা। আর কিছু না। সব ফ্রি।"

তিনশো টাকা। বনাম পঁয়তাল্লিশ হাজার। একশো পঞ্চাশ গুণ কম।

কিন্তু জাহিদ জানে ব্যাপারটা এত সহজ না।

সমস্যা হলো সমাজ। মানুষ। পরিবার। প্রতিবেশী।

"ইউটিউব দেখে কি চান্স হয়?"

এই প্রশ্নটা জাহিদ শুনবে। মা বলবে। বাবা বলবে। পাড়ার লোক বলবে। বিনামূল্যের জিনিস মানুষ বিশ্বাস করে না। যেটার দাম বেশি সেটা ভালো, এটা একটা ধারণা যেটা মানুষের মাথায় গেঁথে আছে। চল্লিশ টাকার চা আর দশ টাকার চা, মানুষ বলবে চল্লিশ টাকারটা ভালো। হয়তো ভালো, হয়তো না। কিন্তু দাম বেশি বলেই মানুষ ধরে নেয় ভালো।

কোচিং সেন্টার জানে এটা। তাই দাম বেশি রাখে। দাম কমালে মানুষ ভাববে মান খারাপ। পঁয়তাল্লিশ হাজার শুনলে মানুষ ভাবে, এত দাম মানে নিশ্চয়ই ভালো পড়ায়। পনেরো হাজার শুনলে ভাববে, সস্তা মানে খারাপ।

এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে price signaling। দাম নিজেই একটা সংকেত। ভালো-মন্দের নয়, বিশ্বাসের।

মাহমুদ বলল, "সেলফ-স্টাডির সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো ডিসিপ্লিন। কোচিংয়ে গেলে কেউ একটা সময়ে যেতে বলে, বসতে বলে, পড়তে বলে। সেটা না হলে নিজেকে নিজে বলতে হয়। আর নিজেকে বলাটা সবচেয়ে কঠিন।"

জাহিদ বুঝল।

কোচিং সেন্টার আসলে কী বিক্রি করে? জ্ঞান? না। জ্ঞান ইউটিউবে ফ্রি। তাহলে কী?

দুটো জিনিস: আশা আর কাঠামো।

আশা, কারণ মানুষ টাকা দিলে মনে করে কিছু একটা হবে। টাকা দেওয়াটাই একটা বিনিয়োগ, আর বিনিয়োগ করলে ফল আসবে, এই বিশ্বাস মানুষকে শান্তি দেয়। যদিও ফলটা অনিশ্চিত।

আর কাঠামো, কারণ কেউ বলে দেয় কখন কী পড়তে হবে। নিজে ভাবতে হয় না। নিজে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া সহজ।

কিন্তু এই আশা আর কাঠামোর দাম পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা?

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল জাহিদ।

বাবা বসে আছেন। CNG থেকে ফিরেছেন। গামছা দিয়ে মুখ মুছছেন। সারাদিনের ক্লান্তি মুখে। জাহিদ বাবার পাশে বসল।

"বাবা।"

"হুম।"

"আজকে কোচিং সেন্টারে গেছিলাম।"

বাবা তাকালেন। চোখে কিছু একটা জ্বলল। আশা? ভয়? দুটোর মিশ্রণ?

"কেমন?"

জাহিদ বলতে চাইল, খারাপ। দুইশো মানুষ এক ঘরে, ভাঙা এসি, দেখা যায় না বোর্ড, শিক্ষক পাঁচ জায়গায় দৌড়ান। কিন্তু বলল না। কারণ বাবা শুনতে চান চান্স পাওয়ার উপায়, সমস্যার তালিকা না।

"ঠিকই আছে।"

"কত লাগবে?"

এই প্রশ্নটা। এই তিনটা শব্দ। "কত লাগবে।" বাবা জিজ্ঞেস করছেন না কোচিং ভালো কি না, দরকার কি না, বিকল্প আছে কি না। বাবা শুধু জানতে চান কত টাকা। কারণ বাবার কাছে শিক্ষা মানে খরচ। এটুকুই বাবা বোঝেন। ছেলে পড়তে চায়, টাকা লাগবে, টাকা দিতে হবে। কীভাবে দেবেন সেটা বাবার সমস্যা, ছেলের না।

"পঁয়তাল্লিশ হাজার।"

নীরবতা।

বাবা কিছু বললেন না। মা কিছু বললেন না। রাকিব ভাই পাশের ঘরে, সে কিছু শুনল কি না জানা নেই।

জাহিদ বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবা মাথা নিচু করে বসে আছেন। গামছাটা হাতে ধরা। আঙুলগুলো গামছা মুচড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে।

পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা।

বাবার তিন মাসের আয়।

তিন মাস। মানে নব্বই দিন। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে CNG চালানো। ট্রাফিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা। যাত্রীর সাথে ভাড়া নিয়ে তর্ক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ধুলো খেয়ে। রাত দশটায় বাড়ি ফেরা। নব্বই দিনের প্রতিটা টাকা জমা করলে, শুধু তাহলেই পঁয়তাল্লিশ হাজার হয়। কিন্তু নব্বই দিন কি পরিবার না খেয়ে থাকবে? বাড়ি ভাড়া কে দেবে? বিদ্যুৎ বিল? ওষুধ?

বাবা বললেন, "দেখি।"

দেখি। মানে হ্যাঁও না, নাও না। মানে আমি চেষ্টা করব, কিন্তু পারব কি না জানি না। মানে আমি তোমাকে না বলতে পারছি না, কারণ তুমি আমার ছেলে, তোমার ভবিষ্যৎ আমার হাতে, আর আমার হাতে টাকা নেই।

"দেখি" শব্দটা পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার চেয়ে ভারী।

১০

রাতে জাহিদ ঘুমাতে পারল না।

বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্যান ঘুরছে। একটু একটু শব্দ করছে। পাশের ঘরে মায়ের সেলাই মেশিনের আওয়াজ। মা এত রাতেও সেলাই করছেন। একটা ব্লাউজ তৈরি করলে পান পঁচিশ টাকা। পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা মানে আঠারোশো ব্লাউজ।

আঠারোশো।

জাহিদ ফোন বের করল। ইন্টারনেটে সার্চ করল: "ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতি ফ্রি।"

প্রথম রেজাল্ট: 10 Minute School। ফ্রি ভিডিও। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, বায়োলজি, ইংলিশ। সব আছে।

দ্বিতীয় রেজাল্ট: Khan Academy বাংলা। বেসিক থেকে অ্যাডভান্সড।

তৃতীয়: পাস্ট পেপার আর্কাইভ। গত দশ বছরের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন। সমাধানসহ। ফ্রি।

সব ফ্রি।

তাহলে কোচিং সেন্টার কেন? মানুষ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা কেন দেয়? ফ্রি তো সব আছে?

কারণ ফ্রি জিনিসকে মানুষ বিশ্বাস করে না। কারণ ইউটিউবে পড়লে পাড়ার লোক বলবে "ইউটিউব দেখে ডাক্তার হওয়া যায় নাকি?" কারণ কোচিংয়ে ভর্তি হলে পরিবার মনে করে কিছু একটা করা হচ্ছে। কারণ টাকা দিলে মনে হয় দায়িত্ব পালন করা হয়েছে।

কোচিং সেন্টার বিক্রি করে মানসিক শান্তি। বাবা-মায়ের। "আমি আমার সন্তানের জন্য সবকিছু করেছি।" এই বাক্যটা বলতে পারার জন্য পঁয়তাল্লিশ হাজার।

জাহিদ ফোন রেখে দিল।

মাহমুদের কথা মনে পড়ল। "ইউটিউব আর পাস্ট পেপার। ব্যস।"

ব্যস।

কিন্তু বাবাকে কী বলবে? বাবা, টাকা লাগবে না? বাবা, আমি ফোনে পড়ব? বাবা, ফ্রিতে হবে?

বাবা বিশ্বাস করবেন? মা বিশ্বাস করবেন? পাড়ার লোক কী বলবে?

জাহিদ জানে উত্তর কী। কেউ বিশ্বাস করবে না। কারণ বিনামূল্যের জিনিসে বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ সবাই ভাবে, দাম না থাকলে দাম নেই।

সে চোখ বন্ধ করল।

পাশের ঘরে সেলাই মেশিনের আওয়াজ চলছে।

ঠক ঠক ঠক ঠক।

একটা ব্লাউজ, পঁচিশ টাকা। আরেকটা। আরেকটা। আঠারোশো বাকি।