সংখ্যা মিথ্যা বলে না
রাত গভীর হয়, জাহিদ ফোনের আলোয় খুঁজে পায় যে সংখ্যা আর ভাগ্য একই জিনিস না
১
ঘড়িতে রাত একটা বাজে।
বাসায় সবাই ঘুমিয়ে গেছে। বাবা মাগরিবের পর থেকে কথা বলেনি। মা রান্নাঘরে বসে মিমের স্কুলের ড্রেসের হাতা সেলাই করেছে, তারপর চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। রাকিব ভাই রাত দশটায় এসে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। মিম কবে ঘুমিয়েছে জাহিদ খেয়াল করেনি।
জাহিদ শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না।
ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ছাদে একটা টিকটিকি। টিকটিকিটা নড়ছে না। সেও জাহিদের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের কারোরই ঘুম নেই।
মাথার ভেতরে সংখ্যাটা ঘুরছে। 4.17। চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে এই সংখ্যাটা তার জীবনে ঢুকেছে। চব্বিশ ঘণ্টায় কতবার এটা শুনেছে সে গুনতে পারবে না। বাবার মুখে। মায়ের চোখে। চাচার ফোনে। পাড়ার লোকদের গলায়। রাসেলের বাবার হাসিতে। সুমাইয়ার চুপ থাকায়।
4.17। এটা একটা সংখ্যা। তিনটা অঙ্ক। একটা দশমিক। কিন্তু এই তিনটা অঙ্কে তার পুরো জীবনের রায় লেখা হয়ে গেছে।
জাহিদ পাশ ফিরল। বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ব্রাইটনেস কমালো।
ফেসবুকে ঢুকল। ভুল করেছে। টাইমলাইন ভরে আছে রেজাল্টের পোস্টে। "আলহামদুলিল্লাহ GPA 5.00", সাথে ফুলের ছবি। "গোল্ডেন A+ পেয়েছে আমার ছেলে", সাথে মিষ্টির বাক্সের ছবি। "ফেল করেছি, জীবন শেষ", সাথে কালো স্ক্রিন। একজন লিখেছে, "4.50 পেয়েছি, মেডিকেলের স্বপ্ন শেষ।" নিচে পঁচিশটা কমেন্ট, বেশিরভাগ সান্ত্বনা, কিছু উপদেশ, কিছু তিরস্কার।
জাহিদ ফেসবুক বন্ধ করল।
গুগলে লিখল: "GPA 5.00 পেলে কি জীবনে সফল হওয়া যায়?"
প্রথম কয়েকটা রেজাল্ট বিজ্ঞাপন। কোচিং সেন্টারের। "GPA 5.00 পেতে চাও? আমাদের সাথে যোগ দাও!" জাহিদ স্ক্রল করল। একটা ব্লগ পোস্ট পেল। পড়ল। কিছু বুঝল না। আরেকটা পড়ল। সেটাও ফাঁকা কথা।
তারপর একটা লিংক পেল। bdfacts.org।
জাহিদ ক্লিক করল।
২
পেজটা লোড হতে দুই সেকেন্ড লাগল। জাহিদের ফোন পুরনো, ইন্টারনেট ধীর। কিন্তু পেজ খুলল।
একটা চার্ট। আর কিছু সংখ্যা।
প্রথম যেটা চোখে পড়ল: GPA 5.00 প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। বাকি ৬০ শতাংশ পারে না।
জাহিদ লাইনটা আবার পড়ল। তারপর আরেকবার।
৬০ শতাংশ। দশজনের মধ্যে ছয়জন। GPA 5.00 পেয়েও পাবলিক ভার্সিটিতে ঢুকতে পারে না। তাহলে তারা কোথায় যায়? প্রাইভেট ভার্সিটি, যেখানে চার বছরে আট-দশ লাখ টাকা লাগে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ক্লাস হয় না? নাকি হারিয়ে যায়?
রাসেল 5.00 পেয়েছে। রাসেল কি জানে এই সংখ্যাটা? রাসেলের বাবা যিনি আজ মিষ্টি বিলিয়েছেন, তিনি কি জানেন যে তাঁর ছেলের সামনে একটা প্রতিযোগিতা আছে, যেখানে 5.00 পাওয়া ছেলেদের অর্ধেকের বেশিও জায়গা পায় না?
জাহিদ স্ক্রল করল।
আরেকটা তথ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ। স্নাতক পাস করা মানুষদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। মানে ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই। সাতজনের মধ্যে একজন। ডিগ্রি থাকলেই চাকরি, এই সমীকরণটা আর কাজ করে না।
জাহিদ ফোন নামিয়ে রাখল। ছাদের দিকে তাকাল। টিকটিকিটা চলে গেছে।
আবার ফোন তুলল। আরও পড়ল।
GPA 3.50 থেকে 4.00 পাওয়া ছেলেমেয়েদের কিছু গল্প পেল। একজন পলিটেকনিক পড়ে ফ্রিল্যান্সার হয়েছে, মাসে আশি হাজার টাকা আয় করে। একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং করে কারখানায় কাজ করে, বেতন পঁয়তাল্লিশ হাজার। একজন কৃষি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের মাছের খামার দিয়েছে। এরা কেউই গোল্ডেন পায়নি। এদের নিয়ে কেউ ফেসবুকে পোস্ট দেয়নি। কিন্তু এরা চলছে। এরা নিজেদের পথ বানিয়ে নিয়েছে।
তারপর একটা scatter plot পেল জাহিদ।
চার্টটার দিকে জাহিদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। X অক্ষে GPA, Y অক্ষে দশ বছর পরের মাসিক আয়। ডটগুলো ছড়িয়ে আছে পুরো চার্ট জুড়ে। কোনো পরিষ্কার প্যাটার্ন নেই। GPA 5.00 পাওয়া কেউ মাসে পঁচিশ হাজার টাকা আয় করছে। GPA 3.50 পাওয়া কেউ আশি হাজার। ট্রেন্ড লাইনটা প্রায় সমতল। R-squared 0.15, মানে GPA জীবনের আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। বাকি ৮৫ শতাংশ অন্য কিছু।
অন্য কিছু।
জাহিদ এই কথাটা মনে মনে বলল। অন্য কিছু। কোন কিছু? দক্ষতা? পরিশ্রম? সুযোগ? যোগাযোগ? ভাগ্য? নাকি সব মিলিয়ে?
সে জানে না। কিন্তু সে এটুকু বুঝল: GPA দিয়ে ভবিষ্যৎ মাপা যায় না। এটা ভর্তি পরীক্ষায় কাজে লাগে। এটুকুই। এটা জীবনের পরীক্ষায় কাজে লাগে কিনা, সেটা অন্য প্রশ্ন।
৩
জাহিদ উঠে বসল। বিছানার ওপর চারজানু হয়ে বসল। ফোনের নোটপ্যাড খুলল।
আজ সকাল থেকে সবাই তাকে বলেছে কী হয়নি। তুমি 5.00 পাওনি। তুমি মেডিকেলে পারবে না। তুমি বুয়েটে পারবে না। তুমি অমুকের ছেলের মতো পারোনি। সারাদিন ধরে যা শুনেছে তার সবকিছু নেতিবাচক। সবকিছু 4.17 কেন্দ্র করে ঘুরছে।
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করেনি: তুমি কী পারো?
জাহিদ টাইপ করতে শুরু করল।
"১। আমি কিসে ভালো? (GPA যেটা বলে সেটা না। আসলে কিসে।)"
থামল। ভাবল। কিসে ভালো সে? অঙ্ক মোটামুটি পারে। পদার্থবিদ্যা বুঝতে পারে, কিন্তু ভালোবাসে না। কেমিস্ট্রি একটু কঠিন লাগে। কিন্তু যখন কম্পিউটারে কিছু করে, সময় চলে যায়। রাকিব ভাইয়ের পুরনো ল্যাপটপে একবার HTML শিখেছিল ইউটিউব দেখে। একটা ওয়েবপেজ বানিয়েছিল। কেউ দেখেনি। কিন্তু বানানোর সময় তার ভালো লেগেছিল।
"২। আমার পরিবার কত টাকা খরচ করতে পারবে?"
এটা সহজ। বাবার আয় পনেরো হাজার। মায়ের পাঁচ হাজার। রাকিব ভাইয়ের পাঁচ হাজার। মোট পঁচিশ হাজার। সংসার খরচ বাদ দিলে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা থাকে। বছরে ষাট-সত্তর হাজার। এই টাকায় প্রাইভেট ভার্সিটি অসম্ভব। ঢাকায় থেকে পড়াও কঠিন। হোস্টেল, খাওয়া, বই, যাতায়াত, সব মিলিয়ে ঢাকায় মাসে ন্যূনতম দশ-বারো হাজার লাগবে। সেটা পরিবারের পক্ষে সম্ভব না।
তাহলে? মানিকগঞ্জে থেকে পড়া। অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কলেজ। অথবা পলিটেকনিক। অথবা কোনো স্কিল যেটা শিখতে ভার্সিটি লাগে না।
"৩। বাংলাদেশে দশ বছর পর কোন কাজের চাহিদা থাকবে?"
এটা জাহিদ জানে না। কিন্তু আজ যা পড়ল তাতে কিছু আন্দাজ হলো। আইটি ফ্রিল্যান্সারদের কথা পড়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কথা। ই-কমার্সের কথা। গার্মেন্টস সেক্টরে অটোমেশনের কথা, যেখানে মানুষের বদলে যন্ত্র আসছে, কিন্তু যন্ত্র চালানোর লোক লাগবে। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির কথা।
জাহিদ তিনটা প্রশ্ন লিখে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করল। তারপর আবার জ্বালল।
একটা জিনিস বুঝতে পারছে সে।
সারাদিন ধরে সবাই তার GPA-কে তার জীবনের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করেছে। 4.17 মানে তুমি এটা পারবে না, ওটা পারবে না, জীবন কঠিন হবে। কিন্তু ডেটা বলছে অন্য কথা। ডেটা বলছে, GPA ভর্তি পরীক্ষার একটা ফিল্টার। জীবনের ফিল্টার না। 5.00 পেলেই সফল, 4.00 পেলেই ব্যর্থ, এই গল্পটা মিথ্যা না, কিন্তু অসম্পূর্ণ। অনেক অনেক অসম্পূর্ণ।
আজ সকালে যখন SMS-এ 4.17 দেখেছে, সেই মুহূর্তে একটা নোঙর নেমে গেছে। পুরো দিনটা সেই নোঙরের চারপাশে ঘুরেছে। বাবার হতাশা, মায়ের চোখের পানি, চাচার ফোন, পাড়ার কথা, সব। এই সংখ্যাটা একটা নোঙরের মতো তাকে একটা জায়গায় আটকে রেখেছে। সমাজ তাকে বলেছে: তুমি 4.17। এটাই তুমি। এখান থেকে নড়ো না।
কিন্তু সংখ্যা মিথ্যা বলে না। আর সংখ্যা বলছে: নোঙরটা ভুল জায়গায় পড়েছে।
৪
রাত দুইটা বাজে।
জাহিদ ফোন হাতে নিয়ে ভাবল। তারপর ফারুকের নাম্বারে গেল। একটা মেসেজ লিখল।
"তুই ঠিক আছিস?"
পাঠিয়ে দিল। ফারুক তো ঘুমিয়ে আছে নিশ্চয়ই। 3.80 পেয়ে ফারুকের অবস্থা কী, জাহিদ ভাবতে পারে। ফারুকের বাবা রিকশা চালায়। ফারুকের মা কাজ করে না। ফারুকের সামনে পথ আরও সরু। জাহিদের চেয়েও সরু।
ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ফারুক জেগে আছে।
"হ্যাঁ। পলিটেকনিক ফর্ম তুলে ফেলেছি।"
জাহিদ মেসেজটা পড়ল। একটু চুপ থাকল। তারপর টাইপ করল।
"বুদ্ধিমানের কাজ করেছিস।"
পাঠিয়ে দিল।
ফারুকের জবাব আসতে একটু সময় লাগল। তারপর এলো।
"সত্যি বলছিস?"
"হ্যাঁ।"
"আজ কেউ এটা বলেনি। সবাই বলেছে আরেকবার দিতে।"
"আরেকবার দিয়ে কী হবে? সময় নষ্ট। তুই ডিপ্লোমা করবি, কাজ শিখবি। তিন বছর পর তোর হাতে একটা স্কিল থাকবে। অনেকের হাতে শুধু ডিগ্রি থাকবে।"
ফারুক কিছুক্ষণ কিছু লিখল না। তারপর এলো: "থ্যাংকস ভাই।"
জাহিদ ফোন নামিয়ে রাখল।
ফারুককে সারাদিনে কেউ বলেনি যে সে ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সবাই বলেছে আরেকবার চেষ্টা কর, যেন 3.80 একটা অসুখ যেটার চিকিৎসা হলো আরেকটা পরীক্ষা। কিন্তু ফারুক নিজে বুঝেছে। ফারুক হিসেব করেছে। ফারুক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
জাহিদের মনে হলো, ফারুক হয়তো তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান।
৫
জানালা দিয়ে ফজরের আজান ভেসে আসছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। কালো থেকে গাঢ় নীল, গাঢ় নীল থেকে ধূসর। একটু পরেই আলো আসবে।
জাহিদ সারারাত ঘুমায়নি।
কিন্তু ক্লান্ত লাগছে না। মাথায় একটা পরিষ্কার অনুভূতি। যেন কুয়াশা সরে গেছে। সবকিছু দেখা যাচ্ছে। স্পষ্ট না, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালো।
গতকাল সকালে সে ছিল একটা সংখ্যা। 4.17। একটা রায়। একটা সীমানা। আজ সকালে সে জানে: সংখ্যাটা একটা শুরু। শেষ না।
জাহিদ ফোনের নোটপ্যাড খুলল। তিনটা প্রশ্নের নিচে আরেকটা লাইন লিখল।
"ভর্তি যুদ্ধ শুরু।"
তারপর ফোন বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল। একটু ঘুমাবে। দুই ঘণ্টা। তারপর উঠবে।
4.17 একটা সংখ্যা। এটা তার গল্পের শুরু, শেষ না।
---
*প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত। দ্বিতীয় অধ্যায়: ভর্তি যুদ্ধ।*