বিশ্ববিদ্যালয়ের মানচিত্র

৫৩টা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ২১ লাখ পরীক্ষার্থী, আর জাহিদের দেয়ালে আটকানো একটা কাগজ

পর্ব ১১ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রেজাল্টের দুই সপ্তাহ পর।

জাহিদ একটা কাজ শুরু করেছে যেটা তার বন্ধুরা কেউ করেনি। সে ম্যাপ আঁকছে।

সাদা কাগজ। বাবার দোকান থেকে আনা পুরনো ক্যালেন্ডারের পেছন দিক। বড় সাইজ, প্রায় দুই হাত বাই দেড় হাত। জাহিদ কালো কলমে লাইন টানছে, বক্স আঁকছে, সংখ্যা লিখছে। মা দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে, ছেলে কী করছে। কিছু বলে না। ছেলে পড়াশোনার কিছু একটা করছে, এটুকু বুঝতে পারে।

আসলে জাহিদ গত দুই সপ্তাহ ফোনে একটাই কাজ করেছে। তথ্য খুঁজেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য। ভর্তি পরীক্ষার তথ্য। আসনসংখ্যার তথ্য। আবেদন ফি-র তথ্য। পরীক্ষার তারিখের তথ্য।

সে যা পেয়েছে, সেটা লিখে রাখছে এই কাগজে।

কাগজের উপরে বড় করে লেখা: "বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা।"

তার নিচে তিনটা বক্স।

প্রথম বক্স: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ৫৩টি। মোট আসন প্রায় ৫২,০০০।

দ্বিতীয় বক্স: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১১০টির বেশি। আসন ৫০,০০০-এর উপরে। কিন্তু খরচ সেমিস্টারে ৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ টাকা। জাহিদ এই বক্সের পাশে একটা ক্রস চিহ্ন দিয়েছে। তার পরিবারের জন্য এটা অসম্ভব।

তৃতীয় বক্স: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ২,২৬০টির বেশি কলেজ। ৩৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সবচেয়ে কম মর্যাদা।

জাহিদ তৃতীয় বক্সের দিকে তাকায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সবাই বলে, "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে লাভ নেই।" রাসেলের বাবা বলেছিলেন, "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি হয় না।" ফারুকের আম্মা বলেছিলেন, "ওটা তো বেকারদের আড্ডা।"

কিন্তু ৩৪ লাখ মানুষ সেখানে পড়ে। ৩৪ লাখ। পুরো ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।

জাহিদ ফোনে ক্যালকুলেটর খোলে।

এবার সে অন্য হিসাব করছে। ২০২৬ সালে এইচএসসি পাস করেছে প্রায় ২১ লাখ শিক্ষার্থী। একুশ লাখ।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন: ৫২,০০০। বেসরকারিতে: ৫০,০০০। মোট প্রায় ১ লাখ।

তার মানে ২১ লাখের মধ্যে মাত্র ১ লাখ পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাবে। বাকি ২০ লাখ?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে ৫ লাখ। বিদেশে যাবে হয়তো ২০,০০০। কারিগরি বা ভোকেশনালে যাবে ৩০,০০০। বাকি প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ কোথায় যাবে?

কোথাও না।

জাহিদ সংখ্যাটা লেখে: ১৪,৫০,০০০। চৌদ্দ লাখ পঞ্চাশ হাজার। প্রতি বছর। এত মানুষ পাস করে, সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে, তারপর কোনো প্রতিষ্ঠানে যায় না। কাজ খোঁজে। রিকশা চালায়। দোকানে বসে। গ্রামে ফিরে যায়। কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে যায়।

এই সংখ্যাটা জাহিদের মাথায় ঘুরতে থাকে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে: আমি কি ওই ১ লাখের মধ্যে পড়ব, নাকি ওই ১৪ লাখের মধ্যে?

জাহিদ কাগজের মাঝখানে একটা টাইমলাইন আঁকে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি। চার মাস। এই চার মাসে সব ভর্তি পরীক্ষা হবে।

অক্টোবর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ক ইউনিট, খ ইউনিট, গ ইউনিট, ঘ ইউনিট। আবেদন ফি ১,০০০ টাকা।

নভেম্বর: বুয়েট। আবেদন ফি ১,২০০ টাকা। রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট একসাথে। আবেদন ফি ৮০০ টাকা।

ডিসেম্বর: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। আবেদন ফি ১,০০০ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর। আবেদন ফি ৭০০ টাকা।

জানুয়ারি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, গুচ্ছ পদ্ধতির পরীক্ষা। আবেদন ফি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা।

জাহিদ হিসাব করে। শুধু আবেদন ফি-ই লাগবে ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা। সাত-আটটা পরীক্ষা দিতে চাইলে।

কিন্তু আবেদন ফি তো শুরু। প্রতিটা পরীক্ষার জন্য যেতে হবে। ঢাকায় পরীক্ষা দিতে গেলে বাসের টিকিট ময়মনসিংহ থেকে ৩৫০ টাকা। যাওয়া-আসা ৭০০। থাকা, খাওয়া, অটোভাড়া ধরলে একদিনে কমপক্ষে ১,৫০০ টাকা।

তিনটা পরীক্ষা ঢাকায় দিলে: ৪,৫০০ টাকা শুধু যাতায়াত আর থাকা। চট্টগ্রামে গেলে আরো বেশি। রাজশাহী গেলে আরো বেশি।

জাহিদ মোট খরচের একটা হিসাব করে। সব মিলিয়ে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। তার বাবার এক মাসের আয়ের সমান। অথবা বেশি।

সে কলমটা রাখে। ঘরের দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালে বাবার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি সেলোটেপ দিয়ে লাগানো। পাশে মায়ের একটা পুরনো ক্যালেন্ডার, যেটায় মা দর্জির অর্ডারের হিসাব রাখে। কত কাজ, কত টাকা, কবে দিতে হবে।

এই ঘরে ২০,০০০ টাকা মানে অনেক কিছু। মায়ের দুই মাসের সেলাইয়ের আয়। রাকিব ভাইয়ের চার মাসের পাঠানো টাকা। বাবার সিএনজি-র জ্বালানি খরচ বাদ দিলে বিশ দিনের নেট আয়।

রাসেল ফোন করে সন্ধ্যায়।

"কী করছিস?"

"পড়ছি।"

"কী পড়ছিস?"

"বিশ্ববিদ্যালয়ের লিস্ট।"

রাসেল হাসে। "লিস্ট পড়তে হয় নাকি? বুয়েট, ঢাবি, মেডিকেল। ব্যস।"

জাহিদ বলে, "তুই জানিস বাংলাদেশে কয়টা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে?"

"ত্রিশ-চল্লিশটা হবে।"

"৫৩টা।"

"৫৩? এত?"

"হ্যাঁ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৪টা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৯টা। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ৪টা। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বাকিগুলো। তুই কয়টার নাম জানিস?"

রাসেল চুপ করে যায়। তারপর বলে, "বুয়েট, ঢাবি, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রাবি, চবি, জাবি, জবি... আর?"

"হাজী দানেশ, পটুয়াখালী, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর, নোয়াখালী, বেগম রোকেয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পাবনা, চাঁদপুর..."

"থাম থাম। এগুলো কোথায় আছে?"

"সারা বাংলাদেশে ছড়ানো। কিন্তু তুই কি কখনো শুনেছিস কেউ বলছে, 'আমি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই'?"

রাসেল হাসে। "না।"

"কেন?"

"কারণ... কেউ পড়ে না ওখানে।"

"কেউ পড়ে না মানে? পড়ে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পড়ে। শুধু আমরা জানি না। বা জানতে চাই না।"

রাসেলের গলা একটু গম্ভীর হয়। "তুই কি বলতে চাইছিস ওখানে চান্স নিবি?"

"আমি বলতে চাইছি, ৩ লাখ ছেলেমেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে ৭,০০০ সিট-এর জন্য। ৫০,০০০ আবেদন করে বুয়েটে ১,২০০ সিট-এর জন্য। কিন্তু হাজী দানেশে বা পটুয়াখালীতে আবেদন করে অনেক কম। ওখানে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা দশগুণ বেশি।"

"কিন্তু ওখানকার মান..."

"মান কী? বিল্ডিং? নাকি শিক্ষক? নাকি সিলেবাস? ইউজিসি-র অনুমোদন সবার একই। ডিগ্রি একই। তফাতটা কোথায়?"

রাসেল বলে, "তফাতটা নামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বললে মানুষ চেনে। পটুয়াখালী বললে কেউ চেনে না।"

জাহিদ চুপ করে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলে, "হ্যাঁ। আর ঠিক এই জায়গাটাতেই সমস্যা।"

রাতে জাহিদ আবার কাগজের সামনে বসে। এবার সে অন্য জিনিস আঁকছে।

কাগজের বাঁ দিকে সে একটা তালিকা করে: "সবাই যেখানে যায়।" ডান দিকে আরেকটা তালিকা: "কেউ যেখানে ভাবে না।"

বাঁ দিকে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল, জাহাঙ্গীরনগর, রুয়েট। পাঁচ-ছয়টা নাম। পুরো দেশের ২১ লাখ পরীক্ষার্থীর একটা বিশাল অংশ এই পাঁচ-ছয়টা জায়গার দিকে ছুটছে। যেন বাংলাদেশে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।

ডান দিকে: হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এগুলো সব সরকারি। টিউশন ফি নেই বললেই চলে। হলে থাকার ব্যবস্থা আছে। অনেকগুলোতে ভালো বিভাগ আছে, কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রিক্যাল, ফার্মেসি, মাইক্রোবায়োলজি। কিন্তু কেউ প্রথম পছন্দ হিসেবে ভাবে না।

জাহিদ ভাবে, কেন?

উত্তরটা সে জানে। কারণ সবাই একই দিকে দৌড়ায়। পাড়ার মানুষ বলে, "ঢাবি পড়, বুয়েট পড়।" কোচিং সেন্টারের ব্যানারে লেখা থাকে, "ঢাবিতে চান্স পাওয়ার গ্যারান্টি।" ফেসবুকে সফল ছেলেমেয়েদের ছবি শেয়ার হয়, "ঢাবিতে ১ম।" "বুয়েটে ৫ম।"

কেউ কখনো পোস্ট করে না, "হাজী দানেশে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হয়েছি, খুশি।" পোস্ট করলেও কেউ লাইক দেয় না।

এটাই সমস্যা। পুরো একটা প্রজন্ম একই পাঁচটা গন্তব্যের দিকে ছুটছে, কারণ শুধু ওই পাঁচটার কথাই সবাই বলে। বাকি ৪৭টা বিশ্ববিদ্যালয় যেন অদৃশ্য।

জাহিদ আরেকটা হিসাব করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক ইউনিটে (বিজ্ঞান) আবেদন করে প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০। আসন আছে ১,৮০০-এর মতো। চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা ২ শতাংশের কম। শতকরা দুইজন।

বুয়েটে আবেদন করে ৫০,০০০-এর কাছাকাছি। আসন ১,২০০। চান্স: ২.৪ শতাংশ।

মেডিকেলে আবেদন করে ১,৫০,০০০-এর উপরে। আসন ৫,০০০-এর কাছে। চান্স: ৩ শতাংশের কিছু বেশি।

জাহিদ এই সংখ্যাগুলো কাগজে লেখে। তারপর পাশে লেখে: "লটারি।"

কারণ এটা লটারিই। ৯৮ শতাংশ বাদ পড়বে। যত ভালো ছাত্রই হোক।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, কেউ এটাকে লটারি বলে না। সবাই বলে, "পরিশ্রম করলে হবে।" কোচিং সেন্টারগুলো বলে, "আমাদের মডেল টেস্ট দাও, চান্স পাবে।" বাবা-মা বলে, "তোর ইচ্ছাশক্তি থাকলে পারবি।"

কেউ বলে না যে ৯৮ জনের মধ্যে ৯৬ জনের ইচ্ছাশক্তিরও কোনো সমস্যা নেই। তারাও পরিশ্রম করেছে। তারাও কোচিং করেছে। তারাও রাত জেগে পড়েছে। শুধু আসন নেই।

জাহিদ ফোনে একটা জিনিস পড়েছিল কদিন আগে। ইংরেজিতে ছিল, সে আস্তে আস্তে পড়ে বুঝেছে। "Survivorship bias" নামে একটা জিনিস আছে। মানে হলো, আমরা শুধু যারা সফল হয়েছে তাদের দেখি। যারা ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কথা কেউ বলে না। তাই মনে হয়, সফল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আসলে সফল হওয়াটা ব্যতিক্রম।

পরদিন সকালে জাহিদ বাবার সাথে চায়ের দোকানে বসে।

বাবা জিজ্ঞেস করে, "কোথায় পরীক্ষা দিবি?"

জাহিদ বলে, "সব জায়গায়।"

বাবা চায়ে চুমুক দেয়। "সব জায়গায় মানে? ঢাকা?"

"ঢাকা তো দিবই। তারপর বুয়েট, মেডিকেল, গুচ্ছ..."

"কত খরচ?"

জাহিদ একটু থামে। সে জানে বাবা সরাসরি এই প্রশ্নটাই করবে। কারণ বাবার কাছে সবকিছু টাকায় মাপা হয়। এটা নিষ্ঠুরতা না। এটা বাস্তবতা।

"সব মিলিয়ে পনেরো থেকে বিশ হাজার। আবেদন ফি, যাতায়াত, থাকা।"

বাবার হাত থেমে যায়। চায়ের কাপটা টেবিলে রাখে। কিছু বলে না।

জাহিদ বলে, "সব জায়গায় না দিলেও হবে। যেখানে চান্স বেশি, সেখানে দিব।"

"চান্স বেশি কোথায়?"

"গুচ্ছ পদ্ধতিতে। একটা পরীক্ষা দিলে ২০টার বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন হয়ে যায়। আর ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এখানে পরীক্ষা দিলে যাতায়াত খরচ লাগবে না।"

বাবা মাথা নাড়ে। "কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী হবে?"

"কৃষিবিদ। ব্যাংকে চাকরি হয়। সরকারি চাকরি হয়। গবেষণা করা যায়।"

বাবা বলে, "তোর ফ্রেন্ড রাসেল কোথায় দিবে?"

"বুয়েট।"

"আর তুই?"

জাহিদ একটু ভেবে বলে, "আমি সব জায়গায় দিব যেখানে আমার সামর্থ্যে কুলায়। রাসেল শুধু বুয়েট নিয়ে ভাবছে। আমি ৫৩টা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ম্যাপ দেখছি।"

বাবা কিছু বলে না। শুধু চা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। যাওয়ার আগে বলে, "যা পারিস কর। টাকা আমি জোগাড় করব।"

জাহিদ জানে, বাবা কীভাবে জোগাড় করবে। বাড়তি শিফট চালাবে। রাত দশটা পর্যন্ত সিএনজি চালাবে। হয়তো কারো কাছ থেকে ধার করবে। হয়তো মায়ের সঞ্চয়ের টিনের বাক্সটা খুলতে হবে, যেটায় মা প্রতি মাসে ২০০-৩০০ টাকা করে রাখে।

বিকেলে সুমাইয়া ফোন করে।

"জাহিদ, তুই কি কোচিংয়ে ভর্তি হবি?"

"কোন কোচিং?"

"ঢাকায়। ভর্তি পরীক্ষার কোচিং। মতিঝিলে একটা আছে, নামটা ভুলে গেছি। রাসেল বলছিল, ওর পরিচিত একজন ওখানে পড়ে বুয়েটে চান্স পেয়েছে।"

"কত খরচ?"

"বিশ হাজার। তিন মাসের।"

জাহিদ মনে মনে হাসে। ২০,০০০ টাকা কোচিং ফি। তারপর ঢাকায় তিন মাস থাকা, মেসভাড়া মাসে ৫,০০০ ধরলে ১৫,০০০। খাওয়া মাসে ৪,০০০ ধরলে ১২,০০০। মোট ৪৭,০০০ টাকা। শুধু কোচিংয়ের জন্য।

"আমার পক্ষে সম্ভব না।"

সুমাইয়া চুপ করে থাকে। সে জানে জাহিদের আর্থিক অবস্থা। কিন্তু বলে, "তাহলে ময়মনসিংহে কোনো কোচিং আছে কিনা দেখ।"

"দেখব। কিন্তু তোর কী প্ল্যান?"

"মেডিকেল। আম্মু বলছে কোচিং ছাড়া হবে না।"

"তুই নিজে কী মনে করিস?"

সুমাইয়া একটু চুপ থেকে বলে, "আমি মনে করি, যে বই পড়ে পরীক্ষা দিয়ে এইচএসসিতে 4.83 পেয়েছে, সে কোচিং ছাড়াও পারবে। কিন্তু আম্মু মানবে না। আম্মুর ভয়, বাকি সবাই কোচিং করছে, আমি না করলে পিছিয়ে পড়ব।"

"এটাই সমস্যা," জাহিদ বলে। "সবাই করছে বলে আমাকেও করতে হবে। সবাই ঢাবিতে যাচ্ছে বলে আমাকেও যেতে হবে। সবাই একই রাস্তায় হাঁটছে বলে আমাকেও হাঁটতে হবে। কেউ থামে না, ভাবে না, এই রাস্তাটাই ঠিক কিনা।"

সুমাইয়া বলে, "তুই কিন্তু অনেক ভাবছিস।"

"ভাবতে হচ্ছে। কারণ আমার টাকা নেই। টাকা থাকলে আমিও না ভেবে সবার সাথে দৌড়াতাম।"

রাতে জাহিদ শোওয়ার আগে কাগজটা আবার দেখে।

সে বুঝতে পারছে একটা জিনিস। ভর্তিযুদ্ধটা শুধু মেধার যুদ্ধ না। এটা তিনটা জিনিসের যুদ্ধ।

এক, তথ্যের যুদ্ধ। কে কতটুকু জানে। ঢাকার ছেলেমেয়েরা জানে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিভাগ ভালো, কোন প্রশ্ন কীভাবে আসে, কোন বইয়ের কোন চ্যাপ্টার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বড় ভাইবোন পড়েছে, পাড়ায় টিউটর আছে, কোচিং সেন্টার আছে। ময়মনসিংহের মফস্বলে জাহিদের কাছে আছে একটা ফোন আর ইন্টারনেট। সে নিজে খুঁজে বের করছে। কেউ বলে দিচ্ছে না।

দুই, টাকার যুদ্ধ। কে কতগুলো পরীক্ষা দিতে পারে। ঢাকার ছেলে সব কটা পরীক্ষা দেবে। আবেদন ফি-র চিন্তা নেই, যাতায়াতের চিন্তা নেই, থাকার চিন্তা নেই। জাহিদকে বাছাই করতে হবে। পাঁচটার জায়গায় তিনটা দিবে। তিনটার জায়গায় দুইটা।

তিন, ভূগোলের যুদ্ধ। কে কোথায় থাকে। ঢাকায় যে থাকে, তার পরীক্ষার কেন্দ্র পাশের রাস্তায়। ময়মনসিংহে যে থাকে, তাকে বাসে পাঁচ ঘণ্টা যেতে হয়। বরিশালে যে থাকে, তাকে লঞ্চে রাত কাটাতে হয়। সিলেটে যে থাকে, তাকে ট্রেনে আট ঘণ্টা। শুধু পরীক্ষা দিতে যাওয়ার কষ্টেই অনেকে হাল ছেড়ে দেয়।

মেধা? মেধা চতুর্থ। তথ্য, টাকা, ভূগোল, তারপর মেধা।

জাহিদ লিখে রাখে কাগজের নিচে: "ভর্তিযুদ্ধটা সমান নয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কিছু মানুষ এগিয়ে আছে। আমি পিছিয়ে আছি।"

১০

শেষ রাতে জাহিদ কাগজটা ভাঁজ করে দেয়ালে পিন দিয়ে আটকায়।

কাগজটায় এখন অনেক কিছু আছে। ৫৩টা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। পরীক্ষার তারিখ। আবেদন ফি। আসনসংখ্যা। প্রতিযোগিতার হার। খরচের হিসাব। দুটো তালিকা, "সবাই যেখানে যায়" আর "কেউ যেখানে ভাবে না।"

মা ঘরে আসে। দেয়ালে কাগজটা দেখে বলে, "এটা কী?"

"বিশ্ববিদ্যালয়ের মানচিত্র।"

মা কাছে গিয়ে দেখে। পড়তে পারে, কিন্তু সব বোঝে না। শুধু সংখ্যাগুলো দেখে। ৫৩। ৫২,০০০। ২১,০০,০০০। ১৪,৫০,০০০।

"এত বড় বড় সংখ্যা," মা বলে।

"হ্যাঁ, আম্মা। এত বড় বড় সংখ্যা।"

মা চলে যায়। জাহিদ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাগজটা দেয়ালে একটু বাঁকা হয়ে আছে। পিনটা ঠিকমতো বসেনি। জাহিদ সোজা করে দেয়।

৫৩টা বিশ্ববিদ্যালয়। সে যতগুলোতে পারে আবেদন করবে। সবাই যেদিকে যাচ্ছে শুধু সেদিকে না, যেদিকে কেউ যাচ্ছে না সেদিকেও।

কারণ জাহিদ বুঝে গেছে একটা জিনিস। পালের সাথে দৌড়ালে পালেই হারিয়ে যেতে হয়। নিজের রাস্তা খুঁজতে হলে পাল থেকে বের হতে হয়।

যুদ্ধ শুরু হয়নি এখনো। কিন্তু মানচিত্র তৈরি।