ঢাকায় যাত্রা

মফস্বলের ছেলে যেদিন প্রথম শহরের মুখোমুখি হলো

পর্ব ১২ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

বাবা দশ হাজার টাকা দিলেন।

দশটা হাজার টাকার নোট। পুরনো, ভাঁজ করা, কিছু কিছুতে দাগ পড়েছে। বাবা নোটগুলো গুনে গুনে জাহিদের হাতে দিলেন। প্রতিটা নোট আলাদা আলাদা করে। যেন প্রতিটা নোটের পেছনে একটা করে যাত্রী আছে, একটা করে ট্রিপ আছে।

"এইটুকু আছে।" বাবা বললেন। গলায় কোনো আবেগ নেই। কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাও নেই। যা আছে, তা আছে। CNG চালিয়ে যা জমাতে পেরেছেন, সেটাই।

"বাকিটা রাকিব পাঠাবে।"

মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ লাল। কাঁদেননি, কিন্তু কাঁদেননি বলে মনে হচ্ছে না। বললেন, "ব্যাগে পানি আছে। দুইটা পরোটাও রেখেছি। বাসে খিদে লাগলে খাবি।"

"আম্মা, তিন ঘণ্টার রাস্তা।"

"তিন ঘণ্টাও তো ঘণ্টা।"

মিম উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে। ক্লাসে যাবে। কিন্তু যাচ্ছে না। বলল, "ভাইয়া, ঢাকা থেকে কিছু আনবে?"

"কী আনব?"

"কিছু না। এমনি জিজ্ঞেস করলাম।"

ভাইকে বিদায় দেওয়ার কোনো ভাষা জানে না মিম। তাই এটুকুই।

বাবা বললেন, "যা। বাস মিস কোরো না। আর ঢাকায় গিয়ে কারো সাথে টাকাপয়সার লেনদেন কোরো না। চিনিস না, কাউকে চিনিস না।"

ব্যাগ কাঁধে নিল জাহিদ। পুরনো কাপড়ের ব্যাগ। এক জোড়া প্যান্ট, দুইটা শার্ট, একটা লুঙ্গি, গামছা, সাবান, টুথব্রাশ। আর পকেটে দশ হাজার টাকা।

গেট পার হতে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল। বাবা উঠানে, মা দরজায়, মিম গেটের কাছে। তিনটা মানুষ, তিন জায়গায়, একই দিকে তাকিয়ে।

জাহিদ হাত তুলল। কেউ হাত তুলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।

বাস ছাড়ল সকাল আটটায়। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা। ভাড়া তিনশো পঁচিশ টাকা। এসি না।

প্রথম আধা ঘণ্টা চেনা রাস্তা। ধানখেত, তালগাছ, পুকুর, টিনের ঘর, মসজিদের মিনার। চোখ বন্ধ করলেও চেনা।

তারপর চেনা শেষ হলো।

এক ঘণ্টা পর ধানখেত কমে এল। ইটের ভাটা দেখা গেল, লম্বা চিমনি, কালো ধোঁয়া। গার্মেন্টসের ফ্যাক্টরি। সাইনবোর্ড ইংরেজিতে, কোনোটায় চীনা হরফও। বড় বড় গোডাউন। ট্রাক সারি সারি।

দেড় ঘণ্টায় গাছ কমে গেল। কংক্রিট বাড়ল। রিকশা বাড়ল, মোটরসাইকেল বাড়ল, হর্ন বাড়ল। দুই ঘণ্টায় জানালার বাইরে মফস্বল মরে গেল। সবুজ শেষ। ধূসর শুরু।

পাশের লোক জেগে উঠলেন। "ঢাকা যাচ্ছ?"

"জি।"

"প্রথমবার?"

"জি।"

লোকটা একটু হাসলেন। সহানুভূতি, না উপহাস, বোঝা গেল না। বললেন, "সামলে থেকো।"

এটুকুই। আর কিছু না।

ঢাকায় ঢুকতে আরো এক ঘণ্টা লাগল। ট্রাফিক।

রাস্তায় গাড়ির লাইন। সামনে দেখা যাচ্ছে না শেষ কোথায়। বাস, ট্রাক, CNG, রিকশা, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি। সব এক রাস্তায়। হর্ন বাজছে, একশোটা, একসাথে, বিরতি ছাড়া। যেন হর্ন বাজালে রাস্তা ফাঁকা হবে। কেউ সরছে না। তবু হর্ন বাজছে।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ফুটপাথ নেই। ফুটপাথ ছিল হয়তো, কিন্তু দোকানে ভরে গেছে। মানুষ হাঁটছে রাস্তায়, গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে। কেউ মোবাইলে কথা বলতে বলতে ট্রাকের সামনে দিয়ে পার হচ্ছে। যেন মৃত্যু নেই।

জাহিদের মনে হলো, তার পুরো শহরের মানুষ এক জায়গায় জড়ো হলেও এই একটা মোড়ের ভিড়ের সমান হবে না।

মহাম্মদপুরে নামল। প্রথম যেটা অনুভব করল, সেটা শব্দ না, গন্ধ না। সেটা তাপ। কংক্রিটের তাপ। রাস্তা, দেয়াল, ভবন, সব থেকে গরম বের হচ্ছে। মফস্বলে মাটি আছে, গাছ আছে, ছায়া আছে। এখানে কংক্রিট ছাড়া কিছু নেই।

গলি দিয়ে ঢুকল। সরু। দুইজন পাশাপাশি হাঁটলে কাঁধে কাঁধ ঠেকে। দুইদিকে তিনতলা চারতলা পাঁচতলা ভবন। ওপরে আকাশ দেখা যায়, কিন্তু একটা সরু ফালি। যেন আকাশকেও এখানে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

ড্রেন খোলা। গন্ধ। দেয়ালে পানের পিক। সিঁড়ি সরু।

দোতলায় পেছনের ঘর। দরজা খোলা।

ঘর আট বাই দশ ফুট।

একটা জানালা, লোহার গ্রিল। একটা ফ্যান, ছাদে ঝুলছে। মেঝেতে একটা চাটাই, ছেঁড়া। কোণায় তিনটা ব্যাগ। তিনজন আগে থেকেই আছে।

একজন চাটাইয়ে বসে ফোন দেখছে। মাথায় ক্যাপ, গায়ে হলুদ টিশার্ট। তাকাল। "তুমি জাহিদ?"

"জি।"

"আয়। আমি শামীম। রংপুর থেকে।" শক্ত হ্যান্ডশেক। "তোমার কোণা ওইটা।" জানালার পাশে দুই ফুট বাই ছয় ফুট ফাঁকা জায়গা দেখাল। এটুকুতে শুতে হবে, বসতে হবে, পড়তে হবে।

"বাকি দুইজন বাইরে গেছে। রাজু বরিশাল থেকে, সজীব কুমিল্লা থেকে। ভাড়া মাথাপিছু আড়াই হাজার। কারেন্ট আলাদা।"

জাহিদ হিসাব করল। আড়াই হাজার ভাড়া, খাওয়া তিন-চার হাজার, কোচিং ফি আলাদা। দশ হাজার টাকা। এক মাস? দেড় মাস?

ব্যাগ নামিয়ে রাখল কোণায়। শামীম বলল, "GPA কত?"

"4.17।"

"আমার 4.50। ঢাবি ট্রাই করব। গত বছর সাত লাখ আবেদন করেছিল। সিট ছয় হাজার।"

বাকি ছয় লাখ চুরানব্বই হাজার কোথায় গেল, কেউ জানে না।

সন্ধ্যায় রাজু ফিরল। লম্বা, রোগা, মুখে দাড়ির ছাপ। দেখে মনে হয় বাইশ-তেইশ, বয়স ঊনিশ।

"GPA?"

"3.90। দ্বিতীয়বার।"

"দ্বিতীয়বার?"

"গত বছর কোথাও হয়নি। এবার আবার।" রাজু এটুকু বলে থামল। যেন গত বছরের গল্পটা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছে।

রাত আটটায় সজীব ফিরল। ঘরে ঢুকেই চাটাইয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ।

শামীম বলল, "কোচিং কেমন?"

"তিনটা দেখে এলাম। সব জায়গায় একই কথা, গ্যারান্টি। প্রতিটা কোচিং বলছে গ্যারান্টি। বোর্ডে গত বছরের সফল ছেলেমেয়ের ফটো লাগানো। কিন্তু যারা চান্স পায়নি, তাদের ফটো কোথায়?"

সজীব কুমিল্লা থেকে। GPA 4.80। গত বছর মেডিকেলের জন্য কোচিং করেছিল। চান্স হয়নি।

"খরচ কত হয়েছিল?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"কোচিং ফি, বই, মডেল টেস্ট, ঢাকায় থাকা খাওয়া। ষাট হাজারের কম না।" সজীব বসল। "বাবার একটা গাভি ছিল। বিক্রি করলেন। সেই টাকায় কোচিং করলাম। চান্স হলো না।"

ঘরে চুপ নেমে এল।

কুমিল্লার একটা গ্রামে একটা পরিবারের সবচেয়ে দামি সম্পদ ছিল একটা গাভি। সেই গাভি বিক্রি হলো। সেই টাকা ঢাকার একটা কোচিং সেন্টারের পকেটে গেল। কোচিং সেন্টার গ্যারান্টি দিয়েছিল। গ্যারান্টি মানে একটা শব্দ পোস্টারে লেখা থাকে। ব্যস।

"এবার?"

"বাবা কিছু জমি বন্ধক দিয়েছেন।" সজীব থামল। "আমি না পারলে, জমি যাবে। বাবা বলেননি। কিন্তু আমি জানি।"

রাতে খিদে লাগল।

গলির মুখে খিচুড়ির দোকান। টিনের চালা, একটা বাল্ব, ধোঁয়া।

"এক প্লেট খিচুড়ি।"

"চল্লিশ টাকা।"

মফস্বলে এই একই খিচুড়ি বিশ টাকা। একই চাল, একই ডাল। কিন্তু এটা ঢাকা। ঢাকা সবকিছুর দাম দ্বিগুণ করে।

খেতে খেতে হিসাব করল। দিনে তিনবেলা, একশো ত্রিশ থেকে দেড়শো। মাসে চার হাজার। ভাড়া আড়াই হাজার। শুধু বেঁচে থাকতে মাসে সাড়ে ছয় হাজার। কোচিং ফি ধরলে দশ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

দশ হাজার টাকা নিয়ে এসেছে। এক মাসও চলবে না।

পরদিন সকালে ফার্মগেট গেল। শামীম সাথে নিয়ে গেল।

ফার্মগেট থেকে নীলক্ষেত। ভর্তি কোচিং সেন্টারের এলাকা। দুই পাশে শুধু কোচিং সেন্টার। একটার পর একটা। দোতলায়, তিনতলায়, চারতলায়। সাইনবোর্ডে লেখা:

"মেডিকেল ভর্তি কোচিং। ৯৮% সাফল্যের হার।"

"ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাডমিশন। GUARANTEED।"

"ঢাবি, জাবি, চবি প্রস্তুতি। আজই ভর্তি হোন।"

GUARANTEED। শব্দটা সব জায়গায়। দেয়ালে, ব্যানারে, ফ্লায়ারে। ছেলেমেয়েরা ফ্লায়ার বিলি করছে রাস্তায়। জাহিদের হাতে একটা দিল। ফ্লায়ারে গত বছরের সফল শিক্ষার্থীদের ছবি। হাসছে। নিচে লেখা: "আমরা পেরেছি, তুমিও পারবে।"

শামীম বলল, "মেডিকেলের কোচিং ফি পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার। ঢাবির জন্য বারো হাজার।"

জাহিদের পকেটে দশ হাজার। সব মিলিয়ে। থাকা, খাওয়া, কোচিং, সব মিলিয়ে।

কিন্তু GUARANTEED কিছু না। পরীক্ষার হলে কোচিং সেন্টার থাকে না। থাকে একটা ছেলে, একটা খাতা, একটা কলম, আর চার-পাঁচটা ঘণ্টা। সেই ঘণ্টাগুলোতে কী হবে, কোনো পোস্টার জানে না।

সজীবের গাভির গল্প মনে পড়ল।

রাতে মেঝেতে শুয়ে আছে জাহিদ।

বিছানা নেই। চাটাই পাতলা। মেঝের শীতলতা পিঠে লাগে। ব্যাগ ভাঁজ করে মাথার নিচে দিয়েছে। চারজন আট বাই দশ ফুটে। শামীমের পা জাহিদের মাথার কাছে। রাজু দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে। সজীব ফোনে কিছু পড়ছে।

মায়ের নম্বরে কল দিল।

দুই রিং-এ মা ধরলেন। "খেয়েছিস?"

"হ্যাঁ আম্মা।"

খায়নি। দুপুরে খায়নি। সকালে মায়ের দেওয়া পরোটা খেয়েছিল বাসে। দুপুরে ভাত খেলে আশি টাকা। বাদ দিয়েছে। রাতে খিচুড়ি, চল্লিশ টাকা। আজকের মোট খরচ চল্লিশ টাকা। বাঁচানো আশি।

"কী খেয়েছিস?"

"ভাত।"

মিথ্যা। মায়ের কাছে মিথ্যা বলতে বুকের মধ্যে কিছু একটা চেপে ধরে।

ফোন রাখার পর শামীম বলল, "বাসার ফোন?"

"আম্মা।"

"আমিও কাল করেছিলাম। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, খেয়েছিস? আমিও বললাম, হ্যাঁ।"

দুজনে চুপ হয়ে গেল।

বাইরে ঢাকা জেগে আছে। রাত এগারোটায়ও হর্ন বাজছে। কোথাও জেনারেটর চলছে। পাশের ফ্ল্যাটে টিভি। কেউ চিৎকার করছে রাস্তায়।

মফস্বলে এই সময়ে নীরবতা নামে। ঝিঁঝির ডাক ছাড়া কিছু শোনা যায় না। বাড়ির পেছনে আমগাছে বাতাস লাগলে পাতা নড়ে। দূরে মসজিদের আজানের পরে আরো গভীর নীরবতা। সেই নীরবতায় ঘুম আসে।

এখানে নীরবতা নেই।

জাহিদ অন্ধকারে শুয়ে ভাবল।

এই শহরে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে এসেছে। সারা বাংলাদেশ থেকে। সবার পকেটে কিছু টাকা, সবার ব্যাগে কিছু কাপড়, সবার মাথায় একটা স্বপ্ন। সবার বাবা কিছু না কিছু দিয়েছেন। কেউ দশ হাজার, কেউ ষাট হাজার, কেউ গাভি বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন। সবাই দিয়েছেন যা আছে।

আর ঢাকা নিচ্ছে। সবার কাছ থেকে নিচ্ছে। ভাড়া, কোচিং ফি, খাবারের দাম, রিকশাভাড়া। সুযোগ দেয় এই শহর, কিন্তু সুযোগের দরজায় দাঁড়াতে হলে আগে টিকিট কাটতে হয়। টিকিটের দাম সবার সমান না।

পকেট থেকে টাকাটা বের করল। অন্ধকারে গুনল। দশটা নোট। এই কটা কাগজের ওপর তার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ নির্ভর করছে। প্রতিটা নোটের পেছনে কয়টা যাত্রী, কত ঘণ্টা রোদে বসা, সেই হিসাব কেউ রাখে না।

টাকা আবার পকেটে রাখল।

ফ্যান ঘুরছে। খটখট করছে। বাইরে ঢাকা গর্জন করছে। ঘুমায় না এই শহর।

যে শহর সুযোগ দেয়, সেই শহর দেখতে আসতেও টাকা লাগে। সুযোগের দিকে তাকাতেও ভাড়া দিতে হয়।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল। মফস্বলের ছেলে, ঢাকার মেঝেতে।