ভর্তি কোচিং
তিনশো জনের ক্লাসে একটা মাইক, একটা শর্টকাট, আর একটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি
১
কোচিং সেন্টারের নাম "বিজয় একাডেমি"।
মোহাম্মদপুরের একটা পুরনো বিল্ডিংয়ের তিনতলায়। সিঁড়িতে পানের পিক। দেয়ালে আগের ব্যাচের "সফল" ছাত্রদের ছবি সাঁটানো। ঢাবিতে চান্স পেয়েছে, মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, BUET-এ চান্স পেয়েছে। সব ছবিতে হাসি। ব্যর্থতার কোনো ছবি নেই। কেউ তোলে না। কেউ টাঙায় না।
ত্রিশ হাজার টাকা। তিন মাসের প্রোগ্রাম। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি।
রাকিব ভাই পাঠিয়েছে পনেরো হাজার। তিন মাসের পাঠানো টাকা জমিয়ে একসাথে দিয়েছে। ফোনে বলেছে, "পড়। যেটা আমি পারিনি, তুই পার।"
বাকি পনেরো হাজার বাবার জমানো। বাবা গত ছয় মাস ধরে দুপুরে খাননি। সেই টাকা জমিয়েছেন। মা জানেন। জাহিদ জানে না। মা বলেননি।
২
ক্লাসরুমে ঢুকে জাহিদ থমকে দাঁড়াল।
তিনশো জন।
একটা ঘরে তিনশো জন বসে আছে। বড়জোর দুইশো জনের জায়গা। প্লাস্টিকের চেয়ার, সামনে একটা সরু ডেস্ক। এত সরু যে খাতা রাখলে কলম রাখার জায়গা নেই। পাশের জনের কনুই গায়ে লাগছে।
সামনে একটা হোয়াইটবোর্ড। দুপাশে দুটো ফ্যান, কিন্তু পেছনে বাতাস পৌঁছায় না। পেছনের বেঞ্চিগুলো গরম, অন্ধকার, হোয়াইটবোর্ড থেকে এত দূরে যে লেখা পড়া যায় না।
জাহিদ মাঝামাঝি একটা সিট পেল। সামনের দুই সারি প্রথম দিনেই দখল হয়ে গেছে। পেছনে বসলে কিছুই শোনা যাবে না। মাঝামাঝি। জাহিদের চিরকালের জায়গা।
৩
প্রথম ক্লাস। Physics। শামীম স্যার। মোটা, গলায় মাইক্রোফোন, হাতে মার্কার।
ঘরে ঢুকেই বললেন, "তোমাদের মধ্যে কতজন BUET চায়?"
পঞ্চাশ-ষাটটা হাত উঠল।
"কতজন মেডিকেল?"
একশো হাত।
"কতজন ঢাবি?"
বাকিরা।
শামীম স্যার হাসলেন। "এই ঘরে তিনশো জন। ঢাকায় এরকম কোচিং পাঁচশো। প্রতিটায় গড়ে দুইশো। মানে এক লাখ ছাত্র শুধু ঢাকায়। সারাদেশে পাঁচ লাখ। BUET-এ সিট ছয় হাজার। মেডিকেলে পাঁচ হাজার। ঢাবিতে সাত-আট হাজার। তোমাদের বেশিরভাগ চান্স পাবে না। এটা গণিত।"
ক্লাস চুপ।
তারপর পড়াতে শুরু করলেন। Newton-এর গতিসূত্র। কিন্তু পড়ানোর ধরন অন্যরকম।
"ভর্তি পরীক্ষায় Newton-এর প্রথম সূত্র থেকে প্রতি বছর দুইটা MCQ আসে। গত দশ বছরে প্যাটার্ন একই। এই প্যাটার্ন মনে রাখো। Concept বুঝতে সময় লাগে। Shortcut মনে রাখতে দুই মিনিট।"
তিনশো জন লিখে নিল।
জাহিদও লিখল। কিন্তু মনে মনে ভাবল, Newton কি shortcut দিয়ে মহাকর্ষ আবিষ্কার করেছিলেন?
এই প্রশ্ন করার জায়গা এটা না। তিনশো জনের ক্লাসে প্রশ্ন করলে স্যার বিরক্ত হন। পেছনের ছেলেরা হাই তোলে।
৪
দ্বিতীয় ক্লাস। Math। নাহিদ স্যার। "স্টার টিচার।" বিজ্ঞাপনে ছবি সবচেয়ে বড়। ব্যানারে: "নাহিদ স্যারের অঙ্ক ম্যাজিক। ১০০% কমন।"
পনেরো মিনিট দেরিতে এলেন। কোনো ভূমিকা নেই। সরাসরি অঙ্ক।
"Integration। গত পাঁচ বছরে ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় গড়ে তিনটা প্রশ্ন এসেছে। দুইটা substitution, একটা by parts। পাঁচটা টাইপ কভার করলে ৯০% প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।"
পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পাঁচটা টাইপ শেষ। "আজকের জন্য এটুকু।" চলে গেলেন।
এক ঘণ্টাও হলো না।
নাহিদ স্যার সাতটা কোচিংয়ে পড়ান। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা। প্রতিটায় এক ঘণ্টা, তিনশো জন। প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি ছাত্র। মাসে আয় দশ-বারো লাখ।
জাহিদের বাবা CNG চালিয়ে বছরে যা আয় করেন, নাহিদ স্যার মাসে তার চেয়ে বেশি আয় করেন।
কোচিং ব্যবসা। শিক্ষা না, ব্যবসা।
৫
জাহিদের রুটিন এখন এরকম:
সকাল ছয়টায় ওঠা। ছয় থেকে আটটা নিজে পড়া। আটটায় নাস্তা, রুটি আর ডাল। নয়টায় হেঁটে কোচিং। বাসে আট টাকা, হাঁটলে বিশ মিনিট। জাহিদ হাঁটে।
দশটা থেকে দুইটা কোচিং। চারটা ক্লাস।
দুপুরে চানাচুর আর চা। পনেরো টাকা। ভাত খেলে পঞ্চাশ। পঁয়ত্রিশ টাকা বাঁচে প্রতিদিন। মাসে এক হাজারের বেশি। রাকিব ভাইয়ের টাকা যেন একটু বেশিদিন টেকে।
তিনটা থেকে রাত দশটা নিজে পড়া। মেসে ছোট্ট টেবিল, একটা চেয়ার, চারজনের ঘরে তিনজন পড়ছে। ফ্যানের নিচে একটা বাল্ব।
রাত দশটায় রাতের খাবার। ভাত, ডাল, সবজি। পঞ্চাশ টাকা। দিনের একমাত্র ঠিকমতো খাবার।
এগারোটায় আবার পড়া। রাত বারোটায় ঘুম।
চৌদ্দ ঘণ্টা। প্রতিদিন। সাত দিন। কোনো ছুটি নেই।
৬
দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম মডেল টেস্ট। একশো MCQ। এক ঘণ্টা।
জাহিদ পেল ৫৪। র্যাঙ্ক: ৮৭। তিনশোর মধ্যে।
ফলাফলের তালিকা দেয়ালে টানানো হলো। প্রথম তিনজনের নাম লাল কালিতে। ৮২, ৭৯, ৭৬। শেষের দিকে ১৫, ১২, ৯।
৮৭। মাঝামাঝি। আবার মাঝামাঝি। HSC-তে মাঝামাঝি, এখানেও।
পাশ থেকে একটা ছেলে বলল, "ভাই, ৮৭ তো মন্দ না।"
ছেলেটার নাম তানভীর। র্যাঙ্ক ১৪৩। পেয়েছে ৩৮। সে জাহিদের চেয়ে বেশি হতাশ হওয়া উচিত, কিন্তু হাসছে।
"প্রথম টেস্ট তো। শেষ টেস্টে দেখ।"
জাহিদ ভাবল, তানভীর হয়তো ঠিক বলছে। কিন্তু ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হয়েছে। রাকিব ভাইয়ের তিন মাসের টাকা। বাবার দুপুরে না খাওয়ার টাকা। সেই টাকায় ৮৭?
৭
ক্যান্টিনে চায়ের কাপ হাতে তানভীর বলল, "আমি রংপুর। বাবা স্কুলে পিয়ন। মাসে সাত হাজার। কোচিংয়ের টাকা চাচা দিয়েছে। চাচা সৌদি থাকে। বলেছে, ছেলেটাকে ডাক্তার বানাও।"
"তুই কি ডাক্তার হতে চাস?"
তানভীর চুপ থাকল। তারপর বলল, "চাচা বলেছে ডাক্তার, তাই ডাক্তার। নিজে কী চাই, সেটা ভাবার luxury নেই।"
luxury। শব্দটা বিদেশি, কিন্তু একদম সঠিক। নিজের ইচ্ছা একটা luxury যেটা গরিবের নেই।
"তুই কী চাস?"
"জানি না। শুধু জানি, কোথাও একটা চান্স পেতে হবে।"
"সবাই একই কথা বলে। তিনশো জনের মধ্যে দুইশো নব্বই জন জানে না কী হতে চায়। শুধু জানে কোথাও চান্স পেতে হবে।"
তানভীর ঠিকই বলেছে। তিনশো জন একটা দলে ছুটছে। কোথায়? কেন? কারণ সবাই ছুটছে। পাশের জন ছুটছে, তাই আমিও। পুরো জিনিসটা একটা পাল। গরুর পাল যেমন একসাথে ছোটে, মানুষও তাই করে।
৮
তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ক্লাসের পর শামীম স্যারকে একটা প্রশ্ন করতে গেল। Electromagnetic induction। Concept পরিষ্কার হচ্ছে না।
শামীম স্যার বললেন, "ভালো প্রশ্ন। কিন্তু তিনশো জনকে একসাথে concept শেখানো সম্ভব না। তুমি যদি সত্যিই বুঝতে চাও, নিজে পড়ো। Halliday-Resnick কিনে নাও।"
তারপর চারপাশে তাকালেন। কেউ শুনছে না। নিচু গলায় বললেন:
"জাহিদ, একটা কথা বলি। এটা ক্লাসে বলব না। ভালো স্টুডেন্ট নিজে পড়লেও চান্স পায়। কোচিং ছাড়াও চান্স পাওয়া যায়। কিন্তু এটা বলব না ক্লাসে। আমার ব্যবসা আছে।"
জাহিদ থমকে গেল।
স্যার হাসলেন। তিক্ত। "আমি খারাপ মানুষ না। কিন্তু কোচিং সেন্টার চালাতে টাকা লাগে। ছাত্র না আসলে টাকা আসে না। তাই বলি, কোচিং ছাড়া চান্স পাবে না। সবাই বলে। সবাই বিশ্বাস করে। এটাই ব্যবসা।"
"তাহলে আমি কেন ত্রিশ হাজার টাকা দিলাম?"
"কারণ তুমিও বিশ্বাস করেছ। সবাই করেছে। তোমার বাবা-মা ভেবেছে, কোচিংয়ে না দিলে পিছিয়ে পড়বে। পাশের বাসার ছেলে যাচ্ছে, তাই আমার ছেলেকেও যেতে হবে।"
শামীম স্যার কাঁধে হাত রাখলেন। "রাগ কোরো না। টাকাটা নষ্ট হয়নি। কিছু শেখা যায়। কিন্তু বেশিরভাগটা নিজে করতে হবে।"
৯
রাতে মেসে ফিরে জাহিদ বিছানায় বসে রইল।
সোহেল টেবিলে মাথা গুঁজে Chemistry পড়ছে। দিনে ষোলো ঘণ্টা পড়ে। চোখের নিচে কালি। ঠিকমতো খায় না।
মাসুদ বিছানায় শুয়ে। মুখ দেয়ালের দিকে।
"মাসুদ, পড়বি না?"
কোনো উত্তর নেই।
"মাসুদ?"
ফিসফিস করে বলল, "ভাই, আজকে না।"
গলার আওয়াজ কাঁপছে। মাসুদ কাঁদছে। দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ কাঁদছে। সবাই জানে মাসুদ রাতে কাঁদে। প্রায় প্রতি রাতে। কেউ জিজ্ঞেস করে না কেন। জানলে কী করবে? "সব ঠিক হয়ে যাবে" বলবে? সব ঠিক হয় না।
রাজু দুই সপ্তাহ ধরে বাড়িতে ফোন করেনি। জাহিদ জিজ্ঞেস করেছিল কেন।
"ফোন করলে মা কাঁদে। মা কাঁদলে পড়তে পারি না। তাই করি না।"
চারটা ছেলে, চারটা জেলার, চারটা পরিবারের, একটা ঘরে। প্রত্যেকের ঘাড়ে একটা বোঝা। সেই বোঝার নাম "আশা।" বাবা-মায়ের আশা। গ্রামের আশা। না পারলে? সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ ভাবতে চায় না।
মানসিক স্বাস্থ্য। শব্দটা বললে কেউ বোঝে না। কেউ পাত্তা দেয় না। ছেলে পড়ছে, ভালো। ছেলে রাতে কাঁদছে? কাঁদলে কান্না চলে যাবে। পড়ো। পড়লে সব ঠিক হবে।
১০
জাহিদ ডায়েরি বের করল। ছোট, বিশ টাকার, নীল মলাট। একমাত্র জায়গা যেখানে নিজের কথা বলতে পারে।
লিখল:
"শামীম স্যার বললেন, ভালো স্টুডেন্ট নিজে পড়লেও চান্স পায়। তাহলে কোচিং কেন? কারণ সবাই যাচ্ছে। পশুর পাল যেমন একদিকে ছোটে, আমরাও তাই করছি।
ত্রিশ হাজার টাকা। বাবা দুপুরে খাননি ছয় মাস। রাকিব ভাই তিন মাসের টাকা পাঠিয়েছে। আর আমি? ৮৭ নম্বর।
মাসুদ রাতে কাঁদে। রাজু বাড়িতে ফোন করে না। সোহেলের চোখের নিচে কালি। আমি ডায়েরিতে লিখছি। চারজন, চারটা ভিন্ন উপায়ে ভেঙে পড়ছি।
কেউ জিজ্ঞেস করে না, তুমি কেমন আছ? সবাই জিজ্ঞেস করে, কত পেয়েছ?"
১১
চতুর্থ সপ্তাহে দ্বিতীয় মডেল টেস্ট। জাহিদ পেল ৬১। র্যাঙ্ক ৭২। পনেরো ধাপ এগিয়েছে। কিন্তু এখনো মাঝামাঝি।
তুলনাটাই বিষ। তুলনা ছাড়া ৬১ খারাপ না। কিন্তু ৭১-এর পাশে ৬১ কে রাখলে ছোট হয়ে যায়। ঠিক যেমন 4.17 রাসেলের 5.00-এর পাশে ছোট হয়ে যেত।
সেই রাতে তানভীর ফোন করল।
"জাহিদ, একটা আইডিয়া আছে। YouTube-এ ভর্তি পরীক্ষার ভিডিও দেখি। অনেক ভালো চ্যানেল আছে। ফ্রি। কোচিংয়ের চেয়ে ভালো পড়ায় কেউ কেউ। shortcut না, concept।"
"তো?"
"আমরা কয়েকজন মিলে একটা গ্রুপ করি। যে যেটা ভালো পারে, সে বাকিদের পড়াবে। আমি Biology, তুই Math। আরো দুইজন ধরি। কোচিংয়ের পাশাপাশি একটা parallel সিস্টেম। YouTube দেখব, নোট করব, আগের বছরের প্রশ্ন সমাধান করব।"
"খরচ?"
"শূন্য।"
জাহিদ রাজি হলো।
১২
পরের দিন চারজন বসল। তানভীর, জাহিদ, সোহাগ, রুমন।
পরিকল্পনা সোজা। প্রতিদিন বিকাল চারটা থেকে ছয়টা। এক ঘণ্টা YouTube আর আলোচনা, এক ঘণ্টা প্রশ্ন সমাধান। রোটেশনে প্রত্যেকে নিজের strong বিষয় পড়াবে।
সোহাগ বলল, "কোচিংয়ে স্যাররা পড়ান, এটা কি কাজ করবে?"
তানভীর বলল, "পার্থক্য একটা। কোচিংয়ে তিনশো জন, এখানে চারজন। কোচিংয়ে প্রশ্ন করলে স্যার বিরক্ত হন, এখানে যতক্ষণ খুশি প্রশ্ন করো।"
চারজনে হাত মেলাল।
ত্রিশ হাজার টাকার কোচিংয়ের পাশে শূন্য টাকার study group। সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা যাবে না।
হয়তো এটাই পার্থক্য করবে। হয়তো না। কিন্তু অন্তত একটা জিনিস নিশ্চিত: এই চারজন পালের সাথে ছুটছে না। নিজের মতো পথ খুঁজছে। পাল একদিকে যাচ্ছে, তারাও সেদিকে, কিন্তু পায়ে নিজেদের জুতা আছে। পাল থামলে তারা থামবে না।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। মোহাম্মদপুরের রাস্তায় CNG-র আওয়াজ। জাহিদ ভাবল, বাবা এখন হয়তো CNG পার্ক করছেন। আজ কি দুপুরে খেয়েছেন?
ডায়েরিতে লিখবে আজ রাতে: "চারজনে মিলে একটা কিছু শুরু করলাম। নাম নেই। টাকা নেই। শুধু চারটা মাথা আর চারটা ফোনে YouTube। দেখি কী হয়।"
কী হবে, কেউ জানে না। কিন্তু না করার চেয়ে করাটা ভালো। এটুকু জাহিদ শিখেছে। কোচিং থেকে না, নিজের থেকে।