পরীক্ষার দিন

হাজারো মাথায় একটাই প্রশ্ন, ষাট মিনিটে কপাল ফেরে কি না

পর্ব ১৪ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম বাজল। কিন্তু জাহিদ জেগেই ছিল।

রাতে ঘুম আসেনি। চোখ বন্ধ করলে MCQ প্রশ্ন ভাসত। পর্যায় সারণি, ত্রিকোণমিতি, নিউটনের সূত্র, জৈব রসায়ন। সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। তিনটার দিকে একটু তন্দ্রা এসেছিল, তারপর আবার চোখ খুলে গেছে।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক ইউনিটের পরীক্ষা। বিজ্ঞান অনুষদ।

জাহিদ উঠে বসল। পেট মোচড় দিচ্ছে। ক্ষুধা না, ভয়। শরীরটা চিনতে পারছে না। হাত কাঁপছে একটু। গলা শুকনো।

মামার বাসায় সবাই ঘুমাচ্ছে। জাহিদ আস্তে আস্তে বাথরুমে গেল। মুখে পানি দিল। আয়নায় নিজেকে দেখল। চোখের নিচে কালো দাগ। দুই সপ্তাহ ধরে দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুম হয়নি।

মামি উঠে গেছেন। রান্নাঘর থেকে ডাকলেন, "জাহিদ, নাশতা করবি?"

"না, মামি। পারব না।"

"কিছু না খেয়ে পরীক্ষা দিবি? অন্তত একটা কলা খা। আর চা।"

জাহিদ রান্নাঘরে গেল। মামি একটা কলা আর এক কাপ চা দিলেন। কলায় একটা কামড় দিল। গিলতে কষ্ট হলো। পেট বলছে না, মাথা বলছে না।

চায়ে দুই চুমুক দিল। গরম চা একটু ভালো লাগল।

অ্যাডমিট কার্ড চেক করল। তিনবার। ব্যাগে কলম, পেন্সিল, ইরেজার। দুইটা করে কলম নিল। একটা বন্ধ হলে আরেকটা আছে।

বাবা রাতে ফোন করেছিলেন। "ভালো করে দিস। আল্লাহ ভরসা।" মায়ের গলা কাঁপছিল। "আমি নামাজ পড়ব তোর জন্য।"

জাহিদ বের হলো।

সকাল ছয়টায় রাস্তায় নামল।

পরীক্ষা সাড়ে নয়টায়। কিন্তু কোচিং স্যার বলেছিলেন, "অন্তত দুই ঘণ্টা আগে পৌঁছাবে। গেটে ভিড় থাকবে। দেরি করলে ঢুকতে পারবে না।"

মামার বাসা মিরপুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাহবাগে। সোজা রাস্তায় ত্রিশ মিনিট। কিন্তু ঢাকায় সোজা রাস্তা বলে কিছু নেই।

বাস স্টপে দাঁড়াল। দশ মিনিট পর একটা বাস এলো। ঠাসাঠাসি। দরজায় ঝুলে উঠল। পা রাখার জায়গা নেই। একটা রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

বাসের ভেতর গরম, ঘাম, গন্ধ। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে না। পাশে দাঁড়ানো আরেকটা ছেলে, হাতে ফাইল। সেও পরীক্ষার্থী।

ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, "ক ইউনিট?"

"হ্যাঁ।"

"কোন সেন্টার?"

"কার্জন হল।"

"আমারও।"

দুজনে চুপ হয়ে গেল। কথা বলার শক্তি নেই। বাস ফার্মগেটে এসে আটকে গেল। জ্যাম। পনেরো মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে।

জাহিদ ঘড়ি দেখল। সাতটা পনেরো। এখনো ঘণ্টা দেড়েক আছে। কিন্তু বাস নড়ছে না।

পেটে আবার মোচড়। এবার সত্যিকারের। বাথরুম লাগছে। কিন্তু বাসে বাথরুম নেই। ঢাকার রাস্তায় বাথরুম নেই। সহ্য করতে হবে।

বাস নড়ল। থামল। আবার নড়ল। শাহবাগ আসতে নব্বই মিনিট লাগল। ত্রিশ মিনিটের রাস্তা।

জাহিদ বাস থেকে লাফ দিয়ে নামল। পায়ে ব্যথা, কিন্তু দৌড়াল।

কার্জন হলের সামনে পৌঁছে জাহিদ থামল।

মানুষ। শুধু মানুষ। হাজার হাজার।

রাস্তার দুই পাশে ছেলেমেয়ে। হাতে অ্যাডমিট কার্ড, ফাইল, কলম। মুখে আতঙ্ক। কারো চোখ লাল, কেউ ফিসফিস করে সূত্র আওড়াচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, "মা, পৌঁছে গেছি।"

মেলার মতো ভিড়। কিন্তু মেলায় আনন্দ থাকে। এখানে আনন্দের বদলে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা ভারী নিশ্বাস, একটা অদৃশ্য ভয় যেটা সবার বুকে চেপে বসে আছে।

TSC-র সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের স্রোত। কেউ একা, কেউ দলে। কিছু অভিভাবক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। এক বাবা ছেলেকে বললেন, "যা, ভালো করে দে। আমি এইখানে বসি।" ছেলেটা মাথা নাড়ল, ঘুরে তাকাল না।

জাহিদ লাইনে দাঁড়াল। লাইন লম্বা। দুইশো, তিনশো, হয়তো আরো বেশি।

সামনে একটা মেয়ে হঠাৎ টলে গেল। পাশের মেয়ে ধরল। "কী হইছে?" "মাথা ঘুরছে।" "পানি খা।" মেয়েটা বোতল থেকে পানি খেল, একটু সামলে নিল।

কেউ থামল না। থামার সুযোগ নেই। এই লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটা মানুষ নিজের যুদ্ধ লড়ছে। অন্যের যুদ্ধে মনোযোগ দেওয়ার মতো বাড়তি শক্তি কারো নেই।

গেটে পুলিশ। ব্যাগ চেক, অ্যাডমিট কার্ড চেক, পরিচয়পত্র চেক। একটা করে ঢুকছে।

জাহিদের পালা এলো। পুলিশ অ্যাডমিট কার্ড দেখল, মুখের দিকে তাকাল, ব্যাগ খুলে দেখল। "যাও।"

ভেতরে ঢুকল জাহিদ।

পরীক্ষার হল। বিশাল। পাঁচশো আসন।

সারি সারি বেঞ্চ। প্রতিটা বেঞ্চে একটা করে রোল নম্বর সাঁটা। জাহিদ নিজের রোল খুঁজতে লাগল। তৃতীয় সারি, বাঁ দিক থেকে সাত নম্বর।

বসল।

পাশে একটা ছেলে ইতিমধ্যে বসে আছে। চোখ বন্ধ করে কিছু মনে করছে। ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু শব্দ নেই। হয়তো সূত্র, হয়তো দোয়া।

জাহিদ কলম বের করল। দুইটা কলম, একটা পেন্সিল, ইরেজার। টেবিলে সাজিয়ে রাখল। অ্যাডমিট কার্ড টেবিলের কোণায়।

হলে গুনগুন শব্দ। পাঁচশো মানুষ, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ পা ঝাঁকাচ্ছে, কেউ আঙুলে টেবিল ঠকঠক করছে। স্নায়ুর চাপ শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসছে।

ঘড়িতে সাড়ে নয়টা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।

পরীক্ষক এলেন। দুইজন। হাতে প্রশ্নপত্রের বান্ডিল আর OMR শিট।

"মোবাইল ফোন থাকলে বন্ধ করে ব্যাগে রাখো। ব্যাগ সামনে রাখো। টেবিলে শুধু কলম, পেন্সিল, ইরেজার, অ্যাডমিট কার্ড।"

OMR শিট দেওয়া হলো। জাহিদ হাতে নিল। পাতলা কাগজ। এই কাগজে কিছু বৃত্ত ভরাট করবে। সেই বৃত্তগুলো মেশিনে যাবে। মেশিন বলবে পাশ না ফেল।

একটা কাগজ। একটা মেশিন। একটা জীবন।

প্রশ্নপত্র বিতরণ শুরু হলো।

"সময় শুরু।"

জাহিদ প্রশ্নপত্র খুলল। একশো প্রশ্ন। ষাট মিনিট। প্রতি প্রশ্নে ছত্রিশ সেকেন্ড।

নেগেটিভ মার্কিং। প্রতিটা ভুল উত্তরে 0.25 কাটা যাবে। মানে শুধু জানলেই হবে না, কতটুকু জানি সেটাও জানতে হবে। আন্দাজে দিলে ক্ষতি।

প্রথম প্রশ্ন। পদার্থবিদ্যা। তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংক্রান্ত। জানা। বৃত্ত ভরাট করল। আত্মবিশ্বাস একটু বাড়ল।

দ্বিতীয়। রসায়ন। জারণ-বিজারণ। জানা। ভরাট।

তৃতীয়। গণিত। সম্ভাব্যতা। জানা।

প্রথম দশটা প্রশ্ন ভালো গেল। আটটায় নিশ্চিত, দুইটায় একটু ভাবতে হলো কিন্তু পারল।

এগারো থেকে কুড়ি। এখানে কঠিন হতে শুরু করল। জীববিজ্ঞানের একটা প্রশ্ন, কোষ বিভাজনের ধাপ। পড়েছিল, কিন্তু দুইটা অপশন একই রকম লাগছে। সময় যাচ্ছে। ত্রিশ সেকেন্ড হয়ে গেল। একটা দাগিয়ে দিল, পরেরটায় গেল।

একুশ থেকে পঞ্চাশ। মাঝামাঝি অংশ। এখানে জাহিদ বুঝল, পরীক্ষাটা আসলে কী।

কিছু প্রশ্ন জানা। কিছু প্রশ্ন অর্ধেক জানা। আর কিছু প্রশ্ন দেখে মনে হলো এটা কি সিলেবাসে ছিল? ছিল। পড়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে সব মনে নেই।

ঘড়ি দেখল। ত্রিশ মিনিট শেষ। পঞ্চাশটা প্রশ্ন বাকি। ত্রিশ মিনিট।

হাত ঘামছে। কলম পিছলে যাচ্ছে। OMR শিটে একটা বৃত্ত একটু বাইরে চলে গেল। ইরেজার দিয়ে মুছল। আরো সময় গেল।

একান্ন থেকে সত্তর। এই অংশে জাহিদ ভাসতে লাগল।

রসায়নের একটা প্রশ্ন। জৈব যৌগের নামকরণ। চারটা অপশন, তিনটাই সম্ভব মনে হচ্ছে। পড়েছিল, কিন্তু কোনটা সঠিক সেটা ধোঁয়াশা।

ফেলে রাখল। পরে আসবে।

গণিতে একটা সমাকলন। মাথায় ঢুকছে না। কোচিংয়ে এই টাইপ করেছিল, কিন্তু এখন মাথা কাজ করছে না। ঘুমের অভাব, খাওয়ার অভাব, সব একসাথে চাপ দিচ্ছে।

পদার্থবিদ্যার একটা প্রশ্ন। তাপগতিবিদ্যা। সূত্র মনে আছে, কিন্তু কোথায় কোনটা বসাবে সেটা গুলিয়ে যাচ্ছে।

জাহিদ দুইটা প্রশ্ন ফেলে রাখল। এগুলো জানি না, নেগেটিভ মার্কিং খাওয়ার চেয়ে না দেওয়া ভালো।

একাত্তর থেকে একশো। শেষ ত্রিশটা।

সময় বাকি বিশ মিনিট।

জাহিদের হাত কাঁপছে। না ভয়ে, না ক্লান্তিতে, দুইটাই। পাশের ছেলে দ্রুত বৃত্ত ভরাট করছে। ওর হাত কাঁপছে না। ও কি সব পারছে, নাকি আন্দাজে দিচ্ছে?

তুলনা করার সময় নেই।

শেষ ত্রিশটায় জাহিদ পনেরোটা পারল। দশটায় আন্দাজ করল, কিন্তু যুক্তি দিয়ে আন্দাজ, অন্ধ আন্দাজ না। পাঁচটা ফেলে রাখল।

ঘণ্টা বাজল।

"কলম রাখো।"

জাহিদ কলম রাখল। হাত টেবিলে নামিয়ে রাখল। আঙুলগুলো শিথিল হলো। ষাট মিনিট ধরে যে টান ছিল শরীরে, সেটা একসাথে ছেড়ে দিল।

OMR শিট জমা দিল। হল থেকে বেরিয়ে এলো।

বাইরে আরো বড় পরীক্ষা শুরু হলো।

"১৭ নম্বরের উত্তর কী দিলি?"

"খ।"

"না, গ হবে। অক্সিজেনের জারণ সংখ্যা..."

"৩২ নম্বর? সমাকলনটা?"

"আমি ক দিছি।"

"ক? সেটা তো ভুল। ঘ হবে।"

গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েরা উত্তর মেলাচ্ছে। প্রতিটা প্রশ্ন নিয়ে তর্ক। কেউ হাসছে, "এইটা পেরেছি!" কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, "এইটা ভুল দিছি, জানা ছিল, তাও ভুল দিছি।"

জাহিদ শুনল। না শোনার চেষ্টা করল, কিন্তু কানে আসছে।

"৪৫ নম্বর?"

"গ।"

জাহিদ দিয়েছিল খ। পেটে হুল ফুটল। ভুল? সত্যিই ভুল? নাকি ওরা ভুল?

জানার উপায় নেই। কিন্তু প্রতিটা ভুল শুনলে মনে হচ্ছে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে।

জাহিদ ভিড় থেকে সরে এলো। একটা গাছের নিচে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করল। পানি খেল। হাত এখনো কাঁপছে।

মাথায় হিসাব শুরু হলো। প্রথম বিশটায় আঠারো নিশ্চিত। পরের ত্রিশটায় হয়তো আঠারো-কুড়ি। তারপরের ত্রিশটায় বারো-পনেরো। শেষ কুড়িটায় দশ-বারো।

মোট? পঁচান্ন থেকে ষাট। হয়তো।

নেগেটিভ মার্কিং বাদ দিলে? পঞ্চাশ? বাহান্ন?

কাটঅফ কত হবে কেউ জানে না। গত বছর ছিল ষাটের কাছাকাছি। এ বছর? প্রশ্ন কঠিন ছিল, তাহলে কাটঅফ কমবে? নাকি সবাই ভালো করেছে?

জানার কোনো উপায় নেই। শুধু অপেক্ষা।

বিকেলে মামার বাসায় ফিরল। মামি জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন হইছে?"

"মোটামুটি।"

এই উত্তরটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সৎ উত্তর। ভালো বলতে সাহস নেই, খারাপ বলতে চায় না। মোটামুটি মানে মাঝখানে। মাঝখানে মানে অনিশ্চিত। অনিশ্চিত মানে অপেক্ষা।

মামি ভাত দিলেন। জাহিদ খেল। সকাল থেকে কিছু খায়নি। ভাতের স্বাদ পেল না, কিন্তু পেট ভরল।

খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। ঘুম আসছে না। মাথায় ঘুরছে ১৭ নম্বর, ৩২ নম্বর, ৪৫ নম্বর।

ফোন বেজে উঠল। বাবা।

"কেমন হলো?"

"ভালো হইছে, বাবা।" মিথ্যা বলল। বাবাকে চিন্তায় ফেলতে চাইল না।

"আলহামদুলিল্লাহ। পরেরটা কবে?"

"পরশু BUET।"

"তাহলে আজ বিশ্রাম নে। কাল আবার পড়বি।"

ফোন রাখল।

বিশ্রাম। শব্দটা হাস্যকর লাগল। বিশ্রাম কীভাবে নেবে? আজকের পরীক্ষার চিন্তা শেষ হয়নি, পরশুর পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। এর মাঝে ঘুমাতে হবে, খেতে হবে, বেঁচে থাকতে হবে।

পরের তিন সপ্তাহ ছিল যুদ্ধক্ষেত্র।

BUET-র পরীক্ষা। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত। তিন ঘণ্টা। লিখিত। MCQ না, বর্ণনামূলক। সম্পূর্ণ আলাদা প্রস্তুতি।

BUET-র হলে ঢুকে জাহিদ বুঝল, এখানকার প্রতিযোগীরা আলাদা। পাশের ছেলে ক্যালকুলেশন করছে মাথায়, কাগজে হাত দেয়নি। জাহিদ তখনো প্রশ্ন পড়ছে।

পরীক্ষার পর রাসেল ফোন করল।

"কেমন হলো?"

"ভালো।" আবার মিথ্যা।

"আমার খুব ভালো হইছে। ফিজিক্সটা সোজা ছিল, তাই না?"

"হ্যাঁ।" সোজা ছিল না।

রাসেল 5.00 পেয়েছিল। ওর জগৎ আলাদা। ওর কাছে কঠিন আর জাহিদের কাছে কঠিন এক জিনিস না।

তারপর মেডিকেল। ঢাকা মেডিকেলে পরীক্ষা। জীববিজ্ঞান ভারী। জাহিদ সায়েন্সের ছাত্র, কিন্তু মেডিকেলের জীববিজ্ঞান আলাদা মাত্রার। প্রশ্নের গভীরতা আলাদা। একটা প্রশ্নে জিনতত্ত্বের এত খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করল যে জাহিদ ভাবল, এটা কি মাস্টার্সের প্রশ্ন?

তারপর RUET। রাজশাহীতে। বাস ভাড়া সাতশো টাকা, এক রাত থাকা, পরীক্ষা দেওয়া, আবার ফেরা। দুই দিনের ট্রিপে দেড় হাজার টাকা খরচ।

তারপর জাহাঙ্গীরনগর। তারপর জগন্নাথ। তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাতটা পরীক্ষা। তিন সপ্তাহে।

প্রতিটা পরীক্ষায় আলাদা সিলেবাস, আলাদা প্যাটার্ন, আলাদা কাটঅফ। কোনোটা MCQ, কোনোটা লিখিত, কোনোটায় নেগেটিভ মার্কিং আছে, কোনোটায় নেই।

একটা শরীর। একটা মাথা। সাতটা যুদ্ধ।

১০

শরীর ভাঙতে শুরু করল।

তৃতীয় পরীক্ষার পর সর্দি লাগল। নাক বন্ধ, গলা ব্যথা, মাথা ভারী। ওষুধ খেল, প্যারাসিটামল আর একটা অ্যান্টিহিস্টামিন। সর্দি কমল না।

চতুর্থ পরীক্ষায় গেল সর্দি নিয়ে। হলে বসে নাক ঝাড়ছিল বারবার। পাশের ছেলে বিরক্ত হলো। পরীক্ষক তাকালেন। জাহিদ লজ্জায় মরে গেল।

ঘুম কমে গেছে। রাতে তিন-চার ঘণ্টা। বাকি সময় পড়া। কিন্তু পড়া মাথায় ঢুকছে না। একই পৃষ্ঠা তিনবার পড়ছে, কিছু মনে থাকছে না।

খাওয়া অনিয়মিত। সকালে চা আর বিস্কুট। দুপুরে কখনো ভাত, কখনো কিছু না। রাতে মামির রান্না। কিন্তু খিদে নেই। পেট ভরা না, মাথা ভরা।

ওজন কমে গেছে। মামি বললেন, "তোর গাল ভেঙে গেছে।"

সুমাইয়া ফোন করল একদিন। "তুই কেমন আছিস?"

"আছি।"

"মানে?"

"মানে বেঁচে আছি। এটাই এখন অ্যাচিভমেন্ট।"

সুমাইয়া হাসল না। বলল, "আমারও একই অবস্থা। মেডিকেলের পর থেকে ঘুম নেই। মা বলছে ডাক্তার দেখা। আমি বলছি পরীক্ষা শেষ হোক।"

দুজনে কিছুক্ষণ চুপ থাকল।

সুমাইয়া বলল, "জাহিদ, একটা কথা বলি?"

"বল।"

"এই সিস্টেমটা পাগলামো। একটা দেশে এত পরীক্ষা কেন? একটা কমন পরীক্ষা দিলেই তো হতো। আমরা মানুষ, মেশিন না।"

জাহিদ কিছু বলল না। সুমাইয়া ঠিকই বলেছে। কিন্তু সিস্টেম নিয়ে ভাবার সময় এখন না। সিস্টেমের ভেতরে টিকে থাকাটাই এখন কাজ।

১১

শেষ পরীক্ষা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা থেকে ট্রেনে গেল। রাতের ট্রেন, সকালে পৌঁছানো। ট্রেনে ঘুমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সিট শক্ত, মানুষ গাদাগাদি, আর মাথায় সূত্র ঘুরছে।

সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে CNG নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। পরীক্ষা দিল।

এই পরীক্ষায় জাহিদ কিছু অনুভব করল না। না ভয়, না উত্তেজনা, না আশা। শুধু যান্ত্রিকভাবে প্রশ্ন পড়ল, উত্তর দাগাল, শিট জমা দিল।

শরীর আর মন দুটোই ফুরিয়ে গেছে। রিজার্ভে যা ছিল, সেটাও শেষ।

পরীক্ষার পর ক্যাম্পাসের একটা ভবনের সিঁড়িতে বসল।

চারপাশে ছাত্রছাত্রীরা চলে যাচ্ছে। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ ফোনে কথা বলছে। জীবন চলছে।

জাহিদ বসে রইল।

সিঁড়িটা ঠান্ডা। বিকেলের হালকা বাতাস আসছে। দূরে গাছের সারি। আকাশ পরিষ্কার।

সুন্দর জায়গা। অন্য সময় হলে ভালো লাগত।

এখন কিছু লাগছে না। ভেতরটা ফাঁকা। না আনন্দ, না কষ্ট, না ভয়। শুধু ফাঁকা।

সব দিয়েছে। যা পেরেছে, দিয়েছে। যা পারেনি, সেটাও চেষ্টা করেছে।

এখন?

অপেক্ষা।

১২

ফেরার ট্রেনে জানালার পাশে বসল।

বাইরে অন্ধকার। মাঝে মাঝে একটা গ্রামের আলো দেখা যাচ্ছে। তারপর আবার অন্ধকার।

ফোন বের করল। মায়ের মিসড কল। কল ব্যাক করল।

"মা।"

"শেষ হইছে?"

"হ্যাঁ, সব শেষ।"

"আলহামদুলিল্লাহ। এখন বাসায় আয়। বিশ্রাম নে।"

"আসছি, মা।"

"জাহিদ?"

"বল।"

"তুই যা পারছিস, তা-ই যথেষ্ট। বাকিটা আল্লাহর হাতে।"

জাহিদ ফোন রাখল। চোখ বন্ধ করল।

মায়ের কথাটা সত্যি। কিন্তু সত্যি হলেও মনে শান্তি আসছে না। কারণ "বাকিটা আল্লাহর হাতে" মানে "বাকিটা আমার হাতে নেই।" আর যেটা নিজের হাতে নেই, সেটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা।

ট্রেন চলছে। ঝিকঝিক শব্দ। জাহিদের চোখ ভারী হয়ে এলো।

তিন সপ্তাহে প্রথমবার, কোনো পরীক্ষার চিন্তা নেই। কাল কোনো সিলেবাস নেই। কাল কোনো অ্যালার্ম নেই।

শুধু অপেক্ষা। ফলাফলের।

অপেক্ষা সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরীক্ষা। এতে কোনো প্রশ্নপত্র নেই, কোনো সময়সীমা নেই, কোনো OMR শিট নেই। শুধু একটা প্রশ্ন, দিনরাত মাথায় ঘুরছে।

হলো, নাকি হলো না?

ট্রেন ঢাকার দিকে যাচ্ছে। জাহিদ ঘুমিয়ে পড়ল। তিন সপ্তাহে প্রথম গভীর ঘুম।

বাইরে বাংলাদেশ ঘুমাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর বাবা-মা জেগে আছেন। তাঁদেরও একটাই প্রশ্ন।

হলো, নাকি হলো না?