ফলাফলের গণিত
সাতটা পরীক্ষা, তিনটা চান্স, একটা স্প্রেডশিট, আর একটা সিদ্ধান্ত যেটা নেওয়া যাচ্ছে না
১
প্রথম রেজাল্টটা এলো মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঘ ইউনিট।
জাহিদ বাথরুমে বসে ফোনে রেজাল্ট দেখল। বাথরুমে, কারণ বাইরে বসলে মিম পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে, মা রান্নাঘর থেকে উঁকি দেবেন, বাবা ভান করবেন দেখছেন না কিন্তু কান পাতা থাকবে।
ওয়েবসাইট লোড হতে তিন মিনিট লাগল। সারা দেশের লাখ খানেক ছেলেমেয়ে একসাথে রেজাল্ট দেখছে। সার্ভার হাঁপাচ্ছে।
পেজ লোড হলো।
রোল নম্বর দিল। সাবমিট।
"আপনি উত্তীর্ণ হননি।"
চার শব্দ। লাল অক্ষরে। স্ক্রিনের মাঝখানে।
জাহিদ ফোন রেখে দিল কমোডের ওপর। হাত ধুল। আয়নায় নিজের মুখ দেখল। তারপর বাথরুম থেকে বের হলো।
মা জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো?"
"হয়নি।"
মা কিছু বললেন না। একটু পরে বললেন, "চা খাবি?"
"না।"
জাহিদ ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। কান্না আসছিল না। রাগও না। একটা শূন্যতা। যেন ভেতরের কোনো একটা তার ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু ব্যথা এখনো আসেনি।
কাটঅফ ছিল বাহাত্তর। জাহিদ পেয়েছে আটান্ন।
চৌদ্দ নম্বরের ব্যবধান। চৌদ্দ নম্বর মানে কী? মানে চৌদ্দটা MCQ যেগুলো সে পারেনি, অথবা পেরেছিল কিন্তু নেগেটিভ মার্কিংয়ে খেয়ে গেছে। চৌদ্দটা গোল্লা। চৌদ্দটা ভুল সিদ্ধান্ত, চৌদ্দটা মুহূর্ত যখন সে A-র বদলে B-তে টিক দিয়েছিল।
চৌদ্দ নম্বর। এত কাছেও না, এত দূরেও না। ঠিক মাঝামাঝি কোথাও। যেখানে আশাও করা যায় না, আফসোসও করা যায় না।
২
পরের সপ্তাহে BUET।
এটা আশা করেনি জাহিদ। BUET-এর পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময়ই বুঝেছিল, হবে না। বারোশো সিটের জন্য বারো হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। প্রতি দশ জনে একজন চান্স পায়। জাহিদ সেই একজন না।
রেজাল্ট দেখল। নাম নেই।
এবার কোনো শূন্যতা হলো না। BUET-এর রেজাল্ট দেখা ছিল আনুষ্ঠানিকতা। জানত হবে না, হলো না। ব্যস।
কিন্তু বাইরের দুনিয়ায় খবরটা আলাদা ওজন বহন করে। রাসেল চান্স পেয়েছে। EEE। পুরো গলিতে খবর ছড়িয়ে গেছে। রাসেলের বাবা মিষ্টি বিলিয়েছেন। মসজিদে শুকরিয়ার নামাজ পড়েছেন।
জাহিদের মা রাসেলের বাড়িতে গিয়ে মোবারকবাদ জানিয়ে এসেছেন। ফিরে এসে জাহিদকে বলেছেন, "রাসেলের মা খুব খুশি। বলছিলেন, ছেলেটা সারারাত পড়ত।"
জাহিদও সারারাত পড়ত। কিন্তু সারারাত পড়লেই BUET হয় না। সারারাত পড়া একটা প্রয়োজনীয় শর্ত, যথেষ্ট শর্ত না।
৩
মেডিকেল। জুনের প্রথম সপ্তাহে।
কাটঅফ আটাত্তর। জাহিদ পেয়েছে বাষট্টি।
এবার ষোলো নম্বরের ব্যবধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি। মেডিকেলের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। বায়োলজি কখনো জাহিদের শক্তিশালী বিষয় ছিল না।
তিন-তিনটা রিজেকশন।
জাহিদ হিসাব করল। ভর্তি পরীক্ষার কোচিং, তিনটা পরীক্ষার ফি, ঢাকায় যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, বই, মডেল টেস্ট। সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
পঞ্চাশ হাজার টাকা। বাবার তিন মাসের বেশি সময়ের নেট আয়। তিন-তিনটা "আপনি উত্তীর্ণ হননি" কেনা হয়েছে এই টাকায়।
জাহিদ ভাবল, এই পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বাবা CNG-র ইঞ্জিন বদলাতে পারতেন। পুরো পরিবার দুই মাস আরাম করে খেতে পারত। মিমের জন্য ভালো একটা কোচিং নেওয়া যেত।
কিন্তু এই টাকা গেছে তিনটা ওয়েবসাইটে লাল অক্ষরে "উত্তীর্ণ হননি" পড়ার জন্য।
৪
RUET-এর রেজাল্ট এলো জুনের শেষে।
Waitlisted।
এটা নতুন একটা শব্দ জাহিদের অভিধানে। হ্যাঁও না, নাও না। মাঝখানে ঝুলে থাকা। কেউ যদি সিট ছেড়ে দেয়, তাহলে জাহিদের নম্বর আসতে পারে। যদি কেউ না ছাড়ে, তাহলে না।
জাহিদের ভাগ্য অন্য কারো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। কোনো অচেনা ছেলে বা মেয়ে, যাকে জাহিদ চেনে না, যে জাহিদকে চেনে না, সে যদি RUET ছেড়ে BUET বা ঢাবিতে যায়, তাহলে জাহিদের একটা সিট খালি হবে।
অপেক্ষা। অনিশ্চয়তার সবচেয়ে খারাপ রূপ। হ্যাঁ বা না, দুটোই সহ্য করা যায়। "হয়তো" সহ্য করা কঠিন।
৫
কিন্তু দুটো জায়গায় চান্স পেয়েছে জাহিদ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। রসায়ন বিভাগ।
ফোনে রেজাল্ট দেখে জাহিদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল: "চান্স পেয়েছি।" দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া: "রসায়ন?"
রসায়ন জাহিদের প্রথম পছন্দ ছিল না। দ্বিতীয়ও না। তৃতীয়ও না। সে চেয়েছিল CSE বা EEE। কিন্তু জগন্নাথের ভর্তি পরীক্ষায় যে নম্বর পেয়েছে, তাতে CSE বা EEE-তে কাটঅফের ধারেকাছেও না। রসায়নে কাটঅফ কম, তাই চান্স পেয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। নামটা শুনলে মানুষ বলে, "ও, পুরান ঢাকায়?" হ্যাঁ, পুরান ঢাকায়। নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই বললেই চলে। হলে সিট পাওয়া যায় না বললেই চলে। কিন্তু এটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এটা ঢাকায়। এটা একটা "ব্র্যান্ড"।
আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। স্থানীয় কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স।
এটা শুনলে মানুষ বলে, "ও, ন্যাশনালে?" গলায় একটা সূক্ষ্ম অবজ্ঞা। যেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আসলে বিশ্ববিদ্যালয় না, একটা সান্ত্বনা পুরস্কার। "কোথাও না পেলে ন্যাশনালে যাও।"
কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান। ফিজিক্স। জাহিদের পছন্দের বিষয়। আর স্থানীয় কলেজ মানে বাড়ি থেকে পড়া যায়। থাকা-খাওয়ার আলাদা খরচ নেই।
৬
তৃতীয় অপশন: একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। CSE। পঞ্চাশ শতাংশ স্কলারশিপ।
এই চিঠিটা পড়ে জাহিদের বুক কেঁপে উঠেছিল। CSE। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। এটাই সে চেয়েছিল। এটাই "হট" ফিল্ড। এটা পড়লে চাকরি পাওয়া সহজ। বেতন ভালো। ফ্রিল্যান্সিং করা যায়।
পঞ্চাশ শতাংশ স্কলারশিপ। শুনতে ভালো। মানে টিউশন ফি অর্ধেক। কিন্তু অর্ধেকটাও কত?
জাহিদ ক্যালকুলেটর বের করল।
সেমিস্টার ফি: ত্রিশ হাজার (স্কলারশিপের পর)। বছরে দুটো সেমিস্টার। মানে বছরে ষাট হাজার। প্লাস ঢাকায় থাকা-খাওয়া মাসে আট হাজার ধরলে বছরে ছিয়ানব্বই হাজার। বই, যাতায়াত, অন্যান্য আরো চব্বিশ হাজার। বছরে মোট: প্রায় এক লাখ আশি হাজার। চার বছরে: সাত লাখ বিশ হাজার।
সাত লাখ।
বাবার বার্ষিক নেট আয় দেড় লাখের কাছাকাছি।
মানে বাবার পুরো আয় দিলেও পাঁচ বছর লাগবে। পরিবারের বাকিরা কী খাবে সেই পাঁচ বছর?
জাহিদ চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে দিল।
৭
রাতে খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসল। বাবা, মা, জাহিদ, মিম। রাকিব ফোনে আছে, স্পিকারে।
বাবা বললেন, "তিনটা জায়গায় চান্স পেয়েছিস। কোনটায় যাবি?"
জাহিদ তিনটা অপশন বলল। জগন্নাথে রসায়ন। ন্যাশনালে ফিজিক্স। প্রাইভেটে CSE।
বাবা প্রথম কথা বললেন: "যেটায় কম খরচ।"
এটা বাবার ভাষা। বাবা জীবনটাকে দেখেন খরচের হিসাবে। কারণ বাবার কাছে টাকাই সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য জিনিস। যে জিনিস সবচেয়ে কম আছে, সেটাই সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।
মা বললেন, "যেটায় ভালো ভবিষ্যৎ।"
মায়ের ভাষা আলাদা। মা দেখেন দীর্ঘমেয়াদে। মায়ের চোখে আজকের খরচ কাল শোধ হয়ে যাবে, যদি ভবিষ্যৎ ভালো হয়। মা জানেন না কোনটায় ভালো ভবিষ্যৎ, কিন্তু মা জানেন ভবিষ্যৎটাই আসল।
রাকিব ফোন থেকে বলল, "যেটায় তোর মন চায়।"
তিনজন, তিনটা উত্তর। খরচ। ভবিষ্যৎ। মন।
তিনটাই সঠিক। তিনটাই অসম্পূর্ণ।
৮
খাওয়ার পর জাহিদ ঘরে গিয়ে বিছানায় বসল।
মাথায় তিনটা অপশন ঘুরছে। প্রত্যেকটার পক্ষে যুক্তি আছে, বিপক্ষেও।
জগন্নাথ। সরকারি। ঢাকায়। ব্র্যান্ড ভ্যালু আছে। কিন্তু রসায়ন। জাহিদ রসায়নে ক্যারিয়ার করতে চায় না। রসায়ন পড়ে কী হবে? BCS দেবে? গবেষণা করবে? ইন্ডাস্ট্রিতে রসায়নের চাকরি আছে, কিন্তু সীমিত। আর ঢাকায় থাকার খরচ আছে। হলে সিট না পেলে মেসে থাকতে হবে, মাসে সাত-আট হাজার শুধু থাকা-খাওয়া।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। স্থানীয় কলেজ। বাড়ি থেকে পড়া যায়। পদার্থবিজ্ঞান, যেটা জাহিদের পছন্দ। খরচ একদম কম, মাসে তিন হাজারের মধ্যে সব হয়ে যায়। কিন্তু "ন্যাশনাল" ট্যাগ। চাকরির বাজারে এই ট্যাগ একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে। অনেক কোম্পানি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দেখলে আগ্রহ হারায়। সত্যি কিনা জানা নেই, কিন্তু ধারণাটা আছে। আর ধারণাই তো বাস্তবতা তৈরি করে।
প্রাইভেট। CSE। স্বপ্নের বিষয়। চাকরির বাজারে সবচেয়ে চাহিদা। কিন্তু খরচ? মাসে পনেরো হাজার? কোত্থেকে আসবে এই টাকা? ব্যাংক লোন? শিক্ষা ঋণ? বাবার কাঁধে আরো বোঝা?
৯
পাড়ায় খবর ছড়িয়ে গেছে। জাহিদ জগন্নাথে চান্স পেয়েছে।
"জগন্নাথ" শব্দটা শুনে মানুষের প্রতিক্রিয়া: "বাহ, সরকারি!" কেউ জিজ্ঞেস করে না কোন বিষয়ে। সরকারি, এটাই যথেষ্ট।
পাশের বাসার জামিল ভাই বললেন, "জগন্নাথে যা, ভাই। সরকারি সার্টিফিকেট। BCS দিতে পারবি। সরকারি চাকরি পাবি।"
চায়ের দোকানে আনোয়ার চাচা বললেন, "ঢাকায় গেলে নেটওয়ার্ক হবে। নেটওয়ার্কই আসল।"
মামা ফোন করে বললেন, "জগন্নাথে যা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। ন্যাশনালে গেলে লোকে কী বলবে?"
"লোকে কী বলবে।" এই বাক্যটা বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত-প্রভাবক। কোনো ডেটা না, কোনো যুক্তি না, কোনো হিসাব না। শুধু "লোকে কী বলবে।"
পুরো পাড়া, পুরো আত্মীয়সভা, পুরো সমাজ একটা দিকে চাপ দিচ্ছে: জগন্নাথ।
কারণ জগন্নাথ সরকারি। জগন্নাথ ঢাকায়। জগন্নাথ শুনলে মানুষ মাথা নাড়ে।
কেউ জিজ্ঞেস করছে না: রসায়নে পড়ে জাহিদ কী করবে? রসায়নে চাকরির বাজার কেমন? রসায়নে গড় বেতন কত? জগন্নাথে রসায়নে পড়া বাস্তবে কী জীবন দেবে জাহিদকে?
কেউ এই প্রশ্নগুলো করছে না। কারণ এই প্রশ্নগুলো পাল বা দলের প্রশ্ন না। পাল চলে অনুভূতিতে, স্ট্যাটাসে, নামে। পাল ডেটা দেখে না।
১০
রাত এগারোটায় জাহিদ বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নিল।
Google Sheets খুলল।
হ্যাঁ, ফোনে। ল্যাপটপ নেই জাহিদের। ছোট্ট একটা Android ফোন, স্ক্রিন ফাটা, ব্যাটারি দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু Google Sheets চলে।
একটা নতুন শিট খুলল। নাম দিল: "হিসাব।"
প্রথম কলাম: অপশন। দ্বিতীয় কলাম: চার বছরের মোট খরচ। তৃতীয় কলাম: পাশ করার পর প্রথম বেতন (আনুমান)। চতুর্থ কলাম: দশ বছরে মোট আয় (আনুমান)। পঞ্চম কলাম: ROI।
ROI শব্দটা জাহিদ শিখেছে YouTube থেকে। Return on Investment। কত টাকা ঢালছ, কত টাকা ফেরত পাচ্ছ। ব্যবসার ভাষা। কিন্তু পড়ালেখাও কি ব্যবসা না? বিনিয়োগ করছ সময় আর টাকা, ফেরত চাইছ ক্যারিয়ার আর আয়।
জাহিদ লিখতে শুরু করল।
১১
জগন্নাথ, রসায়ন।
টিউশন ফি: সরকারি, তাই কম। সেমিস্টারে প্রায় দুই হাজার। চার বছরে ষোলো হাজার।
থাকা-খাওয়া: ঢাকায় মেস। মাসে সাত হাজার ধরলে বছরে চুরাশি হাজার। চার বছরে তিন লাখ ছত্রিশ হাজার।
বই, যাতায়াত, অন্যান্য: মাসে দুই হাজার। চার বছরে ছিয়ানব্বই হাজার।
চার বছরের মোট: প্রায় চার লাখ আটচল্লিশ হাজার। ধরো চার লাখ পঞ্চাশ হাজার।
পাশ করার পর? রসায়নে চাকরি। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, সিরামিক ফ্যাক্টরি, কিছু সরকারি চাকরি। প্রথম বেতন? পনেরো থেকে বিশ হাজার। BCS দিলে এবং পেলে, পঁচিশ-ত্রিশ। কিন্তু BCS সবাই পায় না।
গড় ধরে দশ বছরে মোট আয়: প্রায় ত্রিশ লাখ।
ROI: (ত্রিশ লাখ বিয়োগ সাড়ে চার লাখ) ভাগ সাড়ে চার লাখ। মানে 5.67 গুণ।
১২
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পদার্থবিজ্ঞান।
টিউশন ফি: আরো কম। চার বছরে প্রায় বারো হাজার।
থাকা-খাওয়া: বাড়ি থেকে পড়া। মানে শূন্য অতিরিক্ত খরচ। বাড়িতেই খায়, বাড়িতেই থাকে।
বই, যাতায়াত: কলেজে যাওয়া-আসা, বই কেনা। মাসে দেড় হাজার। চার বছরে বাহাত্তর হাজার।
চার বছরের মোট: এক লাখ চুরাশি হাজার। ধরো দেড় লাখ (কারণ বাড়ির খাওয়ার খরচ তো আগে থেকেই আছে, সেটা বাড়তি না)।
পাশ করার পর? পদার্থবিজ্ঞানে চাকরি সীমিত। শিক্ষকতা, কিছু টেকনিক্যাল চাকরি। কিন্তু জাহিদ ভাবছে অন্য কিছু। পদার্থবিজ্ঞান পড়ার পাশাপাশি যদি নিজে প্রোগ্রামিং শেখে? ফিজিক্স আর কোডিং মিলিয়ে ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং? এগুলো এখন সবচেয়ে চাহিদার ক্ষেত্র।
YouTube-তে দেখেছে, Harvard-এর CS50 ফ্রি। MIT-এর OpenCourseWare ফ্রি। Coursera-তে অডিট ফ্রি। মানে একটা ফোন আর ইন্টারনেট থাকলে দুনিয়ার সেরা প্রোগ্রামিং কোর্স পড়া যায়।
দশ বছরে মোট আয়: প্রায় পঁচিশ লাখ (যদি শুধু ফিজিক্সে থাকে)। কিন্তু প্রোগ্রামিং শিখলে? তাহলে সিলিং উঠে যায়। তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ লাখও সম্ভব।
ROI (বেসলাইন, শুধু ফিজিক্স): (পঁচিশ লাখ বিয়োগ দেড় লাখ) ভাগ দেড় লাখ। মানে 15.67 গুণ।
সংখ্যাটা দেখে জাহিদ চোখ কচলাল। পনেরো গুণেরও বেশি? ঠিকই তো। কারণ বিনিয়োগ এত কম যে সামান্য আয়েও ROI অনেক বেশি।
১৩
প্রাইভেট, CSE।
চার বছরের মোট খরচ: সাত লাখ বিশ হাজার। আগেই হিসাব করেছে।
পাশ করার পর? CSE গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি পাওয়া তুলনামূলক সহজ। সফটওয়্যার কোম্পানি, ব্যাংকের IT, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ। প্রথম বেতন পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার। ভালো হলে পঞ্চাশও সম্ভব।
দশ বছরে মোট আয়: প্রায় পঁয়তাল্লিশ লাখ। সবচেয়ে বেশি। সিলিং সবচেয়ে উঁচু।
কিন্তু ROI? (পঁয়তাল্লিশ লাখ বিয়োগ সাত লাখ বিশ) ভাগ সাত লাখ বিশ। মানে 5.25 গুণ।
জগন্নাথের চেয়েও কম?
জাহিদ সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হ্যাঁ। কারণ বিনিয়োগ অনেক বেশি। আয় বেশি, কিন্তু বিনিয়োগও বেশি। আর আয়ের সংখ্যাটা "আনুমান।" যদি চাকরি না পাও? যদি বেতন ভালো না হয়? তাহলে সাত লাখের ঋণ নিয়ে বসে থাকতে হবে।
আর আরেকটা সমস্যা: এই সাত লাখ আসবে কোথা থেকে? ব্যাংক লোন? শিক্ষা ঋণের সুদ কত? সুদসহ দশ বছরে শোধ করতে গেলে মোট কত হবে?
জাহিদ সুদের হিসাব করল। শিক্ষা ঋণে সুদ ন'শতাংশ ধরলে, সাত লাখ চার বছর পর সুদে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ন'লাখ। শোধ করতে চাকরির প্রথম পাঁচ বছর প্রতি মাসে পনেরো-ষোলো হাজার টাকা EMI দিতে হবে।
চাকরির প্রথম বেতন থেকেই লোনের কিস্তি। বাড়িতে টাকা পাঠানো? সেটা পরে।
১৪
জাহিদ স্প্রেডশিটটা আরেকবার দেখল।
সংখ্যাগুলো পরিষ্কার।
ন্যাশনালে ROI সবচেয়ে বেশি। দেড় লাখ বিনিয়োগে পঁচিশ লাখ। পনেরো গুণেরও বেশি।
জগন্নাথে ROI মাঝামাঝি। সাড়ে চার লাখে ত্রিশ লাখ। ছয় গুণের কাছাকাছি।
প্রাইভেটে ROI সবচেয়ে কম। সাত লাখে পঁয়তাল্লিশ লাখ। পাঁচ গুণের একটু বেশি। কিন্তু absolute return সবচেয়ে বেশি, যদি সব ঠিকঠাক যায়।
"যদি সব ঠিকঠাক যায়।" এই শর্তটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। গরিব মানুষের জীবনে "যদি" একটা বিলাসিতা। যখন তোমার কোনো সেফটি নেট নেই, তখন ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্যও নেই।
রাসেল প্রাইভেটে পড়তে পারে। কারণ রাসেলের বাবার ব্যবসা আছে, জমি আছে, সঞ্চয় আছে। রাসেল ব্যর্থ হলেও বাবার সম্পদ তাকে ধরে রাখবে।
জাহিদ ব্যর্থ হলে? জাহিদের নিচে কিছু নেই। শুধু মাটি।
১৫
ফোনে রাকিবকে কল করল জাহিদ।
রাতের শিফট শেষে রাকিব মেসে ফিরেছে। ক্লান্ত গলা।
"কী রে?"
"ভাইয়া, তুই কেন গার্মেন্টসে কাজ করিস? তুই তো পড়তে পারতি।"
রাকিব একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "পারতাম। কিন্তু তখন বাবার একার আয়ে সংসার চলত না। কেউ একজনকে কামাই শুরু করতে হতো। আমি বড়, আমি শুরু করলাম।"
"তোর কি আফসোস হয়?"
"মাঝে মাঝে। তারপর ভাবি, আফসোস করে কী হবে? যা হয়ে গেছে তো হয়ে গেছে।"
"ভাইয়া, আমি কোনটায় যাব?"
"তোকে আগেই বলেছি। যেটায় তোর মন চায়।"
"মন বলছে CSE। কিন্তু CSE পড়তে গেলে মাসে পনেরো হাজার লাগবে। এই টাকা কোথায়?"
রাকিব বলল, "আমি আরো পাঁচ হাজার বেশি পাঠাতে পারব। ওভারটাইম করব।"
"তাহলে তোর?"
"আমার কী? আমি তো আগেই চালাচ্ছি। আরেকটু কষ্ট করলে কিছু হবে না।"
জাহিদ কিছু বলতে পারল না। গলা বন্ধ হয়ে আসছিল।
"ভাই, এমন কিছু করিস না যেটায় পরে আফসোস হয়," রাকিব বলল। "আমার যেটা হয়, তোর যেন না হয়।"
ফোন রাখার পর জাহিদ অনেকক্ষণ বসে রইল। ভাবল, রাকিব ওভারটাইম করবে মানে কী? মানে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করবে বারো ঘণ্টা ফ্যাক্টরিতে দাঁড়িয়ে, যাতে জাহিদ CSE পড়তে পারে। মানে রাকিবের শরীর ক্ষয় হবে, যাতে জাহিদের মস্তিষ্ক তৈরি হয়।
এটা কি ঠিক? এটা কি ন্যায্য?
১৬
পরের দিন সকালে জাহিদ আবার স্প্রেডশিট খুলল।
এবার একটা নতুন কলাম যোগ করল: "সুযোগ ব্যয়।" Opportunity cost।
জগন্নাথে চার বছর রসায়ন পড়ার সুযোগ ব্যয় কী? চার বছর ধরে অন্য কিছু করার সুযোগ হারানো। যেমন, চার বছরে যদি কেউ চাকরি করত, তাহলে কত আয় হতো? অথবা, চার বছরে যদি কেউ কোনো কারিগরি দক্ষতা শিখত?
কিন্তু এটার চেয়ে বড় সুযোগ ব্যয় আছে।
জগন্নাথে রসায়ন পড়ার মানে হলো চার বছর ধরে এমন একটা বিষয় পড়া যেটা জাহিদ পছন্দ করে না। পছন্দ না করলে ভালো করা কঠিন। ভালো না করলে ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন। ভালো চাকরি না পেলে পুরো বিনিয়োগ পানি।
আর ন্যাশনালে ফিজিক্স? খরচ কম, বিষয় পছন্দ। কিন্তু ন্যাশনালের ট্যাগ? সেটা একটা ওজন যেটা সার্টিফিকেটের সাথে আজীবন ঝুলে থাকবে। যদি না জাহিদ নিজের দক্ষতা দিয়ে সেই ওজনকে অতিক্রম করতে পারে।
প্রশ্ন: দক্ষতা কি প্রতিষ্ঠানের নাম অতিক্রম করতে পারে?
বাংলাদেশে? কঠিন। কিন্তু অসম্ভব না।
১৭
জাহিদ আরো একটা জিনিস ভাবল।
সে YouTube-তে একটা ভিডিও দেখেছিল। একজন বলছিলেন, "তোমার ডিগ্রি তোমাকে প্রথম চাকরিটা পেতে সাহায্য করে। তারপর তোমার দক্ষতা তোমাকে বাকি ক্যারিয়ার চালায়।"
প্রথম চাকরি।
জগন্নাথের সার্টিফিকেট দিয়ে প্রথম চাকরি পাওয়া সহজ হবে, কিন্তু সেটা রসায়নে। রসায়নে চাকরি পেয়ে কী হবে যদি জাহিদ সেটা করতে না চায়?
ন্যাশনালের সার্টিফিকেট দিয়ে প্রথম চাকরি পাওয়া কঠিন হবে, কিন্তু যদি জাহিদ ইতিমধ্যে প্রোগ্রামিং পারে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকে, GitHub-এ প্রজেক্ট থাকে, তাহলে কি সার্টিফিকেটের ট্যাগ ম্যাটার করবে?
IT সেক্টরে অনেক কোম্পানি এখন বলে: "আমরা পোর্টফোলিও দেখি, সার্টিফিকেট না।" সত্যি কিনা পুরোপুরি জানা নেই। কিন্তু দিকটা সেদিকেই যাচ্ছে।
তাহলে ন্যাশনালে ফিজিক্স পড়তে পড়তে যদি নিজে প্রোগ্রামিং শেখে, ফ্রিল্যান্সিং শুরু করে, পোর্টফোলিও বানায়, তাহলে কি প্রাইভেটে CSE পড়া ছেলের চেয়ে সে পিছিয়ে থাকবে?
হয়তো না। বরং এগিয়ে থাকবে। কারণ তার ঋণ নেই, তার পরিবারের ওপর চাপ নেই, তার ভাইকে অতিরিক্ত ওভারটাইম করতে হচ্ছে না।
কিন্তু এই যুক্তি কে মানবে? পাড়ায় গিয়ে বলবে, "আমি ন্যাশনালে পড়ব, নিজে প্রোগ্রামিং শিখব"? লোকে হাসবে। বলবে, "জগন্নাথে চান্স পেয়ে ন্যাশনালে যাচ্ছে? পাগল নাকি?"
পাল। আবার পাল। পাল বলছে জগন্নাথ। ডেটা বলছে অন্য কথা।
পাল আর ডেটার মধ্যে জাহিদ দাঁড়িয়ে আছে। একা।
১৮
শেষ রাতে ঘুমানোর আগে জাহিদ আবার স্প্রেডশিটটা দেখল।
তিনটা সারি। তিনটা জীবন। তিনটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।
একটা সারিতে সরকারি ট্যাগ আছে, কিন্তু ভুল বিষয়।
একটা সারিতে সঠিক বিষয় আছে, কিন্তু "ভুল" প্রতিষ্ঠান।
একটা সারিতে সব ঠিক আছে, কিন্তু টাকা নেই।
জাহিদ ফোন বন্ধ করল।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না আজও। কাল। অথবা পরশু। অথবা ডেডলাইনের আগের দিন। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা সব সিদ্ধান্ত ডেডলাইনের আগের দিন নেয়। কারণ তার আগে পর্যন্ত আশা থাকে যে কোনো একটা অলৌকিক কিছু হবে, সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কিন্তু অলৌকিক কিছু হয় না। রাস্তা পরিষ্কার হয় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় ধোঁয়ার মধ্যেই।
জাহিদ জানে, সংখ্যাগুলো কী বলছে। সবচেয়ে কম মর্যাদার অপশনটা সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। কিন্তু মর্যাদা আর বুদ্ধিমত্তা যখন দুই দিকে টানে, তখন কোনটা জেতে?
বাইরে সন্ধ্যার আজান শেষ হয়ে গেছে। দূরে কোথাও একটা CNG-র আওয়াজ। বাবা ফিরছেন। মিটারে আজকের আয় শেষ। কাল আবার শূন্য থেকে।
জাহিদ ভাবল, সে যেটাই বেছে নিক, একটা জিনিস নিশ্চিত: বাবার মিটার শূন্য থেকে শুরু হওয়া বন্ধ করতে হবে। সেটা রসায়ন দিয়ে হোক, ফিজিক্স দিয়ে হোক, বা কম্পিউটার দিয়ে হোক।
পাল যেদিকে যাক। জাহিদকে যেতে হবে সেদিকে যেদিকে ROI বেশি। কারণ জাহিদের ভুল করার বিলাসিতা নেই।
কিন্তু আজ রাতে সিদ্ধান্ত হবে না। আজ রাতে শুধু সংখ্যাগুলো মাথায় ঘুরবে। চার লাখ, দেড় লাখ, সাত লাখ। ত্রিশ লাখ, পঁচিশ লাখ, পঁয়তাল্লিশ লাখ। ছয় গুণ, পনেরো গুণ, পাঁচ গুণ।
সংখ্যাগুলো ঘুরতে ঘুরতে জাহিদ ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে একটা স্প্রেডশিট। সারি আর কলামের মধ্যে জাহিদ হারিয়ে গেছে। কোনো সেল খালি নেই, সব সেলে সংখ্যা, কিন্তু কোনো সংখ্যাই বলছে না কোনটা ঠিক।
কারণ গণিত বলতে পারে কোনটা লাভজনক। গণিত বলতে পারে না কোনটা সঠিক।
সেটা জাহিদকেই বলতে হবে। নিজে।