জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য
চৌত্রিশ লাখ ছাত্র, একটা কলেজ, আর একটা প্রশ্ন যেটার উত্তর কেউ দিতে চায় না
১
জাহিদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার কলেজটা দেখতে চাইল।
ময়মনসিংহ শহরের বাইরে, রেললাইনের ওপারে, একটা পুরনো সরকারি কলেজ। নাম বলা দরকার নেই। বাংলাদেশের প্রতিটা জেলা শহরে এরকম একটা কলেজ আছে। পুরনো গেট, মরচে-ধরা লোহার রেলিং, দেয়ালে নির্বাচনের পোস্টার, গেটের সামনে ফুচকার ঠেলা। এই কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। এখানে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স আছে।
সকাল দশটায় গেল জাহিদ। একা। কাউকে বলেনি। বাবাকে বলেছে বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে। মাকে বলেছে একটু ঘুরে আসি। মিমকে কিছু বলেনি, কারণ মিম জিজ্ঞেস করলে মিথ্যা বলতে হবে, আর মিম মিথ্যা ধরে ফেলে।
গেট দিয়ে ঢুকে ভেতরে তাকাল। একটা মাঠ, খোলা, ঘাস কাটা হয়নি অনেকদিন। মাঠের ওপারে তিনতলা একাডেমিক ভবন। দেয়ালের রং একসময় সাদা ছিল, এখন ধূসর। জানালায় গ্রিল, গ্রিলে মরচে। সিঁড়ির রেলিং ভাঙা। একটা ফ্যান ছাদ থেকে ঝুলছে, ঘুরছে না।
কিন্তু ছাত্রছাত্রী আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে, ক্লাসরুমে বসে আছে, ক্যান্টিনের সামনে চা খাচ্ছে। সংখ্যায় কম না। জীবন্ত জায়গা। শুধু দেখতে পুরনো।
জাহিদ ভাবল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলও পুরনো। সেটা ঐতিহ্য। এটা পুরনো। সেটা অবহেলা। পার্থক্যটা কোথায়? বাজেটে? মনোযোগে? নাকি শুধু নামে?
২
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ দোতলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে করিডোরের শেষ মাথায়। দরজায় সাইনবোর্ড: "পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ।" সাইনবোর্ডের এক কোণা ভাঙা।
জাহিদ ভেতরে উঁকি দিল। একটা ক্লাস চলছে। পনেরো-বিশজন ছাত্রছাত্রী। সামনে একজন শিক্ষক। বয়স ষাটের কাছাকাছি। পাতলা চেহারা, চুল পাকা, চশমা পুরু। শার্টের হাতা গুটানো। বোর্ডে লিখছেন। হাতের লেখা ছোট, পরিষ্কার।
ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ।
জাহিদ একটু অবাক হলো। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ানো হয় না সাধারণত। এটা অ্যাডভান্সড টপিক। কিন্তু শিক্ষক পড়াচ্ছেন, আর ছাত্ররা লিখছে। কেউ ঘুমাচ্ছে না। কেউ ফোন দেখছে না। সামনের সারিতে একটা মেয়ে মাথা নিচু করে নোট নিচ্ছে, কলমের গতি দ্রুত।
ক্লাস শেষ হলো। ছাত্ররা বের হলো। জাহিদ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। শিক্ষক তাকে দেখলেন।
"কী চাই?"
"স্যার, আমি জাহিদ। ভর্তি হতে চাচ্ছি। একটু কথা বলতে চাইলাম।"
শিক্ষক চশমা খুলে মুছলেন। আবার পরলেন। বললেন, "এসো।"
৩
শিক্ষকের নাম আবদুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স, ১৯৮৮ সালে। ব্যাচে তৃতীয় ছিলেন। চাইলে ঢাকায় থাকতে পারতেন। বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারতেন। আসেননি। নিজের জেলায় ফিরে এসেছিলেন।
"কেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
রহমান স্যার একটু হাসলেন। হাসিটা ক্লান্ত, কিন্তু তিক্ত না।
"তখন ভেবেছিলাম, যেখানে ভালো শিক্ষক নেই, সেখানে ভালো শিক্ষক হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় কাজ। ঢাকায় ভালো শিক্ষকের অভাব নেই। এখানে আছে।"
"পরে কি আফসোস হয়েছে?"
রহমান স্যার জানালার দিকে তাকালেন। জানালা দিয়ে মাঠ দেখা যায়। মাঠে কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে। একটা ছেলে ব্যাট করছে, ব্যাটটা আসলে একটা ভাঙা তক্তা।
"আফসোস? মাঝে মাঝে। যখন দেখি ল্যাবে যন্ত্রপাতি নেই। যখন দেখি লাইব্রেরিতে বই পুরনো। যখন দেখি আমার ছাত্রদের চাকরি পেতে কষ্ট হচ্ছে শুধু সার্টিফিকেটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় লেখা আছে বলে।"
তিনি থামলেন। তারপর বললেন, "কিন্তু আফসোস না হওয়ার কারণও আছে। ছত্রিশ বছরে আমি যত ছাত্র পড়িয়েছি, তাদের অনেকে এখন স্কুলে পড়াচ্ছে, কলেজে পড়াচ্ছে, ব্যাংকে কাজ করছে, সরকারি অফিসে আছে। তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। তারা দেশ চালাচ্ছে না? চালাচ্ছে তো।"
৪
রহমান স্যার চা আনালেন। দুটো কাপ। চায়ের রং গাঢ়, দুধ কম। কাপগুলো চিপ-ধরা, কিন্তু পরিষ্কার।
জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "স্যার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কত ছাত্র?"
"শেষ হিসাবে চৌত্রিশ লাখের বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীতেও সবচেয়ে বড়গুলোর একটা।"
"চৌত্রিশ লাখ?"
"হ্যাঁ। এর মানে কী, বলতে পারো?"
জাহিদ ভাবল। "মানে... অনেক ছাত্র?"
রহমান স্যার চায়ে চুমুক দিলেন। "মানে, বাংলাদেশে যত মানুষ উচ্চশিক্ষা নেয়, তার বেশিরভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট সিট কত? দুই-আড়াই লাখ? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌত্রিশ লাখ। অনুপাতটা দেখো। দশের বেশি একের সাথে।"
"তাহলে চাকরির বাজারে বেশিরভাগ মানুষ..."
"জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। ব্যাংকে যাও, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়ে। স্কুলে যাও, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি অফিসে যাও, BCS ক্যাডার ছাড়া বাকি সবাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি BCS ক্যাডারেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়ে আছে। সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে।"
জাহিদ চুপ করে শুনছে।
"কিন্তু কেউ এটা বলে না," রহমান স্যার বললেন। "কেউ বলে না যে দেশের মেরুদণ্ড জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা। কারণ সেটা বলতে গেলে স্বীকার করতে হয় যে সবচেয়ে কম মর্যাদা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটাই সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। সেটা স্বীকার করা কঠিন।"
৫
জাহিদ ক্যাম্পাসে ঘুরল। ঘোরার মতো অনেক কিছু নেই। একটা লাইব্রেরি, ছোট, তাকে বই কম। একটা কম্পিউটার ল্যাব, পুরনো মডেলের ডেস্কটপ, কয়েকটা বন্ধ। একটা ফিজিক্স ল্যাব, যন্ত্রপাতি পুরনো কিন্তু কাজ করে। একটা ক্যান্টিন, চা আর সিঙ্গারা ছাড়া তেমন কিছু নেই।
জাহিদ ক্যান্টিনে বসল। একটা চা নিল। পাঁচ টাকা। ঢাকায় চায়ের দাম পনেরো-বিশ। এখানে পাঁচ। এই পার্থক্যটা ছোট মনে হয়, কিন্তু চার বছর ধরে দিনে তিন কাপ চা খেলে পার্থক্যটা আর ছোট থাকে না।
পাশের টেবিলে দুজন ছেলে বসে আছে। একজন বলছে, "BCS-এর প্রিলি কবে?"
"অক্টোবরে।"
"তোর প্রস্তুতি কেমন?"
"চালাচ্ছি। বাংলাদেশ বিষয়াবলি শেষ করেছি। এখন আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি।"
"গণিত?"
"গণিত তো প্রতিদিনই করি। ফিজিক্সের ছেলে, গণিত না করলে কী করব?"
তারা হাসল। জাহিদও একটু হাসল, মনে মনে।
ফিজিক্সের ছেলে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে। BCS-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ তাদের বলেনি তোমরা পারবে না। হয়তো বলেছে, কিন্তু তারা শোনেনি।
জাহিদ ভাবল, এই দুই ছেলে যদি BCS পাস করে, তাহলে কেউ জিজ্ঞেস করবে না তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছে কি না। কেউ জিজ্ঞেস করবে না তাদের ক্যাম্পাসের দেয়ালে রং ছিল কি না। কেউ জিজ্ঞেস করবে না তাদের ল্যাবে কয়টা কম্পিউটার ছিল।
কিন্তু BCS না পেলে? তাহলে সবাই বলবে, "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আবার BCS দেয়। ওদের দিয়ে কিছু হবে না।"
একই মানুষ। একই প্রস্তুতি। ফলাফল ভালো হলে প্রতিভা, খারাপ হলে প্রতিষ্ঠানের দোষ।
৬
ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে জাহিদ আবার রহমান স্যারের রুমে গেল। স্যার ব্যস্ত ছিলেন না। বসে পড়তে বললেন।
"স্যার, একটা সত্য কথা বলবেন?"
"বলো।"
"জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কি সত্যিই কিছু হওয়া যায়?"
রহমান স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। চুপ থাকাটা ভালো লক্ষণ। যারা সাথে সাথে উত্তর দেয়, তারা সত্য বলে না, বিক্রি করে।
"নির্ভর করে কী বোঝাচ্ছ 'কিছু হওয়া' বলতে," স্যার বললেন। "যদি বোঝাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হওয়া, তাহলে সম্ভাবনা কম। যদি বোঝাও গুগলে চাকরি পাওয়া, তাহলে আরো কম। কিন্তু যদি বোঝাও একটা সম্মানজনক চাকরি, একটা স্থিতিশীল জীবন, পরিবারকে সাহায্য করা, তাহলে হ্যাঁ, অবশ্যই হওয়া যায়। প্রতিদিন হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ হচ্ছে।"
"কিন্তু লোকে বলে..."
"লোকে অনেক কিছু বলে। লোকে বলে মেয়েদের বেশি পড়ার দরকার নেই। লোকে বলে গরিবের ছেলে ডাক্তার হতে পারে না। লোকে বলে মফস্বলের ছেলে ঢাকায় টিকতে পারে না। লোকে বলে, কিন্তু কেউ না কেউ ঠিকই করে দেখায়। প্রশ্ন হলো, তুমি কি সেই কেউ হতে চাও?"
জাহিদ কিছু বলল না।
রহমান স্যার বললেন, "একটা কথা বলি। এই কলেজে যে ছেলেটা প্রথম হয়, সে DU-তে পড়লেও প্রথম হতো। কারণ প্রথম হওয়াটা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠান সুযোগ দেয়। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগানো ব্যক্তির দায়িত্ব।"
"আর যে ছেলেটা শেষ হয়?"
রহমান স্যার হাসলেন। "সে DU-তে পড়লেও শেষ হতো। সেটাও সত্য।"
৭
বাড়ি ফেরার পথে জাহিদ হিসাব করল।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়লে:
খরচ: মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার। টিউশন ফি, বই, যাতায়াত। বাড়ি থেকে পড়বে, থাকা-খাওয়ার অতিরিক্ত খরচ নেই। চার বছরে দেড় লাখের মতো। এটা গত রাতের স্প্রেডশিটেই আছে।
ঢাকায় গেলে: মাসে আট থেকে বারো হাজার শুধু থাকা-খাওয়া। উপরে টিউশন, বই, যাতায়াত। বাবা-মার ওপর চাপ। রাকিবের ওপর চাপ।
মফস্বলে থাকলে: বাবার CNG-তে উঠে কলেজে যাওয়া যায়। মায়ের রান্না খাওয়া যায়। মিমের পড়া দেখানো যায়। পরিবারের কাছে থাকা যায়।
এগুলো আর্থিক হিসাব। কিন্তু আর্থিক হিসাবের বাইরেও হিসাব আছে।
ঢাকায় গেলে বাবা একা। রাত দশটায় CNG চালিয়ে বাড়ি ফিরলে কে দরজা খুলবে? মা একা। সেলাইয়ের কাপড় ভারী হলে কে তুলে দেবে? মিম একা। অঙ্ক না পারলে কাকে জিজ্ঞেস করবে?
জাহিদ জানে, এগুলো সেন্টিমেন্ট। সেন্টিমেন্ট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত না। কিন্তু সেন্টিমেন্ট কি পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত? একজন আঠারো বছরের ছেলে যে বাবার ক্লান্ত মুখ দেখে বড় হয়েছে, সে কি বলতে পারে, "আমার ক্যারিয়ারের জন্য আমি যাচ্ছি, তুমি একা চালাও"?
পারে। অনেকে পারে। জাহিদ পারে কি না, সেটা জাহিদ এখনো জানে না।
৮
সন্ধ্যায় ফারুককে ফোন করল।
ফারুক পলিটেকনিকে পড়ে। ফারুকের GPA 3.80। ফারুকও একটা stigma বহন করে। পলিটেকনিক। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং। লোকে বলে, "পড়তে না পেরে পলিটেকনিকে গেছে।" ফারুক শুনেছে এই কথা অনেকবার। ফারুক শোনেনি একবারও।
"ফারুক, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।"
"বল।"
"তোকে যখন কেউ বলে পলিটেকনিক ভালো না, তুই কী বলিস?"
ফারুক একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "কিছু বলি না। কারণ যে বলছে সে আমার পরিবারকে খাওয়ায় না। আমার বাবা অসুস্থ। আমার মাকে চার ভাইবোনের খরচ চালাতে হয়। পলিটেকনিক চার বছরের। চার বছর পর আমি ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি পাব। টাকা আসবে। এটুকুই আমার দরকার। বাকি সব কথা।"
"কিন্তু মর্যাদা?"
"মর্যাদা টাকা দিয়ে কেনে না। মর্যাদা কাজ দিয়ে কেনে। আমি যখন ভালো কাজ করব, কেউ জিজ্ঞেস করবে না আমি কোথা থেকে পড়েছি।"
"তুই এত নিশ্চিত?"
"নিশ্চিত না। কিন্তু আমার বিকল্প নেই। বিকল্প না থাকলে সন্দেহ করার সুযোগও থাকে না। তুই ভাগ্যবান, তোর বিকল্প আছে। তাই তোর সন্দেহ হচ্ছে। যার বিকল্প নেই তার সন্দেহ হয় না, কারণ সে জানে পথ একটাই।"
জাহিদ ফোন রাখল। ফারুকের কথাটা মাথায় ঘুরছে। বিকল্প না থাকলে সন্দেহ হয় না। তাহলে বিকল্প থাকাটা কি অভিশাপ?
৯
রাতে বিছানায় শুয়ে জাহিদ ভাবল।
দুটো সত্য আছে।
এক: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেটা ভালো বলছে। চৌত্রিশ লাখ ছাত্র। সবচেয়ে বেশি গ্র্যাজুয়েট প্রতি বছর বের হয়। তারা চাকরি করে, ব্যবসা করে, দেশ চালায়। খরচ কম। ঝুঁকি কম। ROI সবচেয়ে বেশি। রহমান স্যারের কথা সত্যি, এই কলেজে যে প্রথম হয়, সে যেকোনো জায়গায় প্রথম হতো।
দুই: সমাজ ভালো বলছে না। "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে?" এই প্রশ্নটার মধ্যে একটা অলিখিত বাক্য আছে: "তাহলে তুমি সেকেন্ড ক্লাস।" চাকরির ইন্টারভিউতে, বিয়ের সম্বন্ধে, আত্মীয়দের বৈঠকে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যাগ একটা অদৃশ্য ওজন। সেটা তুমি যতই হালকা করার চেষ্টা করো, ওখানে থাকে।
দুটো সত্য। দুটো দিক। ডেটা বলছে এক কথা, সমাজ বলছে আরেক কথা।
জাহিদ জানে, দীর্ঘমেয়াদে ডেটা জেতে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে সমাজ জেতে। আর আঠারো বছর বয়সে স্বল্পমেয়াদ মানে কাল। আগামীকাল। পরশু। পাড়ার মানুষের চোখ। মায়ের বান্ধবীদের প্রশ্ন। "তোর ছেলে কোথায় ভর্তি হলো?"
মা কী বলবেন? "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে।" বলবেন ঠিকই, কিন্তু গলাটা একটু নামবে। চোখটা একটু নামবে। কারণ মাও জানেন সমাজ কী বলবে।
আর রাসেলের মা? রাসেলের মা বলবেন, "আমার ছেলে BUET-এ।" গলাটা উঠবে। চোখটা উজ্জ্বল হবে। মিষ্টি বিলাবেন আবার।
এই পার্থক্যটা জাহিদের বুকে বাজছে। কারণ পার্থক্যটা জাহিদের নিজের জন্য না। পার্থক্যটা মায়ের জন্য। মা সারাজীবন সেলাই করেছেন যাতে ছেলে "কোথাও" ভর্তি হতে পারে। সেই "কোথাও" কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়?
মায়ের দোয়া সব জায়গায় সমান। কিন্তু মায়ের গর্ব? সেটা প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে ওঠানামা করে। উচিত না, কিন্তু করে।
জাহিদ চোখ বন্ধ করল। বাইরে রাতের নিরবতায় দূরে কোথাও একটা CNG-র আওয়াজ। বাবা এখনো রাস্তায়। মিটার ঘুরছে। পাঁচ টাকা, দশ টাকা, পনেরো টাকা।
সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। কিন্তু আজ জাহিদ একটা জিনিস দেখেছে যেটা আগে দেখেনি। একটা ভাঙা সাইনবোর্ডের পেছনে একজন শিক্ষক আছেন যিনি ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পড়ান। একটা পুরনো ক্যান্টিনে দুজন ছেলে আছে যারা BCS-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটা পাঁচ টাকার চায়ের কাপে একটা সম্ভাবনা আছে যেটা পঁচিশ টাকার চায়ের কাপে নেই: কম দিয়ে বেশি নেওয়া।
হিসাবের খাতায় সংখ্যাগুলো একই আছে। কিন্তু আজ সংখ্যাগুলোর পেছনে মুখ দেখা গেছে। রহমান স্যারের মুখ। ক্যান্টিনের দুই ছেলের মুখ। ফারুকের গলা।
ঘুম আসছে না। হিসাবের খাতাটা বালিশের নিচে। কলমটা পাশে। কাল সকালে মায়ের চা। বাবার CNG। মিমের স্কুল। সব আবার শূন্য থেকে।
কিন্তু শূন্য থেকে শুরু করা জাহিদ জানে। বাবা প্রতিদিন শূন্য থেকে শুরু করেন। মিটার রিসেট হয়। আবার চালান। আবার কামাই করেন।
জাহিদও চালাবে।