প্রাইভেটের ফাঁদ

চকচকে ক্যাম্পাস, ঠান্ডা ক্লাসরুম, আর ষোলো লাখ টাকার একটা স্বপ্ন

পর্ব ১৭ · ২২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জাহিদের ছিল না। মা বলেছিলেন, "একবার গিয়ে দেখে আয়। দেখলে বুঝবি।"

মা বোঝেন না CSE কী, স্কলারশিপ কীভাবে কাজ করে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিজনেস মডেল কী। কিন্তু মা বোঝেন "গিয়ে দেখা।" চোখে দেখলে যেটা বোঝা যায়, সেটা কাগজে বোঝা যায় না।

রবিবার সকালে জাহিদ বাস ধরল। মাইমনসিং থেকে ঢাকা। চার ঘণ্টা। বাসের সিটে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। ধানক্ষেত, ইটভাটার চিমনি, ছোট ছোট বাজার, পুকুর, মসজিদ। মফস্বলের ভূগোল ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। গাছ কমছে, বিল্ডিং বাড়ছে। রাস্তা চওড়া হচ্ছে। গাড়ি বাড়ছে।

ঢাকা আসছে।

জাহিদের পকেটে ভর্তি অফিসের চিঠি। "আপনাকে ৫০% মেধা বৃত্তিসহ CSE প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে ক্যাম্পাস ভিজিট করুন।" চিঠিতে একটা নম্বর দেওয়া আছে, কল করলে একজন "অ্যাডমিশন কাউন্সেলর" কথা বলবেন।

জাহিদ কল করেছিল। ফোন ধরেছিলেন একজন। গলার স্বর মসৃণ, পেশাদার। বললেন, "জাহিদ ভাই, অভিনন্দন! আপনি আমাদের টপ মেধাবীদের একজন। রবিবার আসুন, আমি নিজে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাব।"

টপ মেধাবী। শব্দটা কানে ভালো লাগল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, BUET, মেডিকেল, কেউ জাহিদকে "টপ মেধাবী" বলেনি। তিনটা জায়গায় সে ফেল করেছে। কিন্তু এই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বলছে সে "টপ মেধাবী।"

জাহিদ ভাবল, হয়তো এখানে তাকে চায়। হয়তো এখানেই তার জায়গা।

বাস ঢাকায় ঢুকল।

ক্যাম্পাস গুলশানের কাছে। বারোতলা বিল্ডিং। কাচের দেয়াল। সামনে সবুজ ঘাস, ছাঁটা গাছ, একটা ফোয়ারা। ফোয়ারায় পানি পড়ছে। রোদে ঝিলমিল করছে।

গেটে দুজন গার্ড। ইউনিফর্ম পরা। জাহিদ বলল, "ভর্তি অফিসে যাব।" গার্ড বলল, "চতুর্থ তলা। লিফটে যান।"

লিফট। জাহিদের বাড়িতে দোতলা ওঠার সিঁড়িও নেই, টিনের চালের একতলা ঘর। এখানে লিফট। লিফটের ভেতরে আয়না, স্টিলের দেয়াল, হালকা মিউজিক বাজছে। জাহিদ নিজের প্রতিফলন দেখল। শার্টটা একটু কুঁচকে গেছে বাসের চার ঘণ্টায়। জুতোয় ধুলো। চুল বাতাসে এলোমেলো।

চতুর্থ তলায় দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এলো। এসি। পুরো ফ্লোরে কার্পেট। দেয়ালে বড় বড় ছবি: হাসিমুখে ছাত্রছাত্রীরা, ল্যাপটপ খোলা, গ্রুপ ডিসকাশন করছে। একটা ছবিতে গ্র্যাজুয়েশনের গাউন পরা ছেলেমেয়েরা টুপি ছুড়ছে আকাশে। নিচে লেখা: "Your Future Starts Here."

রিসেপশনে একটা মেয়ে বসে আছে। পরিপাটি, হাসিমুখ। বলল, "কী নাম, ভাইয়া?"

"জাহিদ।"

"জাহিদুল ইসলাম? মাইমনসিং?"

"হ্যাঁ।"

"প্লিজ বসুন। রাহাত ভাই আসছেন।"

জাহিদ সোফায় বসল। সোফাটা নরম। চামড়ার। বাড়ির কাঠের চেয়ারে বসে বসে পিঠ শক্ত হয়ে গেছে জাহিদের। এই সোফায় বসলে শরীর ডুবে যায়। আরামে না, বিভ্রান্তিতে।

টেবিলে কিছু ব্রোশিওর রাখা। চকচকে কাগজ, রঙিন ছবি। "বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি।" "বিশ্বমানের শিক্ষা, বাংলাদেশের মাটিতে।" "৮০% গ্র্যাজুয়েট চাকরি পায়।"

জাহিদ ব্রোশিওর তুলে নিল। পাতা উল্টাল।

রাহাত ভাই এলেন পাঁচ মিনিট পর। লম্বা, পরিচ্ছন্ন, নীল শার্ট, স্লিম ফিটের প্যান্ট। হাতে একটা ট্যাবলেট। গলায় আইডি কার্ড: "রাহাত হাসান, অ্যাডমিশন কাউন্সেলর।"

হাত বাড়ালেন। "জাহিদ ভাই! ওয়েলকাম!" হাতের ধরন দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী। MBA টাইপ। যারা কথা বলে পেশাদার ভাষায়, হাসে পরিমিত পরিমাণে, প্রতিটা বাক্যে একটা করে "ভ্যালু প্রপোজিশন" ঢোকায়।

"চলুন, আগে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখি। তারপর বসে কথা বলব।"

ক্যাম্পাস ট্যুর শুরু হলো।

প্রথমে কম্পিউটার ল্যাব। একটা বড় ঘর, তিরিশটা ডেস্কটপ সারি সারি সাজানো। প্রতিটায় মনিটর জ্বলছে। কিছু ছেলেমেয়ে কোড লিখছে। এসি চলছে। জাহিদ দেখল, কম্পিউটারগুলো আসল। চালু। স্ক্রিনে কোড। জাহিদের স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব ছিল, কিন্তু দশটা কম্পিউটারের মধ্যে চারটা চলত। বাকিগুলো শোকেসে রাখা শোপিসের মতো ধুলো জমাত।

রাহাত ভাই বললেন, "আমাদের ল্যাব ২৪/৭ খোলা। স্টুডেন্টরা যেকোনো সময় এসে প্র্যাকটিস করতে পারে।"

পরে ক্লাসরুম। এসি। প্রতিটা বেঞ্চে পাওয়ার সকেট, ল্যাপটপ চার্জ করার জন্য। সামনে প্রজেক্টর, স্মার্টবোর্ড। ক্লাসে বিশ-পঁচিশজন ছাত্র। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে একটা ক্লাসে দেড়শো ছাত্র গাদাগাদি করে বসে। এখানে বিশ।

রাহাত ভাই বললেন, "ছোট ক্লাস সাইজ। টিচার-স্টুডেন্ট রেশিও ১:২০। প্রতিটা স্টুডেন্ট ব্যক্তিগত মনোযোগ পায়।"

তারপর লাইব্রেরি। বইয়ের তাক, পড়ার টেবিল, আলাদা আলাদা কিউবিকল। দেয়ালে লেখা: "কুইট জোন।" জাহিদ বই পড়ে মাইমনসিংয়ের পাবলিক লাইব্রেরিতে, যেখানে পাশের টেবিলে কেউ ফোনে কথা বলে, কেউ নাক ডাকে।

সবশেষে ক্যাফেটেরিয়া। পরিষ্কার, টেবিল-চেয়ার সাজানো। মেনু বোর্ডে দাম লেখা। চা চল্লিশ টাকা। জাহিদের পাড়ায় চা দশ টাকা। কিন্তু এখানে এসি আছে।

ট্যুর শেষে রাহাত ভাই জাহিদকে নিয়ে গেলেন তার অফিসে। ছোট ঘর, পরিপাটি। ডেস্কে একটা ল্যাপটপ, একটা ফুলদানি, প্লাস্টিকের ফুল। দেয়ালে একটা সার্টিফিকেট: "MBA, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।"

রাহাত ভাই বসলেন। ট্যাবলেটে কিছু একটা খুললেন।

"জাহিদ ভাই, আপনার ভর্তি পরীক্ষার স্কোর আমাদের টপ ১০%-এ। তাই আমরা আপনাকে ৫০% মেধা বৃত্তি অফার করেছি। এটা আমাদের সর্বোচ্চ বৃত্তি।"

জাহিদ মাথা নাড়ল।

"আমাদের CSE প্রোগ্রাম বাংলাদেশের সেরাগুলোর একটা। ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের বেশিরভাগ ফরেন রিটার্নড। USA, UK, অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স, PhD করে এসেছেন।"

রাহাত ভাই ট্যাবলেটে একটা স্লাইড দেখালেন। ফ্যাকাল্টি লিস্ট। নামের পাশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। "PhD, University of Melbourne।" "MSc, Imperial College London।" দেখতে চমৎকার। জাহিদ ভাবল, এই মানুষগুলো তাকে পড়াবে? সত্যি?

"প্লেসমেন্ট রেট আমাদের গর্ব," রাহাত ভাই বললেন। "আমাদের ৮০% স্টুডেন্ট গ্র্যাজুয়েশনের এক বছরের মধ্যে জব পায়।"

৮০%। সংখ্যাটা ভালো শোনায়। জাহিদের মাথায় স্প্রেডশিটের অভ্যাস ঢুকে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল, "কী ধরনের জব? স্যালারি কত?"

রাহাত ভাই একটু থামলেন। খুব সামান্য, এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। তারপর হাসলেন। "IT সেক্টরে। সফটওয়্যার কোম্পানি, ব্যাংক, টেলিকম। স্যালারি ডিপেন্ড করে, কিন্তু আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা ভালো করছে।"

"কত?" জাহিদ আবার জিজ্ঞেস করল।

"গড়ে... পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার শুরুতে। সিনিয়র লেভেলে পঞ্চাশ-ষাট।"

রাহাত ভাই নির্দিষ্ট সংখ্যা এড়িয়ে গেলেন। "গড়ে" শব্দটা দিয়ে। গড়ে মানে কী? কেউ পঞ্চাশ পায়, কেউ বারো। দুজনের গড় একত্রিশ। কিন্তু বারো হাজারের মানুষটার জীবনে গড়ের কোনো মানে নেই।

জাহিদ এটা ভাবল, কিন্তু বলল না।

"এবার খরচের কথা বলি," রাহাত ভাই বললেন। "আপনার ক্ষেত্রে ৫০% স্কলারশিপ আছে। তাহলে:"

ট্যাবলেটে একটা টেবিল দেখালেন।

টিউশন ফি (স্কলারশিপের পর): সেমিস্টারে দেড় লাখ। বছরে তিন লাখ।

জাহিদ মাথায় হিসাব করল। মাসে পঁচিশ হাজার। শুধু টিউশন। বাবার পুরো মাসের আয় পনেরো হাজার। মানে বাবার আয়ের প্রায় দ্বিগুণ শুধু টিউশন ফি।

"তবে," রাহাত ভাই বললেন, "কিছু বাড়তি খরচ আছে।"

বাড়তি খরচ। জাহিদ কান খাড়া করল।

"ল্যাব ফি: সেমিস্টারে পনেরো হাজার।"

"লাইব্রেরি ফি: সেমিস্টারে পাঁচ হাজার।"

"সেমিস্টার পরীক্ষার ফি: দশ হাজার।"

"আইডি কার্ড ও রেজিস্ট্রেশন: পাঁচ হাজার (প্রথম বছর)।"

"ডেভেলপমেন্ট চার্জ: বছরে দশ হাজার।"

জাহিদ হিসাব করল। ল্যাব ফি, লাইব্রেরি ফি, পরীক্ষার ফি, ডেভেলপমেন্ট চার্জ: বছরে মোট প্রায় পঞ্চাশ হাজার অতিরিক্ত।

মানে বছরে আসল খরচ: তিন লাখ প্লাস পঞ্চাশ হাজার। সাড়ে তিন লাখ।

মাসে প্রায় ত্রিশ হাজার। শুধু পড়ার খরচ। থাকা-খাওয়া ধরেনি।

চার বছরে: চৌদ্দ লাখ। কমপক্ষে।

ঢাকায় থাকা-খাওয়া? মাসে আট হাজার ধরলে বছরে ছিয়ানব্বই হাজার। চার বছরে আরো প্রায় চার লাখ।

যাতায়াত, বই, খুচরা খরচ? আরো দুই লাখ ধরলে।

মোট চার বছর: ষোলো থেকে আঠারো লাখ।

জাহিদের স্প্রেডশিটে যে সাত লাখ বিশ হাজার লিখেছিল, সেটা ছিল শুধু টিউশন আর বেসিক থাকা-খাওয়া। এই লুকানো ফি গুলো ধরলে সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি।

বাবার আট বছরের আয়। পুরো আট বছর বাবা CNG চালাবেন, একটা টাকাও খাবেন না, পরবেন না, কোথাও যাবেন না, তাহলে এই টাকা হবে।

রাহাত ভাই জাহিদের মুখ দেখলেন। বুঝলেন। এই মুখ তিনি আগেও দেখেছেন। প্রতি সপ্তাহে দেখেন। যে ছেলেমেয়েরা স্কলারশিপ পেয়ে আসে, প্রথমে উজ্জ্বল চোখে, তারপর খরচের হিসাব শুনে চোখ নিভে যায়।

রাহাত ভাই প্রস্তুত। এই মুহূর্তের জন্য তার ট্রেনিং আছে।

"জাহিদ ভাই, আমি বুঝতে পারছি এটা অনেক টাকা। কিন্তু এটাকে খরচ হিসেবে দেখবেন না। এটা ইনভেস্টমেন্ট।"

ইনভেস্টমেন্ট। জাহিদ এই শব্দটা জানে। ROI-এর হিসাব করেছে। কিন্তু রাহাত ভাইয়ের মুখে শব্দটা অন্যরকম শোনায়। যেন টাকা ঢাললেই ফিরে আসবে। নিশ্চিত। গ্যারান্টিড।

"আমাদের একটা EMI প্ল্যান আছে," রাহাত ভাই বললেন। "পড়ার সময় আপনাকে পুরো টাকা দিতে হবে না। একটা অংশ পরে দিতে পারবেন। গ্র্যাজুয়েশনের পর মাসে বারো হাজার করে ছয় বছর।"

জাহিদ হিসাব করল। বারো হাজার গুণ বাহাত্তর মাস। আট লাখ চুয়ান্ন হাজার। মানে EMI-তে সুদসহ আরো বেশি দিতে হবে।

"মানে পড়া শেষ হওয়ার আগেই ঋণ শুরু হবে?"

রাহাত ভাই বললেন, "না না, গ্র্যাজুয়েশনের পর থেকে EMI শুরু। পড়ার সময় কোনো চাপ নেই।"

কোনো চাপ নেই। চাকরি পাওয়ার আগেই ঋণ অপেক্ষা করছে। প্রথম বেতনের আগেই কিস্তি শুরু। এটা "কোনো চাপ নেই"?

রাহাত ভাই বললেন, "আমি একজন কারেন্ট স্টুডেন্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। সে বলবে অভিজ্ঞতা কেমন।"

ডাকলেন একজনকে। তানভীর। তৃতীয় বর্ষ, CSE। লম্বা, চশমা, ব্যাকপ্যাকে ল্যাপটপ। হাসিমুখ।

"ভাই, কেমন লাগছে পড়তে?" রাহাত ভাই জিজ্ঞেস করলেন। প্রশ্নটা নির্দেশিত, উত্তরটা প্রস্তুত।

তানভীর বলল, "অনেক ভালো, ভাই। ফ্যাকাল্টি অসাধারণ। ল্যাব ফ্যাসিলিটি দারুণ। প্রজেক্ট করতে পারছি। ইন্টার্নশিপের সুযোগ আছে।"

রাহাত ভাই হাসলেন। "দেখেছেন? আমাদের স্টুডেন্টরা খুশি।"

রাহাত ভাই চলে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য। "আপনারা কথা বলুন, আমি এক মিনিটে আসছি।"

রাহাত ভাই চলে যেতেই তানভীরের মুখ একটু বদলাল। হাসি রইল, কিন্তু চোখে অন্য কিছু।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "খরচ কীভাবে ম্যানেজ করছ?"

তানভীর একটু চুপ করল। তারপর বলল, "বাবা-মা জমি বন্ধক রেখেছেন। গ্রামে। তিন বিঘা। ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে লোন নিয়েছেন।"

"কত?"

"দশ লাখ।"

জাহিদের পেটে কিছু একটা মোচড় দিল। দশ লাখ। জমি বন্ধক।

"তারপর?"

"পড়া শেষ হলে চাকরি হবে। চাকরি হলে লোন শোধ করব। জমি ছাড়াব।" তানভীরের গলায় আত্মবিশ্বাস। এমন আত্মবিশ্বাস যেটা এখনো বাস্তবতার ধাক্কা খায়নি। যে মানুষ এখনো চাকরির বাজারে দাঁড়ায়নি, তার আত্মবিশ্বাস অটুট থাকে। দাঁড়ানোর পর বোঝা যায়।

"চাকরি না হলে?"

তানভীর একটু থামল। এই প্রশ্ন সে নিজেকে করে না। এই প্রশ্ন করলে রাতে ঘুম হয় না।

"হবে, ইনশাল্লাহ। আমাদের ৮০% তো পায়।"

আবার সেই ৮০%। ব্রোশিওরের সংখ্যা, রাহাত ভাইয়ের মুখের সংখ্যা, এখন তানভীরের মুখেও। সংখ্যাটা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে গেছে। কেউ যাচাই করেনি। কেউ জিজ্ঞেস করেনি ৮০% কীভাবে মাপা হয়েছে, কোন ব্যাচের ডেটা, কোন ধরনের "জব" ধরা হয়েছে।

রাহাত ভাই ফিরে এলেন। তানভীরকে বিদায় দিলেন।

জাহিদ বলল, "আমি একটু নিচে যাই। ক্যাফেটেরিয়ায় চা খাই।"

রাহাত ভাই বললেন, "অবশ্যই! আসুন, আমি নিয়ে যাই।"

"না, আমি একা যাব।"

রাহাত ভাই একটু অবাক হলেন। বেশিরভাগ ভিজিটর গাইডেড ট্যুরের বাইরে যেতে চায় না। জাহিদ চায়।

ক্যাফেটেরিয়ায় গেল জাহিদ। চল্লিশ টাকায় চা কিনল। বসল একটা কোণার টেবিলে।

পাশের টেবিলে দুজন ছেলে বসে আছে। একজন ল্যাপটপে কিছু করছে, অন্যজন ফোনে কথা বলছে। ফোনে কথা বলা ছেলেটার গলা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

"না, মা, এই মাসের টাকা দিতে পারব না। ইন্টার্নশিপ থেকে স্টাইপেন্ড পাইনি এখনো।"

"..."

"হ্যাঁ, EMI দিতে হবে। না দিলে লেট ফি লাগবে।"

"..."

"আমি চেষ্টা করছি, মা।"

ফোন রাখল। মুখ ভার। পাশের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, "কী হলো?" বলল, "কিছু না। মায়ের ওষুধের টাকা লাগবে, আমি পাঠাতে পারছি না।"

জাহিদ চা খেল। চায়ে চিনি বেশি।

আরেকটু বসল। পাশ দিয়ে একটা মেয়ে গেল, হাতে বই, চোখে ক্লান্তি। পেছনে আরেকজন, ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে। এরা সবাই ভেতরে ভেতরে কোনো না কোনো হিসাবের ওজন বহন করছে। কিন্তু ক্যাম্পাসের চকচকে দেয়ালে সেই ওজন দেখা যায় না।

ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হওয়ার সময় জাহিদ একজনের সাথে পরিচয় হলো। আকাশ। এই ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই। CSE, ২০২৪ ব্যাচ। দুই বছর আগে পাশ করেছে। ক্যাম্পাসে এসেছিল সার্টিফিকেটের একটা কপি তুলতে।

জাহিদ নিজেকে পরিচয় দিল। বলল ভর্তির কথা ভাবছে। আকাশ বলল, "চল, একটু বসি।"

বাইরে বেঞ্চে বসল দুজন। আকাশ সিগারেট ধরাল। জাহিদ খেয়াল করল, আকাশের জুতো পুরনো, শার্টের কলার একটু হলুদ হয়ে গেছে। দুই বছর আগে পাশ করা CSE গ্র্যাজুয়েট।

"কোথায় জব করো?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"একটা ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি। মিরপুরে।"

"স্যালারি?"

আকাশ সিগারেটে একটা টান দিল। ধোঁয়া ছাড়ল। "বাইশ।"

"বাইশ হাজার?"

"হ্যাঁ।"

"তো EMI?"

"বারো হাজার।"

জাহিদ কিছু বলল না। হিসাবটা নিজেই হয়ে গেল। বাইশ হাজার বেতন। বারো হাজার EMI। বাকি দশ হাজার।

দশ হাজার টাকায় ঢাকায় থাকা। ভাড়া, খাওয়া, যাতায়াত, ফোনের বিল, কাপড়, ওষুধ। দশ হাজার টাকায়।

"বাড়িতে পাঠাতে পারো?"

আকাশ হাসল। তিক্ত হাসি। "বাড়িতে? বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে টাকা আনতে হয়। বাবা পাঠান। বাইশ হাজারে ঢাকায় থেকে EMI দিলে কিছু থাকে না।"

জাহিদ ভাবল, এই মানুষ চার বছর পড়েছে, ষোলো লাখ টাকা খরচ হয়েছে পরিবারের, পাশ করেছে, চাকরি পেয়েছে, কিন্তু বাবার কাছ থেকে এখনো টাকা নিতে হচ্ছে।

"কবে শেষ হবে EMI?"

"আরো চার বছর।"

"তারপর?"

"তারপর? তারপর স্যালারি বাড়বে, ইনশাল্লাহ। তিন-চার বছর পর চল্লিশ-পঞ্চাশ পাব হয়তো। তখন একটু স্বস্তি হবে।"

"হয়তো" শব্দটা খেয়াল করল জাহিদ। তানভীর বলেছিল "হবে।" আকাশ বলছে "হয়তো।" দুই বছরের চাকরি "হবে"কে "হয়তো"তে বদলে দিয়েছে।

১০

আকাশ আরেকটা সিগারেট ধরাল।

"ভাই, তুমি কোত্থেকে?"

"মাইমনসিং।"

"বাবা কী করেন?"

"CNG চালান।"

আকাশ জাহিদের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "শোন, তোমাকে একটা কথা বলি। কেউ বলবে না, আমি বলছি।"

জাহিদ শুনল।

"এই ক্যাম্পাস সুন্দর। এসি আছে, ল্যাব আছে, ফরেন-রিটার্নড স্যার আছে। সব সত্যি। কিন্তু পড়ানোটা? সিলেবাস একই। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি যে টেক্সটবুক ইউজ করে, আমরাও সেই টেক্সটবুক পড়েছি। করমেন, নভাক, টেনেনবম। একই বই। শুধু ক্লাসরুমে এসি আছে আর চেয়ারটা নরম।"

জাহিদ কিছু বলল না।

"আর সেই ৮০% প্লেসমেন্ট? জানো কীভাবে হিসাব করে? যারা কোনো জব পেয়েছে, যেকোনো জব, সেটা কাউন্ট করে। কেউ কল সেন্টারে কাজ করছে, সেটাও 'প্লেসড।' কেউ বারো হাজারে ডাটা এন্ট্রি করছে, সেটাও 'প্লেসড।' আর যারা জব পায়নি? তাদের ডেটা? ওই ২০%-এ ফেলে দেয়। কেউ জিজ্ঞেস করে না ওই ২০% কোথায় গেল।"

আকাশ সিগারেট মাটিতে ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে দিল।

"আমার ব্যাচে বত্রিশজন ছিল। আটজন ভালো জব পেয়েছে, ত্রিশ হাজারের ওপরে। বারোজন কোনো না কোনো জব পেয়েছে, পনেরো থেকে বাইশের মধ্যে। আর বাকি বারোজন? কেউ ফ্রিল্যান্সিং ট্রাই করছে, কেউ বাড়ি চলে গেছে, কেউ আরেকটা কোর্স করছে। এদের হিসাব কেউ রাখে না।"

১১

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "তোমার কি আফসোস আছে?"

আকাশ ভাবল। "আফসোস? জানি না। আমি CSE পড়তে চেয়েছিলাম, পড়েছি। কোড লিখতে শিখেছি। সেটা ভালো। কিন্তু..."

"কিন্তু?"

"কিন্তু এই একই জিনিস আমি ঘরে বসে শিখতে পারতাম। ইউটিউবে, ফ্রি কোর্সে। ষোলো লাখ না দিয়ে। জমি বন্ধক না রেখে।"

আকাশ উঠে দাঁড়াল। "আমাকে যেতে হবে। অফিস।"

হাত বাড়াল। জাহিদ হাত মেলাল।

"ভাই, তুমি যা সিদ্ধান্ত নাও, ভেবে নিও। এই ক্যাম্পাসের চকচকে দেয়াল দেখে সিদ্ধান্ত নিও না। দেয়ালের ওপাশে কী আছে, সেটা ভাবো।"

আকাশ চলে গেল। পুরনো জুতো, হলুদ কলার। CSE গ্র্যাজুয়েট। বাইশ হাজারের চাকরি। বারো হাজারের EMI। বাকি দশ হাজার দিয়ে ঢাকায় বেঁচে থাকা। এটাকে আকাশ "ফ্রিডম" বলে না। এটাকে আকাশ কিছু বলে না। শুধু চালায়।

১২

জাহিদ আবার ভর্তি অফিসে গেল। রাহাত ভাই অপেক্ষা করছিলেন।

"কেমন লাগল ক্যাম্পাস?"

"ভালো।"

"তাহলে কি আমরা প্রসিড করব? ফর্ম ফিলআপ করতে মাত্র বিশ মিনিট লাগে। রেজিস্ট্রেশন ফি দশ হাজার।"

দশ হাজার। আজকেই। এখনই। রেজিস্ট্রেশনের জন্য। পরে আরো আসবে।

জাহিদ বলল, "আমি ভেবে জানাব।"

রাহাত ভাইয়ের মুখে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন। হাসি থাকল, কিন্তু চোখে একটু তাড়া। "জাহিদ ভাই, সিট কিন্তু লিমিটেড। স্কলারশিপ সীটও লিমিটেড। দেরি করলে সিট ফুরিয়ে যেতে পারে।"

সিট ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়। এটা সবচেয়ে পুরনো সেলস ট্রিক। "এখনই কিনুন, নইলে শেষ হয়ে যাবে।" জামাকাপড়ের দোকানে যেটা বলে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতেও একই কথা। পণ্য আলাদা, কৌশল এক।

জাহিদ বলল, "আমি জানাব।"

উঠে দাঁড়াল। হাত মেলাল। বের হয়ে গেল।

১৩

লিফটে নামতে নামতে জাহিদ ভাবল।

এই ইউনিভার্সিটি কী বিক্রি করে? শিক্ষা? না। শিক্ষা তো YouTube-তেও আছে, MIT OpenCourseWare-তেও আছে, যেকোনো টেক্সটবুকেও আছে। এই ইউনিভার্সিটি বিক্রি করে তিনটা জিনিস: আশা, ব্র্যান্ড, আর এসি রুম।

আশা: "পড়া শেষ হলে চাকরি হবে।" হয়তো হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু আশাটা বিক্রি হয় চার বছর ধরে। চার বছর ধরে টাকা ঢালো, আশা ধরে রাখো।

ব্র্যান্ড: "প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির CSE।" পাড়ায় বলতে পারবে, "আমার ছেলে CSE পড়ে।" মানুষ মাথা নাড়বে। কেউ জিজ্ঞেস করবে না কত খরচ হচ্ছে, কত ঋণ হচ্ছে।

এসি রুম: চকচকে ক্যাম্পাস, কার্পেটেড ফ্লোর, কাচের দেয়াল। এগুলো পড়ার মান বাড়ায় না। করমেনের অ্যালগরিদম এসি রুমে পড়লেও একই, টিনের চালের ঘরে পড়লেও একই। কিন্তু এসি রুম মনে একটা ভ্রম তৈরি করে: "আমি ভালো জায়গায় পড়ছি।" ভ্রমটা দরকারি। ভ্রম ছাড়া ষোলো লাখ কে দেবে?

লিফটের দরজা খুলল। গ্রাউন্ড ফ্লোর।

১৪

বাইরে বের হলো জাহিদ।

গেটে সেই গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। ইউনিফর্ম পরা। জাহিদ থামল। গার্ডের দিকে তাকাল। গার্ড বয়স্ক, পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তি। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে, দরজা খোলে, বন্ধ করে।

জাহিদ ভাবল, এই গার্ড কত বেতন পায়?

বারো হাজার। হয়তো তেরো। ঢাকায় সিকিউরিটি গার্ডের বেতন এরকমই।

আর ভেতরের আকাশ? CSE গ্র্যাজুয়েট? বাইশ হাজার।

দশ হাজারের ব্যবধান। গার্ড আর CSE গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে। চার বছরের পড়া, ষোলো লাখ টাকা, জমি বন্ধক, EMI, সবকিছুর পর ব্যবধান দশ হাজার টাকা।

গার্ড কোনো টিউশন ফি দেয়নি। কোনো জমি বন্ধক রাখেনি। কোনো EMI দেয় না। গার্ডের বারো হাজার পুরোটা তার।

আকাশের বাইশ হাজারের বারোটা EMI-তে যায়। বাকি দশ হাজার। গার্ডের চেয়ে দুই হাজার কম।

জাহিদ মাথা নাড়ল। সংখ্যাগুলো কথা বলছে। কিন্তু এই কথা কেউ শুনতে চায় না। কারণ এই কথা শুনলে চকচকে ক্যাম্পাসের জাদু ভেঙে যায়। আর জাদু ভাঙলে ষোলো লাখ টাকা কে দেবে?

১৫

রাস্তায় বের হলো জাহিদ। গুলশানের রাস্তা। এসি গাড়ি চলছে, পাশ দিয়ে রিকশা, সিএনজি। দুটো পৃথিবী একই রাস্তায়।

বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জাহিদ মাথায় সব গুছাচ্ছে।

ক্যাম্পাস সুন্দর ছিল। এসি ভালো ছিল। ল্যাবে আসল কম্পিউটার ছিল। রাহাত ভাই মসৃণ ছিল। তানভীরের আত্মবিশ্বাস ছিল। সব ভালো ছিল।

কিন্তু আকাশের কথা কানে বাজছে। "একই টেক্সটবুক।" "বারো হাজার EMI।" "বাইশ হাজার স্যালারি।" "বাড়ি থেকে টাকা আনতে হয়।"

আর সেই সংখ্যাটা। ষোলো লাখ। বাবার আট বছরের আয়।

জাহিদের বাবা CNG চালান প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। ষোলো ঘণ্টা। রোদে, বৃষ্টিতে, ধুলোয়। মাসে পনেরো হাজার নেট আয়। এই পনেরো হাজার দিয়ে চারজনের সংসার চলে। ভাত, ডাল, মাছ, মিমের স্কুল, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, বাড়িভাড়া।

এই বাবাকে জাহিদ বলবে, "বাবা, ষোলো লাখ লাগবে"?

বাবা কী বলবেন? বাবা বলবেন, "কোত্থেকে আনব?" কিন্তু বাবা এটাও বলবেন, "আনব।" কারণ বাবা ছেলের জন্য সব করতে রাজি। জমি নেই বন্ধক রাখার। কিন্তু বাবা ধার করবেন, শরীর খাটাবেন, রাতে ঘুমাবেন না, তবু আনবেন।

আর সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। বাবা "না" বললে জাহিদ থেমে যেত। কিন্তু বাবা "হ্যাঁ" বলবেন, সেটাই বিপদ। বাবার "হ্যাঁ" মানে বাবার শরীর ভাঙবে, বাবার বয়স বাড়বে, বাবার CNG-র স্টিয়ারিং ধরা হাত কাঁপবে। আর জাহিদ এসি রুমে বসে করমেন পড়বে।

১৬

বাসে উঠল জাহিদ। মাইমনসিংয়ের বাস। চার ঘণ্টা।

জানালার পাশে বসল। ঢাকা ছাড়ছে। কাচের বিল্ডিং কমছে, গাছ বাড়ছে। বিল্ডিং ছোট হচ্ছে, আকাশ বড় হচ্ছে।

পকেট থেকে ফোন বের করল। স্প্রেডশিট খুলল।

প্রাইভেট CSE-র সারিতে সংখ্যা বদলাল। সাত লাখ বিশ হাজার মুছে লিখল: ষোলো লাখ। আসল সংখ্যা।

ROI আবার হিসাব করল। ষোলো লাখ বিনিয়োগে, দশ বছরে পঁয়তাল্লিশ লাখ আয় ধরলে: (পঁয়তাল্লিশ বিয়োগ ষোলো) ভাগ ষোলো। 1.81 গুণ।

দেড় গুণেরও কিছু বেশি। আর এটাও "যদি সব ঠিকঠাক যায়।" যদি আকাশের মতো বাইশ হাজারের চাকরি হয়, তাহলে দশ বছরে মোট আয়: ছাব্বিশ-সাতাশ লাখ। ষোলো লাখ বিনিয়োগে সাতাশ লাখ। ROI: 0.69 গুণ।

শূন্য দশমিক ছয় নয়।

মানে ফেরত আসবে না। বিনিয়োগের চেয়ে কম পাবে। লস।

জাহিদ ফোন রেখে দিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

মফস্বলের রাস্তায় একটা CNG চলছে। অন্য কারো বাবা চালাচ্ছে। অন্য কোনো জাহিদের জন্য।

১৭

বাসে বসে জাহিদ ভাবল, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কী আসলে?

একটা ব্যবসা। পণ্য: সার্টিফিকেট আর আশা। ক্রেতা: মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবার যারা বিশ্বাস করে শিক্ষাই একমাত্র সিঁড়ি। মূল্য: পরিবারের সঞ্চয়, জমি, ভবিষ্যৎ। মার্কেটিং: চকচকে ক্যাম্পাস, ফরেন-রিটার্নড ফ্যাকাল্টি, ৮০% প্লেসমেন্ট। ডেলিভারি: একই টেক্সটবুক, একই সিলেবাস, শুধু ঠান্ডা ক্লাসরুম।

এটা বলতে চাইছে না যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি খারাপ। কিছু ভালোও আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু যাদের জন্য এই খরচ সামর্থ্যের বাইরে, তাদের জন্য এটা একটা ফাঁদ। ফাঁদটা দেখতে সুন্দর। ফাঁদে ফুল আছে, এসি আছে, হাসিমুখ কাউন্সেলর আছে। কিন্তু ফাঁদ তো ফাঁদই।

তানভীর এখনো ফাঁদের ভেতরে আছে, কিন্তু জানে না। তানভীর ভাবছে ফাঁদ থেকে বের হওয়ার রাস্তা আছে, চাকরি নামে। হয়তো আছে। হয়তো নেই।

আকাশ বের হয়েছে। কিন্তু ফাঁদের দড়ি এখনো পায়ে জড়ানো। EMI নামে। আরো চার বছর।

১৮

বাস মাইমনসিংয়ে পৌঁছাল সন্ধ্যায়।

জাহিদ নামল। রিকশায় উঠল। বাড়ির দিকে। রিকশাওয়ালা পেডেল মারছে, জাহিদ বসে আছে। পরিচিত রাস্তা, পরিচিত দোকান, পরিচিত মানুষ। মফস্বল। এখানে কোনো কাচের বিল্ডিং নেই, কোনো ফোয়ারা নেই, কোনো চল্লিশ টাকার চা নেই।

কিন্তু এখানে বাবা আছে, মা আছে, মিম আছে। এখানে ঋণ নেই, EMI নেই, জমি বন্ধক নেই।

বাড়িতে পৌঁছাল। মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন।

"কেমন?"

"দেখে এলাম।"

"কী দেখলি?"

জাহিদ একটু চুপ করল। তারপর বলল, "চকচকে।"

মা বুঝলেন। মা সবসময় বোঝেন। "চকচকে" শব্দটায় কী আছে, মা জানেন। মা জানেন চকচকে জিনিস সোনাও হয়, পিতলও হয়।

"ভাত খা। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

জাহিদ ভাত খেল। ডাল দিয়ে। কাল রাতের আলুভর্তা দিয়ে। বিনামূল্যে। কোনো ল্যাব ফি নেই, ডেভেলপমেন্ট চার্জ নেই।

রাতে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। টিনের চাল। পাখা ঘুরছে, কিন্তু গরম যাচ্ছে না। এসি নেই এখানে।

কিন্তু ঋণও নেই।

জাহিদ ভাবল, গেটের গার্ড বারো হাজার পায়। আকাশ বাইশ হাজার পায়, কিন্তু EMI দিয়ে দশ হাজার থাকে। গার্ডের চেয়ে দুই হাজার কম নিয়ে বাঁচে একজন CSE গ্র্যাজুয়েট। চার বছর পড়া, ষোলো লাখ টাকা, আর শেষে গার্ডের চেয়ে কম।

এই হিসাবটা কেউ কোনোদিন ব্রোশিওরে ছাপে না।

জাহিদ পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। ঘুম এলো না। কিন্তু সিদ্ধান্তটা একটু পরিষ্কার হলো। প্রাইভেটে যাওয়া হবে না। এটুকু জানা গেল।

বাকি দুটো অপশন। জগন্নাথ আর ন্যাশনাল। দুটোর মধ্যে একটা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আজ না। আজ শুধু একটা দরজা বন্ধ হলো।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। মিম পাশের ঘরে ঘুমিয়ে গেছে। মা সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন, মেশিনের একটানা আওয়াজ আসছে। বাবা এখনো ফেরেননি। CNG নিয়ে বাইরে। রাতের প্যাসেঞ্জার।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল।

চকচকে ক্যাম্পাসের ছবি ভেসে উঠল। কাচের দেয়াল, ফোয়ারা, এসি। তারপর আকাশের মুখ ভেসে উঠল। পুরনো জুতো, হলুদ কলার। তারপর গেটের গার্ডের মুখ। ক্লান্ত, পঞ্চাশ বছর বয়স, সারাদিন দাঁড়িয়ে।

তিনটা মুখ। তিনটা জীবন। একটা গেট।

গেটের এপাশে গার্ড। বারো হাজার। কোনো ঋণ নেই।

গেটের ওপাশে আকাশ। বাইশ হাজার। বারো হাজার EMI। বাকি দশ।

ব্যবধান: দশ হাজার টাকা আর ষোলো লাখ ঋণ।

ঘুম এলো।