পলিটেকনিকের পথ

বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হয় না, জিনিস বানাতে হয়

পর্ব ১৮ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হয় না, জিনিস বানাতে হয়

---

পলিটেকনিকের গেটটা লোহার। মরচে ধরা। একটা পাল্লা খোলে, আরেকটা খোলে না। গেটের ওপরে সাইনবোর্ড, সাদা রঙের ওপর নীল অক্ষরে লেখা: সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। কয়েকটা অক্ষরের রঙ উঠে গেছে। "সরকারি" পড়া যায়, "পলিটেকনিক" পড়া যায়, "ইনস্টিটিউট" শব্দের শেষের "ট" মুছে গেছে।

জাহিদ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল, এখানে ফারুক পড়ে।

ভেতরে ঢুকল। ক্যাম্পাসটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গাছের সারি থাকে, বেঞ্চ থাকে, ছেলেমেয়েরা ঘাসে বসে আড্ডা দেয়। এখানে ঘাস কম, মাটি বেশি। একটা পুরোনো বিল্ডিং, দোতলা, হলুদ রঙ করা ছিল একসময়, এখন ধূসর। পেছনে টিনের ছাদের একটা লম্বা ঘর। সেটা ওয়ার্কশপ।

জাহিদ আগে কোনোদিন পলিটেকনিকে আসেনি। কোনো কারণ ছিল না আসার। জাহিদের পরিচিত কেউ পলিটেকনিকে পড়ে না। পড়ত না। এখন ফারুক পড়ে।

---

ফারুককে খুঁজে পেতে সময় লাগল না। ওয়ার্কশপের সামনে একটা ছেলে বলল, "ফারুক? ইলেকট্রিক্যালে আছে। ওই পাশে।"

জাহিদ ওই পাশে গেল।

ওয়ার্কশপের ভেতরটা অন্য জগৎ। জাহিদ ক্লাসরুম চেনে। চেয়ার, টেবিল, ব্ল্যাকবোর্ড, স্যারের লেকচার, ছাত্রদের নোট নেওয়া। সেরকম কিছু এখানে নেই। এখানে মেশিন আছে। বড় বড় লোহার মেশিন। একটা লেদ মেশিন ঘুরছে, ধাতু কাটছে, লোহার গুঁড়ো উড়ছে। পাশে একটা ওয়েল্ডিং স্টেশন, নীল আলো জ্বলছে, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। একটা ছেলে হেলমেট পরে ওয়েল্ডিং করছে, আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছে।

গন্ধটাও আলাদা। কোচিং সেন্টারে ঘামের গন্ধ, চকের গুঁড়োর গন্ধ। এখানে ধাতুর গন্ধ, তেলের গন্ধ, পোড়া ধাতুর গন্ধ। জাহিদ শুঁকল। অচেনা গন্ধ, কিন্তু কেমন যেন সৎ।

ইলেকট্রিক্যাল সেকশনে ফারুক পেল।

---

ফারুকের হাত কালো। তেলের দাগ। আঙুলের নখের ভেতরে কালি ঢুকে গেছে। জামার হাতায় একটা পোড়া দাগ, সোল্ডারিং আয়রন থেকে হয়তো। চুল এলোমেলো। চশমাটা নাকের ওপর একটু বাঁকা।

কিন্তু ফারুক হাসছে।

জাহিদ থামল। এই হাসিটা দেখে থামল। কারণ জাহিদ মনে করতে পারছে না, শেষ কবে ফারুককে হাসতে দেখেছে। রেজাল্টের পর ফারুককে দেখেছে, চুপচাপ ছিল। কোচিং সেন্টারের সামনে দেখা হয়েছে, মুখ কালো ছিল। বাড়িতে একবার গিয়েছিল, ফারুক ঘরে শুয়ে ছিল, কথা বলতে চায়নি।

এখন ফারুক হাসছে। হাতে একটা সার্কিট বোর্ড। পাশে একটা সোল্ডারিং আয়রন। বোর্ডে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ লাগানো, তারের সাথে তার জোড়া, রঙিন তারগুলো সাপের মতো প্যাঁচানো।

"জাহিদ!" ফারুক চমকে উঠল। "তুই এখানে?"

"দেখতে আসলাম।"

ফারুক সোল্ডারিং আয়রন রাখল। জাহিদের দিকে হাত বাড়াল, তারপর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থামল। "হাত নোংরা।"

"আয়।"

দুই বন্ধু হাত মেলাল। জাহিদের হাতে তেলের দাগ লাগল। জাহিদ পরোয়া করল না।

---

ফারুক জাহিদকে ঘুরিয়ে দেখাল। মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপে লেদ মেশিনে লোহা কাটা হচ্ছে। সিভিল সেকশনে ইট আর সিমেন্ট দিয়ে কলাম বানানো হচ্ছে। ইলেকট্রনিক্স ল্যাবে অসিলোস্কোপের সবুজ আলো ঢেউ খেলছে।

কেউ লেকচার শুনছে না। কেউ নোট নিচ্ছে না। সবাই কিছু একটা করছে। হাত চালাচ্ছে।

"এখানে ক্লাস হয় না?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"হয়। থিওরি ক্লাস আছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় ওয়ার্কশপে। এখানে বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হয় না। জিনিস বানাতে হয়। আমি বানাতে পারি।"

কোনো বড়াই নেই। শুধু একটা তথ্য।

---

ক্যান্টিনে বসল দুইজন। ক্যান্টিন মানে একটা টিনের ছাদের ঘর, কয়েকটা বেঞ্চ, একটা চায়ের দোকান। চা পাঁচ টাকা।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "খরচ কত?"

ফারুক চায়ে ফুঁ দিল। "সরকারি পলিটেকনিক। টিউশন ফি নেই বললেই চলে। সেমিস্টারে কয়েকশো টাকা। বই কিনতে হয়, কিছু যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। মোটামুটি চলে।"

"চার বছর?"

"চার বছর। ডিপ্লোমা।"

"তারপর?"

ফারুক চা খেল একটু। "তারপর সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি চাকরি পেলে শুরুতে পনেরো থেকে আঠারো হাজার। প্রাইভেট সেক্টরে কন্সট্রাকশন, পাওয়ার, টেলিকমে কাজ আছে। পাঁচ বছর পর পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার। কেউ কেউ বিদেশে যায়।"

"বিদেশ?"

"মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া। টেকনিশিয়ান হিসেবে। পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার টাকা মাসে পাচ্ছে অনেকে। আমাদের সিনিয়র একজন আছে, সৌদিতে, ইলেকট্রিক্যাল টেকনিশিয়ান। মাসে সত্তর হাজার পাঠায়।"

জাহিদ চুপ করে শুনল। পনেরো হাজার দিয়ে শুরু। তার বাবা পনেরো বছর ধরে সিএনজি চালিয়ে পনেরো হাজার কামায়। ফারুক চার বছর পড়ে শুরুতেই সেখানে পৌঁছে যাবে। পাঁচ বছর পর দ্বিগুণ।

অঙ্কটা সোজা। কিন্তু অঙ্কটা কেউ করে না। কারণ অঙ্কের চেয়ে বড় একটা জিনিস আছে। সেটা হলো মুখ। সমাজে মুখ দেখানোর একটা অঙ্ক আছে, সেই অঙ্কে পলিটেকনিক হেরে যায়।

---

"লোকে কী বলে জানিস?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

ফারুক হাসল। তিক্ত হাসি না, বরং মজা পাওয়ার হাসি। যেন এই প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করছিল।

"জানি। পলিটেকনিক? তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাসনি?"

জাহিদ কিছু বলল না।

"আমার খালা বলেছে। আমার চাচা বলেছে। পাড়ার লোক বলেছে। সবার একই কথা। পলিটেকনিক মানে ব্যর্থ। পলিটেকনিক মানে যারা ভালো পড়তে পারে না তারা যায়। পলিটেকনিক মানে সেকেন্ড ক্লাস।" ফারুক থামল। "কিন্তু জানিস, এই কথা যারা বলে, তারা কেউ জানে না পলিটেকনিকে কী শেখায়। তারা শুধু জানে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় না।"

"তোর কষ্ট হয়?"

ফারুক ভাবল কিছুক্ষণ। "প্রথম দিকে হতো। এখন হয় না। এখন আমি জানি আমি কী শিখছি। আমি তার কাটতে পারি, সোল্ডার করতে পারি, সার্কিট ডিজাইন করতে পারি। দুই মাসে এটুকু শিখেছি। চার বছর পর কোথায় থাকব, সেটা ভাবলে ভয় লাগে না। ভালো লাগে।"

জাহিদ চায়ের কাপ ঘোরাল। ফারুকের কথা শুনতে শুনতে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। হিংসা না। বরং এক ধরনের অবাক হওয়া। ফারুকের জিপিএ ৩.৮০ ছিল। জাহিদের ৪.১৭। কিন্তু এই মুহূর্তে ফারুক জানে সে কোথায় যাচ্ছে। জাহিদ জানে না।

---

বেলা বারোটার দিকে একটা রিকশা এসে থামল গেটের কাছে। রিকশা থেকে একজন লোক নামলেন। শুকনো চেহারা, গায়ের রঙ রোদে পোড়া, লুঙ্গি আর একটা হাফ শার্ট। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ।

ফারুক উঠে দাঁড়াল। "বাবা!"

ফারুকের বাবা। রিকশাচালক। জাহিদ জানে, ফারুকের বাবা রিকশা চালান। সকাল থেকে রাত। দিনে তিনশো, চারশো টাকা আসে। কখনো পাঁচশো। শরীর খারাপ হলে কিছু আসে না।

ফারুকের বাবা পলিথিনের ব্যাগ থেকে একটা টিফিন বক্স বের করলেন। "তোর মা পাঠিয়েছে। ডাল-ভাত আর একটু আলু ভর্তা।"

ফারুক টিফিন বক্স নিল।

ফারুকের বাবা ক্যাম্পাসের দিকে তাকালেন। ওয়ার্কশপের দিকে। টিনের ছাদ, মরচে ধরা গেট, ধূসর বিল্ডিং। সুন্দর কিছু না। কিন্তু ফারুকের বাবার চোখে একটা জিনিস ছিল যেটা জাহিদ ধরতে পারল।

গর্ব।

নিচু স্বরের গর্ব। চুপচাপ গর্ব। যে গর্ব মুখে বলে না, শুধু চোখে থাকে। ফারুকের বাবা জানেন, তাঁর ছেলে কিছু একটা শিখছে। হাত দিয়ে শিখছে। কাগজের সার্টিফিকেটের বাইরে কিছু একটা। যেটা দিয়ে কাজ পাওয়া যায়, টাকা আসে, সংসার চলে। রিকশাচালকের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট হোক, পুরো ইঞ্জিনিয়ার না হোক, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার।

ফারুকের বাবা বেশিক্ষণ থাকলেন না। "যা, খেয়ে নে। আমি যাই। রোদ বাড়ছে, বিকালে সওয়ারি কমে যায়।"

রিকশায় উঠলেন। প্যাডেল মারলেন। জাহিদ দেখল, ফারুকের বাবার পিঠ একটু বাঁকা। রিকশার হ্যান্ডেলে ধরা হাতদুটো শুকনো, শিরা বেরিয়ে আছে।

ফারুক টিফিন বক্স খুলল। ডাল-ভাত, আলু ভর্তা। সাধারণ খাবার। কিন্তু ফারুক যেভাবে খাচ্ছে, যত্ন করে, আস্তে আস্তে, সেটা দেখে মনে হলো সাধারণ না।

জাহিদ পাশে বসে রইল। নিজের টিফিন নেই, কিন্তু ক্ষুধাও নেই।

---

ফারুক খেতে খেতে বলল, "তুই কোথায় ভর্তি হবি ঠিক করেছিস?"

জাহিদ মাথা নাড়ল। "না।"

"ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি?"

"নিচ্ছি। কোচিং করছি।"

"কোন কোন জায়গায় দিবি?"

"ঢাবি, বুয়েট, মেডিকেল, জাহাঙ্গীরনগর। সবখানে।"

ফারুক কিছু বলল না। ভাত মুখে দিল।

জাহিদ বলল, "রাসেল তো জানিস। সেও দিচ্ছে সবখানে। ওর বাবা বলেছে, পাবলিক না পেলে প্রাইভেটে দেবে।"

ফারুক বলল, "রাসেলের বাবার সামর্থ্য আছে।"

"হুম।"

"তোর বাবার?"

জাহিদ চুপ করে রইল।

ফারুক টিফিন বক্সের ঢাকনা বন্ধ করল। "জাহিদ, তুই আমার চেয়ে ভালো পড়িস। সেটা সত্য। কিন্তু একটা কথা বলি?"

"বল।"

"রাসেল চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। থিওরি পড়বে। পরীক্ষা দেবে। সিজিপিএ তুলবে। চার বছর পর একটা সার্টিফিকেট নিয়ে বের হবে। তারপর চাকরি খুঁজবে। চাকরি না পেলে মাস্টার্স করবে। মাস্টার্সের পরেও না পেলে বিসিএসের প্রিপারেশন নেবে।"

জাহিদ শুনছে।

"আমি চার বছর এখানে থাকব। মেশিন চালাব, সার্কিট বানাব, ইন্সটলেশন করব। চার বছর পর আমি কিছু বানাতে পারব। আমার হাতে একটা দক্ষতা থাকবে। সার্টিফিকেটও থাকবে, কিন্তু সার্টিফিকেটের চেয়ে বড় জিনিস হাতে থাকবে।"

ফারুক থামল। "কে ভালো অবস্থায় থাকবে, সেটা আমি জানি না। হয়তো রাসেল। হয়তো আমি। কিন্তু আমি অন্তত জানি, আমি কী পারি।"

---

জাহিদ ক্যাম্পাসে ঘুরল আরও কিছুক্ষণ। একটা নোটিশবোর্ড দেখল। "সাবেক শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান তথ্য।" তালিকায় নাম আর কর্মস্থল। একজন ঢাকা ওয়াসায়। একজন পল্লী বিদ্যুতে। একজন গ্রামীণফোনের টাওয়ার মেইনটেন্যান্সে। একজন দুবাইতে। একজন সিঙ্গাপুরে।

পাশে আরেকটা কাগজ। "ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং: একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার পথ।" চার বছরের কোর্স, সরকারি পলিটেকনিকে খরচ নগণ্য। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে শুরু, পনেরো থেকে আঠারো হাজার। পাঁচ বছরে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। বিদেশে টেকনিক্যাল ওয়ার্কার হিসেবে পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার।

জাহিদ তথ্যগুলো পড়ল। এই তথ্যগুলো কেন কেউ বলে না? স্কুলে বলে না, কোচিং সেন্টারে বলে না, পাড়ায় বলে না।

---

১০

বিকালে ফারুক জাহিদকে ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপে নিয়ে গেল।

"এটা দেখ।"

ফারুক একটা সার্কিট বোর্ড তুলে ধরল। ছোট, হাতের তালুর সমান। সবুজ রঙের বোর্ডে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ সোল্ডার করা। রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, একটা ছোট চিপ। তারগুলো গোছানো, পরিষ্কার। একটা এলইডি লাগানো, সেটা লাল আলো দিচ্ছে।

"এটা কী?"

"এটা আমার প্রথম প্রজেক্ট।" ফারুক বলল। "একটা সাধারণ ভোল্টেজ রেগুলেটর সার্কিট। ইনপুটে বারো ভোল্ট দিলে আউটপুটে পাঁচ ভোল্ট দেয়। মোবাইল চার্জ করা যায়।"

জাহিদ বোর্ডটা হাতে নিল। হালকা। কিন্তু ভারী একটা জিনিস এটা। কারণ এটা ফারুক বানিয়েছে। নিজের হাতে। কেউ বানিয়ে দেয়নি, বইতে পড়ে মুখস্থ করেনি। সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখেছে, যন্ত্রাংশ জোগাড় করেছে, সোল্ডারিং আয়রন ধরেছে, একটা একটা করে জুড়েছে। পুড়িয়ে ফেলেছে দুইবার, আবার করেছে। তিন দিন লেগেছে।

ফারুকের চোখ জ্বলছে। সেই জ্বলা কোচিং সেন্টারের কোনো ছাত্রের চোখে জাহিদ দেখেনি। কোচিং সেন্টারে সবার চোখে ভয় আছে, উদ্বেগ আছে, ক্লান্তি আছে। এই জ্বলাটা অন্য। এটা কিছু একটা বানানোর জ্বলা। কিছু একটা পারার জ্বলা।

জাহিদ বোর্ডটা ফারুককে ফেরত দিল।

"তুই ভালো করেছিস, ফারুক।"

ফারুক বোর্ডটা যত্ন করে রাখল। "আমি জানি না ভালো করেছি কি না। কিন্তু আমি জানি, আমি এটা পারি। আর পারাটা ভালো লাগে।"

---

১১

জাহিদ পলিটেকনিক থেকে বের হলো বিকালে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবল।

ফারুকের জিপিএ ৩.৮০ ছিল। পুরো এলাকা ধরে নিয়েছিল, ফারুক ব্যর্থ। খালা বলেছে ব্যর্থ। চাচা বলেছে ব্যর্থ। পাড়ার মানুষ বলেছে ব্যর্থ। কারণ ফারুক বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি।

কিন্তু আজ জাহিদ দেখল, ফারুক হাসছে। ফারুকের হাত নোংরা, কিন্তু ফারুক জানে সে কী করছে। ফারুকের বাবা রিকশাচালক, কিন্তু ফারুকের বাবার চোখে গর্ব।

রাসেল চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওরি পড়বে। ফারুক চার বছর জিনিস বানাবে। কে ভালো অবস্থায় থাকবে? জাহিদ জানে না।

কিন্তু একটা জিনিস জাহিদ বুঝল। "বিশ্ববিদ্যালয়" একটা শব্দ যেটা মুগ্ধ করে। "পলিটেকনিক" একটা শব্দ যেটা খাওয়ায়। পুরো দেশ মুগ্ধ হওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে। খাওয়ার কথা কেউ ভাবছে না।

জাহিদ বাবার কথা ভাবল। পনেরো বছর ধরে সিএনজি চালান। মাসে পনেরো হাজার। ফারুক চার বছর পর শুরু করবে পনেরো থেকে আঠারো হাজারে। ফারুকের বাবা সারাজীবন রিকশা চালিয়ে মাসে দশ থেকে বারো হাজার কামান। ফারুক চার বছর পর সেই সারাজীবনের কামাই ছাড়িয়ে যাবে। এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা না। এটা একটা সিদ্ধান্ত।

---

১২

রাতে জাহিদ খাটে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্যান ঘুরছে। পাশের ঘরে বাবা মা কথা বলছে, শুধু গুনগুন শোনা যাচ্ছে।

রাসেলের বাবা বলেছেন, পাবলিক না পেলে প্রাইভেটে দিতে হবে। প্রাইভেটে চার বছরে আট থেকে দশ লাখ। তারপর চাকরির বাজারে পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকার চাকরি খোঁজা। যদি পাওয়া যায়।

ফারুক কত খরচে পড়ছে? প্রায় বিনামূল্যে। চার বছর পর চাকরি প্রায় নিশ্চিত। কন্সট্রাকশন বাড়ছে, পাওয়ার সেক্টর বাড়ছে, টেলিকম বাড়ছে। টেকনিশিয়ান ছাড়া এগুলো চলে না।

কিন্তু এসব কথা কেউ বলে না। কোচিং সেন্টারে বলে না। স্কুলে বলে না। কারণ এসব কথা বললে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহাত্ম্য কমে যায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহাত্ম্য কমলে কোচিং সেন্টারের ব্যবসা কমে যায়।

জাহিদ পাশ ফিরল। চোখ বন্ধ করল।

ফারুকের সেই সার্কিট বোর্ডটা চোখের সামনে ভাসছে। সবুজ বোর্ড, ছোট ছোট যন্ত্রাংশ, লাল এলইডির আলো। ফারুকের চোখের সেই জ্বলা। কোচিং সেন্টারের কারও চোখে সেই জ্বলা নেই। কোচিং সেন্টারে সবার চোখে একটাই জিনিস: ভয়।

ফারুকের চোখে ভয় নেই। ফারুক জানে সে কী পারে। সেটাই তার শক্তি।

জাহিদ ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে একটা সার্কিট বোর্ড দেখল। বোর্ডে একটা লাল আলো জ্বলছে। ছোট্ট আলো। কিন্তু অন্ধকারে সেটুকুই যথেষ্ট।