সবাই যেদিকে যায়

দশজন দাঁড়িয়ে থাকলে এগারোতম লোকটাও দাঁড়ায়, চা ভালো কিনা না জেনেই

পর্ব ১৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

বিকেলে চায়ের দোকানে চারজন বসে আছে।

জাহিদ, রাসেল, আরিফ, ফারুক। সুমাইয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু কান এদিকে।

এই চারজন একসাথে HSC দিয়েছে। একসাথে কোচিংয়ে গেছে। এখন একসাথে চায়ের দোকানে বসে আছে, কিন্তু প্রত্যেকের সামনে আলাদা রাস্তা।

রাসেল BUET পেয়েছে। EEE। সে এখন একটু উঁচু স্বরে কথা বলে, চায়ে চুমুক দেয় ধীরে ধীরে, যেন দুনিয়াটা তার জন্য অপেক্ষা করবে।

আরিফ জাপান যাবে। কোনো ভাষা স্কুলে। তারপর কাজ খুঁজবে।

ফারুক একটা প্রাইভেটে BBA-তে ভর্তি হচ্ছে। বাবার সিদ্ধান্ত।

সুমাইয়া মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। রংপুর। পরিবার উৎসবে।

জাহিদ চায়ে চুমুক দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, "রাসেল, তুই BUET কেন চেয়েছিলি?"

রাসেল একটু অবাক হলো। BUET কেন চায় কেউ, এটা কি জিজ্ঞেস করার বিষয়?

"মানে?"

"মানে, তুই কেন EEE চেয়েছিলি? তুই কি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পছন্দ করিস? কোনো ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলেছিস?"

রাসেল চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। "সবাই তো BUET চায়।"

"হ্যাঁ, সেটা জানি। কিন্তু তুই কেন চাস? তোর নিজের কারণটা কী?"

"BUET থেকে পাশ করলে চাকরি পাওয়া সহজ। বেতন ভালো। সবাই রেসপেক্ট করে।"

"এগুলো তুই কোথায় শুনেছিস?"

"সবাই বলে।"

জাহিদ খেয়াল করল, রাসেলের প্রতিটা উত্তরে "সবাই" শব্দটা আছে। সবাই চায়, সবাই বলে, সবাই জানে। রাসেল নিজে কী চায়, সেটা কোথাও নেই।

"তুই যদি BUET না পেতি?"

"RUET হয়তো। অথবা CUET।"

"মানে আরেকটা ইঞ্জিনিয়ারিং? ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কিছু ভাবিসনি কখনো?"

রাসেল চুপ।

রাসেলের পৃথিবী: BUET, RUET, CUET, KUET। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং। বাকি সব অদৃশ্য। কারণ রাসেলের পাড়ায়, স্কুলে, কোচিংয়ে সবাই ইঞ্জিনিয়ারিং ইঞ্জিনিয়ারিং করে। মানচিত্রের বাইরে "এখানে দানব আছে" লেখা।

জাহিদ সুমাইয়ার দিকে তাকাল। "সুমাইয়া, তুই মেডিকেলে কেন?"

সুমাইয়া একটু হাসল। হাসিটা তিক্ত।

"আমার মা আমাকে গর্ভে ধারণ করার আগে থেকে ঠিক করে রেখেছেন আমি ডাক্তার হব।"

"কেন?"

"আব্বা বলেন, ডাক্তার হলে ভালো পাত্র পাওয়া যায়।"

চায়ের দোকানে একটা নীরবতা নামল।

সুমাইয়া বলল, "আমি ক্লাস সেভেনে থাকতে একটা ছবি এঁকেছিলাম। আর্ট টিচার বলেছিলেন, তোমার হাতে ট্যালেন্ট আছে। আমি সেই ছবিটা আম্মাকে দেখিয়েছিলাম। আম্মা বলেছিলেন, ছবি আঁকা শখ, পড়ালেখা আসল। সব রঙ-তুলি ফেলে দিয়েছিলেন।"

জাহিদ ভাবল, সুমাইয়ার ক্যারিয়ার সিদ্ধান্তের মূলে আছে বিয়ের বাজার। সুমাইয়া কী করতে চায়, কোথায় ভালো, সেটা কোনো ফ্যাক্টর না। ফ্যাক্টর হলো: বিয়ের বাজারে কোন পেশার মেয়েদের দাম বেশি।

ডাক্তার মেয়ে = ভালো পাত্র। আর্টিস্ট মেয়ে = "সে আবার কী করে?"

একটা কাল্পনিক মানুষের কাল্পনিক পছন্দের ওপর ভিত্তি করে একটা আঠারো বছরের মেয়ের আসল জীবনের আসল সিদ্ধান্ত।

আরিফের দিকে ফিরল জাহিদ। "আরিফ, তুই জাপান কেন?"

"মামাতো ভাই গেছে। ভালো কামাচ্ছে।"

"তোর মামাতো ভাই কী করে জাপানে?"

"ফ্যাক্টরিতে কাজ করে।"

"তুই কি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে চাস?"

আরিফ থতমত খেল। "প্রথমে ফ্যাক্টরি হবে। তারপর ভালো কিছু।"

"তুই কি জাপানি ভাষা পারিস? সেখানে বাংলাদেশি ছেলেরা কেমন আছে, খোঁজ নিয়েছিস?"

আরিফ চায়ে চুমুক দিল। উত্তর দিল না।

উত্তর না দেওয়াটাই উত্তর। আরিফ জাপান যাচ্ছে কারণ মামাতো ভাই গেছে। ব্যস। মামাতো ভাই যদি দুবাই যেত, আরিফ দুবাই যেত। মামাতো ভাই যদি মালয়েশিয়া যেত, আরিফ মালয়েশিয়া যেত। গন্তব্য কোনো বিষয় না। বিষয় হলো: কেউ একজন আগে গেছে, তাই আমিও যাব।

ফারুকের দিকে তাকাল।

"ফারুক, তোর BBA?"

"বাবা বলেছেন।"

"তোর বাবা কেন BBA বললেন?"

"পাশের বাসার সাইফুল ভাই BBA করে ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। বাবা সেটা দেখে বললেন, তুইও BBA কর।"

একটা ডেটা পয়েন্ট। একজন মানুষ। পাশের বাসার সাইফুল ভাই। সাইফুল ভাই কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে BBA করেছেন, কত GPA, কোন ব্যাংকে, কত বেতনে, কিছু জানা নেই। ফারুকের আগ্রহ কোথায়, কিছু জানা নেই। শুধু জানা আছে: পাশের বাসার ভাই করেছে, আমিও করব।

জাহিদ চারজনের দিকে তাকাল। চারজন, চারটা ভিন্ন পথ। কিন্তু একটা জিনিস কমন। কেউ নিজে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

রাসেল: "সবাই BUET চায়।" পাল।

সুমাইয়া: "আব্বা ঠিক করেছেন।" পরিবার।

আরিফ: "মামাতো ভাই গেছে।" আত্মীয়।

ফারুক: "পাশের বাসার সাইফুল ভাই।" প্রতিবেশী।

চারটা সিদ্ধান্ত। কোনোটাতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নিজে নেই।

জাহিদ নিজেকে জিজ্ঞেস করল: আমি কি আলাদা?

উত্তর: না।

জাহিদও ঢাবির পরীক্ষা দিয়েছে কারণ সবাই দেয়। মেডিকেল দিয়েছে কারণ "চান্স নিয়ে দেখি।" BUET দিয়েছে কারণ সায়েন্সের ছেলে মানেই BUET-এর পরীক্ষা দিতে হবে। জাহিদও পালের ভেড়া।

সুমাইয়া বলল, "জাহিদ ঠিকই বলছে।"

সবাই তাকাল।

"আমি ডাক্তার হতে চাই না। আমি ছবি আঁকতে চাই। ডিজাইন করতে চাই। রঙ নিয়ে কাজ করতে চাই। কিন্তু এটা বললে আম্মা বলবেন পাগলামি, আব্বা বলবেন মাথা খারাপ, পাড়া বলবে ডাক্তারি ছেড়ে ছবি আঁকবে?"

সুমাইয়ার চোখ একটু ভিজে গেল। কিন্তু কাঁদল না।

"আমি মেডিকেলে যাব। পড়ব। পাশ করব। ডাক্তার হব। কারণ আমার পছন্দ কোনো ফ্যাক্টর না। আমি শুধু একটা ভেরিয়েবল যেটার মান অন্যরা ঠিক করে।"

একটা রিকশা এলো। সুমাইয়া উঠে বসল। চলে গেল।

সুমাইয়া চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ।

রাসেল বলল, "তোর পয়েন্ট কী, জাহিদ?"

"আমরা কেউ নিজের সিদ্ধান্ত নিইনি।"

"তাতে সমস্যা কী? BUET-এ পড়া কি খারাপ?"

"না। BUET ভালো। মেডিকেল ভালো। জাপান ভালো হতে পারে। BBA ভালো হতে পারে। আমি বলছি না সিদ্ধান্তগুলো ভুল। আমি বলছি, সিদ্ধান্তগুলো আমাদের না।"

"তফাৎটা কী?"

"তফাৎটা হলো, যখন কঠিন সময় আসবে, তখন বুঝবি। তুই EEE-তে গিয়ে যদি সার্কিটের ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়িস, তখন কী ভাববি? ভাববি, আমি তো এটা চেয়েছিলাম। কিন্তু আসলে তুই চাসনি। সবাই চেয়েছিল।"

চায়ের দোকানের মালিক মকবুল ভাই চা বানাচ্ছেন। দুধ ঢালছেন, চিনি দিচ্ছেন।

জাহিদ মকবুল ভাইয়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে ভাবল।

ঢাকায় একটা গলিতে একটা চায়ের দোকান। দোকানের সামনে দশজন মানুষ দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। এগারোতম একজন মানুষ গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দেখল অনেক লোক। দাঁড়িয়ে গেল। চা অর্ডার করল।

চা ভালো কিনা জানে না। দাম কত জানে না। কিন্তু দশজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তাই ভালো হবেই।

দ্বাদশতম মানুষ এলো। এগারোজন দাঁড়িয়ে দেখে সেও দাঁড়াল। ত্রয়োদশতম। চতুর্দশতম। বিশতম।

বিশজনের একজনও জানে না চা ভালো কিনা। প্রত্যেকে জানে শুধু একটা জিনিস: বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে।

এটাই পালের আচরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এই চায়ের দোকানের কোনো তফাৎ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস? কারণ সবাই চায়। সবাই কেন চায়? কারণ সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস। বৃত্ত। পুরোটাই বৃত্ত।

BUET কেন স্বপ্ন? কারণ সবাই বলে স্বপ্ন। সবাই কেন বলে? কারণ তারাও শুনেছে সবাই বলে।

কেউ কখনো বৃত্তটা ভেঙে বের হয়ে জিজ্ঞেস করে না, "কিন্তু আসলেই কি এই রাস্তাটা আমার জন্য?"

১০

বাড়ি ফেরার রাস্তায় জাহিদ একা হাঁটছিল।

আকাশে সন্ধ্যার রঙ। কমলা আর বেগুনির মাঝখানে একটা রঙ যেটার নাম জাহিদ জানে না।

সে ভাবছিল, আজকে সবাইকে প্রশ্ন করেছে। কিন্তু নিজেকে?

জাহিদ, তুই কী চাস?

উত্তর নেই। জাহিদ জানে কী চায় না। রসায়ন চায় না। কিন্তু কী চায়? CSE? হয়তো। ফিজিক্স? হয়তো। "হয়তো" একটা উত্তর না।

অন্যদের প্রশ্ন করা সহজ। নিজেকে প্রশ্ন করা কঠিন। অন্যের পালের আচরণ চোখে পড়ে। নিজের পালের আচরণ অদৃশ্য।

১১

বাড়িতে ফিরে জাহিদ ঘরে গেল। দরজা বন্ধ করল।

বিছানার নিচ থেকে ডায়েরি বের করল। পুরোনো ডায়েরি, মলাট ছেঁড়া, কিছু পাতা হলুদ। জাহিদ লেখে না নিয়মিত। মাঝে মাঝে, যখন মাথা খুব ভারী হয়।

আজকে মাথা ভারী।

কলম তুলে নিল।

"আমি কী চাই?"

"সবাই কী চায়, সেটা জানি। বাবা কী চান, সেটা জানি। মা কী চান, সেটা জানি। পাড়া কী বলে, সেটা জানি।"

"কিন্তু আমি কী চাই? আমি। জাহিদ। শুধু জাহিদ। সবার কথা বাদ দিলে, সবার চাপ বাদ দিলে, সবার প্রত্যাশা বাদ দিলে, যদি পৃথিবীতে শুধু আমি একা থাকতাম, তাহলে আমি কী করতাম?"

১২

কলম থামাল জাহিদ। উত্তর লিখতে পারল না।

আঠারো বছর ধরে কেউ এই প্রশ্নটা করেনি। না শিক্ষক, না বাবা-মা, না কোচিং সেন্টার। সবাই বলেছে কোথায় যেতে হবে, কী পরীক্ষা দিতে হবে। কেউ বলেনি, "তুমি কী চাও?"

এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। কারিকুলামে নেই। কোচিংয়ের সিলেবাসে নেই। বাবা-মায়ের চেকলিস্টে নেই।

সবার চেকলিস্ট: GPA কত? কোন গ্রুপ? কোন ইউনিটের পরীক্ষা? কোথায় চান্স?

কারো চেকলিস্টে নেই: বাচ্চাটা কী করতে পছন্দ করে? ছেলেটা কোন কাজে সময় ভুলে যায়? মেয়েটার চোখ কখন জ্বলে ওঠে?

১৩

জাহিদ আবার লিখল:

"আমি জানি না আমি কী চাই। এটা স্বীকার করতে লজ্জা লাগে। আঠারো বছর বয়সে একজন মানুষের জানা উচিত সে কী চায়। কিন্তু আমি জানি না।"

"তবে আজকে একটা জিনিস বুঝেছি। সবাই যেদিকে যায়, সেদিকে গেলেই যে ঠিক হবে, এটা সত্যি না। দশজন মানুষ একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে চা ভালো হতেও পারে, নাও পারে। দশজনের কেউ হয়তো জানেই না চা ভালো কিনা।"

"আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজ থেকে জিজ্ঞেস করব, চা ভালো কিনা।"

১৪

ডায়েরি বন্ধ করল। বিছানার নিচে রেখে দিল।

উত্তর পায়নি। "আমি কী চাই?" প্রশ্নটা এখনো শূন্য।

কিন্তু প্রশ্নটা করেছে। এটুকুই যথেষ্ট। আপাতত।

কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো হয় তখন, যখন মানুষ প্রশ্ন না করে উত্তর ঠিক করে ফেলে। পাড়ার উত্তর, পরিবারের উত্তর, সমাজের উত্তর নিজের উত্তর ভেবে নেয়।

জগন্নাথ, ন্যাশনাল, প্রাইভেট, সেই তিনটা অপশন এখনো আছে। কিন্তু এখন একটা নতুন ফিল্টার যোগ হয়েছে: "আমি কী চাই?"

বাইরে রাস্তায় একটা কুকুর ডাকছে। দূরে মসজিদ থেকে এশার আজান। পাশের ঘরে মিম পড়ছে, বই উল্টানোর শব্দ।

জাহিদ বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আজকে সে একটা প্রশ্ন করেছে যেটা আঠারো বছরে কেউ করেনি। এটা খুব বড় কিছু না। কিন্তু এটা প্রথম পদক্ষেপ। পালের বাইরে পা রাখার প্রথম পদক্ষেপ।

পাল যেদিকে যাক। জাহিদকে খুঁজে বের করতে হবে সে কোন দিকে যেতে চায়।

আজ না হলে কাল। কিন্তু খুঁজতে হবে। কারণ না খুঁজলে পাল তাকে নিয়ে যাবে। আর পাল জানে না সে কোথায় যাচ্ছে। পাল শুধু জানে সে চলছে।