সিদ্ধান্তের ওজন

তিনটা রাস্তা, একটা পরিবার, আর একটা ছেলে যে পালের সাথে যায়নি

পর্ব ২০ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ডেডলাইন রবিবার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোমবার। প্রাইভেটের বুধবার।

তিনটা ডেডলাইন। তিনটা রাস্তা। তিনটা ভবিষ্যৎ। আর হাতে আছে চারদিন।

জাহিদ ঘরে বসে ফোনের স্ক্রিনে স্প্রেডশিটটা দেখছে। সেই একই তিনটা সারি। চার লাখ, দেড় লাখ, সাত লাখ। সংখ্যাগুলো এতদিনে মুখস্থ হয়ে গেছে।

মা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন, "জাহিদ, আজ রাতে সবাই মিলে বস। কথা বলতে হবে।"

জাহিদ ফোন রেখে দিল। "সবাই মিলে" মানে পরিবার সভা। এই বাড়িতে এটা খুব কম হয়। শেষবার হয়েছিল যখন রাকিব গার্মেন্টসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার আগে হয়েছিল যখন বাবা CNG কিনেছিলেন ব্যাংক থেকে কিস্তিতে।

পরিবার সভা মানে বড় সিদ্ধান্ত। পরিবার সভা মানে সবার মতামত শোনা। পরিবার সভা মানে, একটা পরিবার যাদের কিছু নেই, তারা যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে নামছে।

রাত আটটায় সবাই একসাথে বসল।

বাবা মেঝেতে চাটাইয়ে বসেছেন। সারাদিন CNG চালিয়ে শরীর ভাঙা। গামছা কাঁধে। সামনে চায়ের কাপ।

মা পাশে বসেছেন। কোলে একটা খাতা। হিসাবের খাতা। হলুদ পাতা, কিনারা ভাঁজ হয়ে গেছে। এই খাতায় মা প্রতিদিনের খরচ লেখেন। চাল কত, তেল কত, গ্যাস কত, স্কুলের বেতন কত।

জাহিদ সামনে বসেছে।

মেঝেতে রাকিবের ফোন রাখা, স্পিকার চালু। গাজীপুর থেকে রাকিব। রাতের শিফট শুরু হবে ঘণ্টাখানেক পর।

পাশের ঘরের দরজা একটু ফাঁক। মিম ভেতরে বসে আছে। বই খুলে রেখেছে, কিন্তু পড়ছে না। কান পাতা।

বাবা বললেন, "বল, কী কী অপশন আছে।"

জাহিদ তিনটা অপশন বলল। আগেও বলেছে, সবাই জানে। কিন্তু আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে হবে। কারণ আজ সিদ্ধান্ত হবে।

"এক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। রসায়ন। সরকারি। ঢাকায়। মাসে আট হাজার লাগবে থাকা-খাওয়া মিলিয়ে। চার বছরে সাড়ে চার লাখ।"

বাবা মাথা নাড়লেন। "সরকারি। ভালো।"

"দুই, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পদার্থবিজ্ঞান। স্থানীয় কলেজে। বাড়ি থেকে পড়া যাবে। মাসে তিন হাজারের বেশি লাগবে না। চার বছরে দেড় লাখ।"

বাবা কিছু বললেন না। "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়" শব্দটা শুনে তার মুখের ভাব বদলাল না, কিন্তু চোখে একটা ছায়া পড়ল। বাবা পড়ালেখা করেননি, কিন্তু সমাজে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কদর কত, সেটা CNG স্ট্যান্ডে বসেই শিখে গেছেন।

"তিন, প্রাইভেট। CSE। মাসে পনেরো হাজার। চার বছরে সাত লাখ।"

বাবা চায়ে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন, "সাত লাখ কোথায়?"

প্রশ্নটা ছোট। উত্তর নেই।

ফোন থেকে রাকিবের গলা এলো।

"প্রাইভেটে পড়, আমি ম্যানেজ করবো।"

ঘরে সবাই চুপ হয়ে গেল।

রাকিব বলতে লাগল। "আমি ওভারটাইম করলে মাসে পনেরো পাবো। এখন দশ পাই। পাঁচ হাজার বেশি পাঠাতে পারব। বাবার পনেরো, আমার পনেরো, মায়ের পাঁচ। পঁয়ত্রিশ হাজার। পনেরো হাজার জাহিদের পড়ায়, বাকি বিশ হাজারে সংসার চলবে।"

বাবা বললেন, "ওভারটাইম মানে কয় ঘণ্টা?"

"চৌদ্দ। সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা।"

চুপ।

মা হিসাবের খাতাটা কোলে চেপে ধরলেন। কিছু বললেন না।

জাহিদ রাকিবের কথা শুনছে। চৌদ্দ ঘণ্টা। সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা। সপ্তাহে ছয়দিন। গার্মেন্টসের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে, মেশিনের সামনে, শব্দের মধ্যে, গরমের মধ্যে। চৌদ্দ ঘণ্টা। যাতে জাহিদ এসি ঘরে বসে প্রোগ্রামিং পড়তে পারে।

রাকিবের শরীর, জাহিদের মস্তিষ্ক। আবার সেই বিনিময়।

বাবা বললেন, "তুই চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করবি? শরীর থাকবে?"

"থাকবে। আমি তো করেছিও আগে। রমজানের সময় ওভারটাইম করি।"

"রমজানে এক মাস। এটা চার বছর।"

রাকিব একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "চার বছর না। জাহিদ পড়তে পড়তে টিউশনি ধরবে, ফ্রিল্যান্সিং শিখবে। দুই বছর পর নিজে কামাই শুরু করবে। তখন আমার ওভারটাইম কমবে।"

"যদি না পারে?"

"পারবে। জাহিদ পারবে।"

একটা বিশ্বাস। কোনো ডেটা নেই, কোনো প্রমাণ নেই। শুধু একটা বড় ভাইয়ের বিশ্বাস যে তার ছোট ভাই পারবে।

জাহিদ মেঝেতে বসে হাতের আঙুল দিয়ে চাটাইয়ের বুনোটের ওপর আঁকাআঁকি করছে। চোখ নিচু। গলায় কিছু আটকে আছে।

মা এতক্ষণ চুপ ছিলেন।

এবার হিসাবের খাতাটা খুললেন। টেবিলের মাঝখানে রাখলেন। পাতা উল্টালেন।

কিছু বললেন না। শুধু খাতাটা রেখে দিলেন।

জাহিদ তাকাল।

মার্চের পাতা। প্রতিটা দিনের খরচ লেখা। পেন্সিলে। কিছু জায়গায় কাটাকাটি, হিসাব মেলেনি বলে।

চাল: ৪৫ টাকা কেজি। ২ কেজি। ৯০ টাকা। তেল: ১৮০ টাকা লিটার। আধা লিটার। ৯০ টাকা। সবজি: ৫০ টাকা। ডিম: ১২ টাকা করে ৪টা। ৪৮ টাকা। গ্যাস: মাসে ১,০০০। বিদ্যুৎ: মাসে ৮০০। মিমের স্কুল: মাসে ৫০০। জাহিদের ফোনের রিচার্জ: মাসে ২০০।

মাসের শেষে একটা লাইন টানা। তার নিচে লেখা: "মোট আয় ২৫,০০০। মোট খরচ ২৩,৮০০। বাকি ১,২০০।"

বারোশো টাকা। পুরো মাসে বারোশো টাকা বাঁচে। সেটাও যদি কেউ অসুস্থ না হয়। যদি CNG-র কোনো যন্ত্রাংশ না ভাঙে। যদি কোনো অপ্রত্যাশিত খরচ না আসে।

মা খাতাটা রেখে দিলেন। বললেন কিছু না। সংখ্যাগুলো নিজেই কথা বলছে।

বাবা খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর জাহিদের দিকে তাকালেন। বললেন, "তুই যেটা বলবি সেটাই হবে। কিন্তু হিসাব মিলাতে হবে।"

এই একটা বাক্যে বাবা পুরো জীবনদর্শন বলে দিলেন। স্বাধীনতা আছে, কিন্তু বাস্তবতার ভেতরে। তুই পছন্দ করতে পারবি, কিন্তু পছন্দের ফল বহন করতে হবে। আমি তোকে জোর করব না, কিন্তু অংকটা তোকেই মেলাতে হবে।

বাবা শিক্ষিত না। কিন্তু বাবা বোকা না।

CNG-র মিটারে সারাদিন সংখ্যা ওঠে। ভাড়া কত, গ্যাসের খরচ কত, দিনশেষে লাভ কত। বাবা এই অংকটা প্রতিদিন করেন। প্রতিটা যাত্রীতে। প্রতিটা ট্রিপে।

হিসাব মিলাতে হবে। এটাই বাবার একমাত্র শর্ত।

জাহিদ বসে আছে। মাথা নিচু।

তিনটা অপশন মাথায় ঘুরছে।

জগন্নাথ। মামা বলেছেন যেতে। পাড়ার জামিল ভাই বলেছেন যেতে। চায়ের দোকানের আনোয়ার চাচা বলেছেন যেতে। সবাই বলছে জগন্নাথ। সরকারি। ব্র্যান্ড। ঢাকা। BCS।

কিন্তু বিষয়? রসায়ন। জাহিদ রসায়নে ক্যারিয়ার করতে চায় না। রসায়নে চাকরির বাজার সংকীর্ণ। আর মাসে আট হাজার টাকা। বাবার আয়ের অর্ধেকের বেশি। চার বছর ধরে।

প্রাইভেট। রাকিব বলছে যেতে। CSE। সবচেয়ে ভালো ক্যারিয়ার। কিন্তু দাম? রাকিবের চৌদ্দ ঘণ্টা। চার বছর ধরে।

ন্যাশনাল। কেউ বলছে না যেতে। কেউ এই অপশনের পক্ষে একটা শব্দও বলেনি। কারণ "ন্যাশনাল" বললেই মানুষের মনে যে ছবিটা আসে, সেটা দ্বিতীয় শ্রেণির ছবি। হেরে যাওয়া মানুষের শেষ আশ্রয়।

কিন্তু সংখ্যাগুলো?

মাসে তিন হাজার। চার বছরে দেড় লাখ। পদার্থবিজ্ঞান, যেটা জাহিদের পছন্দের বিষয়। বাড়ি থেকে পড়া যায়। বাকি সময়ে নিজে প্রোগ্রামিং শেখা যায়। পরিবারের ওপর কোনো বাড়তি চাপ নেই।

ROI: পনেরো গুণ। সবচেয়ে বেশি।

ঘরে নীরবতা। বাইরে ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। দূরে মসজিদ থেকে এশার আজান শেষ হয়েছে একটু আগে।

ফোন থেকে রাকিবের নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে। সে অপেক্ষা করছে।

মা বসে আছেন। হিসাবের খাতা বন্ধ করে কোলে রেখেছেন।

বাবা চায়ের কাপ শেষ করেছেন। খালি কাপটা মেঝেতে রাখা।

জাহিদ মাথা তুলল।

"NU Physics।"

দুটো শব্দ। ইংরেজিতে বলল, কারণ এটাই সবাই বলে। NU। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। সবচেয়ে বেশি ছাত্রসংখ্যা, সবচেয়ে কম সম্মান। চৌত্রিশ লাখ ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়, যেটার নাম শুনলে চাকরিদাতারা নাক সিটকায়।

সেই বিশ্ববিদ্যালয়। সেই পদার্থবিজ্ঞান।

জাহিদ বলল এটা।

১০

নীরবতা।

কেউ কিছু বলছে না। ফোন থেকেও কোনো শব্দ নেই। মা তাকিয়ে আছেন জাহিদের দিকে। বাবা খালি কাপটার দিকে তাকিয়ে আছেন।

কেউ এটা আশা করেনি।

জগন্নাথে চান্স পেয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ন্যাশনালে যাওয়া? এটা তো উল্টো পথে হাঁটা। এটা তো পাহাড় থেকে নেমে সমতলে আসা। কে এটা করে?

জাহিদ বলতে লাগল। শান্ত গলায়। যেন অনেকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে।

"NU-তে পড়বো। বাড়িতে থাকবো। কোডিং শিখবো নিজে নিজে।"

থামল একটু।

"বড় ভাইকে আর কষ্ট দেবো না।"

শেষ বাক্যটা বলার সময় জাহিদের গলা কাঁপল। সামান্য। যে না দেখে সে বুঝবে না। কিন্তু মা দেখলেন।

১১

ফোন থেকে রাকিবের গলা এলো। একটু ভাঙা।

"তুই নিশ্চিত?"

"নিশ্চিত।"

"ন্যাশনালে পড়বি? জগন্নাথ ছেড়ে?"

"হ্যাঁ।"

"কেন?"

জাহিদ বলল, "কারণ জগন্নাথে রসায়ন পড়ে আমার কিছু হবে না। বিষয়টা ভুল। চার বছর ধরে যেটা পছন্দ না সেটা পড়ব, আবার ঢাকায় থাকার জন্য মাসে আট হাজার টাকা লাগবে, সেটার মানে কী?"

"আর প্রাইভেট?"

"প্রাইভেটে CSE পড়তে গেলে তোকে চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করতে হবে চার বছর ধরে। তোর বয়স বাইশ, ভাইয়া। তুই কি সারাজীবন গার্মেন্টসের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকবি আমার জন্য?"

রাকিব কিছু বলল না।

"NU-তে পড়লে মাসে তিন হাজার। বাবার একার আয়েই চলবে। তোর টাকা তোর কাছে থাকবে। তুই নিজের জন্য কিছু করতে পারবি। একটা কোর্স করতে পারবি। জমাতে পারবি।"

রাকিব বলল, "কিন্তু NU-এর সার্টিফিকেট দিয়ে..."

"সার্টিফিকেট দিয়ে প্রথম চাকরি হয়। তারপর দক্ষতা দিয়ে চলে। আমি দক্ষতা বানাবো। নিজে।"

১২

মা কাঁদছেন।

চুপচাপ। শব্দ করে না। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে গালে। হাতের আঁচলে মুছছেন।

জাহিদ দেখল। বলল, "মা, কাঁদছ কেন?"

মা মাথা নাড়লেন। বললেন, "কাঁদছি না।"

কিন্তু কাঁদছেন।

কেন কাঁদছেন মা? কারণ ছেলে NU-তে যাচ্ছে বলে? না। কারণ ছেলে নিজের জন্য সবচেয়ে ভালো অপশন ছেড়ে দিচ্ছে পরিবারের জন্য? নাকি কারণ ছেলেটা এত অল্প বয়সে এত বড় হিসাব করতে শিখে গেছে, যে হিসাব একটা আঠারো বছরের ছেলের করার কথা না?

হয়তো তিনটাই। হয়তো আরো কিছু যেটা মা নিজেও জানেন না।

মায়েদের কান্না সবসময় একটা কারণে হয় না। মায়েদের কান্না একটা নদীর মতো, অনেক উৎস থেকে পানি এসে একসাথে মিশে যায়, কোনটা কোথা থেকে এসেছে আর আলাদা করা যায় না।

১৩

বাবা বললেন, "তুই ন্যাশনালে পড়বি। পাড়ায় মানুষ কথা বলবে। মামা জিজ্ঞেস করবেন। তুই সামলাতে পারবি?"

"পারব।"

"জগন্নাথে চান্স পেয়ে ন্যাশনালে গেছে, এটা শুনে মানুষ বলবে ছেলেটা পাগল।"

"বলুক।"

বাবা জাহিদের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ। CNG-র স্টিয়ারিং ধরতে ধরতে যে হাত শক্ত হয়ে গেছে, সেই হাত দিয়ে গামছাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ভাঁজ করলেন।

তারপর বললেন, "ঠিক আছে।"

দুটো শব্দ। বাবার অনুমোদন। বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে না, ব্যাখ্যা করে না। শুধু "ঠিক আছে।" বাবা বুঝেছেন যে ছেলে হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাবার কাছে এটাই যথেষ্ট। কারণ বাবা নিজেও জীবনটা হিসাব করেই চালান।

১৪

ফোন থেকে রাকিবের গলা আবার এলো।

"জাহিদ।"

"বলো।"

"তুই যদি মনে করিস এটাই ঠিক, তাহলে এটাই ঠিক। কিন্তু একটা কথা। তুই যদি কোনোদিন মনে করিস টাকা দরকার, যেকোনো কারণে, তাহলে আমাকে বলবি। লুকাবি না।"

"বলব।"

"আর একটা কথা। NU-তে পড়িস আর যেখানেই পড়িস, পড়াশোনাটা ঠিকমতো করবি। আমি পড়তে পারিনি। তুই পড়ছিস। এটা নষ্ট করবি না।"

"করব না।"

রাকিব বলল, "গুড।" তারপর বলল, "আমার শিফট শুরু হবে। রাখি।"

"রাখ, ভাইয়া।"

ফোন কেটে গেল। স্পিকার থেকে আর কোনো শব্দ নেই। ঘরে আবার নীরবতা।

পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ এলো। মিম নাক ঝাড়ছে। সেও শুনেছে সব। সেও কাঁদছে। চুপচাপ। কারণ এই পরিবারে কেউ জোরে কাঁদে না। এই পরিবারে কান্না আসে নিঃশব্দে, চলে যায় নিঃশব্দে।

১৫

বাবা উঠে গেলেন। মা রান্নাঘরে গেলেন।

জাহিদ একা বসে আছে। ফোনটা হাতে তুলল।

স্প্রেডশিট খুলল। ন্যাশনালের সারিতে একটা সবুজ মার্ক দিল। বাকি দুটো সারি মুছে দিল না। শুধু ধূসর করে দিল।

তারপর ফোন বন্ধ করল।

সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

জাহিদ জানে, এই সিদ্ধান্ত শুনে পাড়ার মানুষ কী বলবে। মামা কী বলবেন। CNG স্ট্যান্ডে বাবাকে কী শুনতে হবে। "জগন্নাথে চান্স পেয়ে ন্যাশনালে গেছে? ছেলেটার মাথা খারাপ নাকি?"

কিন্তু পাড়ার মানুষ মায়ের হিসাবের খাতা দেখেনি। মামা রাকিবের চৌদ্দ ঘণ্টার শিফটের কথা জানেন না। CNG স্ট্যান্ডের লোকেরা জানে না যে বারোশো টাকা, মাসে বারোশো টাকা বাঁচে এই পরিবারে।

ওরা দেখে নাম। জাহিদ দেখেছে সংখ্যা।

১৬

পরের দিন শুক্রবার।

জাহিদ সকালে উঠে চা খেল। মা রুটি ভেজে দিলেন। কাল রাতের কথা কেউ তুলল না। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এই পরিবারে সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে আবার আলোচনা হয় না। কারণ ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই। শুধু সামনে এগোনোর রাস্তা আছে।

বিকালে বাবা CNG থেকে ফিরলেন। জাহিদকে বললেন, "চল।"

"কোথায়?"

"কলেজে। ভর্তির খোঁজ নিতে হবে।"

দুজনে গেলেন। বাবা CNG-তে, জাহিদ পাশে।

কলেজটা শহরের পুরোনো অংশে। লাল ইটের দেয়াল, কিছু জায়গায় প্লাস্টার খসে গেছে। সামনে একটা পুকুর, পানি সবুজ। গেটে একটা ব্যানার: "অনার্স ভর্তি চলছে, সেশন ২০২৬-২৭।"

জাহিদ ব্যানারটা পড়ল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাচের দেয়াল নেই এখানে। এসি ক্লাসরুম নেই। ক্যাফেটেরিয়া নেই। যেটা আছে সেটা হলো একটা ছাদ, কিছু বেঞ্চ, কিছু শিক্ষক, আর একটা সুযোগ।

সুযোগটাই যথেষ্ট।

১৭

ভর্তি অফিসে একজন ক্লার্ক বসে আছেন।

বাবা বললেন, "আমার ছেলে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হবে।"

ক্লার্ক ফর্ম দিলেন। জাহিদ পূরণ করল।

নাম: জাহিদ হাসান। বাবার নাম: আজিজুর রহমান। HSC GPA: 4.17। বিষয়: পদার্থবিজ্ঞান। সেশন: ২০২৬-২৭।

রেজিস্ট্রেশন ফি: চার হাজার পাঁচশো টাকা।

ক্লার্ক বললেন, "ক্যাশ না মোবাইল ব্যাংকিং?"

বাবা পকেট থেকে টাকা বের করলেন।

ক্যাশ।

ছোট ছোট নোট। একশো টাকার, পঞ্চাশ টাকার, কিছু বিশ টাকার। ভাঁজ করা, কিছু কুঁচকানো। বাবা একটা একটা করে গুনলেন। চার হাজার পাঁচশো।

জাহিদ দেখছে। প্রতিটা নোট দেখছে।

এই একশো টাকার নোটটা কোন যাত্রীর ভাড়া? মিরপুর থেকে ফার্মগেট? নাকি উত্তরা থেকে মতিঝিল? এই পঞ্চাশ টাকার নোটটা সকালের প্রথম ট্রিপের? নাকি দুপুরের রোদে, ট্রাফিকে আটকে থেকে, ঘামতে ঘামতে পাওয়া? এই বিশ টাকার নোটটা? কোন যাত্রী দিয়েছিলেন? কতটা পথ চালিয়ে?

চার হাজার পাঁচশো টাকা।

বাবার কতদিনের আয় এটা? সাদামাটা হিসাবে, তিনদিন। তিনদিনের CNG চালানো, তিনদিনের রোদ-বৃষ্টি-ট্রাফিক, তিনদিনের ক্লান্তি।

ক্লার্ক টাকা গুনলেন। রসিদ দিলেন।

বাবা রসিদটা ভাঁজ করে শার্টের পকেটে রাখলেন। সেই পকেটে আর কিছু নেই। রসিদটা একা।

১৮

কলেজ থেকে বের হয়ে বাবা বললেন, "চা খাবি?"

সামনেই একটা দোকান। দুজনে বসলেন।

বাবা দুই কাপ চা অর্ডার করলেন। দশ টাকা কাপ।

চা আসল। বাবা চুমুক দিলেন। জাহিদ কাপটা হাতে ধরে বসে আছে।

বাবা বললেন, "আমি পড়তে পারিনি। তুই পড়ছিস। এটাই আমার কাছে যথেষ্ট। কোথায় পড়ছিস সেটা দরকারি না। কী হচ্ছিস সেটা দরকারি।"

জাহিদ চায়ে চুমুক দিল। কিছু বলল না। বলার দরকার নেই। কিছু কথা শুধু শোনার জন্য।

বাবা আরেক চুমুক দিয়ে বললেন, "কালু মিয়ার ছেলে 4.50 পেয়ে ঢাকায় যাচ্ছে। আমার ছেলে 4.17 পেয়ে এখানে থাকছে। কালু মিয়া জিজ্ঞেস করবে কেন। আমি বলব, আমার ছেলে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"

একটু থামলেন। তারপর বললেন, "এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। ছেলে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।"

চা শেষ হলো। বাবা বিশ টাকা রেখে উঠলেন।

১৯

রাতে জাহিদ বিছানায় শুয়ে ভাবল।

সে পালের সাথে যায়নি।

পুরো পাড়া বলেছিল জগন্নাথ। মামা বলেছিলেন জগন্নাথ। চায়ের দোকানের আনোয়ার চাচা বলেছিলেন জগন্নাথ। কোচিং সেন্টারের রহিম স্যার জানলে বলতেন জগন্নাথ। সমাজ, সংস্কৃতি, প্রচলিত ধারণা, সব বলছিল জগন্নাথ।

জাহিদ বলেছে NU।

কারণ জাহিদ নাম দেখেনি, সংখ্যা দেখেছে। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেখেনি, পরিবারের সামর্থ্য দেখেছে। পালের গতি দেখেনি, নিজের রাস্তা খুঁজেছে।

এটা সাহস না। এটা গণিত। এটা সেই স্প্রেডশিটের ফল যেটা জাহিদ রাত এগারোটায় ফোনের ভাঙা স্ক্রিনে বানিয়েছিল। পনেরো গুণ ROI।

কিন্তু গণিতটা সবাই করতে পারে। সবাই স্প্রেডশিট বানাতে পারে। সংখ্যা দেখতে পারে। পারে না সংখ্যা অনুযায়ী চলতে, যখন পুরো দুনিয়া বলছে অন্য দিকে যেতে।

সেটাই কঠিন। সংখ্যার কথা শোনা, যখন মানুষের কথা উল্টো বলছে।

জাহিদ শুনেছে সংখ্যার কথা।

২০

পালের সাথে যেতে হয় না। কখনো কখনো নিজের পথ কাটতে হয়।

জাহিদ পথ কেটেছে। ছোট পথ। সরু পথ। পাশে ঝোপঝাড়, কাঁটা, আর "ন্যাশনাল" লেখা একটা সাইনবোর্ড যেটার দিকে কেউ তাকায় না।

কিন্তু পথ তো আছে। পথ থাকলেই হাঁটা যায়।

বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। দূরে CNG-র আওয়াজ নেই। বাবার CNG গ্যারেজে। কাল সকালে আবার বের হবে। মিটার শূন্য থেকে শুরু হবে।

জাহিদেরও মিটার শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে। NU Physics, Session 2026-27। রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধিত। চার হাজার পাঁচশো টাকা। ছোট ছোট নোটে। প্রতিটা নোটে একটা দিনের ঘাম।

নতুন অধ্যায় শুরু হবে। নতুন ক্লাস, নতুন বই, নতুন শিক্ষক। আর সন্ধ্যায়, পড়া শেষে, জাহিদ ফোনে YouTube খুলবে। CS50। Lecture 1। "This is CS50."

সেই ফোনে। সেই ভাঙা স্ক্রিনে। সেই দুই ঘণ্টার ব্যাটারিতে।

কিন্তু শুরু করতে তো এটুকুই যথেষ্ট।