BUET-এর স্বপ্ন ভাঙে

চার নম্বরের দূরত্ব

পর্ব ২১ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাতে ফোন বাজলো।

জাহিদ তখন ল্যাপটপে বসে ছিল। ইউটিউবে একটা পাইথন টিউটোরিয়াল চালু আছে, ভিডিওর লোক বলছে "ভ্যারিয়েবল হলো একটা বাক্সের মতো।" জাহিদ ভাবছিল বাক্সের উপমাটা ঠিক খাটে না, কারণ বাক্সে একটা জিনিস রাখলে আগেরটা থাকে, কিন্তু ভ্যারিয়েবলে নতুন ভ্যালু দিলে আগেরটা চলে যায়। তখনই স্ক্রিনে রাসেলের নাম।

রাত সাড়ে এগারোটা। রাসেল এত রাতে ফোন করে না।

"রাসেল?"

ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর একটা শব্দ, যেটা শব্দ না, নিশ্বাস। ভারী, ধীর, যেন কেউ বুকের ভেতর থেকে কিছু তুলে আনতে চাইছে কিন্তু পারছে না।

"জাহিদ।"

এটুকুই। তারপর আবার চুপ।

জাহিদ বুঝলো। রেজাল্ট বেরিয়েছে।

রাসেল আর জাহিদ একই স্কুলে পড়তো। ক্লাস সিক্স থেকে। রাসেল সবসময় ফার্স্ট হতো, জাহিদ থাকতো পাঁচ-ছয়ের দিকে। এসএসসিতে রাসেল জিপিএ ৫.০০, জাহিদ ৪.১৭। এইচএসসিতেও রাসেল ৫.০০, জাহিদ ৪.৫০।

রাসেলের বাবা স্কুল শিক্ষক। গণিতের। বেতন আঠারো হাজার টাকা। কিন্তু ছেলের পড়াশোনায় যে সময় দিতেন, সেটা টাকা দিয়ে মাপা যায় না। রাসেল ক্লাস এইটে থাকতে বাবা নাইনের গণিত শেখাতেন। নাইনে থাকতে দশের। সবসময় এক বছর এগিয়ে।

রাসেলের মা গৃহিণী। পরীক্ষার আগে রাত দুইটায় দুধ গরম করতেন। ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিতেন, জাগাতেন না। পরদিন রাসেল বলতো, "আম্মু, জাগালা না কেন?" মা বলতেন, "ঘুমও দরকার।"

এই পরিবারের একটাই স্বপ্ন ছিল। একটাই শব্দ। চার অক্ষরের।

বুয়েট।

শব্দটা রাসেলের বাড়িতে প্রায় ধর্মীয় মর্যাদা পেয়েছিল। রাসেলের বাবা নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চেয়েছিলেন, পারেননি। আর্থিক অবস্থা ছিল না। স্বপ্নটা মরেনি। শুধু এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গেছে।

রাসেলের ফেসবুক বায়োতে লেখা ছিল: "BUET '26 (ইনশাআল্লাহ)।"

রাসেল কোচিং করতো। মতিঝিলে, মাসিক ফি আট হাজার টাকা। বাবার বেতনের প্রায় অর্ধেক। বাকি দশ হাজারে সংসার। রাসেলের মা কিছু টিউশনি করতেন, সেই টাকায় বাজার হতো।

একদিন রাসেল নিজেই বলেছিল, "আমার যদি বুয়েট না হয়, আব্বুর মুখের দিকে তাকাতে পারবো না।"

বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা চারশো নম্বরের। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন। নেগেটিভ মার্কিং আছে। প্রতি বছর দশ-বারো হাজার পরীক্ষার্থী, আসন এক হাজারের কাছাকাছি। প্রত্যেকেই জিপিএ ৫.০০। প্রত্যেকেই কোচিং করেছে। প্রত্যেকেই "ক্লাসের সেরা ছাত্র।"

জিপিএ ৫.০০ এখানে প্রবেশমূল্য, টিকিট না।

রাসেল পেলো ১৬৮। কাটঅফ ছিল ১৭২।

চার নম্বর।

চার নম্বর কতটুকু? একটা এমসিকিউ। হয়তো দুইটা। একটা প্রশ্নে যদি অন্য অপশনে টিক দিতো। যদি আগের রাতে ঘুম একটু ভালো হতো। চার নম্বর। পুরো জীবনের হিসাব বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাসেল শুধু বললো, "একশো আটষট্টি।"

"কাটঅফ কত?"

"একশো বাহাত্তর।"

জাহিদ কিছু বলতে পারলো না। "কাছাকাছি ছিলি" বললে অপমান হবে। "কোনো ব্যাপার না" বললে কষ্টকে ছোট করা হবে। তাই চুপ করে রইলো। দুজনে চুপ করে ফোনে থাকলো। নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছু নেই।

তারপর রাসেল বলতে শুরু করলো। থেমে থেমে, যেন প্রতিটা বাক্য একটা ভারী পাথর।

"ক্লাস সিক্স থেকে পড়ছি। ছয় বছর। প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা। ছুটির দিনে আট ঘণ্টা। বন্ধুরা ক্রিকেট খেলতো, আমি অঙ্ক করতাম। ঈদের দিনেও বই খুলতাম। জিপিএ ৫.০০ পেলাম। কোচিং করলাম। মডেল টেস্টে ভালো করলাম। সব করলাম, জাহিদ। সব।"

একটু থামলো।

"তাও হলো না।"

জাহিদের মনে পড়লো নিজের কথা। ৪.১৭ পাওয়ার পর মনে হয়েছিল পৃথিবী শেষ। কিন্তু রাসেলের কষ্ট আলাদা। জাহিদের ৪.১৭ ছিল প্রত্যাশার চেয়ে কম। রাসেলের ৫.০০ ছিল প্রত্যাশার সমান। অথচ ফলাফল একই রকম তিক্ত।

৪.১৭ পেয়ে জাহিদ ভেবেছিল সে যথেষ্ট ভালো না। ৫.০০ পেয়ে রাসেল ভাবছে যথেষ্ট ভালো হয়েও কাজ হয়নি। কোনটা বেশি কষ্টের?

"আব্বু কী বললেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করলো।

রাসেল একটু চুপ থাকলো। "কিছু বলেননি।"

"মানে?"

"মানে সত্যি কিছু বলেননি। রেজাল্ট দেখে আব্বু ফোন রেখে দিলেন টেবিলে। উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। দশ মিনিট। আম্মু গেলেন পেছনে। আমি দরজা থেকে দেখলাম, আব্বু রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। আম্মু পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বলছেন না।"

জাহিদের গলা শুকিয়ে গেল।

"তারপর আব্বু ঘরে ঢুকলেন। বললেন, 'রুয়েট পেয়েছিস তো? ভালো। রুয়েট ভালো।' তারপর নিজের ঘরে চলে গেলেন।"

রাসেলের গলা কাঁপলো।

"আব্বু যদি রাগ করতেন, চিৎকার করতেন, বকতেন, সহ্য করতে পারতাম। কিন্তু 'রুয়েট ভালো' বলে চলে গেলেন। ওই 'ভালো' শব্দটার মধ্যে যে কতটা ব্যথা ছিল, তুই বুঝবি না।"

জাহিদ বুঝতো। তার নিজের বাবাও একই রকম। রেজাল্টের দিন কিছু বলেননি। পরদিন সিএনজি চালাতে বেরিয়ে গেছিলেন। যেন কিছু হয়নি।

বাংলাদেশের বাবারা কাঁদেন না। তারা চুপ করেন।

"আম্মু কী বললেন?"

"আম্মু বললেন, 'আল্লাহ যেটা ভালো সেটাই করবেন। রুয়েটও তো সরকারি। ইঞ্জিনিয়ারিং তো হচ্ছেই।'"

রাসেল একটু থামলো। "আম্মুর কথা ঠিক। রুয়েট সরকারি। ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে। কিন্তু..."

"কিন্তু?"

"কিন্তু রুয়েট তো বুয়েট না, জাহিদ।"

এই একটা বাক্য। এর মধ্যে পুরো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা সত্য লুকিয়ে আছে। রুয়েট ভালো বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি, ভর্তুকিযুক্ত, স্বীকৃত। কিন্তু বাংলাদেশে "ভালো" আর "সেরা" এক কথা না। আর "সেরা না" মানে অনেকের কাছে "ব্যর্থ।"

"রুয়েটে কোন সাবজেক্ট?"

"ইলেকট্রিক্যাল।"

"ইইই? সেটা তো ভালো।"

"ভালো।" রাসেলের গলায় সেই একই শব্দ। তার বাবার মতো। "ভালো" বলছে, কিন্তু শব্দটার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।

জাহিদ বুঝলো, রাসেলের সমস্যা রুয়েট না। রাসেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়নি। সে বুয়েটিয়ান হতে চেয়েছিল। দুটো আলাদা জিনিস।

ইঞ্জিনিয়ারিং একটা বিষয়। সার্কিট শেখা, কোড লেখা, সমস্যার সমাধান করা। এটা রুয়েটেও শেখানো হয়, বুয়েটেও, চুয়েটেও, কুয়েটেও। একই সিলেবাস, একই বই। পার্থক্য আছে অবকাঠামোতে, শিক্ষকের মানে, গবেষণার সুযোগে। কিন্তু মূল পড়াশোনা একই।

তাহলে রাসেলের এত কষ্ট কেন?

কারণ রাসেল ইঞ্জিনিয়ারিং "করতে" চায়নি। সে ইঞ্জিনিয়ার "হতে" চেয়েছিল। বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার। সেই পরিচয়, সেই তকমা, সেই নামের ওজন। রুয়েটে ভর্তি হয়ে "বুয়েটিয়ান" হওয়ার কোনো উপায় নেই। যত ভালো ইঞ্জিনিয়ারই হোক।

বাংলাদেশে মানুষ পেশা বেছে নেয় না, পরিচয় বেছে নেয়। ডাক্তার হতে চায় না, "ডাক্তার সাহেব" হতে চায়। ইঞ্জিনিয়ারিং শিখতে চায় না, "বুয়েটিয়ান" হতে চায়। দক্ষতা না, তকমা। কাজ না, পরিচয়।

এটাই আইডেন্টিটি বায়াস। পরিচয়ের পক্ষপাত।

১০

"তুই জানিস, আমাদের ক্লাসে কে কে বুয়েট পেয়েছে?"

"কে?"

"সোহেল। আর নাহিদ।"

"সোহেল কত পেলো?"

"একশো আটাত্তর।"

"আর নাহিদ?"

"একশো তিয়াত্তর। এক নম্বর বেশি কাটঅফের চেয়ে।"

রাসেলের গলায় তিক্ততা ছিল না। ছিল শূন্যতা।

"নাহিদ একশো তিয়াত্তর পেয়ে বুয়েটে যাবে। আমি একশো আটষট্টি পেয়ে রুয়েটে। পাঁচ নম্বরের তফাৎ। কিন্তু দুনিয়ার চোখে নাহিদ 'বুয়েটিয়ান' আর আমি 'বুয়েটে পারিনি।' পাঁচ নম্বর দিয়ে পুরো পরিচয় আলাদা হয়ে গেল।"

১১

"রাসেল।"

"হুম।"

"তোকে একটা কথা বলি। তুই রুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল পড়বি। চার বছর পর তোর হাতে একটা ডিগ্রি থাকবে, কিছু দক্ষতা থাকবে, কিছু প্রজেক্ট থাকবে। নাহিদ বুয়েটে পড়বে। চার বছর পর তার হাতেও একই জিনিস থাকবে। তফাৎটা হবে তোরা চার বছরে কী করলা সেটায়। বুয়েটের নাম দিয়ে নাহিদ যদি চার বছর ঘুমায়, আর রুয়েটে বসে তুই যদি সত্যি সত্যি ইঞ্জিনিয়ারিং শিখিস, তাহলে চার বছর পর তুই এগিয়ে থাকবি।"

রাসেল কিছু বললো না।

জাহিদ জানে এই কথা এখন রাসেলের কানে ঢুকবে না। যখন ক্ষত তাজা, তখন যুক্তি কাজ করে না। জাহিদ নিজেই এই পথ পেরিয়ে এসেছে। ৪.১৭ পাওয়ার পর কেউ যদি বলতো "জিপিএ দিয়ে কিছু হয় না," সে রেগে যেতো। ছয় মাস পর নিজেই বুঝেছে কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা না।

"তুই একটু ঘুমা। কাল কথা হবে।"

"জাহিদ।"

"হুম?"

"থ্যাংকস। ফোন ধরার জন্য।"

১২

ফোন রেখে জাহিদ কিছুক্ষণ বসে রইলো।

সে ভাবলো সুমাইয়ার কথা, যে সিলেট মেডিকেলে পড়ছে, কিন্তু ঢাকা মেডিকেল না। ফারুকের কথা, যে পলিটেকনিকে পড়ছে, কিন্তু ঢাকা পলিটেকনিক না। রাসেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, কিন্তু বুয়েটে না। জাহিদ পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না।

সবার বাক্যে একটা "কিন্তু" আছে। সেই "কিন্তু"র পরের অংশটাই সবার কষ্টের জায়গা।

১৩

পরদিন সকালে জাহিদ মায়ের পাশে বসলো।

"আম্মু, রাসেলের বুয়েট হয়নি। চার নম্বরের জন্য।"

মা সেলাই থামালেন। চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। "রুয়েট পেয়েছে?"

"হ্যাঁ।"

"রুয়েটও তো ভালো।"

জাহিদ হাসলো। রাসেলের মা-ও একই কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সব মা বোধহয় একই স্ক্রিপ্ট থেকে কথা বলেন।

মা আবার সেলাই শুরু করলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "মানুষ যেটা পায় না, সেটা নিয়েই কাঁদে। যেটা পায়, সেটার দাম বোঝে না।"

সোজা কথা। কিন্তু সত্যি।

১৪

সন্ধ্যায় জাহিদ ল্যাপটপ খুললো। পাইথন না, এবার অন্য কিছু সার্চ করলো।

"RUET alumni success stories."

রুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়াররা গুগলে কাজ করছে। মাইক্রোসফটে। দেশে বড় বড় প্রজেক্ট সামলাচ্ছে। কেউ স্টার্টআপ খুলেছে। কেউ পিএইচডি করছে আমেরিকায়।

তারপর সার্চ করলো: "BUET graduates who struggled." সেটাও পেলো। শুধু নামের ওপর ভর দিয়ে চার বছর পার করেছে, দক্ষতা তৈরি করেনি।

প্রতিষ্ঠানের নাম সুবিধা দেয়, গ্যারান্টি দেয় না। নাম ছোট হলে পথ বন্ধ হয় না, শুধু একটু লম্বা হয়।

জাহিদ ভাবলো এই কথাগুলো রাসেলকে বলবে। কিন্তু আজ না। আজ রাসেলের শুধু সময় দরকার।

১৫

রাতে ঘুমানোর আগে জাহিদ আরেকবার রাসেলের ফেসবুক প্রোফাইল খুললো।

বায়ো বদলে গেছে।

আগে ছিল: "BUET '26 (ইনশাআল্লাহ)।"

এখন শুধু নাম। রাসেল আহমেদ। কোনো ইউনিভার্সিটি নেই। কোনো ইনশাআল্লাহ নেই। কোনো স্বপ্ন নেই। ফাঁকা।

প্রোফাইল পিকচারও বদলে গেছে। আগে ছিল বুয়েটের গেটের সামনে তোলা ছবি, হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনে লাল ইটের দেয়াল। এখন একটা ডিফল্ট ছবি, নীল রঙের সিলুয়েট।

একটা ছেলে ছয় বছর ধরে যে পরিচয় তৈরি করেছিল, সেটা একটা রাতে মুছে গেল।

জাহিদ ফোন রেখে দিলো। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

যেদিন মানুষ নিজেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে না, নিজের নাম দিয়ে চেনাতে শেখে, সেদিন আসল শুরু। কিন্তু সেই শুরুটা এত ব্যথার মধ্য দিয়ে আসে কেন?

বাইরে রিকশার ঘণ্টা বাজছে। দূরে কোথাও মসজিদের আজান। জাহিদ চোখ বন্ধ করলো।

চার নম্বর। পুরো পৃথিবী বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আবার কিছুই বদলাতে না পারার জন্যও যথেষ্ট। নির্ভর করছে তুমি কোন দিক থেকে দেখছো।

রাসেল এখন শুধু একটা দিক দেখতে পাচ্ছে। অন্য দিকটা দেখতে সময় লাগবে।

জাহিদ জানে। কারণ তারও সময় লেগেছিল।