রুয়েটে রাসেল

একই ম্যাক্সওয়েল, একই সমীকরণ, কিন্তু মোড়কটা আলাদা হলে মানুষ আলাদা চোখে দেখে

পর্ব ২২ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

তিন মাস পর জাহিদ রাজশাহী গেল। রাসেলকে দেখতে।

ময়মনসিংহ থেকে রাজশাহী সরাসরি বাস নেই। ঢাকা হয়ে যেতে হয়। আট ঘণ্টার পথ বারো-তেরো ঘণ্টা হয়ে যায়। জাহিদ রাতের বাসে উঠল ময়মনসিংহ থেকে, ভোর পাঁচটায় গাবতলী, সাড়ে পাঁচটায় রাজশাহীর বাস। দুপুর একটায় রাজশাহী।

বাস ভাড়া দুই পথে মিলিয়ে চৌদ্দশো টাকা। জাহিদ দুই সপ্তাহ ধরে জমিয়েছে এই টাকা। কলেজের ক্যান্টিনে দুপুরে না খেয়ে। নাস্তায় শুধু রুটি-ডাল।

রাসেলকে শেষ দেখেছে তিন মাস আগে। তখন রাসেল BUET-এ চান্স না পেয়ে RUET-এ ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্তটা রাসেলের ছিল না। রাসেলের বাবার ছিল। "ইঞ্জিনিয়ারিং-ই পড়বি। BUET না হলে RUET।"

RUET-এর গেটে রাসেল দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রথম দেখায় চিনতে একটু সময় লাগল। তিন মাসে রাসেল রোগা হয়ে গেছে। গালের হাড় বের হয়ে এসেছে। চুল বড়, টি-শার্ট ঢোলা।

"তুই কি খাস না?"

"খাই। হলের খাবার। পেট ভরে, মন ভরে না।"

রাসেল হাসল। হাসিটা আগের মতো না। আগে পুরো মুখ জুড়ে থাকত। এখন ঠোঁটে শুরু হয়ে ঠোঁটেই থামে।

ক্যাম্পাসটা জাহিদের কল্পনার চেয়ে ভালো। জাহিদ ভেবেছিল হয়তো ময়মনসিংহের কোনো সরকারি কলেজের মতো হবে। ভাঙা বিল্ডিং, ময়লা করিডোর। কিন্তু না। রাস্তা পরিষ্কার, গাছ আছে, ছায়া আছে। ল্যাবের জানালা দিয়ে দেখা গেল যন্ত্রপাতি সাজানো। BUET-এর পুরোনো ভবনগুলোর সেই ঐতিহাসিক ভারীক্কি নেই, কিন্তু কাজ চলে।

"ক্যাম্পাস তো মন্দ না," জাহিদ বলল।

রাসেল কাঁধ ঝাঁকাল। "ঠিক আছে।"

"ঠিক আছে" শব্দটা এমনভাবে বলল যেন রেস্তোরাঁর খাবারের রিভিউ দিচ্ছে। খারাপ না, ভালোও বলব না। কারণ রাসেলের মাথায় ক্যাম্পাসের ছবি BUET-এর। সেই পুরোনো লাল ইটের বিল্ডিং, TSC-র আড্ডা। সেই ছবির পাশে RUET "ঠিক আছে।"

কিন্তু জাহিদের চোখে? জাহিদ যেখানে পড়ে, সেখানে ল্যাবে যন্ত্রপাতির অর্ধেক কাজ করে না। জাহিদের চোখে RUET স্বপ্নের মতো।

একই জায়গা। দুই জোড়া চোখ। দুটো আলাদা দেখা।

রাসেলের হলের রুম। তিন তলা। চারজনের রুম। দুটো বাঙ্ক বেড, চারটা টেবিল।

একটা ছেলে টেবিলে বসে পড়ছিল। রাসেল পরিচয় করিয়ে দিল। "এ সুমন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।"

রাসেল বলল, "সুমনের গল্প শুনবি? GPA 4.67। কোচিং সেন্টারের নামও শোনেনি। NCTB-র বই পড়ে RUET-এ চান্স পেয়েছে।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "কোচিং করোনি?"

সুমন বলল, "চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোচিং সেন্টার আছে দুই-তিনটা। কিন্তু আমাদের বাড়ি উপজেলায়। সেখান থেকে শহরে যেতে এক ঘণ্টা বাস। রোজ সম্ভব না। তাই বই পড়েছি। NCTB আর পুরোনো প্রশ্ন।"

জাহিদ ভাবল, এই ছেলে কোনো কোচিং ছাড়া, উপজেলা থেকে, RUET-এ চান্স পেয়েছে। আর ঢাকার কোচিং সেন্টারে লাখ লাখ টাকা খরচ করা অনেকেই পায়নি। প্রতিভা যেখানে-সেখানে থাকে। সুযোগ থাকে না।

দুপুরে ক্যান্টিনে খেতে খেতে রাসেল বলল, "ক্লাস কেমন জানিস? ভালো। মানে সত্যিই ভালো। স্যারেরা জানেন কী পড়াচ্ছেন। ইলেকট্রিক্যাল সার্কিটের একজন স্যার আছেন, PhD করেছেন জাপান থেকে। তাঁর ক্লাস YouTube-এর সেরা লেকচারের চেয়ে ভালো।"

"তাহলে সমস্যা কী?"

রাসেল চামচ রেখে দিল। "সমস্যা এটা না যে RUET খারাপ। সমস্যা হলো RUET BUET না।"

একটু পর বলল, "আমি এখনো BUET-এর পেজ ফলো করি। তাদের ওরিয়েন্টেশনের ভিডিও দেখেছি। রাতে হেডফোন লাগিয়ে দেখি BUET-এর ফ্রেশার্সরা ক্যাম্পাসে ঢুকছে। ওখানে আমার থাকার কথা ছিল। চার নম্বরের জন্য হলো না।"

"সেটা তো তিন মাস আগের কথা।"

"তিন মাস আগের কথা আজকেও মাথায় আছে। কালও থাকবে।"

তারপর বলল, "আমি ভাবছি পরের বছর ক্রেডিট ট্রান্সফার করব। RUET-এ এক বছর পড়ে, তারপর BUET-এ।"

জাহিদ জানত এটা হয় না। বাংলাদেশের পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ক্রেডিট ট্রান্সফারের কোনো সিস্টেম নেই। কিন্তু সরাসরি বলল না। বলল, "কে বলেছে?"

"একটা ফেসবুক গ্রুপে দেখেছি।"

ফেসবুক গ্রুপ। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপে হাজারটা তথ্য ঘোরে, নব্বই শতাংশ ভুল বা অর্ধসত্য। কেউ লেখে, দশজন শেয়ার করে, শ'জন বিশ্বাস করে।

"তুই একবার রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।"

জাহিদ জানত, রাসেল করবে না। গিয়ে "হয় না" শুনলে শেষ আশাটাও যাবে। আর আশা ধরে রাখাটাই এখন রাসেলের বেঁচে থাকার উপায়।

বিকেলে EEE ল্যাবে গেল দুজনে। একজন সিনিয়র ভাই, শাহরিয়ার, চতুর্থ বর্ষ, ল্যাপটপে কোড লিখছিলেন। রাসেল তাঁকে চেনে।

রাসেল জিজ্ঞেস করল, "ভাই, চাকরির মার্কেট কেমন?"

শাহরিয়ার ভাই বললেন, "BUET থেকে যারা বের হয়, তারা বেশিরভাগ সফটওয়্যার কোম্পানিতে যায়। আমরাও যাই। একই জায়গায়। কিন্তু শুরুর বেতনে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পার্থক্য থাকে। দুই বছর পর? দুই বছর পর কেউ জিজ্ঞেস করে না কোথায় পড়েছ। তখন দেখে তুমি কী পারো। দুই বছর পর সেই পার্থক্যও থাকে না।"

তারপর বললেন, "RUET, KUET, CUET থেকে পাশ করলে পাঁচ বছর পর বেতন BUET গ্র্যাজুয়েটদের দশ থেকে পনেরো শতাংশের মধ্যে। দশ বছর পর? কেউ গোনে না।"

"কিন্তু সমাজ গোনে," শাহরিয়ার ভাই নিজেই বললেন। "তুমি বললে BUET, মানুষ বলবে 'ওয়াও।' তুমি বললে RUET, মানুষ বলবে 'ও, আচ্ছা।' এই 'ওয়াও' আর 'আচ্ছা'-র পার্থক্যটা টাকায় মাপা যায় না। সেটা বিয়ের বাজারে থাকে, আত্মীয়ের আড্ডায় থাকে, স্কুলের রিইউনিয়নে থাকে।"

বেতনের ব্যবধান বন্ধ হয়। পরিচয়ের ব্যবধান বন্ধ হয় না। কখনো না।

সন্ধ্যায় হলের ছাদে বসল দুজনে। রাজশাহীর আকাশ পরিষ্কার। ময়মনসিংহের চেয়ে অনেক তারা।

রাসেল বলল, "তুই ন্যাশনালে কেমন আছিস?"

জাহিদ বলল, "ঠিক আছি। জানিস কেন? কারণ আমি নিজে বেছে নিয়েছি। জগন্নাথে রসায়ন ছেড়ে ন্যাশনালে ফিজিক্স বেছেছি। আমার সিদ্ধান্ত, আমার হিসাব, আমার স্প্রেডশিট। ভুল হতে পারে। কিন্তু আফসোস নেই।"

রাসেল চুপ করে থেকে বলল, "আমার সিদ্ধান্ত আমার ছিল না। বাবা বলেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি মেনে নিয়েছি। আর এখন BUET না হওয়ার আফসোস আমাকে খাচ্ছে।"

জাহিদ বুঝল, রাসেলের সমস্যাটা RUET-এর না। রাসেল নিজেকে দেখেছিল "BUETian" হিসেবে। সেই পরিচয়টা তৈরি হয়ে গিয়েছিল পরীক্ষার আগেই। কোচিংয়ে স্যার বলতেন "তোমরা BUET-এ পড়বে," বন্ধুরা বলত "রাসেল তো পাবেই," বাবা আত্মীয়দের বলতেন "ছেলে BUET-এ পড়বে।" পরিচয় রেজাল্টের আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রেজাল্ট অন্য কথা বলল।

এখন রাসেল একটা ফাটলে দাঁড়িয়ে। একদিকে সে যা হতে চেয়েছিল: "I AM a BUETian।" অন্যদিকে বাস্তবতা: "I DO engineering at RUET।"

AM আর DO-র মধ্যে গভীর পার্থক্য। AM মানে অস্তিত্ব, পরিচয়, স্ট্যাটাস। DO মানে কাজ, দক্ষতা, প্রক্রিয়া। রাসেল AM হারিয়েছে। DO পেয়েছে। কিন্তু DO দিয়ে AM-এর শূন্যতা পূরণ হচ্ছে না।

রাতে রাসেলের রুমে মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে পড়ল জাহিদ। সুমন ঘুমিয়ে গেছে। রাসেল বিছানায় শুয়ে ফোন দেখছে। জাহিদ জানত কী দেখছে।

"রাসেল।"

"হুম?"

"তুই যে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পড়ছিস, সেটা কোথায় পড়ছিস?"

"RUET-এ।"

"আমি কোথায় পড়ছি?"

"ন্যাশনালে।"

"সমীকরণটা কি আলাদা?"

রাসেল ফোন থেকে মুখ তুলল।

জাহিদ বলল, "ম্যাক্সওয়েলের চারটা সমীকরণ। ডাইভার্জেন্স অফ ই, ডাইভার্জেন্স অফ বি, কার্ল অফ ই, কার্ল অফ বি। BUET-এ পড়ালেও একই। RUET-এ পড়ালেও একই। আমার কলেজে পড়ালেও একই। ইউনিভার্সিটির নাম বদলালে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড বদলায় না।"

"একই জ্ঞান, শুধু মোড়ক আলাদা। মোড়কে লেখা BUET, না RUET, না ন্যাশনাল। ভেতরে একই চকলেট।"

"চকলেট হলেও মোড়কটাই তো মানুষ আগে দেখে," রাসেল বলল।

"হ্যাঁ। মানুষ মোড়ক দেখে। কিন্তু চকলেটের স্বাদ মোড়কে থাকে না।"

পরের দিন সকালে গেটে এসে বিদায়।

রাসেল বলল, "একটা কথা বলব? তুই ন্যাশনালে পড়ে শান্তিতে আছিস। আমি RUET-এ পড়ে অশান্তিতে আছি। তোর জায়গাটা 'খারাপ,' আমার জায়গাটা 'ভালো।' কিন্তু তুই ভালো আছিস, আমি ভালো নেই। এটা কোন হিসাব?"

জাহিদ বলল, "হিসাবটা সহজ। তুই তোর জায়গাটা নিজে বেছেছিস বলে মনে করিস না। তুই মনে করিস তোকে এখানে পাঠানো হয়েছে, কারণ তুই অন্য জায়গায় যেতে পারিসনি। RUET তোর শাস্তি না, তোর সুযোগ। কিন্তু তুই শাস্তি মনে করছিস বলে সুযোগটা দেখতে পাচ্ছিস না।"

রাসেল হাসল। এবার হাসিটা একটু বড় ছিল। ঠোঁট ছাড়িয়ে গালে পৌঁছেছে।

"তুই বিজ্ঞ হয়ে গেছিস রে।"

"বিজ্ঞ না। স্প্রেডশিটে জীবন দেখলে এরকম হয়।"

বাসে বসে জাহিদ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। রাজশাহীর ধুলো রাস্তা, আমের বাগান, পদ্মার চর।

পাশের সিটে একটা লোক বসেছিলেন। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, রাজশাহীতে কাজ করেন।

"আপনি কোথায় পড়েছেন?"

"KUET। খুলনা। BUET-এ চান্স পাইনি। তখন মনে হয়েছিল জীবন শেষ।"

"এখন?"

"এখন আমি একটা কোম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। আমার নিচে তিনজন কাজ করে, তার মধ্যে একজন BUET থেকে পাশ করা। প্রথম দুই বছর পার্থক্য থাকে। তারপর পার্থক্যটা চলে যায় তুমি কতটা পরিশ্রম করো, কতটা শিখো, সেখানে। ইউনিভার্সিটির নাম দরজা খুলে দেয়। দরজার ভেতরে কী করবে, সেটা তোমার।"

১০

বাস পদ্মা সেতু পার হচ্ছে। জানালা দিয়ে নদী দেখা যাচ্ছে। বিশাল, ধূসর, শান্ত।

জাহিদ ভাবছিল।

রাসেল একটা ভালো জায়গায় আছে অসুখী, কারণ সেটা "সেরা" জায়গা না। আর সে, জাহিদ, একটা "খারাপ" জায়গায় আছে শান্তিতে, কারণ সেটা নিজে বেছেছে। বেছে নেওয়ার মধ্যে একটা শক্তি আছে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিলে ফলাফল খারাপ হলেও আফসোস কম থাকে।

আর আরেকটা জিনিস মাথায় ঘুরছিল। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ। একই সমীকরণ সে পড়ছে, রাসেল পড়ছে, BUET-এর ছেলেরা পড়ছে। ম্যাক্সওয়েল ১৮৬৫ সালে এই সমীকরণ লেখেননি "শুধু Cambridge-এর ছাত্রদের জন্য।" লিখেছিলেন পুরো মহাবিশ্বের জন্য। আলো একই গতিতে চলে, সেটা যে ল্যাবেই মাপো।

জ্ঞানের কোনো ঠিকানা নেই। কিন্তু মানুষ জ্ঞানকে ঠিকানায় বিচার করে।

বাংলাদেশে সবাই জিজ্ঞেস করে "কোথায় পড়?" কেউ জিজ্ঞেস করে না "কী পড়? কতটা পারো?"

কোথায়। কী না। কোথায়।

ময়মনসিংহে পৌঁছাল ভোরের দিকে। মা উঠে গেছেন, চুলায় আঁচ দিচ্ছেন। "রাসেল কেমন আছে?" "ভালো আছে।" মনে মনে ভাবল, রাসেল ভালো নেই। রাসেল একটা ভালো জায়গায় আছে, কিন্তু সেটাকে ভালো মানতে পারছে না।

জাহিদ শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর আগে শেষ চিন্তা: ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ কাল ক্লাসে আছে। একই সমীকরণ, একই সত্য, একই আলো। মোড়ক যেটাই হোক।