কলেজের প্রথম দিন

দুই তলা ভবন, খোসা ওঠা রং, আর পঁয়ত্রিশটা ভিন্ন গল্প

পর্ব ২৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

কলেজটা খুঁজে পেতে জাহিদের দশ মিনিট লেগেছিল।

গুগল ম্যাপে দেখিয়েছিল মেইন রোড থেকে বাঁয়ে ঢুকলেই। কিন্তু বাঁয়ে ঢুকলে একটা চায়ের দোকান, তারপর একটা মুরগির ফার্ম, তারপর একটা পুকুর। কলেজ কোথায়?

পুকুরের ওপারে একটা দুই তলা ভবন। সামনে সাইনবোর্ড: "সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।" অর্ধেক অক্ষর মুছে গেছে। যেটুকু পড়া যায়, সেটুকু দিয়ে আন্দাজ করতে হয়।

গেট বলতে লোহার দুটো পাল্লা। একটা খোলা, একটা বন্ধ। বন্ধ পাল্লার কব্জা ভাঙা, তাই চিরকালের জন্য বন্ধ।

জাহিদ ভেতরে ঢুকল।

ভবনটা দেখে মনে হলো কেউ একটা বাড়ি বানাতে চেয়েছিল, তারপর মাঝপথে সিদ্ধান্ত বদলে কলেজ বানিয়ে ফেলেছে।

প্রতি তলায় চারটা রুম। সিঁড়ির রেলিং-এ মরচে। দেয়ালের রং একসময় হলুদ ছিল, এখন ধূসর আর হলুদের মাঝামাঝি কিছু একটা। জায়গায় জায়গায় প্লাস্টার খসে পড়েছে, ভেতরের ইট দেখা যাচ্ছে।

মাঠ বলতে ভবনের সামনে একটুকরো খালি জায়গা। ক্রিকেট পিচ আঁকা, কিন্তু পিচের মাঝখানে ঘাস গজিয়ে গেছে।

জাহিদ ভাবল, BUET-র ক্যাম্পাস ফারুকের ফোনে দেখেছিল। লাল ভবন, বিশাল মাঠ, গাছে ঘেরা রাস্তা। আর এখানে একটা পুকুর, একটা মুরগির ফার্ম, আর খোসা ওঠা দেয়াল।

তুলনা করা বোকামি। জাহিদ জানে। তবু মাথায় আসে।

পদার্থবিদ্যা অনার্সের ক্লাসরুম দোতলায়, দুই নম্বর রুম। সাতটা বেঞ্চ। সামনে একটা ব্ল্যাকবোর্ড, কালো রং উঠে ধূসর হয়ে গেছে। চক দিয়ে লিখলে তিন ফুটের বেশি দূর থেকে চোখ কুঁচকে তাকাতে হয়।

জাহিদ দ্বিতীয় বেঞ্চে বসল। মাঝামাঝি। নিরাপদ দূরত্ব।

পঁয়ত্রিশজন ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিন এসেছে সাতাশজন। বাকি আটজন হয়তো আসবে, হয়তো আসবে না। কেউ কেউ ভর্তি হয় কিন্তু ক্লাস করে না। সিট ধরে রাখে, যদি অন্য কোথাও চান্স পায়।

পাশের বেঞ্চে একটা ছেলে ফোনে কিছু দেখছে। স্ক্রিনে ইংরেজি কোড। সামনের বেঞ্চে দুইজন মেয়ে, একজন নোটবুকে লিখছে, আরেকজন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। পেছনে তিনজন ছেলে জোরে জোরে গতকালের ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে কথা বলছে। পদার্থবিদ্যা নিয়ে কোনো কথা নেই।

গল্প সবার আলাদা। পরে কয়েকদিনে জাহিদ জানবে, কিন্তু কিছু টুকরো প্রথম দিনেই ধরা পড়ল।

যে ছেলেটা ফোনে কোড দেখছিল, তার নাম নাহিদ। ফ্রিল্যান্সিং করে, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। মাসে পনেরো হাজার আয়। ডিগ্রিটা লাগবে ব্যাকআপ হিসেবে, যদি কোনোদিন ফ্রিল্যান্সিং বন্ধ হয়।

সামনের সারিতে যে মেয়েটা নোটবুকে লিখছিল, সে সুমি। সুমি পদার্থবিদ্যা পড়তে সত্যিই চেয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি, জাহাঙ্গীরনগরেও না। ভর্তি পরীক্ষায় পনেরো নম্বর কম। দুটো MCQ-র ব্যবধান, পুরো জীবনের রাস্তা বদলে গেছে।

পেছনের তিনজনের একজন শামীম। আগ্রহ ব্যবসায়। বাবা বলেছেন অনার্স পাশ করতে হবে, বিষয় যেকোনো হলেই চলে।

আর জাহিদ? জাহিদ সেই ছেলে যার পরিবারের সামর্থ্য ঢাকায় যাওয়ার ছিল না।

পঁয়ত্রিশজন। পঁয়ত্রিশটা কারণ। কিন্তু রুমটা একই, বেঞ্চ একই, ব্ল্যাকবোর্ড একই।

এগারোটায় স্যার আসলেন।

বয়স ষাটের ওপরে। পাতলা গড়ন, টাক মাথায় কয়েকটা সাদা চুল। হাতে পুরনো ব্যাগ, চেইন অর্ধেক খোলা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

"আমার নাম মোহাম্মদ আবদুর রহমান। পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৮।" স্যার থামলেন। "তখন থেকে পড়াচ্ছি। এই কলেজে, আরো দুটো কলেজে। তিনটা কলেজ, সপ্তাহে ছয়দিন।"

কেউ কিছু বলল না।

"আমি জানি তোমরা কী ভাবছো। ভাবছো, NU-তে পড়ে কী হবে। ভাবছো, এই কলেজটা ভালো না। ভাবছো, এখানকার ডিগ্রি দিয়ে কিছু হয় না।"

ক্লাসরুমে নীরবতা। কারণ স্যার ঠিকই বলেছেন।

স্যার বোর্ডে লিখলেন: F = ma

"এটা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীকরণ?" কেউ উত্তর দিল না। "নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র। এটা BUET-এও একই, MIT-তেও একই, আর এই কলেজেও একই। পদার্থবিদ্যা ভবন চেনে না।"

স্যার চশমা খুলে মুছলেন।

"তোমরা NU-তে পড়ছো বলে কম শিখবে, এটা ভাবলে ভুল। তোমরা কম শিখবে যদি তোমরা কম পড়ো। কোথায় পড়ছো সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কতটুকু পড়ছো সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"

জাহিদ খাতায় লিখে রাখল কথাটা। শব্দে শব্দে।

"তবে একটা কথা বলি। প্রতিটা কলেজে প্রথম বছরে চল্লিশ-পঞ্চাশজন থাকে। চতুর্থ বছরে থাকে পনেরো-বিশজন। বাকিরা হারিয়ে যায়। তোমাদের মধ্যে যারা চতুর্থ বছর পর্যন্ত টিকে থাকবে, তারাই আসল।"

ক্লাস শেষ হলো দুপুর একটায়। স্যার চলে গেলেন পরের কলেজে। দুইটায় ওখানে ক্লাস।

ক্যান্টিন বলতে ভবনের পেছনে টিনের চালার নিচে দুটো টেবিল। চা পাঁচ টাকা, সিঙ্গারা সাত। জাহিদ চা নিল, সিঙ্গারা নিল না। সাত টাকা বাঁচানো।

নাহিদ পাশে এসে বসল।

"তুই কি সিরিয়াসলি পদার্থবিদ্যা পড়বি?"

"ভর্তি হয়েছি তো।"

"ভর্তি হওয়া আর পড়া এক জিনিস না। আমি ভর্তি হয়েছি ডিগ্রির জন্য। আমার আসল কাজ ফ্রিল্যান্সিং।"

"কী করিস?"

"ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। Fiverr-এ কাজ পাই। গত মাসে পনেরো হাজার ইনকাম।"

পনেরো হাজার। জাহিদের বাবার সারা মাসের আয়।

"কবে থেকে শিখছিস?"

"ক্লাস নাইন থেকে। YouTube-এ শুরু। ক্লাস টেনে Fiverr-এ অ্যাকাউন্ট খুললাম। প্রথম কাজ পেতে ছয় মাস লেগেছে। পাঁচশো টাকা, একটা visiting card design।"

জাহিদ বলল, "আমি Python নিয়ে একটু একটু পড়েছি। বেশি দূর যাইনি।"

"Python ভালো শুরু। টাকা আসে ওয়েবে, তবে Python দিয়ে data নিয়ে কাজ করা যায়।"

জাহিদ ভাবল, data। পদার্থবিদ্যায়ও data আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরিমাপ, বিশ্লেষণ। হয়তো দুটো জিনিস এত আলাদা না।

বিকেল চারটায় কলেজ শেষ। জাহিদ হেঁটে বাসায় ফিরল। রিকশায় পনেরো টাকা, হেঁটে শূন্য। প্রতিদিন ত্রিশ টাকা বাঁচানো, মাসে নয়শো।

বাসায় ঢুকে ভাত খেল। মা জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন হলো?"

"ভালো।"

মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। জাহিদও কলেজের চেহারার কথা বলল না। বলে লাভ কী? মা চিন্তা করবেন, কিন্তু কলেজ বদলানোর সামর্থ্য কারো নেই।

বিকেল পাঁচটায় জাহিদ নিজের ঘরে ঢুকল। দশ ফুট বাই আট ফুটের রুম। একটা খাট, টেবিল, চেয়ার। টেবিলে পদার্থবিদ্যার বই, খাতা, আর ল্যাপটপ।

ল্যাপটপটা রাকিব ভাইয়ের পুরনো। তিন বছর আগে সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছিল, তারপর গার্মেন্টসে ঢোকার পর আর লাগেনি, জাহিদকে দিয়ে দিয়েছে। ব্যাটারি মরে গেছে, চার্জারে রেখে চালাতে হয়। RAM কম, একসাথে তিনটার বেশি ট্যাব খুললে জমে যায়।

কিন্তু চলে। এটুকুই যথেষ্ট।

জাহিদ ল্যাপটপ খুলল। YouTube-এ সার্চ করল: "Python tutorial Bangla"

প্রথম ভিডিও। বারো মিনিট। "Python কী এবং কেন শিখবেন?"

হেডফোন লাগাল। প্লে করল।

সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দুটো ভিডিও দেখল আর freeCodeCamp-এর একটা লেসন শুরু করল।

Python-এর প্রথম ধাপ: print("Hello, World!")

জাহিদ টাইপ করল। এন্টার চাপল। স্ক্রিনে দেখাল: Hello, World!

একটা লাইন কোড। একটা আউটপুট। কিন্তু জাহিদের মনে হলো সে একটা নতুন ভাষায় প্রথম শব্দ বলেছে। যেমন ছোটবেলায় প্রথম "আ" লেখা শেখা, এটাও তেমন। শুরু।

তারপর variable। x = 5। y = 3। z = x + y। print(z)। আউটপুট: 8।

পদার্থবিদ্যার সমীকরণের মতোই। চলক আছে, মান আছে, ফলাফল আছে। শুধু ভাষাটা আলাদা।

সকালে স্যার বলেছিলেন পদার্থবিদ্যা সব জায়গায় একই। কোডিংও কি তাই? যেখানেই বসো, print("Hello, World!") একই আউটপুট দেবে। পদার্থবিদ্যার ক্লাসরুম দেয়ালে আটকে আছে, কিন্তু কোডিং দেয়াল চেনে না।

রাতে খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "ল্যাব আছে?"

জাহিদ একটু থামল। ল্যাব আছে, একটা। নিচতলায়। বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি নব্বইয়ের দশকের। oscilloscope-এর স্ক্রিন অর্ধেক কালো, galvanometer-এর কাঁটা আটকে আছে। তবে vernier caliper আছে, screw gauge আছে, basic optics-এর সরঞ্জাম আছে।

"আছে, বাবা।"

বাবা মাথা নাড়লেন। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

জাহিদ চুপ করে ভাত খেল। বাবাকে কী বলবে? কলেজের প্লাস্টার খসে পড়ছে? স্যার তিনটা কলেজে দৌড়ান? ল্যাবের যন্ত্রপাতি জাহিদের জন্মের আগে কেনা? বলে কী হবে? বাবা তো সেই পনেরো হাজার টাকার মানুষ।

১০

রাত নয়টায় আবার ল্যাপটপ খুলল।

freeCodeCamp-এর সাইটে "Scientific Computing with Python"। ফ্রি কোর্স, ফ্রি সার্টিফিকেট। প্রথম মডিউল শুরু করল।

তারপর কলেজের নোটিশ বোর্ডের কথা মনে পড়ল। সকালে ঢোকার সময় দেয়ালে একটা পোস্টার দেখেছিল। হলুদ কাগজে কালো হরফে:

"জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য Google IT Support Professional Certificate। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। Coursera-তে। নিবন্ধনের শেষ তারিখ: ৩০ মার্চ।"

ফোনে পোস্টারের ছবি তুলে রেখেছিল। Coursera খুলল। কলেজের আইডি নম্বর দিল। ইমেইল দিল।

"Enrollment successful."

আরেকটা শুরু। আরেকটা রাস্তা।

১১

রাত সাড়ে দশটায় ল্যাপটপ বন্ধ করল। ফোনে নাহিদের মেসেজ।

"ভাই, আজকে ক্লাসে তোকে দেখলাম নোট নিচ্ছিলি। বেশিরভাগ লোক প্রথম দিন নোট নেয় না। তোকে সিরিয়াস মনে হলো।"

জাহিদ লিখল, "সিরিয়াস না হলে এখানে এসে লাভ কী?"

নাহিদ: "বেশিরভাগের জন্য লাভ একটাই, কাগজ।"

জাহিদ: "তোরও তো তাই।"

নাহিদ: "হ্যাঁ, কিন্তু আমি জানি কাগজটা দিয়ে কী করব। তুই কি জানিস?"

জাহিদ ভাবল। সত্যি বলতে, জানে না। পদার্থবিদ্যায় অনার্স করে কী হবে? শিক্ষক? গবেষক? BCS?

"এখনো ভাবছি," লিখল।

নাহিদ: "ভাবতে ভাবতে শিখতে থাক। একটা কথা বলি, ডিগ্রি একটা কাগজ। স্কিল হলো আসল জিনিস। কাগজ দিয়ে চাকরি পাবি, স্কিল দিয়ে টিকে থাকবি।"

জাহিদ মেসেজটা পড়ল। আবার পড়ল।

১২

রাত এগারোটা। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে।

আজকের দিনটা মাথায় সাজাল। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা, কলেজ। পদার্থবিদ্যা। এটা ডিগ্রি, কাগজ, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে দশটা, কোডিং। Python, freeCodeCamp, Coursera। কারো সিলেবাসে নেই।

দুটো শিক্ষা। একটা আনুষ্ঠানিক, একটা অনানুষ্ঠানিক। একটায় রোল নম্বর আছে, পরীক্ষা আছে। আরেকটায় কিছু নেই, শুধু স্ক্রিনে কোড আর মাথায় ধারণা।

কিন্তু দুটো মিলিয়ে কি একটার চেয়ে শক্তিশালী কিছু হতে পারে? পদার্থবিদ্যা শেখাবে চিন্তা করতে, সমস্যা সমাধান করতে, গণিত বুঝতে। কোডিং শেখাবে সেই চিন্তাকে কাজে লাগাতে।

দুটো পরিচয়। একটা দেওয়া: "NU-র ছাত্র।" মানুষ তাকে সেই মাপে মাপবে, কম ভাববে। আরেকটা তৈরি করা: কতটুকু শিখেছে, সেটাই মাপকাঠি। সেখানে কোনো লেবেল নেই।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল।

কাল সকালে আবার কলেজ। বিকেলে আবার কোডিং। পরশুও তাই। প্রথম দিন শেষ।

বাইরে রাস্তায় একটা কুকুর ডাকছে। পাশের ঘরে মিম ঘুমিয়ে গেছে। মা-বাবার ঘর থেকে কোনো শব্দ নেই।

জাহিদ ভাবল, print("Hello, World!")

সত্যিই তো। সে একটা নতুন দুনিয়ায় "হ্যালো" বলেছে আজ।