ল্যাব থেকে টিউশনি

তিন হাজার টাকা, দুই ছাত্র, আর রাত এগারোটার পর একটা ক্যালকুলেটর

পর্ব ২৪ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

ছয় মাস হয়ে গেছে কলেজে।

ফিজিক্সের ক্লাস হয়, ল্যাব হয়, পরীক্ষা হয়। জাহিদ পড়ে, বোঝে, পরীক্ষা দেয়। রুটিন চলছে। কিন্তু রুটিনের বাইরে আরেকটা হিসাব চলছে যেটা কোনো রুটিনে লেখা নেই।

বাবার CNG থেকে পনেরো হাজার। মায়ের সেলাই থেকে পাঁচ হাজার। ভাই রাকিবের গার্মেন্টস থেকে পাঁচ হাজার। মোট পঁচিশ হাজার।

পঁচিশ হাজার টাকায় চার জনের সংসার। বাড়িভাড়া সাত হাজার। বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি দেড় হাজার। মিমের স্কুলের খরচ দুই হাজার। বাবার CNG-র তেল আর মেরামত পাঁচ হাজার। বাকি থাকে সাড়ে চার হাজার। এই টাকায় চার জনের খাওয়া, ওষুধ, জামাকাপড়, আর জাহিদের কলেজের যাবতীয় খরচ।

সাড়ে চার হাজার টাকায়।

জাহিদ হিসাবটা একদিন খাতায় লিখল। লিখে দেখল, মাসের শেষে কিছু থাকে না। বরং কখনো কখনো মাইনাস হয়। সেই মাইনাসটা মা পূরণ করেন রাত বারোটায় অতিরিক্ত একটা ব্লাউজ সেলাই করে, অথবা বাবা শেষ রাতে একটা বাড়তি ট্রিপ মেরে।

জাহিদ খাতাটা বন্ধ করল। টেবিলের ওপর রাখল। চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ।

তারপর সিদ্ধান্ত নিল। আয় করতে হবে।

মফস্বল শহরে একজন কলেজ ছাত্রের আয়ের উপায় কী?

চাকরি করার বয়স হয়নি। ব্যবসা করার পুঁজি নেই। অনলাইনে কিছু করার মতো স্কিল এখনো তৈরি হয়নি, পাইথন শেখা সবে শুরু, print("Hello World") থেকে সবে if-else-এ গেছে।

একটাই পথ খোলা। টিউশনি।

বাংলাদেশে টিউশনি একটা সমান্তরাল অর্থনীতি। সরকারি হিসাবে এটার কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো ট্যাক্স নেই, কোনো লাইসেন্স নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু লাখ লাখ পরিবারের আয়ের উৎস এটা। কলেজ ছাত্র পড়ায় স্কুলের বাচ্চাকে, ইউনিভার্সিটি ছাত্র পড়ায় কলেজের ছেলেমেয়েকে। একটা চেইন। উপরের ধাপের ছেলে নিচের ধাপের ছেলেকে টানে। বিনিময়ে কিছু টাকা হাত বদল হয়। সবাই খুশি।

জাহিদ নাহিদকে বলল।

নাহিদ বলল, "তোর কয়টা ছাত্র দরকার?"

"দুইটা হলেই চলে।"

"HSC ফিজিক্স পড়াতে পারবি?"

জাহিদ একটু থামল। সে নিজে NU-তে ফিজিক্স পড়ছে। BSc প্রথম বর্ষ। আর HSC ফিজিক্স মানে সে যেটা দুই বছর আগে পড়ে এসেছে। পারবে না কেন?

"পারব।"

"ঠিক আছে। আমার কাজিনের ছেলে HSC দেবে আগামী বছর। ফিজিক্সে দুর্বল। আর পাশের বাসার একটা মেয়ে আছে, সেও খুঁজছে। দুইটাই তোকে দিচ্ছি।"

"কত নেব?"

নাহিদ বলল, "দেড় হাজার করে নে। বেশি নিলে চলে যাবে, কম নিলে তুই টিকবি না।"

দেড় হাজার গুণ দুই। তিন হাজার টাকা।

তিন হাজার টাকা। বাবার এক সপ্তাহের CNG-র আয়ের সমান। জাহিদের জন্য এটা অনেক টাকা।

প্রথম দিন টিউশনি দিতে গেল জাহিদ।

ছাত্রের নাম সাব্বির। ক্লাস ইলেভেন। চেহারায় একটু বোকাসোকা ভাব, কিন্তু চোখে মনোযোগ আছে। সাব্বিরের বাবা অটো চালান। মা গৃহিণী। দুই রুমের বাসা, একটু ছোট, কিন্তু পরিষ্কার। জাহিদের বাসার মতোই। একই অর্থনৈতিক স্তর। তফাৎ শুধু এই যে সাব্বিরের বাবা ছেলের পড়ার পেছনে দেড় হাজার টাকা দিতে রাজি, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন পড়ালেখাই একমাত্র পথ।

জাহিদ প্রথমদিন নিউটনের গতিসূত্র পড়াল।

পড়াতে গিয়ে একটা জিনিস বুঝল। সে নিজে নিউটনের গতিসূত্র পড়েছে। পরীক্ষায় লিখেছে। নম্বর পেয়েছে। কিন্তু সেটা বোঝা আর সেটা অন্যকে বোঝানো দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।

সাব্বির জিজ্ঞেস করল, "ভাইয়া, তৃতীয় সূত্রে কেন প্রতিক্রিয়া বল সমান হয়? যদি আমি দেয়ালে ঘুষি মারি, দেয়াল তো আমার চেয়ে শক্ত। তাহলে দেয়ালের বল বেশি হওয়া উচিত না?"

জাহিদ থামল।

প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটাও জানা। কিন্তু এমনভাবে বোঝাতে হবে যাতে সাব্বির পরের বার নিজে বোঝাতে পারে। এটাই চ্যালেঞ্জ।

জাহিদ বলল, "তুই যখন ঘুষি মারিস, তোর হাতে ব্যথা লাগে না?"

"লাগে।"

"সেই ব্যথাটাই দেয়ালের প্রতিক্রিয়া বল। তোর হাত দেয়ালকে ধাক্কা দিচ্ছে, দেয়াল তোর হাতকে ধাক্কা দিচ্ছে। একই পরিমাণ। তফাৎ হলো দেয়াল শক্ত, তাই সে নড়ে না। তোর হাত নরম, তাই তোর হাত ব্যথা পায়। বল সমান, কিন্তু প্রভাব আলাদা।"

সাব্বিরের চোখ বড় হলো। "ও! তাহলে বল সমান হলেও যেটা দুর্বল সেটার ওপর বেশি ইফেক্ট পড়ে?"

"ঠিক।"

সাব্বির হাসল। জাহিদও হাসল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভাবছে, এই প্রশ্নটা সে নিজে কখনো করেনি। কখনো এভাবে ভাবেনি। পড়ালেখা মুখস্থ করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে, নম্বর পেয়েছে। কিন্তু বুঝেছে কি?

আজ একটা ইলেভেনের ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সে নিউটনের তৃতীয় সূত্র আসলে বুঝল।

শেখার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো শেখানো। এটা কেউ জাহিদকে বলেনি। সে নিজে আবিষ্কার করল।

দ্বিতীয় ছাত্রী নাফিসা। ক্লাস টুয়েলভ। পরের বছর HSC। ফিজিক্সে ভয় পায়, কিন্তু অংকে ভালো। জাহিদ বুঝল, নাফিসার সমস্যা ফিজিক্স না, সমস্যা হলো ফিজিক্সের ভাষা। সূত্রগুলো দেখলেই তার মাথা ঘুরে যায়, কিন্তু যদি অংকের ভাষায় বোঝানো হয়, তাহলে সে ধরতে পারে।

জাহিদ পদ্ধতি বদলাল। নাফিসাকে সূত্র না দিয়ে আগে সমস্যা দিল। সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নাফিসা নিজেই সূত্রটার দরকার অনুভব করল। তখন সূত্র দিল। মনে রইল।

দুইজন ছাত্র, দুই রকম পদ্ধতি। জাহিদ শিখছে যে পড়ানো মানে একটা স্ক্রিপ্ট পড়ে যাওয়া না। পড়ানো মানে সামনের মানুষটার মাথার ভেতরে ঢুকে বোঝা, সে কোথায় আটকে আছে।

এটাও কেউ শেখায়নি। এটাও নিজে শিখল।

জাহিদের দিন এখন ঘড়ির কাঁটার মতো চলে।

সকাল ছয়টায় ওঠে। এক ঘণ্টা কোডিং। ল্যাপটপ নেই, নাহিদের পুরনো ডেস্কটপটা ধার করা, সেটায় বসে পাইথন প্র্যাকটিস। এখন ভেরিয়েবল, লুপ, ফাংশন পর্যন্ত এসেছে। পাশাপাশি HTML আর CSS শিখছে। একটা ওয়েবপেজ বানানোর চেষ্টা করেছে, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো লেখা, কোনো ডিজাইন নেই, কিন্তু ব্রাউজারে দেখা যাচ্ছে। এটুকুই যথেষ্ট।

আটটায় কলেজ। ফিজিক্সের লেকচার, ল্যাব। NU-র সিলেবাস ভারী না, কিন্তু ল্যাবের যন্ত্রপাতি পুরনো। গ্যালভানোমিটারের কাঁটা কাঁপে, স্পেকট্রোমিটারের স্কেল ঝাপসা। জাহিদ ল্যাবে মন দিয়ে কাজ করে, কিন্তু মনের এক কোণায় থাকে, এই যন্ত্রপাতি দিয়ে কী শেখা যায়? BUET-র ল্যাবে কী আছে? RUET-এ রাসেল কী ধরনের ল্যাব করছে?

তুলনা আসে। তুলনা আসবেই। জাহিদ তুলনাটাকে ঝেড়ে ফেলে। কাজ করে।

তিনটায় টিউশনি। দুই ঘণ্টা। সাব্বির আর নাফিসা। দুজনের জায়গা কাছাকাছি, তাই একজনের বাসা থেকে আরেকজনের বাসায় যেতে পাঁচ মিনিট লাগে।

পাঁচটায় নিজের পড়া। BSc-র সিলেবাস। ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, ইলেকট্রিসিটি, অপটিক্স। জাহিদ নোট করে, সমস্যা সমাধান করে।

রাত নয়টায় আবার কোডিং। এখন Django শিখতে শুরু করেছে। নাহিদ বলেছে, "পাইথন শিখলে Django শেখ। ওয়েব অ্যাপ বানাতে পারবি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজ পাবি।" জাহিদ Django-র ডকুমেন্টেশন পড়ছে। ইংরেজি। অনেক কিছু বোঝে না। কিন্তু না বুঝলে গুগল করে। গুগল করে বাংলায় টিউটোরিয়াল খোঁজে। পায় না সব সময়। তখন ইংরেজিটাই ধীরে ধীরে পড়ে। একটা পেজ পড়তে এক ঘণ্টা লাগে।

রাত এগারোটায় ঘুম।

সতেরো ঘণ্টার দিন। সাত ঘণ্টা ঘুম। কোনো বিনোদন নেই। ক্রিকেট দেখা নেই, আড্ডা নেই, ফেসবুক স্ক্রল নেই। যা আছে তা হলো কাজ, পড়া, পড়ানো, আর কোডিং।

এই রুটিন কেউ বলে দেয়নি। কোনো মোটিভেশনাল ভিডিও থেকে কপি করেনি। দরকার থেকে তৈরি হয়েছে। দরকার সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।

প্রথম মাসের টিউশনি ফি পেল জাহিদ।

সাব্বিরের বাবা দেড় হাজার টাকা দিলেন। নতুন নোট না, পুরনো, ভাঁজ করা। হাতে দিয়ে বললেন, "ভালো পড়াও, ভাই। ছেলেটা ফিজিক্সে ফেল করবে বলে ভয় পাচ্ছিলাম।"

নাফিসার মা দিলেন দেড় হাজার। সাথে একটা কথা বললেন যেটা জাহিদের কানে লেগে রইল।

"আপনি NU-তে পড়েন? কিন্তু এত ভালো পড়ান!"

কথাটা প্রশংসা। কিন্তু প্রশংসার ভেতরে একটা বিস্ময় আছে। বিস্ময়ের ভেতরে একটা পূর্বধারণা আছে। পূর্বধারণাটা হলো, NU-তে যে পড়ে সে ভালো পড়াতে পারবে না। NU মানে দুর্বল ছাত্র। NU মানে যে কোথাও চান্স পায়নি।

জাহিদ হাসল। বলল, "চেষ্টা করি, আন্টি।"

ভেতরে কিছু একটা খচ করল। কিন্তু সে কিছু বলল না। কী বলবে? "আমি BUET-এ চান্স পাইনি বলে NU-তে পড়ি, কিন্তু সেটা মানে এই না যে আমি ফিজিক্স জানি না"? এত কথা কে শোনে? আর বলে কী হবে? আন্টি তো ভুল বলেননি। NU-র বাস্তবতা তো এটাই। বেশিরভাগ ছাত্র এখানে এসেছে কারণ আর কোথাও হয়নি।

জাহিদও তাদের একজন। এটা সত্য।

কিন্তু সত্য আর পুরো সত্য এক জিনিস না।

তিন হাজার টাকা।

জাহিদ টাকাটা মায়ের হাতে দিল।

মা বললেন, "এটা কী?"

"টিউশনি করি। দুইটা ছাত্র। HSC ফিজিক্স।"

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, "তোর নিজের পড়ায় সমস্যা হবে না তো?"

"হবে না।"

"টাকাটা তুই রাখ। তোর লাগবে।"

"না, মা। তুমি রাখো।"

মা টাকাটা নিলেন। বুকের কাছে ধরলেন একটু। তারপর আলমারিতে রেখে দিলেন। কিছু বললেন না।

সেদিন রাতে জাহিদ লক্ষ্য করল, মা রাত বারোটার পরে সেলাই মেশিনে বসেননি। আগে প্রায় প্রতি রাতেই বসতেন। অতিরিক্ত একটা ব্লাউজ, অতিরিক্ত পাঁচশো টাকা। সেই অতিরিক্তটা এখন দরকার নেই।

তিন হাজার টাকা। পরিবারের মোট আয় এখন আটাশ হাজার। পঁচিশ থেকে আটাশ। তিন হাজার টাকার ফারাক। সংখ্যায় ছোট। কিন্তু এই তিন হাজার টাকার মানে হলো, মায়ের রাত বারোটার পরে জেগে থাকতে হয় না।

জাহিদ এটা নিয়ে কিছু বলল না। মাও কিছু বললেন না। কিছু কিছু জিনিস কথায় বলতে নেই। বললে ছোট হয়ে যায়।

ইতিমধ্যে, তিনশো কিলোমিটার দূরে, রাজশাহীতে রাসেল RUET-এ পড়ছে।

রাসেলের মাসিক খরচ আট হাজার টাকা। মেসভাড়া তিন হাজার, খাওয়া তিন হাজার, বাকি দুই হাজার যাতায়াত, ফটোকপি, মোবাইল রিচার্জ, আর মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে চা-সিঙ্গারা। রাসেলের বাবা এই টাকা পাঠান। রাসেল নিজে কিছু আয় করে না। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ল্যাব, পরীক্ষা। পুরো সময়টা পড়ালেখায় যায়। এটাই তো হওয়ার কথা, তাই না? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, সব মনোযোগ পড়ায় দেবে।

কিন্তু হিসাবটা একটু অন্যভাবে দেখলে কী দাঁড়ায়?

রাসেল: মাসে আট হাজার টাকা খরচ করে। আয় শূন্য। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

জাহিদ: মাসে কলেজের খরচ প্রায় শূন্য (বাড়ি থেকে পড়ছে)। আয় তিন হাজার। ফিজিক্স পড়ছে, ফিজিক্স পড়াচ্ছে, আর কোডিং শিখছে।

মাসিক নিট পার্থক্য: এগারো হাজার টাকা। রাসেলের পরিবার থেকে আট হাজার বের হচ্ছে, জাহিদের পরিবারে তিন হাজার ঢুকছে।

কিন্তু এই হিসাব অসম্পূর্ণ। কারণ রাসেল যেটা পাচ্ছে সেটা একটা RUET-র ডিগ্রি, যেটার বাজারমূল্য আছে। চার বছর পরে রাসেল চাকরি পাবে, বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা বেতনে। জাহিদের NU-র ফিজিক্সের ডিগ্রির বাজারমূল্য কত? কেউ জানে না। কারণ বাজারে এই ডিগ্রির চাহিদাই নেই।

তাহলে কে ভালো বিনিয়োগ করছে?

উত্তরটা সোজা না। উত্তরটা সোজা না বলেই এই গল্পটা বলার দরকার আছে।

রাসেল বিনিয়োগ করছে একটা নিশ্চিত পথে। জাহিদ বিনিয়োগ করছে একটা অনিশ্চিত পথে, কিন্তু সে একসাথে তিনটা জিনিস শিখছে: ফিজিক্স, পড়ানো, আর কোডিং। রাসেল একটা শিখছে: ইঞ্জিনিয়ারিং। কোনটা বেশি মূল্যবান, সেটা আজ বলা যায় না। পাঁচ বছর পরে বলা যাবে। দশ বছর পরে বলা যাবে। হয়তো কোনোদিনই বলা যাবে না, কারণ তুলনাটাই ভুল।

দুইটা আলাদা জীবন। দুইটা আলাদা পথ। কোনোটা "সঠিক" না, কোনোটা "ভুল" না। শুধু আলাদা।

রাত সাড়ে এগারোটা।

জাহিদের ঘুমানোর কথা। কিন্তু আজ ঘুম আসছে না। কারণ সে একটা জিনিস বানানোর চেষ্টা করছে। পাইথনে একটা ক্যালকুলেটর।

সিম্পল ক্যালকুলেটর। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। ইউজার ইনপুট নেবে, অপারেশন সিলেক্ট করবে, রেজাল্ট দেখাবে।

কোডটা কাজ করছে না।

সমস্যা হলো ইনপুট। ইউজার যখন সংখ্যা দেয়, পাইথন সেটাকে স্ট্রিং হিসেবে নিচ্ছে। স্ট্রিং দিয়ে যোগ করলে concatenation হয়, অ্যাডিশন না। "5" + "3" = "53", 8 না।

জাহিদ বিশ মিনিট ধরে এই বাগ খুঁজছে। কোড ঠিক আছে মনে হচ্ছে। কিন্তু আউটপুট ভুল আসছে।

তারপর গুগল করল। "python input returns string"। প্রথম রেজাল্টেই উত্তর পেল। int() দিয়ে কনভার্ট করতে হবে।

একটা লাইন বদলাল। int(input()) লিখল। রান করল।

5 + 3 = 8।

কাজ করছে।

জাহিদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কালো টার্মিনালে সাদা লেখায় "8" লেখা। এটুকুই। কোনো গ্রাফিক্স নেই, কোনো বাটন নেই, কোনো রং নেই। শুধু একটা সংখ্যা। ঠিক সংখ্যা।

সে স্ক্রিনশট নিল। ফোনে সেভ করল। কাউকে দেখাল না। কাকে দেখাবে? মা বুঝবেন না, বাবা বুঝবেন না, মিম বুঝবে কিন্তু গুরুত্ব দেবে না। নাহিদকে দেখাতে পারে, কিন্তু নাহিদ হেসে বলবে, "এটা তো বেসিক।"

হ্যাঁ, এটা বেসিক। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ প্রোগ্রাম। যেকোনো টিউটোরিয়ালের প্রথম প্রজেক্ট। লাখ লাখ মানুষ এটা বানিয়েছে।

কিন্তু জাহিদ বানিয়েছে। জাহিদ নিজের হাতে, নিজের মাথায়, নিজের সময় দিয়ে একটা জিনিস বানিয়েছে যেটা কাজ করে। কিছু একটা ইনপুট দিলে সঠিক আউটপুট দেয়। এটুকু।

এটুকু ছোট। কিন্তু এটুকু আসল।

একদিন এই স্ক্রিনশটটা দেখে হাসি পাবে। একদিন যখন সে আরো বড় কিছু বানাবে, তখন এই ক্যালকুলেটরটা মনে করে ভাববে, এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। এই রাত সাড়ে এগারোটায়। এই পুরনো ডেস্কটপে। এই ভাঙা চেয়ারে বসে।

কিন্তু সেটা ভবিষ্যতের কথা। এখন রাত বারোটা বাজছে। ঘুমাতে হবে। সকাল ছয়টায় উঠতে হবে। আবার কোডিং, আবার কলেজ, আবার টিউশনি।

জাহিদ কম্পিউটার বন্ধ করল। বিছানায় গেল। বালিশে মাথা রাখল।

ঘুম আসার আগে একটা ভাবনা মাথায় এলো। আজ সে তিনটা কাজ করেছে: ফিজিক্স পড়েছে, ফিজিক্স পড়িয়েছে, আর একটা ক্যালকুলেটর বানিয়েছে। তিনটার কোনোটাই বড় কোনো কাজ না। কিন্তু তিনটা মিলিয়ে একটা দিন হয়েছে যেটা নষ্ট হয়নি।

এটুকুই যথেষ্ট। আপাতত।