ইন্টারনেটে ইঞ্জিনিয়ার

ডিগ্রি নেই, কিন্তু কাজ আছে, আর কাজই শেষ কথা

পর্ব ২৫ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত সাড়ে এগারোটা। টিউশনি শেষ করে জাহিদ ঘরে ফিরেছে। দুই ছাত্রকে পদার্থবিদ্যা পড়িয়ে এসেছে। আজকের বিষয় ছিল তড়িৎচুম্বকত্ব। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ বোঝাতে গিয়ে নিজেই আবার বুঝেছে। পড়ানো মানে দুইবার শেখা।

ভাত খেয়ে বিছানায় বসল। ফোন হাতে নিল। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত, এই দেড় ঘণ্টা জাহিদের নিজের সময়। বাকি পুরো দিন কলেজের, টিউশনির, পরিবারের। এই দেড় ঘণ্টা কোডিং শেখার।

আজ Python-এর list comprehension শিখবে। গতকাল loop শিখেছে। তার আগে variable, function, conditional। ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। YouTube-এ একটা চ্যানেল পেয়েছে, বাংলায় Python শেখায়। দেখে দেখে কোড লেখে। ভুল হয়। আবার লেখে। তারপর একসময় কাজ করে।

কাজ করলে একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়। পদার্থবিদ্যার সমস্যা খাতায় থাকে। কোডের সমস্যা সমাধান হলে স্ক্রিনে কিছু একটা দেখা যায়। জীবন্ত কিছু।

ফোনে কোড লেখা কষ্টকর। স্ক্রিন ছোট, কীবোর্ড আরো ছোট। bracket, colon খুঁজে খুঁজে টাইপ করতে হয়। একটা সাধারণ for loop লিখতে দুই মিনিট লাগে। ল্যাপটপে ত্রিশ সেকেন্ড লাগত।

কিন্তু ল্যাপটপ নেই। রাকিব ভাইয়ের পুরনো ল্যাপটপটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে গত মাসে। মাদারবোর্ড গেছে। ঠিক করতে সাত-আট হাজার। সেই টাকা নেই।

তাই ফোনে। Termux নামে একটা app পেয়েছে, ফোনেই Python চলে। সমস্যা আছে, কিন্তু বিকল্প নেই।

আজ রাতে ভিডিওটার comment section-এ কেউ একজন লিখেছে: "আমি NU-তে হিসাববিজ্ঞান পড়ি। Python শিখে এখন data entry-র কাজ করি Upwork-এ। মাসে ২০-২৫ হাজার আয়।"

জাহিদ থামল। লাইনটা আবার পড়ল।

NU-তে পড়ে। মানে তার মতো। বাবার CNG থেকে আয় পনেরো হাজার। এই ছেলেটা Python শিখে বাবার চেয়ে বেশি আয় করছে?

জাহিদ comment-টাতে reply দিল: "ভাই, কতদিন লেগেছে শিখতে?"

উত্তর কাল আসবে।

পরদিন সকালে উত্তর এসেছে।

"৮ মাস। প্রথম ৪ মাস শুধু শিখেছি। পরের ৪ মাসে কাজ পেতে শুরু করেছি। প্রথম কাজ ছিল ৫ ডলারের। এখন ঘণ্টায় ৫ ডলার রেট।"

জাহিদ হিসাব করল। ঘণ্টায় পাঁচ ডলার মানে প্রায় ছয়শো টাকা। দিনে চার ঘণ্টা কাজ করলে আড়াই হাজার। মাসে বিশ দিন কাজ করলে পঞ্চাশ হাজার।

সংখ্যাটা অবাস্তব লাগল। কিন্তু YouTube comment-এ মিথ্যা বলে কী লাভ?

আট মাস। সে যদি আপ্রাণ চেষ্টা করে, আগামী আট মাসে একটা আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে একটা। এই সময়টা তার আছে।

কলেজে ক্লাসের ফাঁকে জাহিদ নাহিদের সাথে দেখা করল।

নাহিদ জাহিদের ক্লাসমেট। কিন্তু ক্লাসে কম আসে। সপ্তাহে দুই-তিনদিন। বাকি দিন কী করে জাহিদ জানত না। আজ জিজ্ঞেস করল।

"তুই ক্লাসে আসিস না কেন?"

নাহিদ হাসল। "কাজ করি। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। ফ্রিল্যান্সিং।"

জাহিদ অবাক হলো। দেড় বছর চেনে, কখনো শোনেনি।

"কত আয় হয়?"

"গত মাসে পঁয়তাল্লিশ হাজার। তবে প্রতি মাসে এত হয় না। গড়ে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ।"

পঁয়তাল্লিশ হাজার। নাহিদ NU-তে Physics পড়ে। কোনো engineering university-তে পড়েনি। কোনো ডিপ্লোমা নেই। শুধু কাজ জানে।

"কবে থেকে শিখেছিস?"

"ইন্টারের পর থেকে। দুই বছরের বেশি। প্রথমে HTML, CSS। তারপর JavaScript। তারপর React। এখন Node.js শিখছি।"

"কোথায় শিখেছিস?"

"YouTube। আর Programming Hero-তে একটা কোর্স। ছয় মাসের। চার হাজার টাকা। বাকি সব ফ্রি।"

নাহিদ ফোন বের করে Upwork profile দেখাল।

Web Developer। Rating 4.9। ঘণ্টায় রেট পনেরো ডলার।

পনেরো ডলার মানে প্রায় আঠারোশো টাকা। ঘণ্টায়।

জাহিদের বাবা সারাদিন CNG চালিয়ে গ্যাস-ভাড়া বাদে হাতে পান আড়াইশো-তিনশো। বারো-তেরো ঘণ্টায়। ঘণ্টায় বিশ টাকা।

নাহিদ ঘণ্টায় আঠারোশো। বাবা ঘণ্টায় বিশ।

এই তুলনা করা উচিত না। জাহিদ জানে এটা অন্যায়। বাবা শারীরিক পরিশ্রম করেন, নাহিদ বুদ্ধির কাজ করে। বাজার আলাদা, চাহিদা আলাদা। কিন্তু তুলনাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না।

নাহিদ বলল, "আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে, তুই কি engineer? আমি বলি, না। তারপর বলে, তাহলে এই কাজ কীভাবে করিস? আমি বলি, শিখে করি।"

একটু থেমে বলল, "আমি কোনো engineering university-তে পড়িনি। কিন্তু আমি engineer-এর কাজ করি। ক্লায়েন্ট ডিগ্রি জিজ্ঞেস করে না। পোর্টফোলিও দেখে। কাজ ভালো হলে পয়সা দেয়। খারাপ হলে দেয় না। এটাই নিয়ম।"

সেদিন রাতে জাহিদ ইন্টারনেটে খুঁজল।

একজন ছেলে, সিলেটের একটা কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স, এখন সিঙ্গাপুরের কোম্পানিতে remote-এ কাজ করে। মাসিক আয় দেড় লাখ টাকা। একজন মেয়ে, NU-তে English পড়ত, এখন UI/UX designer। মাসে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার। একজন কোনো ডিগ্রিই শেষ করেনি, এখন mobile app developer।

আবার উল্টো গল্পও পেল। একজন BUET-এর CSE graduate। চার বছর পড়েছে। কিন্তু coding-এ আগ্রহ ছিল না, theory পড়ে পাস করেছে। এখন bank-এ IT officer। বেতন পঁচিশ হাজার।

BUET-এ পড়লেই ভালো developer হওয়া যায়? দেখা যাচ্ছে, না। NU-তে পড়লেই developer হওয়া যায় না? দেখা যাচ্ছে, যায়।

তাহলে engineering কী? একটা ডিগ্রির নাম, নাকি একটা কাজের নাম?

ডিগ্রি একটা দরজা খুলে দেয়। কিন্তু দরজার ভেতরে কী করবে, সেটা নির্ভর করে skill-এর ওপর। দরজা ছাড়াও ঢোকা যায়, যদি জানালা দিয়ে ঢুকতে পারো। আর দরজা দিয়ে ঢুকেও বসে থাকা যায়, যদি কিছু করতে না জানো।

পরের সপ্তাহে জাহিদ একটা সিদ্ধান্ত নিল। অনলাইনে একটা ফ্রি coding bootcamp-এ ভর্তি হলো। Ostad-এর introductory course। HTML, CSS, JavaScript। ছয় সপ্তাহের।

প্রথম সপ্তাহে HTML। সহজ। ট্যাগ লেখো, ব্রাউজারে দেখো। মনে হলো একটা বাড়ির কাঠামো বানাচ্ছে। দেয়াল, দরজা, জানালা। কিন্তু রং নেই।

দ্বিতীয় সপ্তাহে CSS। রং আর সাজসজ্জা। বাড়িটা সুন্দর হতে শুরু করল।

তৃতীয় সপ্তাহে JavaScript। এটা কঠিন। Variable, function, event, DOM manipulation। মাথা ঘুরল। কিন্তু Python শেখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। loop, condition, function, concept হিসেবে চেনা। শুধু syntax আলাদা।

চতুর্থ সপ্তাহে assignment: একটা ওয়েবসাইট বানাও। জাহিদ বানাল। নাহিদ দেখে বলল, "ভালো শুরু। এখন কারো জন্য একটা বানা। তোর পাড়ায় কি কোনো দোকান আছে?"

পাড়ায় আজিম চাচার মুদি দোকান। তিরিশ বছর ধরে চলছে। কোনো ওয়েবসাইট নেই।

জাহিদ আজিম চাচার কাছে গেল।

"চাচা, আপনার দোকানের জন্য একটা ওয়েবসাইট বানাতে চাই। দোকানের নাম, ঠিকানা, কী পাওয়া যায়, সব একটা পেজে। Google-এ search করলে পাবে।"

"কত লাগবে?"

"দুই হাজার টাকা।"

"করো দেখি। ভালো না হলে পয়সা দিমু না।"

তিন দিন লাগল। প্রথম দিন কাগজে design। দ্বিতীয় দিন HTML-CSS দিয়ে বানাল, রং দিল সবুজ আর সাদা, সাইনবোর্ডের সাথে মিলিয়ে। তৃতীয় দিন ছোটখাটো সমস্যা ঠিক করল। ফোন নম্বরে ক্লিক করলে সরাসরি কল যায়, এটা যোগ করল। Google Maps-এর link দিল।

আজিম চাচা ফোনে দেখলেন। নিজের দোকানের নাম দেখে হাসলেন। "সুন্দর হইছে তো। কিন্তু অন্যরা কীভাবে দেখবে?"

সেই রাতে GitHub Pages-এ হোস্ট করল। নাহিদ শিখিয়ে দিয়েছিল। লিংক পাঠাল।

পরদিন আজিম চাচা দুই হাজার টাকা দিলেন।

দুই হাজার টাকা। তিন দিনের কাজ। মোট সাত-আট ঘণ্টা। ঘণ্টায় আড়াইশো টাকা।

বাবা ঘণ্টায় বিশ টাকা আয় করেন।

জাহিদ নিজেকে থামাল। বাবা প্রতিদিন করেন, বছরের পর বছর। এটা একবারের আয়। সরাসরি তুলনা চলে না। কিন্তু সম্ভাবনাটা দেখল।

সন্ধ্যায় মাকে টাকাটা দিল।

মা জিজ্ঞেস করলেন, "কোথায় পেলি?"

"আজিম চাচার দোকানের জন্য ওয়েবসাইট বানিয়ে দিয়েছি।"

মা বুঝলেন না ওয়েবসাইট কী। কিন্তু টাকাটা হাতে নিলেন। চোখে গর্বের ভাব না, স্বস্তির ভাব। ছেলে কিছু একটা পারে। টিউশনির তিন হাজারের বাইরে আরেকটা পথ আছে।

কিন্তু জাহিদ জানে এটা entry-level কাজ। সাধারণ HTML-CSS ওয়েবসাইট বানাতে পারে লাখ লাখ মানুষ। আসল টাকা অন্য জায়গায়। React, Node.js, database। এগুলো শিখতে এক-দুই বছর লাগবে।

BUET-RUET-এ যারা CSE পড়ছে, তারা structured course-এ শিখছে। ল্যাবে বসে, প্রফেসরের কাছে। জাহিদ শিখছে YouTube-এ। রাত সাড়ে এগারোটায়। ফোনের পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনে।

একই গন্তব্য। আলাদা যানবাহন। তারা বসে আছে air-conditioned বাসে। জাহিদ হাঁটছে।

হাঁটলেও পৌঁছানো যায়। দেরিতে পৌঁছায়। কিন্তু পৌঁছায়।

১০

শুক্রবার বিকেলে কলেজ লাইব্রেরিতে জাহিদ কোড লিখছিল। ফোনে। কোণার চেয়ারে, কানে হেডফোন। JavaScript-এর DOM manipulation।

পেছন থেকে গলা শুনল। "কী করছো?"

আবদুর রহমান স্যার। পদার্থবিদ্যার প্রফেসর। বয়স ষাটের কাছাকাছি। ক্লাসে চক দিয়ে বোর্ডে লেখেন, PowerPoint ব্যবহার করেন না। কিন্তু পদার্থবিদ্যা বোঝান যেন গল্প বলছেন। জাহিদের প্রিয় শিক্ষক।

"কোডিং শিখছি, স্যার।"

স্যার চেয়ার টেনে পাশে বসলেন। "কেন শিখছো?"

জাহিদ সৎ উত্তর দিল। "আয়ের জন্য, স্যার। টিউশনিতে তিন হাজার পাই। আরেকটু বেশি আয় করতে চাই।"

স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "আয়ের জন্য শেখা ভালো। কিন্তু শুধু আয়ের জন্য শিখলে একটু কম শেখা হয়।"

"মানে?"

"তুমি Physics পড়ো। Physics হলো ভিত্তি। মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, সেটা Physics বলে। আর coding হলো হাতিয়ার। তুমি Physics-এর জ্ঞান দিয়ে সমস্যা চিনবে, আর coding দিয়ে সমস্যা সমাধান করবে। দুটো মিলিয়ে নাও।"

জাহিদ চুপ করে শুনল।

"শুধু ওয়েবসাইট বানানো শিখলে তুমি হাজার হাজার developer-এর একজন হবে। কিন্তু Physics জানা developer? সেটা অন্য জিনিস। Data analysis, simulation, scientific computing। এগুলো কম মানুষ পারে। চাহিদা বেশি।"

"কিন্তু স্যার, Physics-এর চাকরি তো কম।"

স্যার হাসলেন। "চাকরি কম। কিন্তু কাজ কম না। চাকরি আর কাজ এক জিনিস না, জাহিদ।"

১১

সেদিন রাতে জাহিদ বিছানায় শুয়ে ভাবল।

স্যার যা বলেছেন, সেটাই সবচেয়ে ভালো পরামর্শ সে এখন পর্যন্ত পেয়েছে। Physics ছেড়ে দিও না, coding-ও ছেড়ে দিও না। দুটো মেলাও।

কীভাবে মেলাবে সে এখনো জানে না। এখন সে HTML-CSS শিখছে, দোকানের ওয়েবসাইট বানাচ্ছে। এটা Physics না। কিন্তু এটা শুরু। হাঁটতে শিখছে। দৌড়ানো পরে।

ফোনের নোটপ্যাড খুলল। লিখল:

"ইঞ্জিনিয়ারিং কি একটা ডিগ্রির নাম, নাকি একটা কাজের নাম?"

নিচে লিখল:

"ডিগ্রি একটা দরজা। কাজ হলো ঘরের ভেতরে যা করো।"

তারপর আরেকটা লাইন:

"পদার্থবিদ্যা হলো ভিত্তি। কোডিং হলো হাতিয়ার। দুটো মিলিয়ে নাও।"

ফোন বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল।

সে শুধু developer হবে না। সে হবে Physics জানা developer। অথবা coding জানা physicist। নামটা গুরুত্বপূর্ণ না। কাজটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাইরে রাস্তায় একটা CNG-র আওয়াজ। কেউ দেরি করে ফিরছে। মিটার ঘুরছে।

জাহিদের মিটারও ঘুরছে। অন্যরকম মিটার। দেখা যায় না, কিন্তু এগোচ্ছে। প্রতিটা লাইন কোড, প্রতিটা ভুল আর সংশোধন, সব যোগ হচ্ছে। ধীরে, কিন্তু যোগ হচ্ছে।

দুই হাজার টাকা। তিন দিনের কাজ। এটা শুরু।

শেষ না।