সফটওয়্যার vs সিভিল

সবাই কোড লিখতে চায়, কেউ সেতু বানাতে চায় না

পর্ব ২৬ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

এক বছর হয়ে গেছে।

জাহিদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে। রাসেল রুয়েটে ইইই। ফারুক পলিটেকনিকে ইলেকট্রিক্যাল। তিনজন তিন জায়গায়, তিন রাস্তায়। কিন্তু গ্রুপ চ্যাটটা এখনও চালু।

শুক্রবার রাতে তিনজন একসাথে কথা বলে। ভয়েস কলে। এটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। কে শুরু করেছিল মনে নেই, কিন্তু এখন প্রতি শুক্রবার রাত দশটায় কেউ না কেউ কল দেয়।

আজও দিয়েছে। রাসেল।

"একটা খবর আছে।" রাসেলের গলায় একটা অদ্ভুত সুর। হাসি না, বিরক্তি না, কিছু একটা যেটার নাম জাহিদ ঠিক বলতে পারছে না।

"বল।"

"আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, শাওন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। চান্স পেয়েছিল সব ডিপার্টমেন্টে। সিভিল নিয়েছে কারণ সে ব্রিজ ডিজাইন করতে চায়।"

"তো?"

"আজ ক্লাসের পর ক্যান্টিনে বসে বলল, 'ভাই আমি ভুল করেছি। সিভিলে কেউ থাকে না। সবাই সফটওয়্যারে যায়।'"

জাহিদ চুপ করে রইল।

ফারুক বলল, "মানে?"

রাসেল বলল, "মানে হচ্ছে, রুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্টের গত পাঁচ বছরের পাসড আউট স্টুডেন্ট ট্র্যাক করেছে শাওন। ফেসবুকে, লিংকডইনে। পঞ্চাশজনের মধ্যে বত্রিশজন এখন সফটওয়্যার কোম্পানিতে।"

"সিভিল পড়ে?"

"সিভিল পড়ে। স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস পড়ে, সয়েল মেকানিক্স পড়ে, কংক্রিট ডিজাইন পড়ে। তারপর চাকরি করে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে। কারণ সফটওয়্যারে বেতন বেশি।"

"কত বেশি?"

রাসেল একটু থামল। তারপর বলল, "শুরুতে সিভিলে পনেরো থেকে বিশ হাজার। সফটওয়্যারে পঁচিশ থেকে চল্লিশ। পাঁচ বছর পর ফারাকটা আরও বাড়ে।"

রাসেলের কথাটা জাহিদের মাথায় আটকে গেল।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি। এটা শুধু শাওনের গল্প না। এটা বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সবচেয়ে বড় আয়রনি।

জাহিদ ফোনে খুঁজতে শুরু করল। bdfacts.org-এ ঢুকল। সার্চ করল। ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ার। বেতন। কর্মসংস্থান।

ডেটা পেল।

চার্টটার দিকে জাহিদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পাঁচটা ইঞ্জিনিয়ারিং শাখা। তিনটা সময়বিন্দু। শুরু, পাঁচ বছর, দশ বছর।

সিএসই সবার ওপরে। শুরুতে ত্রিশ থেকে পঁচিশ হাজার, দশ বছরে দেড় লাখ পর্যন্ত। তারপর ইইই, যেটা মাঝামাঝি। সিভিল, মেকানিক্যাল, টেক্সটাইল, এরা নিচে গোল হয়ে আছে। শুরুর বেতন পনেরো থেকে বাইশ। দশ বছরেও ষাট-সত্তর হাজারের বেশি যায় না। যদি না মধ্যপ্রাচ্যে যাও।

সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। কিন্তু সংখ্যার পেছনের গল্পটা আরও পরিষ্কার।

বাজার বলছে: সফটওয়্যার শিখো। বাকি সব গৌণ।

রাসেল বলল, "আমাদের ইইই ডিপার্টমেন্টেও একই হাল। সিনিয়ররা বলে, ভাই ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ জীবনে একবারও কাজে লাগবে না। পাইথন শিখো। মেশিন লার্নিং শিখো। ইইই পড়ে সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করি।"

"তাহলে ইইই পড়ো কেন?"

"সেটাই তো প্রশ্ন।" রাসেলের গলা নিচু হয়ে গেল। "ভর্তি পরীক্ষায় সিএসই-তে চান্স পাইনি। ইইই পেয়েছি। এখন ইইই-র সিলেবাস পড়ি, রাতে নিজে নিজে সফটওয়্যার শিখি। দুইটা জিনিস একসাথে চালাচ্ছি।"

জাহিদের মনে হলো, এটা শুধু রাসেলের সমস্যা না। পুরো দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার একটা গভীর ফাটল এখানে।

ফারুক চুপচাপ শুনছিল। একটু পর বলল, "আমাদের পলিটেকনিকেও সবাই একই কথা বলে।"

"কী কথা?"

"সিভিলে টাকা নেই। সফটওয়্যারে যা।"

ফারুকের গলায় কোনো উত্তেজনা নেই। একটা শান্ত বিরক্তি আছে। যেন এই কথা সে শতবার শুনেছে।

"আমাদের ব্যাচে ইলেকট্রিক্যাল-এ চল্লিশজন। এর মধ্যে পনেরোজন ইতিমধ্যে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কোর্স করছে ইউটিউবে। তারা ডিপ্লোমা শেষ করে সফটওয়্যারে ঢুকবে। ইলেকট্রিক্যাল-এর কিছুই করবে না।"

"তুই?"

ফারুক একটু চুপ করল। তারপর বলল, "আমি পারি না।"

"মানে?"

"কম্পিউটারের সামনে আট ঘণ্টা বসে থাকতে পারি না। আমি হাত দিয়ে কাজ করি। তার টানি, সার্কিট বানাই, প্লাম্বিং করি, ওয়্যারিং করি। আমার হাত চায় কিছু ধরতে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মাথা ধরে।"

জাহিদ কিছু বলল না।

ফারুক বলল, "গতমাসে আমাদের হোস্টেলের ইলেকট্রিক লাইনে শর্ট সার্কিট হয়েছিল। পুরো তিন তলা অন্ধকার। ওয়্যারম্যান আসতে দুই দিন লাগবে বলল। আমি নিজে ঠিক করলাম। দুই ঘণ্টায়। মেইন প্যানেল খুলে, ফল্ট লাইন বের করে, নতুন তার দিয়ে। সবাই অবাক। কিন্তু জানিস, পরে কী হলো?"

"কী?"

"কেউ বলল না, ভালো কাজ করেছিস। বরং রুমমেট বলল, এসব কাজ করে কত পাবি? সফটওয়্যার শিখলে মাসে পঞ্চাশ হাজার।"

ফারুকের গলা ভাঙল না। কিন্তু একটা ক্লান্তি ছিল। যে ক্লান্তি আসে যখন কেউ তোমার কাজকে কাজ হিসেবে দেখে না।

জাহিদ ফোনটা কানে রেখে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে অন্ধকার। শীতের রাত।

সে ইঞ্জিনিয়ার না। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র যে কোডিং শিখছে। দুই দুনিয়ার কোনোটাতেই পুরোপুরি নেই। কিন্তু এই অবস্থান থেকে সে একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছে যেটা ভেতরে থাকলে হয়তো দেখত না।

ইঞ্জিনিয়ারিং মানে একটা বিশাল জগৎ। সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, কেমিক্যাল, টেক্সটাইল। প্রতিটা শাখা আলাদা। কিন্তু সমাজ পুরো জিনিসটাকে এক করে ফেলেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং মানে এখন সফটওয়্যার। বাকি সব দ্বিতীয় শ্রেণি।

ফলাফল? শাওন ব্রিজ ডিজাইন করতে চায়, কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করছে কেন সিভিল নিয়েছে। রাসেল ইইই পড়ে রাতে পাইথন শিখছে। ফারুকের হাতে দক্ষতা আছে, কিন্তু সমাজ সেটাকে মূল্য দিচ্ছে না।

আর ফলাফল হলো একটা দেশ, যেখানে সবাই কোড লিখতে চায়, কেউ সেতু বানাতে চায় না।

"একটা কথা বলি?" জাহিদ বলল।

"বল।"

"পদ্মা রেলসেতুর কথা শুনেছিস? ঢাকা মেট্রোরেল? পায়রা বন্দর? কর্ণফুলী টানেল? এগুলো বানাচ্ছে কারা?"

রাসেল বলল, "চায়না।"

"এক্সাক্টলি।" জাহিদের গলায় একটা তিক্ততা এলো। "বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট বানাচ্ছে বিদেশি ইঞ্জিনিয়াররা। কারণ আমাদের দেশে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের অভাব।"

"অভাব? BUET থেকে প্রতি বছর সিভিল বের হয়।"

"বের হয়। তারপর সফটওয়্যার কোম্পানিতে ঢোকে। অথবা মধ্যপ্রাচ্যে যায়। দেশে থাকে কজন? দেশের মেগা প্রজেক্টগুলোতে কত জন বাংলাদেশি সিনিয়র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছে?"

চুপ।

জাহিদ বলল, "আমি একটা ডেটা দেখেছিলাম। বাংলাদেশের চলমান এবং পরিকল্পিত মেগা প্রজেক্টগুলোর জন্য আগামী দশ বছরে এক লাখ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দরকার। রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রো, বন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে। কিন্তু প্রতি বছর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্র্যাজুয়েশন করে যতজন, তার অর্ধেকও এই সেক্টরে কাজ করে না।"

ফারুক বলল, "কারণ বেতন কম।"

"হ্যাঁ। বেতন কম। কিন্তু বেতন কম কেন? চাহিদা তো আছে। কাজ তো আছে।"

কেউ উত্তর দিল না। উত্তরটা জটিল। সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, ঠিকাদারি ব্যবস্থার গলদ, প্রকৌশলীদের মর্যাদার অভাব। চাহিদা আছে, কিন্তু সেই চাহিদা ভালো বেতনে রূপান্তরিত হচ্ছে না। ভালো বেতন নেই বলে ভালো ছেলেমেয়ে আসে না। ভালো ছেলেমেয়ে না আসায় সেক্টরের মান পড়ছে। দুষ্টচক্র।

রাসেল বলল, "কিন্তু সফটওয়্যারে বেতন বেশি কেন? সেটা তো একটা কারণ আছে।"

জাহিদ বলল, "আছে। কারণটা সহজ। সফটওয়্যার এক্সপোর্টেবল। তুই ঢাকায় বসে আমেরিকার ক্লায়েন্টের কাজ করতে পারিস। ডলারে ইনকাম। কিন্তু একটা ব্রিজ তুই রিমোটলি বানাতে পারবি না। ব্রিজ বানাতে হলে মাটিতে দাঁড়াতে হবে। কংক্রিট ঢালতে হবে। রোদে পুড়তে হবে।"

"তাহলে সিভিলে বেতন কম থাকবেই?"

"না। থাকা উচিত না। কারণ ব্রিজ ছাড়া দেশ চলে না। রাস্তা ছাড়া অর্থনীতি চলে না। কিন্তু বাজার সেভাবে ভাবে না। বাজার ভাবে: এই মুহূর্তে কোন স্কিলে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে?"

ফারুক বলল, "বাজার ভুল ভাবে।"

তিনজন চুপ করল।

ফারুক খুব কম এরকম কথা বলে। সে সাধারণত শোনে, মাথা নাড়ে। কিন্তু আজ সে বলল, বাজার ভুল ভাবে।

যেদিন ঘরের বিদ্যুৎ চলে যায়, যেদিন রাস্তা ভাঙে, যেদিন পানির পাইপ ফাটে, সেদিন কোনো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কাজে আসে না। সেদিন দরকার হয় ফারুকের মতো একটা ছেলে, যে হাত দিয়ে জিনিস ঠিক করতে পারে।

কিন্তু সেই ছেলেটার বেতন পনেরো হাজার।

জাহিদ ফোনের নোটপ্যাডে কিছু লিখতে শুরু করল। কথা বলতে বলতে। এটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। কিছু শুনলে, কিছু ভাবলে, লিখে রাখে।

সে লিখল:

"ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আইডেন্টিটি সমস্যা: - সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বললে মানুষ ভাবে: 'কোডিং জানে না।' - মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বললে মানুষ ভাবে: 'সফটওয়্যারে যেতে পারেনি।' - ইইই বললে মানুষ ভাবে: 'সিএসই-তে চান্স পায়নি।' - শুধু সিএসই বললে মানুষ মাথা নাড়ে।"

"আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার" বলাটা আগে গর্বের ছিল। এখন এটা বলা মানে একটা অব্যক্ত ক্ষমা চাওয়া: "আমি কোডিং পারি না, তাই।" কিন্তু একটা বিশতলা ভবনের ফাউন্ডেশন ডিজাইন করা কি কম জটিল কোনো ওয়েব অ্যাপ বানানোর চেয়ে? জাহিদ জানে, উত্তর হলো না। কিন্তু কঠিন হওয়া আর ভালো বেতন পাওয়া এক জিনিস না। বাজার কাঠিন্য দিয়ে দাম ঠিক করে না। বাজার ঠিক করে চাহিদা আর সরবরাহ দিয়ে। সফটওয়্যারের চাহিদা বৈশ্বিক, সিভিলের চাহিদা স্থানীয়।

রাসেল বলল, "আরেকটা জিনিস আছে যেটা কেউ বলে না।"

"কী?"

"সিভিলে যদি মধ্যপ্রাচ্যে যাও, বেতন ভালো। আশি থেকে একশো বিশ হাজার। কিন্তু সেটার একটা দাম আছে। পরিবার থেকে দূরে। চুক্তিভিত্তিক কাজ। কবে ফেরত আসবে জানো না। আর সেখানেও বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের অবস্থান কী? বেশিরভাগ সুপারভাইজার লেভেলে। প্রজেক্ট ম্যানেজার বা ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হয় কজন?"

ফারুক বলল, "সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার।"

এটা ফারুকের নিজের ভবিষ্যৎ। পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা করে সরকারি চাকরিতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। বেতন শুরুতে ষোলো হাজার। পদোন্নতি ধীর। কিন্তু চাকরিটা স্থায়ী। পেনশন আছে। এটুকুই।

ফারুক বলল, "আমার বাবা বলেন, সরকারি চাকরি পেলে জীবন সেট। আমি জানি বেতন কম। কিন্তু আমি জানি আমি কী পারি। আমি তার ধরতে পারি। সার্কিট বোর্ড পড়তে পারি। একটা মোটর খুলে আবার জোড়া লাগাতে পারি। এটা আমার জিনিস।"

একটু থেমে বলল, "আমাকে সবাই বলে সফটওয়্যার শিখতে। কিন্তু আমি যদি আমার জিনিস ছেড়ে অন্যের জিনিস ধরি, তাহলে আমি কে?"

কলটা শেষ হলো রাত বারোটায়।

জাহিদ বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরনো অভ্যাস।

তিনজনের কথা ভাবছে। রাসেল বাজারের সাথে তাল মেলাচ্ছে, ইইই পড়ে সফটওয়্যার শিখছে। বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু রাসেল কি কখনো পাওয়ার সিস্টেম ডিজাইন করবে? নাকি তার ইইই ডিগ্রিটা দেয়ালে ঝুলবে? ফারুক জানে সে কে। হাতের মানুষ। কিন্তু সমাজ হাতের কাজকে মাথার কাজের চেয়ে কম দামি মনে করে। প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, এদের ছাড়া সভ্যতা চলে না। কিন্তু এদের বেতন সবসময় কম।

আর জাহিদ? দুই দুনিয়ার মাঝখানে। ইঞ্জিনিয়ার না, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাটলটা দেখতে পাচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে দেখা।

ফারুকের কথাটা মাথায় ঘুরছে। "আমি যদি আমার জিনিস ছেড়ে অন্যের জিনিস ধরি, তাহলে আমি কে?" এটা শুধু ফারুকের প্রশ্ন না। এটা প্রতিটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের প্রশ্ন যে সফটওয়্যারে সুইচ করেছে। তারা কি সত্যিই সফটওয়্যার ভালোবাসে? নাকি বাজার বাধ্য করেছে?

ফারুক বাধ্য হচ্ছে না। ফারুকের বেতন কম হবে। সামাজিক মর্যাদা কম হবে। কিন্তু ফারুক নিজেকে চেনে।

এটা কি যথেষ্ট? জাহিদ জানে না। কিন্তু সে জানে, নিজেকে না চেনা আরও খারাপ।

১০

জাহিদ ফোন তুলল। নোটপ্যাডে লিখল:

"বাংলাদেশ কি শুধু কোডার তৈরি করবে, নাকি ইঞ্জিনিয়ার?

কোডার অনেক দেশে আছে। ভারত, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম। কিন্তু নিজের সেতু বানানোর মতো ইঞ্জিনিয়ার কই? নিজের মেট্রো চালানোর মতো? নিজের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করার মতো?

সফটওয়্যার প্রিমিয়ামটা বাস্তব। কিন্তু এটা মনোকালচার তৈরি করছে। কৃষিতে যেমন একটাই ফসল ফলালে মাটি নষ্ট হয়, তেমনি একটাই শাখায় সবাই গেলে ইঞ্জিনিয়ারিং নষ্ট হয়।

একশো হাজার সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দরকার। মেগা প্রজেক্ট আসছে। কিন্তু কেউ সেই ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না।"

জাহিদ ফোন রাখল। সে জানে, সে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এটা নীতিমালার কাজ, বাজারের কাজ, সমাজের মানসিকতার কাজ। কিন্তু সে এটুকু করতে পারে: দেখতে পারে। বুঝতে পারে। লিখে রাখতে পারে।

১১

ঘুমের আগে জাহিদ শেষ একটা জিনিস লিখল নোটপ্যাডে:

"সফটওয়্যার vs সিভিল, এটা আসলে সফটওয়্যার vs সিভিল না। এটা হলো: বাজার vs পরিচয়।

বাজার বলে: যেখানে টাকা, সেখানে যাও। পরিচয় বলে: তুমি যেটা, সেটাই থাকো।

দুটোই সত্য। দুটোই দরকার। কিন্তু যখন পুরো দেশ শুধু বাজারের কথা শোনে, তখন পরিচয় হারিয়ে যায়। আর পরিচয় হারালে দেশও হারায়।

কে বানাবে সেতু? কে বানাবে রাস্তা? কে ঠিক করবে বিদ্যুতের লাইন?

সবাই যদি কোড লেখে, তাহলে কে বানাবে সেই দেশ যেটার ওপর দাঁড়িয়ে কোড লেখা হবে?"

জাহিদ ফোন বন্ধ করল।

চোখ বন্ধ করল।

বাইরে শীতের বাতাস বইছে। কোথাও একটা ট্রেন চলে গেল। রেললাইনের শব্দ ক্ষণিকের জন্য ঘরে ঢুকল, তারপর মিলিয়ে গেল।

ট্রেনটা চলছে একটা রেললাইনের ওপর দিয়ে। সেই রেললাইন বানিয়েছে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তার নাম কেউ জানে না। তার বেতন কত ছিল কেউ জানে না। কিন্তু ট্রেনটা চলছে।

এটুকুই।

---

*পরবর্তী পর্ব: পর্ব ২৭।*