বন্ধু ফারুকের কথা

পর্ব ২৭ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

ফারুকের সাথে দেখা হলো শুক্রবারে।

জাহিদ ফোন করেছিল বুধবারে। ফারুক বলেছিল, "শুক্রবার আয়। পলিটেকনিকের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে, ওখানে বসি।" জাহিদ বলেছিল ঠিক আছে। ফারুক বলেছিল, "একটু দেরি হতে পারে, একটা কাজে আছি।" কী কাজ জিজ্ঞেস করেনি জাহিদ। ফারুক সবসময় কোনো না কোনো কাজে থাকে।

চায়ের দোকানটা পলিটেকনিকের গেটের ঠিক বাইরে। টিনের চাল। তিনটা বেঞ্চ। একটা স্টোভ। জাহিদ বসে আছে বিশ মিনিট। চা শেষ। আরেকটা চা নিলো।

ফারুক এলো বারোটার একটু পরে। সাইকেলে। পেছনে একটা ব্যাগ বাঁধা, ভেতরে ধাতব কিছু ঝনঝন করছে। সাইকেল থেকে নামলো, ব্যাগটা কাঁধে নিলো।

জাহিদ তাকিয়ে রইলো। এটা সেই ফারুক না।

মানে, ফারুকই। একই মুখ, একই চোখ। কিন্তু হাঁটাটা বদলেছে। আগে মাথা একটু নিচু করে হাঁটতো, যেভাবে মানুষ হাঁটে যখন নিজেদের সম্পর্কে নিশ্চিত না। এখন সোজা। কাঁধ টানটান। যেন জানে কোথায় যাচ্ছে।

"দেরি হয়ে গেলো," ফারুক বললো। বসলো। "একটা চা দেন।"

দোকানদার চা দিলো।

ফারুক চায়ে চুমুক দিলো। তারপর জাহিদের দিকে তাকালো। হাসলো। দাঁত বের করে। সেই পুরনো হাসি। সেটা বদলায়নি।

"কেমন আছিস?" ফারুক জিজ্ঞেস করলো।

"আছি। তুই কেমন?"

"ভালো।"

ফারুক "ভালো" বললো এমনভাবে যেভাবে মানুষ বলে যখন সত্যিই ভালো থাকে। বানানো "ভালো" না। খালি "ভালো" না। একটু ভারী "ভালো", যেটার ভেতরে কিছু আছে।

ফারুকের ব্যাগটা বেঞ্চের নিচে রাখলো সে। ব্যাগের জিপার একটু খোলা। ভেতরে প্লায়ার্স, স্ক্রু ড্রাইভার, তার, টেপ, একটা মাল্টিমিটার। জাহিদ চিনলো মাল্টিমিটারটা। ফিজিক্সের ল্যাবে দেখেছে। কিন্তু ফারুকেরটা অন্যরকম, মানে একই জিনিস, কিন্তু এটায় ব্যবহারের চিহ্ন আছে। স্ক্রিনের কোনায় একটু আঁচড়। ডায়ালে আঙুলের ময়লা। এটা কেউ চেনে, কেউ প্রতিদিন ধরে।

"পলিটেকনিক কেমন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করলো।

ফারুক একটু ভাবলো। চায়ে চুমুক দিলো।

"এক বছর হলো। প্রথম ছয় মাস কঠিন ছিলো। থিওরি বুঝতাম না। ম্যাথ দুর্বল, তুই তো জানিস। কিন্তু ওয়ার্কশপে ঢুকে সব বদলে গেলো।"

"মানে?"

"মানে, ক্লাসে যখন বলে ওহমের সূত্র, আমার মাথায় ঢোকে না। কিন্তু যখন একটা সার্কিট বোর্ডে মাল্টিমিটার ধরি, ভোল্টেজ মাপি, কারেন্ট মাপি, তখন বুঝি। হাতে ধরলে বুঝি। চোখে দেখলে বুঝি। কাগজে পড়লে বুঝি না।"

জাহিদ চুপ করে শুনলো। জাহিদের উল্টো। কাগজে পড়লে বোঝে। হাতে ধরলে ভুল করে। ল্যাবে যন্ত্রপাতি ধরতে ভয় পায়। ফিজিক্সের ল্যাবে প্রথম দিন ওসিলোস্কোপের নব ঘোরাতে গিয়ে ভুল করেছিলো, স্ক্রিনের ওয়েভ হারিয়ে গিয়েছিলো, স্যার বকা দিয়েছিলেন।

"এখন কী কী পারিস?" জাহিদ জিজ্ঞেস করলো।

ফারুক আঙুল গুনলো।

"বাড়ির ওয়্যারিং করতে পারি। পুরো বাড়ি। মেইন বোর্ড থেকে শুরু করে প্রতিটা রুমের সুইচ, সকেট, ফ্যান পয়েন্ট, লাইট পয়েন্ট। সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখে বুঝতে পারি। মোটর রিওয়াইন্ড করতে পারি, ছোট মোটর, পাম্পের মোটর, ফ্যানের মোটর। সোল্ডারিং পারি। পিসিবি সোল্ডার করতে পারি। ট্রান্সফর্মারের বেসিক কাজ পারি।"

ফারুক থামলো। তারপর বললো, "আর একটা জিনিস শিখেছি।"

"কী?"

"ভয় পাই না। বিদ্যুৎকে ভয় পাই না। আগে তার দেখলে ভয় লাগতো। এখন জানি কোন তার ধরা যায়, কোনটা ধরা যায় না। কোথায় কারেন্ট আছে, কোথায় নেই। ভয় পায় ওরা যারা জানে না। জানলে ভয় লাগে না।"

জাহিদ ভাবলো, এই কথাটা শুধু বিদ্যুতের জন্য সত্য না। সবকিছুর জন্য সত্য।

ফারুকের জিপিএ ৩.৮০। পলিটেকনিকের প্রথম বর্ষে। ক্লাসে দ্বিতীয়। প্রথম হতে পারতো, কিন্তু ইংরেজিতে কম পেয়েছে।

"ইংরেজি আমার শত্রু," ফারুক বললো। হাসলো। "কিন্তু সার্কিট ডায়াগ্রামে ইংরেজি লাগে না। তার চেনে না ভাষা।"

পলিটেকনিকের জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো না। জাহিদ জানে। ফারুকের কাছ থেকে শুনলো।

সকাল আটটায় ক্লাস শুরু। থিওরি ক্লাস দুটো। তারপর ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে হাতে কাজ। তার কাটা, তার জোড়া, সার্কিট বানানো, মোটর খোলা, মোটর জোড়া। হাত ময়লা হয়, নখের ভেতরে কালো জমে, গ্রিজের গন্ধ লাগে জামায়। ফারুকের হাতের দিকে তাকালো জাহিদ। হাতগুলো পাল্টে গেছে। আঙুলের ডগায় ছোট ছোট কাটা দাগ। তালুতে একটু শক্ত চামড়া। এগুলো কাজের চিহ্ন। বই পড়ার হাত এরকম হয় না।

"প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা হয়," ফারুক বললো। "থিওরি পরীক্ষার চেয়ে কঠিন। একটা সার্কিট দেয়, বানাও। সময় দেয় দুই ঘণ্টা। একটা ভুল কানেকশন দিলে পুরোটা বাদ। পরীক্ষক দাঁড়িয়ে দেখে। তোর হাত কাঁপলে বোঝে তুই জানিস না।"

"তোর হাত কাঁপে?"

"প্রথমবার কেঁপেছিলো। এখন কাঁপে না।"

ইন্ডাস্ট্রি ভিজিটে গিয়েছিলো দুইবার। একবার গাজীপুরের একটা কারখানায়, যেখানে বড় বড় জেনারেটর আছে। আরেকবার একটা সোলার প্যানেল ইনস্টলেশন সাইটে। সোলার সাইটে গিয়ে ফারুকের চোখ বড় হয়ে গিয়েছিলো।

"একটা ছাদে ছয়টা প্যানেল। ইনভার্টার, ব্যাটারি, নেট মিটারিং। পুরো সিস্টেমটা আমি বুঝলাম। মানে, একদম পুরোটা। ক্লাসে যা পড়েছি, সব ওখানে দেখলাম।"

ফারুকের চোখে একটা আলো জ্বলে উঠলো। যেভাবে মানুষের চোখে আলো জ্বলে যখন তারা কোনো কিছু আবিষ্কার করে। ফারুক সোলার প্যানেল আবিষ্কার করেনি। কিন্তু নিজের জায়গা আবিষ্কার করেছে।

"আর একটা খবর আছে," ফারুক বললো। চায়ের কাপ টেবিলে রাখলো।

"কী?"

"চাকরি করি।"

জাহিদ অবাক হলো। "পড়তে পড়তে?"

"হ্যাঁ। পলিটেকনিকের পাশে একটা ইলেকট্রিক্যালের দোকান আছে, নূর ইলেকট্রিক্যালস। মালিক সালাম ভাই। উনি আমাকে নিয়েছেন। সপ্তাহে চার দিন, ক্লাসের পরে। বিকেল তিনটা থেকে রাত আটটা। মাসে পাঁচ হাজার।"

পাঁচ হাজার টাকা। জাহিদ হিসেব করলো। এটা বিশাল কোনো অঙ্ক না। কিন্তু ফারুকের জন্য বিশাল।

"কী করিস ওখানে?"

"সব করি। দোকানে যারা আসে, তাদের সমস্যা শুনি। ফ্যান ঘোরে না, সুইচ কাজ করে না, ওয়্যারিং পুড়ে গেছে। মেরামত করি। মাঝে মাঝে বাড়িতে যেতে হয়, কারো বাড়ির ওয়্যারিং ঠিক করতে। সালাম ভাই সাথে যাই, দেখি, শিখি।"

ফারুক থামলো। তারপর বললো, একটু নিচু গলায়, "বাবাকে বলেছিলাম।"

"কী বললো?"

"চুপ করে ছিলো। তারপর বললো, 'কত পাস?' বললাম, পাঁচ হাজার। বাবা কিছু বললো না।"

জাহিদ বুঝলো কেন বাবা কিছু বলেনি। ফারুকের বাবা রিকশা চালান। সারাদিন রিকশা চালিয়ে দিনে তিনশো থেকে চারশো টাকা আয় করেন। মাসে দশ থেকে বারো হাজার, যদি প্রতিদিন চালেন। অসুস্থ হলে, বৃষ্টি হলে, রিকশা ভাঙলে, আয় কমে। ফারুকের আয় ঘণ্টায় হিসেব করলে বাবার চেয়ে বেশি। ফারুক পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে, পাঁচ হাজার মাসে। বাবা দশ ঘণ্টা চালেন, বারো হাজার মাসে। ফারুকের ঘণ্টাপ্রতি আয় প্রায় পঞ্চাশ টাকা। বাবার চল্লিশ।

ফারুকের বাবা চুপ ছিলেন কারণ হিসেবটা তিনিও বুঝেছেন। ছেলে এখনো ছাত্র, আর ঘণ্টায় তার চেয়ে বেশি কামায়। এটা গর্বের কথা। কিন্তু ভেতরে একটু ব্যথাও করে, হয়তো, যেটা কেউ মুখে বলে না।

"সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের পরীক্ষা আসছে," ফারুক বললো। "ডিপ্লোমা শেষ হলে দিতে পারবো।"

জাহিদ জানে। পাশ করলে সরকারি চাকরি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুৎ। বেতন ষোলো থেকে আঠারো হাজার শুরুতে। পেনশন। চাকরির নিরাপত্তা।

"তুই দিবি?" জাহিদ জিজ্ঞেস করলো।

"দিবো। কিন্তু পাশ করি আর না করি, কাজের অভাব হবে না।"

"মানে?"

ফারুক সোজা হয়ে বসলো। এই বিষয়ে সে ভেবেছে। অনেক ভেবেছে।

"দেখ, সোলার প্যানেলের কথা ধর। বাংলাদেশে এখন বুম চলছে। প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা কারখানা, প্রতিটা অফিস সোলার দিতে চায়। ইনস্টলেশন কে করবে? ইলেকট্রিশিয়ান। ভালো ইলেকট্রিশিয়ান পাওয়া যায় না। সালাম ভাই বলে, দিনে দুই-তিনটা কল আসে, লোক নেই দিতে। একজন ভালো ইলেকট্রিশিয়ান দিনে আটশো থেকে বারোশো টাকা নেয়। মাসে বিশ দিন কাজ করলে ষোলো থেকে চব্বিশ হাজার। পাঁচ বছর অভিজ্ঞতা হলে পঁচিশ থেকে চল্লিশ হাজার।"

ফারুক থামলো না।

"আর গালফে যেতে চাইলে? দুবাই, সৌদি, কাতার, সবখানে ইলেকট্রিশিয়ান দরকার। স্কিল্ড ইলেকট্রিশিয়ান, সার্টিফিকেটসহ, মাসে পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার টাকা। কনস্ট্রাকশন লেবারের দ্বিগুণ। কারণ একজন হেল্পার রিপ্লেস করা সহজ, একজন ইলেকট্রিশিয়ান রিপ্লেস করা কঠিন।"

জাহিদ চুপ করে শুনছে। ফারুক যা বলছে, সেটার সাথে জাহিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। জাহিদ ফিজিক্স পড়ছে। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পড়ছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ছে। এগুলো দিয়ে কী চাকরি হবে, জাহিদ জানে না। বিসিএস দিতে হবে, নয়তো মাস্টার্স করতে হবে, নয়তো পিএইচডি, নয়তো অন্য কিছু। পথটা লম্বা, ঝাপসা।

ফারুকের পথ ছোট। পরিষ্কার। ডিপ্লোমা, তারপর কাজ। অথবা পরীক্ষা, তারপর সরকারি চাকরি। দুটোর যেকোনো একটা। দুটোই আছে।

"তুই রাগ করিস না," ফারুক বললো। "একটা কথা বলি।"

"বল।"

"তোরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস, থিওরি শিখিস। আমি পলিটেকনিকে পড়ি, কাজ শিখি। দশ বছর পরে দেখা যাবে কে এগিয়ে।"

জাহিদ রাগ করলো না। কারণ ফারুক ঠিক বলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে জাহিদ তিন বছর পড়বে। তারপর মাস্টার্সে আরো দুই বছর। মোট পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছরে সে কোনো টাকা আনবে না। বাবা সিএনজি চালাবেন, মা সেলাই করবেন, ভাই রাকিব গার্মেন্টসে খাটবে। জাহিদ পড়বে। থিওরি পড়বে। পরীক্ষা দেবে। নম্বর পাবে।

ফারুক এখনই পাঁচ হাজার আনছে। ডিপ্লোমা শেষ হলে পনেরো থেকে বিশ হাজার আনবে। তিন বছরের ভেতরে। সরকারি চাকরি হলে আঠারো হাজার প্লাস পেনশন। বেসরকারি হলে অভিজ্ঞতা বাড়লে ত্রিশ, চল্লিশ।

জাহিদ পাঁচ বছর পরে কোথায় থাকবে? বিসিএসের প্রস্তুতিতে হয়তো। কোচিং সেন্টারে। প্রিলিমিনারি, রিটেন, ভাইভা। তিন-চার বার দিতে হয় গড়ে। মানে আরো দুই-তিন বছর। এই সময়ে ফারুক ঘর বানাবে, সংসার চালাবে।

চায়ে চুমুক দিলো। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

"একটু দাঁড়া," ফারুক বললো। সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। গ্যালারি খুললো। একটা ছবি দেখালো।

একটা দোকানের ভেতরের ছবি। দেয়ালে নতুন সুইচবোর্ড। সাদা প্লাস্টিকের বোর্ড, চারটা সুইচ, দুইটা সকেট, একটা ফ্যান রেগুলেটর। তারগুলো পরিষ্কারভাবে গেছে, কোনো তার বাইরে বের হয়নি। এমসিবি বোর্ড আলাদা, সুন্দর করে লাগানো। পুরো কাজটা ঝকঝকে।

"এটা আমার প্রথম সোলো কাজ," ফারুক বললো। "পাশের গলিতে একটা নতুন দোকান হচ্ছে, মুদি দোকান। পুরো ওয়্যারিং আমি একা করেছি। সালাম ভাই শুধু শেষে চেক করেছে।"

জাহিদ ছবির দিকে তাকালো। সুন্দর কাজ। পরিষ্কার। গোছানো।

"সালাম ভাই কী বললো?"

"বললো, ভালো হয়েছে। আর কিছু বলেনি। সালাম ভাই বেশি কথা বলে না। 'ভালো হয়েছে' মানে সত্যিই ভালো হয়েছে।"

ফারুক আরেকটা ছবি দেখালো। এটা সেলফি। ফারুক আর তার বাবা। বাবার চেহারায় ক্লান্তি আছে, রিকশার ক্লান্তি, কিন্তু চোখে অন্য কিছু আছে। ফারুক হাসছে। বাবাও হাসছে, একটু কম, যেভাবে পুরনো মানুষেরা হাসে, ঠোঁট বেশি ফাঁক করে না কিন্তু চোখ নরম হয়ে আসে।

"এটা কবে তুলেছিস?"

"ওই দিন। দোকানের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে বাবাকে দেখালাম ছবিটা। বাবা দেখে কেঁদে ফেলেছিল।"

জাহিদ কিছু বললো না।

"জানিস কেন কেঁদেছিল?"

"কেন?"

ফারুকের গলা একটু ভারী হলো। চায়ের কাপে আঙুল ঘোরাচ্ছে।

"বাবা বললো, 'তুইই প্রথম পরিবারে যে টাকা আনার আগে কাজ শিখেছে। আমি শেখার আগেই কাজ শুরু করেছিলাম।'"

বাতাসে একটু ধুলো উড়লো। দোকানদার আরেকটা স্টোভ জ্বালালো। আগুনের একটু গন্ধ পেলো জাহিদ।

ফারুকের বাবা ক্লাস সেভেনে পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। সংসার চালাতে হয়েছিলো। প্রথমে ভ্যান, তারপর রিকশা। কোনো ট্রেনিং নেই। শুধু শরীর আর রাস্তা। চল্লিশ বছর ধরে।

ফারুক সুযোগ পেয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার টাকা ছিলো না বলে পলিটেকনিকে গেছে। হাতে কাজ শিখেছে। এখনই আয় করছে। দারিদ্র্য তাকে একটা পথে ঠেলে দিয়েছে, আর সেই পথটা ভুল ছিলো না।

জাহিদ পলিটেকনিকের গেটের দিকে তাকালো। গেটে একটা সাইনবোর্ড। নাম লেখা। ছাত্ররা ঢুকছে, বের হচ্ছে। কেউ কেউ ওয়ার্কশপের জামা পরে, জামায় গ্রিজের দাগ। কেউ কেউ খাতা হাতে। কেউ একটা মোটরের পার্ট বহন করছে, ভারী, দুই হাতে ধরে।

এই ছেলেগুলোকে কেউ ইঞ্জিনিয়ার বলে না। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বলে, যেটার ভেতরে একটা "কিন্তু" আছে। আসল ইঞ্জিনিয়ার না। মাঝখানে কিছু একটা।

অথচ কারো বাড়ির লাইন কেটে গেলে এরাই আসে। মোটর পুড়লে এরাই ঠিক করে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার অফিসে বসে ডিজাইন করে। মাঠে আসে এরা।

যে হাত দিয়ে তার ধরে, তাকে বলে মিস্ত্রি। যে কাগজে তার আঁকে, তাকে বলে ইঞ্জিনিয়ার। ফারুক দুটোই পারে। কিন্তু সমাজ তাকে মিস্ত্রির কাছাকাছি রাখবে। কারণ তার সার্টিফিকেটে লেখা ডিপ্লোমা, বিএসসি না।

"তোর পরিকল্পনা কী?" জাহিদ জিজ্ঞেস করলো।

ফারুক বললো, "ডিপ্লোমা শেষ করবো। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের পরীক্ষা দেবো। পাশ করলে সরকারি চাকরি। না করলে প্রাইভেটে কাজ করবো। সোলার দিকে যেতে চাই। সোলার ইনস্টলেশন, মেইনটেন্যান্স। ভালো টাকা। চাহিদা বাড়ছে। সাপ্লাই কম।"

"আর গালফ?"

"যেতে পারি। কিন্তু এখনই না। দুই-তিন বছর অভিজ্ঞতা হলে স্কিল্ড ওয়ার্কার হয়ে যেতে পারবো। হেল্পারের দ্বিগুণ বেতন।"

জাহিদ নিজের কথা ভাবলো। কেউ যদি এখন জিজ্ঞেস করে, তোর পরিকল্পনা কী, জাহিদ কী বলবে? ফিজিক্সে অনার্স করছি। তারপর? মাস্টার্স করবো হয়তো। তারপর? বিসিএস দেবো হয়তো। তারপর? জানি না।

"হয়তো" আর "জানি না" দিয়ে পরিকল্পনা হয় না।

১০

ফারুক উঠলো। ব্যাগটা কাঁধে তুললো। ব্যাগের ভেতর থেকে প্লায়ার্সের হাতলটা বের হয়ে আছে। লাল রঙের হাতল।

"যাই। বিকেলে একটা কাজ আছে। পাশের পাড়ায় একটা বাড়িতে ওয়্যারিং চেক করতে হবে। শর্ট সার্কিট হচ্ছে।"

জাহিদ উঠলো। দুইজন হাঁটলো একটু। পলিটেকনিকের গেট পার হলো।

"জাহিদ," ফারুক বললো। থামলো।

"হুম?"

"তুই ভালো পড়িস। ফিজিক্স ভালো পারিস। তুই তোর জায়গায় ভালো করবি। আমি আমার জায়গায়। জায়গা আলাদা, এটুকুই।"

ফারুক সাইকেলে উঠলো। প্যাডেল মারলো। ব্যাগের ভেতরে যন্ত্রপাতি ঝনঝন করছে। ফারুক রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেলো।

জাহিদ দাঁড়িয়ে রইলো।

ফারুককে দারিদ্র্য পলিটেকনিকে "ঠেলে" দিয়েছে। সবাই মনে করেছিলো এটা পতন। ফারুকের মা কেঁদেছিলেন। আত্মীয়রা বলেছিলো, "বেচারা।"

কিন্তু এক বছরে ফারুকের হাতে একটা দক্ষতা আছে যেটা দিয়ে সে আজই টাকা আনতে পারে। দশ বছর পরেও পারবে। বিদ্যুৎ থাকবে, তার থাকবে, ফারুকের কাজ শেষ হবে না।

জাহিদের ফিজিক্স দিয়ে কী হবে? সত্যিই জানে না।

জাহিদ হাঁটতে শুরু করলো। বাস স্ট্যান্ডের দিকে। রোদ উঠেছে। গরম।

ফারুকের ব্যাগে যন্ত্রপাতি ঝনঝন করছিলো। জাহিদের ব্যাগে বই আছে। দুটো ব্যাগ, দুটো ভবিষ্যৎ। কোনটা ভারী, কোনটা হালকা, সেটা এখনো বলা যায় না।