ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট

কারো কাছে চাকরি আসে, কাউকে চাকরির কাছে যেতে হয়

পর্ব ২৮ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

ফোনটা বেজে উঠল রাত সাড়ে দশটায়। রাসেল।

জাহিদ ধরল। "কী রে?"

"ভাই, ক্যাম্পাসে রিক্রুটমেন্ট আসছে!" রাসেলের গলায় উত্তেজনা। যেন কেউ ফ্রি টাকা বিলাচ্ছে এবং লাইন ছোট।

"কোন কোম্পানি?"

"গ্রামীণফোন, বিকাশ, Brain Station 23, Samsung R&D। চারটা একসাথে। পুরো সপ্তাহ ধরে চলবে।"

জাহিদ বিছানায় বসে ছিল। ল্যাপটপে একটা React component লিখছিল। আঙুল থেমে গেল কিবোর্ডের ওপর।

ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট। অডিটোরিয়াম, প্রজেক্টর, স্যুট পরা HR ম্যানেজার, কোম্পানির লোগো। ছাত্ররা সারিবদ্ধ, সিভি হাতে, চোখে আশা।

এই ছবিটা জাহিদের জীবনে কোনোদিন আসেনি। আসবেও না।

রাসেল বলে চলল। "গ্রামীণফোন তো সরাসরি অফার দেয়। ইন্টারভিউ, তারপর অফার লেটার। Brain Station 23 ইন্টার্নশিপ দিয়ে শুরু করে, তারপর কনভার্ট করে। Samsung R&D-তে ছয় মাসের প্রবেশন।"

"তুই দিচ্ছিস?"

রাসেল একটু চুপ করল। তারপর বলল, "সেইটাই তো সমস্যা।"

"কী সমস্যা?"

"ওরা CSE-র ছেলেদের চায়। EEE-র জন্য আলাদা স্লট আছে, কিন্তু সেটায় কোডিং টেস্ট দিতে হবে। Data structure, algorithm, OOP। আমি তো এসব নিয়ে বসিনি কোনোদিন।"

জাহিদ কিছু বলল না।

রাসেল বলল, "আমি সার্কিট ডিজাইন পারি। সিগন্যাল প্রসেসিং পারি। পাওয়ার সিস্টেমের ক্যালকুলেশন পারি। কিন্তু ওরা জিজ্ঞেস করবে linked list কী, binary tree-তে traversal কীভাবে হয়। এগুলো আমার সিলেবাসে ছিল না।"

"তোর তো C প্রোগ্রামিং ছিল, না?"

"ছিল। ফার্স্ট ইয়ারে। ল্যাবে প্রোগ্রাম লিখতাম, পাশ করতাম, ভুলে যেতাম। কে জানত এটাই আসল জিনিস হবে?"

রাসেলের সমস্যাটা পরিষ্কার। RUET তাকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বানাচ্ছে। কিন্তু চাকরির বাজার চাইছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দুটো আলাদা জিনিস। বিশ্ববিদ্যালয় এক জিনিস শেখায়, ইন্ডাস্ট্রি আরেক জিনিস চায়। মাঝখানে ছাত্র, দুই দিকে টানাটানি।

সিস্টেমটা একটা বিচিত্র খেলা। তোমাকে ভর্তি করায় সার্কিট পড়াতে, পরীক্ষা নেয় সার্কিটের, ডিগ্রি দেয় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। তারপর চাকরি দিতে এসে বলে, "সার্কিট তো লাগবে না, কোডিং পারো?"

রাসেল বলল, "আমাদের ব্যাচে তিরিশ জন। এর মধ্যে কোডিং ভালো পারে সাত-আটজন। বাকিরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে ইঞ্জিনিয়ারিংই পড়েছে। কিন্তু চাকরি পাবে ওই সাত-আটজন।"

"বাকিরা?"

"বাকিরা BCS দেবে। নয়তো মাস্টার্স করবে। নয়তো ফ্যামিলি বিজনেসে ঢুকবে। নয়তো বিদেশ যাবে।"

জাহিদ ফোন কানে রেখে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে অন্ধকার। রাস্তায় একটা রিকশা চলে গেল, ঘণ্টির আওয়াজ।

রাসেলের কথা শুনতে শুনতে জাহিদ ভাবল, ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট জিনিসটা আসলে কী? একটা সুবিধা। একটা বিশাল সুবিধা। কোম্পানি নিজে এসে তোমার দরজায় দাঁড়াচ্ছে, বলছে, "চাকরি চাও?" তোমাকে কোথাও যেতে হচ্ছে না, কোনো পোর্টালে হারিয়ে যেতে হচ্ছে না, কোনো রেফারেন্সের জন্য তদবির করতে হচ্ছে না।

এই সুবিধা বাংলাদেশে কতজন পায়?

জাহিদ মনে মনে হিসাব করল। BUET, RUET, KUET, CUET, SUST, BRAC, NSU। মোটামুটি পনেরো থেকে বিশটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট হয়। আর National University-র অধীনে কলেজ? দুই হাজারের বেশি। বিশ লাখেরও বেশি ছাত্র।

এই বিশ লাখের কলেজে কোনো কোম্পানি আসে না। কোনো প্রজেক্টর জ্বলে না। কোনো অফার লেটার ছাপা হয় না। শূন্য।

ফোনে রাসেল বলল, "তুই কী করবি? তোর তো কোডিং আছে।"

জাহিদ হাসল। তিক্ত হাসি না, কিন্তু মজারও না। "আমার কলেজে তো কোনো রিক্রুটার আসবে না।"

"তুই নিজেই তো যেতে পারিস।"

"কোথায়? গ্রামীণফোনের অফিসে গিয়ে বলব, আমি National University থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ি, আমাকে চাকরি দেন?"

রাসেল চুপ করল। সে বুঝল, ব্যাপারটা অতটা সরল না।

জাহিদ বলল, "তোর ক্যাম্পাসে কোম্পানি আসে কারণ তোর ক্যাম্পাসের নাম আছে। RUET। ব্র্যান্ড। ওরা জানে, এখান থেকে বের হওয়া ছেলেমেয়েরা একটা মান ধরে রাখবে। ওদের ফিল্টার করার দরকার নেই, বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্টার করে দিয়েছে।"

"কিন্তু তুই তো ভালো কোড লিখিস।"

"লিখি। কিন্তু সেটা প্রমাণ করার জায়গা নেই। তোর জন্য ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট হলো একটা মঞ্চ। আমার কোনো মঞ্চ নেই। আমাকে নিজের মঞ্চ নিজে বানাতে হবে।"

সেই রাতে ফোন রেখে জাহিদ ল্যাপটপ খুলল। ঘড়িতে রাত এগারোটা।

মঞ্চ বানাতে হবে। কথাটা নিজের মুখেই বলেছে, এখন করতে হবে।

প্রথম কাজ: পোর্টফোলিও। জাহিদের কাছে পাঁচটা প্রজেক্ট আছে GitHub-এ। তিনটা ওয়েবসাইট, একটা Django ইনভেন্টরি অ্যাপ, একটা React প্রজেক্ট। কিন্তু README নেই ঠিকমতো, কোড পরিষ্কার না, কমিট মেসেজ বাংলায় লেখা কিছু কিছু।

রাত দুইটা পর্যন্ত বসে পাঁচটা রিপোজিটরি গুছিয়ে নিল। README লিখল ইংরেজিতে। কোডে কমেন্ট যোগ করল।

দ্বিতীয় কাজ: Upwork। পরের দিন নাহিদকে ফোন করল।

নাহিদ ফ্রিল্যান্সার। Upwork-এ দুই বছর ধরে কাজ করে। জাহিদ বলল, "আমাকে প্রোফাইল খুলতে সাহায্য কর।"

নাহিদ বলল, "খোলা সহজ। কাজ পাওয়া কঠিন। প্রতিটা জবে পঞ্চাশ থেকে একশো বিড পড়ে। তোর প্রোফাইল নতুন, কোনো রিভিউ নেই। ক্লায়েন্ট কেন তোকে নেবে?"

"তাহলে?"

"দাম কমিয়ে। প্রথম তিন-চারটা কাজ প্রায় ফ্রিতে করবি। রিভিউ কিনবি, টাকা দিয়ে না, শ্রম দিয়ে।"

নাহিদ প্রোফাইল সেটআপ করিয়ে দিল। ছবি, বায়ো, স্কিল ট্যাগ, পোর্টফোলিও লিংক।

"এখন বিড দে। প্রতিদিন পাঁচটা করে। কভার লেটার কপি-পেস্ট করবি না, প্রতিটা আলাদা লিখবি।"

প্রথম বিড। কোনো উত্তর এলো না।

দ্বিতীয় বিড। নীরবতা।

তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম। কিছু নেই।

জাহিদ প্রতিদিন পাঁচটা করে বিড দিতে লাগল। সকালে ক্লাসের আগে Upwork খুলে নতুন জব দেখে, কভার লেটার লিখে, বিড পাঠায়। সন্ধ্যায় আবার।

এক সপ্তাহ পর। পঁচিশটা বিড হয়ে গেছে। একটাও রিপ্লাই নেই। নোটিফিকেশন বেল-এ লাল বিন্দু নেই। ইনবক্স খালি।

জাহিদ নাহিদকে ফোন করল। "কিছু হচ্ছে না।"

"হবে। ধৈর্য ধর।"

"কতদিন?"

"আমার প্রথম কাজ পেতে বিয়াল্লিশটা বিড লেগেছিল। ছয় সপ্তাহ।"

ছয় সপ্তাহ। জাহিদ ফোন রেখে দিল। ছয় সপ্তাহ মানে দেড় মাস নীরবতা। দেড় মাস প্রতিদিন বিড দিয়ে যাওয়া, প্রতিদিন খালি ইনবক্স দেখা।

কিন্তু বিকল্প কী? ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টের জন্য বসে থাকা? সেটা তো আসবে না। কোনোদিন আসবে না।

দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি। বিড সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে গেছে।

একটা নোটিফিকেশন এলো।

জাহিদের হাত কাঁপল। Upwork-এর নোটিফিকেশন। ক্লায়েন্ট মেসেজ।

"Hi, I saw your profile. Can you build a simple landing page? Budget: $20."

বিশ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় চব্বিশশো।

জাহিদ মেসেজটা তিনবার পড়ল। তারপর রিপ্লাই লিখতে বসল। হাতে ঘাম। কী লিখবে? অনেক বেশি লিখলে ক্লায়েন্ট ভাববে ছেলেটা desprate। কম লিখলে ভাববে আগ্রহ নেই।

নাহিদকে স্ক্রিনশট পাঠাল। নাহিদ বলল, "সোজা লেখ। হ্যাঁ পারব, এত দিনে দেব, এই হলো আমার প্ল্যান। ব্যস।"

জাহিদ লিখল: "Hi, yes I can do this. I'll deliver within 2 days. Responsive design, clean HTML/CSS, mobile-friendly. Draft within 24 hours."

পাঠিয়ে দিল। দুই ঘণ্টা পর রিপ্লাই। "Sounds good. Let's start."

জাহিদের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল। প্রথম ক্লায়েন্ট। প্রথম কাজ।

বিশ ডলার। চব্বিশশো টাকা। দুই দিনের কাজ।

এটা কি অনেক? না। একজন রিকশাচালক দিনে এর চেয়ে বেশি কামায়।

কিন্তু জাহিদ জানে, এই বিশ ডলার টাকা না। এটা প্রমাণ। কেউ একজন তোমাকে চেনে না, তোমার ডিগ্রি জানে না, তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শোনেনি, তারপরও তোমাকে কাজ দিচ্ছে। শুধু পোর্টফোলিও দেখে।

ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে তুমি কে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলে দেয়। Upwork-এ তুমি কে সেটা তোমার কাজ বলে দেয়।

জাহিদ কাজ শুরু করল রাত বারোটায়। HTML, CSS, একটু JavaScript। রেসপন্সিভ ডিজাইন। মোবাইলে চেক করল, ডেস্কটপে চেক করল। প্রতিটা ডিটেইল।

সকাল পাঁচটায় শেষ হলো। ফজরের আজান হচ্ছে বাইরে।

১০

চব্বিশ ঘণ্টার আগেই ড্রাফট পাঠিয়ে দিল। ক্লায়েন্ট দুই ঘণ্টা পর রিপ্লাই দিল। "Looks great. Just change the header color to blue."

হেডারের রঙ নীল করল। পাঁচ মিনিটের কাজ। পাঠিয়ে দিল।

"Perfect. Approved."

কাজ শেষ। Upwork-এ মাইলস্টোন সাবমিট করল। টাকা escrow থেকে রিলিজ হলো। বিশ ডলার, মাইনাস Upwork-এর কমিশন বিশ পার্সেন্ট, হাতে এলো ষোলো ডলার। মোটামুটি উনিশশো টাকা।

কিন্তু টাকা না, জাহিদ অপেক্ষা করছিল অন্য কিছুর জন্য। রিভিউ।

পরের দিন রিভিউ এলো।

পাঁচ তারা। পাঁচের মধ্যে পাঁচ।

মন্তব্য: "Good work."

দুইটা শব্দ। Good work। ভালো কাজ।

জাহিদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। দুইটা শব্দ। কিন্তু এই দুইটা শব্দের ওজন অনেক।

কোনো ক্যাম্পাস রিক্রুটার আসেনি তার কলেজে। কোনো কোম্পানির লোগো তার অডিটোরিয়ামে ঝোলেনি। সেগুলো পনেরো-বিশটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। বাকি দুই হাজার কলেজের ছেলেমেয়েদের নিজের পথ নিজে খুঁজতে হয়।

জাহিদ খুঁজছে।

১১

রাতে রাসেলকে ফোন করল।

"রিক্রুটমেন্ট কেমন হলো?"

রাসেল বলল, "গ্রামীণফোনের টেস্ট দিলাম। কোডিং সেকশনে তিনটার মধ্যে একটা পেরেছি। বাকি দুইটা পারিনি। Time complexity জিজ্ঞেস করেছিল, মাথায় কিছু আসেনি।"

"Brain Station?"

"ওদের ইন্টারভিউ পরশু। কিন্তু শুনলাম ওরা CSE ছাড়া কাউকে শর্টলিস্ট করেনি।"

জাহিদ বলল, "আমার একটা খবর আছে।"

"কী?"

"Upwork-এ প্রথম কাজ শেষ করলাম। পাঁচ তারা রিভিউ পেলাম।"

রাসেল বলল, "কত পেলি?"

"বিশ ডলার।"

একটু নীরবতা। তারপর রাসেল বলল, "শুরু তো হলো।"

"হ্যাঁ। শুরু হলো।"

দুজনে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। দুজনের পথ আলাদা। রাসেল অপেক্ষা করছে কোম্পানি তার কাছে আসবে। জাহিদ নিজে কোম্পানির কাছে যাচ্ছে, যে কোম্পানি তার দেশেও না, তার শহরেও না, তার মহাদেশেও না।

একজনের কাছে মঞ্চ এসেছে। আরেকজন মঞ্চ বানাচ্ছে।

কোনটা ভালো? কে জানে। কিন্তু মঞ্চ না থাকলে যে বানাতে হয়, এটা জাহিদ শিখে গেছে।

১২

সেই রাতে ঘুমানোর আগে জাহিদ Upwork-এর প্রোফাইল আবার খুলল। পাঁচ তারা রিভিউয়ের পাশে ছোট করে লেখা: "$20.00 earned."

পুরো পৃথিবীর ফ্রিল্যান্স মার্কেটে এই সংখ্যাটা কিছু না। কিন্তু শূন্য থেকে বিশ, এই পথটুকু সবচেয়ে কঠিন। এক থেকে একশো সহজ। একশো থেকে হাজার আরো সহজ। কিন্তু শূন্য থেকে এক? সেটাই আসল যুদ্ধ।

জাহিদের শূন্যটা ভেঙেছে।

ল্যাপটপ বন্ধ করল। বালিশে মাথা রাখল। বাইরে মফস্বলের রাত। নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

"Good work।"

দুইটা শব্দ। ঘুম আসার আগে শেষ চিন্তা।

কাল আরো বিড দিতে হবে।