প্রথম চাকরির চিঠি
পাঁচ বন্ধু, পাঁচ রাস্তা, কার চিঠি কাকে কী বলছে
১
আড়াই বছর।
জাহিদ হিসাব করে দেখল, HSC-র পর আড়াই বছর হয়ে গেছে। NU-তে পদার্থবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষ চলছে। Upwork-এ ছোট ছোট কাজ পাচ্ছে। জীবন একটা ছন্দে চলছে, যেটা বাইরে থেকে দেখলে ধীর, কিন্তু ভেতরে থেকে বোঝা যায়, কিছু একটা তৈরি হচ্ছে।
আর ঠিক এই সময়ে, বন্ধুদের জীবনে একটার পর একটা "চিঠি" আসতে শুরু করল।
চিঠি মানে আক্ষরিক চিঠি না। ইমেইল, মেসেজ, নোটিফিকেশন, ফোন কল। কিন্তু সবগুলোর মানে একই: তোমার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এই নাও তোমার ভবিষ্যৎ, স্বাক্ষর করো।
জাহিদের বন্ধুদের মধ্যে প্রথম চিঠিটা পেল রাসেল।
২
রাসেল RUET-এ EEE তৃতীয় বর্ষে। ক্যাম্পাসে রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভ হলো। তিনটা কোম্পানি এসেছে। একটা টেলিকম, একটা পাওয়ার কোম্পানি, আর একটা সফটওয়্যার ফার্ম।
রাসেল তিনটাতেই আবেদন করল।
টেলিকম কোম্পানি তাকে ডাকেনি। পাওয়ার কোম্পানি ইন্টারভিউ নিল, কিন্তু বলল পরে জানাবে। সফটওয়্যার ফার্ম তাকে নিয়ে নিল। অফার লেটার ইমেইলে এলো সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই।
পজিশন: জুনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
বেতন: মাসে ত্রিশ হাজার টাকা।
শর্ত: দুই মাসের মধ্যে React শিখতে হবে।
রাসেল ফোনে জাহিদকে বলল, "ভাই, চাকরি পেয়ে গেছি।"
জাহিদ বলল, "মোবারকবাদ। কোন কোম্পানি?"
"একটা সফটওয়্যার ফার্ম। গুলশানে অফিস।"
"কিন্তু তুই তো EEE পড়ছিস।"
রাসেল একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "হ্যাঁ। EEE পড়ছি। চাকরি সফটওয়্যারে।"
একটা নীরবতা পড়ল দুজনের মধ্যে। জাহিদ বুঝল এই নীরবতার ওজন। চার বছর ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে ঢুকছে। RUET-এর সিল, EEE-র ডিগ্রি, সার্কিট ডিজাইন আর পাওয়ার সিস্টেমের কোর্স, সব মিলিয়ে যা শিখেছে, তার প্রায় কিছুই এই চাকরিতে কাজে লাগবে না।
"React কি তোর সিলেবাসে ছিল?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"না। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের একটা কোর্স ছিল, সেটাতে HTML আর CSS দিয়ে একটা স্ট্যাটিক পেজ বানিয়েছিলাম। ব্যস।"
"তাহলে React শিখবি কীভাবে?"
"YouTube। আর Udemy-তে একটা কোর্স কিনেছি। তিনশো টাকা।"
রাসেল RUET-এ চার বছর পড়ল। সরকার তার পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করল। আর সে তিনশো টাকার একটা Udemy কোর্স দিয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এটা রাসেলের ব্যর্থতা না। এটা সিস্টেমের ব্যর্থতা। কিন্তু সিস্টেম নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে না। সিস্টেম বলে, "আমরা তো শিখিয়েছি। তুমি adapt করতে পারনি।"
৩
ফারুকের খবরটা এলো একটু অন্যভাবে।
ফারুক পলিটেকনিক থেকে বের হওয়ার পর সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদের পরীক্ষা দিয়েছিল। সরকারি চাকরি। BPSC-র মাধ্যমে। লিখিত পরীক্ষা, তারপর ভাইভা।
লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিল। ভাইভা দিয়েছিল। তারপর ছয় মাস অপেক্ষা।
ছয় মাস। বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ছয় মাস অপেক্ষা করা স্বাভাবিক। কখনো এক বছর। কখনো দেড়।
এই ছয় মাসে ফারুক কী করেছে? একটা ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করেছে। বাবার সাথে বাজারে যেত। মায়ের সাথে ঘরের কাজে সাহায্য করত। আর প্রতিদিন সকালে উঠে ফোন চেক করত, গেজেট বের হয়েছে কি না।
গেজেট বের হলো ফেব্রুয়ারিতে।
ফারুকের নাম আছে।
ফারুকের বাবা কাঁদলেন।
একজন মানুষ যে সারাজীবন রং মিস্ত্রির কাজ করেছেন, যার হাত সবসময় সাদা-ধূসর রঙে রঞ্জিত থাকে, যিনি কখনো সরকারি অফিসে ঢুকতে ভয় পান, তাঁর ছেলে এখন সরকারি কর্মকর্তা হবে। ছোট পদ, কিন্তু সরকারি। গেজেটেড না, কিন্তু স্থায়ী। নামের আগে কোনো খেতাব বসবে না, কিন্তু রিটায়ার করার পর পেনশন পাবে।
বেতন: মাসে আঠারো হাজার টাকা।
রাসেলের ত্রিশ হাজারের তুলনায় কম। কিন্তু ফারুকের আঠারো হাজারের সাথে আসছে পেনশন, বাড়ি বরাদ্দের সুযোগ, সরকারি ছুটি, চাকরির নিরাপত্তা, আর একটা পরিচয়।
পলিটেকনিক। যেটাকে সবাই "ব্যর্থদের জায়গা" বলত। যেখানে গেলে মানুষ বলত "ইঞ্জিনিয়ার না, ডিপ্লোমা"। সেই পলিটেকনিক থেকে বের হয়ে ফারুক সরকারি চাকরি পেয়ে গেছে।
রাসেল RUET-এ পড়ে সফটওয়্যারে ঢুকছে। ফারুক পলিটেকনিক পড়ে সরকারি চাকরি ধরেছে। কে "আসল" ইঞ্জিনিয়ার?
৪
সুমাইয়ার কোনো চিঠি আসেনি।
সুমাইয়া সিলেট মেডিকেলে। তৃতীয় বর্ষে উঠেছে। আরো তিন বছর বাকি। ইন্টার্নশিপ ধরলে সাড়ে তিন। তারপর BCS দেবে, সেটার প্রস্তুতি আরো এক বছর, পরীক্ষা আরো এক বছর, পোস্টিং আরো ছয় মাস।
মোট: এখন থেকে প্রায় ছয় বছর পর সুমাইয়ার প্রথম মাসিক বেতন আসবে।
ছয় বছর। রাসেল ততদিনে সিনিয়র ডেভেলপার হয়ে যাবে। ফারুক পদোন্নতি পাবে। জাহিদ হয়তো নিজের ছোট্ট একটা ব্যবসা দাঁড় করাবে। আর সুমাইয়া ততদিনেও "ছাত্রী"।
সুমাইয়ার পরিবার এখনো তার পেছনে টাকা ঢালছে। হোস্টেলের ভাড়া, বই, যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার ফি। মেডিকেলে পড়ার খরচ সরকারি হলেও কম না। আর সুমাইয়ার বাবা চা-বাগানের ম্যানেজার, মধ্যবিত্ত। ধনী না, গরিবও না। ঠিক মাঝখানে, যেখানে স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য আছে কিন্তু স্বপ্ন পূরণের গ্যারান্টি নেই।
সুমাইয়া একদিন ফোনে বলল, "তোরা সবাই কিছু না কিছু করছিস। আমি এখনো পড়ছি। মনে হয় জীবনটা একটা দৌড়, আর আমি সবার পেছনে।"
জাহিদ বলল, "তুই ডাক্তার হচ্ছিস। দৌড় তো একই, তোর রাস্তাটা লম্বা।"
"রাস্তা লম্বা বললেই তো মনটা ছোট হয়ে যায় না।"
সুমাইয়া ঠিক বলেছে। রাস্তা লম্বা জানলেই ধৈর্য আসে না। ধৈর্য একটা পেশি, যেটা প্রতিদিন চর্চা করতে হয়। আর মেডিকেল স্টুডেন্টদের সেই চর্চাটা করতে হয় শূন্য আয়ে, শূন্য স্বীকৃতিতে, পরিবারের টাকায়, আর সমাজের "ডাক্তার হবে তো" টাইপ শর্তসাপেক্ষ সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে।
৫
আরিফ জাপানে।
TITP প্রোগ্রামে গেছে দেড় বছর আগে। Technical Intern Training Program। নামটা শুনলে মনে হয় প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, দক্ষতা শিখছে, জাপানি টেকনোলজি আত্মস্থ করছে। বাস্তবে আরিফ একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ বানায়। দিনে বারো ঘণ্টা। সপ্তাহে ছয় দিন।
বেতন: মাসে দেড় লাখ ইয়েন। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ।
আরিফ প্রতি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেশে পাঠায়। বাকি পঞ্চাশ হাজারে জাপানে চলে। জাপানে পঞ্চাশ হাজার টাকায় চলা মানে ভাত রান্না করা নিজে, মাংস না কেনা, বাসা ভাগাভাগি করা আরো তিনজন বাংলাদেশির সাথে, আর শীতের রাতে হিটার বন্ধ রেখে কম্বল জড়িয়ে ঘুমানো।
আরিফ ফোনে বেশি কথা বলে না। সময় পায় না। রাতে ফিরে এত ক্লান্ত থাকে যে ফোন ধরার শক্তি নেই। মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেয়। ছোট ছোট মেসেজ।
"ভাই, আজকে তুষারপাত হলো।"
"ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন এসেছে। শেখাচ্ছে।"
"একা লাগে।"
তিনটা মেসেজ। তিনটা জীবনের তিনটা দিক। প্রকৃতির সৌন্দর্য, যেটা সে ভোগ করার সময় পায় না। কাজের একঘেয়েমি, যেটা সে "শেখা" বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। আর একাকীত্ব, যেটার কোনো সান্ত্বনা নেই।
আরিফের আয় সবার চেয়ে বেশি। এক লাখ টাকা। রাসেলের ত্রিশ হাজারের তিন গুণের বেশি। ফারুকের আঠারো হাজারের পাঁচ গুণের বেশি। কিন্তু আরিফ সবার চেয়ে বেশি একা, সবার চেয়ে বেশি ক্লান্ত, সবার চেয়ে বেশি দূরে।
টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না, এটা ধনীদের কথা। কিন্তু টাকা দিয়ে নিজের দেশ, পরিবার, বন্ধু, ভাষা, আর পরিচিত রাস্তার গন্ধ কেনা যায় না, এটা প্রবাসীদের কথা।
৬
আর জাহিদ?
জাহিদের কোনো অফার লেটার আসেনি। কোনো গেজেট তার নাম ছাপেনি। কোনো কোম্পানি তাকে ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে ডাকেনি, কারণ NU-তে ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট হয় না।
কিন্তু জাহিদের Upwork অ্যাকাউন্টে এখন একটা ছোট্ট ইতিহাস তৈরি হয়েছে। পনেরোটা কাজ সম্পন্ন। সতেরোটা রিভিউ, সব পাঁচ তারা। একটা Rising Talent ব্যাজ।
আয়? ধারাবাহিক না। এক মাসে দুইশো ডলার আসে, পরের মাসে একশো। কখনো তিনশো। কখনো সত্তর। গড় করলে মাসে দুইশো থেকে তিনশো ডলারের মধ্যে। বাংলাদেশি টাকায় চব্বিশ থেকে ছত্রিশ হাজার।
সংখ্যাটা রাসেলের চাকরির কাছাকাছি। ফারুকের চেয়ে বেশি। কিন্তু এটা ধ্রুব না। কোনো মাসে ক্লায়েন্ট পাওয়া যায় না। কোনো মাসে ক্লায়েন্ট পাওয়া যায় কিন্তু দাম কম। কোনো মাসে কাজ পেয়ে ঘুম নেই, ডেডলাইন ধরতে সারারাত জেগে থাকতে হয়।
জাহিদ তার মাকে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেয়। মা নেন না, কিন্তু জাহিদ জোর করে। এটা বেতন না, এটা প্রমাণ। প্রমাণ যে NU-তে পড়া মানে সময় নষ্ট না।
বাবা জানেন ছেলে Upwork-এ কাজ করে। কিন্তু বাবা বোঝেন না ঠিক কী হচ্ছে। বাবার ভাষায়, "ল্যাপটপে কিছু একটা করে।" বাবার কাছে চাকরি মানে অফিসে যাওয়া, বস থাকা, মাস শেষে বেতন পাওয়া। জাহিদের কাজটা বাবার সংজ্ঞায় চাকরি না।
কিন্তু টাকাটা আসলে? আসে।
বাবা সেটা দেখেন। কিছু বলেন না। কিন্তু কিছু বলেন না মানেই অনুমোদন, বাবার ভাষায়।
৭
রাসেল চাকরিতে ঢুকল। প্রথম সপ্তাহেই বুঝল, RUET-এ চার বছরে যা শিখেছে, তার নব্বই শতাংশ এখানে দরকার নেই।
সার্কিট থিওরি? না। পাওয়ার সিস্টেম? না। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স? না। সিগন্যাল প্রসেসিং? না।
দরকার কী? React, Node.js, MongoDB, Git, আর Jira বোঝা।
রাসেল React শিখছে। YouTube-এ টিউটোরিয়াল দেখে, Udemy-র কোর্স করে, অফিসের সিনিয়র ডেভেলপারের কাছে প্রশ্ন করে। প্রথম মাসে সে একটা ছোট কম্পোনেন্ট বানাল। দ্বিতীয় মাসে একটা পুরো পেজ। তৃতীয় মাসে সে টিমের সাথে তাল মেলাতে পারছে।
রাসেল মেধাবী। RUET-এ চান্স পেয়েছিল, সেটাই প্রমাণ। কিন্তু রাসেলের মেধা এখন খরচ হচ্ছে এমন কিছু শিখতে যেটা তার বিশ্ববিদ্যালয় শেখায়নি। সে নিজেকে reinvent করছে। EEE ইঞ্জিনিয়ার থেকে সফটওয়্যার ডেভেলপার।
এটা কি খারাপ? না। চাকরি পেয়েছে, বেতন পাচ্ছে, শিখছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়: তাহলে RUET-এ EEE পড়ার দরকারটা কী ছিল? চার বছর, সরকারি অর্থায়ন, হোস্টেল, ল্যাব, পরীক্ষা, সব কিছু করে এসে যদি তিনশো টাকার Udemy কোর্সই আসল প্রস্তুতি হয়, তাহলে ওই চার বছরের মূল্য কী?
মূল্য আছে। RUET-এর সিল আছে বলেই কোম্পানি তাকে ডেকেছে। ডিগ্রিটা দরজা খোলে। দরজার ভেতরে কী আছে সেটা আলাদা প্রশ্ন।
কিন্তু দরজা খোলার জন্য চার বছর আর কয়েক লাখ টাকা, এটা কি যুক্তিসঙ্গত দাম?
৮
ফারুক যোগদান করল উপজেলা পর্যায়ে। LGED-তে। একটা ছোট অফিস। দুজন কর্মকর্তা, তিনজন কর্মচারী। ফারুকের কাজ: রাস্তা নির্মাণের তদারকি, ছোটখাটো অবকাঠামোর ডিজাইন, মাপজোখ।
প্রথম দিন অফিসে গিয়ে ফারুক দেখল, তার ডেস্কে একটা পুরোনো চেয়ার, একটা ফাইল ক্যাবিনেট, আর দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার। কম্পিউটার নেই। ইন্টারনেট নেই। AutoCAD চালানোর জন্য নিজের ল্যাপটপ আনতে হবে।
আঠারো হাজার টাকা বেতন। ঢাকায় একটা মেসের ভাড়া দশ হাজার। কিন্তু ফারুক ঢাকায় না, উপজেলায়। এখানে থাকার খরচ কম। পাঁচ হাজারে একটা ঘর পাওয়া যায়।
ফারুকের বাবা এখনো রং করেন। কিন্তু এখন রং করার সময় তাঁর পিঠ একটু বেশি সোজা। কারণ তাঁর ছেলে "সরকারি চাকরি করে"। এলাকায় এই কথাটার একটা ওজন আছে। সেই ওজন টাকায় মাপা যায় না।
ফারুকের মা মসজিদে মানত পুরো করলেন। ফারুকের বোনকে নতুন জামা কিনে দিলেন। ফারুকের বাবা প্রথমবারের মতো ছেলের কাছে টাকা চাইলেন না, বরং বললেন, "তোর দরকারে খরচ কর।"
এই একটা বাক্য। "তোর দরকারে খরচ কর।" এর আগে বাবার কাছ থেকে সবসময় শুনে এসেছে, "আমাকে একটু সাহায্য কর।" এবার বাবা বলছেন, নিজের জন্য খরচ কর। মানে বাবা এখন নিশ্চিত, ছেলে দাঁড়িয়ে গেছে।
পলিটেকনিকের "ব্যর্থ" ছেলে দাঁড়িয়ে গেছে। আর RUET-এর "সফল" ছেলে এখনো তিনশো টাকার কোর্স করছে।
জীবন মজার।
৯
একদিন রাতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সবাই একসাথে অনলাইন হলো। বিরল ঘটনা। পাঁচজনের পাঁচ রকম সময়সূচি। আরিফের জাপানে তখন রাত এগারোটা। রাসেল অফিস থেকে ফিরেছে। ফারুক উপজেলায় লোডশেডিংয়ের ফাঁকে মোবাইল ডেটায় আছে। সুমাইয়া হোস্টেলে। জাহিদ বাড়িতে, ল্যাপটপের সামনে।
গ্রুপের নাম: "পাঁচ মূর্খ"। HSC-র সময় রাসেল নাম দিয়েছিল।
আরিফ প্রথম মেসেজ দিল। একটা ছবি। জানালা দিয়ে তোলা। বাইরে সব সাদা। তুষার।
"আজকে প্রথমবার বরফ দেখলাম। সুন্দর, কিন্তু ঠান্ডা।"
রাসেল তার অফার লেটারের স্ক্রিনশট দিল। কোম্পানির লোগো, তার নাম, পজিশন, বেতন। নিচে লিখল: "ভাইসব, এই নিন। অফিসিয়ালি চাকুরে।"
ফারুক তার সরকারি আইডি কার্ডের ছবি দিল। ছবিটা একটু ঝাপসা, কম আলোয় তোলা। কিন্তু নামটা পড়া যায়: মো. ফারুক আহমেদ। পদবি: সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। "বাবা কাঁদছিলেন," ফারুক লিখল।
সুমাইয়া একটা ছবি দিল। ক্যাডাভার ল্যাবে। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পেছনে একটা টেবিল যেটা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রপ করা। নিচে লিখল: "আমার রুমমেট এই ছবি দেখে বমি করেছে। আমি চা খেতে খেতে তুলেছি। তিন বছর পর আমিও ডাক্তার, ইনশাআল্লাহ।"
জাহিদ কিছুক্ষণ ভাবল কী পাঠাবে।
তার কোনো অফার লেটার নেই। কোনো সরকারি আইডি নেই। কোনো বরফের ছবি নেই। কোনো ল্যাবের সেলফি নেই।
জাহিদ তার Upwork ড্যাশবোর্ডের একটা স্ক্রিনশট নিল। গত সপ্তাহের আয়: সাতচল্লিশ ডলার। পাঠাল।
"৪৭ ডলার। গত সপ্তাহে। ঘর থেকে। বস নেই। অফিস নেই। যাতায়াত নেই। ঋণ নেই।"
রাসেল রিপ্লাই দিল: "ভাই, তুই একদিন আমাদের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবি।"
জাহিদ লিখল: "ছাড়ানোর দরকার নেই। নিজের মতো চলতে পারলেই হলো।"
১০
সবাই ঘুমিয়ে গেলে জাহিদ একটু হিসাব করল।
রাসেলের ত্রিশ হাজারের সাথে আসে সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, বসের কথা শোনা, ট্রাফিক জ্যাম, আর এমন কিছু শেখা যেটা বিশ্ববিদ্যালয় শেখায়নি। ফারুকের আঠারো হাজারের সাথে আসে পেনশন আর সম্মান, কিন্তু একটা ছোট উপজেলায় বদ্ধ জীবন। আরিফের এক লাখের সাথে আসে বারো ঘণ্টার শিফট আর একাকীত্ব। সুমাইয়ার শূন্যের সাথে আসে একটা প্রতিশ্রুতি: ছয় বছর পর সে ডাক্তার হবে।
আর জাহিদের সাতচল্লিশ ডলার? সবচেয়ে ছোট সংখ্যা। কিন্তু সবচেয়ে স্বাধীন সংখ্যা। কোনো বস নেই যে বলবে "কাল থেকে আসতে হবে না।" কোনো সরকার নেই যে বলবে "তোমার পদ বিলুপ্ত।" কোনো ফ্যাক্টরি নেই যে বলবে "আজকে ওভারটাইম।"
পাঁচ বন্ধু। পাঁচ রাস্তা। কে "জিতেছে"?
কেউ না। আর সবাই।
কারণ কেউ বলেনি যে পলিটেকনিকের ছেলেটা সরকারি চাকরি পাবে, RUET-এর ছেলেটাকে YouTube-এ React শিখতে হবে, বিদেশে গেলে টাকা আসবে কিন্তু ঘুম যাবে, মেডিকেলে ভর্তি হওয়া মানে আরো ছয় বছর ছাত্র থাকা, আর NU-র ছেলেটা ঘরে বসে ডলারে আয় করবে।
কেউ বলেনি। কারণ কেউ জানত না।
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। ফোনে একবার শেষ দেখল হোয়াটসঅ্যাপ। আরিফ "Good night" লিখে অফলাইন হয়ে গেছে। ইংরেজিতে। জাপানে থেকে থেকে ভাষাও বদলাচ্ছে ছেলেটার।
ঘুমানোর আগে একটা চিন্তা মাথায় এলো: আড়াই বছর আগে সবাই একই ক্লাসরুমে বসত। একই ক্যান্টিনে সিঙ্গারা খেত। আর আজ একজন গুলশানে অফিস করছে, একজন উপজেলায় রাস্তা মাপছে, একজন জাপানে বরফ দেখছে, একজন ক্যাডাভারের সাথে সময় কাটাচ্ছে, আর একজন ল্যাপটপের সামনে বসে সাতচল্লিশ ডলার উপার্জন করছে।
পাঁচটা জীবন। পাঁচটা দিক। একটা গ্রুপ চ্যাট।
জাহিদ ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে কুকুর ডাকছে। পাশের ঘরে মিম ফিসফিস করে কথা বলছে। রান্নাঘর থেকে মায়ের থালা-বাসন ধোয়ার আওয়াজ।
সব কিছু যেমন ছিল তেমন আছে। কিন্তু জাহিদ জানে, সে আর সেই ছেলেটা না, যে "কোথাও চান্স পায়নি" বলে মাথা নিচু করত।
এখন সে একজন যে নিজের পথ নিজে বানাচ্ছে। ধীরে। সাতচল্লিশ ডলার করে।