দশ বছরের হিসাব

পাঁচ বন্ধু, পাঁচ রাস্তা, একটা স্প্রেডশিট, আর দশ বছরের প্রজেকশন

পর্ব ৩০ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত তিনটা।

জাহিদের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা স্প্রেডশিট খোলা। গুগল শিটস। সারি আর কলামের মাঝখানে পাঁচটা নাম। পাঁচটা জীবন। পাঁচটা আলাদা রাস্তা।

রাসেল। ফারুক। সুমাইয়া। আরিফ। জাহিদ।

ক্লায়েন্টের কাজ শেষ করে জাহিদ আজ একটা অদ্ভুত কাজ শুরু করেছে। কেউ বলেনি, কেউ বলবেও না। কিন্তু মাথার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে কয়েক সপ্তাহ ধরে: দশ বছর পর আমরা কে কোথায় থাকব?

প্রশ্নটা শুধু কৌতুহল না। প্রশ্নটা জরুরি। কারণ আজকের প্রতিটা সিদ্ধান্ত দশ বছর পরের জীবনটা বানাচ্ছে। আর জাহিদ সংখ্যা পছন্দ করে। সংখ্যা মিথ্যা বলে না।

স্প্রেডশিটে প্রথম কলাম: বছর। Year 1 থেকে Year 10। 2026 থেকে 2036।

দ্বিতীয় কলাম থেকে: আয়। মাসিক। টাকায়।

জাহিদ টাইপ করতে শুরু করল।

প্রথম নাম: রাসেল।

RUET থেকে EEE পাশ করে বের হয়েছে দুই বছর আগে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করেনি একদিনও। বের হওয়ার তিন মাসের মধ্যে ঢাকার একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার হিসেবে ঢুকেছে। বেতন ত্রিশ হাজার।

জাহিদ লিখল:

রাসেল, Year 1: 30,000।

Year 2: 38,000। প্রমোশন বা চাকরি বদল। সফটওয়্যারে বছরে একবার চাকরি বদলানো স্বাভাবিক।

Year 3: 48,000। মিড-লেভেল। React, Node.js। দু-তিনটা কোম্পানিতে কাজ করেছে।

Year 5: 70,000। সিনিয়র ডেভেলপার। একটা ভালো কোম্পানিতে সেটল।

Year 7: 100,000। টিম লিড। কোড কম, মিটিং বেশি।

Year 10: 120,000 থেকে 150,000। দেড় লাখ। অসম্ভব না। সিনিয়র ম্যানেজার বা প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার লেভেলে হয়। কিন্তু সবাই পৌঁছায় না।

রাসেলের মোট বিনিয়োগ: চার বছর RUET, খরচ প্রায় ছয় লাখ টাকা। হোস্টেল, খাওয়া, বই, টিউশন।

আর রাসেলের ডিগ্রি? EEE। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং। চার বছর ধরে সার্কিট, পাওয়ার সিস্টেম, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স পড়েছে। কিন্তু কাজে লাগাচ্ছে JavaScript আর Python। ডিগ্রির সাথে কাজের মিল? শূন্য।

জাহিদ একটা নোট লিখল কলামের পাশে: "কাগজে ইঞ্জিনিয়ার। বাস্তবে ডেভেলপার। ডিগ্রি ব্যবহার করেনি।"

দ্বিতীয় নাম: ফারুক।

ফারুকের গল্প আলাদা। সবার থেকে আলাদা। পলিটেকনিকে পড়েছে, সরকারি। খরচ প্রায় শূন্য। বই কিনেছে, যাতায়াত করেছে, মোট পঞ্চাশ হাজার টাকাও লাগেনি চার বছরে। সরকারি পলিটেকনিকে টিউশন ফি নেই বললেই চলে।

ডিপ্লোমা শেষ করে BCS দিয়েছে। টেকনিক্যাল ক্যাডারে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। পোস্টিং পেয়েছে উপজেলায়। বেতন আঠারো হাজার।

জাহিদ লিখল:

ফারুক, Year 1: 18,000।

সংখ্যাটা দেখে জাহিদের মনে হলো, আঠারো হাজার। ঢাকায় একটা মেসের সিট ভাড়া ছয় হাজার। খাওয়া সাত-আট হাজার। বাকি চার হাজার। এই দিয়ে জামাকাপড়, ফোন বিল, বাড়িতে টাকা পাঠানো। কীভাবে?

কিন্তু ফারুক উপজেলায়। ঢাকায় না। উপজেলায় বাড়ি ভাড়া তিন হাজার। খাওয়া কম। জীবনযাত্রার খরচ কম। আর সরকারি চাকরির খরচ শুধু বেতন না।

Year 3: 22,000। ইনক্রিমেন্ট। Year 5: 28,000। গ্রেড প্রমোশন। Year 7: 35,000। টাইমস্কেল। Year 10: 45,000।

জাহিদ সংখ্যাটা দেখল। দশ বছরে আঠারো থেকে পঁয়তাল্লিশ। রাসেল দশ বছরে ত্রিশ থেকে দেড় লাখ। পার্থক্য বিশাল। তাহলে ফারুক হেরে গেল?

না। জাহিদ আরেকটা কলাম যোগ করল: "মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়।"

বাংলাদেশে গত দশ বছরে গড় মুদ্রাস্ফীতি ছয় থেকে সাত পার্সেন্ট। কিন্তু খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি আরো বেশি, আট-নয়। সরকারি বেতন বাড়ে ধীরে। বেতন কমিশন আসে সাত-আট বছর পরপর। মাঝখানে মানুষ চাপা পড়ে।

2036 সালে 45,000 টাকার বাস্তব মূল্য? আজকের হিসাবে 25,000 টাকার কাছাকাছি। মুদ্রাস্ফীতি বেতনটাকে খেয়ে ফেলবে।

কিন্তু।

জাহিদ আরেকটা কলাম যোগ করল: "পেনশন।"

এই কলামটা শুধু ফারুকের সারিতে আছে। অন্য কারো নেই।

ফারুক যদি পঁচিশ বছর চাকরি করে, তাহলে অবসরের পর প্রতি মাসে পেনশন পাবে। আমৃত্যু। ফারুক মারা গেলে তার স্ত্রী পাবে। এটা একটা গ্যারান্টি যেটা বাংলাদেশে আর কোনো পেশায় নেই। প্রাইভেট চাকরিতে নেই, ফ্রিল্যান্সিংয়ে নেই, ব্যবসায় নেই।

পেনশন হলো লুকানো সোনা। আজকে দেখা যায় না। দশ বছর পরেও দেখা যায় না। তিরিশ বছর পর দেখা যায়, যখন অন্য সবার আয় অনিশ্চিত আর ফারুক প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা পাচ্ছে। কিছু না করে।

জাহিদ নোট লিখল: "আজকের হিসাবে সবচেয়ে কম। তিরিশ বছরের হিসাবে সবচেয়ে নিরাপদ।"

তৃতীয় নাম: সুমাইয়া।

সুমাইয়ার হিসাব সবচেয়ে জটিল। কারণ সুমাইয়ার টাইমলাইন সবচেয়ে লম্বা।

MBBS পাঁচ বছর। ইন্টার্নশিপ এক বছর। মোট ছয় বছর। এই ছয় বছরে সুমাইয়ার আয় শূন্য। বরং খরচ হচ্ছে। সরকারি মেডিকেলে পড়ছে, তাই টিউশন ফি কম। কিন্তু বই, যন্ত্রপাতি, হোস্টেল, কোচিং, এটা-সেটা মিলিয়ে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ। ছয় বছরে দশ থেকে বারো লাখ।

ইন্টার্নশিপের সময় স্টাইপেন্ড আছে। কত? আট হাজার টাকা। মাসে আট হাজার টাকায় ঢাকায় থাকতে হয়, খেতে হয়, হাসপাতালে যেতে হয়, রোগী দেখতে হয়। আট হাজার টাকা। একজন রিকশাচালক এর চেয়ে বেশি আয় করে।

জাহিদ লিখল:

সুমাইয়া, Year 1 (ইন্টার্নশিপ): 8,000।

Year 2: 15,000। সরকারি পোস্টিং বা প্রাইভেট ক্লিনিক। Year 3: 25,000-40,000। পোস্টগ্র্যাডে ঢুকলে আবার ছাত্র, না ঢুকলে প্র্যাকটিস। Year 5: 40,000-60,000। জেনারেল প্র্যাকটিশনার। স্পেশালিস্ট হতে আরো তিন-চার বছর।

Year 10: দুইটা সম্ভাবনা। প্রথম: স্পেশালিস্ট। ঢাকায় চেম্বার। মাসে 80,000 থেকে 150,000। কিন্তু HSC-র পর থেকে তেরো বছর লেগেছে এই পয়েন্টে আসতে। দ্বিতীয়: উপজেলায় পোস্টিং। সরকারি বেতন 35,000 আর হতাশা। রোগী বেশি, ওষুধ নেই, যন্ত্রপাতি নেই। বার্নআউট।

জাহিদ মোট বিনিয়োগ হিসাব করল। টাকায়: দশ থেকে পনেরো লাখ। কিন্তু টাকায় হিসাব করলে সুমাইয়ার আসল বিনিয়োগ ধরা পড়ে না। আসল বিনিয়োগ হলো সময়। সাত বছর। HSC-র পর থেকে MBBS প্লাস ইন্টার্নশিপ শেষ করতে সাত বছর। এই সাত বছরে বাকি সবাই আয় করেছে। রাসেল চাকরি করেছে, ফারুক সরকারি চাকরি করেছে, আরিফ বিদেশে টাকা কামিয়েছে, জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং করেছে। সুমাইয়া পড়েছে। শুধু পড়েছে।

নোট: "সাত বছর জীবন থেকে কেটে নিয়েছে। ROI ফেরত আসতে আরো দশ বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আয় করার সম্ভাবনা তারই। যদি টিকে থাকতে পারে।"

"যদি।" এই শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থ নাম: আরিফ।

আরিফ জাপানে। TITP প্রোগ্রামে। তিন বছরের চুক্তি। ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। মাসে 100,000 টাকার সমান আয়।

সংখ্যাটা বড়। পাঁচ বন্ধুর মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আয় আরিফের। কিন্তু জাহিদ জানে, বড় সংখ্যার পেছনে ছোট ছোট শর্ত থাকে।

আরিফ মাসে 100,000 আয় করে। কিন্তু জাপানে থাকার খরচ আছে। বাড়ি ভাড়া, খাবার, বীমা, ট্যাক্স। বাদ দিলে হাতে থাকে 60,000-65,000। এর মধ্যে 50,000 বাড়িতে পাঠায়। বাকি 10,000-15,000 জমায়।

তিন বছর পর আরিফ ফিরবে। হাতে থাকবে 15 থেকে 20 লাখ টাকা। যেটা বাবা ফেরত পাঠানো টাকা দিয়ে জমিয়েছে, আর নিজের সঞ্চয়। এটা একটা ভালো সংখ্যা। বিশ লাখ টাকা। কিন্তু এই বিশ লাখ টাকার বিনিময়ে আরিফ কী দিয়েছে?

তিন বছর জীবন। তিন বছর পরিবার ছাড়া। তিন বছর একটা ভাষা না জানা দেশে। তিন বছর ফ্যাক্টরির লাইনে একই কাজ বারবার। কোনো ডিগ্রি নেই, কোনো দক্ষতা উন্নয়ন নেই। তিন বছর বয়স বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বাড়েনি।

জাহিদ লিখল:

আরিফ, Year 1-3: 100,000 (জাপান)।

Year 4: ফেরত। এখন কী?

এখানে আরিফের জীবন দুইভাগে ভাগ হয়। জাহিদ দুইটা সারি করল।

সারি A: আরিফ সঞ্চয় দিয়ে একটা ছোট ব্যবসা শুরু করেছে। মোবাইলের দোকান, বা ইলেকট্রনিক্সের দোকান, বা ছোট একটা রেস্টুরেন্ট। Year 5-তে 30,000-40,000 আয়। Year 10-এ 60,000-80,000। ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে, কর্মচারী আছে, একটা স্থিতি এসেছে।

সারি B: আরিফ সঞ্চয় খরচ করে ফেলেছে। বিয়ে, বাড়ি মেরামত, পরিবারের চাহিদা, ভুল বিনিয়োগ। টাকা শেষ। আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে। কোরিয়া, বা আবার জাপান। দালালকে টাকা দিচ্ছে। Year 5-তে আবার বিদেশে, আবার 100,000। Year 10-এ? হয় বিদেশেই আছে, প্রতি তিন বছর পর দেশে আসে দুই মাসের জন্য। নাহলে দেশে, 20,000 টাকার চাকরিতে। সঞ্চয় শূন্য।

জাহিদ ভাবল, আরিফের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। অর্ধেক মানুষ সারি A-তে যায়, অর্ধেক সারি B-তে। কোনো গবেষণা পড়েনি জাহিদ এটা নিয়ে, কিন্তু পাড়ার অভিজ্ঞতা থেকে জানে। পাড়ায় চারজন প্রবাসী ফিরেছে গত পাঁচ বছরে। দুইজন ব্যবসা করছে, দুইজন আবার গেছে।

নোট: "আয় বেশি, কিন্তু মেয়াদ কম। ডিগ্রি নেই, দক্ষতা নেই। তিন বছরে যা আয় করেছে সেটাই সব। তারপর শূন্য থেকে শুরু। অথবা আবার একই চক্র।"

পঞ্চম নাম: জাহিদ।

নিজের হিসাব করা সবচেয়ে কঠিন। অন্যদের জীবন বাইরে থেকে দেখা যায়, নিজের জীবন ভেতর থেকে দেখতে হয়। ভেতর থেকে দেখলে সব ঝাপসা।

জাহিদ NU-তে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ছে। নিজে নিজে কোডিং শিখেছে। Upwork-এ ফ্রিল্যান্সিং করছে। মাসে 200-300 ডলার আসছে, মানে 22,000-33,000 টাকা। কিছু মাসে বেশি, কিছু মাসে কম। কোনো মাসে শূন্য।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সমস্যা হলো, এটা একটা রাস্তা যেটার কোনো ম্যাপ নেই। চাকরিতে একটা সিঁড়ি আছে: জুনিয়র, মিড, সিনিয়র, লিড, ম্যানেজার। সরকারি চাকরিতে গ্রেড আছে: নবম, অষ্টম, সপ্তম। ডাক্তারিতে ধাপ আছে: MBBS, পোস্টগ্র্যাড, স্পেশালিস্ট, কনসালট্যান্ট। প্রতিটা পেশায় একটা পরিষ্কার সিঁড়ি আছে। পরের ধাপটা দেখা যায়।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে কিছু দেখা যায় না। পরের মাসে কাজ পাবে কিনা জানা যায় না। পরের বছর কত আয় হবে জানা যায় না। দশ বছর পর কোথায় থাকবে, সেটা তো দূরের কথা।

তাই জাহিদ নিজের জন্য একটা সারি বানাল না। তিনটা বানাল।

P10: সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা। দশ পার্সেন্ট সম্ভাবনা।

ফ্রিল্যান্সিং শুকিয়ে গেছে। ক্লায়েন্ট আসছে না, বা AI এসে ছোট কাজগুলো খেয়ে ফেলেছে, বা Upwork-এর নিয়ম বদলেছে। জাহিদ ঢাকায় একটা ছোট কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার হিসেবে ঢুকেছে। বেতন 25,000। NU-র পদার্থবিজ্ঞানের ডিগ্রি দেখে কেউ বেশি দিতে চায়নি। "NU-র ছেলে" ট্যাগটা তাড়া করেছে। Year 10-এ 40,000-50,000। খারাপ না, কিন্তু রাসেলের অর্ধেকের কম।

P50: গড় সম্ভাবনা। পঞ্চাশ পার্সেন্ট।

ফ্রিল্যান্সিং টিকে আছে। ক্লায়েন্ট বেসড তৈরি হয়েছে। Upwork-এ Top Rated। রেট বেড়ে $20-25/hr হয়েছে। মাসে $1000-1500 আসছে, মানে 120,000-180,000 টাকা। অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসে কাজ। নিজের সময়ের মালিক। Year 10-এ হয়তো $2000-2500/month।

P90: সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা। দশ পার্সেন্ট।

জাহিদ একটা ছোট সফটওয়্যার এজেন্সি বানিয়েছে। তিন-পাঁচজন ডেভেলপার কাজ করে। ক্লায়েন্ট বাইরে থেকে আসে, জাহিদ কাজ ভাগ করে দেয়। নিজে কোড লেখে কম, ম্যানেজ করে বেশি। মাসে 200,000+ টাকা। কিন্তু এটা এজেন্সি, কর্মচারীর বেতন দিতে হয়, খরচ আছে। নিট আয় 150,000 থেকে 200,000।

মোট বিনিয়োগ: NU-র চার বছরের খরচ দেড় লাখ। প্লাস একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ল্যাপটপ পনেরো হাজার। প্লাস ইন্টারনেট বিল। মোট দুই লাখ টাকার কম। সবার চেয়ে কম বিনিয়োগ।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা।

জাহিদ পাঁচটা নামের দিকে তাকাল। পাঁচটা আলাদা গ্রাফ মাথায় তৈরি হলো।

রাসেল: ধীরে শুরু, তারপর খাড়া উপরে। একটা সরল রেখা না, একটা কার্ভ। প্রথম তিন বছর ধীরে, তারপর দ্রুত। সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে অভিজ্ঞতা জমা হলে আয় দ্রুত বাড়ে।

ফারুক: প্রায় সমতল রেখা। আঠারো থেকে পঁয়তাল্লিশ। দশ বছরে সাতাশ হাজার বেড়েছে। বছরে গড়ে আড়াই হাজার। কিন্তু রেখাটা কখনো শূন্যে নামবে না। রেখাটা স্থির। ঝড় আসুক, মহামারি আসুক, রাজনৈতিক অস্থিরতা আসুক, ফারুকের বেতন আসবে।

সুমাইয়া: প্রথম সাত বছর শূন্যের কাছে। তারপর হঠাৎ লাফ। ধীরে বাড়ে, তারপর দ্রুত বাড়ে। Year 10-এ অন্য সবার সমান বা বেশি। কিন্তু সেই সাত বছরের খাদটা ভয়ংকর। সাত বছর ধরে অন্যদের আয় করতে দেখা আর নিজে পড়তে থাকা, এটা মানসিক চাপ।

আরিফ: প্রথম তিন বছর সবার উপরে। তারপর একটা খাড়া পতন। শূন্যে নেমে আসে। তারপর? হয় আবার উপরে, নাহলে নিচেই থাকে। গ্রাফটা ভাঙা। মাঝখানে একটা ফাটল।

জাহিদ: গ্রাফ নেই। একটা ধূসর এলাকা আছে। P10 আর P90-এর মধ্যে বিশাল ফাঁক। সবচেয়ে খারাপ হলে সবার নিচে, সবচেয়ে ভালো হলে সবার উপরে। গড় হলে মাঝখানে।

জাহিদ স্প্রেডশিটটা দেখল। সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। কিন্তু সংখ্যার বাইরে একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যেটা কলামে ধরা যায় না।

পরিচয়।

আঠারো বছর বয়সে সমাজ প্রত্যেককে একটা লেবেল দিয়েছিল। রাসেলকে বলেছিল "BUETian না, তবে RUET-এর ছেলে। ইঞ্জিনিয়ার।" ফারুককে বলেছিল "পলিটেকনিকের। ডিপ্লোমা।" সুমাইয়াকে বলেছিল "ডাক্তার হবে।" আরিফকে বলেছিল "বিদেশী। প্রবাসী।" জাহিদকে বলেছিল "NU-র ছেলে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের।"

এই লেবেলগুলো আঠারো বছর বয়সে লাগানো হয়েছিল। HSC-র পর। ভর্তি পরীক্ষার পর। যে দরজাটা খুলেছিল, সেটাই পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। কেউ জিজ্ঞেস করেনি ছেলেটা কী জানে, কী পারে, কী চায়। শুধু জিজ্ঞেস করেছে কোথায় পড়ে।

দশ বছর পর এই লেবেলগুলো কি টিকে থাকবে?

রাসেল ইঞ্জিনিয়ার। কাগজে। কিন্তু সে কোনোদিন সার্কিট ডিজাইন করেনি, পাওয়ার প্ল্যান্টে যায়নি, ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম মেইনটেইন করেনি। সে কোড লেখে। JavaScript লেখে। API বানায়। ডাটাবেজ ডিজাইন করে। সে একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার। কিন্তু বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ বলবে "ছেলে RUET-এর ইঞ্জিনিয়ার।" কেউ বলবে না "ছেলে JavaScript লেখে।"

ফারুক সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। পদবি। কিন্তু তার কাজ? ফাইল সই করা, ঠিকাদারের সাথে কথা বলা, উপজেলা অফিসে বসে থাকা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ কতটুকু করে? দশ পার্সেন্ট? পাঁচ?

সুমাইয়া ডাক্তার হবে। লেবেলটা ঠিক আছে। সুমাইয়া সত্যিই ডাক্তার হবে। রোগী দেখবে, ওষুধ দেবে, প্রাণ বাঁচাবে। পাঁচ বন্ধুর মধ্যে সুমাইয়াই একমাত্র যার লেবেল আর বাস্তব মিলবে।

আরিফ "বিদেশী।" তিন বছর পর ফিরলে? "জাপান ফেরত।" কতটুকু সম্মান আর কতটুকু করুণা, সেটা নির্ভর করবে পকেটে কত টাকা আছে তার উপরে।

আর জাহিদ? "NU-র ছেলে।" মাসে দুই লাখ আয় করলেও লোকে বলবে "NU-তে পড়েছিল।" বাংলাদেশে মানুষকে চেনার জন্য দুইটা প্রশ্ন: কোথায় পড়েছ? কী করো? প্রথমটার উত্তর সারাজীবন একই থাকে।

ঘড়িতে রাত চারটা বাজে।

জাহিদ স্প্রেডশিটটা সেভ করল। ফাইলের নাম দিল: "ten_year_projection.xlsx"। কেউ দেখবে না এই ফাইল। কোনো ক্লায়েন্টের কাজ না, কোনো অ্যাসাইনমেন্ট না। নিজের জন্য। নিজেকে বোঝানোর জন্য।

ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে জাহিদ একটা শেষ নোট লিখল। স্প্রেডশিটের নিচে। একটা আলাদা সেলে।

"সমাজ আমাদের প্রত্যেককে আঠারো বছর বয়সে একটা পরিচয় দিয়েছিল। সেই পরিচয়টা একটা ডিগ্রির নাম, একটা প্রতিষ্ঠানের নাম, একটা পেশার নাম দিয়ে তৈরি। কিন্তু দশ বছর পর, পরিচয়টা যেখানে আছে বাস্তবটা সেখানে নেই। রাসেল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং করে না। ফারুক ইঞ্জিনিয়ার পদবিতে আছে, কিন্তু ফাইল আর ঠিকাদার ম্যানেজ করে। আরিফ প্রবাসী, কিন্তু দেশে ফিরবে। সুমাইয়া ডাক্তার, সত্যিই ডাক্তার। আমি NU-র ছেলে, কিন্তু NU আমাকে কোডিং শেখায়নি।"

একটু ভেবে আরেকটা লাইন যোগ করল।

"ইঞ্জিনিয়ারিং একটা পরিচয় না। ইঞ্জিনিয়ারিং একটা কাজ। যে কাজটা করে, সেই ইঞ্জিনিয়ার। ডিগ্রি থাকুক বা না থাকুক।"

১০

ল্যাপটপ বন্ধ করল। ঘরে অন্ধকার।

বাইরে ফজরের আজান শুরু হয়েছে। দূরে, মসজিদের মাইকে। আজানের শব্দটা ঘরে ঢুকছে জানালা দিয়ে। জাহিদ শুয়ে পড়ল।

ঘুম আসার আগে শেষ একটা চিন্তা মাথায় এলো। স্প্রেডশিটে সবকিছু ঢোকানো যায়। আয়, খরচ, বিনিয়োগ, মুদ্রাস্ফীতি, পেনশন। কিন্তু কিছু জিনিস স্প্রেডশিটে ধরা যায় না। রাসেলের ইঞ্জিনিয়ারিং না করার আফসোস। ফারুকের উপজেলায় আটকে থাকার একাকীত্ব। সুমাইয়ার সাত বছরের ক্লান্তি। আরিফের জাপানের ফ্যাক্টরিতে একা রাত কাটানো। জাহিদের প্রতিটা মাসে কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা।

এগুলো কোনো কলামে ধরা যায় না। কোনো সূত্র দিয়ে হিসাব করা যায় না। কিন্তু এগুলোই আসল খরচ। টাকায় মাপা যায় না এমন খরচ।

আজানের শব্দ থামল। পাখি ডাকছে। সকাল হচ্ছে।

জাহিদের চোখ বন্ধ হচ্ছে। কাল সকালে উঠে আবার ল্যাপটপ খুলবে। আবার কোড লিখবে। আবার ক্লায়েন্টের ম্যাসেজ আসবে। আবার NU-র ক্লাস আছে, যেতে হবে, নাহলে অ্যাটেনডেন্স কম পড়বে।

স্প্রেডশিটটা একটা ফাইল। কম্পিউটারে পড়ে থাকবে। কিন্তু ফাইলটা জাহিদকে একটা জিনিস দেখিয়েছে যেটা আগে স্পষ্ট ছিল না।

পাঁচ বন্ধু। পাঁচটা আলাদা রাস্তা। কিন্তু দশ বছর পর, কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে, সেটা আজকের লেবেল দিয়ে বলা যায় না। আজকের লেবেল বলে রাসেল এগিয়ে কারণ সে ইঞ্জিনিয়ার, জাহিদ পিছিয়ে কারণ সে NU-র ছেলে। কিন্তু সংখ্যা বলছে অন্য কথা। সংখ্যা বলছে, লেবেল দিয়ে জীবন চলে না। কাজ দিয়ে চলে। দক্ষতা দিয়ে চলে। আর একটু ভাগ্য দিয়ে চলে।

লেবেল? লেবেল শুধু অন্যের চোখের জন্য। নিজের জীবনে লেবেলের কোনো কাজ নেই।

ঘুম এলো।

অধ্যায় তিন শেষ।