ডাক্তার হতে চাই
একটা মেয়ে, একটা স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের আসল দাম
১
সুমাইয়ার বাবার নাম আব্দুর রহিম।
পেশা: সহকারী শিক্ষক। উপজেলার একমাত্র সরকারি হাইস্কুলে। বিষয়: গণিত। বেতন: মাসে বিশ হাজার টাকা। ইনক্রিমেন্ট ধরে বাইশ। উৎসব বোনাস বছরে দুইবার, বেসিকের অর্ধেক। ছাত্রদের টিউশনি মাসে তিন-চার হাজার। মোট আয়: পঁচিশ-ছাব্বিশ হাজার টাকা।
সুমাইয়ার মা গৃহিণী। সংসার সামলান। দুই মেয়ে, এক ছেলে। সুমাইয়া বড়, তারপর ছোট বোন রুমানা ক্লাস সেভেনে, আর ছোট ভাই ক্লাস ফোরে।
পঁচিশ হাজার টাকায় পাঁচ জনের সংসার। ভাড়া নেই, নিজের বাড়ি, টিনের ছাদ। কিন্তু খাবার আছে, বিদ্যুৎ বিল আছে, তিন সন্তানের স্কুলের খরচ আছে, ওষুধপত্র আছে। টাকা ফুরিয়ে যায় মাসের কুড়ি তারিখের মধ্যে। বাকি দশ দিন চলে ধার আর টিউশনির আগাম টাকা দিয়ে।
রহিম সাহেব গণিতের শিক্ষক। সংখ্যা ভালো বোঝেন। কিন্তু নিজের সংসারের সংখ্যাগুলো যোগ করলে উত্তর সবসময় ঋণাত্মক আসে। আয় বিয়োগ ব্যয় সমান মাইনাস। প্রতি মাসে।
২
সুমাইয়া ক্লাস ফাইভে পড়ত যখন প্রথম বলেছিল, "আমি ডাক্তার হতে চাই।"
রহিম সাহেব হেসেছিলেন। গর্বের হাসি। বলেছিলেন, "ডাক্তার হলে মানুষের সেবা করা যায়। অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করা, এর চেয়ে ভালো কাজ আর কী আছে?"
সুমাইয়া মাথা নেড়েছিল। তখন সে বুঝতই না ডাক্তার হওয়া মানে কী। MBBS কী, অ্যাডমিশন টেস্ট কী, কোচিং কী, কিছুই জানত না। শুধু জানত, ডাক্তার মানে সাদা কোট। ডাক্তার মানে গলায় স্টেথোস্কোপ। ডাক্তার মানে সবাই সম্মান করে।
কিন্তু সুমাইয়া ক্লাস ফাইভে কেন ডাক্তার হতে চেয়েছিল?
"মানুষের সেবা" বাবার শেখানো উত্তর। সুন্দর উত্তর। মহৎ উত্তর। কিন্তু একটা মেয়ে যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, তখন সে "মানুষের সেবা" বুঝে না। সে বোঝে কাকে দেখে মানুষ উঠে দাঁড়ায়, কার সামনে মানুষ মাথা নিচু করে কথা বলে, কে এলে ঘরের পরিবেশ বদলে যায়।
সুমাইয়ার নানী অসুস্থ ছিলেন। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিলেন রহিম সাহেব। ডাক্তার এলেন। তরুণ, সাদা অ্যাপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ। ডাক্তার বসতে না বসতে সবাই চুপ হয়ে গেল। রহিম সাহেব, যিনি স্কুলে পঞ্চাশজন ছাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, তিনি ডাক্তারের সামনে ভদ্র ছেলের মতো বসে আছেন। "জী স্যার, জী স্যার।"
সুমাইয়া দেখেছিল।
একটা মেয়ে যখন দেখে তার বাবা, যাকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ মনে করে, সেই বাবা আরেকজনের সামনে ছোট হয়ে যাচ্ছেন, তখন সেই মেয়ের মনে একটা প্রশ্ন জাগে: ঐ মানুষটা কে? কেন বাবা তার সামনে এরকম?
উত্তর: ডাক্তার।
সেদিন থেকে সুমাইয়া জানে, ডাক্তার হলে কেউ তোমাকে ছোট করতে পারে না। ডাক্তার হলে তোমার বাবাকে কারো সামনে মাথা নিচু করতে হয় না। ডাক্তার হলে তুমিই সেই মানুষ যার সামনে অন্যরা ছোট হয়।
এটা সেবার ইচ্ছা না। এটা মর্যাদার ক্ষুধা। কিন্তু সুমাইয়া এটা জানে না। সে ভাবে সে মানুষের সেবা করতে চায়।
৩
আরেকটা কারণ আছে। এটা কেউ মুখে বলে না।
সুমাইয়ার চাচাতো বোন তাসনিম। তাসনিমের বাবা ব্যবসায়ী, ভালো আয়। তাসনিমের বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। পাত্র ইঞ্জিনিয়ার। BUET-এর। ঢাকায় ফ্ল্যাট আছে, গাড়ি আছে।
তাসনিমের বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ এসেছিল দেখতে। পাত্রের মা বসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "মেয়ের বাবা কী করেন?"
"ব্যবসা।"
"কী ব্যবসার?"
"কাপড়ের ব্যবসা। বাজারে দোকান আছে।"
পাত্রের মা সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
সুমাইয়ার মা সেদিন পাশে বসে ছিলেন। শুনেছিলেন সব। বুঝেছিলেন, যেদিন সুমাইয়ার বিয়ের সময় আসবে, পাত্রপক্ষ জিজ্ঞেস করবে, "মেয়ের বাবা কী করেন?"
উত্তর: "স্কুলের শিক্ষক।"
শিক্ষক। সম্মান আছে, কিন্তু ওজন নেই। বাংলাদেশে শিক্ষককে সবাই সম্মান করে, কিন্তু কেউ তার মেয়েকে বিয়ে করতে লাইন দেয় না। শিক্ষকের বেতন সবাই জানে। শিক্ষকের সামর্থ্য সবাই আন্দাজ করতে পারে। একটা টিনের ছাদের বাড়ি, একটা পুরনো সাইকেল, আর মাসে পঁচিশ হাজার টাকা। এই দিয়ে পাত্রপক্ষকে মুগ্ধ করা যায় না।
কিন্তু "মেয়ের বাবা শিক্ষক" এর পরে যদি একটা বাক্য যোগ হয়?
"আর মেয়ে ডাক্তার।"
ব্যাস। হিসাব বদলে গেল।
"শিক্ষকের মেয়ে" আর "ডাক্তার মেয়ে" এই দুইটা পরিচয়ের ওজন আলাদা। প্রথমটাতে করুণা আছে, দ্বিতীয়টাতে সম্মান। প্রথমটাতে মানুষ বলে "বেচারা, শিক্ষকের মেয়ে, পাবে কোথায়?" দ্বিতীয়টাতে মানুষ বলে "মেয়ে ডাক্তার, বাবা শিক্ষক হলেও কোনো সমস্যা নেই।"
সুমাইয়ার মা এটা বোঝেন। রহিম সাহেবও বোঝেন। কিন্তু কেউ এটা মুখে বলে না। কারণ এটা বলতে গেলে স্বীকার করতে হয়, বাংলাদেশে শিক্ষকতা একটা পেশা হিসেবে সম্মানিত, কিন্তু সামাজিক মুদ্রা হিসেবে দুর্বল।
রহিম সাহেব গণিত পড়ান। ফর্মুলা জানেন। কিন্তু এই ফর্মুলাটা তাঁর জানা: মেয়ে ডাক্তার হলে পুরো পরিবারের পরিচয় বদলে যায়।
৪
HSC-র দুই বছর আগে থেকে শুরু হলো প্রস্তুতি।
সুমাইয়া ইন্টারমিডিয়েটে বিজ্ঞান বিভাগ। উপজেলার সরকারি কলেজে। কলেজে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান পড়ানো হয়। কিন্তু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় যে ধরনের প্রশ্ন আসে, সেটা কলেজে পড়ানো হয় না। সেটার জন্য কোচিং লাগে।
কোচিং। বাংলাদেশে এই শব্দটা একটা সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা। সরকারি স্কুল-কলেজে যা পড়ানো হয় সেটা ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে যথেষ্ট না। তাই কোচিং। আলাদা টাকা দিয়ে, আলাদা জায়গায়, আলাদা শিক্ষকের কাছে, আবার সেই একই জিনিস পড়া। কিন্তু এবার পরীক্ষার ধাঁচে।
সুমাইয়ার কোচিং শুরু হলো ক্লাস ইলেভেনে। উপজেলা থেকে জেলা শহরে যেতে হয়। বাসে এক ঘণ্টা। সপ্তাহে তিন দিন।
কোচিং ফি: মাসে তিন হাজার টাকা।
বই আর গাইড: বছরে পাঁচ-ছয় হাজার। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার গাইড, প্রশ্নব্যাংক, মডেল টেস্ট। প্রতিটার দাম তিনশো থেকে পাঁচশো টাকা। দশ-বারোটা কিনতে হয়।
যাতায়াত: বাসে যাওয়া-আসা দিনে একশো টাকা। মাসে বারো দিন, মানে বারোশো।
ক্লাস টুয়েলভে কোচিংয়ের চাপ বাড়ল। সপ্তাহে পাঁচ দিন। ফি বেড়ে চার হাজার। HSC-র পর ভর্তি পরীক্ষার আগে তিন মাসের ইনটেনসিভ ব্যাচ। সেটার আলাদা ফি, পনেরো হাজার।
রহিম সাহেব হিসাব করলেন। দুই বছরে কোচিংয়ের মোট খরচ: প্রায় আশি হাজার টাকা।
আশি হাজার। একজন স্কুল শিক্ষকের তিন মাসের বেতনের বেশি।
টাকা কোথা থেকে এলো? ঋণ। সুমাইয়ার মামা সরকারি চাকরি করেন, তাঁর কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার ধার। বাকি ত্রিশ হাজার কিস্তিতে দিয়েছেন, মাসে মাসে। টিউশনির টাকা থেকে। পরিবারের খাবারের বাজেট কমিয়ে। মাছ সপ্তাহে দুই দিন থেকে এক দিন হয়েছে। মাংস মাসে একবার থেকে দুই মাসে একবার।
সুমাইয়া জানত না এই হিসাবগুলো। সে জানত কোচিংয়ে যেতে হয়, পড়তে হয়, ভালো নম্বর পেতে হয়। বাবা টাকা দিচ্ছেন, সেটা কোথা থেকে আসছে সেই প্রশ্ন করেনি। করলে বাবা বলতেন, "তুই পড়। টাকা নিয়ে ভাবিস না।"
এই বাক্যটা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ বাবা বলেন। এই বাক্যের পেছনে ঋণ আছে, ক্ষুধা আছে, অনিদ্রা আছে। কিন্তু মেয়ে জানবে না। মেয়ে শুধু পড়বে।
৫
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ষাট হাজার ছাত্রছাত্রী মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন আছে প্রায় পাঁচ হাজার। প্রাইভেটে আরো আট হাজার। মোট তেরো হাজার। ষাট হাজারের মধ্যে তেরো হাজার। মানে প্রতি পাঁচজনে একজন চান্স পায়।
সংখ্যাটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়ে কিছুটা ভালো। BUET-এ দশ হাজারে একজন। কিন্তু মেডিকেলে পাঁচজনে একজন মানে ভালো সম্ভাবনা, এটা ভাবলে ভুল হবে। কারণ পাঁচজনে চারজন পড়ে যায়। চারজনের দুই বছরের কোচিং, আশি হাজার টাকা, অজস্র রাত জাগা, সব শূন্য হয়ে যায়।
সুমাইয়া পরীক্ষা দিল। একশো নম্বরের MCQ। এক ঘণ্টা সময়। ষাটটা প্রশ্ন জীববিজ্ঞান থেকে, বাকিটা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান।
পরীক্ষার দিন সুমাইয়ার বাবা সাথে গিয়েছিলেন। জেলা শহরে পরীক্ষার কেন্দ্র। সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। বাসে দেড় ঘণ্টা। পরীক্ষা দশটায়। এগারোটায় শেষ। এক ঘণ্টায় একটা জীবনের ফলাফল।
রহিম সাহেব বাইরে বসে ছিলেন। গেটের সামনে। আরো শ খানেক অভিভাবক বসে আছেন। কেউ গাছের নিচে, কেউ চায়ের দোকানে, কেউ রাস্তার ধারে। সবার চোখে একই প্রশ্ন: আমার সন্তান কি পারবে?
রহিম সাহেব গণিতের শিক্ষক। তিনি জানেন সম্ভাবনার হিসাব। পাঁচজনে একজন। মানে বিশ পার্সেন্ট। মানে আশি পার্সেন্ট সম্ভাবনা যে সুমাইয়া পারবে না। কিন্তু সম্ভাবনার হিসাব যখন নিজের মেয়ের ব্যাপারে আসে, তখন গণিত কাজ করে না। তখন দোয়া কাজ করে।
৬
ফলাফল বের হলো দুই সপ্তাহ পর।
সুমাইয়া চান্স পেয়েছে।
সিলেট মেডিকেল কলেজ। ঢাকা মেডিকেল না, ময়মনসিংহ মেডিকেল না, চট্টগ্রাম মেডিকেল না। সিলেট। মেরিট লিস্টে তার অবস্থান মাঝামাঝি। ঢাকা পেতে হলে আরো পাঁচ-ছয় নম্বর লাগত। পায়নি। কিন্তু সরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে। এটাই যথেষ্ট। এটাই সব।
রহিম সাহেবের বাড়িতে খবরটা আসল সন্ধ্যায়। সুমাইয়া মোবাইলে রেজাল্ট দেখে চিৎকার করে উঠল। মা ছুটে এলেন রান্নাঘর থেকে। রুমানা আর ছোট ভাই বুঝল না কী হয়েছে, কিন্তু বড় বোন আর মা কাঁদছে দেখে তারাও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রহিম সাহেব স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে খবরটা শুনলেন ফোনে। সুমাইয়া বলল, "বাবা, চান্স পেয়েছি।"
রহিম সাহেব কিছু বললেন না। চুপ ছিলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ।"
একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে ঋণের ভার আছে, দুই বছরের উদ্বেগ আছে, পঁচিশ হাজার টাকার বেতনে পাঁচজনের সংসার চালানোর ক্লান্তি আছে, মাছ কম খাওয়ার রাতগুলো আছে, মামার কাছে ধার চাওয়ার লজ্জা আছে। আর আছে একটা বিশ্বাস যেটা সত্য হয়েছে: আমার মেয়ে পারবে।
৭
পাড়ায় খবর ছড়াল আগুনের মতো।
"রহিম স্যারের মেয়ে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে!" উপজেলায় এটা ছোট খবর না। প্রতি বছর এই উপজেলা থেকে দুই-তিনজন সরকারি মেডিকেলে চান্স পায়। সুমাইয়া এবারের তিনজনের একজন।
প্রতিবেশীরা আসতে শুরু করলেন। মিষ্টি নিয়ে। কেউ একটা বোতল কোকাকোলা, কেউ এক কেজি রসমালাই, কেউ শুধু মুখে। "তোমার মেয়ে ডাক্তার হবে! মাশাআল্লাহ!"
"ডাক্তার হবে।" ভবিষ্যৎ কাল। সুমাইয়া এখনো ডাক্তার হয়নি। পাঁচ বছর বাকি। ইন্টার্নশিপ ধরলে ছয়। কিন্তু মানুষ বলছে "হবে" না, বলছে যেন ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। মেডিকেলে চান্স পাওয়া মানে ডাক্তার হওয়া। এই দুইয়ের মাঝখানের ছয় বছর কেউ গণনায় ধরে না।
রহিম সাহেবের স্কুলের সহকর্মীরা তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। প্রধান শিক্ষক স্টাফরুমে ঘোষণা দিলেন: "আমাদের রহিম সাহেবের মেয়ে সিলেট মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে।" সবাই হাততালি দিলেন। রহিম সাহেব লাজুক মানুষ। মাথা নিচু করে হাসলেন।
কিন্তু সেই হাসির নিচে একটা হিসাব চলছে। MBBS পাঁচ বছর। সরকারি কলেজে টিউশন ফি নগণ্য, বছরে কয়েক হাজার। কিন্তু থাকা-খাওয়া, বই, যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার ফি, সব মিলিয়ে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ। পাঁচ বছরে আট থেকে দশ লাখ। প্লাস ইন্টার্নশিপের এক বছর, সেখানে স্টাইপেন্ড আছে কিন্তু থাকার খরচ আছে।
মোট: দশ থেকে বারো লাখ। পরের ছয় বছরে।
রহিম সাহেবের বার্ষিক আয়: তিন লাখ। ছয় বছরে আঠারো লাখ। তার মধ্যে থেকে দশ-বারো লাখ সুমাইয়ার পেছনে। বাকি ছয়-আট লাখে ছয় বছর ধরে চারজনের সংসার। মানে মাসে আট-নয় হাজার। অসম্ভব না, কিন্তু চাপের।
আর রুমানা? ছোট মেয়ে? সে কি পড়বে না? তিন বছর পর তারও HSC শেষ হবে। সে কি কোচিং পাবে না? সে কি কিছু হতে চাইবে না?
রহিম সাহেব এসব ভাবছেন। কিন্তু আজ ভাবার দিন না। আজ উদযাপনের দিন। হিসাব কাল।
৮
সুমাইয়া জাহিদকে ফোন করল।
"চান্স পেয়েছি!" গলায় উত্তেজনা। "সিলেট মেডিকেল!"
জাহিদ বলল, "অভিনন্দন!" সত্যিকারের অভিনন্দন। জাহিদ খুশি হয়েছে। সুমাইয়া তার বন্ধু। পাঁচ বন্ধুর একজন। বন্ধু ভালো করলে ভালো লাগে। এটা আন্তরিক।
"ঢাকা পেলে ভালো হতো," সুমাইয়া বলল। "কিন্তু সিলেটও ভালো। সরকারি তো।"
"সরকারি হলেই হলো। ডাক্তার তো ডাক্তার, সিলেট থেকে হোক বা ঢাকা থেকে।"
"তাই তো।" সুমাইয়া হাসল।
ফোন রাখার পর জাহিদ চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ।
মাথায় একটা হিসাব শুরু হলো। MBBS পাঁচ বছর। প্লাস ইন্টার্নশিপ এক বছর। মোট ছয় থেকে সাত বছর। এই সময়টায় সুমাইয়ার কোনো আয় নেই। বরং খরচ হচ্ছে। তার বাবা তাকে টাকা পাঠাবেন। মাসে মাসে। পঁচিশ হাজার টাকার বেতন থেকে।
সুমাইয়ার বয়স এখন আঠারো। MBBS শেষ হবে তেইশে। ইন্টার্নশিপ চব্বিশে। তারপর? হয় সরকারি পোস্টিং, বেতন পনেরো-কুড়ি হাজার। নাহলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস, শুরুতে তেমন আয় নেই। স্পেশালিস্ট হতে চাইলে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন, আরো তিন-চার বছর।
মানে সুমাইয়ার প্রথম "ভালো আয়" শুরু হবে সাতাশ-আটাশ বছর বয়সে। তার আগ পর্যন্ত সে তার বাবার উপর নির্ভরশীল। একজন স্কুল শিক্ষক, যার বেতন পঁচিশ হাজার, যার আরো দুই সন্তান আছে, তিনি তাঁর বড় মেয়েকে আর্থিকভাবে সাপোর্ট করবেন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স পর্যন্ত।
জাহিদ নিজের দিকে তাকাল। সে এখন আঠারো। NU-তে পড়ছে। Upwork-এ কাজ করছে। মাসে কুড়ি-পঁচিশ হাজার আয়। বাবার CNG থেকে পনেরো হাজার, মায়ের সেলাই থেকে পাঁচ হাজার, রাকিবের গার্মেন্টস থেকে পাঁচ হাজার। পরিবারে সবাই কিছু না কিছু আয় করে।
সুমাইয়ার পরিবারে আয় করেন একজন। রহিম সাহেব। আর তাঁর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এখন একটা মেয়ের পেছনে যার রিটার্ন আসতে আরো সাত-আট বছর।
জাহিদ ভাবল, এটা সাহস। নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে একটা বিনিয়োগ করা যার ফলাফল এক দশক পরে। রহিম সাহেব জানেন এটা কঠিন হবে। তবুও করছেন। কারণ মেয়ে ডাক্তার হবে।
কিন্তু জাহিদের মনে আরেকটা প্রশ্ন জাগল যেটা সে কাউকে বলল না: যদি সুমাইয়া ডাক্তার হওয়ার পর উপজেলায় পোস্টিং পায়? যদি সরকারি বেতন পায় পনেরো-কুড়ি হাজার? যদি স্পেশালিস্ট না হতে পারে? তাহলে এই দশ-বারো লাখের বিনিয়োগের রিটার্ন কোথায়?
এই প্রশ্নটা জাহিদ নিজেকে করল। উত্তর পেল না। কারণ ডাক্তারি শুধু আয়ের হিসাব না। ডাক্তারি একটা পরিচয়। আর পরিচয়ের দাম টাকায় মাপা যায় না।
৯
রওনার দিন এলো।
সুমাইয়া সিলেটে যাবে। বাড়ি থেকে প্রথমবার এত দূরে। উপজেলা থেকে সিলেট সাত ঘণ্টার পথ। বাসে।
একটা ছোট স্যুটকেস। দুইটা শাড়ি, তিনটা সালোয়ার কামিজ, একটা কম্বল, একটা বালিশের কভার, টয়লেটরি। মা একটা টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত আর মুরগির তরকারি দিলেন। "রাস্তায় খাবি।"
বাবা ব্যাগ থেকে একটা জিনিস বের করলেন। একটা ছোট বাক্স। খুললেন।
স্টেথোস্কোপ।
পুরনো। একটু বিবর্ণ। কিন্তু কাজ করে। রহিম সাহেব এটা কিনেছেন জেলা শহরে একজন সিনিয়র ডাক্তারের কাছ থেকে। সেকেন্ডহ্যান্ড। দাম দিয়েছেন আটশো টাকা। নতুন কিনলে দুই-আড়াই হাজার। সেই সামর্থ্য নেই।
"এটা তোমার অস্ত্র," রহিম সাহেব বললেন।
সুমাইয়া স্টেথোস্কোপটা হাতে নিল। ধাতব অংশটা ঠান্ডা। রাবারের টিউবটা একটু শক্ত, পুরনো হয়ে গেছে। কানের দুই প্রান্ত খুলে কানে লাগালে একটু ঢিলা। কিন্তু কাজ করে। বুকে ধরলে হার্টবিট শোনা যায়।
সুমাইয়া স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে দেখল নিজেকে। দেয়ালের ভাঙা আয়নায়। একটা আঠারো বছরের মেয়ে, সালোয়ার কামিজে, গলায় একটা সেকেন্ডহ্যান্ড স্টেথোস্কোপ। পেছনে টিনের ছাদ। পাশে একটা পুরনো স্যুটকেস।
এটাই শুরু।
সুমাইয়ার মা কাঁদছেন। ছোট বোন রুমানা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ভাই বুঝছে না কেন সবাই কাঁদছে।
রহিম সাহেব কাঁদছেন না। তিনি হাসছেন। কিন্তু হাসিটা পাতলা। হাসির পেছনে একটা ভারী হিসাব চলছে। ছয় বছর। দশ-বারো লাখ। পঁচিশ হাজারের বেতন। আর দুই সন্তান বাড়িতে।
সুমাইয়া বাসে উঠল। জানালা দিয়ে হাত নাড়ল।
বাস ছাড়ল।
রহিম সাহেব দাঁড়িয়ে রইলেন। বাস দেখা যাচ্ছে না আর। ধুলো পড়ে গেছে। রাস্তা ফাঁকা।
তিনি ঘরে ফিরলেন। ট্যাবলের উপর সুমাইয়ার HSC-র সার্টিফিকেটের একটা ফটোকপি পড়ে আছে। পাশে একটা নোটবুক। নোটবুকে তিনি লিখে রেখেছেন: সিলেটে পাঠানোর প্রথম মাসের খরচ। হোস্টেল সিট: দুই হাজার। খাওয়া: চার হাজার। বই: পাঁচ হাজার (প্রথম সেমিস্টারের)। যাতায়াত ও বিবিধ: দুই হাজার। মোট: তেরো হাজার।
পঁচিশ হাজারের মধ্যে তেরো হাজার।
বাকি বারো হাজারে চারজনের সংসার। মাসে বারো হাজার। দিনে চারশো।
রহিম সাহেব নোটবুকটা বন্ধ করলেন।
সাদা অ্যাপ্রোনের ওজন শুরু হলো।