অ্যানাটমির রাত
ক্যাডাভার ল্যাবের গন্ধ, আটজনের রুম, আর একটা ফোন কল যেটায় কেউ উত্তর দেয়নি
১
সিলেট মেডিকেল কলেজের হোস্টেল। মেয়েদের ব্লক। রুম নম্বর ১১৪।
আট ফুট বাই দশ ফুটের একটা ঘরে আটটা মেয়ে। চারটা বাঙ্ক বেড। প্রতিটা বেডের নিচে দুইটা ট্রাঙ্ক, একটা ব্যাগ, তিন-চারটা বই। দেয়ালে পেরেক ঠুকে তোয়ালে ঝোলানো। জানালায় পর্দা নেই, একটা চাদর টাঙানো। বাথরুম একটা, আটজনের জন্য।
সুমাইয়া উপরের বাঙ্কে শোয়। ডানদিকের কোণায়। জানালার কাছে। জানালাটা একটু ভাঙা, তাই মশা ঢোকে। কিন্তু বাতাসও পাওয়া যায়। সিলেটের গরমে বাতাসটা দরকার।
ভর্তি হয়েছে তিন সপ্তাহ। তিন সপ্তাহে সুমাইয়া অনেক কিছু শিখেছে। কিন্তু মেডিসিন না। মেডিসিন শেখা শুরু হয়নি এখনও। তিন সপ্তাহে সে শিখেছে কীভাবে আটজনের রুমে প্রাইভেসি ছাড়া থাকতে হয়। কীভাবে একটা বাথরুমের জন্য লাইন দিতে হয় সকাল ছয়টায়। কীভাবে মেসের ভাত খেতে হয় যেটা কখনো ঠিকমতো সেদ্ধ হয় না।
আর শিখেছে যে মেডিকেল কলেজ আর কোচিং সেন্টার দুইটা সম্পূর্ণ আলাদা জগত।
২
প্রথম সপ্তাহে ওরিয়েন্টেশন হয়েছিল। বড় হলরুমে, সব ফার্স্ট ইয়ার একসাথে। ব্যাচে দুইশ জন। প্রিন্সিপাল এসেছিলেন। ভাইস প্রিন্সিপাল এসেছিলেন। ডিপার্টমেন্টের হেডরা এসেছিলেন।
সবাই একটাই কথা বলেছেন: "তোমরা বাংলাদেশের সেরা মেধাবী। তোমরা যারা এখানে আছ, তোমরা দেশের ভবিষ্যত।"
সুমাইয়া ভেবেছিল, এত সেরা মেধাবী দেশের ভবিষ্যত হলে, ভবিষ্যতটা একটু ভালো থাকার কথা ছিল।
তারপর সিলেবাস দেওয়া হলো।
ফার্স্ট ইয়ার: তিনটা সাবজেক্ট। অ্যানাটমি। ফিজিওলজি। বায়োকেমিস্ট্রি।
শুধু তিনটা। কিন্তু তিনটার ওজন তিনশোটার সমান।
অ্যানাটমি একটাই। কিন্তু বই তিনটা। Gray's Anatomy, Cunningham's Manual of Practical Anatomy, Snell's Clinical Anatomy। প্রতিটা হাজার পেজের উপরে। Gray's? তেরোশ পেজ। Cunningham's তিন খন্ড। Snell's আটশ পেজ।
সুমাইয়া বইগুলো হাতে নিয়ে ওজন করেছিল। আক্ষরিক অর্থে। তিনটা বই মিলিয়ে প্রায় আট কেজি। একটা চালের বস্তার সমান।
আর এটা শুধু অ্যানাটমি। ফিজিওলজিতে Guyton, বায়োকেমিস্ট্রিতে Harper's। সব মিলিয়ে পনের-ষোলটা বই। ফার্স্ট ইয়ারে।
HSC-তে সুমাইয়া তিনটা গাইড বই আর দুইটা টেক্সটবুক পড়ে GPA 5 পেয়েছিল। এখানে শুধু একটা সাবজেক্টে তিনটা বই, প্রতিটা তার HSC-র সব বই মিলিয়ে যত পেজ তার থেকে বেশি।
রুমমেট নাফিসা, রাজশাহী থেকে এসেছে, প্রথম দিন বইগুলো দেখে বলেছিল, "এগুলো কি আমাদের পড়তে হবে, নাকি ঘরে রাখলেই পাশ?"
কেউ হাসেনি। কারণ সবাই ভাবছিল একই কথা।
৩
দ্বিতীয় সপ্তাহে অ্যানাটমি ক্লাস শুরু হলো। লেকচার হলে। ফার্স্ট ইয়ারের সব ক্লাস নিচতলায়। প্রফেসর এসেছেন, মাইক্রোফোন হাতে। বোর্ডে লিখছেন। লিখছেন আর বলছেন। দ্রুত। খুব দ্রুত।
"Upper limb. Pectoral region. Boundaries: superiorly by clavicle, medially by sternum, laterally by deltopectoral groove..."
সুমাইয়া লিখছে। পাশের মেয়ে লিখছে। সবাই লিখছে। কেউ বুঝছে কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন।
মেডিকেলের পড়া মানে মুখস্থ। এটা কেউ আগে বলেনি। কিন্তু এটাই সত্যি। অ্যানাটমিতে বোঝার কিছু নেই। শরীরের প্রতিটা হাড়, প্রতিটা মাংসপেশি, প্রতিটা ধমনী, প্রতিটা শিরা, প্রতিটা স্নায়ু, কোথা থেকে শুরু হয়, কোথায় শেষ হয়, কোন হাড়ের কোন পৃষ্ঠে কোন মাংসপেশি লাগানো, কোন ধমনী কোন শিরার পাশ দিয়ে যায়, এগুলো মনে রাখতে হবে। শুধু মনে রাখা। লজিক নেই। ফর্মুলা নেই। ডেরিভেশন নেই। শুধু তথ্য। অসীম তথ্য।
পদার্থবিদ্যায় একটা সূত্র মনে রাখলে বিশটা সমস্যা সমাধান করা যায়। অ্যানাটমিতে বিশটা তথ্য মনে রেখে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
সুমাইয়া পদার্থবিদ্যা ভালোবাসত। অঙ্ক ভালোবাসত। HSC-তে তার সেরা বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা। সে ভেবেছিল মেডিকেলেও লজিক্যাল চিন্তা কাজে লাগবে। লাগবে। কিন্তু সেটা ক্লিনিক্যাল ইয়ারে। ফোর্থ ইয়ারে। ফিফথ ইয়ারে। ফার্স্ট ইয়ারে? শুধু মুখস্থ। শুধু মনে রাখা। শুধু পড়া আর পড়া আর পড়া।
৪
তৃতীয় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার। ক্যাডাভার ল্যাব।
সুমাইয়া জানত এই দিনটা আসবে। মেডিকেলে পড়লে মৃতদেহ কাটতে হবে, এটা সবাই জানে। টিভিতে দেখা যায়, বইতে পড়া যায়। কিন্তু জানা আর অনুভব করা দুইটা আলাদা জিনিস।
ল্যাবের দরজা খোলার আগেই গন্ধটা পাওয়া গেল। ফরমালিন। তীব্র, ঝাঁঝালো, চোখে জল আনা গন্ধ। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, "নাকে রুমাল চাপবে না। অভ্যাস করতে হবে।"
ল্যাবের ভেতরে পাঁচটা টেবিল। প্রতিটা টেবিলে একটা করে মৃতদেহ। সাদা কাপড়ে ঢাকা। ফরমালিনে সংরক্ষিত। চামড়ার রং বদলে গেছে, ধূসর-বাদামি। মাংসপেশি শক্ত। গন্ধটা এত তীব্র যে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
প্রফেসর বললেন, "এরা আমাদের শিক্ষক। এরা দেহদানকারী। মৃত্যুর পরেও এরা শেখাচ্ছেন। সম্মান করবে।"
কাপড় সরানো হলো।
প্রথম যে মেয়েটা দেখল, সে চিৎকার করেনি। শব্দ করেনি। শুধু চোখ বন্ধ করে ফেললো। তারপর আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেল। দরজার কাছে গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দ্বিতীয় মেয়েটা অজ্ঞান হলো। সোজা মেঝেতে পড়ে গেল। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ছুটে এলেন। পানি দিলেন। বাইরে নিয়ে গেলেন।
ছেলেদের মধ্যেও দু-তিনজন বের হয়ে গেল। কেউ বমি করল বাইরে গিয়ে। কেউ শুধু দাঁড়িয়ে রইল, মুখ সাদা।
সুমাইয়া অজ্ঞান হলো না। বমিও করল না। সে দাঁড়িয়ে রইল। দেখল। চোখ সরাল না। কিন্তু ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল। কী বদলেছে সেটা সে ঠিক বুঝতে পারল না। শুধু বুঝল যে এই মুহূর্তের আগে আর পরে সে একই মানুষ না।
প্রফেসর দেখাচ্ছেন। "এটা pectoralis major। এটা deltoid। এই groove-টা দেখ, এটা deltopectoral groove। এর ভেতর দিয়ে cephalic vein যাচ্ছে।"
ক্লাস চলল দেড় ঘন্টা।
৫
সেদিন রাতে সুমাইয়া ডিনার খেতে পারল না।
মেসে গিয়ে প্লেটে ভাত নিল। ডাল নিল। একটুকরো মাছ নিল। তারপর বসে তাকিয়ে রইল। মুখে তুলতে পারল না।
চোখের সামনে ফরমালিনে সংরক্ষিত হাতটা ভাসছে। ধূসর চামড়া। শক্ত মাংসপেশি। আঙুলের নখগুলো এখনো আছে। কোনো এক সময় এই হাত দিয়ে কেউ ভাত খেত, কারো মুখে তুলে দিত, কারো মাথায় হাত বুলাত।
সুমাইয়া প্লেট ফেরত দিয়ে রুমে চলে এলো। বিস্কুট খেল। দুইটা টাইগার বিস্কুট। আর এক গ্লাস পানি।
রুমমেট মিতু জিজ্ঞেস করল, "খাওনি?"
সুমাইয়া বলল, "পারিনি।"
মিতু বলল, "আমিও পারিনি।"
দুইজন চুপ করে বসে রইল। কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে হয় না। পাশে থাকলেই হয়।
৬
দিন যাচ্ছে।
সুমাইয়ার রুটিন: সকাল সাতটায় উঠা। আটটায় ক্লাস। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ক্লাস। লেকচার আর প্র্যাক্টিক্যাল। দুপুরে মেসে খাওয়া। বিকেলে লাইব্রেরি। সন্ধ্যায় আবার পড়া। রাতে মেসে খাওয়া। তারপর আবার পড়া। রাত বারোটা-একটার আগে ঘুমানোর প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু পড়াটাই সমস্যা। কোথা থেকে শুরু করবে? কতটুকু পড়বে? একটা ক্লাসে যা পড়ানো হয়, সেটা বইতে খুঁজতে গেলে পঞ্চাশ পেজ। পঞ্চাশ পেজ পড়তে তিন ঘন্টা। একদিনে তিন-চারটা ক্লাস। তিন-চারটা ক্লাসের পড়া করতে দশ-বারো ঘন্টা। দিনে চব্বিশ ঘন্টা।
ক্লাসের সময়: ছয় ঘন্টা। পড়ার সময়: দশ ঘন্টা। ঘুমের সময়: ছয় ঘন্টা। খাওয়া, গোসল, বাকি সব: দুই ঘন্টা। মোট: চব্বিশ ঘন্টা।
কোনো ফাঁক নেই। কোনো শখ নেই। কোনো বিনোদন নেই। কোনো বন্ধুর সাথে আড্ডা নেই। শুধু পড়া।
আর তারপরেও পরীক্ষায় সবকিছু কভার করা সম্ভব না। কারণ সিলেবাস এত বড় যে সব পড়া মানুষের পক্ষে সম্ভব না। সবাই সিলেক্টিভ পড়ে। ইম্পর্ট্যান্ট টপিক পড়ে। গত বছরের প্রশ্ন দেখে ধারণা করে কী আসতে পারে। এটাকে বলে "সাজেশন"।
মেডিকেলে GPA 4.83 পাওয়া মেয়ে সাজেশন পড়ে? হ্যাঁ। কারণ সব পড়ার সময় নেই। কারণ মানুষের মস্তিষ্কের একটা ধারণক্ষমতা আছে। কারণ বইগুলো ডিজাইনই করা হয়েছে রেফারেন্স হিসেবে, শুরু থেকে শেষ পড়ার জন্য না।
৭
খরচের হিসাব।
সুমাইয়া একটা ছোট খাতায় প্রতিদিনের খরচ লেখে। অভ্যাস পুরোনো। মফস্বলের স্কুল শিক্ষকের মেয়ে। টাকার হিসাব রাখতে শিখেছে বাবার কাছ থেকে।
হোস্টেল ফি: মাসে ৫০০ টাকা। সরকারি মেডিকেল, তাই এত কম।
মেস: মাসে ৩,০০০ টাকা। সকালে রুটি-ভাজি, দুপুরে ভাত-ডাল-তরকারি-মাছ বা মাংস, রাতে একই। মানটা খারাপ। ভাত কখনো বেশি সেদ্ধ, কখনো কম। ডাল পাতলা। মাছে কাঁটা বেশি, মাংস কম। কিন্তু তিন হাজারে এর বেশি আশা করা যায় না।
বই: মাসে গড়ে ২,০০০ টাকা। একটা Gray's Anatomy-র দাম দেড় হাজার। ফটোকপি করলে সস্তা, কিন্তু ফটোকপিতে ছবি ঠিকমতো আসে না। অ্যানাটমিতে ছবি ছাড়া পড়া অসম্ভব।
যাতায়াত আর বিবিধ: ৫০০ টাকা। রিকশা, অটো, মোবাইল রিচার্জ।
জরুরি খরচ: মাসে ১,০০০ টাকা। ওষুধ, স্যানিটারি পণ্য, মাঝেমাঝে বাইরে খাওয়া যখন মেসের খাবার একেবারেই খাওয়া যায় না।
মোট: মাসে প্রায় ৭,০০০ টাকা।
বাবা পাঠান ৮,০০০ টাকা। স্কুলের বেতন ২০,০০০ টাকায় সংসার চালিয়ে, বাকি সব বাদ দিয়ে, ৮,০০০ পাঠান। মাঝে মাঝে ৭,০০০ পাঠান। "এই মাসে একটু কম, পরের মাসে দেব।"
সুমাইয়া বাড়িতে থাকতে তিনটা টিউশনি করত। মাসে ৪,৫০০ টাকা আয়। সেটা নিজের হাতখরচ আর বইয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল। এখন সিলেটে। টিউশনি নেই। আয় শূন্য। পুরোটাই বাবার উপর নির্ভরশীল।
একটা ২০ বছরের মেয়ে, GPA 4.83, দেশের সেরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, আর তার মাসিক বাজেটে বাইরে খাওয়ার জন্য বরাদ্দ: শূন্য।
৮
কেউ বলে না কথাটা। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারে ড্রপআউট হয়।
অফিসিয়ালি ড্রপআউট না। কেউ বলে না "আমি ছেড়ে দিচ্ছি।" কেউ চিঠি লিখে জানায় না। হয় ক্লাসে আসা কমে যায়, তারপর একদিন আসে না, তারপর আর কখনো আসে না। হোস্টেলের ঘর খালি হয়। বিছানাটা কয়েকদিন এভাবেই থাকে, তারপর নতুন কেউ আসে বা আসে না।
বাংলাদেশে মেডিকেলে ভর্তি হয়ে প্রথম বছরে ড্রপআউটের হার পাঁচ থেকে আট শতাংশ। দুইশ জনের ব্যাচে দশ থেকে ষোলোজন। কেউ মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে। কেউ পড়ার চাপ নিতে পারে না। কেউ বাড়ির অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, টাকা আসে না। কেউ বুঝতে পারে এটা সে চায়নি, বাবা-মা চেয়েছিল।
কেউ এ নিয়ে কথা বলে না। ক্লাসে একটা সিট খালি হলে বাকিরা তাকায়, তারপর ভুলে যায়। কারণ নিজের পড়াই শেষ হচ্ছে না, অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়?
সুমাইয়ার ব্যাচে এক মাসে তিনজন অনিয়মিত হয়ে গেছে। একজন ছেলে, গোপালগঞ্জ থেকে এসেছিল। ক্লাসে আসত, পেছনের বেঞ্চে বসত, কিছু বলত না। একদিন আসা বন্ধ। কেউ জানে না কেন। কেউ জিজ্ঞেসও করেনি।
৯
রাত এগারোটা। সুমাইয়া ফোন করল জাহিদকে।
জাহিদ রিসিভ করল দ্বিতীয় রিংয়ে। সে কোড লিখছিল। VS Code খোলা, টার্মিনালে কিছু একটা রান করছে।
"কেমন আছ?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"ভালো।"
কিন্তু "ভালো" শব্দটা ভালো শোনাল না। ক্লান্ত শোনাল। খালি শোনাল। যেন শব্দটার ভেতরটা ফাঁকা।
সুমাইয়া কথা বলছে। কিন্তু আগের মতো না। আগে ফোনে এনার্জি থাকত। পরীক্ষার স্ট্রেস থাকত, কিন্তু তারপরেও একটা উত্তেজনা থাকত। "আজ এটা পড়লাম, আজ ওটা বুঝলাম, আজ স্যার এটা বললেন।" এখন কথাগুলো একটানা। সমতল। কোনো উচ্চতা নেই, কোনো নিচুতা নেই।
"ক্যাডাভার ল্যাবে গেলাম আজ," সুমাইয়া বলল।
"কেমন লাগল?"
"জানি না। লাগল। কিন্তু কী লাগল সেটা বলতে পারব না।"
চুপ। কয়েক সেকেন্ড।
"জাহিদ, একটা কথা বলব?"
"বল।"
"আমি ডাক্তার হতে এসেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটাও রোগী দেখিনি। শুধু মৃতদেহ দেখেছি।"
জাহিদ কিছু বলল না। কী বলবে? সুমাইয়া ঠিকই বলেছে। ফার্স্ট ইয়ারে কোনো রোগী দেখার সুযোগ নেই। ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার শুরু হয় থার্ড ইয়ার থেকে। তার মানে সুমাইয়াকে দুই বছর শুধু বই পড়তে হবে, মৃতদেহ কাটতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে, কিন্তু একজন জীবিত রোগীর সাথে কথাও বলতে পারবে না।
"এটা কি আমি চেয়েছিলাম?" সুমাইয়া বলল। "নাকি বাবা চেয়েছিলেন?"
জাহিদ চুপ করে রইল।
কিছু প্রশ্নের উত্তর অন্যের দেওয়া উচিত না। কিছু প্রশ্ন নিজেকে নিজে করতে হয় আর নিজেকে নিজে উত্তর দিতে হয়। জাহিদ জানে সুমাইয়ার বাবা স্কুল শিক্ষক, মাসে কুড়ি হাজার টাকা বেতন, আর তার মেয়ে ডাক্তার হবে এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সুমাইয়া কি নিজে চেয়েছিল? নাকি বাবার চোখের স্বপ্ন দেখে নিজেরও স্বপ্ন মনে হয়েছিল?
জাহিদ বলল, "ঘুমাও। কাল ক্লাস আছে তোমার।"
সুমাইয়া বলল, "হ্যাঁ। আছে।"
ফোন রেখে দিল।
১০
রাত দুইটা।
সুমাইয়া পড়ছে। Upper limb-এর anatomy। Brachial plexus। পাঁচটা root, তিনটা trunk, ছয়টা division, তিনটা cord, শেষে branches। প্রতিটা nerve কোথা থেকে বের হয়, কোথায় যায়, কোন muscle-কে innervate করে, সব মনে রাখতে হবে।
ফোনের ফ্ল্যাশলাইটে পড়ছে। রুমের লাইট বন্ধ। বাকি সাতজন ঘুমাচ্ছে। ঘুমাচ্ছে মানে, ঘুমানোর চেষ্টা করছে। আটজনের ঘরে নিরবতা কখনো পুরোপুরি নিরব হয় না। কেউ নিশ্বাসের শব্দ করে, কেউ পাশ ফেরে, কেউ ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে।
সুমাইয়া বইয়ের পেজে চোখ রেখেছে। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না। Brachial plexus-এর diagram দেখছে, কিন্তু দেখছে না। চোখ পড়ছে, মস্তিষ্ক পড়ছে না।
নিচের বাঙ্কে নাফিসা। হঠাৎ একটা শব্দ। খুব আস্তে। চাপা। কান্নার শব্দ।
সুমাইয়া বই থেকে চোখ তুলল। কান পাতল। হ্যাঁ, নাফিসা কাঁদছে। বালিশে মুখ চাপা দিয়ে কাঁদছে। শব্দ হচ্ছে না প্রায়, কিন্তু নিশ্বাসের ছন্দটা বদলে যাচ্ছে। ফুঁপানোর শব্দ। চাপা, ভাঙা, একটু একটু করে বের হচ্ছে।
সুমাইয়া কিছু বলল না। নাফিসাও কিছু বলল না।
দুইজনের কেউ কাউকে acknowledge করল না। কারণ করলে কী হবে? সুমাইয়া কী বলবে? "কেঁদো না"? কেন কাঁদবে না? কাঁদার যথেষ্ট কারণ আছে। "সব ঠিক হয়ে যাবে"? হয়তো হবে। হয়তো হবে না। এই মুহূর্তে কেউ জানে না।
তাই চুপ। দুইজনেই চুপ।
সুমাইয়া আবার বইয়ে চোখ ফেরাল। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলো পেজে পড়ছে। Brachial plexus। C5, C6, C7, C8, T1। পাঁচটা root।
নাফিসার কান্না থামল। ঘুমিয়ে পড়ল হয়তো। বা থামাল।
সুমাইয়া পড়ছে। রাত দুইটা পনের। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। হোস্টেলের করিডোরে একটা বিড়াল হাঁটছে, নখের শব্দ হচ্ছে টাইলসে।
এটাই মেডিকেল কলেজ। এটাই ফার্স্ট ইয়ার। এটাই সাদা অ্যাপ্রোনের ওজন। বাইরে থেকে যেটাকে সম্মান বলে, সামাজিক মর্যাদা বলে, "আমার মেয়ে ডাক্তার" বলে, ভেতর থেকে সেটা ফরমালিনের গন্ধ, ফোনের ফ্ল্যাশলাইটে পড়া, আর পাশের বেডে চাপা কান্না।
সুমাইয়া পেজ উলটাল। পরের পেজ। আরও nerve। আরও muscle। আরও origin, insertion, action, nerve supply, blood supply।
পড়তে হবে। আর কোনো অপশন নেই।