প্রফ পরীক্ষার যুদ্ধ
একশো বিশ জনের মধ্যে বারো জন হেরে গেল, আর সুমাইয়া টিকে রইল
১
সুমাইয়া তিন মাস ধরে পড়ছে।
তিন মাস। একটানা। দিনে ষোলো ঘণ্টা। কখনো আঠারো। ঘুম ছয় ঘণ্টা, কখনো পাঁচ, কখনো সাড়ে চার। বাকি সময়টুকু একটাই কাজ: পড়া। খাওয়া, গোসল, নামাজ, এগুলো ফাঁকে ফাঁকে হয়। কিন্তু বাকি সবটুকু সময় বইয়ের ভেতর।
প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা। MBBS-এর প্রথম গেট। Anatomy, Physiology, Biochemistry। তিনটা সাবজেক্ট। প্রতিটার Written, Practical, Viva। মোট নয়টা পরীক্ষা। যেকোনো একটায় ফেল মানে পুরো বছর আবার। বারো মাস। একটা সাবজেক্টের জন্য পুরো বছর।
সুমাইয়ার রুমমেট নাফিসা বলল, "তুই কি মরে যাবি নাকি?"
সুমাইয়া উত্তর দিল না। Cunningham's Manual-এর ১১২ পৃষ্ঠায় brachial plexus-এর একটা ডায়াগ্রাম আছে। Roots, trunks, divisions, cords, branches। সে এটা সাতবার এঁকেছে। আটবারে এসেও একটা branch ভুল হচ্ছে। Lateral pectoral nerve কোন cord থেকে বের হয়? Lateral cord। ঠিক আছে। কিন্তু medial pectoral nerve? Medial cord। নামে medial, cord-ও medial। কিন্তু lateral pectoral nerve-এর innervation কোনটা? Clavicular head of pectoralis major। এটা কেন মনে থাকে না?
সে আবার আঁকল। নবমবার।
ফোন বন্ধ। তিন সপ্তাহ হলো। জাহিদকে একটা মেসেজ দিয়ে বলেছিল, "পরীক্ষার পরে কথা হবে। রাগ করো না।" জাহিদ রাগ করেনি। সে বুঝেছে। কিন্তু বোঝার পরেও একটা ফাঁকা জায়গা থাকে। সেটা সুমাইয়া এখন ভাবার সময় পাচ্ছে না।
২
মেডিকেলের প্রফেশনাল পরীক্ষা একটা অদ্ভুত জিনিস।
বাংলাদেশে MBBS পাঁচ বছরের কোর্স, প্লাস এক বছর ইন্টার্নশিপ। এই পাঁচ বছরে চারটা প্রফেশনাল পরীক্ষা। প্রতিটা পাশ না করলে পরের ধাপে যাওয়া যায় না। ফেল করলে পুরো বছর রিপিট। কোনো গ্রেস নেই, কোনো supplementary নেই। হয় পাশ, নয় আবার।
প্রথম প্রফ সবচেয়ে কঠিন। কারণটা সহজ: ছেলেমেয়েরা কলেজ থেকে সবে এসেছে। HSC-তে পড়ালেখার ধরন ছিল মুখস্থ করো, খাতায় লেখো, নম্বর পাও। এখানে সেটা কাজ করে না। Anatomy-তে একটা হাড় হাতে ধরে বলতে হয় এটা কোন হাড়, কোন পাশের, কোন surface উপরে। Physiology-তে একটা ECG দেখে বলতে হয় রোগীর কী সমস্যা। Biochemistry-তে একটা metabolic pathway-র enzyme একটা missing হলে কী হবে, সেটা চেইন ধরে ধরে বলতে হয়।
পাশ করে ষাট থেকে সত্তর শতাংশ। বাকি তিরিশ শতাংশ? তারা আবার পড়ে। আবার পরীক্ষা দেয়। কেউ কেউ দুইবার রিপিট করে। কেউ কেউ ছেড়ে দেয়।
সুমাইয়ার ব্যাচে একশো বিশ জন। সেশন শুরু হয়েছিল একশো বিশ জন দিয়ে। প্রথম প্রফ-এ বসবে একশো বিশ জন। কিন্তু সবাই পার হবে না।
৩
পরীক্ষার ফর্ম্যাট তিন ধাপে।
প্রথম ধাপ: Written। MCQ, SAQ, আর Essay। MCQ-তে চারটা অপশন, একটা সঠিক, নেগেটিভ মার্কিং আছে। ভুল করলে কাটা যাবে। SAQ মানে Short Answer Question, দুই-তিন লাইনে উত্তর। Essay মানে পুরো পাতাজুড়ে লেখা। Anatomy-র Written-এ একটা প্রশ্ন আসতে পারে: "Describe the blood supply of the stomach with a neat labelled diagram." এটা লিখতে তিরিশ মিনিট লাগে। ডায়াগ্রাম আঁকতে আরো দশ।
দ্বিতীয় ধাপ: Practical। Anatomy-র Practical মানে Dissection। একটা cadaver-এর সামনে দাঁড়িয়ে একটা structure identify করতে হবে। Examiner বলবে, "Show me the ulnar nerve at the elbow." খুঁজে বের করতে হবে। সময় দুই মিনিট। দুই মিনিটে না পারলে, পরের station-এ যাও। Physiology-র Practical-এ haemoglobin estimation, blood grouping, spirometry। Biochemistry-তে qualitative analysis, কোন sample-এ কোন substance আছে, সেটা chemical test দিয়ে বের করো।
তৃতীয় ধাপ: Viva। মুখোমুখি। একজন Professor, তুমি, আর একটা টেবিল। Professor যা খুশি জিজ্ঞেস করতে পারে। কোনো সিলেবাস নেই, কোনো সীমানা নেই। সে চাইলে পুরো বইটা জিজ্ঞেস করতে পারে। তোমার কাজ উত্তর দেওয়া। ভুল উত্তর দিলে সে তোমাকে আরো ভেতরে নিয়ে যাবে। সঠিক উত্তর দিলে আরো কঠিন প্রশ্ন আসবে। থামবে তখনই, যখন তুমি আটকে যাবে। অথবা সময় শেষ হবে।
৪
ভাইভা নিয়ে গল্পের শেষ নেই।
হোস্টেলের রুমে রুমে ভাইভার গল্প ছড়ায় ভাইরাসের মতো। সিনিয়রদের কাছ থেকে আসে। ব্যাচমেটদের কাছ থেকে আসে। কিছু সত্যি, কিছু বানানো, কিন্তু সবগুলোই ভয় ধরায়।
"গত বছর ফারুক স্যার মুড খারাপ থাকায় টানা সাতজনকে ফেল করিয়ে দিছে।"
"শিরিন ম্যাডাম ঠিকমতো সালাম না দিলে মার্কস কাটে।"
"হাসান স্যার প্রথম প্রশ্নের উত্তর না পারলে বাকিটা শোনে না। সোজা বের করে দেয়।"
সুমাইয়া এসব শুনে ভয় পায়। সে ভয় পায় কিন্তু সেটা দেখায় না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসার প্র্যাক্টিস করে। এটা মজার গল্প না। এটা সত্যি। মেডিকেল কলেজের মেয়েরা ভাইভার আগে আয়নায় হাসার চর্চা করে। চোখে আত্মবিশ্বাস আনার চেষ্টা করে। কারণ একজন Professor-এর সামনে যদি তুমি নার্ভাস দেখাও, সে ভাববে তুমি পড়োনি। আর পড়োনি মানে ফেল।
নাফিসা বলল, "তুই কেন এত tension নিচ্ছিস? তুই তো পড়ছিস।"
সুমাইয়া বলল, "পড়া আর পারা এক জিনিস না।"
৫
পরীক্ষা শুরু হলো।
Written তিনদিন। প্রতিদিন সকাল নটা থেকে দুপুর একটা। চার ঘণ্টা। হাত ব্যথা হয়ে যায়। আঙুলে কলম ধরার জায়গায় একটা শক্ত গোটা পড়ে গেছে, সেটা আরো শক্ত হলো। Anatomy-র Written-এ একটা প্রশ্ন এসেছিল mediastinum নিয়ে। সুমাইয়া পেরেছে। Physiology-তে renal physiology থেকে একটা essay এসেছিল। Counter-current mechanism। সে পেরেছে, কিন্তু ডায়াগ্রামটা তেমন ভালো হয়নি। Biochemistry-তে lipid metabolism। Beta-oxidation-এর steps। এটা সে রাত তিনটায় শেষবার পড়েছিল, পরীক্ষার আগের রাতে। মনে ছিল।
Practical দুইদিন। Anatomy-র Dissection-এ তার station-এ পড়েছিল axilla। সে axillary artery-র branches বলতে পেরেছে। ছয়টা। Superior thoracic, thoracoacromial, lateral thoracic, subscapular, anterior circumflex humeral, posterior circumflex humeral। কিন্তু subscapular artery-র branch কোনটা? Circumflex scapular আর thoracodorsal। সে একটু আটকে গিয়েছিল। তারপর মনে পড়েছে।
Physiology-র Practical-এ একটা ECG দিয়ে বলেছে interpret করো। Normal sinus rhythm। Rate calculate করতে হয়েছে। 300 ভাগ large squares-এর সংখ্যা। চার square ছিল। 300 ভাগ 4 সমান 75 beats per minute। Normal range।
Biochemistry-র Practical-এ unknown sample-এ glucose ছিল। Benedict's test দিলে brick-red precipitate। সহজ ছিল।
৬
তারপর ভাইভা।
সুমাইয়ার Anatomy ভাইভা ছিল Dr. Kamal Hossain-এর কাছে। উনি strict, কিন্তু fair। মুড খারাপ থাকলেও প্রশ্ন ঠিকমতো করেন, উত্তর শুনেন।
"Brachial plexus-এর roots কয়টা?" উনি জিজ্ঞেস করলেন।
"পাঁচটা, স্যার। C5, C6, C7, C8, T1।"
"Erb's point কোনটা?"
"Upper trunk, স্যার। C5-C6 junction। Erb-Duchenne palsy হলে waiter's tip position হয়।"
"কেন?"
"কারণ suprascapular nerve, musculocutaneous nerve, আর axillary nerve damage হয়। Shoulder abduction, elbow flexion, আর forearm supination lost হয়।"
স্যার মাথা নাড়লেন। ভালো না মন্দ, সেটা বোঝা গেল না। কিন্তু তিনি পরের প্রশ্নে গেলেন। সুমাইয়া জানে, পরের প্রশ্নে যাওয়া মানে আগেরটা ঠিক ছিল। আটকে গেলে তিনি সেখানেই খোঁড়াখুঁড়ি করতেন।
Physiology ভাইভা একটু কঠিন হলো। Cardiac cycle নিয়ে প্রশ্ন এলো। Isovolumetric contraction কতক্ষণ? 0.05 সেকেন্ড। Rapid ejection phase-এ কত percent blood বের হয়? সত্তর শতাংশ। এটা সুমাইয়া পেরেছে। কিন্তু pressure-volume loop-এর একটা প্রশ্নে আটকে গেল। Examiner বললেন, "It's okay, move on."
Biochemistry ভাইভায় একজন নতুন Professor ছিলেন। তিনি gluconeogenesis-এর regulatory enzymes জিজ্ঞেস করলেন। তিনটা। Pyruvate carboxylase, PEP carboxykinase, Fructose 1,6-bisphosphatase। সুমাইয়া বলতে পেরেছে। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "Cori cycle কী?" সুমাইয়া বলল। তারপর "glucose-alanine cycle?" সেটাও বলল। Professor হাসলেন।
৭
রেজাল্ট বের হলো একটা বিকেলে।
নোটিশ বোর্ডে লিস্ট টানানো হলো। একশো বিশটা রোল নম্বর। কিছু নম্বরের পাশে "P"। কিছু নম্বরের পাশে "F"।
সুমাইয়া দৌড়ে গেল না। সে হেঁটে গেল। ধীরে। পেটের ভেতরে কিছু একটা পাক খাচ্ছে। হাত ঠান্ডা। পা কাঁপছে না, কিন্তু হাঁটু একটু নরম লাগছে।
তার রোল নম্বর ৪৭।
৪৭-এর পাশে "P"।
পাশ।
সে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করল। একটা লম্বা শ্বাস নিল। ফুসফুস ভরে গেল। তারপর ছাড়ল। আস্তে আস্তে।
এটা আনন্দ না। এটা হালকা হওয়া। তিন মাসের একটা বোঝা নামল। শরীরটা হঠাৎ খুব হালকা লাগল, যেন মাধ্যাকর্ষণ কমে গেছে।
নাফিসাও পাশ করেছে। দুজনে হোস্টেলে ফিরল। সুমাইয়া বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল।
সে চোদ্দো ঘণ্টা ঘুমাল।
এক টানা। কোনো স্বপ্ন নেই। কোনো ভয় নেই। শরীরটা তিন মাসের ঘুমের ঋণ শোধ করল একদিনে।
৮
কিন্তু সবার গল্প এরকম না।
একশো বিশ জনের মধ্যে বারো জন ফেল করেছে। বারো জন। দশ শতাংশ। জাতীয় গড়ের চেয়ে ভালো, কারণ সিলেট মেডিকেল ভালো কলেজ। কিন্তু বারো জনের প্রতিটার জন্য এটা একটা দুর্ঘটনা।
বারো জন এখন আবার পড়বে। আবার একই Anatomy, একই Physiology, একই Biochemistry। আবার ষোলো ঘণ্টা। আবার ভাইভা। আবার সেই আয়নার সামনে হাসার প্র্যাক্টিস। আর একটা বছর।
কিন্তু বারো জনের সবার জন্য এই "আরেকটা বছর" সমান না।
৯
তানিয়া ফেল করেছে।
তানিয়ার বাবা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক। গাজীপুরে তিনটা ফ্যাক্টরি। বার্ষিক টার্নওভার কোটির ঘরে। তানিয়া admission coaching-এ দশ লাখ টাকা খরচ করেছে। কলেজে প্রতি মাসে তার খরচ পঁচিশ হাজার, হোস্টেলে না থেকে শহরে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে আছে। AC আছে, Wi-Fi আছে, রান্নার লোক আছে।
তানিয়া ফেল করেছে।
তার বাবা ফোনে বললেন, "কোনো সমস্যা নেই, মা। আবার দিবি। এবার ভালো করে পড়বি।"
তানিয়ার জন্য এই ফেল একটা গতি বাধা। একটা বছর বেশি লাগবে। খরচ হবে আরো পাঁচ-ছয় লাখ। কিন্তু পরিবার এটা absorb করতে পারবে। ফ্যাক্টরি চলছে, টাকা আসছে। তানিয়ার জীবনে এই ফেল একটা বাম্প, speedbreaker। গাড়ি থামবে, তারপর আবার চলবে।
১০
রুবেল ফেল করেছে।
রুবেলের বাবা কিশোরগঞ্জের একটা গ্রামে চাষ করে। তিন বিঘা জমি। ধান আর পাট। বছরে আয় দেড় লাখ টাকা। রুবেল মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল মেধা দিয়ে। ফ্রি সিট। সরকারি কলেজ। টিউশন ফি নেই বললেই চলে। কিন্তু হোস্টেল, খাওয়া, বই, যাতায়াত, এসব মিলিয়ে মাসে সাত-আট হাজার টাকা লাগে। বাবা জমির একটা অংশ বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছে।
রুবেল ফেল করেছে।
আরেকটা বছর মানে আরো এক লাখ টাকা। বাবার কাছে সেই টাকা নেই। জমি আর বন্ধক দেওয়ার মতো নেই। ভাই ঢাকায় রিকশা চালায়, সে মাসে দুই হাজার পাঠায়। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, সেখান থেকে আরো দেড় হাজার। এটুকু দিয়ে সংসার চলে, কিন্তু ছেলের মেডিকেলের বাড়তি খরচ চলে না।
রুবেল ফোনে বাবাকে বলল, "বাবা, আমি ফেল করছি।"
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বাবা বললেন, "কী করবি এখন?"
রুবেল জানে কী করবে। সে জানে কিন্তু বলতে পারছে না। কারণ বলা মানে স্বীকার করা। আর স্বীকার করা মানে ছেড়ে দেওয়া।
রুবেল MBBS ছেড়ে দিল।
সে কিশোরগঞ্জে ফিরে গেল। একটা ফার্মেসিতে কাজ নিল। মাসে বারো হাজার টাকা বেতন। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল যে ছেলে, সে এখন ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে অন্যের prescription পড়ে ওষুধ বের করে দেয়।
১১
এটাই class divide।
তানিয়া ফেল করেছে, আবার দেবে। রুবেল ফেল করেছে, আর দিতে পারবে না। দুজনের পরীক্ষা একই ছিল। প্রশ্ন একই ছিল। হল রুম একই ছিল। কিন্তু ফেলের পরিণাম আলাদা। কারণ একজনের পেছনে টাকা আছে, আরেকজনের পেছনে নেই।
মেডিকেল কলেজ সরকারি। টিউশন ফি প্রায় শূন্য। কিন্তু পড়ার খরচ শূন্য না। বই কিনতে হয়, খেতে হয়, থাকতে হয়, পরীক্ষার ফি দিতে হয়। আর সবচেয়ে বড় খরচ হলো সময়। ছয় বছর। ছয় বছর ধরে একটা পরিবারকে একজন কর্মক্ষম মানুষের আয় ছাড়া চলতে হয়। গরিব পরিবারের জন্য এই ছয় বছর একটা জুয়া। জিতলে সব পাল্টে যায়। হারলে? হারলে রুবেলের মতো হয়।
সুমাইয়া এটা বোঝে। সে দেখেছে রুবেলকে হোস্টেল থেকে ব্যাগ গোছাতে। সে দেখেছে রুবেলের চোখ। সেই চোখে কান্না ছিল না। কান্না থাকলে ভালো হতো। কান্নার পরে মানুষ হালকা হয়। রুবেলের চোখে ছিল শূন্যতা। একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, আর সে জানে এটা আর খুলবে না।
১২
সুমাইয়া সেদিন রাতে জাহিদকে ফোন করল। তিন সপ্তাহ পরে প্রথম ফোন।
"পাশ করেছি।"
জাহিদ বলল, "আমি জানতাম।"
"তুই জানতি কীভাবে?"
"তুই তিন মাস ফোন বন্ধ রাখলি, ষোলো ঘণ্টা পড়লি। তুই ফেল করবি কোন দুনিয়ায়?"
সুমাইয়া হাসল। ক্লান্ত হাসি। চোদ্দো ঘণ্টা ঘুমের পরেও ক্লান্তি যায়নি। এই ক্লান্তি শরীরের না। মাথার ভেতরে একটা জায়গা আছে যেখানে তিন মাসের চাপ জমে আছে। সেটা যেতে সময় লাগবে।
"তোর কেমন চলছে?" সে জিজ্ঞেস করল।
জাহিদ বলল, "এই মাসে তিনশো ডলার ইনকাম হয়েছে। মানে প্রায় ছত্রিশ হাজার টাকা।"
সুমাইয়া চুপ করে রইল।
ছত্রিশ হাজার টাকা। তার বাবা যা বেতন পান। জাহিদ NU-তে Physics পড়তে পড়তে ফ্রিল্যান্সিং করে ছত্রিশ হাজার টাকা কামাচ্ছে। আর সে? সে MBBS-এ ভর্তি হয়ে তিন মাস ষোলো ঘণ্টা পড়ে, একটা পরীক্ষায় কোনোরকম পাশ করেছে। তার ইনকাম শূন্য। এই মুহূর্তে সে পরিবারের উপর বোঝা।
কিন্তু দশ বছর পরে?
দশ বছর পরে সুমাইয়া হবে একজন ডাক্তার। হয়তো specialist। তখন তার মাসিক আয় হতে পারে এক থেকে দেড় লাখ টাকা। জাহিদ হয়তো তখনো ফ্রিল্যান্সিং করবে, বা হয়তো একটা ছোট IT firm খুলবে। তার আয় হয়তো পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ। তফাতটা তখন আর তেমন বড় না।
কিন্তু প্রশ্নটা হলো: সুমাইয়ার পরিবার কি আরো ছয় বছর এই শূন্য আয় সহ্য করতে পারবে?
১৩
জাহিদ প্রশ্নটা করল না। সে জানে এটা করার জায়গা না।
কিন্তু সে হিসাবটা মাথায় করল। NU-র ফিজিক্সে তার বার্ষিক খরচ বিশ হাজার টাকার মতো। আর সে মাসে ছত্রিশ হাজার কামাচ্ছে। মানে সে net positive। পরিবারে টাকা দিতে পারছে। বাবার ভ্যানের চাকা ভাঙলে সে টাকা পাঠায়। মিমের স্কুলের বই সে কিনে দেয়।
সুমাইয়ার MBBS-এ বার্ষিক খরচ? হোস্টেল, খাওয়া, বই, যাতায়াত মিলিয়ে বছরে লাখ দেড়েক। আর সে একটা টাকাও কামায় না। মানে সে net negative। পরিবার তার পেছনে টাকা ঢালছে, কিছু ফেরত আসছে না। এটা একটা investment। দীর্ঘমেয়াদী। কিন্তু investment-এ return আসতে সময় লাগে। আর এই সময়টুকুতে পরিবারকে টিকে থাকতে হয়।
রুবেলের পরিবার পারেনি।
তানিয়ার পরিবার পারবে। কারণ তাদের surplus আছে।
সুমাইয়ার পরিবার? মাঝামাঝি। তার বাবা সরকারি কর্মচারী, বেতন নিয়মিত। কিন্তু বাড়তি নেই। একটা ধাক্কা, একটা অসুখ, একটা বিয়ে, এসবের যেকোনো একটা হলেই হিসাব গড়বড়। সুমাইয়া টিকে আছে, কিন্তু পাতলা দড়ির ওপর।
১৪
মেডিকেল স্কুল একটা endurance test। Intelligence দিয়ে ঢুকতে হয়, কিন্তু টিকে থাকতে লাগে stamina, money, আর luck।
সুমাইয়ার প্রথম বছর শেষ। সে পাশ করেছে। কোনোরকম না, মোটামুটি ভালোভাবে পাশ করেছে। কিন্তু Top mark না। সেটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। এই মুহূর্তে পাশ করাটাই যথেষ্ট।
সামনে আরো চার বছর। আরো তিনটা Professional Exam। প্রতিটা আগেরটার চেয়ে কঠিন। Second Prof-এ Pharmacology, Pathology, Microbiology, Community Medicine। Third Prof-এ Forensic Medicine, Ophthalmology, ENT। Final Prof-এ Medicine, Surgery, Obstetrics and Gynaecology। প্রতিটায় Written, Practical, Viva। প্রতিটায় ফেল করলে বছর রিপিট।
ফিনিশ লাইন ছয় বছর দূরে।
সুমাইয়া কোনোমতে প্রথম বছর পার করেছে। বাকি পাঁচ।
সে ফোন রেখে দিল। জাহিদও রেখে দিল। দুজনেই চুপ। দুজনের পথ আলাদা, গতি আলাদা, গন্তব্য আলাদা। কিন্তু দুজনেই জানে, এই মুহূর্তে তারা যে যার জায়গায় ঠিক আছে। এটুকুই যথেষ্ট।
এখনকার জন্য।