ওয়ার্ডের বাস্তবতা

সাদা অ্যাপ্রোনের নিচে যে ভাঙা সিস্টেম লুকিয়ে থাকে

পর্ব ৩৪ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

সুমাইয়া তৃতীয় বর্ষে উঠেছে। এই বছর থেকে ওয়ার্ড শুরু।

প্রথম দুই বছর ক্লাসরুমে বসে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি পড়েছে। ক্যাডাভার ধরেছে, এনজাইম সাইকেল আঁকতে আঁকতে খাতার পাতা ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা ছিল বই-এর জগত। পরিষ্কার ছবি, লেবেলড ডায়াগ্রাম। বাস্তবতা অন্যরকম হবে, সবাই বলেছিল। সুমাইয়া ভেবেছিল সে প্রস্তুত।

সে প্রস্তুত ছিল না।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সরকারি। পাঁচশো বেডের হাসপাতাল, কিন্তু যেকোনো দিন গুনলে সাতশো থেকে আটশো রোগী পাওয়া যাবে। বাকি দুইশো-তিনশো কোথায় থাকে? মেঝেতে। করিডোরে। সিঁড়ির নিচে। কেউ কেউ বাইরের বারান্দায়, খোলা আকাশের নিচে, একটা চাটাই বিছিয়ে।

তৃতীয় বর্ষের প্রথম দিন সুমাইয়া মেডিসিন ওয়ার্ডে ঢুকল। সাদা অ্যাপ্রোন পরা। গলায় স্টেথোস্কোপ। হাতে একটা নতুন খাতা। মনে একটা ধারণা যে সে এখন থেকে রোগী দেখবে, শিখবে, একদিন সুস্থ করবে।

ওয়ার্ডের দরজা খুলতেই গন্ধটা এসেছে আগে।

ডেটল, পুরোনো রক্ত, প্রস্রাব, আর ঘামের একটা মিশ্রণ। সুমাইয়ার পাশে দাঁড়ানো একটা মেয়ে মুখ চেপে ধরল। সুমাইয়া ধরল না। কিন্তু পেটের ভেতরটা উলটে গেল।

বিছানাগুলো একটার সাথে আরেকটা লাগানো। পর্দা নেই। যে বিছানায় একজন শুয়ে আছে, পাশের বিছানায় আরেকজন কাশছে। কাশি দিয়ে যা বের হচ্ছে, পাশের রোগীর মুখের কাছে যাচ্ছে। ইনফেকশন কন্ট্রোল বইতে পড়েছে সুমাইয়া। এখানে সেটা একটা তাত্ত্বিক ধারণা।

সিনিয়র এক রেসিডেন্ট ডাক্তার ওদের গ্রুপকে নিয়ে ওয়ার্ড রাউন্ডে বেরিয়েছে। তার নাম ডক্টর ফয়সাল। চতুর্থ বর্ষের রেসিডেন্ট। চোখের নিচে কালো দাগ। মুখে দুই দিনের দাড়ি। হাতে একটা বাইক্কাল কলম, যেটা দিয়ে প্রেসক্রিপশনও লেখে, কান চুলকায়ও।

"আজকে তোমরা প্রথমবার ওয়ার্ডে এসেছো," ডক্টর ফয়সাল বলল। "বইতে যা পড়েছো, সেটার সাথে এখানকার কোনো মিল পাবে না। বই তোমাদের বলেছে একটা রোগী, একটা বেড, একটা চার্ট। এখানে একটা বেডে দুইজন। চার্ট হারিয়ে গেছে। আর রোগী? রোগী তোমার চেয়ে বেশি জানে তার অসুখের কথা।"

সুমাইয়া প্রথম রোগী দেখল বিকেল তিনটায়।

একজন বৃদ্ধ মানুষ। বয়স সত্তর-পঁচাত্তর। পেটে পানি জমেছে। লিভার সিরোসিস। ডক্টর ফয়সাল বলল, "হিস্ট্রি নাও।"

সুমাইয়া বিছানার পাশে বসল। "দাদা, আপনার কী সমস্যা?"

বৃদ্ধ মানুষটা তাকাল। চোখ হলুদ। চামড়া হলুদ। জন্ডিসের শেষ পর্যায়।

"আমার আর সমস্যা নাই, মা। আমি মরতে আইছি।"

সুমাইয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। বইতে এই পরিস্থিতির কোনো উত্তর লেখা নেই। রোগী যখন বলে "আমি মরতে আইছি," তখন ডাক্তারের কী বলা উচিত? থার্ড ইয়ারের সিলেবাসে এই চ্যাপ্টার নেই।

"দাদা, আপনি ভালো হয়ে যাবেন। চিকিৎসা চলছে।"

বৃদ্ধ মানুষটা হাসল। দাঁত নেই। মাড়ি দিয়ে হাসল। "তুমি নতুন, তাই না? নতুন ডাক্তাররা সবসময় এই কথা বলে। পুরোনোগুলো আর বলে না।"

ডক্টর ফয়সাল পেছন থেকে শুনছিল। কিছু বলল না। সুমাইয়া উঠে আসার পর বলল, "প্রতিদিন এরকম রোগী পাবে। অভ্যস্ত হতে হবে।"

"অভ্যস্ত হওয়া কি ঠিক?" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল।

ফয়সাল একটু থামল। তারপর বলল, "ঠিক কি না সেটা পরে ভাববে। আগে টিকে থাকো।"

ওয়ার্ডের বাস্তবতা সুমাইয়া প্রতিদিন একটু একটু করে বুঝতে লাগল।

মেডিসিন ওয়ার্ডে তিনজন ডাক্তার। দুইশো রোগী। এর মানে একজন ডাক্তার প্রতিদিন সত্তরজন রোগী দেখবে। একজনকে পাঁচ মিনিট দিলেও সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। কিন্তু পাঁচ মিনিট কে দেয়? দুই মিনিট। দেড় মিনিট। কখনো ত্রিশ সেকেন্ড। প্রেসক্রিপশন লিখে পরেরজন।

ইকুইপমেন্ট। ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিন তিনটা, দুইটা নষ্ট। অক্সিজেন সিলিন্ডার ছয়টা, দুইটা খালি। পালস অক্সিমিটার একটা, সেটা কখনো কাজ করে, কখনো করে না। ভেন্টিলেটর নেই। আইসিইউতে চারটা বেড, কিন্তু মেশিন আছে দুইটায়। বাকি দুইটা বেড শুধু বেড, আইসিইউ-র নাম নিয়ে।

গ্লাভস। একটা বক্সে একশো পিস। সেটা সাত দিন চলার কথা। তিন দিনে শেষ হয়ে যায়। তারপর? তারপর খালি হাতে।

সুমাইয়া একদিন দেখল একজন সিনিয়র ডাক্তার খালি হাতে একটা ক্ষত পরিষ্কার করছেন। "স্যার, গ্লাভস?" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল।

"গ্লাভস শেষ। স্টোরে বলেছি, আসবে সোমবার।"

"আজ বুধবার।"

"হ্যাঁ। তাহলে কী করবে? রোগীকে বলবে সোমবার আসেন?"

সুমাইয়া চুপ করে গেল।

সিনিয়র ডাক্তারদের কথা আলাদা করে বলতে হয়।

ডক্টর নাজমুল হক। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, মেডিসিন বিভাগ। বয়স চল্লিশ। চুলে পাক ধরেছে। সরকারি বেতন মাসে সাঁইত্রিশ হাজার টাকা। সাঁইত্রিশ হাজার। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, যিনি এমবিবিএস, এফসিপিএস করেছেন, দশ বছর ট্রেনিং করেছেন, সাঁইত্রিশ হাজার টাকা পান।

সিলেটে ফ্ল্যাটের ভাড়া পনেরো হাজার। বাচ্চার স্কুল পাঁচ হাজার। বাজার দশ হাজার। বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি তিন হাজার। সাঁইত্রিশ হাজারে মাস শেষ হয় না।

তাহলে সন্ধ্যায় চেম্বার। বিকেল পাঁচটায় হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সোজা চেম্বারে। রাত দশটা পর্যন্ত। ভিজিট পাঁচশো টাকা। দিনে পনেরো-বিশজন দেখলে আট-দশ হাজার। মাসে আড়াই-তিন লাখ। এটা দিয়ে চলে।

কিন্তু মানুষটা সকাল আটটা থেকে রাত দশটা কাজ করছে। চৌদ্দ ঘণ্টা। সপ্তাহে ছয় দিন। বিশ্রাম নেই। বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসার সময় নেই।

ডক্টর নাজমুল একদিন ওয়ার্ড রাউন্ডে বলছিলেন, "তোমরা ডাক্তার হচ্ছো। ভালো কথা। কিন্তু একটা জিনিস জেনে রাখো, সরকার তোমাদের দিয়ে সস্তায় কাজ করাবে। তোমরা যত ভালো ডাক্তারই হও, সিস্টেম তোমাদের পিষে ফেলবে।"

থার্ড ইয়ারের ছাত্রছাত্রীরা চুপ করে শুনল।

"আমি এই হাসপাতালে দশ বছর আছি। দশ বছরে তিনবার ইকুইপমেন্ট আপডেট হয়েছে। দশ বছরে বেতন বেড়েছে পাঁচ হাজার টাকা। দশ বছরে রোগী বেড়েছে তিনগুণ।"

প্রথম নাইট ডিউটি।

সুমাইয়া জানত একদিন এটা আসবে। পুরো ব্যাচকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সুমাইয়ার পালা এসেছে একটা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়।

সন্ধ্যা ছয়টায় ঢুকেছে। পরের দিন সকাল আটটায় বের হবে। কিন্তু বের হওয়ার পরেও ক্লাস আছে, বিকেল তিনটা পর্যন্ত। মোট ছত্রিশ ঘণ্টা একটানা জেগে থাকা।

রাত বারোটার দিকে ইমার্জেন্সি থেকে একটা বাচ্চা এসেছে। তিন বছর বয়স। নিউমোনিয়া। শ্বাস নিতে পারছে না। বুকের পাঁজর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে প্রতিটা শ্বাসে। নাকের ডগা নীল হয়ে যাচ্ছে।

বাচ্চার মা কোলে করে নিয়ে এসেছে। গ্রাম থেকে। দুই ঘণ্টা বাসে করে। বাচ্চাটা কাঁদছে, কিন্তু কান্নার জোর নেই। ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদছে।

ডিউটি ডাক্তার দেখলেন। "অক্সিজেন লাগবে। সিলিন্ডার লাগাও।"

নার্স গেল সিলিন্ডার আনতে। ফিরে এসে বলল, "সিলিন্ডার খালি। স্টোরে বলেছি, কাল আসবে।"

সুমাইয়া দাঁড়িয়ে আছে পাশে। বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা তিন বছরের বাচ্চার অক্সিজেন দরকার, আর হাসপাতালে অক্সিজেন নেই।

ডিউটি ডাক্তার রেফার করতে চাইলেন প্রাইভেট হাসপাতালে। কিন্তু বাচ্চার মায়ের পার্সে আটশো টাকা। প্রাইভেটে ভর্তি হতে বিশ হাজার লাগবে।

"অ্যাম্বু ব্যাগ দাও।" ম্যানুয়ালি অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা। নার্স চেপে চেপে দিচ্ছে। সুমাইয়া পাশে দাঁড়িয়ে আছে। থার্ড ইয়ারের ছাত্রী। দেখা ছাড়া কোনো অধিকার নেই তার।

রাত দুইটায় বাচ্চাটা মারা গেল।

তিন বছরের একটা বাচ্চা। যার নাম ছিল রাফি। যার মা দুই ঘণ্টা বাসে করে এসেছিল। যার অসুখ ছিল নিউমোনিয়া, যেটা অক্সিজেন আর অ্যান্টিবায়োটিক দিলে ভালো হয়ে যেত। অক্সিজেন ছিল না।

মা চিৎকার করে কাঁদছে। ওয়ার্ডের অন্য রোগীরা জেগে গেছে। নার্স মাকে ধরে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। সুমাইয়া দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ডক্টর ফয়সাল এসেছে। সুমাইয়ার মুখ দেখে বুঝেছে।

"প্রথমবার?"

সুমাইয়া মাথা নাড়ল।

"অভ্যস্ত হয়ে যাবে।"

"আমি অভ্যস্ত হতে চাই না।"

ফয়সাল কিছু বলল না। চলে গেল। ফয়সাল চতুর্থ বর্ষে পড়ে। সে কতবার এই দৃশ্য দেখেছে, সুমাইয়া জানে না।

রাত তিনটায় সুমাইয়া ওয়ার্ডের বাইরে বেঞ্চে বসে আছে। ফোন হাতে। জাহিদের নম্বর ডায়াল করল।

তিনবার রিং হলো। চারবার। পাঁচবার। জাহিদ ঘুমাচ্ছে। NU-তে মিডটার্ম চলছে। রাত তিনটায় কে ফোন ধরে?

ষষ্ঠ রিং-এ জাহিদ ধরল।

"হ্যালো?" ঘুমভাঙা গলা।

"জাহিদ।"

জাহিদ সুমাইয়ার গলা শুনে উঠে বসল। এই গলা চেনে সে। এটা সুমাইয়ার স্বাভাবিক গলা না।

"কী হইছে?"

"একটা বাচ্চা মারা গেছে আজ। আমি কিছু করতে পারিনি।"

জাহিদ চুপ।

"তিন বছর বয়স। নিউমোনিয়া। অক্সিজেন লাগত। হাসপাতালে অক্সিজেন ছিল না। একটা সিলিন্ডার থাকলে বাচ্চাটা বেঁচে যেত।"

জাহিদের কিছু বলার নেই। সে NU-তে ফিজিক্স পড়ছে। ওয়েবসাইট বানাচ্ছে। তার পৃথিবী অন্যরকম। সে জানে না সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে রোগী শুয়ে থাকে। সে জানে না অক্সিজেন সিলিন্ডার খালি থাকতে পারে।

"তুমি কিছু বলো," সুমাইয়া বলল।

"আমি কী বলব?"

"জানি না। কিছু বলো।"

জাহিদ ভাবল। সান্ত্বনা দেবে? "সব ঠিক হয়ে যাবে" বলবে? সে তো জানে সব ঠিক হবে না। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল কাল ঠিক হয়ে যাবে না। পরশু না। আগামী বছরও না।

"তুমি ক্লান্ত। একটু ঘুমাও।"

"ঘুমাতে পারব না।"

"তাহলে আমি ফোনে আছি। কিছু বলতে না পারি, শুনতে পারি।"

সুমাইয়া কাঁদল না। কান্না আসেনি তার। যা এসেছে, সেটা কান্নার চেয়ে ভারী। একটা শূন্যতা। একটা রাগ, যেটা কার ওপর সে নিজেও জানে না।

ফোনে নীরবতা। দুইজন দুই শহরে বসে আছে। একজনের হাতে রক্তের দাগ। অন্যজনের হাতে ফিজিক্সের বই।

দশ মিনিট পর সুমাইয়া বলল, "জাহিদ, তুমি ঘুমাও। কাল তোমার পরীক্ষা আছে।"

"পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ না।"

"গুরুত্বপূর্ণ। তোমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমাও।"

সুমাইয়া ফোন রেখে দিল।

এটাই সরকারি হাসপাতাল।

রোগীরা মেঝেতে ঘুমায়। পরিবারের লোকজন বাসা থেকে বালিশ, চাদর, তোয়ালে নিয়ে আসে। ক্যান্টিনে যে খাবার পাওয়া যায়, সেটা খাওয়ার যোগ্য না। তাই পরিবার বাসা থেকে ভাত, তরকারি, ডাল এনে রোগীকে খাওয়ায়। ওষুধ? কিছু ওষুধ হাসপাতাল দেয়। বাকিটা বাইরে থেকে কিনতে হয়। ওষুধের টাকা রোগীর।

একটা সিনে ফিল্মের সেটিং না এটা। বাস্তব। প্রতিদিনের বাস্তব। আঠারো কোটি মানুষের মধ্যে যারা প্রাইভেট হাসপাতালে যেতে পারে না, তাদের জন্য এটাই ব্যবস্থা।

সুমাইয়া একদিন দেখল একটা রোগীর স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে। নার্সকে ডেকেছে, কিন্তু নার্স আসেনি। নার্স একজন, ওয়ার্ডে পঞ্চাশজন রোগী। রোগীর ছেলে নিজেই স্যালাইন বদলে দিয়েছে। ইউটিউবে দেখে শিখেছে।

ইউটিউবে দেখে স্যালাইন লাগানো। এটা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা।

ডক্টর ফয়সাল একদিন ওয়ার্ডের ছাদে সিগারেট খাচ্ছিল। সুমাইয়া গেল কিছু জিজ্ঞেস করতে। ফয়সাল সিগারেট শেষ করে বলল, "বসো।"

সুমাইয়া বসল।

"তুমি কেন ডাক্তার হচ্ছো?"

"মানুষের সেবা করতে চাই।"

ফয়সাল হাসল। তিক্ত হাসি। "এই উত্তরটা আমিও দিতাম। চার বছর আগে। এখন আর দিই না।"

"তাহলে এখন কেন আছেন?"

"কারণ আর কিছু পারি না। এমবিবিএস পড়ে ডাক্তারি ছাড়া আর কী করব? দোকান দেব?"

সুমাইয়া কিছু বলল না।

ফয়সাল বলল, "শোনো, তুমি ডাক্তার হচ্ছো একটা ভাঙা সিস্টেমের ভেতরে। সিস্টেমটা ঠিক করা তোমার কাজ না। বেঁচে থাকাটাই তোমার কাজ। প্রতিদিন ওয়ার্ডে যাও, যতটুকু পারো করো, বাসায় ফিরে ভুলে যাও। না হলে পাগল হয়ে যাবে।"

"ভুলে যাওয়া কি সম্ভব?"

"প্র্যাকটিস করলে হয়।"

সুমাইয়া ভাবল, মানুষ মরবে, আর সে ভুলে যাবে? কিন্তু না ভুললে প্রতিটা মৃত্যু বুকে নিয়ে ঘুরবে। সেটাও সম্ভব না।

মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে কি? ফয়সাল বলবে, নেই।

স্ট্যাটাস।

সমাজ বলে, "ডাক্তার।" মানুষ শুনে মাথা নোয়ায়। বিয়ের বাজারে ডাক্তারের দাম সবচেয়ে বেশি। পাড়া-প্রতিবেশী বলে, "ওদের মেয়ে ডাক্তার হচ্ছে।" গর্বের কথা।

কিন্তু সেই ডাক্তার জানে, সে ছত্রিশ ঘণ্টা ডিউটি করে। অক্সিজেন নেই বলে বাচ্চা মরতে দেখে। সরকার সাঁইত্রিশ হাজার টাকা দেয়। বাঁচতে পারে না। তাই সন্ধ্যায় চেম্বারে যায়। চেম্বারে গেলে লোকে বলে, "ডাক্তাররা টাকার পেছনে দৌড়ায়।"

কে দৌড়াচ্ছে? কেন দৌড়াচ্ছে? কেউ জিজ্ঞেস করে না।

সুমাইয়ার মা ফোন করেন প্রতি সন্ধ্যায়। "কেমন আছো, মা?" সুমাইয়া বলে, "ভালো আছি।" মাকে কী বলবে? বলবে আজ একটা গর্ভবতী মেয়ে ইমার্জেন্সিতে এসেছে, সিজারের জন্য ওটি ফাঁকা নেই, তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে? মা শুনলে ভেঙে পড়বেন।

তাই সুমাইয়া বলে, "ভালো আছি।"

ডাক্তাররা সবসময় "ভালো আছি" বলে।

১০

সন্ধ্যায় সুমাইয়া হোস্টেলে ফিরেছে। অ্যাপ্রোন খুলেছে। সকালে যখন পরেছিল, সাদা ছিল। এখন সাদা নেই। হলুদ একটা দাগ, কিডনি রোগীর প্রস্রাব লেগেছিল। লাল একটা ছিটা, ব্লাড স্যাম্পল নেওয়ার সময়। বাদামি একটা দাগ, কী সেটা সুমাইয়া ভাবতে চায় না।

বেসিনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছে। সাবান দিয়ে। আবার সাবান দিয়ে। আবার। নখের ভেতরে রক্তের দাগ যায় না।

আয়নায় নিজেকে দেখল। চোখের নিচে কালি পড়তে শুরু করেছে। তৃতীয় বর্ষের প্রথম মাসেই। ডক্টর ফয়সালের মতো।

সুমাইয়া ভাবল, সমাজ যে স্ট্যাটাসটা দেখে, "ডাক্তার," সেটা একটা শব্দ। শব্দটার পেছনে কী আছে, কেউ জানে না। কেউ জানতেও চায় না। মানুষ শুধু সাদা অ্যাপ্রোনটা দেখে। অ্যাপ্রোনের দাগগুলো দেখে না।

সাদা অ্যাপ্রোনটা ধোয়া দরকার। কাল সকালে আবার পরতে হবে। আবার ওয়ার্ডে যেতে হবে। আবার দুইশো রোগী। আবার তিনজন ডাক্তার। আবার খালি সিলিন্ডার।

সুমাইয়া অ্যাপ্রোনটা বালতিতে ভেজাতে দিল। পানি লাল হয়ে গেল।

শিফটের শেষে সাদা কোট আর সাদা থাকে না। এটাই ওয়ার্ডের বাস্তবতা। এটাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা।