MBBS-এর সাত বছরের দাম
সংখ্যা দিয়ে দেখা: সাদা অ্যাপ্রোন পরার আসল খরচ কত
১
জাহিদ স্প্রেডশিটে একটা নতুন শিট খুলল। নাম দিল: "MBBS ROI।"
পার্ট থার্টিতে পাঁচজনের দশ বছরের প্রজেকশন বানিয়েছিল। সেখানে সুমাইয়ার কলামটা সবচেয়ে খালি ছিল। প্রথম ছয় বছর: শূন্য। জিরো ইনকাম। সাত নম্বর বছরে আট হাজার টাকা, ইন্টার্নশিপের স্টাইপেন্ড। আট নম্বর বছরে পনেরো হাজার।
কিন্তু শুধু আয় দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। আয়ের পাশে খরচটাও দেখতে হবে। মানে, MBBS-এ কত টাকা ঢালতে হচ্ছে।
জাহিদ দুটো সিনারিও বানাল। সরকারি মেডিকেল কলেজ আর প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ।
সুমাইয়া সরকারিতে পড়ছে। কিন্তু জাহিদের চেনা অন্তত তিনজন প্রাইভেটে ভর্তি হয়েছে। তুলনাটা করা দরকার।
২
সরকারি মেডিকেল কলেজ। টিউশন ফি।
জাহিদ গুগল করল। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অফিসিয়াল ফি স্ট্রাকচার। পেল। সংখ্যাটা দেখে একটু অবাক হলো।
বছরে দুই হাজার টাকার কাছাকাছি। এমবিবিএস পাঁচ বছর প্লাস এক বছর ইন্টার্নশিপ। ছয় বছরের টিউশন ফি: বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা।
সংখ্যাটা লিখে জাহিদ নিজেই হাসল। পনেরো হাজার টাকায় ডাক্তার। পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা মেডিকেল এডুকেশন। আমেরিকায় এই টাকায় একটা টেক্সটবুক কেনা যায় না।
কিন্তু।
টিউশন ফি মানে টোটাল খরচ না। টিউশন ফি মানে শুধু ইউনিভার্সিটিকে দেওয়া টাকা। বাকি খরচগুলো ইউনিভার্সিটি দেয় না।
৩
হোস্টেল। সরকারি মেডিকেল কলেজে হোস্টেলের সিট পাওয়া যায়, কিন্তু সবাই পায় না। যারা পায়, তাদের হোস্টেল ফি মাসে দুইশো থেকে পাঁচশো টাকা। কিন্তু হোস্টেলের বাইরের খরচ আলাদা।
খাওয়া। মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা। হোস্টেলের মেস, ক্যান্টিন, বাইরের খাবার মিলিয়ে।
বই। মেডিকেলের বই দামি। প্রতি বছর নতুন বই লাগে। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি। একটা গ্রে'স অ্যানাটমি দেড় হাজার টাকা। পাঁচ বছরে বই বাবদ পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার।
যন্ত্রপাতি। স্টেথোস্কোপ, অপথালমোস্কোপ, ডিসেকশন কিট। একবারই কিনতে হয়, কিন্তু দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা।
ট্রান্সপোর্ট। হোস্টেল থেকে হাসপাতালে, লাইব্রেরিতে। মাসে পাঁচশো থেকে এক হাজার।
ফোন, ইন্টারনেট, জামাকাপড়, ব্যক্তিগত খরচ। মাসে দেড় থেকে দুই হাজার।
জাহিদ হিসাব কষল। মাসিক লিভিং কস্ট: সাত থেকে আট হাজার টাকা। ঢাকায় হলে একটু বেশি, আট-নয় হাজার। বাইরের মেডিকেল কলেজে একটু কম, ছয়-সাত।
বাহাত্তর মাস। ছয় বছর।
সাত হাজার গুণ বাহাত্তর = পাঁচ লাখ চার হাজার। আট হাজার গুণ বাহাত্তর = পাঁচ লাখ ছিয়াত্তর হাজার।
গোল করে বললে: পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা।
৪
জাহিদ লিখল:
সরকারি মেডিকেল কলেজ, ডাইরেক্ট কস্ট: - টিউশন ফি: ~০.১৫ লাখ - হোস্টেল/থাকা: ~০.৮৫ লাখ (৬ বছর) - খাওয়া: ~২.৫০ লাখ - বই ও যন্ত্রপাতি: ~০.৪০ লাখ - ট্রান্সপোর্ট ও অন্যান্য: ~১.১০ লাখ - মোট ডাইরেক্ট কস্ট: ~৫.০০ লাখ টাকা
এটা কনজার্ভেটিভ এস্টিমেট। বাস্তবে পাঁচ থেকে ছয় লাখ। কেউ কেউ আরো কম খরচে ম্যানেজ করে, হোস্টেলে থেকে, সিনিয়রদের বই নিয়ে। কেউ কেউ আরো বেশি, ঢাকায় মেস ভাড়া নিলে, কোচিং করলে।
কিন্তু পাঁচ লাখ একটা রিজনেবল মিডপয়েন্ট।
এবার প্রাইভেট।
৫
প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ। এটা আলাদা জগৎ।
জাহিদ তিনটা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের ফি চেক করল। ওয়েবসাইট, ফেসবুক গ্রুপ, পরিচিত দুইজনের কাছে জিজ্ঞেস করা।
টিউশন ফি: পনেরো থেকে পঁচিশ লাখ টাকা। কিছু কলেজে তিরিশ লাখ পর্যন্ত। রেঞ্জটা বিশাল। কারণ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশে একটা ইন্ডাস্ট্রি। কেউ পনেরো লাখে পড়ায়, কেউ পঁচিশে।
লিভিং কস্ট একই। সাত-আট হাজার মাসে। তবে প্রাইভেটে হোস্টেল কম। বেশিরভাগ ছাত্র মেসে বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকে। মেসের ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার। তাহলে মাসিক লিভিং কস্ট আট থেকে দশ হাজার।
বাহাত্তর মাসে লিভিং: ছয় থেকে সাত লাখ।
জাহিদ লিখল:
প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, ডাইরেক্ট কস্ট: - টিউশন ফি: ১৫-২৫ লাখ (মিডপয়েন্ট ~২০ লাখ) - লিভিং কস্ট (৬ বছর): ~৬.৫ লাখ - মোট ডাইরেক্ট কস্ট: ~২৫ লাখ (রেঞ্জ: ২০-৩০ লাখ)
সংখ্যাটা দেখে জাহিদ ভাবল, পঁচিশ লাখ। একটা পরিবারের জন্য পঁচিশ লাখ টাকা। গ্রামে একটা দোতলা বাড়ি বানানো যায় এই টাকায়। ঢাকায় একটা ছোট ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট দেওয়া যায়।
কিন্তু জাহিদ জানে, এটা শুধু ডাইরেক্ট কস্ট। গল্পের অর্ধেকটা এখনো বাকি।
৬
অপরচুনিটি কস্ট।
শব্দটা জাহিদ প্রথম শুনেছিল NU-এর ইকোনমিক্স ক্লাসে না। শুনেছিল একটা ইউটিউব ভিডিওতে। কেউ একজন বলছিল, "The biggest cost of college isn't tuition. It's the money you could have earned."
সুমাইয়া আঠারো বছর বয়সে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। পঁচিশ বছর বয়সে বের হবে। এই সাত বছরে তার আয়: শূন্য। শেষ বছরে ইন্টার্নশিপ স্টাইপেন্ড পাবে, মাসে আট থেকে দশ হাজার। তাও ছয় মাস থেকে এক বছর।
এখন ধরা যাক, সুমাইয়া আঠারো বছর বয়সে MBBS না পড়ে কাজ করত। কী কাজ করত? জাহিদ তিনটা সিনারিও বানাল:
সিনারিও ১: সাধারণ চাকরি। কল সেন্টার, রিসেপশনিস্ট, ডেটা এন্ট্রি। শুরুর বেতন দশ থেকে বারো হাজার। সাত বছর পর: পনেরো থেকে আঠারো হাজার। গড় মাসিক: তেরো-চৌদ্দ হাজার। সাত বছরে মোট আয়: এগারো থেকে বারো লাখ।
সিনারিও ২: দক্ষ চাকরি। গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফ্রিল্যান্সিং। শুরু পনেরো হাজার, সাত বছর পর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার। গড় মাসিক: কুড়ি-বাইশ হাজার। সাত বছরে মোট আয়: সতেরো থেকে আঠারো লাখ।
সিনারিও ৩: মিড-গ্রাউন্ড। গড় পনেরো হাজার। সাত বছরে: বারো থেকে তেরো লাখ।
জাহিদ মিড-গ্রাউন্ড ধরল। গড় মাসিক পনেরো হাজার। চুরাশি মাস (সাত বছর)।
১৫,০০০ x ৮৪ = ১২,৬০,০০০ টাকা। প্রায় তেরো লাখ।
জাহিদ লিখল: অপরচুনিটি কস্ট = ~১৩ লাখ টাকা।
৭
এবার টোটাল।
জাহিদ দুটো কলাম পাশাপাশি রাখল:
সরকারি MBBS: - ডাইরেক্ট কস্ট: ৫ লাখ - অপরচুনিটি কস্ট: ১৩ লাখ - টোটাল রিয়েল কস্ট: ১৮ লাখ
প্রাইভেট MBBS: - ডাইরেক্ট কস্ট: ২৫ লাখ - অপরচুনিটি কস্ট: ১৩ লাখ - টোটাল রিয়েল কস্ট: ৩৮ লাখ
আঠারো লাখ আর আটত্রিশ লাখ। দুইয়ের মাঝে বিশ লাখ টাকার পার্থক্য। আর সেই পার্থক্যটা শুধু টিউশন ফি।
জাহিদ একটু ভাবল। সুমাইয়ার বাবা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। মাসিক বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার। আঠারো লাখ মানে তার চার বছরের গ্রস স্যালারি। কোনো খরচ না করে, শুধু আয় জমালে, চার বছর লাগবে।
প্রাইভেট হলে? আটত্রিশ লাখ। নয় বছরের গ্রস স্যালারি। এটা তো সারাজীবনেও জমানো সম্ভব না।
এজন্যই সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়াটা এত বড় ব্যাপার। এজন্যই অ্যাডমিশন টেস্টের আগে পুরো পরিবার নামাজে দাঁড়ায়।
৮
কিন্তু আঠারো লাখ খরচ করে রিটার্ন কত?
জাহিদ নতুন সেকশন শুরু করল: "রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট।"
সরকারি ডাক্তারের শুরুর বেতন। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে নবম গ্রেড। ন্যাশনাল পে স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, নবম গ্রেডের বেসিক: ২২,০০০ টাকা। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা মিলিয়ে গ্রস: পঁয়ত্রিশ থেকে আটত্রিশ হাজার।
জাহিদ লিখল: Year 1 (বয়স ২৬): ৩৫,০০০/মাস।
ইনক্রিমেন্ট বছরে একবার। পাঁচ পার্সেন্ট। গ্রেড প্রমোশন তিন-চার বছর পরপর।
Year 3: ৪০,০০০। Year 5: ৪৫,০০০। Year 7: ৫২,০০০। Year 10: ৬০,০০০-৬৫,০০০।
দশ বছরে সরকারি ডাক্তারের বেতন পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়ষট্টি হাজার। এটা শুধু সরকারি বেতন। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি ডাক্তারদের আয়ের একটা বড় অংশ আসে অফিসিয়াল বেতন থেকে না।
৯
প্রাইভেট প্র্যাক্টিস। ইভনিং চেম্বার।
বাংলাদেশে সরকারি ডাক্তাররা অফিস আওয়ারের পরে প্রাইভেট চেম্বারে বসতে পারেন। এটা আইনসিদ্ধ। এটাই সিস্টেম।
কিন্তু চেম্বার মানেই ইনকাম না। চেম্বার থেকে আয় করতে হলে রোগী লাগে। রোগী আসতে হলে পরিচিতি লাগে, রেফারেল লাগে, বিশ্বাস লাগে। একজন নতুন ডাক্তার, তিরিশ বছর বয়স, চেম্বার খুললেই রোগী আসবে না।
জাহিদের ধারণা, চেম্বার থেকে ভালো আয় করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর লাগে। প্রথম দুই বছর: মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার। তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছর: পনেরো থেকে কুড়ি। পঞ্চম বছরের পর: কুড়ি থেকে পঞ্চাশ হাজার। সিনিয়র হলে, ভালো এলাকায় চেম্বার হলে, স্পেশালিস্ট হলে আরো বেশি।
কিন্তু স্পেশালিস্ট হওয়ার জন্য পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন লাগে। এফসিপিএস বা এমডি। আরো তিন থেকে চার বছর। আরো তিন-চার বছরের কম আয়। রেসিডেন্সি পিরিয়ডে স্টাইপেন্ড মাসে বিশ-পঁচিশ হাজার।
জাহিদ ভাবল, তাহলে একজন স্পেশালিস্ট ডাক্তার হতে মোট সময়: ৫ (MBBS) + ১ (ইন্টার্ন) + ৪ (পোস্ট-গ্র্যাড) = ১০ বছর। আঠারো থেকে আটাশ।
আটাশ বছর বয়সে স্পেশালিস্ট। তারপর আরো পাঁচ বছর ধরে পেশেন্ট বেস তৈরি। তেত্রিশ বছর বয়সে গিয়ে একজন স্পেশালিস্ট ডাক্তারের আয় শুরু হয় আশি হাজার থেকে দেড় লাখ। সরকারি বেতন আর চেম্বার মিলিয়ে।
এটা ভালো আয়। কিন্তু তেত্রিশ বছর বয়সে।
১০
ব্রেকইভেন।
জাহিদ হিসাব করল। সরকারি MBBS-এ টোটাল রিয়েল কস্ট আঠারো লাখ। গ্র্যাজুয়েশনের পর (বয়স ছাব্বিশ) থেকে আয় শুরু। সরকারি বেতন আর চেম্বার মিলিয়ে গড় মাসিক নেট আয় (খরচ বাদ দিয়ে সেভিংস): প্রথম পাঁচ বছরে মাসে পনেরো থেকে কুড়ি হাজার সেভ করতে পারবে। তারপর আরো বাড়বে।
মাসে পনেরো হাজার সেভ করলে, আঠারো লাখ উঠে আসতে কত মাস? একশো কুড়ি মাস। দশ বছর।
তার মানে, সরকারি MBBS-এর বিনিয়োগ ব্রেকইভেন করে গ্র্যাজুয়েশনের আট থেকে দশ বছর পরে। বয়স তখন চৌত্রিশ-ছত্রিশ।
প্রাইভেট MBBS? আটত্রিশ লাখ। মাসে পনেরো হাজার সেভ করলে: দুইশো পঞ্চাশ মাস। বিশ বছরেরও বেশি। ব্রেকইভেন বয়স: পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ। স্পেশালিস্ট হলে দ্রুততর, কিন্তু তাও পনেরো বছরের কম না।
জাহিদ নিজের সাথে তুলনা করল।
জাহিদ বয়স বিশে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছে। ছাব্বিশ বছর বয়সে (সুমাইয়া যখন গ্র্যাজুয়েট করবে), জাহিদের ছয় বছরের ফ্রিল্যান্সিং অভিজ্ঞতা থাকবে। সে ততদিনে (P50 ধরলে) মাসে নব্বই হাজার আয় করবে। ছয় বছরে মোট আয়: প্রায় ত্রিশ লাখ।
সুমাইয়ার মোট আয় একই সময়ে: শূন্য। মোট খরচ: পাঁচ লাখ।
ব্যবধান: পঁয়ত্রিশ লাখ।
১১
তাহলে MBBS পড়া কি বোকামি?
জাহিদ এই প্রশ্নটা স্প্রেডশিটে লিখল না। মাথার ভেতরে ঘুরল।
না। বোকামি না। কারণ MBBS শুধু একটা ক্যারিয়ার চয়েস না। MBBS একটা স্ট্যাটাস পারচেজ।
বাংলাদেশে "ডাক্তার" শব্দটা একটা সামাজিক মুদ্রা। এটা শুধু পেশা না। এটা পরিচয়। "আমার মেয়ে ডাক্তার" বলতে পারা, "আমার স্বামী ডাক্তার" বলতে পারা, "আমার ছেলে ডাক্তার" বলতে পারা। এই বাক্যগুলোর আর্থিক মূল্য কত?
জাহিদ জানে, এটা মাপা যায় না। কিন্তু এটা আছে। এটা বাস্তব।
বিয়ের বাজারে একজন ডাক্তারের দাম আর একজন ফ্রিল্যান্সারের দাম একই না। ফ্রিল্যান্সার মাসে দুই লাখ আয় করলেও, পাত্রীপক্ষ বলবে, "চাকরি কী করেন?" ফ্রিল্যান্সিং। "মানে... বাড়িতে বসে কম্পিউটারে?" হ্যাঁ। "ওহ।"
সেই "ওহ"-টা বিশ লাখ টাকার চেয়ে দামি।
১২
জাহিদ আরেকটা জিনিস ভাবল। "ডাক্তারের বাবা" হওয়ার মূল্য।
সুমাইয়ার বাবা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। মাসিক বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার। সামাজিকভাবে সম্মানিত, কিন্তু কেউ তাকে নিয়ে বিশেষ কথা বলে না। শিক্ষক তো শিক্ষকই।
কিন্তু সুমাইয়া ডাক্তার হলে? "আহা, উনার মেয়ে ডাক্তার!" এলাকায়, আত্মীয়দের মধ্যে, মসজিদে, বাজারে। সুমাইয়ার বাবার পরিচয় বদলে যাবে। আগে ছিলেন "করিম স্যার।" এখন হবেন "ডাক্তারের বাবা।"
এই ট্রান্সফরমেশনের দাম কত? আঠারো লাখ? পঁচিশ লাখ? তিরিশ লাখ?
জাহিদ জানে না। কিন্তু জাহিদ জানে, সুমাইয়ার বাবা সেই দাম দিতে রাজি। কারণ তিনি সারাজীবন এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছেন।
জাহিদের বাবা? জাহিদের বাবাকে কেউ জিজ্ঞেস করে না, "আপনার ছেলে কী করে?" জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারবেন না। "কম্পিউটারে কিছু একটা করে, বিদেশিদের কাজ করে।" ব্যস। এর বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার ভাষা নেই।
১৩
স্ট্যাটাস ট্যাক্স। জাহিদ স্প্রেডশিটে এই নামে একটা সেল বানাল।
মানুষ কুড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা খরচ করে একটা টাইটেলের জন্য। "ডা." দুটো অক্ষর। নামের আগে দুটো অক্ষর। এই দুটো অক্ষরের জন্য একটা পরিবার দশ বছর ধরে টাকা জমায়, জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয়, আত্মীয়দের কাছে হাত পাতে।
কারণ এই দুটো অক্ষর শুধু ডিগ্রি না। এই দুটো অক্ষর একটা সোশ্যাল ক্যাপিটাল।
ফ্রিল্যান্সারের কোনো টাইটেল নেই। নামের আগে কিছু নেই। জাহিদ আব্দুল্লাহ, ব্যস। কোনো "ফ্রি." বা "ফ্রিল্যান্সার" প্রিফিক্স নেই। কেউ বলে না, "ফ্রিল্যান্সার জাহিদ আসছেন।" বলে, "জাহিদ, ও যে ছেলেটা কম্পিউটারে কাজ করে, সে আসছে।"
এটাই স্ট্যাটাস ট্যাক্স। ডাক্তার হওয়ার জন্য মানুষ যে অতিরিক্ত টাকা দেয়, সেটা ডাক্তারি শেখার জন্য না। সেটা "ডাক্তার" ডাকা শোনার জন্য।
১৪
জাহিদ স্প্রেডশিট বন্ধ করল। ঘড়িতে রাত চারটা বেজে গেছে।
সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। MBBS আর্থিকভাবে স্লো। ব্রেকইভেন আসে তিরিশের পরে। প্রাইভেট হলে পঁয়তাল্লিশের আগে না। ততদিনে অন্য পেশায় কেউ ঘর কিনে ফেলেছে, গাড়ি কিনেছে, সঞ্চয় করেছে।
কিন্তু।
পঁয়তাল্লিশের পরে? পঞ্চাশের পরে? ষাটের পরে?
একজন ডাক্তারের আয় বয়সের সাথে বাড়ে। অভিজ্ঞতা মানে আরো রোগী, আরো বিশ্বাস, আরো রেফারেল। ষাট বছর বয়সে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্টের মাসিক আয় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
ষাট বছর বয়সে একজন ফ্রিল্যান্সারের আয়? কেউ জানে না। কারণ ষাট বছর বয়সে ফ্রিল্যান্সিং করা মানুষের স্যাম্পল সাইজ বাংলাদেশে শূন্য। এই ইন্ডাস্ট্রিই তো দশ বছরের পুরনো না।
জাহিদ এটা ভেবে একটু অস্বস্তি বোধ করল। সে সংখ্যা পছন্দ করে। কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর সংখ্যায় নেই। কিছু প্রশ্নের উত্তর শুধু সময় দেবে।
১৫
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে স্প্রেডশিটের শেষে একটা নোট লিখল:
"MBBS-এর রিটার্ন ক্যালকুলেট করা যায়। কিন্তু MBBS-এর ভ্যালু ক্যালকুলেট করা যায় না। কারণ ভ্যালু শুধু টাকায় মাপা যায় না।"
তারপর আরেকটা নোট:
"সুমাইয়া ডাক্তার হবে। সে ভালো ডাক্তার হবে। আমি জানি। কিন্তু সে ডাক্তার হচ্ছে পনেরো লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য, না তার বাবার পাড়ায় মাথা উঁচু করে হাঁটার জন্য? দুটোই সত্য। দুটোই আসল। আর এটাই সমস্যা।"
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল।
বাইরে ফজরের আজান শুরু হয়েছে।
সাদা অ্যাপ্রোন কেনা সহজ। কিন্তু সাদা অ্যাপ্রোন পরার খরচ, সেটা শুধু টাকায় মাপা যায় না।