গ্রামে পোস্টিং

তিন লাখ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার, আর সেই ডাক্তারের জন্য কেউ নেই

পর্ব ৩৭ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

চিঠিটা এলো জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে।

সুমাইয়া তখন বাসায়। ময়মনসিংহ মেডিকেলের ইন্টার্নশিপ শেষ হয়েছে দুই মাস আগে। তারপর থেকে বাসায় বসে আছে। BCS Health Cadre-এর গেজেট বের হয়নি। নিয়োগপত্র আসেনি। কবে আসবে কেউ জানে না।

দুই মাস ধরে সুমাইয়া প্রতিদিন একই কাজ করেছে। সকালে উঠে ফোন চেক করেছে। BCS Health Cadre-এর ফেসবুক গ্রুপে কেউ কিছু পোস্ট করেছে কি না দেখেছে। দুপুরে আবার চেক করেছে। রাতে শেষবার। সাত বছর পড়ালেখা করেছে। এই সাত বছরের পুরস্কার হচ্ছে একটা ফেসবুক গ্রুপে রিফ্রেশ বাটন চাপা।

তারপর একদিন চিঠি এলো।

সুমাইয়ার বাবা আজিম সাহেব ডাকপিয়ন থেকে চিঠি নিলেন। হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর সুমাইয়াকে ডাকলেন।

"তোমার চিঠি এসেছে।"

সুমাইয়া দৌড়ে এলো। খামটা হাতে নিয়ে দেখল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিল। হাত কাঁপছে। খুলল।

নিয়োগপত্র। মেডিকেল অফিসার, ৪৪তম গ্রেড। বেতন স্কেল ২২,০০০ টাকা, সাথে বাড়িভাড়া, মেডিকেল, আর অন্যান্য মিলিয়ে মোট প্রায় ৩৫,০০০ টাকা।

পোস্টিং: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ।

সুমাইয়া চিঠিটা দুইবার পড়ল। তিনবার। দোয়ারাবাজার। সুনামগঞ্জ। সে জায়গাটার নাম শুনেছে, কিন্তু কোথায় সেটা ঠিক জানে না। ফোনে গুগল ম্যাপ খুলল। দেখল। ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। সিলেট হয়ে যেতে হবে। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ, সুনামগঞ্জ থেকে দোয়ারাবাজার। বাস, নৌকা, আবার বাস। পুরো দিন লাগবে।

মা পেছন থেকে দেখছিলেন। "কোথায় হয়েছে?"

"সুনামগঞ্জ।"

মা চুপ করে রইলেন। সুনামগঞ্জ মানে দূর। সুনামগঞ্জ মানে হাওর। সুনামগঞ্জ মানে বর্ষায় চারদিকে পানি, শুকনোয় ধুলো, আর সারাবছর একটা বিচ্ছিন্নতা যেটা মানচিত্রে দেখা যায় না কিন্তু গায়ে লাগে।

বাবা বললেন, "ট্রান্সফার করাতে পারবি না?"

"বাবা, আমি তো এইমাত্র জয়েন করিনি। ট্রান্সফার করাতে গেলে লোক লাগে, টাকা লাগে, এমপির রেফারেন্স লাগে। আমাদের কিছুই নেই।"

এটাই সত্য। বাংলাদেশে সরকারি ডাক্তারের পোস্টিং একটা লটারি, কিন্তু লটারির ফলাফল কানেকশন দিয়ে ঠিক করা যায়। যাদের কানেকশন আছে, তারা ঢাকায় থাকে। মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশানের কাছাকাছি হাসপাতালে বসে। বিশজন রোগী দেখে বাসায় ফেরে। যাদের কানেকশন নেই, তারা যায় দোয়ারাবাজার। বা ভোলা। বা রাঙামাটি। বা এমন কোনো জায়গায় যেখানে গুগল ম্যাপেও রাস্তা ঠিকমতো দেখায় না।

সুমাইয়ার কানেকশন নেই। তাই সে যাবে দোয়ারাবাজার।

জয়েনিং-এর দিন ছিল আগস্টের এক তারিখ।

সুমাইয়া একা গেল না। বাবা সাথে গেলেন। মা বলেছিলেন যেতে চান, কিন্তু বাসার কাজ ফেলে দুজনে যাওয়া সম্ভব না। বাবা আজিম সাহেব প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ছুটি নিলেন দুইদিনের।

ময়মনসিংহ থেকে সিলেট বাসে চার ঘণ্টা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ আরো দুই ঘণ্টা। সুনামগঞ্জ শহর থেকে দোয়ারাবাজার যেতে নৌকা ধরতে হলো, কারণ বর্ষা। রাস্তা ডুবে আছে। নৌকায় দেড় ঘণ্টা। তারপর আরো আধ ঘণ্টা হেঁটে।

পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দ্বিতল ভবন। সামনে একটা মাঠ, যেটা এখন কাদায় ভরা। দেয়ালের রং উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। গেটে একটা সাইনবোর্ড, কিন্তু অর্ধেক অক্ষর মুছে গেছে। পড়া যায় "...স্বাস্থ্য কম...ক্স"।

ভেতরে ঢুকলেন। একজন আয়া বসে আছেন বারান্দায়। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "ডাক্তার সাহেব আছেন?"

আয়া হাসলেন। "ডাক্তার? ডাক্তার তো গত তিন মাস নেই। ট্রান্সফার হয়ে গেছেন। এখন আপনারা কে?"

বাবা বললেন, "আমার মেয়ে। নতুন ডাক্তার। পোস্টিং হয়েছে এখানে।"

আয়া সুমাইয়ার দিকে তাকালেন। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখলেন। তারপর বললেন, "এত কম বয়সী মেয়ে? একা থাকবেন এখানে?"

সুমাইয়া বলল, "হ্যাঁ।"

আয়া কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন। সেই মাথা নাড়ানোতে সহানুভূতি ছিল, সন্দেহ ছিল, আর একটু করুণাও ছিল।

হেলথ কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখল সুমাইয়া। একত্রিশটা বেড আছে কাগজে। বাস্তবে পনেরোটার ম্যাট্রেস ছেঁড়া, পাঁচটার ফ্রেম ভাঙা, দুইটায় মরচে ধরেছে এতটাই যে রোগী শোয়ালে বেড ভেঙে পড়বে। কাজের বেড বলতে নয়টা। নয়টা বেড, তিন লাখ মানুষের জন্য।

এক্স-রে মেশিন আছে। কাজ করে না। ল্যাব আছে। মাইক্রোস্কোপ আছে, কিন্তু রিএজেন্ট নেই। ব্লাড টেস্ট হয় না, ইউরিন টেস্ট হয় না। রোগী এলে স্টেথোস্কোপ দিয়ে শোনা যায়, ব্লাড প্রেশার মাপা যায়, আর তাকিয়ে দেখা যায়। ব্যস। এই তিনটা জিনিস দিয়ে তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা।

কোনো কিছু গুরুতর হলে রেফার। সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে যেতে তিন ঘণ্টা, ভালো দিনে। বর্ষায় পাঁচ ঘণ্টা। কখনো কখনো পুরো দিন। আর রাতে? রাতে অ্যাম্বুলেন্স নেই। নৌকা আছে, কিন্তু রাতে নৌকা চলে না। তাহলে রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে কী হবে?

কিছু হবে না। অপেক্ষা করবে সকালের জন্য। বেঁচে থাকলে যাবে। না থাকলে যাবে না।

বাবা পুরো কমপ্লেক্স ঘুরে দেখলেন। কিছু বললেন না। মুখ শক্ত করে রাখলেন। কিন্তু চোখ দেখলে বোঝা যেত।

দোতলায় ডাক্তারের কোয়ার্টার। দশ বাই বারো ফুটের রুম। একটা খাট, একটা টেবিল, একটা চেয়ার। জানালায় কাচ নেই, প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ঢাকা। রান্নাঘর নেই।

বাবা ঘরটা দেখে বললেন, "সুমাইয়া, তুই এখানে থাকবি?"

"থাকতে হবে, বাবা।"

"আমি কথা বলি। চেষ্টা করি, অন্য কোথাও..."

"বাবা।" সুমাইয়া থামালো। "আপনি কার সাথে কথা বলবেন? আমাদের কেউ নেই। কোনো এমপি চেনি না, কোনো সচিব চিনি না। আপনি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। আমি সাধারণ একজন ডাক্তার। এটাই আমাদের জায়গা।"

বাবা চুপ করে রইলেন।

পরদিন সকালে বাবা ফিরে গেলেন। ফেরার সময় সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছু বললেন না। কিন্তু সুমাইয়া বুঝল, বাবার গায়ে যে কাঁপুনি ছিল, সেটা কান্নার।

প্রথম সপ্তাহে সুমাইয়া বুঝল, সে শুধু ডাক্তার না। সে এখানে সবকিছু।

সকাল আটটায় OPD খোলে। লাইন থাকে গেট পর্যন্ত। কখনো গেটের বাইরেও। মানুষ আসে পায়ে হেঁটে, নৌকায়, ভ্যানে। কেউ কেউ দুই ঘণ্টা হেঁটে আসে। ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হয়, আটটায় পৌঁছায়, লাইনে দাঁড়ায়, দুপুর বারোটায় সুমাইয়ার সামনে বসে।

একদিনে দুইশো রোগী দেখেছে সুমাইয়া। দুইশো। প্রতিটা রোগীকে গড়ে তিন মিনিট। কারো ডায়াবেটিস, কারো হাইপারটেনশন, কারো ডায়রিয়া, কারো ম্যালেরিয়া, কারো চামড়ায় ফাঙ্গাল ইনফেকশন। একটা বাচ্চা এলো যার শরীরে পানি এসেছে, কিডনির সমস্যা হতে পারে, কিন্তু কিডনি টেস্ট করার কোনো উপায় নেই এখানে। রেফার করল সিলেটে। বাচ্চার মা বলল, "আপা, সিলেট যাওয়ার টাকা নাই।"

সুমাইয়া কী বলবে?

সে নিজের পকেট থেকে পাঁচশো টাকা দিল।

বিকেলে একটা সাপে-কাটা রোগী এলো। কৃষক, ক্ষেতে কাজ করছিল, ধান কাটার সময় সাপ কামড়েছে। পা ফুলে গেছে। অ্যান্টিভেনম আছে স্টকে, সুমাইয়া দিল। কিন্তু মনিটরিং দরকার। ICU দরকার। ICU কোথায়? নেই। সুমাইয়া নিজে রাত জেগে মনিটর করল। দুই ঘণ্টা পরপর ভাইটালস চেক। সকালে রোগী স্ট্যাবল হলো। সুমাইয়া তখন আঠাশ ঘণ্টা জেগে আছে।

একদিন একটা প্রেগন্যান্ট মেয়ে এলো। প্রথম সন্তান। লেবার পেইন শুরু হয়েছে। সুমাইয়া দেখল, ব্রিচ প্রেজেন্টেশন। নরমাল ডেলিভারি রিস্কি। সিজার দরকার। কিন্তু এখানে অপারেশন থিয়েটার নেই। সিলেটে পাঠাতে হবে। কিন্তু সময় নেই। নৌকায় তিন ঘণ্টা, তারপর বাসে আরো দুই ঘণ্টা। ততক্ষণে...

সুমাইয়া সিদ্ধান্ত নিল। ম্যানুয়ালি ব্রিচ ডেলিভারি করবে। ইন্টার্নশিপে দেখেছে, কিন্তু নিজে একা করেনি কখনো। হাত কাঁপছে। কিন্তু বিকল্প কী?

দুই ঘণ্টা লাগল। মেয়েটা চিৎকার করছিল, তার শাশুড়ি বাইরে কাঁদছিলেন, আয়া সুমাইয়াকে সাহায্য করছিলেন। শেষে বাচ্চা এলো। ছেলে। কাঁদল। সুমাইয়াও কাঁদল। কিন্তু কেউ দেখল না, কারণ তখন সবাই বাচ্চার দিকে তাকিয়ে।

পরদিন সুমাইয়ার কাছে একটা মেয়ে এলো। বয়স ষোল-সতের হবে। চোখের নিচে কালি, ঠোঁট কাটা, হাতে আঁচড়ের দাগ। সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?"

মেয়েটা কিছু বলল না। পাশে তার শাশুড়ি বসা। শাশুড়ি বললেন, "পড়ে গেছে।"

সুমাইয়া শাশুড়িকে বাইরে যেতে বলল। শাশুড়ি গেলেন না প্রথমে। সুমাইয়া আবার বলল, এবার গলায় কড়া সুরে। শাশুড়ি গেলেন।

মেয়েটা তখন বলল। স্বামী মারে। প্রতিদিন মারে। গতকাল লাথি মেরেছে পেটে। তার পেটে বাচ্চা আছে তিন মাসের।

সুমাইয়া মেয়েটাকে চেক করল। পেটে আঘাতের চিহ্ন আছে। সে মেডিকোলিগ্যাল কেস হিসেবে রিপোর্ট করতে বলল। মেয়েটা বলল, "আপা, রিপোর্ট করলে আমি যাবো কোথায়? বাপের বাড়ি নিবে না। স্বামীর বাড়ি থাকতে দিবে না।"

সুমাইয়া কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। মেডিকেল কলেজে এই পরিস্থিতির কোনো সিলেবাস নেই।

সে মেয়েটাকে ওষুধ দিল, কিছু পরামর্শ দিল, আর নিজের ফোন নম্বর দিল। বলল, "কিছু হলে ফোন করবি।" মেয়েটা চলে গেল। সুমাইয়া জানে, মেয়েটা ফোন করবে না। কারণ ফোন করার মতো সাহস থাকলে সে আগেই কিছু করত।

এক সপ্তাহে সুমাইয়া বুঝল: সে ডাক্তার, নার্স, কাউন্সেলর, সোশ্যাল ওয়ার্কার, আর কখনো কখনো বিচারকও। একজন মানুষ। তিন লাখ মানুষের জন্য।

একাকীত্বটা আসে রাতে।

দিনে রোগী থাকে, কাজ থাকে, ব্যস্ততা থাকে। রাতে কেউ থাকে না। কমপ্লেক্সের দোতলায় সুমাইয়ার ঘর। নিচে রাতের ডিউটিতে একজন আয়া থাকেন, একজন ওয়ার্ড বয়। ব্যস। বাকি পুরো ভবন খালি।

রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না। মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক। মাঝে মাঝে নীরবতা, যেটা শব্দের চেয়ে বেশি ভারী।

সুমাইয়া মাকে ফোন করে রাতে। নেটওয়ার্ক থাকলে। নেটওয়ার্ক সবসময় থাকে না। ছাদে উঠলে একটা বার আসে, তাতে কথা বলা যায়।

মা বলেন, "কেমন আছিস?"

"ভালো।"

"খাচ্ছিস ঠিকমতো?"

"হ্যাঁ।"

দুটোই মিথ্যা। ভালো নেই। খাওয়াও ঠিকমতো হচ্ছে না। রান্না করার সময় নেই। বাজার নেই কাছে, সবচেয়ে কাছের বাজার দুই কিলোমিটার দূরে। আয়া মাঝে মাঝে রান্না করে দেন, বিনিময়ে সুমাইয়া তাকে দুইশো টাকা দেয় প্রতি সপ্তাহে। বাকি দিনগুলোতে বিস্কুট, কলা, আর মুড়ি।

জাহিদকে ফোন করে মাঝে মাঝে। জাহিদ ব্যস্ত, ফ্রিল্যান্সিং ভালো চলছে। গাজীপুরে বসে কাজ করছে, ক্লায়েন্ট পাচ্ছে, টাকা আসছে। জাহিদ জিজ্ঞেস করে, "কেমন চলছে?"

সুমাইয়া বলে, "চলছে।"

কী বলবে? বলবে যে গতকাল রাতে একটা বাচ্চা মারা গেছে কারণ সময়মতো সিলেটে পাঠানো যায়নি? বলবে যে রাতে ঘুম হয় না, কারণ প্রতিটা মৃত্যু মাথায় ঘুরে?

এগুলো ফোনে বলা যায় না।

রোগীরা সুমাইয়াকে ভালোবাসে। এটা সুমাইয়া আশা করেনি।

প্রথম সপ্তাহেই একটা গুজব ছড়িয়ে গেল পুরো উপজেলায়: "নতুন ডাক্তার আইছে, মেয়ে ডাক্তার, থাকবে নাকি যাবে দেখি।" মানুষ সন্দেহ করে। কারণ আগের ডাক্তাররা থাকেনি। পোস্টিং হয়েছে, এসেছে, দুই মাস থেকেছে, তারপর ট্রান্সফার করিয়ে নিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করেছে। কেউ কেউ জয়েনই করেনি, শুধু সই করে চলে গেছে, বেতন তুলেছে ঢাকা থেকে।

সুমাইয়া থাকল। প্রথম সপ্তাহ। দ্বিতীয় সপ্তাহ। এক মাস। দুই মাস।

একদিন একজন বৃদ্ধা এলেন। হাঁটতে পারেন না ভালো করে, ছেলে কাঁধে করে নিয়ে এসেছে। সুমাইয়া দেখল, হাঁটুতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস। ওষুধ দিল, ব্যায়ামের পরামর্শ দিল। বৃদ্ধা যাওয়ার সময় সুমাইয়ার হাত ধরলেন।

"আপা, আমাদের এখানে ডাক্তার আসে, কিন্তু থাকে না। আপনি থাকবেন?"

সুমাইয়া বৃদ্ধার হাত ধরে রাখল। বলল, "থাকবো।"

বৃদ্ধা চলে গেলেন। সুমাইয়া টেবিলে মাথা রাখল।

"থাকবো" বলা সহজ। থাকা কঠিন। কিন্তু এই মানুষগুলোর চোখে যে আশা দেখেছে, সেটা ছেড়ে যাওয়া আরো কঠিন।

কিন্তু প্রশ্নটা ভেতরে কুরে কুরে খায়।

সুমাইয়ার ব্যাচমেট তানিয়া। একসাথে পড়েছে, একসাথে ইন্টার্নশিপ করেছে। তানিয়ার বাবা অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব। তানিয়ার পোস্টিং হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঢাকায় বসে, এসি রুমে, কুড়িজন রোগী দেখে, বিকেলে বাসায় ফেরে। একই বেতন। ৩৫,০০০ টাকা।

সুমাইয়া দিনে দুইশো রোগী দেখে, ১৪ ঘণ্টা কাজ করে, রাতে মোমবাতির আলোয় প্রেসক্রিপশন লেখে। তানিয়া কুড়িজন দেখে, আট ঘণ্টা কাজ করে। একই পরীক্ষা, একই রেজাল্ট, একই ডিগ্রি। পার্থক্য শুধু বাবা। মেধার কোনো দাম নেই এই সিস্টেমে। কানেকশনের দাম আছে।

সুমাইয়া এটা নিয়ে কাউকে কিছু বলে না। সিস্টেম এরকমই। সবাই জানে।

তারপর সকালে আবার রোগী আসে। আবার লাইন। আবার তিন লাখ মানুষ একজন ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর সুমাইয়া আবার উঠে দাঁড়ায়।

বাবার ঋণের কথাটা সুমাইয়া ভোলেনি।

MBBS-এ চান্স পাওয়ার পর কোচিং সেন্টারের বিল ছিল ৮০,০০০ টাকা। বাবা আজিম সাহেবের মাসিক বেতন ২৫,০০০ টাকা, সংসার চালানোর পর কিছু জমানোর উপায় নেই। তাই ঋণ করেছিলেন। সমবায় সমিতি থেকে। ৮০,০০০ টাকা।

সাত বছর হয়ে গেছে। সুদে-আসলে বেড়ে প্রায় ১,১০,০০০ হয়েছিল। বাবা কিস্তিতে কিস্তিতে শোধ করেছেন। এখনো ৩০,০০০ বাকি।

সুমাইয়ার প্রথম মাসের বেতন আসল সেপ্টেম্বরে। ৩৫,০০০ টাকা। জীবনে প্রথম নিজের আয়।

সে প্রথম কাজ যেটা করল: বাবাকে ১৫,০০০ টাকা পাঠাল। বিকাশে। বাবা ফোন করলেন। "এটা কিসের?"

"ঋণের জন্য। আগামী মাসে বাকিটা দিবো।"

বাবা কিছু বললেন না কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, "তোমার খরচ?"

"হবে।"

১৫,০০০ পাঠানোর পর সুমাইয়ার কাছে আছে ২০,০০০ টাকা। ঘরভাড়া লাগে না, কোয়ার্টারে থাকে। কিন্তু খাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, ফোনের বিল, মাঝে মাঝে রোগীদের জন্য নিজের পকেট থেকে ওষুধ কেনা, এসব মিলিয়ে ২০,০০০ যথেষ্ট না। কিন্তু চলবে। চলাতে হবে।

পরের মাসে বাকি ১৫,০০০ পাঠাল। ঋণ শেষ। বাবার কাঁধ থেকে সাত বছরের বোঝা নামল।

বাবা সেদিন রাতে ফোন করে কাঁদলেন। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ৫৫ বছর বয়স, জীবনে অনেক কিছু সহ্য করেছেন, কিন্তু মেয়ের কাছ থেকে টাকা পেয়ে কাঁদলেন।

সুমাইয়া বলল, "বাবা, কাঁদছেন কেন? আপনি আমার জন্য করেছেন। আমি আপনার জন্য করছি। এটাই তো নিয়ম।"

বাবা বললেন, "নিয়ম না, মা। এটা তোর মন।"

রাত এগারোটা।

লোডশেডিং। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। কমপ্লেক্সে একটা জেনারেটর আছে, কিন্তু ডিজেল নেই। ডিজেল শেষ হয়ে গেছে গত সপ্তাহে। নতুন ডিজেল কবে আসবে কেউ জানে না। "শীঘ্রই।"

সুমাইয়া তার ঘরে বসে আছে। টেবিলে একটা মোমবাতি জ্বলছে। সামনে আজকের রোগীদের নোট। সে লিখছে। প্রতিটা রোগীর নাম, বয়স, সমস্যা, কী ওষুধ দিয়েছে, কী পরামর্শ দিয়েছে। এটা করা বাধ্যতামূলক না। কেউ চেক করে না। কিন্তু সুমাইয়া করে। কারণ এই মানুষগুলো আবার আসবে, তখন আগের হিস্ট্রি জানা থাকলে ভালো চিকিৎসা দেওয়া যাবে।

মোমবাতির আলোয় লেখা কঠিন। চোখ জ্বালা করে। হাত ব্যথা করে। সারাদিনে দুইশোর বেশি রোগী দেখেছে। চোদ্দ ঘণ্টা কাজ করেছে। এখন রাত এগারোটায় সে মোমবাতির আলোয় নোট লিখছে।

গাজীপুরে একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সুপারভাইজারের বেতন ২৫,০০০ টাকা। আট ঘণ্টা শিফট। বিদ্যুৎ আছে, এসি আছে, ক্যান্টিনে খাবার আছে। ছুটির দিন ছুটি।

সুমাইয়ার বেতন ৩৫,০০০ টাকা। চোদ্দ ঘণ্টা কাজ। বিদ্যুৎ নেই। এসি? ফ্যানও নেই এখন, কারণ বিদ্যুৎ নেই। ক্যান্টিন নেই। ছুটির দিনেও রোগী আসে, কারণ রোগ ছুটির দিন মানে না।

১০,০০০ টাকা বেশি পায় সুমাইয়া। সেই ১০,০০০ টাকার জন্য সে সাত বছর পড়ালেখা করেছে, বাবা ঋণ করেছে, পরিবার কষ্ট করেছে।

স্ট্যাটাস। ডাক্তার। সাদা অ্যাপ্রোন। মানুষ "ডাক্তার আপা" বলে ডাকে। সম্মান দেয়। কিন্তু সম্মান দিয়ে বিদ্যুতের বিল দেওয়া যায় না। সম্মান দিয়ে ডিজেল কেনা যায় না। সম্মান দিয়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসা করা যায় না যখন এক্স-রে মেশিন কাজ করে না, ল্যাবে রিএজেন্ট নেই, আর রাতে অ্যাম্বুলেন্স চলে না।

স্ট্যাটাসের একটা দাম আছে। সেই দাম সুমাইয়া প্রতিদিন দিচ্ছে।

মোমবাতি প্রায় শেষ। সুমাইয়া শেষ রোগীর নোট লিখল। খাতা বন্ধ করল। মোমবাতি নিভিয়ে দিল।

অন্ধকার।

জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। গ্রামের আকাশে তারা থাকে, ঢাকায় যেটা দেখা যায় না। সুন্দর। কিন্তু সৌন্দর্য দিয়ে পেট ভরে না।

সুমাইয়া শুয়ে পড়ল। ঘুম আসবে না জানে। কিন্তু শুয়ে থাকলে শরীরটা অন্তত বিশ্রাম পাবে। মন বিশ্রাম পাবে না। মন কখনো পায় না।

সকালে আবার উঠতে হবে। আবার দুইশো রোগী। আবার তিন মিনিট করে। আবার সাপে-কাটা, ডায়াবেটিস, ডেলিভারি, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। আবার সব একজনে।

কিন্তু সে উঠবে। কারণ ঐ বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আপনি থাকবেন?"

সে বলেছিল, "থাকবো।"

আর সুমাইয়া কথা রাখে।