USMLE-এর হিসাব
পাঁচ লাখ টাকার বাজি, ষাট পার্সেন্ট সম্ভাবনা, আর একটা স্কুলশিক্ষকের মেয়ের সীমানা
১
সুমাইয়ার হোয়াটসঅ্যাপে একটা গ্রুপ আছে। নাম: "USMLE Bangladesh 2026"। মেম্বার তিন হাজারের বেশি। প্রতিদিন কেউ না কেউ একটা প্রশ্ন করে: Step 1-এর স্কোর কত লাগবে? UWorld কবে শুরু করব?
আর প্রতিদিন কেউ না কেউ একটা উত্তর দেয়: সম্ভব। আমি পেরেছি। তুমিও পারবে।
এই "আমি পেরেছি" বলা মানুষগুলো আমেরিকায় থাকে। শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, হিউস্টন। তাদের ইনকাম ডলারে। তাদের জীবন ইনস্টাগ্রামে। সাদা কোট, স্টেথোস্কোপ, হাসপাতালের করিডোর, ক্যাপশনে লেখা: "Hard work pays off."
সুমাইয়া এই পোস্টগুলো স্ক্রল করে। কিন্তু মাথার ভেতরে একটা হিসাব চলে। সবসময়।
২
USMLE। United States Medical Licensing Examination। বাংলাদেশের একজন MBBS ডাক্তারের কাছে এটা একটা দরজা। দরজার ওপাশে আমেরিকা। কিন্তু দরজাটা খোলা না। চাবি বানাতে গেলে কয়েকটা জিনিস লাগে।
পরীক্ষা। Step 1: বেসিক সায়েন্স, রেজিস্ট্রেশন ফি $645। Step 2 CK: ক্লিনিক্যাল নলেজ, আরো $645। ECFMG সার্টিফিকেশন $160। OET (ইংরেজি দক্ষতা) $587। Pathway Application $900।
মোট পরীক্ষার খরচ: $3,000 থেকে $3,500। বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ।
তারপর স্টাডি ম্যাটেরিয়াল। First Aid ($55), UWorld Question Bank ($700-$900), Pathoma ($100), Sketchy Medical ($300)। আরো এক থেকে দেড় লাখ।
মোট: সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। ন্যূনতম।
সুমাইয়ার বাবার বেতন মাসে বত্রিশ হাজার। ছয় লাখ মানে বাবার দেড় বছরের বেতন। শুধু পরীক্ষা আর বই।
৩
কিন্তু টাকা শুধু শুরু। আসল বিনিয়োগ হলো সময়।
USMLE-র জন্য ছয় থেকে বারো মাস ফুল-টাইম পড়া দরকার। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা। UWorld, First Aid, Pathoma, প্র্যাকটিস টেস্ট।
সুমাইয়া কি ফুল-টাইম পড়তে পারবে? না। কারণ সে ইন্টার্ন। ৩৬ ঘণ্টার শিফট। ইন্টার্নশিপ শেষ না করলে BMDC রেজিস্ট্রেশন হবে না, ECFMG সার্টিফিকেশন হবে না।
তার মানে ইন্টার্নশিপ করতে করতে পড়তে হবে। ৩৬ ঘণ্টা ডিউটি শেষে বাসায় এসে UWorld খোলা। রাতের ডিউটিতে ফাঁকা পেলে First Aid পড়া।
ইউটিউবে একজন বাংলাদেশি ডাক্তার বলছে, "ইন্টার্নশিপের সময় প্রতিদিন চার ঘণ্টা পড়তাম। ঘুমাতাম পাঁচ ঘণ্টা। এক বছর। কোনো সামাজিক জীবন ছিল না।"
কমেন্টে সবাই লিখেছে: "ইনস্পিরেশনাল।"
সুমাইয়া ভাবল, এটা ইনস্পিরেশনাল না। এটা একটা সিস্টেমের ব্যর্থতা।
৪
ধরা যাক পরীক্ষা পাশ করল। ভালো স্কোর পেল। ECFMG সার্টিফাইড হলো। তারপর?
ম্যাচ। NRMP Match। আবেদন, ইন্টারভিউ, পছন্দের তালিকা, আর একটা অ্যালগরিদম।
IMG-দের ম্যাচের হার? 2024 সালে Non-US IMG: প্রায় 58%। মানে 42% সব করেও জায়গা পায় না।
তুমি ছয় লাখ খরচ করলে। এক বছরের ঘুম দিলে। তারপর একটা অ্যালগরিদম বলল: না।
সুমাইয়া ফোনে জাহিদকে বলল, "জানিস, USMLE-টা একটা জুয়া।"
জাহিদ বলল, "জুয়া না। জুয়ায় সবার সম্ভাবনা সমান থাকে। এটায় থাকে না। যার বাবা ডাক্তার, সে USCE আর LOR সহজে পায়। যার টাকা আছে, সে আমেরিকায় গিয়ে অবজার্ভারশিপ করে। তোমার শুধু স্কোর আছে। স্কোর দিয়ে লড়তে হলে Step 1-এ 240+, Step 2 CK-তে 250+ চাই। তার জন্য বারো মাস ফুল-টাইম পড়া চাই। তোমার কাছে সেটা নেই।"
৫
সুমাইয়া একটা টাইমলাইন বানাল। খাতায়, কলম দিয়ে।
HSC পাশ: 2019। বয়স 18। MBBS ভর্তি: 2020। MBBS শেষ (ইন্টার্নশিপ সহ): 2026, বয়স 25। USMLE প্রস্তুতি আর পরীক্ষা: 2027-2028। ম্যাচ: 2029 মার্চ, বয়স 28। রেসিডেন্সি (ইন্টার্নাল মেডিসিন): 2029-2032। ফেলোশিপ (সাব-স্পেশালিটি হলে): 2032-2035।
অ্যাটেন্ডিং হিসেবে প্রথম আসল বেতন: 31 থেকে 35 বছর বয়সে।
HSC-র পর 13 থেকে 17 বছর। জীবনের সবচেয়ে উর্বর সময়টা পুরোটাই পড়াশোনা, পরীক্ষা, ট্রেনিং।
বাবার বয়স এখন 52। সুমাইয়া অ্যাটেন্ডিং হলে বাবার বয়স হবে 63 থেকে 67। রিটায়ারমেন্টের পরে। পেনশন সীমিত, MPO স্কুলশিক্ষক। বাবার চিকিৎসা? বার্ধক্য?
সুমাইয়া এমন কিছুতে বিনিয়োগ করতে পারে না যেটা 13 বছর পর রিটার্ন দেবে। পরিবারের সেই বিলাসিতা নেই।
৬
বিকল্প আছে। PLAB। UK-র পথ।
PLAB 1: $290, বাংলাদেশে দেওয়া যায়। PLAB 2: $980, UK-তে গিয়ে দিতে হয়। ভিসা, বিমান, থাকা-খাওয়া ধরলে মোট $3,500-$4,500।
পাশ করলে NHS-এ কাজ। Foundation Year 2 লেভেলে বেতন 35,000 পাউন্ড। ট্যাক্সের পর মাসে 2,300 পাউন্ড। লন্ডনে একটা রুমের ভাড়া 800-1,200 পাউন্ড।
কনসালট্যান্ট হলে (8-10 বছর পর): 85,000-120,000 পাউন্ড। ভালো, কিন্তু আমেরিকান $300,000-এর ধারেকাছে না।
UK-র পথ একটু সস্তা, একটু কম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু promised land না।
৭
সুমাইয়া গ্রুপে একটা প্রশ্ন করল: "যারা USMLE দিয়ে ম্যাচ করেছেন, আপনাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল? সততার সাথে বলুন।"
উত্তর এলো পঞ্চাশটা।
প্রথম ক্যাটাগরি: বাবা ডাক্তার। খরচ নিজেরাই দিয়েছে। কেউ কেউ আমেরিকায় আত্মীয়ের বাসায় থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
দ্বিতীয়: মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত। জমি বিক্রি করেছে, FDR ভেঙেছে, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নিয়েছে।
তৃতীয়: নিজে আয় করে জোগাড় করেছে। টিউশন, কোচিং। সময় লেগেছে দুই-তিন বছর বেশি।
চতুর্থ ক্যাটাগরি: শূন্য। কেউ লেখেনি। কারণ যাদের বাবা স্কুলশিক্ষক বা দিনমজুর, তারা USMLE-র কথা ভাবতেই পারে না। তারা এই গ্রুপে নেই।
দরজায় একটা অদৃশ্য সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা নেই "শুধু মেধাবীদের জন্য।" লেখা আছে "শুধু সচ্ছলদের জন্য।"
৮
রাতে সুমাইয়া একজন সিনিয়রকে ফোন করল। মরিয়ম আপু। ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ, এখন শিকাগোতে ইন্টার্নাল মেডিসিনে রেসিডেন্সি। তৃতীয় বছর।
"আপু, আমি USMLE-এর কথা ভাবছি। কিন্তু টাকা..."
মরিয়ম আপু বললেন, "সুমাইয়া, ইনস্টাগ্রামে যা দেখো, সেটা আধা সত্য। আমি 35 বছর বয়সে প্রথম ভালো টাকা দেখব। আমার সহপাঠী যে ব্যাংকে ঢুকেছিল, সে 25-এ গাড়ি কিনেছিল।"
"আপনি কি অনুতাপ করেন?"
"না। কিন্তু আমি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। টাকাটা বাবাই দিয়েছিলেন। আমাকে ঝুঁকি নিতে হয়নি, শুধু পরিশ্রম করেছি। কিন্তু যদি বাবা স্কুলশিক্ষক হতেন? ছয় লাখ টাকা জোগাড় করা পাহাড় হতো? তাহলে কি এই ঝুঁকি নিতাম?"
একটু থেমে বললেন, "সম্ভবত না।"
৯
জাহিদ পুরো কথাটা শুনল পরদিন ফোনে।
সুমাইয়া বলল, "তুই কী মনে করিস?"
"আমি মনে করি তুই এখন USMLE দিবি না।"
"কেন?"
"কারণ তুই সংখ্যা জানিস। ঝুঁকি জানিস। আর তোর পরিবার কত টাকা হারাতে পারে সেটাও জানিস। আমেরিকায় যাওয়ার সম্ভাবনা 60%। না-যাওয়ার 40%। 40% চান্সে ছয় লাখ হারানো মানে প্রত্যাশিত ক্ষতি আড়াই লাখ। তোর পরিবারের কাছে আড়াই লাখ টাকার মানে কী?"
সুমাইয়া বলল, "সবকিছু কি টাকার হিসাবে মাপা যায়?"
জাহিদ বলল, "না। কিন্তু যেটা টাকায় মাপা যায়, সেটা না মেপে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বোকামি।"
১০
সুমাইয়া সিদ্ধান্ত নিল। এখন না।
হয়তো পরে। পাঁচ বছর পর। যখন কিছু টাকা জমবে, ভাইয়ের পড়াশোনা শেষ হবে, ঝুঁকি নেওয়ার জায়গাটা একটু বড় হবে।
কিন্তু "হয়তো পরে" মানে সম্ভবত কখনো না। সুমাইয়া এটাও জানে। মেডিসিনে বয়স গুরুত্বপূর্ণ। 28-এ শুরু করলে 35-এ অ্যাটেন্ডিং। 33-এ শুরু করলে 40-এ। প্রতিটা বছর বিলম্বে পুরো টাইমলাইন পিছিয়ে যায়।
আর বাংলাদেশে যে ডাক্তার পাঁচ-ছয় বছর প্র্যাকটিস করে ফেলেছে, সে আবার স্টুডেন্ট হতে চায় না। জীবনের একটা ছন্দ তৈরি হয়ে গেছে। সেই ছন্দ ভাঙতে লাগে সাহস, আর সাহসের পেছনে লাগে নিরাপত্তা জাল। সেই জালটা হলো টাকা।
USMLE ধনীদের গেম। রাজনৈতিকভাবে সঠিক কথা না। কিন্তু সংখ্যা এটাই বলছে। একটা স্কুলশিক্ষকের মেয়ে ছয় লাখ টাকার বাজি ধরতে পারে না। 60% সম্ভাবনায়।
১১
সেদিন রাতে সুমাইয়া একটা "USMLE Success Story" পোস্ট দেখল। একজন লিখেছে: দুই বছর প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে টাকা জমিয়েছি, প্রথমবার ম্যাচ হয়নি, দ্বিতীয়বার হয়েছে, মোট চার বছর লেগেছে, মোট খরচ আট লাখ।
কমেন্টে সবাই তাকে হিরো বলছে। বাজি জেতার গল্প সবাই শোনে।
কিন্তু যে 42% ম্যাচ করতে পারেনি, তাদের গল্প কোথায়? তারা কি ফিরে এসেছে? তারা কি ছয় লাখ ফেরত পেয়েছে?
কেউ জানে না। ব্যর্থতার কোনো ফেসবুক গ্রুপ নেই।
১২
সুমাইয়া ফোনটা রাখল। বালিশে মাথা রাখল।
মাথায় ময়মনসিংহের বাড়ি এলো। বাবা বারান্দায় চা খাচ্ছেন। মা রান্নাঘরে। ভাই উপরতলায় পড়ছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ।
বাবাকে বলা, "বাবা, ছয় লাখ দাও, আমেরিকা যাওয়ার চেষ্টা করব, 60% চান্স আছে।" সুমাইয়া বলতে পারে না। কারণ বাবা দেবেন। নিজের সব দিয়ে দেবেন। জমি বিক্রি করবেন। বাবারা এটাই করেন। কিন্তু বাবাকে ওই জায়গায় ফেলা, যেখানে তিনি না বলতে পারেন না, সেটাই তো অন্যায়।
সুমাইয়া USMLE Bangladesh 2026 গ্রুপের নোটিফিকেশন বন্ধ করল।
এখন না। বাংলাদেশে থাকব। কম বেতনে, কম সম্মানে, কিন্তু বাবার পাশে।
তারপর দেখা যাবে।