ডাক্তারের ROI
সাত বছরের বিনিয়োগ, সাদা অ্যাপ্রোনের দাম, আর ফেসবুকে তিন হাজার লাইক
১
সুমাইয়ার প্রথম ফেসবুক পোস্ট এলো রাত দশটায়।
ছবিতে সুমাইয়া। সাদা অ্যাপ্রোন। গলায় স্টেথোস্কোপ। পেছনে একটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাইনবোর্ড। ক্যাপশন: কিছু নেই। শুধু ছবি।
জাহিদ ছবিটা দেখল। লাইক দিল। তারপর কমেন্ট সেকশনে গেল। ইতিমধ্যে দুইশো কমেন্ট। "মাশাআল্লাহ।" "গর্বিত।" "ডাক্তার আপু।" "দোয়া করবেন।" "পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করলে।"
জাহিদ কমেন্ট পড়তে পড়তে একটা জিনিস লক্ষ্য করল। কমেন্টের ভাষা। মানুষ সুমাইয়াকে সম্বোধন করছে এমনভাবে যেন সে একটা কিছু হয়ে গেছে। একটা কিছু অর্জন করেছে যেটা সাধারণ মানুষ পারে না। একটা আলাদা স্তরে উঠে গেছে।
সত্যি কথা, পেরেছে। সাত বছর। পাঁচ বছর MBBS, এক বছর ইন্টার্নশিপ, তারপর পোস্টিং। সাত বছর ধরে সে শুধু পড়েছে, শিখেছে, পরীক্ষা দিয়েছে, হাসপাতালে ঘুমিয়েছে, ছত্রিশ ঘণ্টার শিফটে দাঁড়িয়ে থেকেছে। আর এখন সে একজন মেডিকেল অফিসার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
কিন্তু জাহিদের মাথায় অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরছে। প্রশ্নটা কুৎসিত। প্রশ্নটা কেউ জোরে বলে না। কিন্তু জাহিদ সংখ্যা পছন্দ করে। সংখ্যা কুৎসিত প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পায় না।
প্রশ্নটা হলো: ROI কত?
২
ROI। Return on Investment। বিনিয়োগের উপর লাভ।
ব্যবসায়ী এই শব্দটা ব্যবহার করে। কিন্তু ক্যারিয়ারেও ROI আছে। প্রতিটা মানুষ তার ক্যারিয়ারে কিছু বিনিয়োগ করে: সময়, টাকা, শক্তি, তারুণ্য। আর বিনিময়ে কিছু পায়: আয়, সম্মান, নিরাপত্তা, অর্থ।
জাহিদ আবার স্প্রেডশিট খুলল। সেই পুরনো ফাইল। ten_year_projection.xlsx। কিন্তু আজ সে নতুন একটা শিট যোগ করল। নাম দিল: "Doctor ROI."
প্রথম কলাম: বয়স। আঠারো থেকে পঁচিশ।
দ্বিতীয় কলাম: সুমাইয়া।
তৃতীয় কলাম: জাহিদ।
চতুর্থ কলাম: ফারুক।
৩
সুমাইয়ার হিসাব।
বয়স আঠারো: MBBS ভর্তি। খরচ শুরু। সরকারি মেডিকেল কলেজে টিউশন ফি কম, কিন্তু বই, যন্ত্রপাতি, হোস্টেল, খাওয়া, ঢাকায় থাকা। বছরে দেড় লাখ ধরলে পাঁচ বছরে সাড়ে সাত লাখ।
আয়? শূন্য। পাঁচ বছর শূন্য। একটা টাকাও আয় নেই।
বয়স তেইশ: ইন্টার্নশিপ। এক বছর। বেতন আট হাজার টাকা। মাসে আট হাজার। বছরে ছিয়ানব্বই হাজার। এই দিয়ে ঢাকায় থাকা, খাওয়া, যাতায়াত? পরিবারের টাকা ছাড়া সম্ভব না।
বয়স চব্বিশ: BCS পরীক্ষা। প্রস্তুতি। আরো ছয় মাস থেকে এক বছর। আয় নেই, বা সামান্য কিছু। কোচিং ফি লাগে।
বয়স পঁচিশ: পোস্টিং পেয়েছে। মেডিকেল অফিসার। বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার।
জাহিদ হিসাব করল। সুমাইয়ার মোট বিনিয়োগ: সাড়ে সাত লাখ (পড়ার খরচ) + সাত বছরের সুযোগ ব্যয়। এই সাত বছরে সে যদি অন্য কিছু করত, কত আয় করতে পারত? ধরা যাক, মাসে বিশ হাজার করে। সাত বছরে সতেরো লাখ। মোট সুযোগ ব্যয়: প্রায় পঁচিশ লাখ। খরচ মিলিয়ে ত্রিশ লাখের কাছাকাছি।
আর পঁচিশ বছর বয়সে সুমাইয়ার মোট আয়? ইন্টার্নশিপের ছিয়ানব্বই হাজার, আর পোস্টিংয়ের দশ মাসে সাড়ে তিন লাখ। মোট: প্রায় সাড়ে চার লাখ।
জাহিদ সংখ্যাটা দেখল। ত্রিশ লাখ বিনিয়োগ। সাড়ে চার লাখ আয়। ROI: মাইনাস পঁচাশি পার্সেন্ট।
৪
জাহিদের হিসাব।
বয়স আঠারো: NU-তে ভর্তি। পড়ার খরচ প্রায় শূন্য। বছরে কয়েক হাজার টাকা। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখছে। উনিশ বছর বয়সে প্রথম আয়। মাসে পাঁচ হাজার।
বয়স কুড়ি: মাসে পনেরো হাজার। একুশ: পঁচিশ হাজার। বাইশ: চল্লিশ হাজার। তেইশ: পঞ্চাশ হাজার। চব্বিশ: সত্তর হাজার। পঁচিশ: আশি থেকে ছিয়ানব্বই হাজার। আজকে ডলারে আটশো, টাকায় প্রায় ছিয়ানব্বই হাজার।
মোট আয়? জাহিদ যোগ করল। উনিশ থেকে পঁচিশ, ছয় বছরে, গড় মাসিক আয় ধরলে ত্রিশ হাজার করে: মোট প্রায় একুশ-বাইশ লাখ। রিয়ালিস্টিক হিসাবে, ওঠানামা ধরে, পঁচিশ-ত্রিশ লাখের মধ্যে।
বিনিয়োগ? NU-র খরচ: ত্রিশ-চল্লিশ হাজার। একটা ল্যাপটপ: পঁচিশ হাজার। ইন্টারনেট বিল, কোর্স ফি: আরো পঞ্চাশ হাজার। মোট: দেড় লাখের কম।
ROI? হাজার পার্সেন্টের উপরে।
৫
ফারুকের হিসাব।
বয়স আঠারো: সরকারি পলিটেকনিক। খরচ শূন্যের কাছাকাছি। বাইশ বছর বয়সে চাকরি পেয়েছে। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। বেতন আঠারো হাজার দিয়ে শুরু।
বাইশ থেকে পঁচিশ, তিন বছরে: গড় বেতন তেইশ হাজার ধরলে মোট আয় প্রায় আট-দশ লাখ।
বিনিয়োগ? পলিটেকনিকের খরচ: পঞ্চাশ হাজারের কম। BCS প্রস্তুতি: আরো ত্রিশ হাজার। মোট: এক লাখের কম।
ROI? ভালো। জাহিদের মতো উচ্চ না, কিন্তু ভালো।
জাহিদ তিনটা সংখ্যা পাশাপাশি রাখল।
পঁচিশ বছর বয়সে মোট আয়:
সুমাইয়া: সাড়ে চার লাখ।
জাহিদ: পঁচিশ-ত্রিশ লাখ।
ফারুক: আট-দশ লাখ।
সুমাইয়া সবার পেছনে। সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা করে, সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিয়ে, সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে, সে সবার পেছনে।
৬
কিন্তু গল্প এখানে শেষ হলে সেটা অসম্পূর্ণ গল্প।
জাহিদ স্প্রেডশিটে আরেকটা শিট যোগ করল। নাম: "Projection: 25 to 55."
এবার হিসাব তিরিশ বছরের। পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন।
বয়স পঁয়ত্রিশ। দশ বছর পর।
সুমাইয়া: স্পেশালিস্ট। গাইনি, বা মেডিসিন, বা চোখ। দশ বছরে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে, কয়েক বছর হাসপাতালে কাজ করেছে, নিজের চেম্বার দিয়েছে। মাসিক আয়: এক লাখ থেকে দেড় লাখ। চেম্বার থেকে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার, হাসপাতাল থেকে বাকিটা।
জাহিদ: ফ্রিল্যান্সার। দশ বছর ধরে কাজ করছে। ক্লায়েন্ট বেজ আছে। ভালো গেলে: মাসে দেড় থেকে দুই লাখ। খারাপ গেলে: মাসে পঞ্চাশ-সত্তর হাজার। টেকনোলজি বদলায়। আজকের স্কিল কালকে অচল হতে পারে। নিশ্চয়তা? শূন্য।
ফারুক: সরকারি চাকরি। দশ বছরে গ্রেড প্রমোশন হয়েছে। বেতন পঁয়তাল্লিশ হাজার। বাড়ি ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা মিলিয়ে হয়তো পঞ্চান্ন-ষাট।
বয়স পঁয়তাল্লিশ। বিশ বছর পর।
সুমাইয়া: প্রতিষ্ঠিত। নিজের চেম্বার, দুই-তিনটা হাসপাতালে ভিজিটিং কনসালট্যান্ট। মাসিক আয়: দুই লাখের উপরে। কিছু ডাক্তার তিন-চার লাখও আয় করে এই বয়সে।
জাহিদ: অনিশ্চিত। হয় নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে, সফটওয়্যার কোম্পানি বা এজেন্সি, মাসে তিন-চার লাখ। অথবা টেকনোলজি শিফটে খাপ খাওয়াতে পারেনি, আয় কমতে শুরু করেছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বয়স বাড়লে নতুন ফ্রিল্যান্সারদের সাথে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়। তারা সস্তায় কাজ করে।
ফারুক: বেতন পঞ্চান্ন হাজার। পেনশন জমছে। চাকরির নিরাপত্তা আছে। অবসরের পর পেনশন পাবে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি খেয়ে ফেলছে তার বেতন।
বয়স পঞ্চান্ন। তিরিশ বছর পর।
সুমাইয়া: এখনো প্র্যাকটিস করছে। ডাক্তারদের রিটায়ারমেন্ট নেই। শরীর চললে চেম্বার চলে। মাসে দেড় লাখের উপরে। কমেছে, কারণ রোগী কম দেখছে। কিন্তু সম্মান কমেনি। "পুরনো ডাক্তার" মানে "ভালো ডাক্তার।"
জাহিদ: হয় একটা ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে, আয় চলছে। অথবা নতুন প্রজন্মের কাছে মার্কেট হারিয়েছে। পঞ্চান্ন বছর বয়সে ফ্রিল্যান্সিং? কঠিন। খুব কঠিন।
ফারুক: অবসর নিয়েছে। পেনশন পাচ্ছে। মাসে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার। ধনী না। কিন্তু ভুখা না। জমানো টাকা আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। গ্র্যাচুইটি পেয়েছে।
৭
জাহিদ প্রজেকশনটা দেখল। একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট।
পঁচিশ বছর বয়সে সুমাইয়া সবার পেছনে। কিন্তু পঁয়ত্রিশে সে সবাইকে ধরে ফেলছে। পঁয়তাল্লিশে সে এগিয়ে যাচ্ছে। পঞ্চান্নতে সে এখনো আয় করছে, যখন জাহিদ অনিশ্চিত আর ফারুক পেনশনে।
ডাক্তারি একটা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। শুরুতে লোকসান, শেষে লাভ। ফ্রিল্যান্সিং শুরুতে লাভ, শেষে অনিশ্চিত। সরকারি চাকরি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাঝামাঝি, কিন্তু স্থির।
কিন্তু এটা শুধু টাকার হিসাব। টাকার বাইরে আরেকটা জিনিস আছে।
৮
স্ট্যাটাস।
বাংলাদেশে স্ট্যাটাস একটা মুদ্রা। চোখে দেখা যায় না, ব্যাংকে জমা রাখা যায় না, কিন্তু এই মুদ্রা দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়।
"ডাক্তারের পরিবার।"
এই চারটা শব্দ বাংলাদেশে একটা পাসপোর্ট। আদালতে গেলে বিচারক একটু ভদ্রভাবে কথা বলে। ব্যাংকে গেলে ম্যানেজার একটু তাড়াতাড়ি দেখে। স্কুলে ভর্তির সময় একটু বেশি গুরুত্ব পায়। বিয়ের বাজারে "ডাক্তার" শব্দটা একটা ম্যাজিক। পাত্রীপক্ষ বা পাত্রপক্ষ, যে দিক থেকেই হোক, "ডাক্তার" মানে নিরাপদ। "ডাক্তার" মানে ভালো পরিবার। "ডাক্তার" মানে সম্মান।
জাহিদ ভাবল। সে মাসে ছিয়ানব্বই হাজার টাকা আয় করে। সুমাইয়া পঁয়ত্রিশ হাজার। কিন্তু বিয়ের বাজারে সুমাইয়ার দাম জাহিদের তিনগুণ। কারণ সুমাইয়ার পরিচয় "ডাক্তার।" জাহিদের পরিচয়? "ফ্রিল্যান্সার।" মানে, "কী করে বুঝি না, তবে কম্পিউটারে কিছু একটা করে।"
সুমাইয়ার বাবা ঋণ করে মেয়েকে পড়িয়েছে। জাহিদ নিজের পয়সায় নিজে চলছে। কিন্তু সমাজের চোখে সুমাইয়া "সফল," জাহিদ "এখনো কিছু হয়নি।"
এটাই স্ট্যাটাস ডিভিডেন্ড। টাকায় কেনা যায় না।
৯
কিন্তু স্ট্যাটাস ফ্রি না। স্ট্যাটাসের একটা দাম আছে। সেই দামটা সুমাইয়া দিয়েছে।
সাত বছর।
আঠারো থেকে পঁচিশ। জীবনের সবচেয়ে ভালো সাত বছর। যে বয়সে মানুষ বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়, প্রেম করে, নিজেকে আবিষ্কার করে, ভুল করে, ভুল থেকে শেখে, সেই বয়সটা সুমাইয়া কাটিয়েছে অ্যানাটমি হলে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে, পরীক্ষার হলে।
সুমাইয়া প্রথম বর্ষে ক্যাডাভার দেখে বমি করেছিল। তৃতীয় বর্ষে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। পঞ্চম বর্ষে নিজে পোস্টমর্টেমে সাহায্য করেছিল। এগুলো কোনো ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা হয়নি।
ইন্টার্নশিপে ছত্রিশ ঘণ্টার শিফট। একটানা। ঘুম নেই। খাওয়া অনিয়মিত। একবার ইমার্জেন্সিতে একজন মা মারা গেছিল সুমাইয়ার সামনে। প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ। রক্ত থামানো যায়নি। সুমাইয়া সেদিন রাতে হোস্টেলে ফিরে কাঁদেনি। কাঁদতে পারেনি। কাঁদলে পরের দিন আবার দাঁড়ানো যায় না।
এগুলো কোনো ROI ক্যালকুলেশনে ধরা যায় না। কত রাতের ঘুম নষ্ট হয়েছে? কটা সম্পর্ক ভেঙেছে সময় না দিতে পেরে? কতবার বাড়িতে যেতে পারেনি পরীক্ষার জন্য? কতবার অসুস্থ শরীরে ডিউটি করেছে কারণ ছুটি নেই?
এগুলোর কোনো কলাম নেই স্প্রেডশিটে। কিন্তু এগুলোই স্ট্যাটাস ট্যাক্স।
১০
জাহিদ স্প্রেডশিটটা সেভ করল। তারপর একটু ভাবল।
সে কি সুমাইয়াকে হিংসা করে? না। কারণ সুমাইয়া যা দিয়েছে, সেটা জাহিদ দিতে পারত না। সাত বছর ধরে একটা জায়গায় আটকে থাকা, ছত্রিশ ঘণ্টার শিফট করা, মানুষের রক্ত দেখা, মৃত্যু দেখা, এগুলো সবাই পারে না।
সে কি সুমাইয়াকে দয়া করে? না। কারণ সুমাইয়া নিজে বেছে নিয়েছে এই পথ। কেউ জোর করেনি। সুমাইয়া জানত কী হবে। তারপরও বেছে নিয়েছে।
তাহলে জাহিদ কী অনুভব করছে?
সম্মান। এবং একটু দুঃখ।
সম্মান কারণ সুমাইয়া এমন একটা কাজ করেছে যেটা সত্যিই কঠিন। দুঃখ কারণ সমাজ এই কঠিন কাজটাকে মহিমান্বিত করে এমনভাবে যেটা বাকিদের ছোট করে। যেন শুধু ডাক্তারি কঠিন, বাকি সব সহজ। যেন শুধু ডাক্তার সম্মানের যোগ্য, বাকিরা নিচে।
১১
জাহিদ ফোনটা রাখল। তারপর একটা নোটপ্যাডে লিখল। স্প্রেডশিটে না, নোটপ্যাডে। কারণ এটা সংখ্যা না, এটা চিন্তা।
"আমরা ডাক্তারকে সম্মান করি কারণ ডাক্তারি কঠিন। কিন্তু কঠিন মানেই ভালো না। কখনো কখনো কঠিন মানে শুধু কঠিন।"
একটু ভেবে আরো লিখল।
"সুমাইয়া সাত বছর দিয়েছে। আমি ছয় বছর দিয়েছি। ফারুক চার বছর দিয়েছে। কিন্তু সমাজ শুধু সুমাইয়াকেই বলবে 'কিছু একটা হয়েছে।' কারণ সুমাইয়ার লেবেলটা সমাজ চেনে। আমার আর ফারুকের লেবেল সমাজ বোঝে না।"
আরেকটা লাইন।
"ডাক্তারি একটা ভালো পেশা। কিন্তু ডাক্তারি ভালো কারণ ডাক্তার মানুষের জীবন বাঁচায়, সেটা না। ডাক্তারি ভালো কারণ সমাজ ডাক্তারকে সম্মান দেয়। আর সম্মান একটা চক্র। আমরা ডাক্তারকে সম্মান দিই কারণ ডাক্তারি কঠিন। ডাক্তারি কঠিন কারণ আমরা কঠিন বানিয়েছি। সাত বছর না হলেও হতো, তিন-চার বছরে কিছু দেশে হয়। কিন্তু আমরা সাত বছর রেখেছি। সাত বছর রেখেছি কারণ কম হলে সম্মান কমে যাবে। সম্মান কমলে ভালো ছেলেমেয়ে আসবে না। আর চক্র চলতে থাকে।"
১২
রাত বারোটা বাজে।
জাহিদ সুমাইয়ার ফেসবুক পোস্টে আবার গেল। লাইক হয়ে গেছে দুই হাজারের উপরে। কমেন্ট পাঁচশো।
সে কমেন্টগুলো পড়ল। প্রতিটা কমেন্টে একটা শব্দ বারবার আসছে: "গর্বিত।" "আমরা গর্বিত।" "পরিবার গর্বিত।" "এলাকা গর্বিত।"
গর্ব। এটাই স্ট্যাটাস ডিভিডেন্ড। সুমাইয়ার বাবা এখন গ্রামে মাথা উঁচু করে হাঁটেন। "আমার মেয়ে ডাক্তার।" ঋণ শোধ হয়নি। কিন্তু ঋণ শোধ না হলেও মাথা উঁচু। কারণ বাংলাদেশে মেয়েকে ডাক্তার বানানো একটা মাইলফলক। একটা পরিবারের শ্রেণি পরিবর্তন।
জাহিদের বাবা? CNG চালান। জাহিদ মাসে ছিয়ানব্বই হাজার আয় করে। বাবাকে প্রতি মাসে পনেরো হাজার পাঠায়। কিন্তু গ্রামে কেউ জিজ্ঞেস করলে জাহিদের বাবা বলেন, "ছেলে কম্পিউটারের কাজ করে।" গর্বের সুর নেই। বিব্রতও না, কিন্তু গর্বও না। মাঝামাঝি কোথাও। কারণ "কম্পিউটারের কাজ" বাংলাদেশে এখনো একটা পরিষ্কার পরিচয় না।
১৩
পরদিন সকালে জাহিদ সুমাইয়ার পোস্টে আবার ঢুকল। লাইক তিন হাজার ছাড়িয়েছে। শেয়ার দুইশো।
তিন হাজার লাইক। একটা ছবিতে। ক্যাপশন ছাড়া।
জাহিদ গত মাসে একটা পোর্টফোলিও পোস্ট করেছিল ফেসবুকে। পাঁচটা ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশট, যেগুলো সে বানিয়েছে। ক্যাপশনে লিখেছিল: "গত ছয় মাসের কিছু কাজ।" লাইক: সাতচল্লিশ। কমেন্ট: তিন।
তিন হাজার বনাম সাতচল্লিশ।
জাহিদ হিসাব করল না এবার। কিছু হিসাবের বাইরে।
১৪
সন্ধ্যায় জাহিদ সুমাইয়াকে ফোন করল। অনেকদিন কথা হয়নি। ফোন ধরতে সময় লাগল। তিন রিং, চার রিং, পাঁচ রিং।
"হ্যালো?"
"সুমাইয়া, জাহিদ বলছি।"
"জাহিদ! কেমন আছিস?" ক্লান্ত গলা। পেছনে কিছু একটা আওয়াজ। হয়তো হাসপাতাল, হয়তো কোয়ার্টার।
"ভালো। তোর পোস্ট দেখলাম।"
"হুম।" একটু চুপ। "ছবিটা আম্মু তুলতে বলেছিলেন। আম্মু এসেছিলেন বেড়াতে।"
"তিন হাজার লাইক।"
সুমাইয়া হাসল। হাসিটা ক্লান্ত। "লাইক দিয়ে কী হবে? গতকাল একটা বাচ্চার নিউমোনিয়া ছিল, রেফার করতে হলো। অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। বাবা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বাসে গেছে জেলা হাসপাতালে। দুই ঘণ্টার রাস্তা।"
জাহিদ কিছু বলল না।
"তিন হাজার লাইক। কিন্তু আমার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই। দুইটা ছিল, দুইটাই খালি। তিন সপ্তাহ ধরে রিকুইজিশন দিয়েছি। কোনো উত্তর নেই।"
আরেকটু চুপ।
"জাহিদ, তুই ভালো আছিস?"
"হুম। ভালো আছি।"
"ভালো থাক। আমার ডিউটি আছে। রাখি?"
"রাখ।"
ফোন কেটে গেল।
১৫
জাহিদ ফোনটা রাখল। স্ক্রিনে সুমাইয়ার ফেসবুক পোস্ট। সাদা অ্যাপ্রোন। তিন হাজার লাইক।
কিন্তু সুমাইয়ার গলায় যে ক্লান্তি ছিল, সেটা তিন হাজার লাইকে ধরা পড়ে না। অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই, অ্যাম্বুলেন্স নেই, রেফার করতে হয় কারণ নিজে কিছু করার ক্ষমতা নেই, এগুলো কোনো ফেসবুক কমেন্টে নেই।
সাদা অ্যাপ্রোন। বাইরে থেকে দেখলে সম্মান। ভেতর থেকে দেখলে? ওজন। একটা ভারী, ক্লান্ত, নিঃশব্দ ওজন। যেটা শুধু যে পরে সে জানে।
জাহিদ স্প্রেডশিটটা বন্ধ করল। ROI-র হিসাব শেষ। কিন্তু হিসাবের বাইরে যেটা আছে, সেটাই আসল কথা।
সুমাইয়া ডাক্তার। সেটা সত্য। সুমাইয়া সম্মানিত। সেটাও সত্য। কিন্তু সুমাইয়া ক্লান্ত, একা, আর একটা ভাঙা সিস্টেমের ভেতরে আটকে আছে। সেটাও সত্য।
তিন হাজার লাইক। কিন্তু সাদা অ্যাপ্রোনের ওজন? সেটা শুধু সুমাইয়া জানে। ফেসবুকের কেউ জানে না। স্প্রেডশিটও জানে না।
১৬
রাত গভীর হচ্ছে। জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল।
বিছানায় শুয়ে ভাবল। চারটা অধ্যায় শেষ হলো। প্রথম অধ্যায়ে সে দেখেছিল শিক্ষার দাম। দ্বিতীয়তে দেখেছিল সার্টিফিকেটের ওজন। তৃতীয়তে দেখেছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের লেবেল। চতুর্থতে দেখেছিল সাদা অ্যাপ্রোনের দাম।
প্রতিটা অধ্যায়ে একটাই জিনিস বারবার এসেছে: সমাজ মানুষকে পরিচয় দেয়। সেই পরিচয়ের ওজন আছে, দাম আছে, সম্মান আছে। কিন্তু পরিচয়ের ভেতরে যে মানুষটা আছে, তার কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না।
সুমাইয়ার সাদা অ্যাপ্রোনের পেছনে সাত বছরের ক্লান্তি, বাবার ঋণ, আর একটা ভাঙা স্বাস্থ্যব্যবস্থা। জাহিদের ল্যাপটপের পেছনে রাত জাগা, অনিশ্চয়তা, আর NU-র ছেলে হওয়ার গ্লানি। ফারুকের সরকারি চাকরির পেছনে আঠারো হাজারে জীবন চালানো আর উপজেলায় একাকীত্ব।
কিন্তু ফেসবুকে? ফেসবুকে শুধু সাদা অ্যাপ্রোন দেখা যায়। শুধু লাইক দেখা যায়। শুধু "গর্বিত" দেখা যায়।
বাস্তব? বাস্তব দেখা যায় না।
অধ্যায় চার শেষ।