BBA-তে কে যায়?
আট লাখ টাকার ডিগ্রি, চারশো পৃষ্ঠার বই, আর একটা নেটওয়ার্ক যেটা কোথাও পৌঁছায় না
১
ঈদের দিন।
জাহিদের মামাবাড়ি নেত্রকোনায়। ঈদে মামাবাড়ি যাওয়া বাধ্যতামূলক। মা-র কথা, বাবার কথা, সবার কথা এক: "ঈদে মামাবাড়ি না গেলে মামা অভিমান করবে।" মামা আদৌ অভিমান করে কি না সেটা আলাদা প্রশ্ন, কিন্তু যাওয়া হয়।
বাসে দুই ঘণ্টা। মাইমনসিং থেকে নেত্রকোনা। রাস্তা খারাপ, বাস পুরনো, সিটের ফোম বেরিয়ে আছে। জাহিদ জানালার পাশে বসে ফোনে Upwork চেক করছে। ঈদের দিনেও ক্লায়েন্ট মেসেজ করে। আমেরিকায় ঈদ নেই।
মামাবাড়িতে পৌঁছে দেখল, তাহের এসেছে।
তাহের জাহিদের খালাতো ভাই। বয়সে এক বছরের ছোট। ময়মনসিংহের একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে BBA পড়ছে। ফার্স্ট ইয়ার শেষ।
তাহের জাহিদকে দেখেই বলল, "ভাইয়া, আমি তো ম্যানেজমেন্ট পড়ছি এখন। তুমি কী করো?"
জাহিদ বলল, "ফ্রিল্যান্সিং।"
তাহেরের চোখে সেই চেনা ভাব। যেটা কিছুটা কৌতুহল, কিছুটা সন্দেহ, কিছুটা করুণা। "ফ্রিল্যান্সিং মানে? কম্পিউটারে কিছু একটা?"
"ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। ক্লায়েন্ট দেয়, আমি বানাই।"
"কত আয় হয়?"
জাহিদ বলল, "মাসে আটশো ডলার।"
তাহের হিসাব করল। আটশো গুণ একশো বিশ। ছিয়ানব্বই হাজার টাকা। তাহেরের বাবা মাসে কামাই করে পঁয়ত্রিশ হাজার। তাহেরের মুখ একটু অন্যরকম হলো। কিন্তু সে পাল্টা বলল, "কিন্তু চাকরি তো না, ভাইয়া। কবে ক্লায়েন্ট চলে যাবে কেউ জানে না। আমার BBA শেষ হলে ব্যাংকে চাকরি হবে। পাকা। স্থায়ী।"
পাকা। স্থায়ী। দুইটা শব্দ যেটা বাংলাদেশে অক্সিজেনের মতো।
২
ঈদের নামাজের পর মামার বাড়ির উঠোনে চাটাই বিছানো হলো। সেমাই, পায়েস, ফিরনি। মামা, মামি, খালা, খালু, মামাতো-খালাতো ভাইবোনের দল। সবাই জড়ো। ঈদের দিনে দুটো জিনিস হয়: খাওয়া আর জিজ্ঞাসাবাদ।
খালু জিজ্ঞেস করল, "তাহের, পড়াশোনা কেমন চলছে?"
তাহের সোজা হয়ে বসল। "ভালো, খালু। ফার্স্ট সেমিস্টারে CGPA 3.5 পেয়েছি।"
"কোন সাবজেক্ট?"
"BBA। ব্যবসায় প্রশাসন।"
খালু মাথা নাড়ল। "ভালো ভালো। BBA করলে ব্যাংকে চাকরি হয়।"
তাহের হাসল। "হ্যাঁ, খালু। এটাই প্ল্যান।"
তারপর খালু জাহিদের দিকে তাকাল। "তুই কী করিস, জাহিদ?"
"ফ্রিল্যান্সিং, খালু।"
"সেটা কী?"
"কম্পিউটারে কাজ। বিদেশি ক্লায়েন্টদের ওয়েবসাইট বানাই।"
খালু চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, "পড়াশোনা তো শেষ করলি। চাকরি খুঁজছিস?"
জাহিদ বলল, "আমি তো কাজ করি, খালু।"
"কাজ আর চাকরি এক জিনিস না।" খালু বলল এটা খুব শান্তভাবে, যেন একটা চিরন্তন সত্য বলছে। তারপর সেমাই মুখে দিল।
জাহিদ কিছু বলল না। এই কথা সে এত বার শুনেছে যে উত্তর দেওয়ার ইচ্ছাটাই শুকিয়ে গেছে।
৩
বিকেলে তাহের আর জাহিদ পুকুরপাড়ে বসে আছে। বাচ্চারা পানিতে নামছে, চেঁচামেচি করছে। আকাশে মেঘ নেই। বাতাসে পুকুরের শ্যাওলার গন্ধ, মাটির গন্ধ, ঈদের সেমাইয়ের গন্ধ।
জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "BBA-তে কেন গেলি?"
তাহের একটু ভাবল। "ভাইয়া, আমি তো ভালো স্টুডেন্ট না। HSC-তে GPA 3.80। সরকারি ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, সব বাদ। তো কী করব?"
"প্রাইভেটে কেন? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে BBA আছে তো।"
তাহের হাসল। "আছে। কিন্তু আব্বা বলল, ন্যাশনালের সার্টিফিকেটে কোনো দাম নেই। যদি টাকা খরচই করতে হয়, প্রাইভেটে কর। অন্তত সার্টিফিকেটে ইউনিভার্সিটির নাম থাকবে।"
"কত খরচ?"
"আট লাখ। চার বছরে।"
আট লাখ। জাহিদ হিসাব করল। তার বাবা মাসে পনেরো হাজার কামাই করে। আট লাখ মানে সাড়ে চার বছরের সম্পূর্ণ আয়। শুধু টিউশন ফি। খাওয়া, থাকা, বই, যাতায়াত আলাদা।
"আব্বা কিস্তিতে দিচ্ছে," তাহের বলল। "সেমিস্টারে এক লাখ। দোকান থেকে আসে। কিন্তু কিছু মাসে কম আসে, তখন মামার কাছ থেকে ধার নেয়।"
তাহেরের বাবার কাপড়ের দোকান নেত্রকোনা শহরে। ছোট দোকান। দুটো কর্মচারী। মাসে আয় অনিয়মিত, কিন্তু গড়ে পঁয়ত্রিশ হাজারের মতো। এই আয় থেকে সংসার চালানো, দুই মেয়ের স্কুলের খরচ, আর ছেলের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির টিউশন।
জাহিদ চুপ করে রইল।
৪
তাহেরের যুক্তি আসলে খারাপ না।
সে বলল, "দেখো ভাইয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে সবাই শেষমেশ কী করে? ব্যাংকে চাকরি করে। BCS দেয়। সরকারি চাকরি খোঁজে। BUET থেকে CSE পাশ করেও লোকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়। তাহলে আমি সরাসরি ব্যাংকের জন্যই পড়ব। মাঝখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চক্কর কেন?"
জাহিদ ভাবল। কথাটায় একটা লজিক আছে।
বাংলাদেশে BUET, RUET, CUET, KUET থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারদের একটা বড় অংশ ইঞ্জিনিয়ারিং করে না। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা করে, কারণ বাজার আছে। কিন্তু সিভিল? মেকানিক্যাল? ইলেকট্রিক্যাল? দেশে তাদের জন্য যথেষ্ট ইন্ডাস্ট্রি নেই। তাই তারা BCS দেয়। ব্যাংকে যায়। মাল্টিন্যাশনালে মার্কেটিং করে। ডিগ্রি আর পেশার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকে না।
তাহের বলল, "আমি অন্তত সৎ। আমি জানি আমি ব্যাংকে যাব। তাই ব্যাংকিং-ফাইন্যান্স পড়ছি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ব্যাংকে যাওয়া, সেটা তো সময়ের অপচয়।"
জাহিদ বলল, "কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সার্টিফিকেটে একটা ওজন আছে। BBA-তে সেটা নেই।"
"ওজন কীসের? BCS পরীক্ষায় সবাই সমান। ইঞ্জিনিয়ার হোক আর BBA হোক, প্রিলিমিনারিতে একই প্রশ্ন। লিখিততে একই নম্বর। ভাইভায় একই প্রশ্ন। ডিগ্রির ওজন কোথায়?"
জাহিদ কিছু বলতে পারল না। কারণ তাহের ভুল বলেনি।
৫
কিন্তু BBA-র বাস্তবতা আরেকটু জটিল।
বাংলাদেশে BBA ডিগ্রি দেয় কত জায়গায়? জাহিদ একদিন হিসাব করেছিল।
সবার উপরে IBA, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Institute of Business Administration। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। দুইশো সিট। ভর্তি পরীক্ষায় আবেদন করে দশ-বারো হাজার। চান্স পায় দুইশো। মানে প্রতি ষাট জনে একজন। BUET-এর চেয়ে কঠিন। IBA থেকে পাশ করলে ব্যাংক, মাল্টিন্যাশনাল, কনসাল্টিং ফার্ম, সব দরজা খোলা। IBA হলো ব্যবসায় শিক্ষার BUET।
তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ। সরকারি। সস্তা। মানসম্মত। কিন্তু আসন কম। ভর্তি পরীক্ষা কঠিন।
তারপর একশোরও বেশি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। NSU, BRAC, IUB, EWU, এগুলো ভালো। ব্যয়বহুল, কিন্তু মানসম্মত। টিউশন বারো থেকে পনেরো লাখ। কিন্তু গ্র্যাজুয়েটরা ভালো চাকরি পায়।
তারপর?
তারপর আরো পঞ্চাশ-ষাট প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। ঢাকায়, চট্টগ্রামে, সিলেটে, রাজশাহীতে, ময়মনসিংহে, কুমিল্লায়। ছোট ক্যাম্পাস। কখনো ক্যাম্পাস নেই, একটা বিল্ডিংয়ের দুটো ফ্লোর ভাড়া নেওয়া। শিক্ষক কম। লাইব্রেরি নেই বললেই চলে। টিউশন পাঁচ থেকে আট লাখ। সার্টিফিকেট দেয়। কিন্তু সার্টিফিকেটের বাজারমূল্য?
তাহের এই তৃতীয় স্তরে।
৬
তাহের বলল, "আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস হয় ঠিকমতো। প্রফেসররা ভালো পড়ান। কারিকুলাম আছে।"
"কারিকুলামে কী পড়াচ্ছে?"
তাহের আঙুলে গুনল। "প্রিন্সিপালস অফ ম্যানেজমেন্ট। প্রিন্সিপালস অফ মার্কেটিং। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং। মাইক্রোইকোনমিক্স। বিজনেস কমিউনিকেশন। বাংলাদেশ স্টাডিজ।"
জাহিদ বলল, "প্রিন্সিপালস অফ ম্যানেজমেন্ট মানে কী শিখছিস?"
"প্ল্যানিং, অর্গানাইজিং, লিডিং, কন্ট্রোলিং। হেনরি ফেওলের চৌদ্দটা প্রিন্সিপাল। মাসলোর হায়ারার্কি অফ নিডস। পোর্টারের ফাইভ ফোর্সেস।"
"এগুলো তো ইউটিউবে ফ্রি পাওয়া যায়।"
তাহের একটু চুপ করল। "ভাইয়া, সব কিছু ইউটিউবে ফ্রি পাওয়া যায়। তোমার ওয়েব ডেভেলপমেন্টও ফ্রি পাওয়া যায়। কিন্তু সার্টিফিকেট ফ্রি পাওয়া যায় না।"
কথাটা সত্য। জাহিদ কিছু বলতে পারল না।
৭
BBA কারিকুলামের একটা সমস্যা আছে যেটা কেউ জোরে বলে না।
চার বছরে যা পড়ানো হয়: মার্কেটিং, ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, হিউম্যান রিসোর্স, অপারেশনস, স্ট্র্যাটেজি, ইকোনমিক্স, স্ট্যাটিস্টিক্স, বিজনেস ল, ইনফরমেশন সিস্টেমস। বারো-তেরোটা বিষয়।
প্রতিটা বিষয়ে তিন-চারটা কোর্স। মোট চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশটা কোর্স। প্রতিটা কোর্স এক সেমিস্টার, মানে চার মাস। চার মাসে একটা পুরো বিষয়ের ভিত্তি শেখানো হয়।
ফলাফল? সবকিছু একটু একটু শেখা হয়। কিছুই গভীরভাবে শেখা হয় না।
মার্কেটিং শিখবে। ফিলিপ কটলারের বই পড়বে। 4P শিখবে: Product, Price, Place, Promotion। কেস স্টাডি করবে কোকা-কোলার, অ্যাপলের। কিন্তু একটা আসল প্রোডাক্ট মার্কেটিং করবে না। একটা আসল ক্যাম্পেইন চালাবে না। একটা আসল বাজেট ম্যানেজ করবে না।
ফাইন্যান্স শিখবে। টাইম ভ্যালু অফ মানি, NPV, IRR, CAPM। সূত্র মুখস্থ করবে। পরীক্ষায় হিসাব করবে। কিন্তু একটা আসল কোম্পানির ব্যালেন্স শিট পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হবে কি?
অ্যাকাউন্টিং শিখবে। ডেবিট-ক্রেডিট, জার্নাল এন্ট্রি, লেজার, ট্রায়াল ব্যালেন্স। কিন্তু QuickBooks বা Tally চালাতে পারবে না। কারণ সফটওয়্যার শেখানো হয় না। খাতায় হিসাব করা শেখানো হয়।
তাহের বলল, "আমাদের প্রফেসর বলেন, BBA হলো জেনারেলিস্ট ডিগ্রি। সবকিছু একটু জানবে, তারপর চাকরিতে গিয়ে স্পেশালাইজ করবে।"
জাহিদ ভাবল, ইন্টারেস্টিং। চার বছর ধরে জেনারেল থাকবে, তারপর চাকরিদাতা তাকে স্পেশালিস্ট বানাবে। চাকরিদাতা কেন বানাবে? সে তো রেডিমেড স্পেশালিস্ট চায়।
৮
BBA-র আসল মূল্য কী?
জাহিদ এটা নিয়ে ভেবেছে। ইউটিউবে ভিডিও দেখেছে, ব্লগ পড়েছে। যারা ভালো ইউনিভার্সিটি থেকে BBA করেছে, তারা বলে: ডিগ্রি না, নেটওয়ার্ক।
ক্লাসমেটরা একদিন ব্যাংকে কাজ করবে, কর্পোরেটে কাজ করবে, ব্যবসা করবে। তারা তোমার রেফারেন্স হবে। প্রফেসররা ইন্ডাস্ট্রিতে কানেক্টেড, তারা তোমাকে ইন্টার্নশিপ দেবে, চাকরির খবর দেবে। অ্যালামনাইরা সিনিয়র পজিশনে আছে, তারা তোমাকে টানবে।
IBA-তে এটা কাজ করে। ঢাকার টপ প্রাইভেটেও কাজ করে। কারণ সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা এমন পরিবার থেকে আসে যেখানে ব্যবসা আছে, কানেকশন আছে, পুঁজি আছে। নেটওয়ার্কটা আগে থেকেই শক্তিশালী। ইউনিভার্সিটি সেটাকে আরো পাকা করে।
কিন্তু তাহেরের ইউনিভার্সিটি? ময়মনসিংহের একটা মিড-টিয়ার প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। ক্লাসমেটরা কারা?
দোকানদারের ছেলেমেয়ে। কৃষকের ছেলেমেয়ে। স্কুল শিক্ষকের ছেলেমেয়ে। ছোট ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়ে। ঠিক তাহেরের মতো। ঠিক জাহিদের মতো। কষ্ট করে টিউশন ফি জোগাড় করা পরিবারের সন্তান।
এদের নেটওয়ার্ক কী? এদের ক্লাসমেট একদিন ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হবে, কর্পোরেটের জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হবে, বাবার দোকানে ফিরে যাবে। কেউ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হবে না। কেউ সিইও হবে না। কেউ ম্যাকিনসিতে কনসাল্ট্যান্ট হবে না।
নেটওয়ার্ক তখনই কাজ করে যখন নেটওয়ার্কে ক্ষমতা থাকে। ক্ষমতা না থাকলে সেটা শুধু পরিচিত মানুষের তালিকা।
৯
জাহিদ তুলনা করল।
তাহের আট লাখ টাকা খরচ করছে চার বছরে। এর বিনিময়ে পাবে: একটা BBA সার্টিফিকেট, চারশো পৃষ্ঠার বইয়ের তত্ত্ব, আর একটা নেটওয়ার্ক যেটা মফস্বলের গণ্ডি পেরোবে না।
জাহিদ খরচ করেছে: শূন্য টাকা। ইউটিউব, freeCodeCamp, MDN, Stack Overflow। ফ্রি রিসোর্স। তিন মাসে HTML, CSS, JavaScript শিখেছে। ছয় মাসে React শিখেছে। এক বছরে ক্লায়েন্ট পেয়েছে। দুই বছরে মাসে আটশো ডলার কামাচ্ছে।
কিন্তু জাহিদের কোনো সার্টিফিকেট নেই।
তাহের ব্যাংকে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবে। জাহিদ পারবে না। কারণ ব্যাংকে চাকরির আবেদনে ন্যূনতম যোগ্যতা: স্নাতক। কোনো কোনো ব্যাংকে: BBA বা MBA। জাহিদের NU-র ফিজিক্সের ডিগ্রি দিয়ে কিছু কিছু জায়গায় আবেদন করা যায়, কিন্তু BBA-ওয়ালাদের সাথে প্রতিযোগিতায় সে পিছিয়ে থাকবে। কারণ সে "সঠিক" বিষয়ে পড়েনি।
আবার, জাহিদ এখনই কামাচ্ছে। তাহের এখনো চার বছর পর কামানো শুরু করবে। এই চার বছরে তাহেরের পরিবার আট লাখ টাকা ঢেলেছে। জাহিদের পরিবার শূন্য।
কে এগিয়ে?
১০
সন্ধ্যায় ফেরার সময় বাসে বসে জাহিদ ভাবছিল।
তাহের ভুল করছে না। তাহের সেটাই করছে যেটা বাংলাদেশের লাখ লাখ ছেলেমেয়ে করে। নিশ্চয়তার পথ বেছে নেওয়া। অনিশ্চিত কিছু না করা। BBA করব, ব্যাংকে চাকরি হবে, বেতন আসবে, পেনশন হবে। সব পরিষ্কার। সব জানা।
কিন্তু নিশ্চয়তার একটা দাম আছে।
আট লাখ টাকা। চার বছর সময়। আর একটা কারিকুলাম যেটা শেখায় তত্ত্ব, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয় না।
তাহের "প্রিন্সিপালস অফ ম্যানেজমেন্ট" পড়ছে। জাহিদ ম্যানেজমেন্ট শিখেছে পাঁচটা ক্লায়েন্টকে একসাথে সামলে, ডেডলাইন মিট করে, অসন্তুষ্ট ক্লায়েন্টকে শান্ত করে, স্কোপ ক্রিপ ঠেকিয়ে। কোনো বই পড়েনি। কোনো পরীক্ষা দেয়নি। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট শিখেছে।
তাহের "ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং" পড়ছে। জাহিদ অ্যাকাউন্টিং শিখেছে নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব রেখে, ট্যাক্স বুঝে, ইনভয়েস বানিয়ে, বিকাশে টাকা ট্র্যাক করে। কোনো লেজার আঁকেনি। কিন্তু হিসাব রাখতে জানে।
তাহের "বিজনেস কমিউনিকেশন" পড়ছে। জাহিদ ক্লায়েন্টের সাথে ইংরেজিতে মেইল লেখে, ভিডিও কলে প্রেজেন্টেশন দেয়, Slack-এ প্রফেশনাল ভাষায় কথা বলে। কোনো কোর্স করেনি। কিন্তু কমিউনিকেশন শিখেছে।
BBA মানে "ব্যবসায় প্রশাসন।" কিন্তু আসল ব্যবসা শেখা যায় ব্যবসা করে, পড়ে না।
তাই কি?
জাহিদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। অন্ধকার নামছে। গ্রামের রাস্তায় রিকশার ঘণ্টি বাজছে। কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছে।
সে ভাবল, তাহের যদি ঠিক হয়? যদি সার্টিফিকেটটাই শেষ পর্যন্ত জেতে? যদি জাহিদের এই আটশো ডলার একদিন শূন্য হয়ে যায়, আর তাহেরের ব্যাংকের চাকরি থাকে?
নিশ্চয়তার আকর্ষণ এখানেই। সে হয়তো কম দেয়। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি দেয়।
অনিশ্চয়তা বেশি দিতে পারে। কিন্তু সে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।
বাস ঝাঁকি দিয়ে একটা গর্তে পড়ল। জাহিদের মাথা জানালায় ঠুকে গেল। সে মাথা ঘষল, আর ভাবা বন্ধ করল।
কিছু প্রশ্নের উত্তর আজ দরকার নেই। উত্তর দেবে সময়।