CA-র পথ
পাঁচ বছর ফকিরের মতো, তারপর বাদশাহ, কিন্তু সেই পথের কথা কেউ বলে না
১
নাহিদের বড় ভাই তারেক।
জাহিদ নাহিদকে চেনে কলেজ থেকে। HSC-তে একসাথে পড়েছে। নাহিদ এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞানে পড়ে। গতানুগতিক ছাত্র। মাঝারি রেজাল্ট। কিন্তু নাহিদের বড় ভাই তারেক একটু অন্যরকম।
তারেক CA। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
জাহিদ শব্দটা আগেও শুনেছে। CA। কিন্তু কী জিনিস, কী করে, কত আয়, সেটা জানত না। বেশিরভাগ মানুষই জানে না। জাহিদ জানত না কারণ তার পরিচিত কোনো CA নেই। তার বাবার পরিচিত কোনো CA নেই। তার স্কুলের কোনো শিক্ষক কখনো ক্লাসে বলেননি, "CA হতে পারো।" কখনো কেউ বলেনি।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, BCS ক্যাডার, এগুলো সবাই জানে। এগুলোর ক্যাম্পাস আছে, ইউনিফর্ম আছে, ফেসবুকে গ্র্যাজুয়েশনের ছবি আছে। CA-এর কিছু নেই। CA অদৃশ্য একটা পেশা। কিন্তু CA-রা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া পেশাজীবীদের একটা।
জাহিদ এটা জানত না। যতক্ষণ না নাহিদ একদিন ফোনে বলল, "ভাইয়ার বেতন শুনবি?"
২
"কত?"
"দেড় লাখ।"
জাহিদ চুপ করে রইল। দেড় লাখ। মাসে। তারেক ভাইয়ের বয়স ত্রিশ। MBBS পাশ করা ডাক্তারের বেতন এই বয়সে কত? সরকারি হলে পঁয়ত্রিশ হাজার। প্রাইভেটে ষাট-সত্তর। আর তারেক ভাই দেড় লাখ।
"কিন্তু সে তো হিসাবরক্ষক। অ্যাকাউন্ট্যান্ট।"
নাহিদ হাসল। "অ্যাকাউন্ট্যান্ট আর CA এক জিনিস না। অ্যাকাউন্ট্যান্ট যে কেউ হতে পারে। CA হতে পারে হাজারে দুইজন।"
"মানে?"
"মানে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস রেট তিন থেকে পাঁচ পার্সেন্ট। বাকি পঁচানব্বই জন ফেল করে। বারবার ফেল করে। কেউ কেউ পাঁচ বছর ধরে পরীক্ষা দিয়ে যায়, পাস করতে পারে না।"
জাহিদ ভাবল। তিন পার্সেন্ট। মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার হার কত? পাঁচ-ছয় পার্সেন্ট। তার মানে CA-র ফাইনাল পরীক্ষা মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষার চেয়েও কঠিন।
কিন্তু একটা পার্থক্য আছে। মেডিকেলে একবার ভর্তি হতে না পারলে শেষ। পরের বছর আবার HSC দিতে হয়, আবার প্রিপারেশন নিতে হয়, আবার লড়তে হয়। CA-তে বারবার পরীক্ষা দেওয়া যায়। ফেল করলে ছয় মাস পর আবার দেওয়া যায়। দরজা বন্ধ হয় না।
"তারেক ভাই কত বছর লেগেছিল?"
"পাঁচ বছর। আর্টিকেলশিপ তিন বছর। পরীক্ষা পাস করতে আরো দুই।"
৩
জাহিদ সেদিন রাতে গুগলে সার্চ করল: ICAB।
Institute of Chartered Accountants of Bangladesh। বাংলাদেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
ICAB-এর ওয়েবসাইট পুরনো ধাঁচের। ফ্যান্সি না। কোনো চকচকে ল্যান্ডিং পেজ নেই, কোনো "আপনার স্বপ্ন পূরণ করুন" টাইপ স্লোগান নেই। শুধু তথ্য। পরীক্ষার সিলেবাস, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, ফি স্ট্রাকচার।
জাহিদ পড়তে শুরু করল।
CA হওয়ার পথটা এরকম:
প্রথমে রেজিস্ট্রেশন। HSC পাস হলেই রেজিস্ট্রেশন করা যায়। কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। কোনো GPA কাটঅফ নেই। 4.17 হোক বা 5.00, দরজা সবার জন্য খোলা।
তারপর আর্টিকেলশিপ। তিন থেকে চার বছর। একটা CA ফার্মে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়। অডিট ফার্ম, ট্যাক্স ফার্ম, অ্যাকাউন্টিং ফার্ম। সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ। রাতে পড়াশোনা। সপ্তাহে ছয়দিন।
আর্টিকেলশিপের বেতন? পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা।
জাহিদ সংখ্যাটা দুবার পড়ল। পাঁচ হাজার টাকা। মাসে। তিন-চার বছর ধরে। ঢাকায় থেকে। ঢাকায় একটা মেসে থাকতে ছয় হাজার লাগে। খেতে আরো সাত-আট। মানে আর্টিকেলশিপের বেতন দিয়ে ঢাকায় টিকে থাকাই সম্ভব না। পরিবার থেকে সাপোর্ট লাগবে, অথবা পার্ট-টাইম কিছু করতে হবে, অথবা না খেয়ে থাকতে হবে।
এটা মেডিকেলের মতো। ইন্টার্ন ডাক্তাররাও আট হাজার পায়। MBBS-এ পড়ার সময়ও উপার্জন শূন্য। দুটো পেশাই একই মডেল ফলো করে: এখন কষ্ট করো, পরে ফল পাবে।
৪
কিন্তু ফলটা কেমন?
জাহিদ ICAB-এর কিছু পুরনো রিপোর্ট খুঁজে পেল। সদস্য সংখ্যা, পাস রেট, কর্মসংস্থানের তথ্য।
বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত CA-র সংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি। পুরো দেশে। আঠারো কোটি মানুষের দেশে মাত্র দুই হাজার CA।
তুলনায়, নিবন্ধিত ডাক্তার প্রায় এক লাখ। ইঞ্জিনিয়ার আরো বেশি। আইনজীবী লাখ লাখ। কিন্তু CA? দুই হাজার।
এত কম কেন? কারণ পরীক্ষা কঠিন। পাস রেট নিম্ন। আর পথটা দীর্ঘ।
কিন্তু এই কমসংখ্যকই বাজারে CA-দের মূল্য তৈরি করে। সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি। যেকোনো বড় কোম্পানির অডিট, ট্যাক্স, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং-এ CA লাগে। ব্যাংকে লাগে। বীমায় লাগে। মাল্টিন্যাশনালে লাগে। স্টক এক্সচেঞ্জে লাগে। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও লাগে। কিন্তু CA পাওয়া যায় না। যে CA পাওয়া যায়, তাকে ধরে রাখতে বেতন দিতে হয় বেশি।
একজন সদ্য পাস করা CA-র শুরুর বেতন? পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার টাকা।
পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায়? এক লাখ বিশ থেকে দুই লাখ।
দশ বছরে? তিন লাখের উপরে। কেউ কেউ পাঁচ লাখ। CFO হলে আরো বেশি।
জাহিদ সংখ্যাগুলো দেখল। এগুলো ডাক্তারের চেম্বারের আয়ের সমান। কিছু ক্ষেত্রে বেশি। আর ডাক্তার হতে সাত বছর লাগে (MBBS পাঁচ, ইন্টার্ন এক, পোস্টগ্র্যাড শুরু করতে আরো এক)। CA হতে লাগে পাঁচ। সময়ও কম।
৫
পরদিন জাহিদ নাহিদকে বলল, "তারেক ভাইয়ের সাথে একটু কথা বলতে পারব?"
নাহিদ বলল, "ভাই সন্ধ্যায় ফ্রি থাকে। ফোন করিস।"
সন্ধ্যায় জাহিদ ফোন করল। তারেক ভাই ফোন ধরলেন। শান্ত গলা। ক্লান্ত কিন্তু স্থির।
"নাহিদ বলেছে তুমি CA নিয়ে জানতে চাও?"
"জি ভাই।"
"কী জানতে চাও?"
"সত্যিই কি এত কঠিন? আর সত্যিই কি এত আয়?"
তারেক ভাই একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "দুটোই সত্যি। কঠিন, কারণ তুমি চার বছর ফকিরের মতো থাকবে। সকালে অফিসে যাবে, ক্লায়েন্টের হিসাব মেলাবে, সন্ধ্যায় বাসায় এসে পড়বে, রাত দুইটায় ঘুমাবে। বেতন পাবে পাঁচ-ছয় হাজার। তোমার বন্ধুরা তখন ত্রিশ-চল্লিশ হাজার কামাবে। তুমি ভাববে, ভুল করলাম কি না।"
"আর তারপর?"
"তারপর তুমি পাস করবে। আর পাস করার পরের মাসে তোমার বেতন হবে পঞ্চাশ হাজার। ছয় মাসের মধ্যে সত্তর। এক বছরে লাখ। তোমার সেই বন্ধুরা তখনো চল্লিশ-পঞ্চাশেই থাকবে।"
তারেক ভাই থামলেন। তারপর বললেন, "CA হতে গেলে পাঁচ বছর ফকিরের মতো থাকতে হবে। তারপর বাদশাহ।"
জাহিদ কথাটা মনে রাখল। ফকির থেকে বাদশাহ। পাঁচ বছরের ব্যবধান।
৬
কিন্তু শুধু ICAB না। আরেকটা পথ আছে।
ACCA। Association of Chartered Certified Accountants। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান। গ্লোবাল কোয়ালিফিকেশন। ১৮০টার বেশি দেশে স্বীকৃত।
জাহিদ ACCA নিয়েও পড়ল। পার্থক্যগুলো বুঝতে চেষ্টা করল।
ICAB বাংলাদেশের নিজস্ব। শুধু বাংলাদেশে কাজ করলে ICAB যথেষ্ট। কিন্তু বিদেশে যেতে চাইলে, মধ্যপ্রাচ্যে, সিঙ্গাপুরে, ইউকেতে, তাহলে ACCA ভালো। ACCA-র পরীক্ষা একটু সহজ, পাস রেট বেশি, ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ পার্সেন্ট। কিন্তু পরীক্ষার সংখ্যা বেশি। তেরোটা পেপার। আর ফি বেশি। ব্রিটিশ পাউন্ডে দিতে হয়।
একটা মজার ব্যাপার জাহিদ খেয়াল করল। ACCA-র পরীক্ষা ঢাকায় দেওয়া যায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলে। মানে ইউকে না গিয়েও ইউকে কোয়ালিফিকেশন নেওয়া সম্ভব। আর ACCA পাস করলে ইউকেতে কাজ করার রাস্তা খোলে। মধ্যপ্রাচ্যে বড় অডিট ফার্মগুলোতে, Deloitte, PwC, EY, KPMG, ACCA-ধারীদের চাহিদা প্রচণ্ড।
জাহিদ ভাবল, আরিফ জাপান যাওয়ার জন্য ভাষা শিখছে, টাকা জমাচ্ছে, এজেন্ট ধরছে। কিন্তু ACCA পাস করলে কোনো এজেন্ট ছাড়াই বিদেশে যাওয়া যায়। কোম্পানিই ডাকে। ভিসাও দেয়।
৭
তারপর জাহিদের মাথায় একটা চিন্তা এল। তাহের।
তাহের। চাচাতো ভাই। BBA পড়ছে। চার বছরের কোর্স। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেমিস্টার ফি বিশ হাজার। মোট খরচ পড়বে ছয়-সাত লাখ। চার বছর পর ডিগ্রি হাতে পাবে। তারপর চাকরি খুঁজবে। BBA পাস করা ছেলের শুরুর বেতন কত? পনেরো থেকে বিশ হাজার। যদি ভালো কোম্পানি পায়। নাহলে বারো-পনেরো।
তাহের যদি BBA-র বদলে CA শুরু করত?
একই চার বছর। কিন্তু CA-তে টিউশন ফি নেই বললেই চলে। রেজিস্ট্রেশন ফি আছে, পরীক্ষার ফি আছে, কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সেটা কিছুই না। আর আর্টিকেলশিপে বেতন পাওয়া যায়, কম হলেও। মানে পরিবারের খরচ কম।
চার বছর পর BBA ডিগ্রি: বেতন পনেরো হাজার।
পাঁচ বছর পর CA কোয়ালিফিকেশন: বেতন পঞ্চাশ হাজার।
হিসাবটা পরিষ্কার। কিন্তু তাহের কোনোদিন CA-র নাম শোনেনি। তাহেরের বাবা শোনেননি। তাহেরের কলেজের কোনো শিক্ষক বলেননি। কারণ CA ক্যাম্পাসবিহীন একটা পেশা। ক্যাম্পাস নেই, তাই দৃশ্যমান না। দৃশ্যমান না, তাই মানুষ জানে না। মানুষ জানে না, তাই কেউ এই পথে পা বাড়ায় না।
আর একটা কথা। CA মফস্বল থেকে করা যায়। পরীক্ষা ঢাকায় দিতে হয়, কিন্তু পড়াশোনা যেকোনো জায়গা থেকে করা সম্ভব। ICAB-এর স্টাডি ম্যাটেরিয়াল অনলাইনে পাওয়া যায়। আর্টিকেলশিপের জন্য ঢাকায় যেতে হয়, কিন্তু কিছু ফার্ম চট্টগ্রামেও আছে, সিলেটেও আছে।
BBA-তে ক্লাস করতে হয়। উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। CA-তে কোনো ক্লাসরুম নেই। তুমি নিজে পড়বে, পরীক্ষা দেবে, পাস করবে। কেউ তোমাকে পড়াবে না, কেউ তোমাকে আটকাবেও না।
৮
জাহিদ সেই রাতে ল্যাপটপ খুলে বসল। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শেষ করে। একটা স্প্রেডশিট খুলল।
কলাম A: পেশা। কলাম B: সময়। কলাম C: শুরুর বেতন। কলাম D: দশ বছর পর। কলাম E: পরিচিতি।
সে লিখতে শুরু করল।
ডাক্তার। সময়: ৭ বছর (MBBS + ইন্টার্ন)। শুরু: ৩৫K (সরকারি)। দশ বছর: ৮০-১৫০K (চেম্বার মিলিয়ে)। পরিচিতি: সর্বোচ্চ।
ইঞ্জিনিয়ার (সফটওয়্যার)। সময়: ৪ বছর। শুরু: ৩০K। দশ বছর: ১২০-১৫০K। পরিচিতি: উচ্চ।
BCS (প্রশাসন)। সময়: ৪+ বছর (ডিগ্রি + প্রস্তুতি)। শুরু: ২২K। দশ বছর: ৪৫-৬০K (+ পেনশন, ক্ষমতা)। পরিচিতি: সর্বোচ্চ।
CA। সময়: ৫ বছর। শুরু: ৫০-৮০K। দশ বছর: ৩০০K+। পরিচিতি: অদৃশ্য।
ফ্রিল্যান্সার (ওয়েব)। সময়: ১-২ বছর। শুরু: ২০-৩০K। দশ বছর: ৮০-১৮০K (P50)। পরিচিতি: নিম্ন।
জাহিদ শেষ কলামটা দেখল। "পরিচিতি।" এটা তার নিজের যোগ করা কলাম। এটা কোনো চাকরির বিজ্ঞাপনে থাকে না। কোনো ক্যারিয়ার গাইডে থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে এটাই আসল কলাম।
ডাক্তার সবাই চেনে। "আমার ছেলে ডাক্তার" বললে পাড়ায় সম্মান পাওয়া যায়, বিয়ের বাজারে দাম বাড়ে, আত্মীয়রা ফোন করে।
CA? "আমার ছেলে CA" বললে মানুষ জিজ্ঞেস করবে, "সেটা কী?"
এটাই সমস্যা। বাংলাদেশে ক্যারিয়ার চয়েস হয় পরিচিতি দিয়ে, আয় দিয়ে না। মানুষ সেটাই বেছে নেয় যেটা সবাই চেনে। যেটা সবাই চেনে না, সেটা যতই ভালো হোক, কেউ বাছে না। কারণ অজানা মানেই অনিশ্চিত। আর মানুষ অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।
Certainty bias।
৯
জাহিদ ভাবল, তার নিজের জীবনে এই বায়াসটা কীভাবে কাজ করেছে।
বাবা বলেছিলেন, "ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হ।" কেন? কারণ বাবা জানেন ডাক্তার কী, ইঞ্জিনিয়ার কী। বাবা CA জানেন না, তাই বাবা কখনো বলেননি "CA হ।"
চাচা বলেছিলেন, "BCS দে।" কেন? কারণ চাচা জানেন BCS কী। DC, SP, এগুলো দেখেছেন। কিন্তু চাচা জানেন না যে একজন সিনিয়র CA একজন DC-র চেয়ে বেশি আয় করে।
কলেজের শিক্ষকরা বলেছিলেন, "ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হও।" কেন? কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয় জানেন। কিন্তু তারা জানেন না যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও একটা প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন আছে যেটা ডিগ্রির চেয়ে বেশি মূল্যবান।
সমাজ ডিগ্রি বিশ্বাস করে, দক্ষতা না। সমাজ ক্যাম্পাস বিশ্বাস করে, পরীক্ষার কাঠিন্য না। সমাজ ফেসবুকে গ্র্যাজুয়েশনের ক্যাপ-গাউন পরা ছবি বিশ্বাস করে, নীরবে পাস করা CA সার্টিফিকেট না।
তাই সবাই BBA করে, CA করে না। সবাই MBA করে, ACCA করে না। সবাই ক্যাম্পাসে যায়, কারণ ক্যাম্পাস চেনা জায়গা। ক্যাম্পাসে বন্ধু থাকে, র্যাগিং থাকে, ক্যান্টিনে চা থাকে, ফেসবুক গ্রুপ থাকে। CA-তে কিছু নেই। শুধু বই আর পরীক্ষা আর একটা চেয়ারে বসে ক্লায়েন্টের হিসাব মেলানো।
১০
রাত গভীর হলো। জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল না।
সে আরেকটা কথা ভাবছিল। CA + কোডিং।
জাহিদ কোডিং জানে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। JavaScript, Python। ফ্রিল্যান্সিং করে। আর CA মানে ফাইন্যান্স, অডিট, ট্যাক্স, কমপ্লায়েন্স।
কোডিং + ফাইন্যান্স = ফাইন্যান্সিয়াল সফটওয়্যার।
বাংলাদেশে কতজন আছে যে একই সাথে কোডিং জানে আর CA-ও? জাহিদ ভাবল, হাতে গোনা। হয়তো দশজন। হয়তো পাঁচজন। হয়তো কেউ নেই।
অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার বানায় কারা? প্রোগ্রামাররা। কিন্তু তারা অ্যাকাউন্টিং বোঝে না। তাই সফটওয়্যার ভালো হয় না। আবার CA-রা সফটওয়্যারের ব্যবহারকারী, কিন্তু তারা কোড লিখতে পারে না। তাই তারা যা চায় সেটা প্রোগ্রামারকে বোঝাতে পারে না।
দুই পক্ষের মাঝখানে একটা শূন্যস্থান।
জাহিদ ভাবল, এই শূন্যস্থানটা তার।
সে CA হবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখনই না। কিন্তু সে একটা কথা বুঝেছে: বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বেতনের পেশাটা সবচেয়ে কম পরিচিত। কারণ সেটার কোনো ক্যাম্পাস নেই। কোনো ইউনিফর্ম নেই। কোনো ফেসবুকে গ্র্যাজুয়েশনের ছবি নেই।
আর যে জিনিসের ছবি নেই, বাংলাদেশে সেটার অস্তিত্বও নেই।
১১
জাহিদ ফোন তুলে নাহিদকে একটা মেসেজ পাঠাল।
"তারেক ভাইকে বলিস, ধন্যবাদ।"
তারপর সে নোটপ্যাডে একটা লাইন লিখল। নিজের জন্য। কোনো ক্লায়েন্টের জন্য না, কোনো অ্যাসাইনমেন্টের জন্য না।
"যে পথের কথা কেউ বলে না, সেটাই হয়তো সবচেয়ে ভালো পথ। কারণ সেখানে ভিড় নেই।"
ফোন রেখে দিল।
বাইরে রাতের বাতাস। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। পাশের ঘরে মিম ঘুমাচ্ছে। মায়ের ঘরে মা ঘুমাচ্ছে। বাবা হয়তো এখনো জেগে আছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না।
জাহিদও কিছু বলছে না। সে শুধু ভাবছে।
দেশের সবচেয়ে বেশি আয়ের পেশা। সবচেয়ে কম পরিচিত। দুটো তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটা গল্প তৈরি হয়। আর সেই গল্পটা বাংলাদেশের ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের পুরো ব্যর্থতা এক লাইনে বলে দেয়।
কেউ বলে না, তাই কেউ জানে না। কেউ জানে না, তাই কেউ হয় না। কেউ হয় না, তাই কেউ বলে না।
একটা বৃত্ত। ভাঙার কেউ নেই।