ব্যাংকে চাকরি
নিশ্চিত বেতন, এসি অফিস, টাই-পরা পরিচয়, আর নিশ্চয়তার মায়া
১
তাহের ফোন করল রাতে। গলায় একটা উত্তেজনা, যেটা চেপে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।
"জাহিদ ভাই, আমি ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ পেয়ে গেছি।"
তাহের জাহিদের মামাতো ভাই। BBA পড়ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফাইনান্স মেজর। তৃতীয় বর্ষ শেষ হয়নি, কিন্তু একটা প্রাইভেট ব্যাংকে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছে। তিন মাস। বেতন নেই, কিন্তু সার্টিফিকেট পাবে, আর "ব্যাংকিং এক্সপেরিয়েন্স" যোগ হবে সিভিতে।
"কোন ব্যাংক?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
তাহের নাম বলল। মোটামুটি মাঝারি সাইজের প্রাইভেট ব্যাংক। দেশে তিরিশটার বেশি প্রাইভেট ব্যাংক আছে। সবার নাম মনে রাখা সম্ভব না।
"ভালো খবর," জাহিদ বলল। "কিন্তু ইন্টার্নশিপে বেতন নেই?"
"নাই। তবে লাঞ্চ দেয়। আর ব্রাঞ্চটা মতিঝিলে, যাতায়াত সুবিধা।"
জাহিদ ভাবল, একটা ছেলে বিনা বেতনে তিন মাস কাজ করবে ব্যাংকে, আর এটাকে সে সৌভাগ্য মনে করছে। এটা বাংলাদেশের চাকরির বাজার। সুযোগ এত কম যে বিনা বেতনে কাজ করার অনুমতিটাকেও মানুষ পুরস্কার ভাবে।
২
কিন্তু তাহেরের উত্তেজনার কারণ শুধু ইন্টার্নশিপ না। কারণটা আরও গভীর।
তাহের ব্যাংকার হতে চায়।
এই "চাওয়া"টা বোঝার জন্য বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বুঝতে হবে। মধ্যবিত্ত পরিবারে ক্যারিয়ারের একটা অলিখিত র্যাংকিং আছে। সবার ওপরে ডাক্তার, তারপর ইঞ্জিনিয়ার, তারপর BCS ক্যাডার। এই তিনটার পরেই আসে ব্যাংকার।
ব্যাংকার।
শব্দটা শুনলেই একটা ছবি ভেসে ওঠে। পরিষ্কার শার্ট, টাই, এসি অফিস, কাঠের ডেস্ক, কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ। হাত ময়লা হয় না। রোদে পুড়তে হয় না। বৃষ্টিতে ভিজতে হয় না। মাস শেষে নির্দিষ্ট তারিখে অ্যাকাউন্টে বেতন ঢোকে। বোনাস আসে ঈদে। ঋণ পাওয়া সহজ, কারণ তুমি নিজেই ব্যাংকের লোক।
আর সবচেয়ে বড় কথা, বিয়ের বাজারে "ব্যাংকার" শব্দটার দাম আলাদা।
জাহিদ এটা আগেই লক্ষ করেছে। ফেসবুকে বিয়ের বিজ্ঞাপন দেখলে, "পাত্র চাই" পোস্টগুলোতে লেখা থাকে: "পাত্র ব্যাংকার/ডাক্তার/সরকারি চাকরিজীবী হলে অগ্রাধিকার।" ফ্রিল্যান্সার লেখা থাকে না। ব্যবসায়ী লেখা থাকে কখনো কখনো, কিন্তু সাথে শর্ত থাকে: "প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।" মানে শুধু ব্যবসা করলে হবে না, প্রমাণ দিতে হবে যে ব্যবসাটা চলছে।
কিন্তু "ব্যাংকার" লিখলে কোনো শর্ত লাগে না। ব্যাংকার মানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্যাংকার মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
৩
তাহেরের বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বেতন তেইশ হাজার টাকা। সারাজীবন চাকরি করেছেন, পেনশনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাহেরের মা গৃহিণী। দুই ভাই, এক বোন। বড় ভাই ফার্মেসিতে চাকরি করে, মাসে পনেরো হাজার পায়। ছোট বোন HSC দিচ্ছে।
এই পরিবারের জন্য তাহেরের ব্যাংকে চাকরি পাওয়া মানে একটা শ্রেণি উত্তরণ। বাবা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, ছেলে ব্যাংক অফিসার। এটা শুধু আয়ের পরিবর্তন না, এটা পরিচয়ের পরিবর্তন।
তাহের বলল, "ভাই, আমি ব্যাংক জবের প্রস্তুতি নিচ্ছি। BBA শেষ হওয়ার আগেই পরীক্ষা দিতে চাই।"
"কোন ব্যাংকের পরীক্ষা?"
"সব। যত পরীক্ষা হয়, সব দিব। প্রাইভেট ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক, সব।"
জাহিদ জানত ব্যাংক জবের পরীক্ষার কথা। কিন্তু বিস্তারিত জানত না। তাহের বলল।
প্রাইভেট ব্যাংক: লিখিত পরীক্ষা, তারপর ভাইভা। পাঁচ হাজার আবেদন পড়ে পঞ্চাশটা পদের জন্য। একশো জনে একজন। গণিত, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, ব্যাংকিং অ্যাওয়ারনেস। কোচিং ফি ছয় মাসে বারো থেকে কুড়ি হাজার।
সরকারি ব্যাংক: সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী। BCS-এর মতো প্রতিযোগিতা। দশ হাজার আবেদন, একশো পদ। পরীক্ষা অনিয়মিত, কখনো দুই বছরে একবার, কখনো তিন।
"তুই কোচিংয়ে যাচ্ছিস?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ। মতিঝিলে একটা কোচিং সেন্টার আছে, ওখানে যাচ্ছি। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরি সাড়ে দশটায়।"
তাহের সকালে ইউনিভার্সিটি, দুপুরে ইন্টার্নশিপ, সন্ধ্যায় কোচিং। তিনটা জায়গায় তিনটা ভূমিকা। ছাত্র, ইন্টার্ন, পরীক্ষার্থী। দিনে ষোলো ঘণ্টা ব্যস্ত।
"কিন্তু একটা প্রশ্ন," জাহিদ বলল। "ব্যাংকে ঢুকে আসলে কী করবি?"
তাহের একটু থামল। "মানে?"
"মানে, চাকরি পেলে কী কাজ করতে হবে? দিনের শুরুতে কী করবি, দিনের শেষে কী করবি?"
তাহের চিন্তা করল। বলল, "হিসাব রাখব। ব্যাংকিং ট্রানজেকশন হ্যান্ডেল করব। লোন প্রসেস করব।"
"সেটা তো পড়ে শিখেছিস। কিন্তু আসলে কী হয়, সেটা কি জানিস?"
তাহের জানত না। সে এখনো তত্ত্বের জগতে আছে। বাস্তবটা দেখেনি।
৪
জাহিদ তাহেরের ইন্টার্নশিপে একদিন বেড়াতে গেল। মতিঝিলের একটা ব্যাংকের ব্রাঞ্চ। সাততলা ভবনের দোতলায়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় একটা সিকিউরিটি গার্ড জিজ্ঞেস করল কী দরকার। জাহিদ বলল বন্ধুর সাথে দেখা করতে এসেছে। গার্ড বলল বসুন, লাঞ্চের সময় দেখা করবেন।
জাহিদ বসল। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। দশ-বারোজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারের ভেতরে তিনজন কর্মী বসে আছে। একজন নোট গুনছে, একজন কম্পিউটারে কিছু টাইপ করছে, একজন খাতায় সই নিচ্ছে। ফ্যান ঘুরছে। এসি আছে, কিন্তু কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। গরম।
লাঞ্চের সময় তাহের বের হলো। মুখটা ক্লান্ত। শার্টের কলার খোলা, টাই ঢিলা।
"কেমন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
তাহের বলল, "ভাই, সারাদিন টাকা গুনছি।"
"মানে?"
"ক্যাশ কাউন্টারে বসিয়ে দিয়েছে। গ্রাহক আসে, টাকা জমা দেয়, আমি গুনি। গ্রাহক টাকা তোলে, আমি গুনি। কখনো একশো টাকার নোট, কখনো পাঁচশো, কখনো হাজার। গুনতে গুনতে আঙুল ব্যথা হয়ে গেছে।"
"সকাল থেকে?"
"সকাল আটটা থেকে। ব্রাঞ্চ খোলে সাড়ে নয়টায়, কিন্তু স্টাফদের আটটায় আসতে হয়। ক্যাশ মেলাতে হয়, রিপোর্ট করতে হয়, তৈজসপত্র গোছাতে হয়। তারপর কাউন্টার খোলে। বিকেল চারটায় কাউন্টার বন্ধ, কিন্তু কাজ শেষ হয় ছয়টায়। মাঝে মাঝে আটটা।"
"আটটা?"
"হ্যাঁ। মাস শেষে ক্যাশ ক্লোজিং-এর সময় রাত আটটা, নয়টা লেগে যায়। ম্যানেজার না বললে কেউ উঠতে পারে না।"
জাহিদ ভাবল, সকাল আটটা থেকে রাত আটটা। বারো ঘণ্টা। ইন্টার্ন হিসেবে বিনা বেতনে। আর এটা ইন্টার্নশিপ। চাকরি হলে এই রুটিনটা স্থায়ী হবে।
৫
তাহের আরও কিছু বলল যেটা জাহিদের কানে নতুন লাগল।
"ভাই, ব্যাংকিং মানে আমি যা ভেবেছিলাম, সেটা না।"
"কী ভেবেছিলি?"
"ভেবেছিলাম হিসাব রাখব। ব্যালেন্স শিট দেখব। ক্রেডিট অ্যানালিসিস করব। মানে, ফাইনান্সের কাজ।"
"আর আসলে?"
"আসলে মার্কেটিং। ব্যাংকিং মানে মার্কেটিং।"
তাহের বলল, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার প্রতি মাসে টার্গেট দেন। এই মাসে পঞ্চাশটা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। তিরিশটা ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করতে হবে। বিশটা ইন্স্যুরেন্স পলিসি বিক্রি করতে হবে। DPS, FDR, লোন, সব কিছুর টার্গেট।
"ব্যাংকের অফিসাররা দুপুরের পর বের হয়ে যায়," তাহের বলল। "কোথায় যায় জানো? বাজারে। দোকানে দোকানে গিয়ে বলে, ভাই, আমাদের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলুন। আমাদের ক্রেডিট কার্ড নিন। আমাদের লোনের সুদ কম।"
"সেটা তো সেলসম্যানের কাজ," জাহিদ বলল।
"ব্যাংক অফিসার আর সেলসম্যানের মধ্যে পার্থক্য কী, ভাই? টাই পরা সেলসম্যান।"
তাহের হাসল। হাসিটা তিক্ত ছিল না, কিন্তু মজারও ছিল না। একটু অবাক হওয়ার হাসি। যেন সে নিজেও এইমাত্র বুঝতে পারল ব্যাপারটা।
৬
তাহের জাহিদকে আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। শফিক ভাই। ব্যাংকে পনেরো বছর ধরে কাজ করছেন। এখন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার। মোটামুটি মিড-লেভেল।
শফিক ভাই দেখতে চল্লিশের কাছাকাছি। চুলে একটু পাক ধরেছে। চোখের নিচে কালি। শার্টটা ইস্ত্রি করা, কিন্তু মুখটা ইস্ত্রি করা না। ক্লান্ত।
লাঞ্চ ব্রেকে বাইরে চা খেতে গেলেন। জাহিদও গেল।
শফিক ভাই চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "তাহের বলল তুমি ফ্রিল্যান্সিং করো?"
"জি।"
"কী ধরনের কাজ?"
"ডাটা এন্ট্রি, ওয়েব রিসার্চ। এখন একটু একটু ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখছি।"
শফিক ভাই মাথা নাড়লেন। "ভালো করছ। ব্যাংকে আসার দরকার নেই।"
জাহিদ একটু অবাক হলো। একজন ব্যাংকার বলছেন ব্যাংকে আসার দরকার নেই।
"কেন বলছেন?"
শফিক ভাই চায়ের কাপটা টেবিলে রাখলেন।
"আমি ব্যাংকে ঢুকেছিলাম হিসাব রাখতে। ফাইনান্স পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম ব্যাংকে বসে ব্যালেন্স শিট পড়ব, ক্রেডিট রিস্ক অ্যানালাইসিস করব, ইকোনমি বুঝব। খুব রোমান্টিক ছিলাম।"
তিনি থামলেন। একটু হাসলেন।
"এখন সারাদিন মানুষকে ঋণ দিই। তারপর সারারাত চিন্তা করি ঋণটা ফেরত আসবে কিনা।"
জাহিদ কিছু বলল না। শুনল।
"জানো, ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চাপ কী? NPL। নন-পারফর্মিং লোন। যে ঋণ ফেরত আসে না। আমি যাকে লোন দিই, সে যদি টাকা না ফেরায়, সেটা আমার রেকর্ডে যায়। ম্যানেজার চেঁচায়। হেড অফিস থেকে ফোন আসে। শো-কজ নোটিশ আসে। আমি টাকা দিইনি, ব্যাংকের টাকা দিয়েছি। কিন্তু দায়টা আমার।"
শফিক ভাই আরেকটু চা খেলেন।
"আর গ্রাহকরা? গ্রাহকদের ধৈর্য নেই। লাইনে দাঁড়ালে চেঁচায়। টাকা দেরিতে পেলে চেঁচায়। লোন রিজেক্ট হলে চেঁচায়। আমরা মাঝখানে। ওপর থেকে চাপ, নিচ থেকে চাপ।"
৭
শফিক ভাই বললেন, ব্যাংকের ক্যারিয়ার ল্যাডারটা দেখতে সুন্দর, কিন্তু ওঠার সিঁড়ি খাড়া।
এন্ট্রি লেভেল: প্রবেশনারি অফিসার। বেতন পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার। তিন-পাঁচ বছর পর সিনিয়র অফিসার। দশ বছর পর AVP, নামটা বড় কিন্তু মিড-লেভেল। পনেরো-বিশ বছর পর VP, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে অনেকে থেমে যায়। পদ কম, প্রতিযোগিতা বেশি, প্রমোশনে রাজনীতি আছে।
"পনেরো বছরে আমি সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার," শফিক ভাই বললেন। "AVP হতে আরও দুই-তিন বছর। মানে আঠারো বছর লাগবে AVP হতে। VP হতে পঁচিশ বছর। আমার বয়স তখন পঞ্চাশ পার।"
তিনি আঙুল দিয়ে চায়ের কাপে বৃত্ত আঁকলেন।
"আর জানো সবচেয়ে মজার কথা কী? প্রাইভেট ব্যাংক চাইলে তোমাকে যেকোনো দিন বের করে দিতে পারে। আমার এক কলিগকে গত বছর বের করে দিয়েছে। বারো বছর চাকরি করেছে। একদিন চিঠি এলো, তোমার পদ বিলুপ্ত। ব্যস। বারো বছরের ব্যাংকার, একদিনে বেকার।"
৮
জাহিদ ব্যাংক থেকে বের হলো বিকেলে। মতিঝিলের রাস্তায় হাঁটছে। চারপাশে ব্যাংকের বিল্ডিং। সোনালী, জনতা, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইসলামী, ডাচ-বাংলা। ইট-কাঠ-কাচের দুর্গ। এই দুর্গগুলোর ভেতরে হাজার হাজার মানুষ সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত টাকা গুনছে, লোন দিচ্ছে, ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করছে, টার্গেট পূরণ করছে। মাস শেষে বেতন পাচ্ছে। বাড়িতে গিয়ে বলছে, "আলহামদুলিল্লাহ, চাকরিটা আছে।"
এটাই নিশ্চয়তা। মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, এই জ্ঞানটুকুই যথেষ্ট। এই জ্ঞানের জন্য মানুষ বারো ঘণ্টা খাটে, ম্যানেজারের বকা শোনে, গ্রাহকের রাগ সহ্য করে, প্রমোশনের জন্য দশ বছর অপেক্ষা করে। কারণ বিকল্পটা আরও ভয়ঙ্কর: অনিশ্চয়তা।
জাহিদ নিজের দিকে তাকাল। সে ফ্রিল্যান্সার। তার কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। এই মাসে পনেরো হাজার আয় করেছে, আগের মাসে নয় হাজার, তার আগের মাসে কুড়ি হাজার। কোনো প্যাটার্ন নেই। কোনো গ্যারান্টি নেই। পরের মাসে শূন্যও হতে পারে।
কিন্তু জাহিদের কোনো ম্যানেজার নেই। কেউ তাকে চেঁচিয়ে বলে না পঞ্চাশটা অ্যাকাউন্ট খোলো। কেউ তাকে শো-কজ করে না। সে সকালে উঠে নিজের ইচ্ছামতো কাজ শুরু করে, নিজের ইচ্ছায় শেষ করে।
তাহলে কোনটা ভালো?
৯
জাহিদ বাসায় ফিরে হিসাব করল।
ব্যাংকার: মাসে ত্রিশ হাজার দিয়ে শুরু, পাঁচ বছরে পঞ্চাশ, দশ বছরে সত্তর, পনেরো বছরে এক লাখ। ফ্রিল্যান্সার: প্রথম বছর গড়ে দশ হাজার, তৃতীয় বছরে ত্রিশ, পঞ্চম বছরে দক্ষতা থাকলে এক লাখ। কিন্তু কোনো মাসে দুই লাখ, কোনো মাসে পাঁচ হাজার।
সংখ্যায় ফ্রিল্যান্সার এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ব্যাংকারের আছে নিশ্চয়তা। প্রতি মাসের ছাব্বিশ তারিখে বেতন আসবে, এটা সে জানে। ফ্রিল্যান্সার জানে না পরের কাজ কবে আসবে।
আর বাংলাদেশের পরিবারগুলো নিশ্চয়তার পূজা করে। কারণ এই দেশে অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা খুব তিক্ত। বন্যায় ঘর ভেসে গেছে, মহামারিতে কাজ হারিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। এত অনিশ্চয়তার মধ্যে যদি একটা জিনিস নিশ্চিত থাকে, মাস শেষের বেতনটা, তাহলে সেটাকে আঁকড়ে ধরতে দোষ কী?
দোষ নেই।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে।
১০
প্রশ্নটা হলো: নিশ্চয়তা কি আসলেই নিশ্চিত?
শফিক ভাইয়ের কলিগকে বের করে দিয়েছে বারো বছর পর। প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরির নিরাপত্তা নেই। ম্যানেজমেন্ট চাইলে যেকোনো দিন "পদ বিলুপ্ত" করতে পারে।
সরকারি ব্যাংকে নিরাপত্তা আছে, কিন্তু বেতন কম। আর প্রমোশন এত ধীর যে একটা জীবন পার হয়ে যায়।
দুটোতেই স্ট্রেস আছে। NPL-এর চাপ, টার্গেটের চাপ, অডিটের চাপ, গ্রাহকের চাপ। ব্যাংকারদের মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের হার বেশি। কারণ স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদী, ক্রনিক।
আর ব্যাংকিং তোমাকে ধনী বানায় না। আরামদায়ক বানায়, কিন্তু ধনী না। একজন AVP-র বেতন এক লাখ বিশ হাজার। ঢাকায় বাসা ভাড়া ত্রিশ হাজার, সন্তানের স্কুল দশ হাজার, গাড়ির কিস্তি পনেরো হাজার, বাকি খরচ বাদ দিলে মাস শেষে তেমন কিছু থাকে না। পনেরো বছর চাকরি করে তুমি মধ্যবিত্তই থাকো। উচ্চ মধ্যবিত্ত হয়তো, কিন্তু মধ্যবিত্ত।
তাহলে ব্যাংকের চাকরি "নিশ্চিত" কিসের? নিশ্চিত যে তুমি মধ্যবিত্ত থাকবে। নিশ্চিত যে তোমার জীবন আরামদায়ক হবে, কিন্তু অসাধারণ না। নিশ্চিত যে তুমি কখনো পথে বসবে না, কিন্তু কখনো উড়তেও পারবে না।
১১
জাহিদ রাতে শুয়ে ভাবল।
ব্যাংকের চাকরি বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্বপ্ন কেন? কারণ এটা নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। নিশ্চিত বেতন, নিশ্চিত পরিচয়, নিশ্চিত সামাজিক মর্যাদা। এসি অফিস, টাই-পরা ছবি, বিয়ের বাজারে দাম। এগুলো সব certainty-র নানা রূপ।
কিন্তু certainty নিজেই একটা bias। মানুষ নিশ্চিত জিনিসকে অতিরিক্ত মূল্য দেয়। একটা নিশ্চিত ত্রিশ হাজার টাকা আর একটা অনিশ্চিত পঞ্চাশ হাজার টাকার মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ ত্রিশ হাজার বেছে নেবে। কারণ ত্রিশ হাজার "আছে।" পঞ্চাশ হাজার "হতে পারে।"
বাংলাদেশের পরিবারগুলো এই bias-এ আটকে আছে। তারা সন্তানদের বলে, "একটা নিশ্চিত চাকরি করো।" মানে সরকারি চাকরি, ব্যাংকের চাকরি, বড় কোম্পানির চাকরি। ফ্রিল্যান্সিং নিশ্চিত না। ব্যবসা নিশ্চিত না। নিজের কিছু করা নিশ্চিত না।
কিন্তু জাহিদ দেখেছে, "নিশ্চিত" চাকরিগুলোও আসলে নিশ্চিত না। প্রাইভেট ব্যাংক ছাঁটাই করে। সরকারি চাকরিতে প্রমোশন আটকে যায়। বড় কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। কিছুই স্থায়ী না।
তাহলে কেন মানুষ নিশ্চয়তার পেছনে ছোটে? কারণ নিশ্চয়তা একটা অনুভূতি, বাস্তবতা না। তুমি ব্যাংকে চাকরি করো, তোমার মনে হয় তুমি নিরাপদ। এই "মনে হওয়া"টাই যথেষ্ট। অনুভূতি দিয়ে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়।
তাহের ব্যাংকে চাকরি পেলে তাহেরের বাবা-মা খুশি হবেন। পাড়ার লোক বলবে, "ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে।" বিয়ের প্রস্তাব আসবে। তাহের একটা পরিচয় পাবে, একটা কাঠামো পাবে, একটা রুটিন পাবে। এগুলো সব ভালো। এগুলোর দরকার আছে।
কিন্তু জাহিদ জানে, নিশ্চয়তা একটা মায়া।
মায়া দেখতে সুন্দর। মায়া মানুষকে শান্তি দেয়। মায়া মানুষকে ঘুমাতে সাহায্য করে। তাই মায়া দরকারি।
কিন্তু মায়া সত্য না। নিশ্চয়তা একটা মায়া। কিন্তু মায়া দেখতে সুন্দর।
জাহিদ চোখ বন্ধ করল। ঘুমানোর চেষ্টা করল। পারল না। মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন: তাহের কি ভুল করছে? নাকি সে নিজেই ভুল করছে, নিশ্চয়তা ছাড়া পথে হেঁটে?
উত্তর নেই। অন্তত আপাতত নেই।