বাবার দোকান

চল্লিশ হাজার টাকা, একটা bKash পয়েন্ট, আর পঁচিশ বছর পর প্রথমবার নিজের কিছু

পর্ব ৪৪ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাতে খাওয়ার পরে মা রান্নাঘর গোছাচ্ছিলেন। জাহিদ পাশের ঘরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে। Upwork-এ একটা ক্লায়েন্টকে মেসেজ পাঠাচ্ছে। বাবা বাইরে উঠোনে বসে বিড়ি টানছেন। CNG-র চাবিটা পাশে রাখা।

মা হঠাৎ বললেন, "জাহিদ।"

"হুম।"

"একটা কথা বলব।"

জাহিদ ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলল। মা-র গলার স্বর শুনে বুঝল, এটা সাধারণ কথা না। একটু নিচু, একটু দ্বিধাগ্রস্ত।

"বলো।"

মা থালা মুছতে মুছতে বললেন, "তোর বাবা সারাজীবন অন্যের CNG চালিয়েছে। কোনোদিন নিজের কিছু হলো না।"

জাহিদ চুপ করে রইল।

"যদি নিজের একটা দোকান হতো..."

কথাটা শেষ করলেন না মা। শেষ করার দরকারও নেই। জাহিদ বুঝে গেল।

বাবা CNG চালান পঁচিশ বছর ধরে। নিজের CNG না, ভাড়ায় নেওয়া। মালিক মিলন সাহেব। প্রতিদিন সকালে CNG নিয়ে বের হন, রাতে ফেরত দেন। ভাড়া দিনে তিনশো টাকা। বাকি যা আয় হয়, সেটা নিজের।

ভালো দিনে আয় হয় সাতশো-আটশো। ভাড়া বাদে হাতে থাকে চারশো-পাঁচশো। মাসে বারো-পনেরো হাজার। খারাপ দিনে, বৃষ্টিতে, হরতালে, অসুস্থ থাকলে, আয় শূন্য।

পঁচিশ বছর। এই একই চক্র। কোনো ছুটি নেই, কোনো বোনাস নেই, কোনো ইনক্রিমেন্ট নেই। বয়স বাড়ছে, শরীর ক্লান্ত হচ্ছে, কিন্তু আয় সেই একই।

বাবার বয়স এখন সাতচল্লিশ। আরো দশ-বারো বছর CNG চালাতে পারবেন। তারপর? শরীর সায় দেবে না। তখন কী হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।

পরদিন সকালে জাহিদ বাবাকে বলল, "বাবা, একটা কথা বলব।"

বাবা CNG-র চাবি হাতে নিচ্ছিলেন। থামলেন। "কী?"

"তুমি কি কখনো ভেবেছ, CNG-র পাশাপাশি একটা ছোট ব্যবসা করলে কেমন হয়?"

বাবা হাসলেন। হাসিটা খুশির না, বিরক্তিরও না। ক্লান্তির। যেন এই প্রশ্নটা আগেও নিজের কাছে নিজেই করেছেন, উত্তর না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

"দোকান? কী বেচবো? আমি তো শুধু গাড়ি চালাতে জানি।"

"দোকানে সবকিছু বেচতে হয় না, বাবা।"

"তুই বোঝ না। দোকান দিতে গেলে জায়গা লাগে, টাকা লাগে, মাল কিনতে হয়। আমার পক্ষে এত কিছু সামলানো..."

"সব দোকান এক রকম না।"

বাবা চাবি পকেটে ঢোকালেন। "যাই, দেরি হচ্ছে।" চলে গেলেন।

কিন্তু জাহিদ ছাড়ল না। ল্যাপটপ খুলে রিসার্চ শুরু করল। তিন দিন ধরে। সন্ধ্যায় ক্লায়েন্টের কাজ, রাতে রিসার্চ।

তিনটা অপশন বের হলো।

প্রথম: মোবাইল রিচার্জ আর ক্যাশআউট পয়েন্ট। bKash, Nagad এজেন্ট। বিনিয়োগ পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো। মাসিক আয় পাঁচ থেকে পনেরো হাজার। ঝুঁকি কম, জায়গা কম লাগে।

দ্বিতীয়: মুদি দোকান। বিনিয়োগ দুই থেকে তিন লাখ। মাসিক আয় পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার। কিন্তু জায়গা লাগবে, মাল তোলা-নামানো, স্টক ম্যানেজমেন্ট, বাকি খাতা। কাজ অনেক বেশি।

তৃতীয়: ফটোকপি আর প্রিন্ট দোকান। বিনিয়োগ দেড় লাখ। মাসিক আয় দশ থেকে বিশ হাজার। কিন্তু মেশিন কিনতে হবে, টেকনিক্যাল জ্ঞান লাগবে।

উত্তরটা পরিষ্কার। bKash/Nagad এজেন্ট পয়েন্ট। বিনিয়োগ সবচেয়ে কম, ঝুঁকি সবচেয়ে কম, টেকনিক্যাল জ্ঞান লাগে না। আর সবচেয়ে বড় কথা: CNG ছাড়তে হবে না। সকালে বাবা CNG নিয়ে বের হবেন, সেই সময় মা এজেন্ট পয়েন্টে বসবেন। বিকেলে বাবা ফিরলে বাবা বসবেন। ডুয়াল ইনকাম, ডুয়াল শিফট।

রাতে খাবার টেবিলে জাহিদ কথাটা তুলল।

"বাবা, আমি একটু হিসাব করেছি।"

বাবা ভাত খাচ্ছিলেন। চামচ থামালেন না।

"তোমাকে দোকান দিতে হবে না। শুধু একটা bKash-Nagad এজেন্ট পয়েন্ট। বাস স্ট্যান্ডের কাছে।"

বাবা এবার চামচ রাখলেন। "bKash পয়েন্ট? ওগুলো তো সব ছেলেমেয়েরা চালায়।"

"তুমিও পারবে। ফোনে bKash অ্যাপ ব্যবহার করা শিখতে একদিন লাগবে। আমি শেখাব।"

"টাকা কোথায়?"

এই প্রশ্নটার জন্য জাহিদ তৈরি ছিল।

"আমার কাছে আছে। দুই মাসের ফ্রিল্যান্সিংয়ের সেভিংস থেকে চল্লিশ হাজার দিতে পারব।"

মা রান্নাঘর থেকে মাথা বাড়িয়ে তাকালেন। বাবা একটু চুপ করে রইলেন।

"তোর টাকা তোর পড়াশোনায় লাগ।"

"পড়াশোনা শেষ, বাবা। এখন কাজ করার সময়।"

বাবা আবার চুপ। ভাবছেন। মা বললেন, "শুনে দেখো না। ছেলে ভেবেচিন্তে বলছে।"

পরের সপ্তাহে জাহিদ বাবাকে নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে গেল।

বাস স্ট্যান্ডের ঠিক পাশে, চায়ের দোকানের পরে, একটা ছোট ঘর খালি। আটফুট বাই ছয়ফুট। ভাড়া মাসে দেড় হাজার। আগে একটা সিগারেটের দোকান ছিল, বন্ধ হয়ে গেছে।

জাহিদ বলল, "এখানে একটা টেবিল, একটা চেয়ার, একটা সাইনবোর্ড। ব্যস।"

বাবা ঘরটার দিকে তাকালেন। ছোট। অন্ধকার। দেয়ালে জং ধরা টিন।

"এখানে?"

"বাস স্ট্যান্ডের পাশে মানে কাস্টমার পাবে। রিকশাওয়ালা, দোকানদার, সবাই ক্যাশআউট করে। দিনে ত্রিশ-চল্লিশটা ট্রানজ্যাকশন হলেই মাসে আট-দশ হাজার আসবে।"

বাবা কিছু বললেন না। কিন্তু ঘরটার ভেতরে ঢুকলেন। দেয়াল ছুঁয়ে দেখলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

"ভাড়া?"

"দেড় হাজার। আমি দেব।"

পরের দুই সপ্তাহ ব্যস্ত গেল।

bKash এজেন্ট রেজিস্ট্রেশন। এনআইডি, ট্রেড লাইসেন্স, ছবি। জাহিদ অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে দিল, বাবার নামে। Nagad-এও আবেদন করল। দুটো থাকলে কাস্টমার বেশি।

ঘরটা ভাড়া নিল। দেয়ালে সাদা চুন, একটা ছোট টেবিল, প্লাস্টিকের চেয়ার দুটো। সাইনবোর্ড বানিয়ে আনল।

মোট খরচ:

bKash রেজিস্ট্রেশন আর প্রারম্ভিক ব্যালেন্স: পনেরো হাজার। Nagad রেজিস্ট্রেশন: আট হাজার। ঘর সাজানো, টেবিল, চেয়ার, সাইনবোর্ড: পাঁচ হাজার। প্রথম মাসের ভাড়া: দেড় হাজার। ক্যাশ ব্যালেন্স (ক্যাশআউটের জন্য হাতে নগদ): দশ হাজার।

মোট: চল্লিশ হাজার টাকা। জাহিদের দুই মাসের ফ্রিল্যান্সিং সেভিংস।

বাবা প্রথমদিন দোকানে বসলেন বিকেলে। CNG থেকে ফিরে গোসল করে এসে বসলেন।

প্রথম কাস্টমার একজন রিকশাওয়ালা। পাঁচশো টাকা ক্যাশআউট। কমিশন আঠারো টাকা।

আঠারো টাকা।

বাবা ফোনের স্ক্রিনে ট্রানজ্যাকশনটা দেখলেন। জাহিদ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

"এই আঠারো টাকা তোমার। এটা কারো কাছ থেকে ভাড়া করা না। কারো কাছে জমা দিতে হবে না।"

বাবা কিছু বললেন না। কিন্তু ফোনটা হাতে ধরে রইলেন কিছুক্ষণ।

দ্বিতীয় কাস্টমার এল দশ মিনিট পরে। হাজার টাকা সেন্ড মানি। তৃতীয় কাস্টমার আরো পনেরো মিনিট পরে। মোবাইল রিচার্জ, একশো টাকা।

প্রথম বিকেলে সাতটা ট্রানজ্যাকশন। কমিশন আয় একশো বিশ টাকা।

প্রথম মাসে হিসাব করল জাহিদ।

মোট ট্রানজ্যাকশন: ৬৮০টা। দিনে গড়ে ২২-২৩টা। সকালে মা, বিকেলে বাবা। বাজারের দিনে বেশি।

মোট কমিশন আয়: ৮,২০০ টাকা। ভাড়া বাদে: ৬,৭০০ নিট।

বাবার CNG আয়: ১৫,০০০ (গড়ে)।

মোট পারিবারিক আয়: ২৩,০০০ টাকা। আগে ছিল ১৫,০০০। বৃদ্ধি পঞ্চান্ন শতাংশ।

সংখ্যাটা বড় না। কিন্তু এই পরিবারের জন্য বড়। আট হাজার টাকায় কী হয়? মা-র ওষুধ কেনা হয়, যেটা আগে মাঝেমধ্যে বাদ পড়ত। ছোটবোনের খাতা-কলম কেনা হয়, যেটা আগে ধার করতে হতো। মাসে দুইবার মাংস রান্না হয়, যেটা আগে একবার হতো।

আট হাজার টাকায় জীবন বদলায় না। কিন্তু জীবনের চাপ একটু কমে।

১০

কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা টাকায় মাপা যায় না।

মা এখন সকালে দোকানে বসেন। নয়টা থেকে দুইটা। আগে সারাদিন বাড়িতে থাকতেন। এখন পাশাপাশি একটা কাজ আছে যেটা বাড়ির বাইরে। মানুষ আসে, কথা বলে, টাকা লেনদেন করে। মা হিসাব রাখেন একটা খাতায়।

মা একদিন বললেন জাহিদকে, "আজ ছত্রিশটা হয়েছে।"

গর্ব। গলায় গর্ব। মা সারাজীবন গৃহিণী ছিলেন। এটা তাঁর প্রথম কাজ। ছোট, হ্যাঁ। কিন্তু নিজের।

আর বাবা? পঁচিশ বছর ধরে মিলন সাহেবের CNG চালিয়েছেন। মিলন সাহেব মালিক, বাবা চালক। কিন্তু এখন বাবার নিজের একটা কিছু আছে। bKash-এর রেজিস্ট্রেশন তাঁর নামে। Nagad-এর লাইসেন্স তাঁর নামে। আয়টা তাঁর। কাউকে ভাড়া দিতে হয় না।

পঁচিশ বছরে প্রথমবার।

১১

বাবা একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরলেন। জাহিদ ল্যাপটপে কাজ করছিল।

"জাহিদ।"

"হুম।"

"আজ একটা লোক এসেছিল। বলল, ভাই আপনি তো CNG চালান, এখন আবার দোকানও দিয়েছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ।"

থামলেন।

"লোকটা বলল, বাহ, ভালো করেছেন।"

এটুকুই। বাবা আর কিছু বললেন না। কিন্তু বলার ভঙ্গিতে একটা কিছু ছিল যেটা জাহিদ আগে দেখেনি। লজ্জা না, সংকোচ না। একটু যেন সোজা হয়ে বলা। একটু যেন নিজেকে নিজের পরিচয় দেওয়া।

আমিও একটা কিছুর মালিক।

১২

জাহিদ সেই রাতে ল্যাপটপে একটা নোট লিখল।

"সবাই বলে চাকরি নাও, ডিগ্রি নাও, বিদেশ যাও। কেউ বলে না: ছোট একটা ব্যবসা খোলো। কেউ বলে না, আমার বাবা bKash এজেন্ট। বলতে লজ্জা পায়।

কিন্তু লজ্জার কী আছে?

ROI? চল্লিশ হাজার টাকা বিনিয়োগ। মাসিক আয় আট হাজার। পাঁচ-ছয় মাসে বিনিয়োগ উঠে আসবে। এই ROI কোনো ডিগ্রি দিতে পারে না। চার বছরের BBA-তে আট লাখ খরচ করলে বিনিয়োগ উঠতে কত বছর লাগে?

চল্লিশ হাজারে ছয় মাসে বিনিয়োগ ফেরত। এটা কেন কেউ কনসিডার করে না?

কারণ certainty bias। মানুষ মনে করে ডিগ্রি মানে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ছোট ব্যবসা মানে অনিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবে উলটো। ডিগ্রি নিয়ে বেকার থাকা খুব সম্ভব। ছোট ব্যবসায় দিনের শেষে হাতে কিছু টাকা থাকা প্রায় নিশ্চিত।

কিন্তু এই কথা কেউ শুনবে না। কারণ bKash এজেন্ট বলতে কেউ গর্ব করে না। গর্ব করে ডিগ্রি নিয়ে। এমনকি সেই ডিগ্রি দিয়ে চাকরি না পেলেও।"

১৩

দুই মাস পর। দোকান চলছে। মাসিক আয় নয় হাজারে উঠেছে। রেগুলার কাস্টমার তৈরি হয়েছে। বাবা এখন ফোনে bKash অ্যাপ একাই চালাতে পারেন। তৃতীয় সপ্তাহে নিজে থেকে একটা সমস্যা সমাধান করলেন, ট্রানজ্যাকশন ফেইল হলে কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে ঠিক করিয়ে দিলেন। সাতচল্লিশ বছর বয়সে নতুন কিছু শেখা। সেটাও একটা বিনিয়োগ।

জাহিদ একদিন সন্ধ্যায় দোকানে বসে আছে। একজন লোক এলেন, দুই হাজার টাকা ক্যাশ ইন। লোকটা বললেন, "তোমাদের দোকান কবে থেকে?" জাহিদ বলল, "দুই মাস।" লোকটা বললেন, "ভালো। আগে বাজারে যেতে হতো। এখন পাশেই পাই।"

জাহিদ দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। বাস স্ট্যান্ড। সন্ধ্যার আলো।

এই দোকানটা ছোট। আটফুট বাই ছয়ফুট। টিনের দেয়াল, প্লাস্টিকের চেয়ার। কিন্তু এটা বাবার নামে।

পঁচিশ বছর পর বাবা শুধু একজন CNG চালক না। বাবা একজন ব্যবসার মালিকও। ছোট ব্যবসা। কিন্তু নিজের।

কখনো কখনো সবচেয়ে ভালো রিটার্ন আসে সবচেয়ে ছোট বিনিয়োগ থেকে। চল্লিশ হাজার টাকায় একটা পরিবারের আয় পঞ্চান্ন শতাংশ বাড়ানো যায়। আর সংখ্যার বাইরে আরেকটা জিনিস পাওয়া যায়, যেটার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

মর্যাদা।