স্টার্টআপ স্বপ্ন

ইউটিউবের স্বপ্ন, মফস্বলের বাস্তবতা, আর একটা প্রোটোটাইপ যেটা চলল না

পর্ব ৪৬ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত সাড়ে এগারোটা। ক্লায়েন্টের কাজ শেষ। জাহিদ ল্যাপটপের স্ক্রিনে ইউটিউব খুলল।

অটোপ্লে-তে একটা ভিডিও চলছে। থাম্বনেইলে একটা ছেলে, বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ, পাশে একটা ল্যাম্বরগিনি, টাইটেল: "How I Made $10K/Month From My Laptop." ভিউ ১.২ মিলিয়ন।

জাহিদ দেখল। পুরোটা দেখল।

ছেলেটা আমেরিকান। ড্রপশিপিং করে। Shopify স্টোর। ফেসবুক অ্যাড। প্রথম মাসে লস, দ্বিতীয় মাসে ব্রেকইভেন, তৃতীয় মাসে দশ হাজার ডলার প্রফিট। এরপর? স্কেল। টিম হায়ার। অটোমেশন। প্যাসিভ ইনকাম।

ভিডিওটা শেষ হতে না হতে পাশে আরেকটা। "I Built a $1M SaaS in 6 Months." তারপর আরেকটা। "Quit My Job, Now I Make $50K/Month."

জাহিদ একটার পর একটা দেখতে থাকল। রাত দেড়টায় ল্যাপটপ বন্ধ করল। মাথার ভেতরে একটা শব্দ ঘুরছে।

স্টার্টআপ।

স্টার্টআপ শব্দটা জাহিদের কাছে নতুন না। ফেসবুকে দেখেছে। LinkedIn-এ দেখেছে। "বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম" নিয়ে আর্টিকেল পড়েছে। কিন্তু শব্দটা সবসময় দূরের জিনিস মনে হতো। ঢাকার জিনিস। গুলশানের কো-ওয়ার্কিং স্পেসের জিনিস। টি-শার্ট পরা ছেলেমেয়েদের জিনিস যারা "ডিসরাপ্ট" শব্দটা প্রতি বাক্যে ব্যবহার করে।

কিন্তু এই ইউটিউব ভিডিওগুলো একটা কথা বারবার বলছে: যে কেউ পারে। তোমার শুধু একটা আইডিয়া লাগবে, একটা ল্যাপটপ লাগবে, আর হাসল লাগবে।

জাহিদের ল্যাপটপ আছে। হাসলও আছে, কারণ ফ্রিল্যান্সিং করে মানুষ হাসল ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। আর আইডিয়া? আইডিয়া তো সবসময় মাথায় ঘোরে।

কিন্তু একটা জিনিস ইউটিউব ভিডিওগুলো বলে না।

প্রসঙ্গ।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ সিন। জাহিদ খুঁজে দেখল।

পাঠাও। ২০১৫ সালে শুরু। রাইড শেয়ারিং, ফুড ডেলিভারি, কুরিয়ার। ফাউন্ডার হুসাইন এম ইলিয়াস, BUET গ্র্যাজুয়েট। ফান্ডিং পেয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। Go-Jek থেকে বিনিয়োগ। পাঠাও এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্টার্টআপগুলোর একটা।

চালডাল। অনলাইন গ্রোসারি। ফাউন্ডার ওয়াসিম আলীম, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং। ঢাকায় অপারেশন।

শেবা ডট এক্সওয়াইজেড। সার্ভিস মার্কেটপ্লেস। ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ক্লিনার বুকিং। ফান্ডিং পেয়েছে। ঢাকায়।

একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

সব ঢাকায়। সব ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডেড। সব ফাউন্ডারের ব্যাকগ্রাউন্ডে BUET, IBA, বা বিদেশের টপ ইউনিভার্সিটি। সব ফাউন্ডারের নেটওয়ার্কে বিনিয়োগকারী, মেন্টর, ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন।

জাহিদ ভাবল, একটা মফস্বলের ছেলে, NU-র অনার্স ডিগ্রি, কোনো নেটওয়ার্ক নেই, কোনো ফান্ডিং নেই, সে কি স্টার্টআপ করতে পারে?

সৎ উত্তর: হয়তো। কিন্তু odds স্তূপের মতো উল্টো দিকে সাজানো।

তারপরও জাহিদ ভাবতে থাকল।

কারণ জাহিদ একটা জিনিস লক্ষ্য করেছে যেটা এই ঢাকার স্টার্টআপ ফাউন্ডাররা লক্ষ্য করেনি। বা করেছে, কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি।

মফস্বলে কোনো ডেলিভারি সার্ভিস নেই।

ফুডপান্ডা? ঢাকা আর চট্টগ্রাম। পাঠাও ফুড? ঢাকা। দারাজ? ডেলিভারি হয় বড় শহরে। মফস্বলে? কিছু নেই।

জাহিদের শহরে পঞ্চাশ হাজার মানুষ। দুইশোর বেশি দোকান। রেস্তোরাঁ বিশ-পঁচিশটা। ফার্মেসি দশটা। মুদি দোকান অগণিত। কিন্তু কেউ ডেলিভারি দেয় না। কারণ কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই।

কেউ যদি একটা সিম্পল ওয়েবসাইট বানায় যেখানে লোকাল দোকানগুলো তাদের পণ্য লিস্ট করতে পারে, মানুষ অর্ডার দিতে পারে, একজন রাইডার ডেলিভারি করে দেয়, তাহলে?

আইডিয়াটা মাথায় আসতেই জাহিদের হাত চুলকাতে শুরু করল। কোড লিখতে চায়।

দুই সপ্তাহ।

জাহিদ রাতের বেলা ক্লায়েন্টের কাজ শেষ করে প্রজেক্টে বসল। ফ্রিল্যান্সিংয়ে সে জ্যাঙ্গো শিখেছে। পাইথন জানে। ডেটাবেজ বোঝে। ফ্রন্টএন্ডে বেসিক কাজ করতে পারে।

নাম দিল: "পৌঁছে দাও।"

ফিচার লিস্ট ছোট রাখল। দোকানদার সাইন আপ করবে, তার পণ্য যোগ করবে। কাস্টমার ব্রাউজ করবে, অর্ডার দেবে। রাইডার অর্ডার দেখবে, পিক আপ করবে, ডেলিভারি করবে।

দুই সপ্তাহে একটা প্রোটোটাইপ দাঁড় করাল। জ্যাঙ্গো ব্যাকএন্ড, সিম্পল টেমপ্লেট ফ্রন্টএন্ড। ডেটাবেজে পোস্টগ্রেস না, SQLite। হোস্টিং ফ্রি টিয়ারে। সুন্দর না, কিন্তু চলে।

জাহিদ নিজের ফোনে ওয়েবসাইটটা খুলল। দোকান যোগ করল। পণ্য যোগ করল। অর্ডার দিল। রাইডার প্যানেলে গিয়ে অর্ডার অ্যাকসেপ্ট করল।

কাজ করছে।

প্রথমবারের মতো জাহিদ নিজের জন্য কিছু বানাল। ক্লায়েন্টের জন্য না। নিজের আইডিয়া, নিজের কোড, নিজের প্রোডাক্ট।

অনুভূতিটা আলাদা।

কিন্তু প্রোটোটাইপ বানানো আর প্রোডাক্ট চালানো এক জিনিস না।

জাহিদ বাস্তবতার হিসাব করতে বসল। আর হিসাব করতে গিয়ে একটার পর একটা দেয়ালে ধাক্কা খেল।

প্রথম দেয়াল: রাইডার।

ডেলিভারি সার্ভিসের প্রাণ হলো রাইডার। ঢাকায় পাঠাও বা ফুডপান্ডা রাইডার পায় কারণ লাখ লাখ তরুণ আছে যাদের বাইক আছে, স্মার্টফোন আছে, আর কাজ দরকার। মফস্বলে? বাইক আছে কিছু মানুষের। কিন্তু স্মার্টফোন? শহরের অর্ধেক মানুষ এখনো বাটন ফোন ব্যবহার করে। যাদের স্মার্টফোন আছে, তাদের বেশিরভাগের ফোনে অ্যান্ড্রয়েড ৫ বা ৬। র‍্যাম এক জিবি। অ্যাপ চালানো কষ্ট।

অবশ্য জাহিদ অ্যাপ বানায়নি, ওয়েবসাইট বানিয়েছে। কিন্তু ওয়েবসাইট চালাতেও ইন্টারনেট লাগে। সেটাই দ্বিতীয় দেয়াল।

দ্বিতীয় দেয়াল: ইন্টারনেট।

জাহিদের শহরে ফোরজি আছে। তত্ত্বে। বাস্তবে? টাওয়ার একটা, শহরের পূর্ব পাশে। পশ্চিম পাশে সিগন্যাল দুর্বল। বৃষ্টি হলে আরো দুর্বল। লোডশেডিংয়ে টাওয়ার বন্ধ হয়ে যায়, তখন ইন্টারনেট শূন্য।

ব্রডব্যান্ড? শহরে তিনটা প্রোভাইডার। স্পিড? কাগজে দশ এমবিপিএস, বাস্তবে তিন-চার। সন্ধ্যায় সবাই ইউটিউব দেখে, তখন এক এমবিপিএস।

একটা ডেলিভারি অ্যাপ চালাতে গেলে রাইডারের ফোনে রিয়েলটাইম অর্ডার আসতে হবে। কাস্টমার অর্ডার দিলে রাইডার তিন-চার মিনিটে দেখতে হবে। কিন্তু ইন্টারনেট যদি পাঁচ মিনিট পরপর আসে-যায়? তাহলে কাস্টমার অর্ডার দিল, রাইডার দেখল বিশ মিনিট পরে। ততক্ষণে কাস্টমার নিজে হেঁটে দোকানে চলে গেছে।

তৃতীয় দেয়াল: পেমেন্ট।

তৃতীয় দেয়াল: টাকা লেনদেন।

ঢাকায় অনলাইন পেমেন্ট চলে। bKash, Nagad, কার্ড। ফুডপান্ডায় অর্ডার দিলে অনলাইনে পে করা যায়। ক্যাশলেস। সিম্পল।

মফস্বলে? মানুষ ক্যাশে লেনদেন করে। bKash ব্যবহার করে ক্যাশআউটের জন্য, সেন্ড মানির জন্য। কিন্তু bKash দিয়ে দোকানে পেমেন্ট? খুব কম। দোকানদার বলে, "ভাই, ক্যাশ দেন। bKash-এ চার্জ কাটে।"

তাহলে পেমেন্ট মডেল কী হবে? ক্যাশ অন ডেলিভারি। রাইডার ডেলিভারি দিয়ে ক্যাশ নেবে। কিন্তু তখন আরেকটা সমস্যা: রাইডার ক্যাশ নিয়ে দোকানদারকে কখন দেবে? দিনে? সপ্তাহে? বিশ্বাসের প্রশ্ন। ক্যাশ হ্যান্ডলিং। হিসাবের ঝামেলা।

চতুর্থ দেয়াল: বাজারের আকার।

পঞ্চাশ হাজার মানুষের শহর।

জাহিদ হিসাব করল। পঞ্চাশ হাজার মানুষের মধ্যে কতজন অনলাইনে অর্ডার দেবে? স্মার্টফোন আছে ধরা যাক বিশ হাজার মানুষের। তার মধ্যে কতজন ইন্টারনেটে কিছু অর্ডার করার ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ? হাজার দুয়েক? আর তাদের মধ্যে কতজন দোকানে না গিয়ে ডেলিভারি নিতে চাইবে? পাঁচশো?

পাঁচশো মানুষ। এরা সবাই যদি মাসে দুইবার অর্ডার দেয়, তাহলে এক হাজার অর্ডার। প্রতি অর্ডারে ডেলিভারি চার্জ ধরি বিশ টাকা। মাসে বিশ হাজার টাকা। রাইডারকে দিতে হবে পনেরো টাকা। হাতে থাকবে পাঁচ হাজার।

পাঁচ হাজার টাকা মাসে।

জাহিদ ফ্রিল্যান্সিংয়ে মাসে আশি হাজার কামায়।

১০

জাহিদ সংখ্যাগুলো একটা খাতায় লিখল। তাকিয়ে রইল।

সমস্যাটা আইডিয়ায় না। আইডিয়াটা ভালো। মফস্বলে ডেলিভারি সার্ভিস দরকার। মানুষ চায়। দোকানদারও চায়, কারণ তাদের বিক্রি বাড়বে। রাইডারও চায়, কারণ আয় হবে।

সমস্যাটা ইনফ্রাস্ট্রাকচারে।

স্মার্টফোন কম। ইন্টারনেট ধীর ও অনিয়মিত। ডিজিটাল পেমেন্ট চলে না। বাজারের আকার ছোট। আর সবচেয়ে বড় কথা: মানুষের অভ্যাস। মফস্বলের মানুষ দোকানে গিয়ে জিনিস কেনে। এভাবেই চলে আসছে। পরিবর্তন ধীরে হয়।

ঢাকায় স্টার্টআপ চলে কারণ ঢাকায় ইনফ্রাস্ট্রাকচার আছে। দুই কোটি মানুষ, স্মার্টফোন সর্বত্র, ইন্টারনেট মোটামুটি চলে, ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ছে। মফস্বলে এর কিছুই নেই। এখনো নেই।

১১

জাহিদ বাবাকে দেখাল।

ল্যাপটপে ওয়েবসাইট খুলল। বলল, "বাবা, দেখো। এটা আমি বানিয়েছি। এখানে দোকানদার তার জিনিসপত্র রাখবে। মানুষ অর্ডার দেবে। রাইডার ডেলিভারি করবে।"

বাবা স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। মাথা একটু কাত করে। জাহিদ দোকানের পেজ দেখাল, পণ্যের লিস্ট দেখাল, অর্ডারের পেজ দেখাল।

বাবা বললেন, "তুই এটা বানিয়েছিস?"

"হ্যাঁ।"

"কতদিনে?"

"দুই সপ্তাহে।"

বাবা আবার স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, "তুই যা বোঝস, কর।"

এটুকুই। বেশি কিছু বোঝেননি হয়তো। কিন্তু ছেলে কিছু একটা বানিয়েছে, এটা বুঝেছেন। আর ছেলের ওপর ভরসা আছে।

ভরসা বোঝা না দিয়েও দেওয়া যায়।

১২

নাহিদকে দেখাল। ফোনে স্ক্রিনশট পাঠাল।

নাহিদ সেই বন্ধু যে ঢাকায় চাকরি করে। সফটওয়্যার কোম্পানিতে। জুনিয়র ডেভেলপার।

নাহিদ দেখে বলল, "ভালো প্রোজেক্ট। ক্লিন কোড। জ্যাঙ্গোটা ঠিকঠাক ব্যবহার করেছিস।"

তারপর বলল, "কিন্তু ভাই, মফস্বলে স্টার্টআপ চালানো যায় না।"

"কেন?"

"ইউজার কোথায়? ইনভেস্টর কোথায়? মেন্টর কোথায়? সব ঢাকায়। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম মানেই ঢাকা। তোকে ঢাকায় আসতে হবে।"

ঢাকা। আবার ঢাকা। সব রাস্তা ঢাকায় গিয়ে শেষ হয়।

জাহিদ বলল, "আমি ঢাকায় যেতে চাই না।"

নাহিদ বলল, "তাহলে স্টার্টআপ ভুলে যা। ফ্রিল্যান্সিং কর। ফ্রিল্যান্সিংয়ে তুই মফস্বলে বসেও আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে পারিস। স্টার্টআপে লোকাল মার্কেট লাগে। তোর লোকাল মার্কেট তৈরি না।"

কথাটা কঠিন। কিন্তু সত্য।

১৩

জাহিদ আরেকটু ঘাঁটল। বাংলাদেশে মফস্বলকেন্দ্রিক স্টার্টআপ কেউ করেছে কি না।

কিছু আছে। কিন্তু খুব কম। আর যেগুলো আছে, সেগুলোও ঢাকা থেকে অপারেট করে। ঢাকায় বসে মফস্বলে সার্ভিস দেয়। মফস্বলে বসে মফস্বলে সার্ভিস দেয়, এরকম প্রায় নেই।

কারণ সিম্পল। বিনিয়োগকারীরা ঢাকায় থাকে। বিনিয়োগকারীর সাথে দেখা করতে হলে ঢাকায় যেতে হয়। পিচ করতে হলে ঢাকায় যেতে হয়। নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট ঢাকায়। স্টার্টআপ কম্পিটিশন ঢাকায়। অ্যাক্সিলারেটর ঢাকায়।

আর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ছাড়া স্টার্টআপ? সম্ভব। বুটস্ট্র্যাপড স্টার্টআপ বলে। নিজের টাকায়, নিজের শ্রমে। কিন্তু সেটার জন্য দরকার যথেষ্ট বড় একটা মার্কেট যেখান থেকে দ্রুত রেভিনিউ আসবে। পঞ্চাশ হাজার মানুষের শহর যথেষ্ট বড় না।

১৪

জাহিদ প্রোটোটাইপটা বন্ধ করল না। ল্যাপটপে রেখে দিল। মাঝে মাঝে খুলে দেখে। কোড ঘাঁটে। এখানে-ওখানে একটু ঠিক করে।

কিন্তু লঞ্চ করল না। কারণ লঞ্চ করলে দোকানদারদের কাছে যেতে হবে, বোঝাতে হবে, রাইডার খুঁজতে হবে, কাস্টমার আনতে হবে। আর এই সব করতে গেলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সময় কমবে। ফ্রিল্যান্সিং কমলে আয় কমবে। আয় কমলে পরিবার চলবে কী করে?

এটাই মফস্বলের স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ঢাকার স্টার্টআপ ফাউন্ডারদের অনেকের পরিবারে আর্থিক কুশন আছে। ছয় মাস আয় না হলেও চলে। বাবা-মা সাপোর্ট করে, বা নিজের সেভিংস আছে, বা ফান্ডিং পেয়ে বেতন দিচ্ছে নিজেকে।

জাহিদের কুশন কোথায়? জাহিদই পরিবারের কুশন। মা-র ওষুধ, বোনের পড়াশোনা, বাবার bKash পয়েন্টের ক্যাশ ব্যালেন্স। জাহিদ একমাস আয় না করলে পরিবার টানাটানিতে পড়বে।

ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য সবার সমান না। এটা কোনো ইউটিউব ভিডিওতে বলে না।

১৫

জাহিদ একটা কথা বুঝল। আগে বোঝেনি, এখন বুঝল।

স্টার্টআপ শুধু আইডিয়া আর কোডের ব্যাপার না। স্টার্টআপ একটা ইকোসিস্টেমের ব্যাপার। ইকোসিস্টেম মানে: ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ডিজিটাল পেমেন্ট, শিক্ষিত ইউজার বেস, বিনিয়োগকারী, মেন্টর, আইনি কাঠামো, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক। এগুলো না থাকলে সেরা আইডিয়াও মরে যায়।

ঢাকায় এই ইকোসিস্টেমটা তৈরি হচ্ছে। ধীরে, কিন্তু হচ্ছে। মফস্বলে? হয়নি। হবে হয়তো। দশ বছর পরে? পনেরো বছর পরে? কে জানে।

জাহিদ সিদ্ধান্ত নিল।

এটা স্টার্টআপ না। এখন না। কিন্তু স্টার্টআপ বানানোর যে দক্ষতা, সেটা সে প্রতিদিন জমাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং করতে করতে জ্যাঙ্গো শিখেছে, ডেটাবেজ শিখেছে, পেমেন্ট ইন্টিগ্রেশন শিখেছে, API বানাতে শিখেছে। আজ যে প্রোটোটাইপ বানাল, সেটা ব্যর্থ হলেও যে দক্ষতায় বানাল, সেটা কোথাও যায়নি।

দক্ষতা জমা থাকে। আইডিয়া আসে-যায়। ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হতে সময় লাগে। কিন্তু যেদিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হবে, সেদিন জাহিদ প্রস্তুত থাকবে।

১৬

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে একটা নোট লিখল।

"তাদের গ্যারেজে ব্রডব্যান্ড আছে। তাদের কাস্টমারদের ক্রেডিট কার্ড আছে। তাদের মার্কেটে তিরিশ কোটি মানুষ। আমার শহরে পঞ্চাশ হাজার। লোডশেডিংয়ে ইন্টারনেট চলে যায়। মানুষ ক্যাশে কেনাকাটা করে।

তাই আমি এখন স্টার্টআপ করব না। দক্ষতা জমাব। যেদিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার আসবে, সেদিন তৈরি থাকব।"

ল্যাপটপ বন্ধ করল। বাইরে অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে বিছানায় গেল।

স্বপ্ন দেখা ফ্রি। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার লাগে। মফস্বলে ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই। এখনো নেই।