ই-কমার্সে ঝাঁপ

কুড়ি টাকা ঘণ্টায়, তিরিশ শতাংশ রিটার্ন, আর ইউটিউবের না-বলা গল্প

পর্ব ৪৭ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

তাহের একদিন জাহিদকে ফোন করল।

"ভাই, আমি একটা ব্যবসা শুরু করতে চাই।"

জাহিদ বলল, "কী ব্যবসা?"

"ই-কমার্স। ফেসবুক পেজে কুর্তা-পাঞ্জাবি বেচব।"

জাহিদ একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "কেন?"

"ইউটিউবে দেখলাম। একজন ছেলে ফেসবুক পেজ থেকে মাসে দুই লাখ কামায়। ঘরে বসে। কোনো অফিস লাগে না, কোনো দোকান লাগে না। শুধু একটা ফোন আর একটা ফেসবুক পেজ।"

"দুই লাখ?"

"হ্যাঁ। ভিডিওতে প্রুফও দেখাল। bKash-এর স্ক্রিনশট।"

জাহিদ কিছু বলল না। bKash স্ক্রিনশট ফটোশপে বানাতে তিন মিনিট লাগে, এটা বলার দরকার নেই এখন।

তাহের তখন ব্যাংক জব প্রিপারেশন নিচ্ছিল।

সরকারি ব্যাংকে চাকরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের AD পরীক্ষা, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত পড়া। বিকেলে কোচিং। রাতে আবার পড়া। ছয় মাস ধরে।

কিন্তু ব্যাংক জবের পরীক্ষা বাংলাদেশে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। একটা পদে আবেদন করে দশ-পনেরো হাজার জন। প্রিলিমিনারি পার হয় পাঁচশো। রিটেন পার হয় একশো। ভাইভায় টেকে পঞ্চাশ। নিয়োগ হয় বিশ-পঁচিশ জনের।

তাহের দুটো পরীক্ষা দিয়েছে। দুটোতেই প্রিলিতে পাশ, রিটেনে ফেল। কাছাকাছি, কিন্তু ভেতরে না। সেই পুরনো গল্প।

আর ঠিক এই সময়ে ইউটিউবের ভিডিওটা দেখল। "ঘরে বসে ই-কমার্সে মাসে দুই লাখ।"

ই-কমার্সে ঝাঁপ দেওয়ার পেছনে তাহেরের যুক্তি ছিল সোজা।

ব্যাংক জব অনিশ্চিত। পরীক্ষা দিচ্ছি, হচ্ছে না। আর কতদিন পড়ব? বাবা-মা-র চোখে প্রশ্ন: কবে চাকরি হবে? বন্ধুদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে জয়েন করে ফেলেছে, কেউ বিদেশ গেছে। তাহের এখনো "প্রস্তুতি নিচ্ছে।"

আর ই-কমার্স? এটা নিজের হাতে। কারো পরীক্ষা দিতে হবে না। কারো অনুমতি লাগবে না। ফেসবুকে একটা পেজ খুলব, ছবি দেব, অর্ডার আসবে, ডেলিভারি দেব। সোজা।

"ই-কমার্সে টাকা আছে!" ইউটিউব বলেছে। ইউটিউব মিথ্যা বলবে কেন?

তাহের ব্যাংক প্রিপারেশন বন্ধ করে দিল। পুরোপুরি না, কিন্তু প্রায়। সকালে আর পড়ে না। সকাল থেকে ফেসবুক পেজের কাজ।

পেজের নাম দিল "আরবান কুর্তা।" ইংরেজিতে লেখা, বাংলায় বিক্রি। লোগো বানাল ক্যানভায়, ফ্রি ভার্সনে। ব্যানার ফটো তুলল নিজের ফোনে।

প্রোডাক্ট সোর্সিং। এটা সবচেয়ে সহজ ছিল। তাহেরদের এলাকায় তিনটা লোকাল দর্জি আছে। কুর্তা-পাঞ্জাবি সেলাই করে। পিস প্রতি খরচ তিনশো টাকা। কাপড়ের দাম ধরে।

তাহেরের প্ল্যান: তিনশো টাকায় কিনব, পাঁচশো টাকায় বেচব। মার্জিন দুইশো টাকা। দিনে দশটা বিক্রি হলে দুই হাজার। মাসে ষাট হাজার।

ক্যালকুলেটরে সংখ্যাটা দেখে তাহেরের মনে হলো, ব্যাংক জব কেন করব?

কিন্তু ক্যালকুলেটর আর বাস্তবতা এক জিনিস না।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের একটা বাস্তব ছবি আছে যেটা ইউটিউব দেখায় না।

বড় খেলোয়াড়: Daraz। Alibaba-র সাবসিডিয়ারি। বিলিয়ন ডলার ফান্ডিং। লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক, ওয়্যারহাউজ, ডেলিভারি ফ্লিট। Daraz-এর সাথে প্রাইসে কম্পিট করা অসম্ভব। Daraz-এ কুর্তা পাওয়া যায় তিনশো টাকায়, ফ্রি ডেলিভারি।

ছোট সেলার কোথায় যাবে? ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম। এটাই তাদের প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু ফেসবুকে ছোট সেলার কয়টা? হাজার হাজার। ঢাকায়, চট্টগ্রামে, সিলেটে, রাজশাহীতে। সবাই কুর্তা বেচছে, সবাই পাঞ্জাবি বেচছে, সবাই শাড়ি বেচছে। একই পণ্য, একই দাম, একই ফেসবুক অ্যালগরিদমের রহমতে।

তাহের পেজ খুলল। প্রথম সপ্তাহে দশটা পোস্ট দিল। কুর্তার ছবি, দাম, ক্যাপশন।

"প্রিমিয়াম কটন কুর্তা। মাত্র ৫০০ টাকা। অর্ডার করতে ইনবক্স করুন।"

প্রথম তিনদিন: কিছুই না। শূন্য ইনবক্স। তাহের বুঝতে পারল না, কেন কেউ মেসেজ করছে না।

চতুর্থ দিনে একটা মেসেজ এলো। "ভাই, দাম কত?" তাহের লিখল, "৫০০ টাকা।" রিপ্লাই এলো, "৩৫০ হবে?"

দরদাম। ফেসবুক ই-কমার্সের প্রথম পাঠ: কাস্টমার সবসময় কম দামে চায়। পাঁচশো বললে তিনশো বলবে। তিনশো বললে দুইশো বলবে।

তাহের বলল, "না ভাই, ৫০০ ফিক্সড।" কাস্টমার চলে গেল।

দ্বিতীয় সপ্তাহে তাহের একটু বুঝল। শুধু পোস্ট দিলে হবে না। রিচ লাগবে। ফেসবুকে অর্গানিক রিচ এখন প্রায় শূন্য। পেজে পাঁচশো ফলোয়ার থাকলেও পোস্ট দেখে পঞ্চাশ জন। বাকি চারশো পঞ্চাশ জনের ফিডে পোস্ট যায়ই না।

সমাধান? বুস্ট। মানে ফেসবুকে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন।

তাহের প্রথম বুস্ট দিল পাঁচশো টাকায়। তিনদিনের জন্য। রিচ পেল বারো হাজার। ইনবক্সে মেসেজ এলো পঁয়ত্রিশটা। অর্ডার কনফার্ম হলো আটটা।

আটটা অর্ডার। পাঁচশো টাকা খরচ করে। মানে প্রতি অর্ডারের জন্য বিজ্ঞাপন খরচ: বাষট্টি টাকা।

তাহের হিসাবটা আবার করল। কেনা তিনশো, বেচা পাঁচশো, বিজ্ঞাপন বাষট্টি। মার্জিন: একশো আটত্রিশ। এখনো লাভ আছে। চলবে।

কিন্তু একটা জিনিস তাহের হিসাবে ধরেনি।

ডেলিভারি।

বাংলাদেশে ই-কমার্সে ডেলিভারি একটা আলাদা যুদ্ধ। কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করতে হবে। Pathao, Steadfast, Sundarban। ঢাকার ভেতরে ডেলিভারি চার্জ ষাট থেকে আশি টাকা। ঢাকার বাইরে একশো বিশ থেকে একশো পঞ্চাশ।

তাহের ঢাকায় না। তাহের মফস্বলে। তাহেরের কাস্টমাররা বেশিরভাগ ঢাকার বাইরে। ডেলিভারি চার্জ গড়ে একশো টাকা।

হিসাবটা এবার: কেনা তিনশো, বেচা পাঁচশো, বিজ্ঞাপন বাষট্টি, ডেলিভারি একশো। নিট মার্জিন: আটত্রিশ টাকা।

আটত্রিশ টাকা। একটা কুর্তা বেচে।

আর তারপর আছে রিটার্ন।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের সবচেয়ে বড় সমস্যা: ক্যাশ অন ডেলিভারি। COD। কাস্টমার অনলাইনে অর্ডার করে, কিন্তু টাকা দেয় ডেলিভারির সময়। আগে দেয় না। কারণ ট্রাস্ট নেই। "আগে দেখব, তারপর দেব।"

COD-র সমস্যা কী?

কাস্টমার অর্ডার দিল। তাহের কুর্তা বানিয়ে প্যাক করে কুরিয়ারে দিল। কুরিয়ার নিয়ে গেল কাস্টমারের বাড়িতে। কাস্টমার দরজা খুলে দেখল: "না, এটা আমার পছন্দ হয়নি।" বা: "ছবিতে যা দেখায়, পণ্যে তা পায় না।" বা: "আমি তো ভুলে গেছি অর্ডার দিয়েছিলাম।" বা: কেউ দরজাই খুলল না।

কুরিয়ার ফেরত নিয়ে আসল। ডেলিভারি চার্জ একশো টাকা, রিটার্ন চার্জ আরো আশি টাকা। মোট একশো আশি টাকা। আর কুর্তাটা ফেরত এলো, কিন্তু কখনো কখনো ভাঁজ হয়ে, ময়লা হয়ে।

রিটার্ন রেট কত? বাংলাদেশে ফেসবুক ই-কমার্সে গড়ে বিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ। মানে দশটা অর্ডারের মধ্যে দুই-তিনটা ফেরত আসে।

১০

তাহেরের প্রথম মাসের হিসাব।

অর্ডার পেল: পঞ্চাশটা। বুস্টে খরচ করেছে দুই হাজার। পঞ্চাশটার মধ্যে ডেলিভারি গেল: পঁয়তাল্লিশটা। পাঁচজন অর্ডার দিয়ে নম্বর দিল ভুল, বা রিপ্লাই করা বন্ধ করে দিল।

পঁয়তাল্লিশটার মধ্যে গ্রহণ করল: পঁয়ত্রিশটা। দশটা ফেরত। রিটার্ন রেট বাইশ শতাংশ।

আয়: পঁয়ত্রিশটা কুর্তা, পিস প্রতি পাঁচশো: ১৭,৫০০ টাকা।

খরচ: পঞ্চাশটা কুর্তা কেনা (তিনশো করে): ১৫,০০০। ডেলিভারি (পঁয়তাল্লিশটা, একশো করে): ৪,৫০০। রিটার্ন চার্জ (দশটা, আশি করে): ৮০০। বুস্ট: ২,০০০।

মোট খরচ: ২২,৩০০। মোট আয়: ১৭,৫০০।

রেভিনিউ পঁচিশ হাজার বলতে পারা যায় যদি ডেলিভারি চার্জ কাস্টমারের কাছে নেওয়া হয়। কিন্তু তাহের প্রথম মাসে "ফ্রি ডেলিভারি" অফার দিয়েছিল কাস্টমার টানতে। তাই ডেলিভারি খরচ নিজের পকেট থেকে।

লাভ? মাইনাস ৪,৮০০ টাকা। প্রথম মাসে লস।

১১

কিন্তু তাহের হাল ছাড়ল না। প্রথম মাসে লস হবেই, সবাই বলে। ই-কমার্স একটা "লং গেম।" ইউটিউবে এটাও বলেছে। তিন-চার মাস দিতে হবে। ব্র্যান্ড বিল্ড হতে সময় লাগে।

দ্বিতীয় মাসে তাহের কিছু পরিবর্তন করল। ফ্রি ডেলিভারি বাদ। ডেলিভারি চার্জ কাস্টমারের কাছে। দাম পাঁচশো, ডেলিভারি একশো, মোট ছয়শো। কিন্তু কাস্টমার ছয়শো শুনলে অনেকে চলে যায়। "Daraz-এ তো ফ্রি ডেলিভারিতে পাওয়া যায়।"

তাহের দাম কমাল। চারশো পঞ্চাশ। ডেলিভারি একশো। মোট পাঁচশো পঞ্চাশ। এখন মার্জিন: চারশো পঞ্চাশ বিয়োগ তিনশো সমান একশো পঞ্চাশ। ডেলিভারি কাস্টমারের। বিজ্ঞাপন প্রতি অর্ডারে ষাট-সত্তর টাকা। নিট মার্জিন: আশি-নব্বই টাকা।

দ্বিতীয় মাসে অর্ডার বাড়ল। ষাটটা। ডেলিভারি চার্জ কাস্টমারের কাছে রাখায় রিটার্ন রেট বাড়ল, পঁচিশ শতাংশ। কারণ কাস্টমার ভাবছে, ছয়শো দিয়ে এই জিনিস পেলাম?

ডেলিভারি সাকসেসফুল: পঁয়তাল্লিশটা। রেভিনিউ: ২০,২৫০। খরচ: কেনা ১৮,০০০, বুস্ট ৩,০০০, রিটার্ন চার্জ ১,২০০। লাভ: প্রায় চার হাজার টাকা।

চার হাজার। এক মাসে। ছয় থেকে আট ঘণ্টা কাজ করে প্রতিদিন।

১২

জাহিদ হিসাবটা শুনে চুপ করে রইল।

চার হাজার টাকা। এক মাসে। দিনে ছয়-আট ঘণ্টা।

মাসে ত্রিশ দিন, দিনে সাত ঘণ্টা ধরলে মোট ঘণ্টা: দুইশো দশ। চার হাজার ভাগ দুইশো দশ: উনিশ টাকা প্রতি ঘণ্টা।

উনিশ টাকা। ঘণ্টায়।

একজন রিকশাওয়ালা ঘণ্টায় পঞ্চাশ-ষাট টাকা কামায়। একজন দিনমজুর ঘণ্টায় আশি-একশো টাকা। তাহের, BBA পাশ, ই-কমার্স উদ্যোক্তা, ঘণ্টায় উনিশ টাকা।

জাহিদ বলল, "তুই জানিস তোর ঘণ্টা প্রতি ইনকাম কত?"

তাহের বলল, "কত?"

"উনিশ টাকা।"

তাহের চুপ।

১৩

কিন্তু তাহের ছাড়ল না। তৃতীয় মাসে আরেকটু ভালো হলো। অর্ডার সত্তরটা। রিটার্ন কমে বিশ শতাংশে এলো, কারণ ছবি আর পণ্যের মান কাছাকাছি আনার চেষ্টা করল। লাভ: ছয় হাজার।

চতুর্থ মাসে সমস্যা শুরু হলো।

ফেসবুক অ্যালগরিদম বদলে গেল। আগে পাঁচশো টাকা বুস্টে বারো হাজার রিচ পেত। এখন পাঁচশোতে ছয় হাজার। অর্ধেক। কিন্তু বুস্ট বাড়ালে খরচ বাড়ে, মার্জিন কমে।

আর কাস্টমার কমপ্লেইন শুরু হলো। "ভাই, কুর্তা পাঠিয়েছেন, সাইজ ভুল।" "ভাই, রং আলাদা। ছবিতে গাঢ় নীল, পণ্যে হালকা নীল।" "ভাই, সেলাইয়ের মান খারাপ।"

সাইজ ভুল। রং আলাদা। সেলাই খারাপ। এই তিনটা সমস্যা ফেসবুক ই-কমার্সের চিরকালীন রোগ। কারণ কাস্টমার ছবি দেখে অর্ডার করে, ছুঁয়ে দেখে না, পরে দেখে না। আর ফোনের ক্যামেরা রং বদলে দেয়, আলো বদলে দেয়।

১৪

পঞ্চম মাসে তাহের বার্নআউটে পড়ল।

সকাল আটটা: কাস্টমারদের মেসেজের রিপ্লাই। দশটা: দর্জির কাছে যাওয়া, নতুন অর্ডার দেওয়া, রেডি মাল তোলা। দুপুর: প্যাকিং। কুর্তা ভাঁজ করা, পলিথিনে মোড়ানো, লেবেল লাগানো, কুরিয়ারে পাঠানো। বিকেল: রিটার্ন প্রোডাক্ট চেক করা, কোনটা আবার বেচা যাবে, কোনটা নষ্ট হয়ে গেছে। সন্ধ্যা: নতুন কন্টেন্ট বানানো, ছবি তোলা, পোস্ট লেখা, বুস্ট সেট করা। রাত: হিসাব করা।

প্রতিদিন। ছুটি নেই। কারণ একদিন পোস্ট না দিলে রিচ কমে। দুদিন না দিলে ফলোয়ার ভুলে যায়। তিনদিন না দিলে পেজ মৃত।

আর এই সবকিছুর পর? মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা।

১৫

ছয় মাস পর তাহের হিসাব কষল।

মোট বিনিয়োগ: ত্রিশ হাজার টাকা। কুর্তা কেনা, কুরিয়ার চার্জ, ফেসবুক বুস্ট, প্যাকেজিং। মোট রিটার্ন: পনেরো হাজার। মানে পনেরো হাজার টাকা লস।

ছয় মাসের সময়? অপরিমেয়। প্রতিদিন ছয়-আট ঘণ্টা, মাসে দুইশো ঘণ্টা, ছয় মাসে বারোশো ঘণ্টা। বারোশো ঘণ্টা। যদি এই বারোশো ঘণ্টা ব্যাংক জবের প্রিপারেশনে দিত, তাহলে?

আর ব্যাংক জবের প্রিপারেশন? ছয় মাসে প্রায় বন্ধ। দুটো পরীক্ষা মিস করেছে। একটা নিয়েছে, তৈরি না হয়ে, প্রিলিতেই ফেল।

১৬

তাহের ফেসবুক পেজ বন্ধ করে দিল।

"আরবান কুর্তা।" ফলোয়ার: ১,২০০। পোস্ট: ১৮০। অর্ডার: ৩১০ (ছয় মাসে)। ডেলিভারি সাকসেস: ২১৫। রিটার্ন: ৭৫। ক্যানসেল/ফেইক: ২০।

পেজ আর্কাইভ করল। ডিলিট করল না। কারণ ডিলিট করলে স্বীকার করতে হয় যে ব্যর্থ। আর্কাইভ করলে বলা যায়, "পরে আবার শুরু করব।"

পরে আবার শুরু করবে না। তাহের নিজেও জানে।

১৭

জাহিদ তাহেরকে জিজ্ঞেস করল, "কেন বন্ধ করলি?"

তাহের বলল, "লাভ হচ্ছিল না।"

জাহিদ বলল, "শুধু তাই?"

তাহের একটু ভাবল। তারপর বলল, "না। আসলে বুঝলাম, এভাবে হবে না। যত বেচি, তত কম্পিটিশন বাড়ে। দাম কমাতে হয়। দাম কমালে মার্জিন কমে। মার্জিন কমলে বেশি বেচতে হয়। বেশি বেচতে গেলে বেশি বুস্ট করতে হয়। বেশি বুস্ট মানে বেশি খরচ। একটা চক্র। বের হওয়ার পথ নেই।"

জাহিদ বলল, "এটাকে বলে race to the bottom। পণ্য বেচলে এটাই হয়। কারণ তোর পণ্য ইউনিক না। তিনশো টাকার কুর্তা আরো হাজারজন বেচছে। তুই কেন তাদের চেয়ে ভালো? কোনো কারণ নেই। তাই কম্পিটিশন শুধু দামে। আর দামে কম্পিটিশন মানে সবার লস।"

১৮

নাহিদ ভাই এসেছিল সেদিন। জাহিদের সেই বড়ভাইতুল্য বন্ধু। ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছিল।

তাহেরের গল্প শুনে নাহিদ বলল, "শোন, একটা কথা মনে রাখিস। পণ্য বেচলে কম্পিটিশন। স্কিল বেচলে মনোপলি।"

তাহের বলল, "মানে?"

"মানে, তুই কুর্তা বেচছিলি। কুর্তা আরো লাখ লোক বেচে। তুই তাদের সাথে কম্পিট করছিলি দামে। কিন্তু জাহিদ কী বেচে? স্কিল। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। জাহিদের মতো কাজ করতে পারে এমন লোক কম। তাই জাহিদ দাম সেট করে, কাস্টমার মানে। তোর ক্ষেত্রে কাস্টমার দাম সেট করত, তুই মানতি।"

তাহের চুপ।

নাহিদ বলল, "পণ্যের দাম বাজার ঠিক করে। স্কিলের দাম তুমি ঠিক করো। এই পার্থক্যটা বোঝ।"

১৯

তাহেরের ই-কমার্স অভিযান শেষ। ছয় মাস। ত্রিশ হাজার টাকা বিনিয়োগ। পনেরো হাজার উদ্ধার। নিট লস: পনেরো হাজার।

কিন্তু আসল লস টাকায় না। আসল লস সময়ে। ছয় মাস। বারোশো ঘণ্টা। এই সময়টা ব্যাংক প্রিপারেশনে দিলে হয়তো পরের পরীক্ষায় চান্স পেত। হয়তো পেত না। কিন্তু অন্তত চেষ্টাটা থাকত।

"হয়তো।" আবার সেই শব্দ।

তাহের ই-কমার্সে গেল কেন? কারণ ই-কমার্স "নিশ্চিত" মনে হয়েছিল। ইউটিউবে দেখেছে, মানুষ কামাচ্ছে। স্ক্রিনশট দেখেছে। "প্রমাণ" দেখেছে। ব্যাংক জব অনিশ্চিত, পরীক্ষায় হচ্ছে না।

Certainty bias। যেটা দেখতে নিশ্চিত, সেটার দিকে ঝুঁকে যাওয়া। ইউটিউব ভিডিওতে সাফল্যের গল্প দেখে মনে হয়, এটাই পথ। কিন্তু ইউটিউব ব্যর্থতার গল্প দেখায় না। পঁচানব্বই শতাংশ ফেসবুক ই-কমার্স পেজ এক বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এই তথ্যটা কোনো ইউটিউব ভিডিওর থাম্বনেইলে থাকে না।

২০

তাহের আবার ব্যাংক প্রিপারেশনে ফিরে গেল।

বই খুলল। নোটবুক বের করল। কোচিংয়ে আবার ভর্তি হলো। এবার দশ হাজার টাকা।

জাহিদকে ফোনে বলল, "নিশ্চয়তার কাছে ফিরে আসতে হলো।"

জাহিদ বলল, "ব্যাংক জব নিশ্চিত?"

তাহের হাসল। ক্লান্ত হাসি। "না। কিন্তু অন্তত পরিচিত। পরিচিত অনিশ্চয়তা অপরিচিত অনিশ্চয়তার চেয়ে সহ্য করা সহজ।"

২১

জাহিদ ফোন রেখে ভাবল।

তাহের পণ্য বেচে। জাহিদ স্কিল বেচে। একই সময়, একই দেশ, একই ইন্টারনেট। কিন্তু অর্থনীতি সম্পূর্ণ আলাদা।

পণ্য বেচলে: কেনা তিনশো, বেচা পাঁচশো, ডেলিভারি একশো, রিটার্ন বিশ শতাংশ, বিজ্ঞাপন ষাট। হাতে থাকে আশি টাকা। আশি টাকার জন্য দু ঘণ্টা খাটুনি।

স্কিল বেচলে: একটা ওয়েবসাইট বানানোর খরচ জাহিদের নিজের সময় ছাড়া প্রায় শূন্য। ক্লায়েন্ট পাঁচশো ডলার দেয়। পুরোটাই মার্জিন। কোনো ডেলিভারি চার্জ নেই, কোনো রিটার্ন নেই, কোনো ফিজিক্যাল প্রোডাক্ট নেই।

পণ্য বেচা আর স্কিল বেচা, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা খেলা। একটায় মার্জিন কমে যায়, আরেকটায় বাড়ে। একটায় কম্পিটিশন বাড়ে, আরেকটায় অভিজ্ঞতা দিয়ে কম্পিটিশন কমানো যায়।

নাহিদ ভাই ঠিকই বলেছে।

পণ্য বেচলে কম্পিটিশন। স্কিল বেচলে মনোপলি।

২২

রাত গভীর হলো।

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। আজ একটা ক্লায়েন্টের কাজ শেষ করেছে। পেমেন্ট আসবে তিনদিনের মধ্যে।

তাহের এখন বই পড়ছে। ব্যাংকের ম্যাথ। ইংলিশ। জেনারেল নলেজ। পরের পরীক্ষা দুই মাস পরে।

দুজনেই অনিশ্চিত। কিন্তু দুজনের অনিশ্চয়তার ধরন আলাদা। জাহিদ জানে পরের মাসে ক্লায়েন্ট থাকবে কি না জানে না, কিন্তু জানে যে তার স্কিল আছে, স্কিল থাকলে কাজ আসবে। তাহের জানে পরীক্ষায় হবে কি না জানে না, কিন্তু জানে যে পরীক্ষা ছাড়া আর কোনো পথ জানা নেই।

একজন স্কিল দিয়ে অনিশ্চয়তা সামলায়। আরেকজন সার্টিফিকেট দিয়ে অনিশ্চয়তা ঢাকতে চায়।

কে ঠিক? কে ভুল? কেউ জানে না। বাংলাদেশে দুটো পথই কঠিন। দুটো পথেই গ্যারান্টি নেই। শুধু পথগুলো আলাদা, আর প্রতিটা পথের হিসাবের খাতা আলাদা।