CA ফাইনাল
তিন পার্সেন্ট পাশের হার, দুই নম্বরের ব্যবধান, আর রাতারাতি নয়গুণ বেতন
১
তারেক সকাল চারটায় উঠেছে।
এটা নতুন কিছু না। সাড়ে চার বছর ধরে সে সকাল চারটায় ওঠে। আর্টিকেলশিপের প্রথম দিন থেকে। অফিস সকাল নয়টা, কিন্তু অডিট সিজনে ক্লায়েন্টের অফিসে সাতটায় পৌঁছাতে হয়।
আজ পড়া না। আজ পরীক্ষা। CA Final। ICAB-এর অধীনে। বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন পেশাদার পরীক্ষা।
তারেক বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে আয়নায় তাকাল। সাতাশ বছর বয়স। চোখের নিচে কালো দাগ। চুলে দু-একটা পাক। সাতাশ বছরের ছেলের চুলে পাক ধরার কথা না। কিন্তু CA-র পড়া সাধারণ পড়া না।
২
তারেক নাহিদের বড় ভাই। নাহিদ ব্যাংকে চাকরি করে, বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার। তারেক আর্টিকেলড স্টুডেন্ট। বেতন আট হাজার টাকা।
আট হাজার। ঢাকায় আট হাজার টাকায় কী হয়? মেসে একটা বেড তিন হাজার। খাওয়া চার হাজার। বাসভাড়া হাজার দেড়েক। মোবাইল রিচার্জ তিনশো। ব্যস। মাস শেষ। কোনো সঞ্চয় নেই।
সাতাশ বছর বয়সে আট হাজার টাকা বেতন। ইউনিভার্সিটির ব্যাচমেটরা ব্যাংকে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার পাচ্ছে। মাল্টিন্যাশনালে পঞ্চাশ। আর তারেক? আর্টিকেলড স্টুডেন্ট। "ছাত্র" শব্দটা এখনো তার পরিচয়ের সাথে জড়িয়ে আছে।
CA-র আর্টিকেলশিপকে অনেকে "ফকির ফেজ" বলে। দুনিয়ার সব সুখ ত্যাগ করে একটা স্বপ্নের পেছনে ছোটা। স্বপ্নটা পূরণ হলে বাদশাহ। না হলে ফকিরই থাকবে।
৩
CA Final-এর পাশের হার।
এই সংখ্যাটা জানলে বুকের ভেতর চাপ আসে। প্রতি সেশনে পাস করে তিন থেকে পাঁচ পার্সেন্ট। প্রতি একশোজনে তিন থেকে পাঁচজন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার চেয়ে কঠিন। BCS-এর চেয়ে কঠিন। IBA MBA-র চেয়ে কঠিন।
আটটা পেপার। প্রতিটা তিন ঘণ্টা। দুই সপ্তাহ ধরে চলে। Financial Reporting, Advanced Audit, Corporate Law, Tax, Cost Management, Strategic Management, Financial Management, IT। প্রতিটা পেপারে আলাদাভাবে পাস করতে হবে। মোট নম্বরে পাস করলেও চলবে না।
হাতে লিখতে হয়। কিছু পেপারে ক্যালকুলেটর নেই। মাথায় ডেপ্রিসিয়েশন, মাথায় ডিফার্ড ট্যাক্স। তিন ঘণ্টা টানা হাতে লেখা। হাত ব্যথা, মাথা ঘোরে, সময় ফুরায়।
তারেক একবার ফেল করেছে। দেড় বছর আগে। দুটো পেপারে। একটাতে দুই নম্বর কম। এটা দ্বিতীয় attempt। তৃতীয়বার হলে শেষ চান্স ICAB-এ। তারপর ACCA-তে সুইচ করতে হবে।
৪
পরীক্ষার আগের রাত।
মেসের ঘরে তারেক বসে আছে। টেবিলে নোটস, মেঝেতে বই, বিছানায় ফটোকপি। পুরো ঘরটা কাগজের সমুদ্র। রুমমেট সোহেল ঘুমাচ্ছে। সোহেল প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, বেতন আঠাশ হাজার। সন্ধ্যায় ফেরে, খায়, ঘুমায়। সোহেলের জীবনে কোনো পরীক্ষা নেই।
তারেক ফোন করল জাহিদকে। রাত সাড়ে এগারোটা।
"ভাই, এই পরীক্ষায় পাস করলে জীবন বদলে যাবে। ফেল করলে পাঁচ বছর বাতিল।"
জাহিদ কিছু বলল না। শুনল।
তারেক বলল, "তিন পার্সেন্ট পাস করে। সাতানব্বইজন ফেল করে। আমি কি সেই তিনজনের একজন?"
জাহিদ বলল, "তুই একবার দিয়ে দুই নম্বরে ফেল করেছিস। দুই নম্বর মানে তুই লাইনের ওপাশে ছিলি, শুধু এপাশে পড়ে গেছিলি। এবার ওপাশে পড়বি।"
তারেক বলল, "আর যদি আবার এপাশে?"
"তাহলে তৃতীয়বার। ICAB না হলে ACCA। পথ শেষ হয় না।"
"পথ শেষ না হলেও ধৈর্য শেষ হয়, ভাই।"
৫
ধৈর্য। CA পাথের সবচেয়ে কঠিন জিনিস পড়া না। সবচেয়ে কঠিন অপেক্ষা। অন্যদের এগিয়ে যেতে দেখা আর নিজে থেমে থাকা।
ব্যাচমেটদের ফেসবুক পোস্ট। "Excited to join Grameenphone!" "Just bought my first car!" আর তারেক মেসে বসে আছে। আট হাজার টাকায়।
মা ফোন করে জিজ্ঞেস করে, "বাবা, কেমন আছিস?" এই "কেমন আছিস"-এর ভেতরে অব্যক্ত প্রশ্ন: কবে শেষ হবে? কবে চাকরি? কবে বিয়ে?
নাহিদের বেতন বড় ভাইয়ের চারগুণ। এটা কাউকে বলা যায় না। কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবা যায়।
৬
পরীক্ষা শুরু হলো। দুইশো জন হলে বসেছে। ছয় থেকে দশজন পাস করবে।
তারেক ভাবল, এই দুইশোজনের প্রত্যেকে ভাবছে সে পাস করবে। কেউ ভেবে আসেনি, "আমি ফেল করতে যাচ্ছি।" কিন্তু সংখ্যা বলছে অন্য কথা।
দুই সপ্তাহ চলল। একদিন পরীক্ষা, একদিন প্রিপারেশন। কোনো পেপার ভালো হলো, কোনো পেপারে সময় কম পড়ল। Tax-এ শেষ প্রশ্ন জানত কিন্তু লেখার সময় ছিল না, পয়েন্ট ফর্মে লিখল। Advanced Audit-এর কেস স্টাডি লিখল, কিন্তু নিশ্চিত না। Corporate Law-তে ক্যালকুলেটর নেই, আইনের ধারা মুখস্থ থেকে ঢেলে দিল।
শেষ পেপার শেষ হলো বৃহস্পতিবার বিকেলে। হল থেকে বের হয়ে রিকশায় চোখ বন্ধ করল। মাথায় একটাই প্রশ্ন: হয়েছে কি?
৭
রেজাল্ট বের হতে দুই মাস লাগে।
ষাট দিন। তারেকের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ষাট দিন। অফিসে যায়, অডিট করে, কিন্তু মাথায় সবসময় একটা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ। Tax পেপারে শেষ প্রশ্নটা? Audit-এর কেস স্টাডিটা? Law-তে ধারা নম্বরটা ঠিক ছিল তো?
নাহিদ ফোন করে। "ভাইয়া, কেমন হয়েছে?" তারেক বলে, "জানি না।" সত্যি জানে না। CA Final-এ দুই নম্বর এদিক-ওদিক হলে ফলাফল উলটে যায়।
৮
ষাটতম দিন। রেজাল্ট বের হলো সন্ধ্যায়। ICAB-এর ওয়েবসাইটে।
ল্যাপটপ খোলা। সাইট লোড হচ্ছে না। সবাই একসাথে ঢুকছে। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনেরো মিনিট।
পেজ লোড হলো। পাস লিস্ট। বর্ণানুক্রমে। T সেকশনে স্ক্রল করল।
নাম আছে।
আবার লোড করল। আবার দেখল। আছে। মার্কশিট চেক করল। আটটা পেপার, সবকটাতে পাস। কিন্তু Advanced Audit-এ পঞ্চাশের মধ্যে ছাব্বিশ। পাস মার্ক পঁচিশ।
দুই নম্বর। এক নম্বর কম পেলে পাস মার্কে। দুই নম্বর কম পেলে ফেল। ফকির আর বাদশাহর মধ্যে দুই নম্বর।
৯
ফোন করল বাবাকে। "বাবা, পাস করেছি।"
বাবা কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ।" মা ফোন নিলেন। মা কাঁদছেন। কিছু বলতে পারছেন না।
নাহিদকে ফোন করল। নাহিদ চিৎকার করল, "ভাইয়া! পেরেছ!"
তারেক মেসের ঘরে একা বসে আছে। চোখ শুকনো। কাঁদতে পারছে না। সাড়ে চার বছরের চাপ একসাথে নেমে গেল। কিন্তু শরীর ভুলে গেছে কাঁদতে।
১০
পাস করার প্রথম সপ্তাহে তিনটা জব অফার।
প্রথম: লোকাল CA ফার্ম, সিনিয়র অডিটর, পঁয়ষট্টি হাজার। দ্বিতীয়: মাঝারি কোম্পানি, ইন্টার্নাল অডিট হেড, পঁচাত্তর হাজার। তৃতীয়: বড় গ্রুপ, ফাইনান্স ম্যানেজার, আশি হাজার।
তারেক দ্বিতীয়টা নিল। পঁচাত্তর হাজার। আট হাজার থেকে পঁচাত্তর হাজার। নয়গুণ। রাতারাতি।
গতকাল মেসে থাকত, আজ ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারে। গতকাল বাসে যেত, আজ উবারে। গতকাল বাবার কাছে টাকা চাইত, আজ বাবাকে পাঠাতে পারে।
১১
জাহিদকে ফোন করে তারেক বলল, "জানো সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা কী? কাল আর আজকের মধ্যে আমি একই মানুষ। স্কিল একই, জ্ঞান একই। কিন্তু কাল আমার দাম আট হাজার, আজ পঁচাত্তর হাজার।"
জাহিদ বলল, "তোর দাম বদলায়নি। বাজারে তোর সার্টিফিকেটের দাম বদলেছে। দুটো অক্ষর, C আর A, তোর নামের পরে যোগ হয়েছে।"
তারেক বলল, "দুটো অক্ষরের দাম প্রতি মাসে সাতষট্টি হাজার টাকা বেশি। বছরে আট লাখ। পাঁচ বছরে চল্লিশ লাখ।"
জাহিদ বলল, "ROI-টা মনস্টার।"
১২
দুই বছরে তারেক দেড় লাখে পৌঁছাল। এক বছর পরে অন্য কোম্পানি, একশো বিশ হাজার। দ্বিতীয় বছরে প্রমোশন, দেড় লাখ। পার্টটাইম ক্লায়েন্টও নিচ্ছে, ট্যাক্স কনসালটেন্সি, অডিট রিভিউ। মাসে আরো ত্রিশ-চল্লিশ হাজার।
পাঁচ বছরের মধ্যে পার্টনার। ফার্মের লাভের ভাগ। ভালো বছরে মাসে তিন-চার লাখ।
আর নাহিদ? পাঁচ বছরে বেতন পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ। দশ হাজার বৃদ্ধি। পাঁচ বছরে।
১৩
জাহিদ ভাবল, এটা certainty bias-এর সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ।
CA-তে কেন মানুষ যায় না? কারণ অনিশ্চয়তা সামনে দেখা যায়। সাড়ে চার বছর আট হাজার টাকায়। তিন পার্সেন্ট পাশের হার। ব্যাচমেটরা এগিয়ে যাচ্ছে, তুমি দাঁড়িয়ে আছ। এই কষ্ট প্রতিদিন অনুভব করা যায়।
আর ব্যাংকিং? প্রথম দিন থেকে বেতন আসে। নিশ্চিত মনে হয়। কিন্তু দশ বছর পরে? বেতন পঞ্চাশ-ষাট হাজার। প্রমোশন আটকে আছে। বের হওয়ার উপায় নেই, কারণ দশ বছরের অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও ট্রান্সফারেবল না।
CA-র কষ্ট front-loaded। প্রথমে কষ্ট, পরে পুরস্কার। ব্যাংকিংয়ের কষ্ট back-loaded। প্রথমে আরাম, পরে স্টেগনেশন।
মানুষ front-loaded কষ্ট এড়ায়। কারণ সেটা দেখা যায়। back-loaded কষ্ট? "পরে দেখা যাবে।" পরে আর দেখা যায় না। পরে আটকে যায়।
১৪
রাতে নাহিদ জাহিদকে বলল, "আমি কখনো CA-র পথে যেতে পারতাম না। সাড়ে চার বছর আট হাজার টাকায় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারি না।"
নাহিদ সৎ। নাহিদ নিজেকে চেনে। সবাই তারেক হতে পারে না।
কিন্তু নাহিদ ব্যাংকের চাকরিকে "নিশ্চিত" মনে করে। ব্যাংকও ছাঁটাই করতে পারে। Merger হতে পারে। অটোমেশন আসতে পারে। নাহিদের "নিশ্চয়তা" আসলে একটা অনুভূতি। বাস্তবতা না।
১৫
সবাই নিশ্চিত পথ খোঁজে। BBA-র পর MBA। HSC-র পর মেডিকেল। পাস করে সরকারি চাকরি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার? অনিশ্চিত পথের শেষে।
CA অনিশ্চিত, তিন পার্সেন্ট পাস করে। কিন্তু যারা পাস করে, বেতন রাতারাতি নয়গুণ। ফ্রিল্যান্সিং অনিশ্চিত, পরের মাসে কাজ থাকবে কি না জানা নেই। কিন্তু যারা টেকে, ঘরে বসে ডলারে আয়। উদ্যোক্তা অনিশ্চিত, দশটার মধ্যে আটটা বন্ধ হয়। কিন্তু যে দুটো টেকে, চাকরি দিয়ে কখনো সম্ভব না এমন কিছু তৈরি করে।
নিশ্চিত পথে সিলিং আছে। অনিশ্চিত পথে সিলিং নেই। কিন্তু মেঝেও নেই।
তারেক পড়েনি। তারেক পেরেছে। দুই নম্বরের ব্যবধানে।
১৬
দুই নম্বর। তারেকের পুরো জীবন দুই নম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
দুই নম্বর কম পেলে আরো ছয় মাস ফকির। হয়তো তৃতীয়বার দিত। হয়তো হাল ছেড়ে দিত।
দুই নম্বর বেশি পেয়েছে বলে পঁচাত্তর হাজার। দুই বছরে দেড় লাখ। পাঁচ বছরে পার্টনার।
একটা প্রশ্নের একটা পয়েন্ট একটু বিস্তারিত লেখা। অথবা হাতের লেখা একটু পরিষ্কার। অথবা পরীক্ষক একটু ভালো মুডে। দুই নম্বরের পেছনে কী কাজ করেছে, কেউ জানে না।
কিন্তু ফলাফল? স্পষ্ট। আট হাজার আর পঁচাত্তর হাজারের মধ্যে দুই নম্বর। ফকির আর বাদশাহর মধ্যে দুই নম্বর।
সবাই নিশ্চিত পথ খোঁজে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার অনিশ্চিত পথের শেষে।
তারেক সেই পথে হেঁটেছে। সাড়ে চার বছর। আট হাজার টাকায়। তিন পার্সেন্ট সম্ভাবনায়।
আর জিতেছে। দুই নম্বরের ব্যবধানে।