নিশ্চয়তার মূল্য

চার বছর পর তিনটা পথ, তিনটা সংখ্যা, আর একটা হিসাবের খাতার নতুন পাতা

পর্ব ৫০ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

চার বছর।

HSC-র পর চার বছর। সেই ২০১৮ সালের জুলাই, যখন সবাই জিজ্ঞেস করত "এরপর কী করবে?" সেই জুলাই থেকে আজকের জানুয়ারি।

জাহিদ ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। Upwork-এ মেসেজ। আমেরিকার একটা accounting firm। invoicing module-এ bug। বাজেট: $450। এক সপ্তাহের কাজ।

জাহিদ proposal পাঠাল, ল্যাপটপ বন্ধ করল। $450। চার বছর আগে হাত কাঁপত। এখন সাধারণ সপ্তাহ।

গত মাসের হিসাব। Upwork: $680। সরাসরি ক্লায়েন্ট ড্যানিয়েল (অস্ট্রেলিয়া): $400 মাসিক রিটেইনার। UK-র ছোট ফার্ম: $150 সাপোর্ট। মোট: $1,230। বাংলাদেশি টাকায়: ১,৩৫,৩০০।

চার বছর আগে পরিবারের মোট আয় ছিল পনেরো হাজার। এখন শুধু জাহিদের আয় সেটার নয় গুণ।

কিন্তু পরের মাসে ষাট হাজারও হতে পারে। গত ডিসেম্বরে $640। তার আগের মাসে $1,100। ওঠানামা। সবসময় ওঠানামা।

তাহের ফোন করল বিকেলে।

"ভাই, আজ বেতন ঢুকেছে।"

"কত?"

"পঁচিশ হাজার। গত মাসেও পঁচিশ। তার আগের মাসেও পঁচিশ।"

গলায় ক্লান্তি। বিরক্তি না, ক্লান্তি। যেন একই বাক্য বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত।

তাহের প্রাইভেট ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার। গুলশান শাখা। AC অফিস। টাই। নয়টা-পাঁচটা। সব ঠিক আছে। সব একদম ঠিক আছে।

"ভাই, পাশের ডেস্কে রফিক ভাই বসে। বারো বছর ধরে এই ব্যাংকে। সিনিয়র অফিসার। বেতন পঁয়তাল্লিশ। বারো বছরে পঁচিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ।"

থামল।

"আমি রফিক ভাইয়ের দিকে তাকাই আর ভাবি, বারো বছর পর আমি ওই চেয়ারে বসে থাকব।"

তারেকের খবর এলো ফেসবুকে। গ্রুপ ফটো। ক্যাপশন: "Alhamdulillah. Finally CA."

CA Final। তিনবার ফেল করে চতুর্থবারে। তিন শতাংশ পাশের হার। একশোজনে তিনজন। তারেক সেই তিনজনের একজন।

চেহারায় ক্লান্তি আর স্বস্তি একসাথে। চার বছর আর্টিকেলশিপ, ছয়বার পরীক্ষা, মাসে পাঁচ হাজার টাকা stipend। আর এখন?

Big Four ফার্ম। সিনিয়র অডিটর। বেতন: দেড় লাখ।

তিনটা পথ। তিনটা সংখ্যা। একই HSC ব্যাচ।

তাহের: ২৫,০০০/মাস। নিশ্চিত। তারেক: ১,৫০,০০০/মাস। চার বছর শূন্যের পর। জাহিদ: ১,২০,০০০/মাস (গড়ে)। কোনো মাসে ৬০, কোনো মাসে ১,৫০।

তাহের বেছেছিল সবচেয়ে নিশ্চিত পথ। BBA, MBA, ব্যাংক। প্রতিটা ধাপ পরিষ্কার। A থেকে B, B থেকে C।

তারেক বেছেছিল সবচেয়ে অনিশ্চিত। তিন শতাংশ। তিনবার ফেল। প্রতিবার "আমি কি ভুল করলাম?" কিন্তু চতুর্থবারে? দেড় লাখ।

জাহিদ কিছু বাছেনি। সে একটা পথ তৈরি করেছে। NU ভর্তি হয়েছিল কারণ অন্য উপায় ছিল না। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল কারণ টাকার দরকার ছিল। financial software-এ গিয়েছিল কারণ একটা ক্লায়েন্ট সেই কাজ দিয়েছিল। প্রতিটা ধাপ improvisation।

জাহিদ ল্যাপটপ খুলে একটা নোট লিখল।

"নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওষুধ। বাবা-মা প্রেসক্রাইব করেন। সমাজ enforce করে। স্কুল বিক্রি করে। 'নিশ্চিত চাকরি' এই দেশের জাতীয় প্রার্থনা।"

"কিন্তু নিশ্চয়তার একটা দাম আছে। সেটা কেউ বলে না।"

"দাম হলো: সিলিং। নিশ্চয়তা মানে সিলিং। ব্যাংকের চাকরি নিশ্চিত পঁচিশ হাজারে। নিশ্চিত পঁয়তাল্লিশেও। আর নিশ্চিত আশি হাজারের বেশি কখনো না-তে।"

"নিশ্চয়তা তোমার নিচের দিকটা বাঁচায়। ওপরের দিকটা কেটে দেয়।"

ব্যাংকিং: নিশ্চয়তা বেশি, সিলিং নিচে। প্রতি মাসে কত আসবে জানা। কিন্তু সংখ্যাটা কখনো নাটকীয়ভাবে বাড়বে না।

CA: নিশ্চয়তা কম, সিলিং ওপরে। পাশ করবে কি না জানা ছিল না। কিন্তু পাশের পর? সীমা অনেক ওপরে।

ফ্রিল্যান্সিং: নিশ্চয়তা সবচেয়ে কম, সিলিং নেই। পরের মাসে কত আসবে কেউ জানে না। কিন্তু ওপরের কোনো সীমাও নেই।

এটা spectrum। বাম দিকে নিশ্চয়তা, ডান দিকে সম্ভাবনা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবার সন্তানদের বাম দিকে ঠেলে দেয়। সেই ধাক্কাটা ভালোবাসা থেকে আসে। ভয় থেকে আসে। দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা থেকে আসে।

কিন্তু সেই ধাক্কাটা একটা দাম নেয়।

তাহের আজকাল একটা কথা বলে। "নিশ্চিত কিন্তু নিরানন্দ।"

AC অফিস। আরামদায়ক চেয়ার। সময়মতো বেতন। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ভাবে না "আজ কী করব?" ভাবে "আজও সেই একই কাজ।"

"তুই জানিস সবচেয়ে খারাপ জিনিস কী? আমি বলতে পারি না আমি দুঃখী। কারণ আমি দুঃখী না। চাকরি আছে, বেতন আছে, AC আছে। কিন্তু সুখীও না। মাঝখানে। কোনো দিকে না।"

তারেক আবার উলটো। প্রতিদিন বারো ঘণ্টা কাজ। অডিট সিজনে ষোলো। ক্লান্ত? প্রচণ্ড। কিন্তু ক্লান্তির একটা purpose আছে।

তারেক একবার বলেছিল, "চার বছর প্রায় ভিখিরির মতো ছিলাম। বন্ধুরা চাকরি করছে, গাড়ি কিনছে। আমি একটা পরীক্ষায় বারবার ফেল হচ্ছি। লাগত, ভুল করেছি। আর এখন? এখন মনে হয়, সেটাই ছিল সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেটা তখন বোঝা সম্ভব ছিল না।"

জাহিদের কোনো অফিস নেই। সকালে চা খেয়ে ল্যাপটপ খোলে। কাজ থাকলে কাজ, না থাকলে খোঁজা। পেনশন নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ।

কিন্তু একটা জিনিস আছে। স্বাধীনতা।

কাউকে ছুটির আবেদন করতে হয় না। কোনো ম্যানেজারের অনুমতি নিতে হয় না। একদিন সকাল দশটায় কাজ শুরু করে রাত দুইটায় শেষ করে। আরেকদিন বিকেল তিনটায় শুরু করে সন্ধ্যা সাতটায় শেষ করে।

এটা সবার জন্য না। কিন্তু জাহিদের জন্য এটাই।

১০

মা-র bKash পয়েন্ট। চার বছর আগের সেই চল্লিশ হাজার টাকার বিনিয়োগ।

বাবা CNG ছেড়ে দিয়েছেন গত বছর। শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। আটচল্লিশ বছর বয়সে ছাব্বিশ বছরের ক্লান্তি জমে গেছে হাড়ে। এখন বাবা সারাদিন bKash পয়েন্টে বসেন। মা সকালের শিফট, বাবা বিকেলের শিফট।

আয় বেড়েছে। প্রথম মাসে আট হাজার। এখন দশ হাজার। এলাকার মানুষ চেনে। "আলমগীর ভাইয়ের bKash-এ যাও।"

পরিবারের মোট আয়: জাহিদ পরিবারকে দেয় ২৫,০০০, bKash পয়েন্ট ১০,০০০। মা-র হাতে প্রতি মাসে ৩৫,০০০। জাহিদের নিজের সেভিংস আলাদা। চার বছর আগে পরিবারের সব মিলিয়ে ছিল ১৫,০০০। এখন পরিবারের ঘরোয়া আয় ৩৫,০০০, খরচ ১৭,০০০। উদ্বৃত্ত ১৮,০০০।

১১

মা-র হিসাবের খাতা। সেই পুরনো, হলুদ হয়ে যাওয়া খাতাটা আলমারি থেকে বের করলেন।

প্রথম পাতা। ২০১৮ সাল।

আয়: ১৫,০০০। চাল-ডাল-তেল: ৬,০০০। ভাড়া: ৩,৫০০। বোনের স্কুল: ১,৫০০। বিদ্যুৎ: ৮০০। ওষুধ: ১,২০০। যাতায়াত: ১,০০০। মোট খরচ: ১৪,০০০। উদ্বৃত্ত: ১,০০০। কখনো শূন্য। কখনো ঋণাত্মক।

শেষ পাতা। এই মাস।

আয়: ৩৫,০০০। চাল-ডাল-তেল: ৭,০০০ (ভালো খাবার কিনছেন)। ভাড়া: ৩,৫০০। বোনের কলেজ: ২,০০০। বিদ্যুৎ: ১,২০০ (ফ্রিজ কিনেছেন)। ওষুধ: ৮০০ (নিয়মিত)। বিবিধ: ২,৫০০। মোট খরচ: ১৭,০০০। উদ্বৃত্ত: ১৮,০০০।

১২

মা বললেন, "চার বছর আগে আমি হিসাব করতাম কোথায় কমাতে হবে। ওষুধ কমাব না মাছ কমাব। বোনের খাতা এই মাসে কিনব না পরের মাসে। প্রতিটা টাকা ছিল একটা যুদ্ধ।"

থামলেন।

"এখন হিসাব করি কোথায় রাখতে হবে। ব্যাংকে রাখব না ফিক্সড ডিপোজিটে। বোনের জন্য আলাদা জমাব কি না।"

কমানোর হিসাব আর রাখার হিসাব। দুটোই হিসাব। কিন্তু একটায় ভয় থাকে, আরেকটায় থাকে না।

মা-র হাতের লেখায় খাতার শেষে একটা লাইন: "আল্লাহর রহমতে এই মাসে ১০,০০০ টাকা ব্যাংকে জমা হলো। মোট জমা: ৫৮,০০০।"

আটান্ন হাজার। মা-র সারাজীবনের সঞ্চয়। বয়স পঁয়তাল্লিশ, প্রথমবার সঞ্চয় করছেন। অনেকের কাছে এটা একটা ডিনারের খরচ। মা-র কাছে এটা ভবিষ্যৎ।

১৩

তিনজনের মধ্যে কে সবচেয়ে "সফল"?

টাকায়? তারেক। দেড় লাখ। কিন্তু চার বছর কষ্ট করেছে, তিনবার ফেল হয়েছে।

স্থিতিশীলতায়? তাহের। নিশ্চিত চাকরি, নিশ্চিত বেতন। কিন্তু সবচেয়ে কম সন্তুষ্ট।

স্বাধীনতায়? জাহিদ। কোনো বস নেই, কোনো অফিস নেই। কিন্তু কোনো নিরাপত্তাজালও নেই।

কে সবচেয়ে সফল? নির্ভর করে তুমি কোন জিনিসকে বেশি মূল্য দাও। নিরাপত্তা? তাহের। আয়? তারেক। স্বাধীনতা? জাহিদ।

কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার: তাহের, যে সবচেয়ে নিশ্চিত পথ বেছেছিল, সে সবচেয়ে কম সন্তুষ্ট। নিশ্চয়তা সন্তুষ্টি দেয় না। নিশ্চয়তা শুধু ভয় কমায়।

সন্তুষ্টি আসে challenge থেকে। "পারব কি না জানি না, তবু চেষ্টা করছি।" তারেক challenge নিয়েছিল, তাই সন্তুষ্ট। জাহিদ প্রতিদিন challenge-এ থাকে, তাই সন্তুষ্ট। তাহের challenge নেয়নি, তাই নিরাপদ কিন্তু সন্তুষ্ট না।

Certainty bias। মানুষ নিশ্চয়তা চায় কারণ অনিশ্চয়তা ভয়ের। কিন্তু নিশ্চয়তা দিয়ে বেঁচে থাকা যায়, বাঁচা যায় না।

১৪

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। ঘরে অন্ধকার। পাশের ঘরে মা-বাবা ঘুমাচ্ছেন। ছোটবোন পড়ছে।

চার বছরে কী বদলেছে? সংখ্যা বদলেছে। ১৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ (পরিবারের ঘরোয়া আয়)। খাতায় উদ্বৃত্ত এসেছে, যেখানে আগে ঘাটতি ছিল। মা-র ওষুধ নিয়মিত হচ্ছে। বোন কলেজে যাচ্ছে। ফ্রিজে মাছ-মাংস আছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় যেটা বদলেছে, সেটা সংখ্যায় মাপা যায় না। ভয় কমেছে। আগে ভয় ছিল "আগামীকাল খাব কী?" এখন ভয় হলে সেটা "পরের মাসে ক্লায়েন্ট কম থাকলে?" দুটো ভয়ের মধ্যে গুণগত পার্থক্য আছে।

১৫

তাহেরের ব্যাংকের চাকরিও অনিশ্চিত। restructuring হতে পারে, ব্যাংক বন্ধ হতে পারে, AI তার কাজ নিয়ে নিতে পারে। তাহের শুধু এই অনিশ্চয়তাগুলো দেখতে পায় না, কারণ AC অফিসের ভেতরে বসে থাকলে বাইরের ঝড় শোনা যায় না।

তারেক জানত সে ঝুঁকি নিচ্ছে। তাই প্রস্তুত ছিল। তিনবার ফেল হয়েও ভাঙেনি। কারণ সে জানত, অনিশ্চয়তা তার পথের অংশ।

জাহিদ অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে। প্রতিদিন। এটা তার স্বাভাবিক অবস্থা।

১৬

রাত গভীর হলো। জাহিদ চোখ বন্ধ করল।

মাথায় একটা বাক্য ঘুরছে। সহজ, ছোট, কিন্তু ভারী।

নিশ্চয়তার বিপরীত অনিশ্চয়তা না। নিশ্চয়তার বিপরীত সম্ভাবনা।

তাহের নিশ্চয়তা বেছেছিল। পেয়েছে নিরাপত্তা, হারিয়েছে সম্ভাবনা। তারেক সম্ভাবনা বেছেছিল। হারিয়েছে চার বছর, পেয়েছে একটা জীবন। জাহিদ কিছু বাছেনি। শুধু হাঁটতে থেকেছে। আর হাঁটতে হাঁটতে একটা পথ তৈরি হয়ে গেছে।

মা-র হিসাবের খাতায় চার বছর আগের পাতা আর আজকের পাতা পাশাপাশি রাখলে একটা গল্প দেখা যায়। কমানোর হিসাব থেকে রাখার হিসাব। ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্ত। ভয় থেকে স্বস্তি।

হিসাবের খাতা বদলেছে।

পঞ্চম অধ্যায় শেষ।