ইউটিউবে শেখা
কোনো ক্লাসরুম নেই, কোনো শিক্ষক নেই, কোনো সার্টিফিকেট নেই, শুধু ইউটিউব আর জেদ
১
রাকিব ভাইয়ের ল্যাপটপটা ছিল একটা Acer। মডেল নম্বর কেউ মনে রাখেনি। চার জিবি র্যাম, পাঁচশো জিবি হার্ডডিস্ক, স্ক্রিনের বাঁ দিকে একটা সরু দাগ যেটা কোনোদিন ঠিক হয়নি। কিবোর্ডের S বোতামটা একটু আটকাত। চাপ দিতে হতো জোরে। ফ্যান ঘুরলে এমন আওয়াজ হতো, মনে হতো কেউ চালের বস্তা টানছে।
রাকিব ভাই গাজীপুর যাওয়ার সময় রেখে গেছিল। বলেছিল, "তোর কাজে লাগবে।" জাহিদ তখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে। ল্যাপটপটা পেয়ে সে প্রথম যেটা করেছিল, সেটা হলো ইউটিউবে গান শোনা। তারপর মুভি দেখা। তারপর একদিন ভুল করে একটা ভিডিও ক্লিক হলো, "HTML শিখুন বাংলায়, পর্ব ১।"
সেই ভুল ক্লিক তার জীবন বদলে দিল।
২
প্রথম মাস।
ভিডিওটায় একজন ছেলে, সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের স্টুডেন্ট, Notepad++ খুলে লিখছে। `<html>`, `<head>`, `<body>`। জাহিদ দেখছে আর ভাবছে, এটা কী? এটা দিয়ে কী হয়?
ভিডিওর শেষে ছেলেটা ব্রাউজারে ফাইলটা ওপেন করল। স্ক্রিনে লেখা দেখাল, "Hello World।"
জাহিদ ল্যাপটপে একই কাজ করল। Notepad++ ডাউনলোড করল। টাইপ করল। ব্রাউজারে ওপেন করল।
স্ক্রিনে লেখা, "Hello World।"
একটা অদ্ভুত অনুভূতি। যেন সে কিছু তৈরি করেছে। কিছুই না, শুধু দুটো শব্দ স্ক্রিনে। কিন্তু সে তৈরি করেছে। সে লিখেছে, কম্পিউটার দেখিয়েছে। এই অনুভূতিটা নতুন।
সেদিন রাতে সে আরো তিনটা ভিডিও দেখল। প্যারাগ্রাফ ট্যাগ, হেডিং ট্যাগ, ইমেজ ট্যাগ। দুই দিনের মধ্যে সে একটা পেজ বানাল। পেজে তার নাম, একটা ছবি (নিজের না, গুগল থেকে নেওয়া ফুলের ছবি), আর নিচে লেখা, "আমি জাহিদ। আমি ওয়েব ডেভেলপার হব।"
ওয়েব ডেভেলপার কী, সেটা সে তখনো পুরোপুরি জানত না।
দ্বিতীয় সপ্তাহে CSS শুরু করল। রঙ, ফন্ট সাইজ, ব্যাকগ্রাউন্ড কালার। এটা যেন জাদু। কোড লিখলে রঙ বদলায়। সংখ্যা বদলালে সাইজ বদলায়। জাহিদ পুরো একটা রাত জেগে বিভিন্ন রঙ ট্রাই করল। সবুজ, লাল, হলুদ, কমলা। ঘরে অন্ধকার, ল্যাপটপের আলো মুখে, আর স্ক্রিনে রঙের বন্যা।
মায়ের কথা মনে পড়ে। মা ভোর চারটায় উঠে দেখেছিল ল্যাপটপের আলো জ্বলছে। জিজ্ঞেস করল, "পড়ছস?"
"হ্যাঁ, মা।"
মিথ্যা বলেনি। পড়ছিলই তো। শুধু সিলেবাসের বই না।
দুই মাসে জাহিদ চারটা ওয়েবসাইট বানাল। চারটাই কুৎসিত। একটায় লেখা ছোট হয়ে গেছে, পড়া যায় না। আরেকটায় ব্যাকগ্রাউন্ডের রঙ আর লেখার রঙ প্রায় একই, চোখ ধাঁধায়। তৃতীয়টায় ছবি লোড হয় না। চতুর্থটায় মোবাইলে খুললে সব ভেঙে যায়।
কিন্তু চারটাই তার তৈরি। কেউ শেখায়নি। কোনো ক্লাসরুম ছিল না। কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না। কোনো গ্রেড ছিল না। শুধু একটা ইচ্ছা: এটা করতে পারলে হয়তো টাকা আসবে।
৩
তৃতীয় মাসে JavaScript শুরু।
এখানে এসে জাহিদ থামল।
HTML আর CSS সহজ ছিল। দেখো আর করো। কিন্তু JavaScript অন্যরকম। ভেরিয়েবল, ফাংশন, লুপ, কন্ডিশন। ভিডিও দেখে বুঝত, কিন্তু নিজে লিখতে গেলে কিছু মিলত না। কোডে এরর আসত। এরর মেসেজ ইংরেজিতে, জাহিদ পুরোটা বুঝত না। "Uncaught TypeError: Cannot read properties of undefined" পড়ে সে পাঁচ মিনিট তাকিয়ে থাকত। তারপর এরর মেসেজটা কপি করে গুগলে সার্চ করত। Stack Overflow-এর একটা পেজ খুলত। সেটাও ইংরেজি। কিন্তু কোডটা দেখলে কিছুটা বোঝা যেত।
এভাবেই জাহিদ ইংরেজি শিখল। পড়ার বই থেকে না। Stack Overflow থেকে। এরর মেসেজ থেকে। Documentation থেকে। টেকনিক্যাল ইংরেজি। "Undefined is not a function" টাইপের ইংরেজি। সাহিত্যের ইংরেজি না, বাঁচার ইংরেজি।
চতুর্থ মাসে একদিন রাত দুটায় জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ। কিন্তু ঘুম আসছে না। মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে: "আমি কি পারব?"
তিন দিন সে কিছু করেনি। ল্যাপটপ খোলেনি। ইউটিউব দেখেনি। ক্লাসে গেছে, বাসায় ফিরেছে, খেয়েছে, ঘুমিয়েছে। তিন দিন পর ফারুক ফোন করল।
"কিরে, শিখছস না? ফেসবুকে তো তোর কোনো পোস্ট দেখি না।"
"আটকে গেছি।"
"কোথায়?"
"JavaScript-এ। বুঝি না। কিছুই বুঝি না।"
ফারুক বলল, "তুই যেটা বুঝস না, সেটা আবার দেখ। একবার না, দশবার। দশবার দেখলে কিছু একটা মাথায় ঢুকবেই।"
সোজা কথা। কিন্তু কাজের কথা।
জাহিদ আবার শুরু করল। একটা ভিডিও তিনবার, চারবার, পাঁচবার দেখল। প্রতিবার কিছু না কিছু নতুন ধরল। প্রথমবার শুনেছিল, বুঝত না। তৃতীয়বার কিছু কিছু মিলল। পঞ্চমবার মনে হলো, "এটা তো আসলে এত কঠিন না।"
কঠিন ছিল। কিন্তু অচেনা ছিল। অচেনা আর কঠিন এক জিনিস না। এই পার্থক্যটা বুঝতে জাহিদের দুই মাস লেগেছিল।
৪
পঞ্চম মাসে Python।
জাহিদ একটা ভিডিওতে শুনল, "Python is the easiest programming language to learn।" সে ভাবল, দেখি। JavaScript যদি কঠিন লাগে, Python-ই চেষ্টা করি।
প্রথম দিনেই প্রেমে পড়ে গেল।
Python-এ সেমিকোলন লাগে না। ব্র্যাকেটের জঞ্জাল নেই। কোড পড়তে প্রায় ইংরেজি পড়ার মতো। `if age > 18: print("adult")`। এটা দেখে জাহিদ হেসে ফেলল। JavaScript-এ এটা লিখতে গেলে ব্র্যাকেট, কার্লি ব্রেস, সেমিকোলন, সব লাগত। Python বলছে, ফালতু কিছু লাগবে না। যা বলতে চাও, বলো।
Python হলো বাংলাদেশী রান্না। সহজ ingredients দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, লবণ। এই চারটা জিনিস দিয়ে বাংলাদেশে পঞ্চাশ রকমের তরকারি হয়। Python-ও তাই। কয়েকটা সহজ নিয়ম দিয়ে অনেক বড় বড় কাজ।
জাহিদ Python দিয়ে প্রথম একটা ক্যালকুলেটর বানাল। তারপর একটা প্রোগ্রাম যেটা নাম জিজ্ঞেস করে আর "Hello" বলে। তারপর একটা গেম, সংখ্যা ধরতে হয়। ছোট ছোট জিনিস। কিন্তু প্রতিটা বানানোর পর মনে হতো, আমি কিছু একটা পারি।
ছয় মাসে জাহিদ তিনটা ভাষা ছুঁয়ে ফেলল। HTML, CSS, JavaScript, Python। কোনোটাই গভীরভাবে শেখা হয়নি। সারফেস লেভেল। কিন্তু ভিত তৈরি হচ্ছিল। ইট গাঁথা শুরু হয়েছে, দেয়াল এখনো ওঠেনি।
৫
সপ্তম মাস থেকে জাহিদ ডিরেকশন পাল্টাল।
সে বুঝল, শুধু ভাষা শিখলে হবে না। কিছু বানাতে হবে যেটা দিয়ে টাকা আসে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা তখন সে শুনেছে। Upwork, Fiverr, ফেসবুকের গ্রুপে মানুষ বলছে, "আমি মাসে লাখ টাকা আয় করি।" জাহিদ জানত এটা অনেকের ক্ষেত্রে বাড়িয়ে বলা। কিন্তু কেউ কেউ সত্যিই করে। সেই কেউ কেউ কী জানে?
Django। React। এই দুটো নাম বারবার আসছিল।
Django হলো Python-এর ওপর বানানো একটা ফ্রেমওয়ার্ক। ওয়েবসাইট বানানো যায়। ব্যাকএন্ড বানানো যায়। জাহিদ শুরু করল। Django-র documentation ভালো, কিন্তু ঘন। প্রতিটা পেজে এত তথ্য যে মাথা ঘুরে যেত। তবু সে পড়ল। ইউটিউবে Traversy Media-র Django ক্র্যাশ কোর্স দেখল। একটা ঘণ্টার ভিডিও, তিন দিনে শেষ করল। কারণ প্রতিটা স্টেপে থামতে হতো, নিজে করতে হতো, ভুল হতো, ঠিক করতে হতো।
নবম মাসে React শুরু। JavaScript ফিরে এল। কিন্তু এবার আলাদা। React-এ JavaScript ব্যবহার করতে গিয়ে জাহিদ বুঝল, চতুর্থ মাসে যেটা বুঝত না, সেটা এখন বুঝছে। সময় একটা শিক্ষক। ধৈর্য আরেকটা।
React কঠিন লাগল। Component, state, props, hooks। কিন্তু জাহিদ এখন আর হাল ছাড়ে না। সে শিখেছে, কঠিন মানে হাল ছাড়া না। কঠিন মানে আরো সময় দেওয়া।
এক বছরের মাথায় জাহিদ একটা পূর্ণ ওয়েবসাইট বানাতে পারে। ফ্রন্টএন্ড React, ব্যাকএন্ড Django। ডেটাবেজ SQLite। সুন্দর না, কিন্তু কাজ করে। একটা টু-ডু অ্যাপ, একটা ব্লগ, একটা ই-কমার্স সাইটের ফ্রন্ট পেজ।
কিছু বানাতে পারা আর কিছু ship করতে পারা, এই দুইটার মধ্যে একটা সমুদ্র আছে। সেই সমুদ্র পার হতে আরো এক বছর লাগবে।
৬
দ্বিতীয় বছর।
এই বছরটা ছিল আসল পরিবর্তনের বছর। প্রথম বছরে জাহিদ শিখেছে কীভাবে কোড লিখতে হয়। দ্বিতীয় বছরে সে শিখল কীভাবে কোড পাঠাতে হয়।
API কী, সেটা বুঝল। REST API বানাল। JSON কী, সেটা শিখল। ডেটাবেজ ডিজাইন, সেটা করল। PostgreSQL শিখল, কারণ অনেক জব পোস্টে PostgreSQL চায়। Git শিখল, কারণ কোড ম্যানেজমেন্ট ছাড়া কেউ টাকা দেয় না। GitHub-এ প্রোফাইল খুলল। খালি খালি প্রোজেক্ট আপলোড করল। deployment শিখল। Heroku-তে প্রথম সাইট হোস্ট করল। সাইট লাইভ দেখে সেদিন সে বাসায় মিম-কে ডেকে দেখিয়েছিল।
"মিম, এটা দেখ। এটা আমার বানানো। আর এটা ইন্টারনেটে আছে। যে কেউ দেখতে পারবে।"
মিম বলেছিল, "সুন্দর তো। কিন্তু এটা দিয়ে কী হবে?"
"এটা দিয়ে চাকরি হবে।"
"তুমি তো চাকরি খুঁজছ না। তুমি তো ফ্রিল্যান্সিং করবা বলছিলা।"
"ফ্রিল্যান্সিং-ও হবে। এটা দিয়ে প্রমাণ হবে যে আমি পারি।"
"বুঝলাম না।"
"বুঝবি। পরে বুঝবি।"
৭
শেখার টুলস।
রাকিব ভাইয়ের সেই Acer ল্যাপটপ। চার জিবি র্যাম। কোড এডিটর VS Code চালাতে গেলে ফ্যান পাগলের মতো ঘুরত। ব্রাউজারে তিনটা ট্যাব খুললে ল্যাপটপ হ্যাং করত। তাই জাহিদ নিয়ম করল: একটা ট্যাব VS Code, একটা ট্যাব ব্রাউজার, আর একটা ট্যাব ইউটিউব। তিনটার বেশি না। কখনো না।
মোবাইল ডাটা। মাসে আটশো টাকার প্যাকেজ। দিনে দেড় জিবি। ইউটিউব চালাত 360p-তে। 480p দিলে ডাটা শেষ হয়ে যেত সন্ধ্যার আগেই। 360p-তে কোডের লেখা ঝাপসা দেখাত। জাহিদ চোখ কুঁচকে পড়ত। তারপর ভিডিও পজ করে নিজে টাইপ করত। ভিডিওতে কী লিখছে ঠিক দেখা যায় না, তো সে অনুমান করত। অনুমান ভুল হতো। এরর আসত। এরর ঠিক করতে গিয়ে নতুন কিছু শিখত।
ভুল করা একটা শেখার পদ্ধতি। জাহিদ এটা আবিষ্কার করেছিল নিজে নিজে।
freeCodeCamp-এর ওয়েবসাইটে সে HTML, CSS, JavaScript-এর কোর্স করল। বিনামূল্যে। সার্টিফিকেটও দেয়। সার্টিফিকেটটা কোথাও কাজে লাগেনি, কিন্তু দেয়ালে টাঙানোর মতো একটা জিনিস পেয়েছিল সে। The Odin Project-এ গিয়ে full-stack শিখল। Traversy Media-র Brad Traversy হলো তার গুরু, যাকে সে কোনোদিন দেখেনি, যে তাকে চেনে না, কিন্তু যার গলার আওয়াজ সে ঘুমের মধ্যেও চিনত।
আর Stack Overflow। সেটা হলো জাহিদের লাইব্রেরি। প্রশ্ন করো, উত্তর পাও। জাহিদ প্রথম দিকে শুধু পড়ত। পরে নিজেও প্রশ্ন করল। প্রথম প্রশ্নে দুটো ডাউনভোট পেল, কারণ প্রশ্নটা ঠিকমতো লেখেনি। সেটাও একটা শিক্ষা: শুধু কোড লেখা না, প্রশ্ন লেখাটাও একটা দক্ষতা।
৮
একাকীত্ব।
এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। ইউটিউবে "আমি কীভাবে ডেভেলপার হলাম" টাইপের ভিডিওতে সবাই বলে, "আমি শিখলাম, প্র্যাকটিস করলাম, জব পেলাম।" কেউ বলে না, "রাত দুটায় কোড কাজ করছে না, কাউকে জিজ্ঞেস করার নেই, গুগলে সার্চ করে করে চোখ জ্বলছে, তবু মিলছে না।"
জাহিদের কোনো ক্লাসমেট কোডিং শিখছিল না। তার ডিপার্টমেন্টে কম্পিউটার সায়েন্স ছিল না। সে ম্যানেজমেন্টের ছাত্র। ম্যানেজমেন্টে থিওরি পড়ানো হয়, কোড না। তার বন্ধুরা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিচ্ছে, জাহিদ রাতে React-এর state management নিয়ে মাথা খাটাচ্ছে। তার বন্ধুরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, জাহিদ API endpoint ডিবাগ করছে।
দুটো পৃথিবী। একটায় সে ক্লাস করে, পরীক্ষা দেয়, গ্রেড পায়। আরেকটায় সে কোড শেখে, ভুল করে, শেখে, আবার ভুল করে। প্রথম পৃথিবীতে তার সাথী আছে। দ্বিতীয় পৃথিবীতে সে একা।
রাত দুটায় কোড কাজ করছে না। কাকে ফোন করবে? ফারুককে? ফারুক তো পলিটেকনিকে পড়ছে, ইলেকট্রিক্যাল। রাসেলকে? রাসেল মেডিকেলে, অ্যানাটমি পড়ছে। কে বুঝবে "TypeError: Cannot read properties of null" মানে কী?
কেউ না।
জাহিদ একটা ইংরেজি শব্দ শিখেছিল সেই সময়ে। Debugging। বাংলায় এর কোনো ভালো অনুবাদ নেই। মানে হলো, ভুল খুঁজে বের করা। কিন্তু ভুল খুঁজতে গেলে ধৈর্য লাগে। আর ধৈর্য ধরতে গেলে সঙ্গী লাগে। সঙ্গী না থাকলে ধৈর্যটা ভেঙে যায়।
জাহিদের ধৈর্য কয়েকবার ভেঙেছে। প্রতিবার সে একদিন, দুইদিন, তিনদিন কিছু করেনি। তারপর আবার ফিরে এসেছে। কারণ ফিরে না আসলে করার কিছু ছিল না। চাকরির বাজারে যাবে? কোন চাকরি? বিসিএস? সেটা তো আরো কঠিন, আরো অনিশ্চিত। অন্তত কোডিংয়ে একটা logic আছে। ভুল করলে এরর মেসেজ আসে। জীবনে ভুল করলে কোনো মেসেজ আসে না, শুধু পরিণাম আসে।
৯
তারপর একদিন ChatGPT এল।
জাহিদ প্রথমে শুনেছিল ফেসবুকে। কেউ একটা পোস্ট করেছে, "এই AI-টা কোড লিখে দেয়।" জাহিদ ভাবল, বাজে কথা। কোনো মেশিন কোড লিখতে পারে না। তারপর সে নিজে ট্রাই করল।
প্রথম প্রশ্ন ছিল, "Write a Python function that checks if a number is prime।"
ChatGPT পাঁচ সেকেন্ডে কোড লিখে দিল। জাহিদ কোডটা কপি করে রান করল। কাজ করে।
সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। পাঁচ মিনিট কিছু ভাবল না। তারপর আরেকটা প্রশ্ন করল। আরো কঠিন। সেটাও পারল।
জাহিদ সেদিন তিন ঘণ্টা ChatGPT-র সাথে কথা বলল। কোড নিয়ে, concept নিয়ে, error নিয়ে। সে প্রশ্ন করল, AI উত্তর দিল। সে বলল "এটা বুঝিনি", AI আরো সহজ করে বুঝিয়ে দিল। সে বলল "আমার কোডে এরর আসছে", AI এরর ধরিয়ে দিল।
এটা আমার শিক্ষক, সহপাঠী, আর সমাধানকারী। সব একসাথে।
রাত দুটায় আর কাউকে ফোন করতে হয় না। AI জেগে আছে। AI-এর ঘুম নেই, বিরক্তি নেই, ডাউনভোট নেই। শুধু উত্তর আছে।
কিন্তু জাহিদ একটা জিনিস বুঝত। AI দিয়ে শর্টকাট নেওয়া যায়, কিন্তু শর্টকাট দিয়ে শেখা যায় না। সে AI-কে ব্যবহার করত বুঝতে, কপি-পেস্ট করতে না। AI যখন কোড দিত, জাহিদ প্রতিটা লাইন পড়ত। বুঝত। না বুঝলে জিজ্ঞেস করত, "এই লাইনটা কেন?" তারপর নিজে আবার লিখত, AI-এর কোড না দেখে।
এই পার্থক্যটা অনেকে বোঝে না। AI-কে ব্যবহার করা আর AI-এর ওপর নির্ভর করা, এই দুটো আলাদা জিনিস। জাহিদ প্রথমটা করত।
১০
Present bias।
অর্থনীতির একটা ধারণা। মানুষ আজকের একশো টাকাকে আগামীকালের দশ হাজার টাকার চেয়ে বেশি মূল্য দেয়। আজকের আনন্দ, আজকের ফলাফল, আজকের সন্তুষ্টি। ভবিষ্যতের বড় পুরস্কারের চেয়ে বর্তমানের ছোট পুরস্কার বেশি আকর্ষণীয়।
ইউটিউবে শেখাটা present bias-এর একটা মজার খেলা।
একটা টিউটোরিয়াল দেখো। ত্রিশ মিনিট। তারপর নিজে বানাও। এক ঘণ্টা। স্ক্রিনে কিছু একটা দেখো যেটা তুমি বানিয়েছ। ডোপামিন। সন্তুষ্টি। আজকে কিছু করলাম।
এটা present bias-এর ভালো দিক। instant feedback। তুমি কোড লিখলে, ফলাফল দেখো। পড়ালেখায় এটা নেই। পরীক্ষার ছয় মাস আগে পড়তে বসো, ফলাফল পাও ছয় মাস পরে। কোডিংয়ে? এখনই। এখনই দেখো তোমার কোড কাজ করে কি না।
জাহিদের জন্য এটা ছিল একটা আশীর্বাদ। সে এমন একটা ছেলে যার ধৈর্য কম। বিসিএসের জন্য তিন বছর পড়া? সম্ভব না তার পক্ষে। কিন্তু একটা ওয়েবসাইট বানাও, এক সপ্তাহে দেখো? সেটা পারে।
কিন্তু present bias-এর একটা খারাপ দিকও আছে।
টিউটোরিয়াল দেখে দেখে একটা জায়গায় আটকে যাওয়া। এটাকে বলে "tutorial hell।" নতুন কিছু শিখছ, কিন্তু আসলে কিছু শিখছ না। দেখছ, করছ, ভুলে যাচ্ছ। কারণ গভীরে যাচ্ছ না। গভীরে যেতে হলে ধৈর্য লাগে। ধৈর্য মানে delayed gratification। আজকে কোনো ফলাফল না পেয়ে ছয় মাস পর বড় ফলাফল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা।
জাহিদের সুবিধা ছিল, সে দুটো মিশিয়েছিল। টিউটোরিয়াল দেখত instant feedback-এর জন্য। কিন্তু তারপর আসল প্রোজেক্ট করত deep learning-এর জন্য। টিউটোরিয়াল দিয়ে শিখত কী করতে হবে। প্রোজেক্ট করে শিখত কেন করতে হবে।
"কী" আর "কেন" এর মধ্যে পার্থক্যটাই হলো amateur আর professional-এর পার্থক্য।
১১
দুই বছর পর জাহিদ একটা লিস্ট করল। কী কী সে শিখেছে।
HTML, CSS, JavaScript, Python, Django, React, REST API, PostgreSQL, SQLite, Git, GitHub, Heroku deployment, basic Linux commands, responsive design, authentication, payment integration।
এই লিস্টটা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শেখায়নি। কোনো সিলেবাসে এটা ছিল না। কোনো পরীক্ষায় এটা আসেনি। কোনো শিক্ষক এটা পড়াননি।
ইউটিউব পড়িয়েছে। Stack Overflow পড়িয়েছে। freeCodeCamp পড়িয়েছে। ChatGPT পড়িয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি পড়িয়েছে ভুল। অসংখ্য ভুল। হাজারটা error message। শত রাত ঘুম না হওয়া। দশবার হাল ছেড়ে দেওয়া আর এগারোবার ফিরে আসা।
জাহিদ মাঝে মাঝে ভাবে, সে যদি BUET-এ পড়ত, তাহলে কী হতো? কম্পিউটার সায়েন্সে চার বছরের degree, ভালো শিক্ষক, ল্যাব, বন্ধু যারা কোড বোঝে, ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট।
কিন্তু সে BUET-এ পড়েনি। সে পড়েছে ময়মনসিংয়ের একটা কলেজে, ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। তার শিক্ষক ছিল YouTube। তার ক্লাসরুম ছিল রাকিব ভাইয়ের পুরনো Acer ল্যাপটপ। তার ক্যাম্পাস ছিল ইন্টারনেট। তার সহপাঠী ছিল Stack Overflow-এর anonymous ইউজাররা, যাদের নাম সে কোনোদিন জানবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে degree দিয়েছে। YouTube আমাকে career দিয়েছে। দুটো আলাদা জিনিস।
জাহিদ এই কথাটা একদিন ফেসবুকে লিখেছিল। পোস্টে সাতাশটা লাইক পড়েছিল। একজন কমেন্ট করেছিল, "ভাই, কোন কোন চ্যানেল থেকে শিখেছেন?" জাহিদ চ্যানেলগুলোর নাম লিখে দিয়েছিল। সেই কমেন্টে আরো তেরোটা লাইক পড়েছিল।
সাতাশটা লাইক। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষকের চেয়ে এই সাতাশ জন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই মুহূর্তে। কারণ এরা বুঝেছে। এরা জানে ইউটিউবে শেখা মানে কী। এরা জানে 360p-তে কোড পড়ার কষ্ট। এরা জানে রাত দুটায় একা বসে "undefined is not a function" এর সাথে যুদ্ধ করা কেমন লাগে।
জাহিদ জানে, তার গল্পটা বাংলাদেশে অনন্য না। লাখ লাখ ছেলেমেয়ে এভাবে শিখছে। ক্লাসরুম ছাড়া। শিক্ষক ছাড়া। সার্টিফিকেট ছাড়া। শুধু একটা ফোন, একটা ইন্টারনেট কানেকশন, আর একটা জেদ।
এই জেদটাই সবকিছু।