প্রথম গিগ

পনেরো ডলার, চৌদ্দ ঘণ্টা, আর টেক্সাসের একজন মানুষ যে জানে না ডেভেলপারের ঘরের ছাদ টিনের

পর্ব ৫২ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

Fiverr-এ অ্যাকাউন্ট খুলতে পনেরো মিনিট লাগল।

প্রোফাইল ছবি দিতে গিয়ে জাহিদ আটকে গেল। তার কোনো ভালো ছবি নেই। সেলফি তুলতে পারে, কিন্তু Fiverr-এ সেলফি দিলে প্রফেশনাল দেখায় না। ফেসবুকের ছবি? সেটা একটা গ্রুপ ফটো, ক্রপ করলে পিক্সেলেটেড হয়ে যায়।

শেষমেশ সে NU কলেজের আইডি কার্ডের ছবি ব্যবহার করল। একমাত্র ফর্মাল ছবি। সাদা শার্ট। চুল আঁচড়ানো। মুখে একটা অস্বস্তিকর হাসি, যেটা পাসপোর্ট সাইজ ছবির সময় ফটোগ্রাফার বলেছিল "একটু হাসেন।" সেই হাসি।

ছবিটা আপলোড করে জাহিদ নিজেই দেখল। দেখে মনে হলো একজন স্কুল ছাত্র ভুল করে Fiverr-এ ঢুকে পড়েছে। কিন্তু অন্য কোনো ছবি নেই। এটাই চলবে।

প্রোফাইল বায়ো লিখতে আরো বিশ মিনিট।

"I am a passionate web developer..."

না। এটা সবাই লেখে। জাহিদ মুছে ফেলল।

"I am a highly skilled..."

না। সে highly skilled না। সে তিন মাস আগে HTML শিখেছে। Highly skilled বলা মিথ্যা হবে।

শেষমেশ লিখল: "I build clean, responsive websites. Fast delivery. Unlimited revisions."

Unlimited revisions। এই কথাটা লেখার সময় জাহিদ বুঝতে পারেনি এটা কতটা বিপজ্জনক প্রতিশ্রুতি। সেটা পরে বুঝবে।

প্রথম গিগ তৈরি করল। টাইটেল: "I will create a responsive website for $20."

বিশ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় চব্বিশশো। জাহিদের মনে হলো এটা যুক্তিসঙ্গত দাম। একটা ওয়েবসাইট বানাতে দুই-তিন দিন লাগে। দিনে আটশো টাকা। মফস্বলের হিসাবে খারাপ না।

গিগ পাবলিশ করে জাহিদ অপেক্ষা করতে বসল।

প্রথম দিন: শূন্য ভিউ। শূন্য ক্লিক। শূন্য অর্ডার।

দ্বিতীয় দিন: দুইটা impression। মানে দুইজন মানুষ গিগের টাইটেলটা দেখেছে। ক্লিক করেনি।

তৃতীয় দিন: একটা ক্লিক। কিন্তু অর্ডার নেই।

জাহিদ Fiverr ফোরামে গেল। পড়ল। অন্য সেলাররা কী বলছে। একজন লিখেছে, "I waited 3 months for my first order." তিন মাস। জাহিদের বুকটা ধক করে উঠল।

আরেকজন লিখেছে, "Send buyer requests every day. That's how you get orders."

Buyer requests। Fiverr-এ buyer-রা কাজের বিজ্ঞাপন দেয়। সেলাররা সেখানে আবেদন পাঠায়। জাহিদ বুঝল, বসে থাকলে হবে না। নিজে গিয়ে দরজায় দরজায় কড়া নাড়তে হবে।

এক সপ্তাহ পর জাহিদ দাম কমাল। বিশ ডলার থেকে দশ ডলার।

দশ ডলার মানে বারোশো টাকা। Fiverr-এর কমিশন কাটলে আটশো। একটা পুরো ওয়েবসাইটের দাম আটশো টাকা। বাবা CNG চালিয়ে একদিনে এর চেয়ে বেশি আয় করে।

কিন্তু জাহিদের কাছে এখন দামটা গুরুত্বপূর্ণ না। রিভিউ গুরুত্বপূর্ণ। Fiverr-এ রিভিউ ছাড়া তুমি কেউ না। শূন্য রিভিউ মানে শূন্য বিশ্বাসযোগ্যতা। শূন্য বিশ্বাসযোগ্যতা মানে শূন্য অর্ডার। শূন্য অর্ডার মানে শূন্য রিভিউ। একটা চক্র। ভাঙতে হবে।

দুই সপ্তাহ হয়ে গেল। এখনো কোনো অর্ডার নেই।

জাহিদ buyer request পাঠাতে শুরু করল। প্রতিদিন দশটা করে।

Fiverr-এ দিনে দশটা buyer request পাঠানো যায়। জাহিদ প্রতিটায় কাস্টম মেসেজ লিখত। কপি-পেস্ট না। প্রতিটা আলাদা। buyer কী চায় সেটা পড়ে, তার চাহিদা অনুযায়ী proposal লিখত।

"Hi, I noticed you need a landing page for your coaching business. I can build it with a clean design, mobile-responsive, and fast loading. Here's my approach..."

পাঁচ দিনে পঞ্চাশটা buyer request।

ঊনপঞ্চাশটা ignored। কোনো reply নেই। কোনো seen নেই। শূন্যতা। ইন্টারনেটের অন্য প্রান্তে কেউ জাহিদের proposal পড়ছে কিনা সেটাও জানার উপায় নেই।

পঞ্চাশ নম্বরটা ছিল একজন আমেরিকান। প্রোফাইলে লেখা: Texas, United States। তার দরকার একটা landing page। বাজেট: পনেরো ডলার।

মেসেজ এলো রাত এগারোটায়। বাংলাদেশ সময়।

"Can you make a landing page? Budget $15. Need it in 3 days."

জাহিদের হাত কাঁপল। সত্যি কাঁপল। সে মেসেজটা তিনবার পড়ল। তারপর reply লিখতে বসল। প্রথম ড্রাফট পাঁচ লাইন। মুছে ফেলল। দ্বিতীয় ড্রাফট তিন লাইন। আবার মুছল। তৃতীয় ড্রাফট:

"Yes, I can do this. I'll deliver a clean, mobile-responsive landing page within 2 days. Would you like to share more details about your business?"

দুই দিনে। তিন দিনের বদলে দুই দিন বলল। কারণ তাড়াতাড়ি deliver করলে buyer খুশি হয়। এটা সে ফোরাম থেকে শিখেছে।

reply এলো: "Sure. It's for a small plumbing business. I'll send the content."

Plumbing business। টেক্সাসের একটা ছোটো প্লাম্বিং কোম্পানি। পাইপ ঠিক করে। নল ঠিক করে। জাহিদ plumbing শব্দটা Google করল। ছবি দেখল। আমেরিকায় প্লাম্বাররা ট্রাকে করে বাড়ি বাড়ি যায়, পাইপ ঠিক করে, ঘণ্টায় পঞ্চাশ-একশো ডলার নেয়।

আর সেই প্লাম্বারের ওয়েবসাইট বানাচ্ছে বাংলাদেশের একটা মফস্বল শহরের ছেলে। পনেরো ডলারে।

পনেরো ডলার। আঠারোশো টাকা। Fiverr কমিশন কাটলে বারো ডলার। চোদ্দশো টাকা।

বাবা তিন দিন CNG চালালে এর চেয়ে বেশি আয় করে। বাবার তিন দিনের আয়ের চেয়ে কম। এটা জাহিদের প্রথম আন্তর্জাতিক আয়।

কিন্তু জাহিদ টাকার হিসাব করল না। সে অর্ডারটা accept করল। তারপর কাজে বসল।

চৌদ্দ ঘণ্টা।

একটা পনেরো ডলারের landing page-এ জাহিদ চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করল। রাত বারোটা থেকে পরদিন দুপুর দুইটা পর্যন্ত। মাঝে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। ভাত খেয়েছে একবার। চা খেয়েছে চারবার।

সে overthink করল। প্রতিটা pixel নিয়ে ভাবল। হেডারের রঙ তিনবার বদলাল। ফন্ট সাইজ পাঁচবার অ্যাডজাস্ট করল। মোবাইল ভিউতে বাটনটা ঠিকমতো আসছে কিনা সেটা বিশবার চেক করল। একটা subtle shadow effect যোগ করল যেটা ক্লায়েন্ট কখনো খেয়ালই করবে না।

পনেরো ডলারের কাজে সে পঞ্চাশ ডলারের মান দিল। কারণ এটা শুধু একটা কাজ না। এটা প্রথম কাজ। এটা প্রমাণ। প্রমাণ যে সে পারে।

ঘণ্টায় হিসাব করলে জাহিদের আয় হলো এক ডলারের সামান্য বেশি। ঘণ্টায় একশো বিশ টাকা। রিকশাওয়ালার চেয়ে কম।

কিন্তু রিকশাওয়ালার রিভিউ লাগে না।

জাহিদ কাজটা deliver করল। তারপর বসে রইল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। Fiverr-এর নোটিফিকেশন বেলটার দিকে। buyer কখন দেখবে? কখন feedback দেবে? পছন্দ হবে? না হলে?

ছয় ঘণ্টা পর মেসেজ এলো।

"Nice work. Looks good."

তারপর order complete হলো। রিভিউ এলো। পাঁচ তারা।

পাঁচটা তারা। হলুদ রঙের। ছোটো ছোটো। স্ক্রিনের এক কোণায়। কিন্তু জাহিদের কাছে এই পাঁচটা তারা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।

কারণ Fiverr-এ তারা হলো মুদ্রা। ডলার দিয়ে তারা কেনা যায় না। কাজ দিয়ে, মান দিয়ে, সময় দিয়ে অর্জন করতে হয়। আর একবার অর্জন করলে এটা compound হয়। পাঁচ তারা মানে পরবর্তী buyer তোমাকে বিশ্বাস করবে। বিশ্বাস মানে আরেকটা অর্ডার। আরেকটা অর্ডার মানে আরেকটা রিভিউ। চক্রটা ভেঙে গেছে। এখন চক্রটা উল্টো দিকে ঘুরছে।

১০

দ্বিতীয় গিগ এলো চার দিন পর। পঁচিশ ডলার। একটা ছোটো ব্যবসার ওয়েবসাইট। তিন পেজ। হোম, অ্যাবাউট, কন্ট্যাক্ট।

জাহিদ এবারও over-deliver করল। কিন্তু এবার বারো ঘণ্টা লাগল, চৌদ্দ না। সে শিখছে। দ্রুত হচ্ছে।

তৃতীয় গিগ: ত্রিশ ডলার। এবার দশ ঘণ্টা। চতুর্থ গিগ: পঁয়ত্রিশ। আট ঘণ্টা।

প্রতিটা গিগ একটা ক্লাসরুম। প্রতিটা ক্লায়েন্ট একজন শিক্ষক। কেউ শেখাচ্ছে ধৈর্য, কেউ শেখাচ্ছে যোগাযোগ, কেউ শেখাচ্ছে সময় ব্যবস্থাপনা। আর প্রতিটা গিগের শেষে একটা report card: তারা।

১১

ফ্রিল্যান্সিংয়ের একটা জাদু আছে। এই জাদুর নাম: তাৎক্ষণিকতা।

তুমি কাজ করো। তুমি deliver করো। টাকা আসে। তিন দিন। পাঁচ দিন। সাত দিন। কিন্তু আসে। চোখের সামনে। Fiverr ব্যালেন্সে সংখ্যাটা বাড়ে।

এটাকে অর্থনীতিবিদরা বলে present bias। বর্তমান পক্ষপাত। মানুষ আজকের পুরস্কারকে কালকের পুরস্কারের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়। আজকে একশো টাকা পেলে যে আনন্দ হয়, কালকে একশো দশ টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে সেই আনন্দ হয় না।

ফ্রিল্যান্সিং এই bias-কে feed করে। তুমি কাজ করলে, তুমি পেলে। এখনই। কোনো বার্ষিক বেতন পর্যালোচনা নেই। কোনো প্রমোশন সাইকেল নেই। কোনো বসের মর্জি নেই। তোমার কাজ, তোমার টাকা। সরাসরি।

চাকরিতে তুমি জানুয়ারিতে কাজ করো, ডিসেম্বরে increment হয়। পুরো এক বছর অপেক্ষা। ফ্রিল্যান্সিংয়ে তুমি সোমবারে কাজ করো, বৃহস্পতিবারে টাকা পাও। এই feedback loop টা addictive।

১২

কিন্তু এই তাৎক্ষণিকতা একটা ফাঁদও।

ফাঁদটা এরকম: তুমি বিশ ডলারের গিগ করতে পারো। আরামে। চোখ বন্ধ করে। প্রতিদিন একটা করে বিশ ডলারের গিগ মানে মাসে ছয়শো ডলার। বাংলাদেশি টাকায় বাহাত্তর হাজার। মফস্বলের হিসাবে অনেক টাকা। বাবা সারা মাস CNG চালিয়ে এর অর্ধেক আয় করে।

তাহলে কেন বিশ ডলারের গিগ ছেড়ে React শিখবে? কেন database design শিখবে? কেন দুই সপ্তাহ আয় বন্ধ রেখে নতুন কিছু শিখবে?

কারণ আজকের বিশ ডলারের গিগ কালকেও বিশ ডলারেই থাকবে। পরশুও। পাঁচ বছর পরেও। দশ বছর পরেও। বিশ ডলার কখনো দুইশো ডলার হবে না, যদি তুমি নতুন skill না শেখো।

present bias বলে: আজকের বিশ ডলার নাও। কালকের কথা কালকে ভাবো।

rational thinking বলে: আজ দশ ডলার কম নাও, সেই সময়টা শিখতে ব্যয় করো, কালকে দুইশো ডলার নেবে।

বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার present bias-এর কাছে হেরে যায়। তারা আজকের গিগ করে। কালকের skill শেখে না। পাঁচ বছর পরে তারা একই জায়গায় থাকে। একই দামে কাজ করে। শুধু বয়স বাড়ে। আর নতুন ফ্রিল্যান্সাররা আসে যারা আরো সস্তায় একই কাজ করতে রাজি।

১৩

জাহিদ একটা সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্তটা সহজ না।

সে তার সময়কে দুই ভাগে ভাগ করল। পঞ্চাশ-পঞ্চাশ।

পঞ্চাশ ভাগ সময়: গিগ। আয়। বিল পরিশোধ। পরিবারকে টাকা দেওয়া। জীবিকা।

পঞ্চাশ ভাগ সময়: শেখা। React। Node.js। Database। API। নতুন জিনিস। যেগুলো আজকে টাকা দেবে না, কিন্তু ছয় মাস পরে দেবে।

এই সিদ্ধান্তটা বিরল। বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার এটা পারে না। কারণ এটা painful। তুমি জানো তুমি আজকে একটা গিগ করলে বিশ ডলার পেতে। কিন্তু তুমি সেটা না করে React tutorial দেখছো। এমন একটা জিনিস শিখছো যেটা থেকে আজকে একটা টাকাও আসবে না। এটা করতে discipline লাগে। আর discipline হলো present bias-এর ওষুধ।

জাহিদের একটা সুবিধা আছে। সে মফস্বলে থাকে। তার খরচ কম। মাসে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করলে চলে যায়। তাই সে পঞ্চাশ ভাগ সময় শেখায় দিতে পারে। ঢাকায় থাকলে বাড়ি ভাড়া, খাওয়া, যাতায়াত মিলিয়ে বিশ হাজার। তখন পঞ্চাশ ভাগ সময় শেখায় দেওয়া সম্ভব না। তখন আশি ভাগ গিগ, বিশ ভাগ শেখা। তখন present bias জেতে।

মফস্বলের সস্তা জীবনযাত্রা জাহিদের গোপন অস্ত্র। সে এটা জানে না। কিন্তু এটাই তাকে অন্য ফ্রিল্যান্সারদের থেকে আলাদা করবে।

১৪

প্রথম মাসে জাহিদের মোট আয়: পঁয়ষট্টি ডলার। প্রায় আট হাজার টাকা।

আট হাজার টাকা। বাবার মাসিক আয়ের অর্ধেকের কম। কিন্তু এটা শূন্য থেকে আট হাজার। এই trajectory টা গুরুত্বপূর্ণ, পরিমাণটা না।

Fiverr-এর ব্যালেন্স withdrawal করতে হলে Payoneer কার্ড লাগে। জাহিদ Payoneer-এ আবেদন করেছিল আগেই। কার্ড এসেছে ডাকে। একটা MasterCard। কালো রঙের। উপরে জাহিদের নাম ইংরেজিতে।

কিন্তু Payoneer থেকে টাকা তুলতে হলে ATM দরকার যেটা international MasterCard support করে। জাহিদের শহরে তিনটা ATM আছে। একটা ডাচ-বাংলা, একটা ইসলামী ব্যাংক, একটা সোনালী ব্যাংক। তিনটার কোনোটাই international card support করে না।

নিকটতম ATM যেটা কাজ করবে: ঢাকা।

১৫

জাহিদ বাসে উঠল। তিন ঘণ্টার যাত্রা।

বাসের টিকিট একশো বিশ টাকা। যাওয়া-আসা দুইশো চল্লিশ। টাকা তোলার জন্য দুইশো চল্লিশ টাকা খরচ। এটাও একধরনের কমিশন। Fiverr বিশ পার্সেন্ট কাটে। Payoneer তিন ডলার কাটে। আর বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুইশো চল্লিশ টাকা কাটে।

ঢাকার গুলশানে একটা Standard Chartered-এর ATM। জাহিদ কার্ড ঢোকাল। PIN দিল। Amount: 1800 taka।

মেশিন গুনগুন করল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর টাকা বেরিয়ে এলো। আঠারোশো টাকা। নোটগুলো জাহিদ দুইবার গুনল। তারপর পকেটে রাখল।

১৬

বাসে ফেরার পথে জাহিদ জানালার পাশে বসে আছে। পকেটে আঠারোশো টাকা। বাসের ভাড়া বাদ দিলে পনেরোশো ষাট। Fiverr কমিশন, Payoneer ফি, বাসের ভাড়া সব বাদ দিলে পনেরো ডলার থেকে হাতে এলো পনেরোশো ষাট টাকা।

কিন্তু জাহিদ হিসাব করছে না। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে। দুই পাশে ধানক্ষেত। দূরে একটা মসজিদের মিনার।

সে ভাবছে টেক্সাসের সেই মানুষটার কথা। যে তার landing page-টা দেখে বলেছে "Nice work." সেই মানুষটা জানে না যে ডেভেলপারের ঘরের ছাদ টিনের। জানে না যে ডেভেলপার তিন ঘণ্টা বাসে চড়ে টাকা তুলতে গেছে। জানে না যে পনেরো ডলার তার কাছে একটা বার্গারের দাম, কিন্তু এই পনেরো ডলার ডেভেলপারের জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক আয়।

এটাই গ্লোবালাইজেশন। এটাই ইন্টারনেট। এটাই ফ্রিল্যান্সিং।

দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবী, একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবলের দুই প্রান্তে, পনেরো ডলারের বিনিময়ে সংযুক্ত।

১৭

বাড়ি ফিরে জাহিদ মাকে পাঁচশো টাকা দিল।

মা জিজ্ঞেস করল, "কই থেইক্যা পাইলি?"

জাহিদ বলল, "কাজ করছি। কম্পিউটারে।"

মা টাকাটা হাতে নিয়ে দেখল। তারপর বলল, "হালাল তো?"

জাহিদ হাসল। "হ্যাঁ, মা। একদম হালাল। একজন আমেরিকানের ওয়েবসাইট বানাইছি।"

মা কিছু বুঝল না। ওয়েবসাইট কী জিনিস মা জানে না। কিন্তু আমেরিকান শব্দটা শুনে একটু impressed হলো। আমেরিকা মানে বড় জায়গা। আমেরিকানরা টাকা দিচ্ছে মানে কাজটা ভালো।

মা পাঁচশো টাকাটা শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখল। তারপর বলল, "চা খাবি?"

জাহিদ চা খেল। মফস্বলের রান্নাঘরে বসে। টিনের ছাদের নিচে। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। পাশের বাড়ির টিভিতে খবর চলছে। কোথাও একটা আযানের সুর।

পকেটে তেরোশো টাকা। কিন্তু পকেটের বাইরে একটা সম্ভাবনা, যেটার কোনো সীমানা নেই।