আপওয়ার্কে উড়ান
ফাইভারের পনেরো ডলারের গিগ থেকে আপওয়ার্কের ঘণ্টা-চুক্তি, মফস্বলের ছেলের বাজার এখন পুরো পৃথিবী
১
ফাইভারে জাহিদ ছয় মাস কাটাল।
ছয় মাসে বাইশটা অর্ডার শেষ করল। প্রতিটা পনেরো থেকে পঁচিশ ডলার। ওয়ার্ডপ্রেস সেটআপ, লোগো ডিজাইন ফিক্স, HTML টেম্পলেট কাস্টমাইজ, ছোটখাটো বাগ ফিক্স। ক্লায়েন্ট বেশিরভাগ ভারত, পাকিস্তান, মিশর। মানে যারা নিজেরাও সস্তায় কাজ করাতে চায়।
বাইশটা অর্ডার থেকে মোট আয়: তিনশো বাহাত্তর ডলার। ফাইভারের কমিশন কাটার পর পেয়েছে তিনশো। ছয় মাসে তিনশো ডলার। মাসে পঞ্চাশ ডলার।
খারাপ না। কিন্তু ভালোও না।
২
সমস্যাটা ফাইভারের স্ট্রাকচারে।
পনেরো ডলারের গিগে কতক্ষণ কাজ করো? কখনো দুই ঘণ্টা, কখনো ছয় ঘণ্টা। ক্লায়েন্টের রিভিশন আসে তিনবার চারবার। "Can you move this button a little to the left?" "Can you change the color to slightly darker blue?" প্রতিটা রিভিশন বিনা পয়সায়। গিগের দাম ফিক্সড।
ছয় ঘণ্টা কাজ করে পনেরো ডলার মানে ঘণ্টায় আড়াই ডলার। গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু জাহিদ গার্মেন্টস শ্রমিক হতে চায় না।
নাহিদ একদিন বলল, "তুই ফাইভারে পচে যাচ্ছিস।"
৩
নাহিদ। জাহিদের বন্ধু। ফ্রিল্যান্সিংয়ে ছয় মাস আগে ঢুকেছে। নাহিদ Upwork-এ কাজ করে।
"ফাইভার আর Upwork-এ পার্থক্যটা কী?"
"ফাইভার হলো বাজার। তুই দাঁড়িয়ে আছিস, ক্রেতা আসবে। Upwork হলো অফিস। তুই অ্যাপ্লাই করবি, ইন্টারভিউ দিবি, তারপর কাজ পাবি।"
"মানে আরও কঠিন?"
"হ্যাঁ। কিন্তু পয়সা বেশি। ফাইভারে ক্লায়েন্ট পনেরো ডলার দিয়ে পঞ্চাশ ডলারের কাজ চায়। Upwork-এ ক্লায়েন্ট জানে যে ভালো কাজের জন্য ভালো দাম দিতে হয়।"
৪
জাহিদ সেই রাতে Upwork-এ অ্যাকাউন্ট খুলল।
প্রথম ধাক্কাটা প্রোফাইলে। ফাইভারে প্রোফাইল মানে একটা ছবি আর কয়েকটা গিগ। Upwork-এ প্রোফাইল মানে একটা পুরো CV। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, স্কিল টেস্ট, পোর্টফোলিও, ঘণ্টাপ্রতি রেট।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অনার্স। ইম্প্রেসিভ না। কিন্তু Upwork-এ ডিগ্রি দেখে না কেউ। দেখে পোর্টফোলিও। পোর্টফোলিও: ফাইভারের বাইশটা ছোট কাজ, বেশিরভাগ ওয়ার্ডপ্রেস সেটআপ।
জাহিদের আসল স্কিল: Django আর React। দুটোই শিখেছে ইউটিউব থেকে, প্র্যাকটিস করেছে নিজের প্রজেক্টে। কিন্তু কোনো ক্লায়েন্টের জন্য Django দিয়ে কিছু বানায়নি এখনো।
৫
জাহিদ একটা সিদ্ধান্ত নিল।
Upwork-এ সে নিজেকে "Full Stack Developer" হিসেবে পজিশন করবে না। কারণ Full Stack Developer সবাই। প্রতিটা বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ফ্রিল্যান্সার নিজেকে Full Stack Developer বলে। এটা একটা শব্দ যার কোনো মানে নেই কারণ সবাই বলে।
সে নিজেকে পজিশন করবে: "Django + React developer for small business tools."
ইনভয়েসিং সিস্টেম, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, CRM, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং। গ্ল্যামারাস না। কিন্তু ডিমান্ড আছে। কারণ পৃথিবীতে ছোট ব্যবসা অনেক, আর প্রতিটা ছোট ব্যবসা এক্সেলে সব ম্যানেজ করে। এক্সেল দিয়ে একটা পর্যায়ের পর আর হয় না। তখন দরকার একটা সিম্পল ওয়েব অ্যাপ।
সেই ওয়েব অ্যাপ বানাবে জাহিদ।
৬
Upwork-এ ক্লায়েন্ট জব পোস্ট করে, তুমি প্রপোজাল পাঠাও। প্রপোজাল মানে কভার লেটার। কেন তুমি এই কাজটা করতে পারবে, আগে কী করেছো, কত চার্জ করবে। প্রতিটা জবে পঞ্চাশ থেকে একশো প্রপোজাল আসে। ক্লায়েন্ট প্রথম দশটা পড়ে।
জাহিদ প্রথম দুই সপ্তাহে বিশটা প্রপোজাল পাঠাল। কোনো রিপ্লাই নেই। তৃতীয় সপ্তাহে আরো পনেরোটা। একটা রিপ্লাই: "Thanks, but we went with someone else." চতুর্থ সপ্তাহে বারোটা। দুইটা রিপ্লাই। একটা বলল, "Can you share a relevant portfolio piece?" জাহিদ নিজের বানানো ডেমো ইনভয়েসিং অ্যাপের লিংক পাঠাল। ইন্টারভিউ দিল। কাজ পেল না।
দুই মাস। সাতচল্লিশটা প্রপোজাল। শূন্য কাজ।
৭
জাহিদ হতাশ হলো? হলো। কিন্তু ফাইভারে ফিরে গেল না।
কারণ জাহিদ বোঝে: ফাইভারে ফিরে গেলে আরাম পাবে, কিন্তু আটকে যাবে। পনেরো ডলারের গিগ সারাজীবন করতে হবে। এটা sunk cost fallacy না। এটা strategic patience। sunk cost fallacy হলো ডুবন্ত জাহাজে থাকা কারণ "এতদূর এসেছি।" Strategic patience হলো জানা যে গন্তব্য সামনে, কিন্তু রাস্তাটা লম্বা।
নাহিদ বলল, "ধৈর্য ধর। আমারও প্রথম কাজ পেতে ছয় সপ্তাহ লেগেছিল। Upwork-এ প্রথম কাজটা পাওয়া সবচেয়ে কঠিন। তোর কোনো রিভিউ নেই। শূন্য রিভিউ মানে রিস্ক।"
৮
নবম সপ্তাহে প্রথম কাজ পেল।
ক্লায়েন্ট: মিস্টার রিচার্ড হেন্ডারসন। লন্ডনের একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ছোট ফার্ম, তিনজন কর্মী। দরকার একটা সিম্পল ইনভয়েসিং টুল। ক্লায়েন্টের তথ্য ইনপুট, ইনভয়েস জেনারেট, PDF ডাউনলোড, পেমেন্ট ট্র্যাকিং।
রেট: ঘণ্টায় পনেরো ডলার। আনুমানিক চল্লিশ ঘণ্টা।
পনেরো গুণ চল্লিশ = ছয়শো ডলার।
বাংলাদেশি টাকায় প্রায় বাহাত্তর হাজার। একটা কাজে। এক সপ্তাহে। বাবা মাসে কত আয় করেন? পঞ্চাশ-পঁচান্ন হাজার। জাহিদ এক সপ্তাহে বাবার এক মাসের আয়ের চেয়ে বেশি কামাবে। মফস্বলে বসে। ল্যাপটপে।
কিন্তু আগে কাজটা করতে হবে।
৯
ব্যাকেন্ড Django, ফ্রন্টেন্ড React, ডেটাবেজ PostgreSQL। মিস্টার হেন্ডারসন প্রতিদিন সকালে মেসেজ দেন: "How's the progress?" জাহিদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আপডেট পাঠায়। স্ক্রিনশটসহ।
Upwork-এ ট্র্যাকার আছে। ক্লায়েন্ট চাইলে দেখতে পারে কাজের সময় কী করছো। স্ক্রিনশট নেয় প্রতি দশ মিনিটে। ট্র্যাকার চালু থাকলে পেমেন্ট গ্যারান্টিড। Upwork এসক্রো সিস্টেমে কাজ করে।
নয় দিন লাগল। মিস্টার হেন্ডারসন খুশি। রিভিউ দিলেন: ৫ স্টার। "Zahid delivered exactly what I needed. Clear communication, on-time delivery. Will hire again."
১০
"Will hire again." এই তিনটা শব্দ Upwork-এ সোনার চেয়ে দামি।
রিপিট ক্লায়েন্ট মানে নতুন প্রপোজাল লেখা লাগে না। মিস্টার হেন্ডারসন পরের মাসে আরেকটা কাজ দিলেন: ড্যাশবোর্ড। কোন ক্লায়েন্ট কত দেয়নি, কোন ইনভয়েস overdue, মাসিক আয়ের সারাংশ। বিশ ঘণ্টা। তিনশো ডলার।
তারপর তার এক বন্ধুকে রেফার করলেন। ম্যানচেস্টারের আরেক অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ইনভয়েসিং টুল দরকার, কিন্তু UK VAT ক্যালকুলেশন যোগ করতে হবে।
জাহিদ VAT জানে না। কিন্তু গুগল করলে জানা যায়। VAT রেট ২০%, কিছু আইটেমে ৫%, কিছু exempt। এটুকু বুঝলেই ক্যালকুলেশন লজিক লেখা যায়।
দ্বিতীয় ক্লায়েন্ট। পঁয়ত্রিশ ঘণ্টা। পাঁচশো পঁচিশ ডলার।
১১
আয়ের কার্ভটা দেখতে এরকম।
মাস এক-তিন: মাসে একশো-দুইশো ডলার। প্রোফাইল বিল্ডিং। প্রপোজাল লেখা, রিজেক্ট হওয়া, ছোট কাজ করা, রিভিউ জমানো।
মাস চার-ছয়: মাসে তিনশো-পাঁচশো ডলার। রিপিট ক্লায়েন্ট আসতে শুরু করেছে। রেফারেল আসছে। প্রোফাইলে দশ-বারোটা ফাইভ স্টার রিভিউ।
মাস সাত-বারো: মাসে পাঁচশো-আটশো ডলার। Upwork "Top Rated" ব্যাজ। Top Rated মানে Upwork সার্টিফাই করছে এই ফ্রিল্যান্সার ভালো। ক্লায়েন্ট দেখলে ভরসা করে। রেট বাড়ানো যায়। ঘণ্টায় পনেরো থেকে আঠারো, তারপর বিশ ডলার।
১২
মাসে আটশো ডলার। মফস্বলে। মানে কী?
জাহিদের থাকা-খাওয়ার খরচ শূন্য। বাবা-মায়ের সাথে থাকে। খাবার ঘর থেকে। নিজের খরচ: মোবাইল রিচার্জ পাঁচশো, ইন্টারনেট দেড় হাজার, বন্ধুদের সাথে চা-নাস্তা হাজার টাকা। মাসে তিন হাজার।
বাংলাদেশি টাকায় আটশো ডলার মানে ছিয়ানব্বই হাজার। ছিয়ানব্বই হাজার আয়, তিন হাজার খরচ। বাকি তিরানব্বই হাজার সেভিংস।
ঢাকায় থাকলে? ভাড়া পনেরো-বিশ, খাবার আট-দশ, যাতায়াত তিন-চার, ইউটিলিটি দুই-তিন। মাসে পঞ্চাশ হাজার খরচ। সেভিংস ছেচল্লিশ হাজার। মফস্বলের অর্ধেক।
দুইশো ডলার ইনকাম হলেও মফস্বলে রাজার হালে থাকা যায়। কোনো ঢাকা ভাড়া নেই, কোনো যানজট নেই। মায়ের রান্না। বাবার ছাদ।
১৩
এটা PPP আর্বিট্রাজ। Purchasing Power Parity।
আমেরিকান ক্লায়েন্ট আমেরিকান রেটে পে করে। জাহিদ বাংলাদেশি রেটে খরচ করে। মাঝখানের ফারাকটা জাহিদের পকেটে।
আমেরিকায় জুনিয়র ডেভেলপার ঘণ্টায় ত্রিশ-চল্লিশ ডলার। জাহিদ পনেরো-বিশ ডলার। ক্লায়েন্টের জন্য সস্তা, জাহিদের জন্য দামি। মিস্টার হেন্ডারসন লন্ডনে ডেভেলপার হায়ার করলে ঘণ্টায় পঞ্চাশ-সত্তর পাউন্ড দিতেন। পনেরো ডলারে কাজ হয়ে যাচ্ছে, দুজনেই লাভে।
তুলনামূলক সুবিধা। রিকার্ডো সাহেবের তত্ত্ব। দুইশো বছর পুরনো, এখনো কাজ করে।
১৪
কিন্তু মাঝখানে কাটা যায়।
Upwork কমিশন: বিশ পার্সেন্ট (প্রথম পাঁচশো ডলারে)। তারপর Payoneer-এর দুই পার্সেন্ট কারেন্সি কনভার্সন ফি। তারপর বাংলাদেশি ব্যাংকের কনভার্সন রেটে আরো তিন পার্সেন্ট।
একশো ডলার কামালে হাতে আসে ছিয়াত্তর ডলার। চব্বিশ ডলার মাঝখানে গায়েব। প্রায় এক চতুর্থাংশ।
জাহিদ জানে। হিসাব করে রাখে। কিন্তু করার কিছু নেই। প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলে প্ল্যাটফর্মের ট্যাক্স দিতে হবে।
কাটাকুটির পর মাসে হাতে আসে ছয়শো দশ ডলারের মতো। বাংলাদেশি টাকায় তিয়াত্তর হাজার। জাহিদ বাবা-মাকে প্রতি মাসে বিশ হাজার দেয়। বাবা প্রথমে নিতে চাননি। জাহিদ বলল, "এটা দেওয়া না, এটা ঋণ শোধ।"
মায়ের কাছে বাবা বললেন, "ছেলেটা মানুষ হয়ে গেছে।"
১৫
মানুষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখানেই ফাঁদ।
মাসে আটশো ডলার। মফস্বলে রাজার মতো। বাবা-মাকে টাকা দিচ্ছে। সেভিংস জমছে। জীবন আরামের। মাথার ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর বলে: "এই তো, যথেষ্ট। আর কী চাই?"
এটা present bias। বর্তমানের আরাম ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ঢেকে দেয়। আজকে আটশো ডলার ভালো লাগছে, তাই কালকে দেড় হাজার ডলারের চেষ্টাটা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে present bias সবচেয়ে বড় শত্রু। কারণ কেউ নেই বলার জন্য যে "তোমার পারফরম্যান্স ভালো না।" কোনো বস নেই, কোনো appraisal নেই, কোনো KPI নেই। তুমি নিজেই বস। আর নিজের বসকে ফাঁকি দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ।
১৬
নাহিদ একদিন ফোনে বলল।
"তুই এখন কত নিচ্ছিস ঘণ্টায়?"
"পনেরো ডলার।"
"কবে থেকে?"
"শুরু থেকে।"
"তুই Top Rated পেয়ে গেছিস। রিভিউ ভালো। ক্লায়েন্ট খুশি। তুই কেন এখনো পনেরো ডলারে?"
জাহিদ বলল, "রেট বাড়ালে ক্লায়েন্ট চলে যাবে না?"
"কিছু যাবে। কিন্তু ভালো ক্লায়েন্ট যাবে না। আর তুই যদি দুই বছর পরেও পনেরো ডলারে থাকিস, তুই পিছিয়ে যাবি। কারণ বাজার এগিয়ে যায়। আজকের পনেরো ডলার দুই বছর পরে বারো ডলারের সমান। ইনফ্লেশন।"
কথাটা মাথায় ঢুকল।
১৭
কিন্তু রেট বাড়াতে হলে স্কিল বাড়াতে হবে।
পনেরো ডলারে Django + React দিয়ে CRUD অ্যাপ বানানো যায়। পঁচিশ-ত্রিশ ডলার চার্জ করতে হলে ক্লায়েন্টকে বলতে হবে: "আমি শুধু কোড লিখি না, আমি ডিপ্লয়মেন্ট করি, ডেটাবেজ অপটিমাইজ করি, CI/CD সেটআপ করি।"
জাহিদ নিজের জন্য নিয়ম বানাল: প্রতি মাসে একটা নতুন জিনিস শেখা।
এই মাস: PostgreSQL। শুধু ব্যবহার না, performance tuning, indexing, query optimization। পরের মাস: Docker। কন্টেইনারাইজেশন। ক্লায়েন্টকে বলা যাবে, "তোমার অ্যাপটা Docker-এ দেব, যেকোনো সার্ভারে একটা কমান্ডে রান করতে পারবে।" তার পরের মাস: AWS basics। EC2, S3, RDS।
প্রতি মাসে একটা নতুন ইট। একটার ওপর আরেকটা।
১৮
present bias বলে: "কাল শিখব। আজকে একটু রেস্ট নিই।"
কাল কখনো আসে না। কাল মানে আরেকটা আজ। আজকের "একটু রেস্ট" কালকেও "একটু রেস্ট" হয়ে যায়।
জাহিদ এটার বিরুদ্ধে একটাই অস্ত্র পেয়েছে: রুটিন। সকাল আটটা থেকে বারোটা, ক্লায়েন্টের কাজ। বিকেল তিনটা থেকে ছয়টা, ক্লায়েন্টের কাজ। রাত নয়টা থেকে এগারোটা, নিজের শেখা। শুক্রবার ছুটি। কোনো exception নেই।
রুটিন বোরিং। কিন্তু বোরিং জিনিস কাজ করে।
১৯
দশ মাস পর।
জাহিদের Upwork প্রোফাইল: Top Rated। Job Success Score ১০০%। আঠারোটা কমপ্লিটেড জব। সব ফাইভ স্টার। তিনটা দেশের ক্লায়েন্ট: UK, USA, Canada। স্পেশালাইজেশন: Django + React, small business tools।
প্রোফাইলে লেখা: "Based in Bangladesh."
কিছু ক্লায়েন্ট "US only" বা "UK only" ফিল্টার দেয়। তারা জাহিদকে দেখবেই না। কিন্তু যারা দেখে, তারা দেখে ফাইভ স্টার, ১০০% জব সাকসেস, ক্লায়েন্ট রিভিউ। "Zahid is my go-to developer now." একজন লিখেছে।
Bangladesh লেখা দেখে কেউ কেউ এড়িয়ে যায়। কিন্তু যারা কাজ করে, তারা ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত কাজের মান বলে, পাসপোর্ট না।
২০
রাতে কাজ শেষ করে জাহিদ ব্যালকনিতে দাঁড়াল।
মফস্বলের রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। দূরে মসজিদের মাইক থেকে এশার আজানের শেষ সুর। আকাশে তারা, ঢাকার মতো আলোর দূষণ নেই।
মা ডাকলেন, "খেয়ে নে, ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, শুটকি মাছের ভর্তা। মায়ের রান্না। ঢাকায় থাকলে হোটেলের তেলচিটচিটে খিচুড়ি খেত।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "ক্লায়েন্ট কোন দেশের?" "কানাডা।" বাবা মাথা নাড়লেন। বাবার কাছে কানাডা, আমেরিকা, ইংল্যান্ড সব এক: বিদেশ। বিদেশের লোক ছেলেকে কাজ দিচ্ছে, ছেলে টাকা কামাচ্ছে, এটুকু যথেষ্ট।
জাহিদ ভাত খেতে খেতে ভাবল, এই টেবিলে বসে সে লন্ডনের অ্যাকাউন্ট্যান্টের ইনভয়েসিং টুল বানায়, কানাডার ডেন্টিস্টের বুকিং সিস্টেম বানায়। আর এই টেবিলেই মায়ের ডাল-ভাত খায়।
তার ঠিকানা মফস্বল। তার বাজার পৃথিবী।
দুটোই সত্য। দুটোই একসাথে সত্য।